রবিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৩

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (১৫) তিন প্রকার বিষয় দ্বারা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জিত হতে পারে



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ১৫)

এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

তিন প্রকার বিষয় দ্বারা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জিত হতে পারে--
(১) শুধু এলেম এবং তা হচ্ছে এলমে মুকাশাফা। (২) শুধু আমল; যেমন শাসনকর্তার ন্যায়বিচার করা এবং মানুষকে শৃংখলায় রাখা। (৩) এলেম ও আমলের সমন্বয়ে গঠিত শাস্ত্রই হচ্ছে আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্র। এই শাস্ত্রজ্ঞ আলেম ও আমেল উভয়টি হয়ে থাকে। এখন তুমি নিজেই পছন্দ কর কেয়ামতে আল্লাহ্'র সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত আলেমদের অন্তর্ভুক্ত হবে, না আমেলদের, না উভয় দলের অন্তর্ভুক্ত থাকবে? নিছক সুখ্যাতির অনুসরণ করার তুলনায় এ কাজটি তোমার জন্যে অধিক জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ। জনৈক কবি বলেন : যা দেখ এবং শুন, তা ত্যাগ কর। সূর্য সামনে থাকতে শনি গ্রহের কি প্রয়োজন? এখানে আমরা পূর্ববর্তী ফেকাহবিদগণের কিছু অবস্থা লিপিবদ্ধ করছি। এতে জানা যাবে, যারা নিজেদেরকে তাঁদের মাযহাবের অনুসারী বলে দাবী করে, তারা তাঁদের প্রতি জুলুম করে এবং কিয়ামতে তারাই হবে এই ফেকাবিদগণের বড় দুশমন। কেননা, স্ব স্ব এলেম দ্বারা আল্লাহ্ পাকের সন্তুষ্টি ছাড়া পূর্ববর্তী ফেকাহবিদগণের অন্য কোন লক্ষ্য ছিল না। তাঁদের অবস্থার মধ্যে আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্রজ্ঞদের লক্ষণ পরিদৃষ্ট হয়েছে। সেমতে আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্রজ্ঞদের লক্ষণ প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়ে থাকে, তাঁরা কেবল ফেকাশাস্ত্রেই মশগুল ছিলেন না; বরং আধ্যাত্ম্য জ্ঞানেরও চর্চা করতেন। এটা ঠিক, এ জ্ঞান সম্পর্কে তাঁরা কোন কিতাব লেখেননি এবং কাউকে এর সবকও দেননি। সাহাবায়ে কেরাম যে কারণে ফেকাহশাস্ত্র সম্পর্কে কোন কিতাব লেখেননি এবং দরস দেননি, সে একই কারণে ফেকাবিদগণও তা করেননি। অথচ ফতোয়া শাস্ত্রে সব সাহাবীই এক একজন ফেকাবিদ ছিলেন।

পরবর্তী পর্ব
পূর্বের ফেকাবিদ ও এযুগের ফেকাবিদের পার্থক্য


জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (১৪) কালাম শাস্ত্র ও দর্শনশাস্ত্র



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ১৪)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
কালাম শাস্ত্র ও দর্শনশাস্ত্র-
আমরা জ্ঞানের প্রকারসমূহের মধ্যে কালাম শাস্ত্র ও দর্শনশাস্ত্রের উল্লেখ করিনি এবং এগুলো ভাল কি মন্দ তাও বর্ণনা করিনি। এর কারণ, কালাম শাস্ত্রের যে সকল উপকারিতার প্রমাণ পাওয়া যায়, সেগুলোর সারমর্ম কোরআন ও হাদীসে বিদ্যমান রয়েছে। যেসকল বিষয় কোরআন ও হাদীস বহির্ভূত, সেগুলো হয় বেদআতের অন্তর্ভুক্ত মন্দ বিবাদ বিসম্বাদ, না হয় বিভিন্ন ফেরকার বিরোধ সম্পর্কিত দীর্ঘ বক্তৃতা বিবৃতি। সুতরাং এগুলো সব বাতিল ও অর্থহীন বিষয়। সুস্থ হৃদয় এগুলো দূষণীয় মনে করে এবং সত্যপন্থী কান এগুলো শ্রবণ করতে সম্মত নয়। আর কিছু বিষয় রয়েছে যা দ্বীনের সাথে সম্পর্ক রাখে না এবং সাহাবায়ে কেরামের যুগে তার কোন অস্তিত্বই ছিল না। তখন এসব বিষয় নিয়ে চিন্তা করা বেদআত বলে গণ্য হত। কিন্তু এখন নীতি বদলে গেছে। কারণ, এ ধরনের বেদআত অনেক হয়ে গেছে, যা কোরআন ও হাদীসের দাবীর প্রতি বিমুখ করে। এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটেছে যারা বেদআতের সন্দেহকে মসৃণ করেছে এবং এ সম্পর্কে বক্তৃতা রচনা করেছে। ফলে এসব বিষয় নিয়ে চিন্তা করা প্রথমে নিষিদ্ধ থাকলেও প্রয়োজনের খাতিরে এখন জায়েয; বরং ফরযে কেফায়া হয়ে গেছে।
দর্শনশাস্ত্র
দর্শনশাস্ত্র কোন আলাদা শাস্ত্র নয়; বরং এর চারটি অংশ রয়েছে -
(১) জ্যামিতি ও অংক। পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে, এ উভয়টিই জায়েয। যার সম্পর্কে আশংকা হয় যে, এগুলো পাঠ করলে খারাপ শাস্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়বে, তাকে ছাড়া অন্য কাউকে এগুলো পাঠ করতে নিষেধ করা যাবে না। যার সম্পর্কে আশংকা, তাকে নিষেধ করা দরকার। কারণ, এসব বিষয়ে অধিক পারদর্শী হলে মানুষ বেদআতের দিকে ঝুঁকে পড়ে। অতএব যাদের ঈমান দুর্বল, তাদেরকে উভয় বিষয় পাঠ করা থেকে বাঁচানো উচিত । যেমন, ছোট শিশুকে নদীর কিনারে দাঁড়াতে দেয়া হয় না অথবা নও-মুসলিমকে কাফেরদের সাথে মেলামেশা করা থেকে দূরে রাখা হয়. যাতে তার উপর সংসর্গের প্রভাব না পড়ে।
(২) দ্বিতীয় অংশ ফালসাফা (দর্শন)-এর সাথে সম্পর্কযুক্ত। এতে প্রমাণের অবস্থা ও শর্ত এবং সংজ্ঞার কারণ ও শর্ত বর্ণিত হয়। উভয়টিই কালাম শাস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত।
(৩) এলমে ইলাহিয়াত- অর্থাৎ আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলীর বর্ণনা। এটাও কালাম শাস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত। দার্শনিকরা এক্ষেত্রে কোন নতুন ধরনের জ্ঞান আবিষ্কার করেননি; বরং তাদের মাযহাব আলাদা। তন্মধ্যে কতক কুফর এবং কতক বেদআত। মুতাযেলী হয়ে যাওয়া যেমন আলাদা শাস্ত্র নয়; বরং কালাম শাস্ত্রীদেরই কতক লোক যুক্তি-প্রমাণের অবতারণা করে বাতিল মাযহাব সৃষ্টি করে নিয়েছে, দার্শনিকদের অবস্থাও তেমনি।
(৪) পদার্থবিদ্যা- এর কতক অংশ শরীয়ত বিরোধী। এটা মূলতঃ জ্ঞানই নয় যে, জ্ঞানের প্রকারসমূহের মধ্যে বর্ণনা করা যাবে; বরং এটা মূর্খতা। আর কতক অংশে পদার্থের গুণাবলী, বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন এবং রূপান্তরণের বিষয় আলোচিত হয়। এর অবস্থা চিকিৎসা শাস্ত্রের মত। পার্থক্য এই যে, চিকিৎসকের দৃষ্টি রোগ ও সুস্থতার দিক দিয়ে বিশেষভাবে মানব দেহের উপর নিবদ্ধ থাকে এবং পদার্থবিদদের দৃষ্টি পদার্থের মধ্যে পরিবর্তন ও গতিশীলতার দিকে নিমগ্ন থাকে। কিন্তু চিকিৎসাশাস্ত্র পদার্থবিদ্যার তুলনায় উত্তম। কারণ, এর প্রয়োজন আছে এবং পদার্থবিদ্যার তেমন প্রয়োজন পড়ে না।

সারকথা, কালাম শাস্ত্র ফরযে কেফায়া জ্ঞানসমূহের অন্যতম। এর ফলে সর্বসাধারণের অন্তর বেদআতীদের চিন্তাধারা থেকে মুক্তি পায়। বেদআত পয়দা হওয়ার কারণে এ শাস্ত্র ওয়াজেব হয়েছে। যেমন হজ্জের পথে বেদুঈনদের জুলুম ও রাহাজানির কারণে রক্ষীর আশ্রয় নেয়া জরুরী হয়ে পড়েছে। যদি বেদুঈনরা তাদের অত্যাচার বন্ধ করে দেয়, তবে হজ্জের শর্তসমূহের মধ্যে সাহায্য গ্রহণ করার শর্ত বাদ পড়ে যাবে। অনুরূপ বেদআতীরা যদি তাদের বাজে বকা বন্ধ করে দেয়, তবে সাহাবায়ে কেরামের সময়ে যতটুকু ছিল, এর বেশী কালাম শাস্ত্রের প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকবে না।
অতএব কালাম শাস্ত্রীদের জানা উচিত, ধর্মে তাদের মর্তবা হজ্জের পথে রক্ষীদের মর্তবারই মত। যদি রক্ষী রক্ষা কাজ ছাড়া অন্য কিছু না করে, তবে সে হাজী হবে না। হজ্জের ক্রিয়াকর্ম আদায় করলেই কেবল হাজী হবে। এমনিভাবে যদি কালামশাস্ত্রী কেবল বিতর্ক ও বেদআত দমনেই মশগুল থাকে এবং আখেরাতের পথ অতিক্রম না করে, আত্মার উন্নতি ও সংশোধনে নিয়োজিত না হয়, তবে সে কখনও আলেমে দ্বীনগণের মধ্যে গণ্য হবে না। তার কাছে আকীদা অন্তর ও মুখের বাহ্যিক আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত। হাঁ, সর্বসাধারণ থেকে তার তফাৎ এতটুকু হবে যে, সে বেদআতীদের সাথে লড়াই করতে পারে এবং সাধারণ লোকের হেফাযত করে। কিন্তু আল্লাহ, তাঁর সিফাত ও কর্ম এবং এলমে মুকাশাফায় বর্ণিত বিষয়সমূহের পরিচয় কালাম শাস্ত্রের দ্বারা অর্জিত হয় না । বরং এ শাস্ত্র যে এগুলোর অন্তরায় তাতেও আশ্চর্যের কিছু নেই। একমাত্র মুজাহাদা তথা সাধনার দ্বারাই এসব বিষয় অর্জন করা যায়। মুজাহাদাকে আল্লাহ্ তা'আলা হেদায়েতের মুখবন্ধ সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ-
>“যারা আমার পথে সাধনা করে, অবশ্যই আমি তাদেরকে আমার পথ প্রদর্শন করব। নিশ্চয় আল্লাহ্ সৎকর্মপরায়ণদের সাথে রয়েছেন।”
এখন আমি কালামশাস্ত্রীর সংজ্ঞাও বর্ণনা করলাম যে, সে সর্বসাধারণের বিশ্বাসকে বেদআতীদের যুক্তিজট থেকে মুক্ত রাখে, যেমন রক্ষী হাজীদেরকে বেদুঈনদের লুণ্ঠন থেকে রক্ষা করে।
আমি ফেকাহবিদের সংজ্ঞা এই বর্ণনা করেছি যে, সে সেসব আইন জানে, যদ্দ্বারা বাদশাহ্ একে অপরের উপর সীমালংঘন দমন করতে পারে। ধর্ম শাস্ত্রের তুলনায় এই উভয় কাজ নিম্নস্তরের। অথচ গুণী আলেম বলে যাঁরা প্রসিদ্ধ, তাঁরা হলেন ফেকাহবিদ ও কালামশাস্ত্রী। তাঁরা আল্লাহ তা'আলার কাছে শ্রেষ্ঠ।
এখন যদি কেউ প্রশ্ন করে, আপনি ধর্ম শাস্ত্রের সাথে তুলনা করে এই আলেমগণকে নিম্নস্তরের বলেন কেন? তবে এর জওয়াব এই যে, যেব্যক্তি মানুষের আচার-আচরণ দেখে সত্যের পরিচয় লাভ করে, সে পথভ্রষ্টতার অরণ্যে উদভ্রান্ত হয়ে ফিরে। প্রথমে সত্য জানা দরকার। এর পর মানুষ চেনা উচিত, যদি সে সত্য পথের পথিক হয়। আর যদি তুমি অনুসরণ করেই তুষ্ট থাক এবং মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের প্রসিদ্ধ স্তরের প্রতিই দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখ, তবে সাহাবায়ে কেরামের অবস্থা ও উচ্চ মর্তবা থেকে গাফেল হয়ো না। যাদের কথা তুমি বল, তারা সবাই এ ব্যাপারে একমত যে, সাহাবায়ে কেরাম সর্বশ্রেষ্ঠ। দ্বীনের ব্যাপারে কেউ তাঁদের মত চলতে পারে না, এমনকি তাঁদের কাছেও ঘেঁষতে পারে না। অথচ তাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব কালাম ও ফেকাহ শাস্ত্রের কারণে ছিল না; বরং আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্র ও তার পথ অবলম্বনের কারণে ছিল।
হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর যে শ্রেষ্ঠত্ব অন্যদের উপর ছিল, তা বেশী রোযা রাখা, বেশী নামায পড়া এবং বহু হাদীস রেওয়ায়েতের কারণে ছিল না, ফতোয়া দান ও কালাম শাস্ত্রের দিক দিয়েও ছিল না; বরং সে বিষয়ের দিক দিয়ে ছিল, যা তাঁর বক্ষে প্রবিষ্ট ছিল। তোমার সে রহস্যের অনুসন্ধানে আগ্রহী হওয়া উচিত। এটাই উৎকৃষ্ট ও গুপ্ত ভান্ডার বিশেষ।
যাকে সাধারণ লোকজন বড় মনে করে এবং সম্মান করে, তাকে পরিত্যাগ কর। কেননা, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হাজারো সাহাবী দুনিয়াতে রেখে গেছেন। তাঁরা আল্লাহর দেয়া জ্ঞানে জ্ঞানী ছিলেন। তাঁদের প্রশংসা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিজে করেছেন। তাঁদের কেউ কালাম শাস্ত্র সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ছিলেন না। দশ জনের কিছু বেশী সংখ্যক সাহাবী ছাড়া কেউ নিজেকে ফতোয়া দানের কাজে নিয়োজিত করেননি। হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) সাহাবীগণের অন্যতম ছিলেন। তাঁর কাছে কেউ ফতোয়া জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন : “অমুক শাসনকর্তার কাছে যাও। সে এ কাজ নিজের দায়িত্বে গ্রহণ করেছে। এ প্রশ্নটি তার কাছে রাখ।” এতে ইঙ্গিত ছিল, মোকদ্দমা ও বিধিবিধান সম্পর্কে ফতোয়া দেয়া প্রশাসনের অন্তর্ভুক্ত।
হযরত ওমর (রাঃ)-এর ওফাতের পর হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বললেন : এলেমের দশ ভাগের নয় ভাগ তিরোহিত হয়ে গেছে। লোকেরা বলল : আমাদের মধ্যে বড় বড় সাহাবী বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও আপনি একথা বলছেন কেন? তিনি বললেন : আমার উদ্দেশ্য ফতোয়া ও বিধানের এলেম নয়- আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কিত এলেম উদ্দেশ্য। হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) কি কালাম শাস্ত্র ইত্যাদি বুঝিয়েছিলেন? যদি না বুঝিয়ে থাকেন, তবে তুমি সে এলেমের মারেফত হাসিল করতে আগ্রহ কর না কেন, যার দশ ভাগের নয় ভাগ হযরত ওমরের ওফাতের কারণে তিরোহিত হয়ে গিয়েছিল? অথচ হযরত ওমর (রাঃ) কালাম ও বিতর্কের দরজা বন্ধ করেন। কেউ তাঁর সামনে কোরআনের দু'আয়াতের পরস্পর বিরোধিতার প্রশ্ন উত্থাপন করলে তিনি তাকে দোররা মারতেন এবং তার সাথে মেলামেশা করতে মানুষকে নিষেধ করে দিতেন।
আলেমদের মধ্যে ফেকাহবিদ কালামশাস্ত্রীরা সমধিক প্রসিদ্ধ-
আলেমদের মধ্যে ফেকাহবিদ কালামশাস্ত্রীরা সমধিক প্রসিদ্ধ একথার জওয়াব এই যে, যে বিষয় দ্বারা আল্লাহ তা'আলার কাছে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হয় এবং যার দ্বারা মানুষের মধ্যে প্রসিদ্ধি লাভ করা যায়, তা অন্য জিনিস। সেমতে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর প্রসিদ্ধি ছিল খেলাফতের দিক দিয়ে এবং শ্রেষ্ঠত্ব ছিল সেই রহস্যের কারণে যা তাঁর অন্তরে রক্ষিত ছিল। অনুরূপভাবে হযরত ওমর (রাঃ)-এর প্রসিদ্ধি ছিল রাজনীতির কারণে এবং শ্রেষ্ঠত্ব ছিল সে এলেমের দিক দিয়ে, যার দশ ভাগের নয় ভাগ তাঁর মৃত্যুর ফলে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর লক্ষ্য ছিল আল্লাহ তাআলার নৈকট্য এবং জনগণের প্রতি ন্যায়বিচার ও স্নেহ মমতা। এদিক দিয়ে তাঁর মাহাত্ম্য ছিল অনন্য । এ বিষয়টি তাঁর অন্তরে লুক্কায়িত ছিল । তাঁর অন্যান্য বাহ্যিক ক্রিযয়াকর্ম তো অন্য লোকদের দ্বারাও সম্পাদিত হওয়া সম্ভবপর ছিল, যারা জাঁকজমক, সুখ্যাতি ও নামযশ প্রত্যাশী।
মোট কথা, প্রসিদ্ধি ক্ষতিকর বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত আর শ্রেষ্ঠত্ব গোপন বিষয়ের আওতাভুক্ত, যা কেউ অবগত হতে পারে না। অতএব ফেকাহ ও কালামবিদ যথাক্রমে শাসক ও বিচারকের ন্যায়। তারা কয়েক ধরনের। তাদের কেউ আপন এলেম ও ফতোয়া দ্বারা আল্লাহ্'র সন্তুষ্টি কামনা করে এবং রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর তরীকাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়; নামযশ ও সুখ্যাতি তাদের কাম্য হয় না। আল্লাহ্ তাআলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। আল্লাহ্ তাআলার কাছে তাদের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ, তারা এলেম অনুযায়ী আমল করে এবং ফতোয়া ও দলীল দ্বারা আল্লাহ তাআলার সত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করে। কেননা, প্রত্যেক এলেমই আমল, কিন্তু প্রত্যেক আমল এলেম নয়। চিকিৎসকও তার এলেম দ্বারা আল্লাহ্'র নৈকট্য লাভে সক্ষম। সে তার এলেম দ্বারা আল্লাহ্'র জন্যে কাজ করে বিধায় সওয়াবের অধিকারী হবে। এমনিভাবে যদি শাসনকর্তা জনগণের কাজকারবার আল্লাহর জন্যে করে, তবে সে আল্লাহ্'র কাছে পছন্দনীয় ও সওয়াবের যোগ্য হবে- ধর্ম শাস্ত্রের ব্যাপারে দায়িত্বশীল হওয়ার দিক দিয়ে নয়; বরং এমন কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্যে, যার লক্ষ্য আল্লাহ্ তা'আলার নৈকট্য অর্জন করা।

রবিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৩

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (১৩) আখেরাত বিষয়ক এলেম



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ১৩)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আখেরাত বিষয়ক এলেম (এলমে মুকাশাফা)
উল্লেখ্য, আখেরাত বিষয়ক এলেম দুই প্রকার- এলমে মুকাশাফা ও এলমে মুয়ামালা। এলমে মুকাশাফার অপর নাম এলমে বাতেন। এটা সকল জ্ঞানের চূড়ান্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। সেমতে জনৈক সাধক বলেন : যে ব্যক্তি এ শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না, তার সমাপ্তি অকল্যাণকর হবে বলে আমি আশংকা করি। এ শাস্ত্র সম্পর্কে সর্বনিম্ন জ্ঞান এই যে, একে সত্য বলে বিশ্বাস করবে এবং যোগ্য লোকদের এ জ্ঞানের অধিকারী হওয়ার কথা স্বীকার করবে।
অন্য একজন বলেন : যার মধ্যে বেদআত ও আত্মম্ভরিতা রয়েছে, সে অন্যান্য শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ হয়ে গেলেও এই শাস্ত্রের কোন বিষয় অর্জন করতে পারবে না। এ শাস্ত্র অস্বীকারকারীর সর্বনিম্ন শাস্তি এই যে, এ শাস্ত্র থেকে সে কিছুই লাভ করতে পারে না। এটা সিদ্দীক ও নৈকট্যশীল বান্দাদের শাস্ত্র। এটা একটা নূর। অন্তর যখন তার মন্দ গুণাবলী থেকে পবিত্র ও পরিষ্কার হয়ে যায়, তখন এই নূর অন্তরে প্রকাশ পায়। এ নূরের প্রভাবে মানুষের সামনে রহস্যের বহু দ্বারোদঘাটিত হয়ে যায়। পূর্বে যেসব বিষয়ের কেবল নাম শুনত এবং কিছু অস্পষ্ট অর্থ ধারণা করে নিত, এ নূরের বরকতে এখন সেসবগুলোর অর্থ সুস্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠে। এমনকি, তখন আল্লাহ তা'আলার সত্তার প্রকৃত মারেফত অর্জিত হয় এবং তাঁর চিরন্তন গুণাবলীর, তাঁর কর্মের, দুনিয়া ও আখেরাতের সৃষ্টি রহস্যের এবং আখেরাতকে দুনিয়ার উপর নির্ভরশীল করার বাস্তব মারেফত অর্জিত হয়ে যায়। নবুওয়ত, নবীর অর্থ, ওহী, ফেরেশতা ও শয়তানের অর্থ, মানুষের সাথে শয়তানের শত্রুতার অবস্থা, নবীগণ কর্তৃক ফেরেশতাগণকে জানার স্বরূপ, তাঁদের কাছে ওহী পৌছার অবস্থা, আকাশ ও পৃথিবীর অবস্থা, অন্তরের মারেফত, তার মধ্যে ফেরেশতা ও শয়তানের বাহিনীর মোকাবিলার অবস্থা, ফেরেশতাগণের ইলহাম ও শয়তানদের কুমন্ত্রণার মধ্যে পার্থক্যের পরিচয়, আখেরাত, জান্নাত, দোযখ, কবরের আযাব, পুলসেরাত, মীযান ও হিসাবের পরিচয়, নিম্নোক্ত আয়াতসমূহের তত্ত্ব
>“তুমি তোমার আমলনামা পাঠ কর। আজ তুমি তোমার হিসাব গ্রহণকারীরূপে যথেষ্ট।“
>“আখেরাতের গৃহই প্রকৃত জীবন যদি তারা জানত।”
আল্লাহ তা'আলার সাক্ষাৎ, তাঁকে দেখার অর্থ, তাঁর নৈকট্যশীল হওয়া ও প্রতিবেশী হওয়ার উদ্দেশ্য, ঊর্ধ্ব জগতের সঙ্গ এবং ফেরেশতাগণের নৈকট্য দ্বারা ভাগ্যবান হওয়ার মর্ম, জান্নাতীদের স্তরের মধ্যে এত পার্থক্য হওয়া যে, তারা একে অপরকে আকাশের উজ্জ্বল তারকার মত ঝলমল করতে দেখবে- ইত্যাদি আরও অনেক বিষয় এ নূরের কারণে জ্ঞাত হওয়া যায়।
এ নূরের পূর্বে উপরোক্ত বিষয়সমূহের মর্মে মানুষ মতভেদ করে। মূল বিষয়বস্তু সত্য বলে বিশ্বাস করে ঠিক, কিন্তু আপন স্বার্থের ব্যাপারে কিসের মধ্যে কি বলতে থাকে! কতক লোকের বিশ্বাস- এগুলো সব দৃষ্টান্ত। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা'আলা তার সৎ বান্দাদের জন্যে যা সৃষ্টি করেছেন তা কোন চোখ দেখেনি, কান শুনেনি এবং কারও অন্তর কল্পনাও করেনি। মানুষের জন্যে জান্নাতে গুণাবলী ও নাম ছাড়া কিছু নেই। কারও বিশ্বাস- এগুলোর মধ্যে কিছু বিষয় দৃষ্টান্ত এবং কিছু বিষয় এমন, যার স্বরূপ শব্দ থেকে জানা যায়।
কারও মতে, আল্লাহ তা'আলার মারেফতের পরিণতি ও পূর্ণতা, তাঁকে জানার ব্যাপারে অক্ষমতা স্বীকার করা। কিছু লোক আল্লাহ তা'আলার মারেফত সম্পর্কে বড় বড় দাবী করে।
কেউ কেউ বলে, আল্লাহ তা'আলার মারেফতের চূড়ান্ত স্তর সর্বসাধারণের বিশ্বাসের সীমা; অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা বিদ্যমান, জ্ঞাত, ক্ষমতাশালী, শ্রোতা, দ্রষ্টা, বাক্যালাপকারী।
এলমে মুকাশাফা বর্ণনা করার পেছনে আমাদের উদ্দেশ্য এসব বিষয়ের উপর থেকে পর্দা সরে যাওয়া, সত্য বিষয় চোখে দেখে নেয়ার মত পরিষ্কার ও স্পষ্ট হয়ে যাওয়া এবং এরপর কোন সন্দেহের অবকাশ না থাকা। অন্তরের উপর পাপাচারের মরিচা থরে থরে পড়ে না থাকলে এটা মানুষের সাধ্যাতীত নয়।
আখেরাতের এলেম দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য সেসব পাপাচার থেকে অন্তরের স্বচ্ছ হওয়ার অবস্থা জানা, যেগুলো আল্লাহ তা'আলা, তাঁর গুণ ও কর্মের স্বরূপ জানতে বাধা সৃষ্টি করে। অন্তর স্বচ্ছ ও পরিষ্কার করার একমাত্র উপায় হচ্ছে কামনা-বাসনা থেকে বিরত থাকা এবং সর্বাবস্থায় পয়গম্বরগণের অনুসরণ করা। এ উপায় অবলম্বন করলে অন্তর পরিষ্কার হতে থাকবে, তাতে সত্যের অংশ প্রতিফলিত এবং সত্যের স্বরূপ উদ্ভাসিত হতে থাকবে। এ স্বচ্ছতার পথ রিয়াযত তথা সাধনা ও জ্ঞান ছাড়া কিছুই নয়। সাধনার বিবরণ স্বস্থানে বর্ণিত হবে। এসব জ্ঞান কোন কিতাবে লিখিত হয় না। আল্লাহ তা'আলা যাকে এ জ্ঞান সামান্য দান করেন, সে তা অন্যের কাছে সাধারণভাবে বর্ণনা করে না; কেবল যোগ্য সহচরের কাছেই বর্ণনা করে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিম্নোক্ত হাদীসে এ গোপন জ্ঞানের কথাই উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন : "কতক জ্ঞান লুক্কায়িত ধনভান্ডারের ন্যায়। সাধকবৃন্দ ছাড়া কেউ এগুলো জানে না। তাঁরা এগুলো বললে কেবল সেসব লোকই এ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে যারা আল্লাহর ব্যাপারে বিভ্রান্ত।" সুতরাং আল্লাহ তা'আলা যে আলেমকে এ জ্ঞানের কিছু অংশ দান করেন, তাঁকে হেয় মনে করো না। কেননা, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে হেয় করেননি এবং এ জ্ঞান দান করেছেন।

আখেরাত বিষয়ক এলেম- ২ (এলমে মুয়ামালা)
এলমে মুয়ামালা হচ্ছে অন্তরের ভালমন্দ অবস্থা জানা। ভাল অবস্থা যেমন- সবর, শোকর, ভয়, আশা, সন্তুষ্টি, সংসার বর্জন, খোদাভীতি, অল্পে তুষ্টি, দানশীলতা, সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ স্বীকার করা, মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার করা, আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখা, সচ্চরিত্রতা, সৎভাবে জীবন যাপন করা, সততা, এগুলোর স্বরূপ জানা, এগুলো অর্জনের উপায় জানা, এগুলোর ফলাফল ও আলামত চেনা, এগুলোর মধ্যে কোনটি দুর্বল হয়ে গেলে তাকে শক্তিশালী করার উপায় জানা এবং কোনটি বিলুপ্ত হয়ে গেলে তা সৃষ্টি করার পদ্ধতি আয়ত্ত করা আখেরাত বিষয়ক এলেমের অন্তর্ভুক্ত।
পক্ষান্তরে অন্তরের মন্দ অবস্থা, যেমন দারিদ্র্যের ভয়, তকদীরের প্রতি অসন্তোষ, হিংসা-দ্বেষ পোষণ, বড়ত্ব অন্বেষণ, প্রশংসা কামনা, পার্থিব ভোগ-বিলাসের জন্যে দীর্ঘ জীবনের আকাঙ্ক্ষা, অহংকার, রিয়া, ক্রোধ আস্ফালন, শত্রুতা, লোভ, কৃপণতা, লালসা, বিত্তবানদের সম্মান করা, ফকীরদেরকে হেয় করার প্রয়াস, কোন বিষয়ে একে অপরের উপর বড়াই করা, সত্য বিষয়ে অহমিকা করা, অনর্থক চিন্তা-ভাবনা করা, বেশী কথা বল পছন্দ করা, অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে সেজেগুজে থাকা, ধর্মের কাজে শৈথিল্য করা, নিজেকে বড় মনে করা, নফসের অনিষ্ট থেকে গাফেল হয়ে অন্যের দোষ অন্বেষণ করা, নিশ্চিন্ত হওয়া, আল্লাহর ভয় থেকে মুক্ত থাকা, অপমান বোধ করলে কঠোরভাবে তার প্রতিশোধ নেয়া, সত্য বিষয়ের প্রতিশোধে দুর্বল হওয়া, আল্লাহর আযাব থেকে নির্ভয় হওয়া, এবাদতের উপর ভরসা করা, চক্রান্ত, আত্মসাৎ ও প্রতারণা করা কঠোর প্রাণ হওয়া, রূঢ়ভাষী হওয়া, দুনিয়া নিয়ে খুশী থাকা, পার্থিব সাফল্য না পেয়ে কাতর হওয়া, জুলুম করা, লজ্জা শরম ও দয়া কম হওয়া ইত্যাদি। এগুলো সবই মন্দ। অন্তরের এসব অভ্যাস সকল অনিষ্ট ও কুকর্মের মূল। এর বিপরীত তথা ভাল অভ্যাসসমূহ আনুগত্য ও পুণ্যের মূল। এগুলোর সংজ্ঞা, স্বরূপ, কারণ, ফলাফল ও প্রতিকার জানার নাম আখেরাত শাস্ত্র । এ শাস্ত্রের আলেমগণের ফতোয়া অনুযায়ী এটি ফরযে আইন। যেব্যক্তি এ থেকে বিমুখ থাকবে, সে আখেরাতে সত্যিকার মহাসম্রাটের ক্রোধে নিপতিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। যেমন, বাহ্যিক আমলের প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শনকারী দুনিয়ার শাসনকর্তার তরবারি দ্বারা এবং ফেকাবিদগণের ফতোয়া অনুযায়ী ধ্বংস হয়ে যায়। সারকথা, ফেকাবিদগণ দুনিয়ার কল্যাণের সাথে সম্বন্ধযুক্ত করে ফরযে আইন বিষয়সমূহ দেখে থাকেন । আর আমরা যে জ্ঞানের বিষয় বর্ণনা করেছি, তা মানুষকে আখেরাতের কল্যাণের সাথে সম্বন্ধযুক্ত করে। কোন ফেকাহবিদকে তাওয়াক্কুল অথবা এখলাস সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হলে অথবা রিয়া থেকে আত্মরক্ষার উপায় সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে সে জওয়াবদানে বিরত থাকবে। অথচ এটা তার নিজের উপরও ফরযে আইন। এটা না জানলে তার পরকাল বিনষ্ট হবে। কিন্তু তাকে যদি লেয়ান, যেহার, ঘোড়দৌড় ও তীরন্দাজির মাসআলা জিজ্ঞেস করা হয়, তবে সে এগুলোর সূক্ষ্ম শাখা-প্রশাখার বিরাট দফতর বর্ণনা করে দেবে, যেগুলোর প্রয়োজন শত শত বছর পর্যন্তও কারও হবে না। প্রয়োজন হলেও সেগুলোর বর্ণনাকারীর অভাব হবে না। ফেকাহবিদ দিবারাত্র এগুলোর স্মরণ ও পাঠদান করার মধ্যে অতিবাহিত করে। কিন্তু যে বিশেষ বিষয়টি তার জন্য জরুরী এবং গুরুত্বপূর্ণ, তার প্রতি গাফেল থাকে। এ ব্যাপারে কেউ আপত্তি করলে সে বলে : এটা দ্বীনী এলেম এবং ফরযে কেফায়া। তাই আমি এতে নিয়োজিত আছি। মানুষ এ ধোঁকায় পড়ে ফেকাহর জ্ঞানার্জন করে এবং অপরকে ধোঁকা দেয়। জ্ঞানী ব্যক্তি মাত্রই জানে, যদি ফরযে কেফায়ার হক আদায় করাই তার উদ্দেশ্য হত, তবে ফরযে কেফায়ার পূর্বে ফরযে আইন বিষয়ে জ্ঞানার্জন করত। বস্তুতঃ ফরযে কেফায়া আরও অনেক রয়েছে। সেগুলো ফেকাহ্'র পূর্বে অর্জন করত। কোন কোন শহরে কাফের যিম্মী ছাড়া মুসলমান চিকিৎসক নেই। ফেকাহর যেসকল বিধি-বিধান চিকিৎসা শাস্ত্রের সাথে সম্পর্কযুক্ত, সেগুলোতে কাফেরদের সাক্ষ্য গ্রহণীয় নয়, কিন্তু এতদসত্ত্বেও ফেকাহবিদ চিকিৎসা শাস্ত্র না শেখে এবং ফেকাহ্ শাস্ত্র বিশেষতঃ বিরোধপূর্ণ ও বিতর্কিত মাসআলাসমূহ শিক্ষা করার কাজে বাড়াবাড়ি করে। অথচ এ ধরনের ফতোয়াদান ও মোকদ্দমায় জওয়াব লেখার লোক শহরে ভূরি ভূরি বিদ্যমান রয়েছে। এমতাবস্থায় যখন কিছু লোক এ ফরযে কেফায়া পালনে তৎপর রয়েছে, তখন ফেকাবিদরা এটা শিক্ষা করার অনুমতি কিরূপে দেবে এবং যে চিকিৎসা শাস্ত্র কেউ জানে না, তা বর্জন করার আদেশ কিরূপে দেবে? এর কারণ এছাড়া কিছুই নয় যে, চিকিৎসা শাস্ত্রের জ্ঞানার্জনে ওয়াক্ফ ও ওসিয়তের মুতাওয়াল্লী হওয়া যায় না, এতীমদের ধনসম্পদের রক্ষক হওয়া যায় না, বিচারবিভাগ ও শাসনবিভাগে চাকুরী লাভ করে সমকক্ষদের চেয়ে এগিয়ে যাওয়া যায় না এবং শত্রুদের উপর প্রবলও হওয়া যায় না।
পরিতাপের বিষয়, মন্দ আলেমদের ধোঁকায় দ্বীন মিটে গেছে। আল্লাহ আমাদেরকে এমন বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করুন, যার কারণে তিনি অসন্তুষ্ট হন এবং শয়তান খুশী হয়। বাহ্যদর্শী আলেমগণের মধ্যে যারা পরহেযগার ছিলেন, তাঁরা বাতেনী আলেম ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন আলেমগণের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতেন ।
উদাহরণতঃ ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) শায়বান নামক এক আবেদ রাখালের সামনে এমনভাবে হাঁটু গেড়ে বসতেন : যেমন মক্তবে বালকরা ওস্তাদের সামনে বসে। তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করতেন : অমুক অমুক ব্যাপারে আমি কি করব? লোকেরা ইমাম শাফেয়ীকে বলত : আপনার মত জ্ঞানী গুণী ব্যক্তি এই জংলী লোকটির নিকট কি শিখতে পারেন? তিনি বলতেনঃ তোমরা যা শেখনি, তার তওফীক এ ব্যক্তি প্রাপ্ত হয়েছেন।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহঃ) ও ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন (রহঃ) মারূফ কারখীর কাছে যাতায়াত করতেন। অথচ তিনি যাহেরী এলেমে এঁদের সমকক্ষ ছিলেন না। তাঁরা উভয়ই তাঁকে আমল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনাকেও জিজ্ঞেস করা হয়, আমরা যদি কোন বিষয়ের সম্মুখীন হই এবং কোরআন ও হাদীসে তার বিধান খুঁজে না পাই, তবে কি করব? তিনি বললেন : সাধু পুরুষদের কাছে জিজ্ঞেস করো এবং তাদের পরামর্শ গ্রহণ করো। এ কারণেই বলা হয়েছে, বাহ্যিক আলেমগণ পৃথিবী ও দেশের শোভা এবং বাতেনী আলেমগণ আকাশ ও ফেরেশতাজগতের সৌন্দর্য।
জুনাইদ (রহঃ) বলেন : একদিন আমাকে আমার মুর্শিদ সিররী (রহঃ) বললেন : তুমি আমার কাছ থেকে উঠে কার কাছে গিয়ে বস? আমি বললাম : মুহাসেবী (রহঃ)-এর কাছে। তিনি বললেন : ভাল কথা। তাঁর জ্ঞান ও আদব গ্রহণ করো। কিন্তু তিনি যে কালাম শাস্ত্র ও মুসলিম দার্শনিকদের খণ্ডন করেন তা শেখো না। এরপর আমি তাঁর কাছ থেকে উঠার সময় একথা বলতে শুনলাম : আল্লাহ্ তোমাকে এলেম ও হাদীসওয়ালা সূফী করুন- সূফী হাদীসওয়ালা না করুন। এতে ইঙ্গিত রয়েছে, যেব্যক্তি হাদীস ও এলেম শিখে সূফী হয়, সে সফলতা লাভ করে। আর যেব্যক্তি সূফী হয়ে হাদীস শিক্ষা করে, সে নিজেকে বিপন্ন করে।

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (১২) যে জ্ঞান ফরযে কেফায়া



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ১২)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যে জ্ঞান ফরযে কেফায়া
প্রকাশ থাকে যে, শিক্ষার প্রকারসমূহ উল্লেখ না করা পর্যন্ত কোনটি ফরয এবং কোন্‌টি ফরয নয়- এর পার্থক্য বুঝা যাবে না। ফরযে কেফায়ার দিক দিয়ে জ্ঞান দু'রকম- শরীয়তগত ও শরীয়ত বহির্ভূত। পয়গম্বরগণের কাছ থেকে যে জ্ঞান অর্জিত হয় এবং বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও শ্রবণ দ্বারা অর্জিত হয় না, তাকে আমরা শরীয়তগত জ্ঞান বলে থাকি। যেমন, অংক শাস্ত্র বুদ্ধি দ্বারা, চিকিৎসা শাস্ত্র অভিজ্ঞতার দ্বারা এবং অভিধান শাস্ত্র শ্রবণের দ্বারা অর্জিত হয়। যে জ্ঞান শরীয়তগত নয়, তা তিন প্রকার- ভাল, মন্দ, অনুমোদিত। যে জ্ঞানের সাথে পার্থিব বিষয়াদির উপযোগিতা জড়িত, তা ভাল জ্ঞান; যেমন চিকিৎসা ও অংক শাস্ত্র ! এ শ্রেণীর জ্ঞানের মধ্যে কতক ফরযে কেফায়া এবং কতক শুধু ভাল- ফরয নয়। পার্থিব বিষয়াদিতে যে জ্ঞানের প্রয়োজন তা ফরযে কেফায়া। যেমন চিকিৎসা শাস্ত্র। দেহের সুস্থতার জন্যে এটা জরুরী। লেনদেন, ওসিয়ত, উত্তরাধিকার বন্টন ইত্যাদিতে অংক শাস্ত্র জরুরী। শহরে কোন ব্যক্তি এ জ্ঞানের অধিকারী না থাকলে শহরবাসীর অসুবিধার অন্ত থাকবে না। কিন্তু অংক শাস্ত্রে একজন জ্ঞানী হলেও যথেষ্ট হয়ে যায় এবং অন্যরা এ ফরয থেকে অব্যাহতি পায়। আমরা চিকিৎসা ও অংক শাস্ত্রের জ্ঞান ফরয বলেছি। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কেননা, এদিক দিয়ে মৌলিক শিল্পগুলোও ফরযে কেফায়া। উদাহরণতঃ বস্ত্র বয়ন, কৃষিকাজ এবং রাজনীতি প্রভৃতিও ফরযে কেফায়া। বরং বদরক্ত চুষে বের করা এবং সেলাই কর্ম শিক্ষা করাও জরুরী। কোন শহরে বদরক্ত বের করার লোক না থাকলে শহরবাসীর জীবন বিপন্ন হবে। যে আল্লাহ রোগ প্রেরণ করেছেন, তিনি ওষুধও নাযিল করেছেন এবং ব্যবহার পদ্ধতিও নির্দেশ করেছেন। এভাবে তিনি রোগমুক্তির উপকরণ ঠিক করে দিয়েছেন। সুতরাং এসব উপকরণ কাজে না লাগিয়ে বিনা চিকিৎসায় মরে যাওয়া বৈধ নয়। যে জ্ঞান ফরয নয়, কেবল ভাল, যেমন অংক ও চিকিৎসার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়সমূহে মনোনিবেশ করার প্রয়োজন হয় না। শরীয়ত বহির্ভূত জ্ঞানের মধ্যে মন্দ শিক্ষা, যেমন জাদু ও তেলেসমাতের জ্ঞান, আর অনুমোদিত অর্থাৎ, বৈধ জ্ঞান যেমন, ক্ষতিকর নয় এমন কবিতা এবং ইতিহাসের জ্ঞান। এখানে শরীয়তগত জ্ঞান বর্ণনা করা উদ্দেশ্য। এ জ্ঞান সবই ভাল। কিন্তু বাস্তবে মন্দ হওয়া সত্ত্বেও তা শরীয়তগত জ্ঞান জানায় ধোকা হয় বিধায় এ জ্ঞান দুরকম- ভাল ও মন্দ। ভাল জ্ঞানের কিছু অংশ মৌলিক, কিছু অংশ শাখা, কিছু অংশ ভূমিকা এবং কিছু অংশ পরিশিষ্ট । অর্থাৎ, এ জ্ঞানের চারটি শ্রেণী রয়েছে ।

শরীয়তগত জ্ঞানের প্রথম প্রকার হচ্ছে মৌলিক।
এ মৌলিক জ্ঞান চারটি- (১) আল্লাহর কিতাব, (২) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নত, (৩) উম্মতের ইজমা এবং (৪) সাহাবায়ে কেরামের ঐতিহ্য। ইজমা যেহেতু সুন্নতকে জানার সুযোগ করে দেয়, তাই এটা মৌলিক জ্ঞান। কিন্তু এর মর্যাদা সুন্নতের পর। সাহাবায়ে কেরামের ঐতিহ্যও সুন্নত জ্ঞাপন করে। কারণ, সাহাবায়ে কেরাম ওহী প্রত্যক্ষ করেছেন এবং অবস্থার ইঙ্গিত দ্বারা এমন সব বিষয় দেখেছেন যা অন্যের দৃষ্টিতে অদৃশ্য। তাই আলেমগণ তাঁদের অনুসরণ করা এবং তাঁদের ঐতিহ্যগুলোকে প্রমাণ সাব্যস্ত করা যথার্থ মনে করেছেন।
শরীয়তগত জ্ঞানের দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে শাখা,
যা এই চারটি মৌলিক জ্ঞান থেকে বুঝা যায়, শব্দাবলী থেকে বুঝা যায় না; বরং অর্থ সম্ভার ও কারণাদির মাধ্যমে হৃদয়ঙ্গম করা যায়। উদাহরণতঃ রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন-
"বিচারক ক্রুদ্ধ অবস্থায় কোন রায় দেবে না।" এ থেকে এটাও জানা যায় যে, যখন বিচারকের উপর প্রস্রাবের চাপ থাকে, অথবা সে ক্ষুধার্ত থাকে অথবা রোগ যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকে, তখনও রায় দেবে না।এই শাখা জ্ঞান দু'ভাগে বিভক্ত-
(১) পার্থিব কল্যাণ সংক্রান্ত জ্ঞান। কল্যাণের সাথে ফেকাহ্ এর অন্তর্ভুক্ত। এর দায়িত্বে রয়েছেন ফেকাবিদগণ। তাঁরা পার্থিব আলেম।
(২) আখেরাতের কল্যাণ সম্পর্কিত জ্ঞান হচ্ছে মনের অবস্থা এবং তার ভাল ও মন্দ অভ্যাসের জ্ঞান। এসব অভ্যাসের মধ্যে কোটি আল্লাহ্র পছন্দনীয় আর কোনটি অপছন্দনীয়, তাও জানতে হয়। এ গ্রন্থের শেষার্ধে এ জ্ঞানের বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে।

শরীয়তগত জ্ঞানের তৃতীয় প্রকার হচ্ছে ভূমিকা,
যা শরীয়তগত জ্ঞানের হাতিয়ারস্বরূপ। যেমন, অভিধান ও ব্যাকরণ উভয়টিই কালামে পাক ও হাদীস শরীফের জ্ঞানার্জনের হাতিয়ার। অথচ অভিধান ও ব্যাকরণ শরীয়তগত জ্ঞান নয়। কিন্তু শরীয়ত জানার জন্যে এগুলো নিয়ে গবেষণা করা অপরিহার্য। কেননা, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর শরীয়ত আরবী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। প্রত্যেক শরীয়তের অবস্থা তার ভাষার মাধ্যমে পরিস্ফুট হয়। তাই আরবী অভিধানের জ্ঞানার্জন কালামে পাক ও হাদীস শরীফের জ্ঞানার্জনের জন্য হাতিয়ার সাব্যস্ত হয়েছে। পুথিগত জ্ঞানও এ হাতিয়ারের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এটা জরুরী নয়। কেননা, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উম্মী ছিলেন; পুথিগত শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না। যদি ধরে নেয়া যায়, শ্রুত কথাবার্তা স্মরণ রাখা সম্ভবপর, তবে লেখা শেখার প্রয়োজন থাকবে না। কিন্তু প্রায়শঃ মানুষ এরূপ হয় না বিধায় অক্ষর জ্ঞান জরুরী।
শরীয়তী জ্ঞানের চতুর্থ প্রকার হচ্ছে পরিশিষ্ট।
এটা কোরআন মজীদে রয়েছে। কারণ, এর কতক অংশ শব্দাবলীর সাথে সম্পর্কযুক্ত। যেমন, কেরাত ও অক্ষরের মাখরাজ তথা উচ্চারণস্থল প্রভৃতির জ্ঞানার্জন। আবার এর কয়েকটি অর্থের সাথে সম্পৃক্ত- যেমন, তফসীর। এ জ্ঞানও কোরআন হাদীসের জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল। কেবল অভিধানের জ্ঞান এর জন্যে যথেষ্ট নয়। আরও কতক অংশ কোরআনের বিধি-বিধানের সাথে সম্পর্কযুক্ত। যেমন, নাসেখ, মনসুখ এবং আম ও খাস ইত্যাদির জ্ঞান। এ জ্ঞানকে ‘উসূলে ফেকাহ্' তথা ফেকাহ্ মূলনীতি বলা হয়। হাদীসও এর অন্তর্ভুক্ত।
হাদীস ও সাহাবীগণের বর্ণনায় রাবীদের নাম, বংশ পরিচয় ও অন্যান্য অবস্থা জানা, সাহাবীদের নাম ও গুণাবলী জানা, যাতে দুর্বল হাদীসকে শক্তিশালী হাদীস থেকে পৃথক করা যায়। রাবীদের বয়সের অবস্থা জানা, যাতে মুরসাল হাদীস মুসনাদ থেকে আলাদা হয়ে যায়। এমনি ধরনের সকল বিষয় পরিশিষ্টের অন্তর্ভুক্ত।
শরীয়তগত জ্ঞানের উপরোক্ত প্রকার চতুষ্টয় কল্যাণকর এবং ফরযে কেফায়া। যদি প্রশ্ন হয়, উপরে ফেকাহ পার্থিব জ্ঞান এবং ফোকাবিদগণকে পার্থিব আলেম বলা হল কেন? তবে জওয়াব এই যে, আল্লাহ্ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-কে মাটির দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর সন্তান সন্ততিকে বীর্য দ্বারা সৃষ্টি করে পিতার ঔরস থেকে মাতার গর্ভে এবং সেখান থেকে দুনিয়াতে ভূমিষ্ঠ করেছেন। এরপর দুনিয়া থেকে কবরে, কবর থেকে হিসাব-নিকাশের জন্যে হাশরে এবং সেখান থেকে জান্নাতে অথবা জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। এগুলোই হচ্ছে মানুষের সূচনা এবং শেষ মনযিল ও শেষ পরিণতি। আল্লাহ্ তা'আলা দুনিয়াকে মানুষের জন্যে আখেরাতের শস্যক্ষেত্র করেছেন, যাতে মানুষ উপার্জনযোগ্য বিষয়সমূহ এখানে উপার্জন করে নেয়। মানুষ যদি সুষ্ঠুভাবে ও ইনসাফ সহকারে দুনিয়াকে গ্রহণ করে, তবে সকল ঝগড়াই চুকে যায় এবং ফেকাহবিদগণের কোন প্রয়োজনই অবশিষ্ট থাকে না। কিন্তু মানুষ তা করে না। সে প্রবৃত্তির তাড়নায় তাড়িত হয়ে দুনিয়াকে গ্রহণ করে । ফলে দুনিয়াতে ঝগড়া-বিবাদ ও কলহ সৃষ্টি হয়। এমতাবস্থায় মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে রাজা-বাদশাহ তথা শাসনকর্তার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে এবং আইন-কানুন রচনা করতে হয়েছে। ফেকাহবিদ শাসননীতি প্রণয়নে পারদর্শী এবং বিবাদ-বিসংবাদে মানুষের মধ্যে ইনসাফ করার পদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। তিনি শাসনকর্তাকে পথ প্রদর্শন করেন। হাঁ, দ্বীনের সাথেও ফেকা সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু সরাসরি নয়- দুনিয়ার মধ্যস্থতায়। কারণ, দুনিয়া হচ্ছে আখেরাতের শস্যক্ষেত্র এবং দ্বীন দুনিয়া ব্যতীত পূর্ণতা লাভ করে না। রাজ্য শাসন ও দ্বীন উভয়েই যমজ অর্থাৎ এক সাথে থাকে। দ্বীন আসল এবং রাজ্য তার রক্ষক। বৃক্ষ যেমন শিকড় ব্যতীত টিকে থাকতে পারে না, দ্বীনও তেমনি রক্ষক ব্যতীত কায়েম-থাকে না। রাজ্য শাসন ও ব্যবস্থাপনা রাজা ব্যতীত পূর্ণ হয় না। ঝগড়া-বিবাদ ফয়সালা করার ব্যবস্থা ফেকা সাহায্যে হয়ে থাকে। সুতরাং রাজ্য শাসন যেমন প্রথম স্তরের দ্বীনী এলেম নয়; বরং দ্বীনের পূর্ণতায় রাজ্য শাসন সহায়ক হয়ে থাকে, তেমনি রাজ্য শাসন পদ্ধতি অর্থাৎ ফেকাহ্ জ্ঞানলাভ করাও প্রথম স্তরের দ্বীনী এলেম নয়। উদাহরণতঃ পথিমধ্যে বেদুইনদের কবল থেকে রক্ষা করে- এমন ব্যক্তিকে সাথে না নিয়ে হজ্জ পূর্ণ হয় না। কিন্তু হজ্জ এক বস্তু, হজ্জের পথে চলা দ্বিতীয় বস্তু, হজ্জ পূর্ণ হওয়ার জন্যে পথের নিরাপত্তা তৃতীয় বস্তু এবং এর পদ্ধতি, কৌশল ও আইন-কানুন জানা চতুর্থ বস্তু। রাজ্য শাসন ও হেফাযতের পদ্ধতি শিক্ষা করা ফেকার সারকথা। নিম্নোক্ত হাদীসটি এর প্রমাণ :
"আমীর, মামুর ও মুতাকাল্লিফ- এ তিন শ্রেণী ব্যতীত যেন কেউ শাসনকার্য পরিচালনা না করে"।
এ হাদীসে 'আমীর' বলে ইমাম তথা শাসককে বুঝানো হয়েছে। প্রথম যুগে শাসকই ফতোয়া দিতেন। ‘মামুর' অর্থ ইমামের নায়েব এবং ‘মুতাকাল্লিফ' অর্থ যে আমীরও নয় এবং মামুরও নয়। সে সেই ব্যক্তি, যে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এসব পদ গ্রহণ করে । সাহাবায়ে কেরামের রীতি ছিল, তাঁরা ফতোয়া দেয়া থেকে গা বাঁচিয়ে চলতেন এবং একে অপরের উপর ন্যস্ত করতেন। কিন্তু কেউ কোরআন ও আখেরাতের অবস্থা জিজ্ঞেস করলে বলে দিতেন। কতক রেওয়ায়েতে মুতাকাল্লিফ শব্দের স্থলে 'মুরায়ী' অর্থাৎ, রিয়াকার বর্ণিত আছে। কারণ, যেব্যক্তি ফতোয়া দানের পদ গ্রহণ করে, অথচ এ কাজের জন্যে একমাত্র সেই নির্দিষ্ট নয়, তার মতলব নাম যশ ও অর্থোপার্জন ছাড়া অন্য কিছু মনে হয় না। বলা যেতে পারে, আপনার এ বক্তব্য হুদ্বুদ ও কেসাসের বিধি-বিধানে এবং ক্ষতিপূরণ ও ঝগড়া-বিবাদের ফয়সালায় জায়েয হতে পারে। কিন্তু এ গ্রন্থের প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডে বর্ণিত বিষয়বস্তু যেমন- নামায-রোযা ইত্যাদি এবাদত এবং হালাল হারাম কাজ-কারবারের বর্ণনা এ বক্তব্য অন্তর্ভুক্ত করে না। ফেকাবিদগণ এসব বিষয়েও ফতোয়া দিয়ে থাকেন। এর জওয়াব এই যে, ফেকাহবিদগণ আখেরাতের বিষয়সমূহের মধ্য থেকে যেসব আমল বর্ণনা করেন, সেগুলো বেশীর চেয়ে বেশী তিন প্রকার হতে পারে- ( ১ ) ইসলাম, (২) নামায ও যাকাত এবং (৩) হালাল ও হারাম। কিন্তু এগুলোর মধ্যেও ফেকাহ্বিদের চূড়ান্ত দৃষ্টি দুনিয়ার সীমা পার হয়ে আখেরাতের দিকে ধাবিত হয় না। এ তিন বিষয়ের অবস্থাই যখন এই, তখন অন্যান্য বিষয়ে তো দুনিয়ার মধ্যেই থাকবে। উদাহরণতঃ ইসলাম সম্পর্কে ফেকাহবিদ কিছু বললে একথাই বলবে যে, অমুকের ইসলাম সঠিক এবং অমুকের ইসলাম সঠিক নয়। মুসলমান হওয়ার শর্ত এগুলো কিন্তু এসব বর্ণনায় মুখ ছাড়া অন্য কোন দিকে তার দৃষ্টি থাকবে না। অন্তর তার রাজত্বের বাইরে। কেননা রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) রাজা বাদশাহদেরকে অন্তরের রাজত্ব থেকে পদচ্যুত করে দিয়েছেন। সেমতে জনৈক সাহাবী এমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলেন যে মুখে ইসলামের কলেমা উচ্চারণ করেছিল। হত্যাকারী রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে এই বলে ওযর পেশ করলেন যে, লোকটি তরবারির ভয়ে কলেমা উচ্চারণ করেছিল। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাকে শাসিয়ে বললেন :
"তুমি কি তার অন্তর চিরে দেখেছিলে, সে অন্তর দিয়ে বলছে কিনা?" বরং ফেকাহবিদ ইসলাম সঠিক হওয়ার ফতোয়া তরবারির ছায়াতলে দেয়। অথচ সে জানে, তরবারি দ্বারা তার সন্দেহ দূর হয়নি এবং অন্তরের উপর থেকে মূর্খতার পর্দা সরে যায়নি। যদি কোন ব্যক্তির ঘাড়ের উপর তরবারি উত্তোলিত থাকে এবং ধন-সম্পদের দিকে হাত প্রসারিত থাকে, এমতাবস্থায় সে কলেমা উচ্চারণ করলে ফেকাহবিদের ফতোয়া অনুযায়ী তার প্রাণ ও ধন-সম্পদ বেঁচে যাবে। কলেমার দৌলতে তার জীবন ও ধন-সম্পদের ব্যাপারে কেউ আপত্তি করতে পারবে না। এ কারণেই রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন :
“কলেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্” না বলা পর্যন্ত মানুষের সাথে যুদ্ধ করার আদেশ আমাকে দেয়া হয়েছে। যখন তারা এ কলেমা বলবে, তখন আমার কাছ থেকে তারা তাদের জান ও মাল বাঁচিয়ে নেবে।”
এ হাদীসে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কেবল জান ও মালের উপর এ মৌখিক কলেমার প্রভাব ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু আখেরাতে মৌখিক কথাবার্তা উপকারী নয়; বরং অন্তরের নূর, রহস্য ও চরিত্র উপকারী। এসব বিষয় ফেকাহ শাস্ত্রের অন্তর্গত নয়। কোন ফেকাহবিদ এগুলো বর্ণনা করলে তা কালাম ও চিকিৎসা শাস্ত্র বর্ণনা করার মতই হবে। তার এ বর্ণনা ফেকাহ্ শাস্ত্র বহির্ভূত ।
অনুরূপভাবে যদি কেউ বাহ্যিক সব শর্ত পূরণ করে নামায আদায় করে এবং প্রথম তকবীর ছাড়া সমস্ত নামাযে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গাফেল থাকে; বরং বাজারের কাজকারবারের কথা চিন্তা করতে থাকে, তবে ফেকাহবিদ অবশ্যই ফতোয়া দেবেন যে, তার নামায সঠিক হয়েছে। অথচ এ নামায আখেরাতে তেমন উপকারী হবে না। যেমন, মুখে কেবল কলেমা উচ্চারণ করে নেয়া ইসলামের ব্যাপারে বিচার দিবসে উপকারী হবে না। কিন্তু ফেকাহবিদ এই অর্থে ইসলাম সঠিক হওয়ার ফতোয়া দেবেন যে, সে যা করছে তাতে আল্লাহ্র আদেশসূচক বাক্য পালিত হয়ে গেছে এবং হত্যা ও শাস্তি তার উপর থেকে অপসারিত হয়ে গেছে! নামাযে খুশু খুযু, নম্রতা ও অন্তর হাযির করা, যা আখেরাতের কাজ, তা নিয়ে ফেকাহবিদগণ সচরাচর আলোচনা করেন না। করলেও তা ফেকাহ্ শাস্ত্র থেকে আলাদাই থাকবে ।
যাকাতের ব্যাপারেও ফেকাহবিদের দৃষ্টি এতটুকুতেই নিবদ্ধ থাকে, যতটুকু দ্বারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি থেকে শাসনকর্তার দাবী পূর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ, এতটুকু হওয়া যে, যদি মালদার ব্যক্তি যাকাত দিতে অস্বীকার করে এবং শাসনকর্তা তাকে জবরদস্তি গ্রেফতার করে, তবে এ ফতোয়া যেন দেয়া যায় যে, তার যিম্মায় যাকাত নেই।
বর্ণিত আছে, কাজী আবু ইউসুফ বছরের শেষ ভাগে নিজের ধন-সম্পদ স্ত্রীকে দান করে দিতেন এবং তার ধন-সম্পদ তাকে দিয়ে নিজের নামে দান করিয়ে নিতেন, যাতে যাকাত ওয়াজেব না হয়। এ বিষয়টি কেউ হযরত আবু হানীফা (রহঃ)-এর কাছে বর্ণনা করলে তিনি বললেন : এটা তার ফেকাহর ফল। ইমাম আবু হানীফার এ উক্তি যথার্থ। কেননা, এ কৌশল কেবল দুনিয়াবী ফেকাই হতে পারে। পরকালে এর ক্ষতি যেকোন গোনাহ থেকে বড়।
হালাল ও হারামের অবস্থা এই যে, হারাম থেকে আত্মরক্ষা করার স্থির নির্দেশ রয়েছে, কিন্তু হারাম থেকে আত্মরক্ষা করার চারটি স্তর রয়েছে-
(১) সেই স্তর, যা সাক্ষীর গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্যে শর্ত। আত্মরক্ষার এ ব্যবস্থা না থাকলে মানুষ সাক্ষ্য দেয়ার, বিচারক হওয়ার এবং শাসক হওয়ার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। বাহ্যিক হারাম থেকে বেঁচে থাকাই কেবল এ ধরনের আত্মরক্ষা।

(২) সৎকর্মপরায়ণ লোকদের আত্মরক্ষা; অর্থাৎ এমন সন্দেহজনক বিষয়াদি থেকে আত্মরক্ষা করা, যাতে হারাম ও হালাল হওয়ার উভয়বিধ সম্ভাবনাই বিদ্যমান। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
“যা সন্দেহজনক নয়, তার বিনিময়ে যা সন্দেহজনক তা ত্যাগ কর।” তিনি আরও বলেন-
"গোনাহ অন্তরে খটকা লাগায়।

(৩) মুত্তাকী-পরহেযগারদের আত্মরক্ষা- তারা কিছু সংখ্যক হালালকেও এ কারণে পরিহার করে যে, এর দ্বারা হারাম পর্যন্ত পৌঁছার ভয় থাকে।
“মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত মুত্তাকী হয় না, যে পর্যন্ত এমন বিষয় পরিহার না করে, যাতে কোন ক্ষতি নেই ‘ক্ষতি হতে পারে' এমন বিষয়ে জড়িত হওয়ার ভয়ে।" এর উদাহরণ- যেমন, কোন ব্যক্তি গীবত হওয়ার ভয়ে অন্যের অবস্থা বর্ণনা করা থেকে বেঁচে থাকে। অথবা উল্লাস স্ফূর্তি বেড়ে গিয়ে অবাধ্যতা হয়ে যাওয়ার ভয়ে সুস্বাদু খাদ্য ভক্ষণ থেকে বিরত থাকে।

(৪) সিদ্দীকগণের আত্মরক্ষা। তা হচ্ছে, আল্লাহ্ তা'আলা ব্যতীত সবকিছু থেকে ভয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয়া, যেন জীবনের এমন কোন মুহূর্ত অতিবাহিত না হয়, যাতে আল্লাহ্ তাআলার নৈকট্য থেকে সামান্য সরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যদিও তাতে হারাম পর্যন্ত না পৌছার বিষয়টি নিশ্চিতরূপে জানা থাকে।
সুতরাং প্রথম স্তর ব্যতীত সকল স্তরই ফেকাহবিদের দৃষ্টির বাইরে থাকে। তার দৃষ্টি কেবল সাক্ষীদের ও বিচারকদের হারাম থেকে আত্মরক্ষার দিকে থাকে এবং সেসব বিষয়ের দিকে থাকে, যেগুলো আদেল হওয়ার পরিপন্থী। এরূপ আত্মরক্ষার উপর কায়েম থাকা আখেরাতে গোনাহ্ হওয়ার পরিপন্থী নয়। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ওয়াবেসা (রাঃ)-কে বলেন :
“তুমি তোমার অন্তরের কাছ থেকে ফতোয়া নাও, যদিও লোকেরা তোমাকে ফতোয়া দেয়।”
শেষ বাক্যটি তিনি তিন বার উচ্চারণ করেছেন। ফেকাবিদ অন্তরের খটকার কথা বর্ণনা করে না এবং খটকা সহকারে আমলের অবস্থাও বলে না; বরং কেবল এমন বিষয় বর্ণনা করে, যদ্বারা ব্যক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়ে যায়। যাবতীয় বক্তব্যের সারমর্ম এই যে, ফেকাবিদের পূর্ণ দৃষ্টি সে জগতের সাথে জড়িত, যার দ্বারা আখেরাতের পথ নিষ্কণ্টক হয়। সে অন্তরের হাল হকিকত ও আখেরাতের বিধানাবলী বললে তা একান্তই প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকে। যেমন, তার কথায় মাঝে মাঝে চিকিৎসা, অংক, জ্যোতির্বিদ্যা ও কালাম শাস্ত্রের আলোচনাও এসে যায়। এ কারণেই হযরত সুফিয়ান সওরী বলতেন, ফেকাহ্ শাস্ত্রের অন্বেষণ আখেরাতের পাথেয় নয়। এ উক্তি যথার্থ। কেননা, সকলেই এ বিষয়ে একমত যে, জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ হচ্ছে, তদনুযায়ী আমল করা। এমতাবস্থায় সেই জ্ঞান ব্যবহারিক জীবনের খুঁটিনাটি আইন কানুনের জ্ঞান কিরূপে হতে পারে? এসব বিষয় দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হবে, এ আশায় যে লোক এসব বিষয় শিক্ষা করে সে উন্মাদ। আল্লাহর আনুগত্যে অন্তর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ উভয়ের দ্বারা আমল হয়ে থাকে। এ আমলের জ্ঞানই সর্বোত্তম। এখানে প্রশ্ন হয়, আপনি ফেকাহ্ ও চিকিৎসা শাস্ত্রকে বরাবর করে দিলেন কিরূপে? চিকিৎসা শাস্ত্র দুনিয়া তথা দেহের সুস্থতার সাথে সম্পর্কযুক্ত। এর উপরও দ্বীনের সঠিকতা নির্ভরশীল। এরূপ জ্ঞানকে ফেকাহর বরাবর করা ইজমার পরিপন্থী। এর জওয়াব এই যে, চিকিৎসা শাস্ত্র ও ফেকাহ্ বরাবর হওয়া অপরিহার্য নয়; বরং উভয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। তিনটি কারণে ফেকাহ্ চিকিৎসা শাস্ত্রের উপর শ্রেষ্ঠ।

প্রথমত ফেকাহ্ শরীয়তী জ্ঞান অর্থাৎ, নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছ থেকে অর্জিত। কিন্তু চিকিৎসা শাস্ত্র শরীয়তী জ্ঞান নয়।
দ্বিতীয়তঃ যারা আখেরাতের পথিক, তাদের কেউ ফেকা প্রতি অমুখাপেক্ষী নয়। রুগ্ন ও সুস্থ উভয়েরই এর প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রতি কেবল রুগ্নরাই মুখাপেক্ষী। তাদের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম।
তৃতীয়তঃ ফেকাহ্ শাস্ত্র আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্রের সঙ্গী। কারণ, এর সারকথা হচ্ছে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমলের প্রতি লক্ষ্য করা। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমলের উৎপত্তিস্থল হচ্ছে অন্তরের অভ্যাস। ভাল আমল ভাল অভ্যাস থেকে প্রকাশ পায় এবং মন্দ আমল মন্দ অভ্যাস থেকে উদগত হয়। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যে অন্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট তা বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না। অপর দিকে সুস্থতা ও অসুস্থতার উৎপত্তি হয় মেযাজ ও পিত্তের দোষ-গুণ থেকে, যা দেহের বিশেষণসমূহের অন্যতম ; অন্তরের নয়। সুতরাং ফেকাহকে চিকিৎসা শাস্ত্রের সাথে তুলনা করে দেখলে ফেকাহর শ্রেষ্ঠত্ব বুঝা যাবে এবং একে আখেরাত সম্পর্কিত শাস্ত্রের সাথে তুলনা করলে আখেরাত সম্পর্কিত শাস্ত্র মনে হবে।

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (১১) সূফীগণের মতে ফরযে আইন হওয়ার উদ্দেশ্য



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ১১)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সূফীগণের মতে ফরযে আইন হওয়ার উদ্দেশ্য
সূফীগণ বলেছেন, ফরযে আইন শিক্ষার উদ্দেশ্য শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং ফেরেশতাদের ইলহাম জানা। তাদের এ উক্তিও সত্য, কিন্তু সে ব্যক্তির জন্যে, যে এতে লিপ্ত হয়। মানুষ যেহেতু প্রায়ই অনিষ্টের কারণাদি তথা রিয়া ও হিংসা থেকে মুক্ত থাকে না, তাই তিনটি ধ্বংসাত্মক বিষয়ের মধ্য থেকে যার প্রতি সে নিজেকে মুখাপেক্ষী দেখে, তা জানা তার জন্যে অপরিহার্য। এটা জানা অবশ্যই ওয়াজেব। কারণ, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন : তিনটি বিষয় মারাত্মক (১) কৃপণতা, যার আনুগত্য করা হয়, (২) কুপ্রবৃত্তি, যা মেনে চলা হয় এবং (৩) আত্মম্ভরিতা। কোন মানুষ এগুলো থেকে মুক্ত নয়। পরে আমরা আড়ম্বর, আত্মপ্রীতি ইত্যাদি মনের যেসব অবস্থা উল্লেখ করব, সে এ তিনটি মারাত্মক বিষয়েরই অনুসারী, যা দূর করা ফরযে আইন। এই মারাত্মক বিষয়সমূহের সংজ্ঞা, কারণাদি, লক্ষণ ও প্রতিকার না জানা পর্যন্ত এগুলো দূর করা সম্ভব নয়। কেননা, অনিষ্ট সম্পর্কে না জানার কারণেই মানুষ অনিষ্টে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এর প্রতিকার হচ্ছে বিপরীত বিষয় দ্বারা তার মোকাবিলা করা। পরবর্তীতে বিনাশন পর্বে আমরা যা লিপিবদ্ধ করেছি, তার অধিকাংশই ফরযে আইন। সব মানুষ অনর্থক বিষয়াদিতে মশগুল হওয়ার দিক দিয়ে সেগুলো বর্জন করে রেখেছে।
নও-মুসলিম ব্যক্তিকে বেহেশত, দোযখ, পুনরুজ্জীবন ও কেয়ামতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের বিষয় দ্রুত শিক্ষা দিতে হবে যাতে সে এগুলো সত্য বলে বিশ্বাস করে। এ বিষয়টিও দুটি কলেমায়ে শাহাদতের পরিশিষ্ট। কারণ, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর রেসালতে বিশ্বাস স্থাপন করার পর তার আনীত বিষয়সমূহও বুঝা দরকার। তা এই যে, যেব্যক্তি আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য করে, তার জন্যে জান্নাত এবং যে তাঁদের নাফরমানী করে তার জন্য জাহান্নাম। সত্য মাযহাব এটাই এবং এ থেকে আরও জানা গেল, প্রত্যেক ব্যক্তির দিবারাত্রির চিন্তাধারার মধ্যে এবাদত ও আদান-প্রদানের কিছু নতুন নতুন ঘটনা ঘটতে থাকে। এ কারণেই তার সামনে যে অভিনব ঘটনা ঘটে, তা জিজ্ঞাসা করা জরুরী এবং যে ঘটনা সত্বর ঘটবে বলে আশা করা যায়, অবিলম্বে তার জ্ঞান লাভ করাও জরুরী।

সুতরাং জানা গেল, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সে আমলের এলেমই বুঝিয়েছেন, যার ওয়াজেব হওয়া সুস্পষ্ট, অন্য কোন এলেম বুঝাননি। এ থেকে পরিষ্কার বুঝা গেল, আমল ওয়াজেব হওয়ার সময় ক্রমান্বয়ে এলেম ওয়াজেব হতে থাকবে।(আল্লাহ্ তা’আলাই ভাল জানেন)

পরবর্তী পর্ব
যে জ্ঞান ফরযে কেফায়া

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (১০) যার জন্য জ্ঞান ফরযে আইন



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ১০)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যার জন্য জ্ঞান ফরযে আইন --
বুদ্ধিমান প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে তিন প্রকার বিষয়ের নির্দেশ দেয়া হয়- (১) বিশ্বাস, (২) বিশ্বাস অনুযায়ী আমল করা ও (৩) না করা। এখন ধর, কোন ব্যক্তি সূর্যোদয় ও দ্বিপ্রহরের মধ্যবর্তী সময়ে বালেগ হল। এখন তার উপর প্রথমতঃ ওয়াজেব হবে শাহাদতের উভয় কলেমা অর্থসহ শিক্ষা করা। অর্থাৎ “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ" কলেমাটি শেখা ও তার অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা ওয়াজেব হবে। এ সম্পর্কে আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে যুক্তি-প্রমাণ লিপিবদ্ধ করে বিশ্বাস করা ওয়াজেব হবে না; বরং নিঃসন্দেহে ও দ্বিধাহীন চিত্তে কলেমাদ্বয় সত্য বলে বিশ্বাস করাই তার পক্ষে যথেষ্ট হবে। এতটুকু জ্ঞান মাঝে মাঝে অনুসরণ ও শরণের মাধ্যমেও অর্জিত হয়ে যায়। আলোচনা ও বিতর্কের প্রয়োজন হয় না। আলোচনা ও যুক্তি-প্রমাণ ওয়াজেব না হওয়ার কারণ, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরবের লোকদের কাছ থেকে যুক্তি প্রমাণ ছাড়াই কেবল সত্য বলে বিশ্বাস ও স্বীকারোক্তি গ্রহণ করেছেন।
মোট কথা, উপরোক্ত বিষয়টুকু জেনে নিলেই তখনকার ওয়াজেব আদায় হয়ে যাবে। তখন কলেমাদ্বয় শিক্ষা করা ও অর্থ হৃদয়ঙ্গম করাই তার জন্যে ফরযে আইন ছিল। এছাড়া অন্য কোন কিছু তার জন্যে জরুরী ছিল না। কারণ, সে যদি এই কলেমাদ্বয় সত্য বলে বিশ্বাস করার পর মারা যায়, তবে নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তা'আলার অনুগত বান্দারূপেই মরবে, নাফরমানরূপে নয়।
কলেমার পর অন্য বিষয়সমূহ সাময়িক কারণাদির ভিত্তিতে তার উপর ওয়াজেব হয়। এগুলো প্রত্যেকের জন্য অপরিহার্য নয়। কেউ কেউ এগুলো থেকে আলাদাও থাকতে পারে। এসব সাময়িক কারণ কর্ম ও বিশ্বাসের মধ্যে দেখা দেয়। প্রথমটির উদাহরণ এই- মনে কর, উপরোক্ত ব্যক্তি সূর্যোদয় ও দ্বিপ্রহরের মধ্যবর্তী সময় থেকে যোহর পর্যন্ত জীবিত রইল। যোহরের সময় এলে তার উপর নতুন ওয়াজেব হবে ওযু ও নামাযের মাসআলা শিক্ষা করা। অতএব এ ব্যক্তি বালেগ হওয়ার সময় সুস্থ থাকলে যদি সে সূর্য ঢলে পড়ার সময় পর্যন্ত কিছু না শেখে এবং এ সময়ের পর শিখতে শুরু করলে ঠিক সময়ে সব শেখে আমল করতে না পারে, তবে বলা যায় যে, ব্যহ্যতঃ সে জীবিত থাকবে বিধায় সময়ের পূর্বেই শিক্ষা করা তার উপর ওয়াজেব। এ কথাও বলা যায়, জানা আমল করার জন্যে শর্ত। আমল ওয়াজেব হওয়ার পর সে আমল সম্পর্কে জানা ওয়াজেব হয়। সুতরাং প্রথম সময় থেকে শিক্ষা করা তার উপর ওয়াজেব নয়। অন্যান্য নামাযের বেলায়ও একথা প্রযোজ্য।
এর পর যদি এ ব্যক্তি রমযান পর্যন্ত জীবিত থাকে, তবে রমযানের কারণে রোযা শিক্ষা করা তার উপর নতুন ওয়াজেব হবে। অর্থাৎ, জানতে হবে যে, সোবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযার সময়। এ সময়ে রোযার নিয়ত করা এবং পানাহার ও স্ত্রীসহবাস থেকে বিরত থাকা জরুরী।
এখন যদি তার কাছে অর্থ-সম্পদ আসে অথবা বালেগ হওয়ার সময়ই অর্থ সম্পদ থাকে, তবে যাকাতের পরিমাণ জানা তার জন্যে অপরিহার্য হবে। কিন্তু তখনই অপরিহার্য হবে না; বরং বালেগ হওয়ার সময় থেকে এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর অপরিহার্য হবে। যদি তার কাছে উট ব্যতীত অন্য কিছু না থাকে তবে কেবল উটের যাকাত জানাই জরুরী হবে। অন্যান্য মালের ক্ষেত্রে এরূপ বুঝা উচিত। যদি তার উপর হজ্জের মাস আসে, তবে হজ্জের মাসআলা তখনই জানা জরুরী নয়। কেননা, হজ্জ সমগ্র জীবৎকালের মধ্যে মাত্র একবার আদায় করতে হয়। তবে আলেমগণের উচিত তার সামর্থ্য থাকলে বলে দেয়া যে, জীবনে একবার হজ্জ করা সে ব্যক্তির উপর ফরয, যে পাথেয় ও সওয়ারীর মালিক। এতে সম্ভবতঃ সে সাবধানতা অবলম্বন জরুরী মনে করে দ্রুত হজ্জ আদায় করতে সচেষ্ট হবে। অতঃপর যখন সে হজ্জ করার ইচ্ছা করবে, তখন মাসআলা শিক্ষা করা তার উপর ওয়াজেব হবে। তবে কেবল হজ্জের আরকান ও ওয়াজেব বিষয়সমূহ শিক্ষা করা জরুরী হবে নফলসমূহ নয়। কারণ, যে কাজ করা নফল, তা শিক্ষা করাও নফল। মোট কথা, যেসব করণীয় কাজ ফরযে আইন, সেগুলো শিক্ষা করা ক্রমান্বয়ে এমনিভাবে ওয়াজেব হবে। বর্জনীয় কর্মের ক্ষেত্রেও যখন যেরূপ অবস্থা দেখা দেবে, সেভাবেই তা শিক্ষা করা ওয়াজেব। এ বিষয়টি মানুষের অবস্থা অনুযায়ী বিভিন্ন রূপ। উদাহরণতঃ যেসব কথাবার্তা বলা হারাম, সেগুলো জানা বোবার জন্যে ওয়াজেব নয়; অথবা অবৈধ দৃষ্টির মাসআলা জানা অন্ধের জন্যে জরুরী নয় কিংবা যারা জঙ্গলে বাস করে, তাদের জন্যে কোন্ কোন্ গৃহে বসা হারাম, তা জানা আবশ্যক নয়। মোট কথা, যদি জানা যায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির এসব বিষয়ের প্রয়োজন হবে না, তবে সেগুলো শিক্ষা করা তার উপর ওয়াজেব নয় ; বরং যেসব বিষয়ে সে লিপ্ত, সেগুলো সম্পর্কে বলে দেয়া জরুরী।
উদাহরণতঃ যদি মুসলমান হওয়ার সময় রেশমী বস্ত্র পরিহিত থাকে অথবা অবৈধভাবে দখল করা যমীনে বসে থাকে কিংবা বেগানা নারীর প্রতি তাকিয়ে থাকে, তবে তাকে এসব বিষয় বর্জন করার কথা বলে দেয়া জরুরী । যেসব বিষয়ে সে লিপ্ত নয়; বরং অদূর ভবিষ্যতে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে, যেমন পানাহারের বস্তু, সেগুলো শিক্ষা দেয়া ওয়াজেব। উদাহরণতঃ যদি কোন শহরে মদ্যপান ও শূকরের মাংস খাওয়ার প্রচলন থাকে, তবে তাকে এগুলো বর্জন করার কথা বলা জরুরী। যেসব বিষয় শিক্ষা করা ওয়াজেব, সেগুলো শেখানোও ওয়াজেব। বিশ্বাস এবং অন্তরের কর্মসমূহ জানাও আশংকা অনুযায়ী ওয়াজেব। যেমন, তার অন্তরে কলেমাদ্বয়ের অর্থ সম্পর্কে সংশয় সৃষ্টি হলে তার এমন বিষয় শেখা উচিত, যদ্বারা সন্দেহ দূর হয়ে যায়। যদি সে সন্দেহ করে এবং মরে যায়; মৃত্যুর সময় সে বিশ্বাস করেনি যে, আল্লাহ তা'আলার কালামে পাক অনন্ত, আল্লাহর দীদার সম্ভবপর, তার মধ্যে পরিবর্তনের অবকাশ নেই এবং এছাড়া অন্যান্য বিশ্বাসও পোষণ করেনি, তবে এরূপ ব্যক্তি সকলের মতানুযায়ী ইসলামের উপরই মরেছে। কিন্তু যেসব কুমন্ত্রণা বিশ্বাসের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে, সেগুলোর কতক স্বয়ং মানুষের মন থেকে। উদগত হয় এবং কতক পরিস্থিতি-পরিবেশের প্রভাব মনে উৎপন্ন হয়। যদি সে এমন শহরে বসবাস করে, যেখানে বেদআতী কথাবার্তার প্রচলন রয়েছে, তবে তাকে বালেগ হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে সত্য বিষয় শিখিয়ে বেদআত থেকে রক্ষা করতে হবে, যাতে প্রথমেই মিথ্যা শিকড় গেড়ে না বসে। কেননা, মিথ্যা শ্রুতিগোচর হয়ে গেলে তা মন থেকে দূর করা ওয়াজেব হবে। অবশ্য কোন কোন সময় এটা দূর করা কঠিন হয়ে পড়ে। উদাহরণতঃ নও-মুসলিম ব্যক্তি ব্যবসায়ী হলে এবং তার শহরে সুদের কারবার প্রচলিত থাকলে সুদ থেকে আত্মরক্ষার মাসআলা শিক্ষা করা তার জন্যে ওয়াজেব হবে। অতএব ফরযে আইন শিক্ষা সম্পর্কে আমরা যা লিপিবদ্ধ করেছি, তাই সত্য। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় আমলের অবস্থা জানা ফরযে আইন । সুতরাং যেব্যক্তি প্রয়োজনীয় আমল ও তার ওয়াজেব হওয়ার সময় জেনে নেবে, সে তার ফরযে আইন জ্ঞান অর্জন করে নেবে।

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (৯) যে জ্ঞান ফরযে আইন



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ৯)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যে জ্ঞান ফরযে আইন --
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন :
>"জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয।"
>"জ্ঞান অর্জন কর; যদিও তা চীন দেশে থাকে।"
যে জ্ঞান প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরযে আইন, তা কি? এ ব্যাপারে মতভেদ আছে এবং এতে বিশটিরও বেশী মতের সন্ধান পাওয়া যায়। আমরা সবগুলোর বিবরণ দিচ্ছি না। তবে মতভেদের সারকথা প্রত্যেক পক্ষই সে জ্ঞানকে অত্যাবশ্যক বলেছেন, যাতে সে নিজে নিয়োজিত ছিল। উদাহরণতঃ
কালাম শাস্ত্রের পণ্ডিতগণ বলেন, কালাম শাস্ত্রই ফরযে আইন। কারণ, তওহীদ তথা আল্লাহর একত্ববাদ এর মাধ্যমেই জানা যায় এবং আল্লাহ্ তাআলার সত্তা ও গুণাবলীর জ্ঞান এ শাস্ত্রের দ্বারাই অর্জিত হয়।
ফেকাহবিদগণ বলেন, : ফেকাহশাস্ত্র শিক্ষা করা ফরযে আইন। কারণ, এর মাধ্যমে এবাদত, হালাল-হারাম এবং জায়েয না-জায়েয ও আদান-প্রদান সম্পর্কে জানা যায়।
তফসীরবিদ ও হাদীসবিদগণ বলেন : আল্লাহর কিতাব ও রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার সুন্নত শিক্ষা করা ফরযে আইন। কেননা, এ দু'টি থেকেই সকল শাস্ত্রের উৎপত্তি।
সূফীগণ বলেন : ফরযে আইন হচ্ছে আমাদের জ্ঞান। তাঁদের কেউ কেউ বলেন, বান্দার নিজের অবস্থা এবং আল্লাহ তা'আলার কাছে তার মর্যাদার অবস্থা জানা ফরযে আইন। কেউ বলেন : এখলাস, নফসের অপবাদ এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা ও ফেরেশতাদের এলহামের পার্থক্য জানা ফরযে আইন। আবার কেউ বলেন, ফরযে আইন হচ্ছে ‘এলমে বাতেন', যা এ জ্ঞানের যোগ্য বিশেষ লোকদের উপর ওয়াজেব। তারা শব্দের ব্যাপকতা পরিবর্তন করে একে বিশেষ অর্থে নিয়েছেন।
আবু তালেব মক্কী (রহঃ) বলেন : ফরযে আইন হচ্ছে সে জ্ঞান, যা নিম্নোক্ত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে ‘পাঁচটি বিষয়ের উপর ইসলামের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত : এ বিষয়ের সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই কেননা, এ পাঁচটি বিষয়ই ওয়াজেব। তাই এগুলো জানাও ওয়াজেব। এখন শিক্ষার্থীর পক্ষে যে বিষয়টি বিশ্বাস করা দরকার, তা আমরা উল্লেখ করছি। আমরা এ অধ্যায়ের ভূমিকায় বলে এসেছি যে, এলেম দুই প্রকার (১) এলমে মোয়ামালা ও (২) এলমে মোকাশাফা। হাদীসে যে এলেম প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয বলে ব্যক্ত হয়েছে, তা হচ্ছে এলমে মোয়ামালা তথা আদান-প্রদান সম্পর্কিত জ্ঞান।

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...