মঙ্গলবার, ১৭ জুন, ২০২৫

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ



বিবাহ (পর্ব – ৩৫) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ —

পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরকে অপরের সাথে সদ্ব্যবহার করা এবং স্বামীর সাথে সম্ভাবে বসবাস করার শিক্ষা দেবে। 

বর্ণিত আছে, আসমা বিনতে খারেজা করারী তাঁর কন্যার বিয়ের সময় তাকে এরূপ উপদেশ দান করেন: যে গৃহে তুমি এসেছিলে, এখন সেখান থেকে বের হয়ে এমন শয্যায় যাচ্ছ, যে সম্পর্কে তুমি ওয়াকিফহাল ছিলে না। তুমি এমন ব্যক্তির কাছে থাকবে, যার সাথে পূর্ব থেকে পরিচয় ছিল না। অতএব তুমি তার পৃথিবী হবে। ফলে সে তোমার আকাশ হবে। তুমি তার জন্যে শান্তির কারণ হলে সে তোমার সুখের কারণ হবে। তুমি তার বাঁদী হলে সে তোমার গোলাম হয়ে থাকবে! স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তার কাছে যাবে না যে, তোমাকে ঘৃণা করে এবং দূরেও থাকবে না যে, দ্রুত ভুলে যায়; বরং সে তোমার কাছে থাকলে তুমি তার নিকটে থাকবে। সে আলাদা থাকলে তুমি দূরে থাকবে। তার নাক, কান ও চোখের দিকে লক্ষ্য রাখবে। সে যেন তোমার কাছ থেকে সুগন্ধি ছাড়া অন্য কিছুর ঘ্রাণ না পায়। সে যখন শুনে তখন যেন তোমার কাছ থেকে ভাল কথা শুনে এবং যখন দেখে তখন যেন ভাল কিছু দেখে।


স্ত্রীর আদবসমূহের মধ্যে একশ' কথার এক কথা, স্ত্রী আপন গৃহে বসে চরকায় সূতা কাটা ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত থাকবে। ছাদে আরোহণ করে এদিক ওদিক তাকাবে না। প্রতিবেশীদের সাথে কথা কম বলবে এবং নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া তাদের গৃহে যাবে না। স্বামীর উপস্থিতিতে ও অনুপস্থিতিতে তার সম্মান করবে। প্রত্যেক কাজে তার সন্তুষ্টি কামনা করবে। নিজের ব্যাপারে ও স্বামীর ধন-সম্পদের ব্যাপারে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। স্বামীর অনুমতিক্রমে গৃহ থেকে বের হলেও পুরাতন কাপড়-চোপড়ে আবৃতা হয়ে বের হবে। সড়কের মধ্যস্থলে ও বাজার থেকে বেঁচে চলবে। সর্বপ্রযত্নে নিজের অবস্থার উন্নতি ও ঘর-কন্নায় নিয়োজিত থাকবে এবং নামায-রোযার সাথে সম্বন্ধ রাখবে। স্বামীর কোন বন্ধু দরজায় আওয়াজ দিলে যদি স্বামী গৃহে না থাকে, তবে তার সাথে কোন কথা না বলাই নিজের স্বামীর আত্মমর্যাদার দাবী। স্বামীকে আল্লাহ তা'আলা যা কিছু দিয়েছেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকবে। খুব সেজেগুজে থাকবে এবং স্বামী সম্ভোগ করতে চাইলে তজ্জন্যে সর্বাবস্থায় প্রস্তুত থাকবে। সন্তানদের প্রতি স্নেহমমতা করবে। স্বামীর কথার প্রত্যুত্তর দেবে না। 


এক হাদীসে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তা'আলা আমার পূর্বে জান্নাতে যাওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে হারাম করেছেন, কিন্তু আমি এক মহিলাকে দেখব সে জান্নাতের দরজার দিকে আমার আগে আগে যেতে থাকবে। আমি জিজ্ঞেস করব, ব্যাপার কি, এই মহিলা আমার আগে যাচ্ছে। আমাকে বলা হবে; হে মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! এ মহিলা সুন্দরী রূপবতী ছিল। তার দুটি এতীম শিশু ছিল। সে তাদের ব্যাপারে সবর করেছে। ফলে তার যে দুর্দশা হওয়ার ছিল, তাই হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তার এই আত্মত্যাগ পছন্দ করে তাকে এই মর্যাদা দান করেছেন। 


স্ত্রীর অন্যতম আদব হচ্ছে, স্বামীর সাথে আপন রূপ-লাবণ্য নিয়ে গর্ব না করা এবং স্বামী কুশ্রী হওয়ার কারণে তাকে হেয় মনে না করা। আসমায়ী বলেন: আমি জঙ্গলে গিয়ে একজন নেহায়েত রূপসী মহিলাকে দেখলাম। সাথে তার স্বামীকে দেখলাম চরম কুশ্রী কদাকার। আমি মহিলাকে বললাম: আশ্চর্যের বিষয়, তুমি এমন ব্যক্তির স্ত্রী হয়ে সুখী আছ! সে বলল: চুপ কর। তুমি ভুল করছ। আসল ব্যাপার হচ্ছে সম্ভবতঃ সে তার স্রষ্টার সন্তুষ্টির কোন কাজ করেছে, যার বিনিময়ে আমাকে লাভ করেছে। আর খুব সম্ভব আমার দ্বারা স্রষ্টার মর্জির খেলাফ কোন কাজ হয়েছে, যার

 শাস্তিস্বরূপ আমি এই স্বামী পেয়েছি। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা আমার

জন্যে যা পছন্দ করেছেন তাতে আমি সন্তুষ্ট থাকব না কেন? 

আসমায়ী বলেন : মহিলা আমাকে সম্পূর্ণ নিরুত্তর করে দিল। 


স্ত্রীর আর এক আদব —

সে কোন অবস্থাতেই স্বামীকে পীড়ন করবে না। হযরত মোয়ায ইবনে জাবালের রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, - "দুনিয়াতে যখন কোন স্ত্রী তার স্বামীকে পীড়ন করে, তখন তার বেহেশতী হুর স্ত্রী দুনিয়ার স্ত্রীকে বলে: তুমি ধ্বংস হও। তুমি তাকে পীড়ন করো না। সে-তো তোমার কাছে মুসাফির। সত্বরই তোমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমাদের কাছে চলে আসবে। 

স্বামী মারা গেলে স্ত্রীর কর্তব্য হবে তার জন্যে চার মাস দশ দিনের বেশী শোক প্রকাশ না করা। এটা বিবাহের অন্যতম হক। স্ত্রী এই চার মাস দশ দিন সুগন্ধি ও সাজসজ্জা থেকে বেঁচে থাকবে। যয়নব বিনতে আবু সালামা বলেন: আমি আবু সুফিয়ানের মৃত্যুর পর তার কন্যা উন্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে হাবীবা (র.)-এর কাছে গেলাম। তিনি হলুদ রঙের সুগন্ধি এনে আপন গালে মালিশ করলেন এবং বললেন: আল্লাহর কসম, আমার সুগন্ধির কোন প্রয়োজন ছিল না; কিন্তু আমি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, "আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে- এমন কোন মহিলার জন্যে মৃতের কারণে তিন দিনের বেশী শোক পালন করা বৈধ নয়, কিন্তু স্বামী মারা গেলে চার মাস দশ দিন শোক পালন করবে। শোক পালনকালে স্ত্রী মৃত স্বামীর গৃহেই থাকবে। বাপের বাড়ী চলে যাওয়া জায়েয নয়। 


স্ত্রীর আর এক আদব, স্বামীর গৃহে যেসব কাজ সম্পাদন করা তার জন্যে সম্ভব, সেগুলো অম্লান বদনে করবে। হযরত আসমা বিনতে আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বর্ণনা করেন- "হযরত যোবায়রের সাথে আমার বিবাহ হলে তাঁর কোন ধন-সম্পদ ছিল না। না ছিল কোন গোলাম, না ছিল বাঁদী। কেবল একটি ঘোড়া ও পানি আনার জন্যে একটি উট ছিল। ফলে আমিই তার ঘোড়াকে ঘাস পানি দিতাম এবং উটের জন্যে খোরমার বীচি কুটে খাবার দিতাম। পানি ভরে আনতাম এবং মশক সেলাই করতাম। এ ছাড়া আটা পিষতাম এবং দু'ক্রোশ দূর থেকে মাথায় বহন করে বীচি আনতাম। অবশেষে আমার পিতা হযরত আবু বকর (রাঃ) আমার কাছে একটি বাঁদী পাঠিয়ে দিলেন। এতে আমি অনেক কাজকর্ম থেকে মুক্তি পাই। একদিন আমার মাথায় বীচির বস্তা ছিল, তখন পথিমধ্যে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে সাক্ষাৎ হল। সাহাবীগণও তাঁর সাথে ছিলেন। তিনি আমাকে নিজের পেছনে সওয়ার করিয়ে নেয়ার জন্যে আপন উস্ত্রীকে বসার জন্যে ইশারা করলেন, কিন্তু পুরুষদের সাথে চলতে আমি লজ্জাবোধ করলাম এবং আমার স্বামীর আত্মমর্যাদাবোধ স্বরণ করলাম। কারণ, তিনি অত্যন্ত আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমার লজ্জা আঁচ করে চলে গেলেন। বাড়ি ফিরে আমি আমার স্বামী যোবায়রের কাছে এ ঘটনা ব্যক্ত করলে তিনি বললেন: আল্লাহর কসম, তুমি যে মাথার বীচি বহন করেছ, এটা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে সওয়ার হওয়ার তুলনায় আমার জন্যে কঠিনতর

-----

বিবাহের ফজিলত 

প্রথম পর্বের লিংক 

বিবাহ (৩৪) স্ত্রীর উপর স্বামীর হক



বিবাহ (পর্ব – ৩৪) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

স্ত্রীর উপর স্বামীর হক —

এক্ষেত্রে চূড়ান্ত কথা, বিবাহ প্রকারান্তরে বাঁদী হওয়ার নামান্তর বিধায় স্ত্রী যেন স্বামীর বাঁদী হয়ে যায়। সুতরাং স্বামীর আনুগত্য করা সর্বাবস্থায় তার উপর ওয়াজিব। স্ত্রীর উপর স্বামীর হক যে বেশী, এ সম্পর্কে অনেক হাদীস বর্ণিত আছে!


রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, "যে স্ত্রী এমতাবস্থায় মারা যায় যে, তার স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।"


কোন এক ব্যক্তি সফরে যাওয়ার সময় স্ত্রীকে বলে গেল: উপর তলার কক্ষ থেকে নীচে নামবে না। নীচে তার পিতা বসবাস করত। ঘটনাক্রমে সে অসুস্থ হয়ে পড়ল। স্ত্রী নীচে পিতার কাছে নামার অনুমতি চেয়ে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে লোক পাঠালে তিনি বললেন: স্বামীর আদেশ পালন কর। শেষ পর্যন্ত পিতা মারা গেলে সে আবার অনুমতি প্রার্থনা করল। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আবার বললেন: স্বামীর আদেশ পালন কর। ফলে পিতা সমাধিস্থও হয়ে গেল; কিন্তু সে নীচে নামল না। অতঃপর রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এই মহিলাকে বলে পাঠালেন: তুমি যে স্বামীর আদেশ পালন করেছ, এর বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তোমার পিতার মাগফেরাত করেছেন। 

অন্য এক হাদীসে আছে, "যখন স্ত্রী পাঞ্জেগানা নামায পড়ে, রমযান মাসের রোযা রাখে, আপন গুপ্ত অঙ্গের হেফাযত করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে, তখন সে তার পালনকর্তার জান্নাতে প্রবেশ করবে।


এ হাদীসে স্বামীর আনুগত্যকে ইসলামের রোকনসমূহের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। একবার রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মহিলাদের আলোচনা প্রসঙ্গে বললেন: গর্ভবতী নারী, সন্তান প্রসবকারিণী নারী, দুগ্ধদানকারিণী নারী, সন্তানদের প্রতি দয়াশীলা নারী, স্বামীর সাথে যে অসদাচারণ করে, যদি তা না করত, তবে তাদের মধ্যে যারা নামাযী, তারা জান্নাতে প্রবেশ করত। 


এক হাদীসে তিনি বলেন:

"আমি দোযখে উকি দিয়ে দেখলাম, তার অধিকাংশ বাসিন্দাই মহিলা। মহিলারা আরজ করলঃ ইয়া রসূলাল্লাহ্, এর কারণ কি? তিনি বললেন: মহিলারা অভিসম্পাত বেশী করে এবং স্বামীদের না-শোকরী করে।"


অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে, আমি জান্নাতে উঁকি দিয়ে দেখলাম, তাতে পুরুষ জান্নাতীদের তুলনায় মহিলাদের সংখ্যা খুব নগণ্য। আমি জিজ্ঞেস করলাম: মহিলারা কোথায়? উত্তর হল: দু'টি লাল বস্তু তাদের জান্নাতে আসার পথে বাধা হয়েছে। একটি স্বর্ণ ও অপরটি জাফরান। অর্থাৎ, অলংকার ও রঙ্গিন পোশাক। হযরত আয়েশা (র.) বলেন: কোন এক যুবতী রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে হাযির হয়ে আরজ করল: ইয়া রসূলাল্লাহ্, আমি যুবতী। মানুষ আমার কাছে বিবাহের প্রস্তাব দেয়, কিন্তু বিবাহ আমার কাছে ভাল লাগে না। এখন জানতে চাই, স্ত্রীর উপর স্বামীর হক কি? তিনি বললেন: ধরে নেয়া যাক, স্বামীর আপাদমস্তক পুঁজে ভর্তি। যদি স্ত্রী এই পুঁজ চেটে নেয়, তবুও তার শোকর আদায় করতে পারবে না। মহিলা বলল: আমি বিবাহ করব কি? তিনি বললেন: করে নাও। বিবাহ করা উত্তম। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন: খাসআম গোত্রের জনৈকা মহিলা রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর খেদমতে এসে আরজ করল : আমি স্বামীহীনা, বিবাহ করতে চাই। এখন স্বামীর হক কি, জানতে চাই। তিনি বললেন: স্বামীর এক হক, সে যদি উটের পিঠে থেকেও সহবাস করার ইচ্ছা প্রকাশ করে, তবে স্ত্রী অস্বীকার করতে পারবে না। আরেক হক, কোন বস্তু তার গৃহ থেকে তার অনুমতি ব্যতীত কাউকে দেবে না। দিলে তুমি রোযা রেখে কেবল ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্তই থাকবে। তোমার রোযা কবুল হবে না। যদি তুমি স্বামীর আদেশ ছাড়া ঘর থেকে বের হও, তবে ঘরে ফিরে না আসা পর্যন্ত এবং তওবা না করা পর্যন্ত ফেরেশতারা তোমার প্রতি অভিসম্পাত করতে থাকবে। এক হাদীসে আছে, "যদি আমি কাউকে সেজদা করার নির্দেশ করতাম, তবে অবশ্যই স্ত্রীকে নির্দেশ করতাম যেন সে তার স্বামীকে সেজদা করে।"


এরূপ বলার কারণ, স্ত্রীর উপর স্বামীর হক বেশী। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন : স্ত্রী আল্লাহর পবিত্র সত্তার অধিকতর নিকটবর্তী তখন হয়, যখন সে তার কক্ষের অভ্যন্তরে থাকে। স্ত্রীর পক্ষে গৃহের আঙ্গিনায় নামায পড়া মসজিদে নামায পড়া অপেক্ষা উত্তম। আর কক্ষের ভেতরকার কক্ষে নামায পড়া কক্ষের ভেতরে নামায পড়ার তুলনায় শ্রেয়ঃ। এটা বলার কারণ, স্ত্রীর অবস্থার উৎকৃষ্টতা ও অপকৃষ্টতা পর্দার উপর নির্ভরশীল। সুতরাং যে অবস্থায় পর্দা বেশী হবে, সে অবস্থাই তার জন্যে উত্তম। এ কারণেই রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : "নারী হল নগ্নতা। সে যখন বের হয়  তখন শয়তান উঁকি দিয়ে দেখে। তিনি আরও বলেন: স্ত্রীর দশটি নগ্নতা রয়েছে। সে যখন বিবাহ করে তখন স্বামী একটি নগ্নতা ঢেকে দেয়। আর যখন সে মারা যায়, তখন কবর দশটি নগ্নতা আবৃত করে দেয়। মোট কথা, স্বামীর হক স্ত্রীর উপর অনেক। তন্মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ দুটি- একটি আত্মরক্ষা ও পর্দা এবং অপরটি প্রয়োজনাতিরিক্ত জিনিসপত্র দাবী না করা এবং স্বামীর উপার্জন হারাম হলে তা থেকে বেঁচে থাকা। সেমতে পূর্ববর্তীকালে নারীর অভ্যাস তাই ছিল। তখন কোন পুরুষ সফরে গেলে তার স্ত্রী ও কন্যারা তাকে বলত: খবরদার! হারাম উপার্জন করবে না। আমরা ক্ষুধা ও কষ্টে সবর করব; কিন্তু দোযখের আগুনে সবর করতে পারব না। সে যুগের এক ব্যক্তি সফরের ইচ্ছা করলে তার প্রতিবেশীদের মনে সন্দেহ হল। সবাই তার স্ত্রীকে বলল: তুমি তার সফরে সম্মত হচ্ছ কেন? সে তো তোমার খরচের জন্যে কিছুই রেখে যাচ্ছে না। স্ত্রী বললঃ আমি আমার স্বামীকে যেদিন থেকে দেখেছি, ভক্ষকই পেয়েছি- রিযিকদাতা পাইনি। আমার পালনকর্তা আমার রিযিকদাতা। এখন ভক্ষক চলে যাবে এবং রিযিকদাতা আমার কাছে থাকবে। রাবেয়া বিনতে ইসমাঈল আহমদ ইবনে আবুল হাওয়ারীর কাছে নিজের বিবাহের পয়গাম দিলে এবাদতের কারণে তিনি তা অপছন্দ করেন এবং বলেন: স্ত্রীর খাহেশ আমার নেই। আমি এবাদতেই মগ্ন থাকতে চাই। রাবেয়া বললেনঃ আমি আমার অবস্থায় তোমার চেয়ে অধিক মগ্ন রয়েছি। পুরুষের খাহেশ আমার নেই, কিন্তু আমি আমার পূর্ব স্বামীর কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে অনেক ধন সম্পদ পেয়েছি। আমি চাই তুমি এসব ধন-সম্পদ তোমার সঙ্গীদের মধ্যে ব্যয় কর এবং তোমার মাধ্যমে আমি সজ্জনদের পরিচয় লাভ করি। আহমদ বললেন: আমি আগে আমার ওস্তাদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নেই। অতঃপর তিনি হযরত সোলায়মান দারানীর কাছে ঘটনা বর্ণনা করলেন। তিনি রাবেয়ার কথা শুনে বললেন: তাকে বিয়ে করে নাও। সে আল্লাহর ওলী। কেননা, এরূপ কথাবার্তা ওলীরা বলেন। আহমদ বলেন: ইতিপূর্বে ওস্তাদ আমাকে বিবাহ করতে বারণ করতেন এবং বলতেন, আমাদের সঙ্গীদের মধ্যে যে কেউ বিয়ে করেছে, সে-ই বদলে গেছে। এর পর আমি রাবেয়াকে বিয়ে করলাম। এই রাবেয়াও সিরিয়ায় তেমনি ছিল, যেমন ছিল বসরায় রাবেয়া বসরী। 


স্বামীর ধনসম্পদ অযথা ব্যয় না করা স্ত্রীর অন্যতম কর্তব্য; বরং সে স্বামীর ধনসম্পদের হেফাযত করবে। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: স্ত্রীর জন্যে হালাল নয় যে, সে স্বামীর গৃহ থেকে তার অনুমতি ছাড়া কোন খাদ্যবস্তু অন্যকে দেবে। তবে খারাপ হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকলে কাঁচা খাদ্য সামগ্রী দিতে পারে। যদি স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রী কাউকে খাওয়ায়, তবে সওয়াব স্বামী নেবে এবং গোনাহ স্ত্রীর উপর থাকবে। 


পরবর্তী পর্ব —

কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ 


বিবাহ (৩৩) তালাক দেয়ার ব্যাপারে স্বামীর উচিত চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা



বিবাহ (পর্ব – ৩৩) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

তালাক দেয়ার ব্যাপারে স্বামীর উচিত চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা- 

(১) যে তোহ্র তথা হায়েষ থেকে পাক থাকার সময়ে স্ত্রীর সাথে সহবাস করেনি, সেই তোহরে তালাক দেয়া। কেননা, যে তোহরে সহবাস হয়ে গেছে, সে তোহরে তালাক দেয়া বেদআত ও হারাম। যদিও তালাক হয়ে যায়। কেননা, এমতাবস্থায় স্ত্রীর ইদ্দত দীর্ঘ হয়ে যায়। সুতরাং কেউ এরূপ তালাক দিলে তার উচিত রুজু করা। হযরত ইবনে ওমর (র.) তার স্ত্রীকে হায়েয অবস্থায় তালাক দিলে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত ওমরকে বললেন: তাকে রুজু করতে বল। এর পর যখন তার স্ত্রী হায়েষ থেকে পাক হবে, এর পর আবার যখন হায়েয হবে ও আবার পাক হবে, তখন ইচ্ছা করলে তালাক দেবে। নতুবা থাকতে দেবে। এখানে হযরত ইবনে ওমরকে দু'তোহর অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে, যাতে রুজু করার উদ্দেশ্য কেবল তালাক দেয়া না হয়ে যায়। 


(২) তালাক দেবে, দুই অথবা তিন তালাক এক সাথে দেবে না। কেননা, ইদ্দতের পর এক তালাক দ্বারাও সেই উপকার হয়, যা তিন তালাক দ্বারা হয়; অর্থাৎ, স্ত্রী বিবাহ বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যায়, কিন্তু এক তালাক দেয়ার মধ্যে আরও দু'টি উপকার আছে। এক, যদি তালাক দেয়ার পর স্বামী অনুতপ্ত হয়, তবে ইদ্দতের দিনগুলোতে রুজু করতে পারে। দুই, ইদ্দতের পর আবার এই স্ত্রীকে নতুনভাবে বিবাহ করতে পারে। যদি তিন তালাক দেয়ার পর অনুতপ্ত হয়, তবে হালাল করার প্রয়োজন হবে এবং দীর্ঘ দিন অপেক্ষা করতে হবে।

হালাল একটি নিন্দনীয় কাজ। এতে অপরের স্ত্রীর মধ্যে নিয়ত লেগে থাকে এবং তার তালাকের অপেক্ষা করা হয়। তিন তালাকই এসব অনিষ্টের কারণ। এক তালাক দিলে উদ্দেশ্যও সাধিত হয়ে যায় এবং অনিষ্টও হয় না। তবে তিন তালাক একত্রে দেয়া হারাম নয়; বরং এসব অনিষ্টের কারণে মাকরূহ। 

(৩) সম্প্রীতির পরিবেশে তালাক দেবে এবং নির্মমতা ও ঘৃণা সহকারে তালাক দেবে না। আকস্মিক বিরহের কারণে স্ত্রীর যে কষ্ট হবে, তা দূর করার জন্যে হাদিয়াস্বরূপ স্ত্রীকে কিছু দিয়ে তার মন খুশী করবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন :   "যে স্ত্রীর বিবাহে মোহরানা উল্লেখ করা হয়নি তাকে 'মুতআ' দেয়া ওয়াজিব।"

(৪) বিবাহ ও তালাক উভয় ক্ষেত্রে স্ত্রীর গোপনীয়তা প্রকাশ করবে না। এ সম্পর্কে হাদীসে শাস্তিবাণী উচ্চারিত হয়েছে। জনৈক বুযুর্গ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি স্ত্রীকে তালাক দিতে চাইলে লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করল- স্ত্রীর প্রতি আপনার সন্দেহ কি? তিনি বললেন: বুদ্ধিমান ব্যক্তি আপন স্ত্রীর গোপন রহস্য ফাঁস করে না। এর পর যখন তিনি তালাক দিয়ে দিলেন, তখন জিজ্ঞেস করা হল, আপনি তাকে কেন তালাক দিলেন? তিনি বললেন : আমি বেগানা স্ত্রীর গোপন তথ্য কেন প্রকাশ করব? মোট কথা, স্বামীর উপর স্ত্রীর যেসকল হক রয়েছে, এ পর্যন্ত সেগুলো বর্ণিত হল।


পরবর্তী পর্ব —

স্ত্রীর উপর স্বামীর হক: 

বিবাহ (৩২) পারস্পরিক জীবন যাপনের দ্বাদশ আদব তালাক সংক্রান্ত


বিবাহ (পর্ব – ৩২) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

পারস্পরিক জীবন যাপনের দ্বাদশ আদব তালাক সংক্রান্ত —

 প্রথম, তালাক একটি বৈধ কাজ, কিন্তু বৈধ কাজসমূহের মধ্যে আল্লাহ তাআলার কাছে এর চেয়ে অধিক অপছন্দনীয় দ্বিতীয়টি নেই। এটা তখনই বৈধ হয়, যখন এর দ্বারা অন্যায় উৎপীড়ন উদ্দেশ্য না থাকে, অর্থাৎ, স্ত্রীকে তালাক দেয়া একটি উৎপীড়ন। অপরকে উৎপীড়ন করা জায়েয নয়; কিন্তু স্ত্রী দোষী হলে অথবা স্বামীর তালাক দেয়ার প্রয়োজন হলে জায়েয হবে। সেমতে আল্লাহ তাআলা বলেন, "স্ত্রীরা যদি তোমাদের অনুগত হয় তবে বিচ্ছিন্নতার পথ তালাশ করো না।" 

যদি স্বামীর পিতা পুত্র বধূকে মন্দ মনে করে, তবে তাকে তালাক দিয়ে দেয়া উচিত। হযরত ইবনে ওমর (র.) বলেনঃ আমি এক মহিলাকে বিয়ে করেছিলাম। হযরত ওমর (র.) তাকে অপছন্দ করতেন এবং আমাকে তালাক দিতে বলতেন। আমি এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (স.)-এর অভিমত চাইলে তিনি বললেন: হে ইবনে ওমর, স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দাও। এ হাদীস থেকে জানা যায়, পিতার হক অগ্রে, কিন্তু এটা তখন, যখন পিতার অপছন্দ করাটা কুউদ্দেশ্যপ্রণোদিত না হয়। যেমন হযরত ওমরের মত পিতার হক নিঃসন্দেহে অগ্রে। স্ত্রী যদি স্বামীকে পীড়ন করে অথবা তার পরিবারকে খারাপ বলে, তবে স্ত্রী দোষী। তেমনি যদি দুশ্চরিত্র হয় ও দ্বীনদার না হয়, তা হলেও দোষী। কোরআনে আছে "মহিলারা বের হবে না; কিন্তু যদি কোন সুস্পষ্ট নির্লজ্জ কাজ করে।" এ আয়াতের তফসীরে হযরত ইবনে মসউদ (র.) বলেন:  স্ত্রী পরিবারের লোকজনকে মন্দচারী বললে এবং স্বামীকে কষ্ট দিলে এও তার নির্লজ্জ কাজ। যদিও এ বিষয়বস্তুটি ইদ্দত সম্পর্কিত; কিন্তু এর দ্বারা আসল উদ্দেশ্য বুঝা যায়। যদি উৎপীড়ন স্বামীর পক্ষ থেকে হয়, তবে স্ত্রীর উচিত কিছু অর্থসম্পদ দিয়ে স্বামীর কবল থেকে মুক্তি লাভ করা। স্ত্রীকে যে পরিমাণ অর্থসম্পদ দেয়া হয়েছে, তার চেয়ে বেশী নেয়া এক্ষেত্রে স্বামীর জন্যে মাকরুহ। স্ত্রীর পক্ষ থেকে অর্থসম্পদ দেয়ার কথা এ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে: "স্ত্রী মুক্তিপণস্বরূপ যা দেয়, তাতে তাদের উভয়ের কোন গোনাহ নেই।" মোট কথা, স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে যতটুকু পায়, সে পরিমাণ অথবা তার চেয়ে কম মুক্তিপণ দেয়া উচিত। স্ত্রী অহেতুক তালাক প্রার্থনা করলে সে গোনাহগার হবে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, "যে স্ত্রী কোন ভয় ও প্রয়োজন ছাড়া স্বামীর কাছে তালাক প্রার্থনা করে, সে জান্নাতের ঘ্রাণ পর্যন্ত পাবে না।"  অন্য এক রেওয়ায়েতে "তার উপর জান্নাত হারাম" বলা হয়েছে।


তালাক দেয়ার ব্যাপারে স্বামীর উচিত চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা- 

বিবাহ (৩১) পারস্পরিক জীবন যাপনের একাদশ আদব সন্তান সংক্রান্ত



বিবাহ (পর্ব – ৩১) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

পারস্পরিক জীবন যাপনের একাদশ আদব সন্তান সংক্রান্ত —
প্রথম, ছেলে সন্তান হলে অধিক খুশী এবং কন্যা সন্তান হলে মনঃক্ষুণ্ণ হবে না। কেননা, কেউ জানে না তার জন্যে এতদুভয়ের মধ্যে কোনটি মঙ্গলজনক; বরং গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, কন্যা সন্তানের মধ্যে নিরাপত্তা ও সওয়াব অধিক। উত্তমরূপে শিক্ষা দান করে, লালন-পালন করে ও তার উপর আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামত সম্পূর্ণ করে, সেই কন্যা তার জন্যে ডানে বামে দোযখের আড়াল হয়ে তাকে জান্নাতে পৌছাবে। হযরত ইবনে আব্বাস (র.)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: যেব্যক্তি দুটি কন্যা সন্তান লাভ করে এবং তারা যতদিন পিতার কাছে থাকে, ততদিন পিতা তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে, সেই কন্যাদ্বয় তাকে জান্নাতে দাখিল করবে। অন্য এক রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এরশাদ করেন: যেব্যক্তি বাজার থেকে নতুন বন্ধু আপন সন্তানদের জন্যে কিনে আনে, সে যেন তাদের জন্যে খয়রাত নিয়ে আসে। তার উচিত এই বন্ধু পুত্রদের পূর্বে কন্যাদের মধ্যে বন্টন শুরু করা। কেননা, যেব্যক্তি কন্যাকে খুশী করে, সে যেন আল্লাহ তা'আলার ভয়ে ক্রন্দন করে। যে আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করে, আল্লাহ তার উপর দোযখ হারাম করে দেন। হযরত আবু হোরায়রা (র.)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, "যে ব্যক্তির তিনটি কন্যা সন্তান অথবা বোন থাকে এবং তাদের বিপদাপদ ও নির্মমতায় সবর করে, আল্লাহ তাকে কন্যাদের প্রতি করুণা করার কারণে জান্নাতে দাখিল করবেন। এক ব্যক্তি আরজ করল : যদি দু'কন্যা থাকে? তিনি বললেন: দু'কন্যার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা হবে। এক ব্যক্তি বলল: একজন হলে? তিনি বললেন: একজন হলেও।"

দ্বিতীয়, ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর শিশুর কানে আযান দেবে। হযরত রাফে (র.)-এর পিতা বর্ণনা করেন: হযরত ফাতেমা (র.)-এর গর্ভ থেকে হযরত হাসান (র.) ভূমিষ্ঠ হলে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর কানে আযান দিয়েছেন। আমি এ দৃশ্য স্বচক্ষে দেখছি। আরও বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন- "আমি যার কোন সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়, অতঃপর সে তার বাম কানে আযান দেয়, সেই সন্তান 'উন্মুহু ছিবইয়ান' রোগের আক্রমণ থেকে মুক্ত থাকে। যখন শিশুর মুখ খোলে, তখন সর্বপ্রথম তাকে কলেমা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্' শিক্ষা দেয়া এবং সপ্তম দিনে খতনা করা মোস্তাহাব। এ সম্পর্কে একটি হাদীস বর্ণিত আছে।

তৃতীয়, শিশুর উত্তম নাম রাখবে। এটাও শিশুর হক। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন- "যখন নাম রাখ, তখন যেন নামের প্রথম অংশ 'আবদ' (বান্দা) হয়, আল্লাহ তাআলার সর্বাধিক প্রিয় নাম হচ্ছে 'আব্দুল্লাহ' ও 'আব্দুররহমান' । রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, "তোমরা আমার নামে নাম রাখ। তবে আমার ডাকনামে ডাকনাম রেখো না।"  আলেমগণ বলেন: এ নিষেধাজ্ঞা কেবল রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর আমলে ছিল। তখন তাঁকে 'আবুল কাসেম' নামে ডাকা হত। এখন অন্যের জন্যে এই নাম রাখা দূষণীয় নয়। তবে তাঁর নাম ও ডাকনাম এক ব্যক্তির জন্যে একত্রিত করা উচিত নয়, হাদীসে এ সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। কেউ কেউ বলেন: এই নিষেধাজ্ঞাও কেবল তাঁর আমলে ছিল। এক ব্যক্তির ডাকনাম ছিল আবু ঈসা (ঈসার বাপ)। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) শুনে বললেন: ঈসা (আ.)-এর তো বাপ ছিল না। এ থেকে জানা গেল, আবু ঈসা নাম রাখা মাকরূহ। নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই যে সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়ে যায়, তারও নাম রাখা উচিত। আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াযীদ বলেন: আমি শুনেছি গর্ভপাতের সন্তান কেয়ামতের দিন পিতার পেছনে পেছনে ফরিয়াদ করবে এবং বলবে, তুমি আমাকে নামহীন ছেড়ে দিয়ে নষ্ট করেছ। হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ একথা শুনে বললেন: তা কেমন করে হবে? পিতা তো জানতেও পারে না যে, গর্ভপাতজনিত সন্তান ছেলে না মেয়ে। এমতাবস্থায় সে কিরূপে নাম রাখবে? জওয়াবে আবদুর রহমান বললেনঃ অনেক নাম আছে, যা পুরুষ ও নারী উভয়েরই হতে পারে; যেমন আম্মারা, তালহা, ওতবা ইত্যাদি। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ "কেয়ামতের দিন তোমরা তোমাদের নামে ও তোমাদের পিতার নামে আহূত হবে। অতএব তোমরা সুন্দর সুন্দর নাম রাখ। কারও নাম খারাপ থাকলে তা বদলে দেয়া মোস্তাহাব। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) 'আছ' (পাপী) -এর নাম পাল্টে আবদুল্লাহ রেখেছিলেন। হযরত যয়নব (র.)-এর নাম ছিল বাররাহ। নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: তুমি নিজেই নিজেকে ভাল বল। উল্লেখ্য, 'বাররাহ' অর্থ নিরপরাধ। এর পর তিনি এই নাম পাল্টে যয়নব রাখলেন।

চতুর্থ, সন্তান জন্ম গ্রহণের পর আকীকা করবে। পুত্রের জন্যে দু'টি ছাগল এবং কন্যার জন্য একটি ছাগল জবাই করবে। আকীকার জন্তু নর হোক কিংবা মাদী, তাতে কিছু আসে যায় না। হযরত আয়েশা (র.) রেওয়ায়েত করেন, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) পুত্রের আকীকায় দুটি ছাগল এবং কন্যার আকীকায় একটি ছাগল জবাই করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বর্ণিত আছে, তিনি হযরত ইমাম হাসান (র.)-এর আকীকায় একটি ছাগল জবাই করেন। এ থেকে জানা গেল, এক ছাগল জবাই করলেও ক্ষতি নেই। ভূমিষ্ঠ শিশুর চুলের ওজনের সমপরিমাণ সোনা অথবা রূপা খয়রাত করা সুন্নত। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত ইমাম হুসাইন (র.)-এর জন্মের সপ্তম দিন হযরত ফাতেমা (র.)-কে এরশাদ করেন: তার চুল মুণ্ডন করে চুলের সমপরিমাণ রূপা সদকা করে দাও। হযরত আয়েশা (র.) বলেন: আকীকার জন্তুর হাড়া ভাঙ্গা উচিত নয়।

পঞ্চম, সন্তানের কণ্ঠ তালুতে খোরমা অথবা মিষ্টি মেখে দেবে। আবু বকর তনয়া হযরত আসমা (র.) বলেন: কোবায় আবদুল্লাহ ইবনে যোবায়র আমার গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হলে আমি তাকে এনে রসূলে আকরাম (স.)-এর কোলে তুলে দিলাম। তিনি একটি খোরমা চিবিয়ে তার রস আবদুল্লাহর মুখে দিলেন। তাই সর্বপ্রথম তার পেটে যা পড়ে, তা ছিল রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর লালা মোবারক। এর পর তিনি তার তালুতে খোরমা মেখে দিলেন এবং বরকতের দোয়া করলেন। মুহাজিরদের মধ্যে সর্বপ্রথম শিশু সে-ই জন্মগ্রহণ করেছিল। তাই তার জন্মগ্রহণে মুসলমানদের আনন্দের সীমা ছিল না; কেননা, লোকেরা বলাবলি করতো যে, ইহুদীরা তোমাদের উপর জাদু করেছে। তোমাদের সন্তান সন্ততি হবে না।


পরবর্তী পর্ব —

পারস্পরিক জীবন যাপনের দ্বাদশ আদব তালাক সংক্রান্ত 

বিবাহ (৩০) পারস্পরিক জীবন যাপনের দশম আদব সহবাস সংক্রান্ত



বিবাহ (পর্ব – ৩০) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

পারস্পরিক জীবন যাপনের দশম আদব সহবাস সংক্রান্ত —
দশম আদব হচ্ছে সহবাস সংক্রান্ত আদব। সহবাসে মোস্তাহাব হচ্ছে বিসমিল্লাহ বলে সূরা এখলাস পাঠ করবে এবং আল্লাহু আকবার ও লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়ে এই দোয়া করবে:

‎للَّهُمَّ اجْعَلْهَا ذُرِّيَّةٌ إِنْ كُنْتَ
‎فَذَرْتَ أَنْ تَخْرُجَ ذَلِكَ مِنْ صُلْبِي .

রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ তোমাদের কেউ যখন স্ত্রীর সাথে সহবাস করে, তখন এই দোয়া পড়বে, - "আল্লাহ, আমাকে আলাদা রাখুন শয়তান থেকে এবং শয়তানকে আলাদা রাখুন আপনার দেয়া সন্তান থেকে।"  স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোন সন্তান জন্ম নিলে এই দোয়ার বরকতে শয়তান তার কোন ক্ষতি করবে না। এর পর বীর্যস্খলনের সময় নিকটবর্তী হলে ঠোঁট না নাড়িয়ে মনে মনে এই দোয়া পড়বে, "সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি বীর্য দ্বারা মানব সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে আত্মীয় ও বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন।" সহবাসের সময় নিজেকে এবং স্ত্রীকে কোন বস্তু দ্বারা আবৃত করে নেয়া উচিত। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিজের মস্তক ঢেকে নিতেন এবং বিবিকে বলতেন: গাম্ভীর্য সহকারে থাক। এক হাদীসে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: যখন স্বামী-স্ত্রী সহবাস করতে চায়, তখন যেন গাধার মত উলঙ্গ না হয়। সহবাসের পূর্বে প্রেমালাপ ও চুম্বন করা উচিত। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: তোমাদের কেউ যেন স্ত্রীর উপর চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায় পতিত না হয়: বরং স্বামী স্ত্রীর মধ্যে প্রথমে দূত বিনিময় হওয়া উচিত। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন: ইয়া রসূলাল্লাহ! দূত বিনিময় কি? তিনি বললেন: চুম্বন ও প্রেমালাপ। 
অন্য এক হাদীসে আছে- তিনটি বিষয় পুরুষের অক্ষমতার পরিচায়ক। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে আলাপ না করে, প্রীতি সৃষ্টি না করে, কাছে শয়ন না করেই স্ত্রী অথবা বাঁদীর সাথে সহবাস শুরু করা এবং নিজের প্রয়োজন সেরে নেয়া ও স্ত্রীর প্রয়োজন অপূর্ণ রেখে দেয়া।

তিন রাতে সহবাস করা মাকরূহ- মাসের প্রথম ও শেষ রাতে এবং পনর তারিখের রাতে। কোন কোন আলেম জুমুআর দিন ও জুমুআর রাতে সহবাস করা মোস্তাহাব বলেছেন। পুরুষের বীর্যস্খলন হলে কিছুক্ষণ এমনিভাবে থেমে থাকবে, যাতে স্ত্রীর প্রয়োজনও পূর্ণ হয়ে যায়। কেননা, মাঝে মাঝে স্ত্রীর বীর্যস্খলন বিলম্বে হয়। তখন পুরুষের সরে যাওয়া তার পীড়ার কারণ হয়। একযোগে বীর্যস্খলন হওয়াকে স্ত্রী ভাল মনে করে। স্বামীর উচিত প্রতি চার দিনে একবার সহবাস করা। অবশ্য এর চেয়ে বেশী কমও হতে পারে। তবে এ ব্যাপারে স্ত্রীর চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। কেননা স্ত্রীকে সতী পুণ্যবর্তী বাখা স্বামীর উপর ওয়াজিব। হায়েযের দিনগুলোতে এবং পরে গোসল করার পূর্বে সহবাস করবে না। কোরআন পাকে এর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কথিত আছে, এতে সন্তান কুষ্ঠগ্রস্ত হয়। হায়েযের দিনগুলোতে সহবাস ছাড়া স্ত্রীর সমগ্র শরীর ভোগ করা জায়েয। পেছনের দিক অর্থাৎ, মলদ্বার দিয়ে সহবাস করা নাজায়েয। কেননা, হায়েযওয়ালী স্ত্রীর সাথে সহবাস করা নোংরামির কারণে হারাম। মলদ্বারে সহবাস করলে সর্বাবস্থায় নোংরামি হয়ে থাকে। সুতরাং এর নিষেধাজ্ঞা ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে সহবাসের নিষেধাজ্ঞার চেয়ে অধিকতর কঠোর। আল্লাহ তাআলা বলেন : "এর অর্থ যখন ইচ্ছা আপন শস্যক্ষেত্রে আস। এই অর্থ নয় যে, যেদিক দিয়ে ইচ্ছা আস। হায়েযের দিনগুলোতে নাভি থেকে হাঁটুর উপর পর্যন্ত কাপড় বেঁধে রাখা স্ত্রীর জন্যে মোস্তাহাব। হায়েযের দিনগুলোতে স্ত্রীর সাথে আহার করা ও সাথে শয়ন করা জায়েয। সহবাসের পর পুনরায় সহবাস করতে চাইলে জননেন্দ্রিয় ধুয়ে নেয়া উচিত। রাতের শুরুভাগে সহবাস করা মাকরুহ। কেননা, এতে নাপাক অবস্থায় শয়ন করতে হয়। সহবাসের পর ঘুমাতে অথবা কিছু খেতে চাইলে নামাযের ওযুর মত ওযু করে নেয়া সুন্নত। হযরত ইবনে ওমর (র.) বলেন: আমি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে আরজ করলাম: আমাদের কেউ নাপাক অবস্থায় নিদ্রা যেতে পরে কি না? তিনি বললেন: হাঁ, যদি ওযু করে নেয়। এক্ষেত্রে ওযু ছাড়া নিদ্রা যাওয়ার অনুমতিও রয়েছে। হযরত আয়েশা (র.) বলেন: রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নাপাক অবস্থায় পানিতে হাত না লাগিয়ে ঘুমিয়ে থাকতেন।

সহবাসের অন্যতম আদব হচ্ছে বাইরে বীর্যস্খলন না ঘটানো; বরং বীর্যস্খলন গর্ভাশয়ের মধ্যেই হওয়া উচিত। আল্লাহ যাকে সৃষ্টি করতে চাইবেন সে তো সৃষ্টি হবেই। এমতাবস্থায় বীর্যস্থলন প্রত্যাহার করায় কি লাভ? এর পর বাইরে বীর্যস্খলন ঘটানো বৈধ কি না, এ ব্যাপারে আলেমগণের চারটি বিভিন্ন মাযহাব রয়েছে। কোন কোন আলেম সর্বাবস্থায় একে বৈধ বলেন। কেউ কেউ সর্বাবস্থায় হারাম বলেন। কারও মতে স্ত্রীর সম্মতিক্রমে বৈধ এবং সম্মতি ছাড়া অবৈধ। কোন কোন আলেম বলেন, এটা বাঁদীর সঙ্গে বৈধ এবং স্বাধীন নারীর সাথে অবৈধ।

আমাদের মতে বিশুদ্ধ মাযহাব হচ্ছে, এ কাজটি বৈধ এবং উত্তম বর্জনের অর্থে মাকরূহ। এট! তেমনি মাকরুহ, যেমন বলা হয়, যিকির ও নামায ব্যতীত মসজিদে চুপচাপ বসে থাকা মাকরূহ। এটা মাকরুহ তাহরীমীও নয়, তানযিহীও নয়। কেননা, এর নিষেধাজ্ঞা কোরআন হাদীসে প্রমাণিত নেই।

অতঃপর জানা উচিত, গর্ভপাত করা এবং জীবন্ত শিশু প্রোথিত করা পাপ। কেননা, এতে একটি বিদ্যমান বস্তুর উপর অত্যাচার চালানো হয়। এর পর বিদ্যমান হওয়ারও কয়েকটি স্তর আছে।

(১) বীর্য গর্ভাশয়ে পতিত হওয়া এবং স্ত্রীর বীর্যের সাথে মিলে জীবন লাভের যোগ্য হওয়া। এমতাবস্থায় একে নষ্ট করা পাপ। (২) যদি এটা মাংসপিণ্ড হয়ে যায়, তখন নষ্ট করা পাপ পূর্বের তুলনায় বেশী (৩) যদি সন্তান পূর্ণাঙ্গ হয়ে যায় এবং তাতে প্রাণ সঞ্চার হয় তখন নষ্ট করা আরও বড় পাপ। (৪) যদি সন্তান জীবিতাবস্থায় মাতৃগর্ভে থেকে আলাদা হয়ে যায়, তখন নষ্ট করা সর্বাধিক অন্যায় কাজ!

আমরা গর্ভাশয়ে বীর্য পতিত হওয়াকে অস্তিত্ব লাভের প্রাথমিক স্তর বলেছি- পুরুষাঙ্গ থেকে বীর্যস্খলনকে বলিনি। এর কারণ ভ্রূণ কেবল পুরুষের বীর্যের দ্বারা তৈরী হয় না; বরং পুরুষ ও স্ত্রী উভয়ের বীর্যের সংমিশ্রণে অথবা পুরুষের বীর্য ও হায়েযের রক্তের সংমিশ্রণে তৈরী হয়। জনৈক বিশ্লেষক লেখেছেন, মাংসপিণ্ড আল্লাহ তাআলার আদেশে হায়েযের রক্ত দ্বারা গঠিত হয়। এর সাথে রক্তের সম্পর্ক দুইয়ের সাথে দুধের সম্পর্কের অনুরূপ। হায়েযের রক্ত জমাট হওয়ার জন্যে পুরুষের বীর্যের সংমিশ্রণ জরুরী; যেমন দুধ জমাট বাঁধার জন্যে জমাট দইয়ের সংমিশ্রণ শর্ত। মোট কথা, বীর্য জমাট হওয়ার কাজে নারীর বীর্য একটি স্তম্ভ এবং নারী-পুরুষ উভয়ের বীর্য সন্তানের অস্তিত্ব লাভের জন্যে এমন, যেমন ক্রয়-বিক্রয়ের অস্তিত্ব লাভে এক পক্ষের প্রস্তাব ও অপর পক্ষের গ্রহণ হয়ে থাকে। সুতরাং যদি কোন ব্যক্তি বিক্রয়ের প্রস্তাব করে এবং অপর পক্ষ তা গ্রহণ না করে, তবে অপর পক্ষকে বিক্রয় ভেঙ্গে দেয়ার দোষে দোষী বলা হবে না। হাঁ, প্রস্তাব ও গ্রহণ উভয়টি হয়ে যাওয়ার পর মুখ ফিরিয়ে নেয়া বিক্রয় ভঙ্গ করা বলা হবে। পুরুষের পৃষ্ঠদেশে বীর্য থাকলে যেমন সম্ভান সৃষ্টি হয় না, তেমনি পুরুষাঙ্গ থেকে বের হওয়ার পরেও সন্তান সৃষ্টি হয়না, যে পর্যন্ত নারীর বীর্য অথবা হায়েযের রক্তের সাথে মিশ্রিত না হয়। এখন প্রশ্ন হতে পারে, বাইরে বীর্যস্খলন উপরোক্ত কারণে মাকরূহ না হলেও কুনিয়তের কারণে মাকরূ হবে। কেননা খারাপ নিয়তেই এ ধরনের কাজ করা হয়, যাতে কিছু গোপন শেরকের লেশ থাকে। এর জওয়াব, পাঁচ প্রকার নিয়ত এ কাজের কারণ হয়ে থাকে।

প্রথম নিয়ত বাঁদীদের বেলায়। তা হচ্ছে, পুরুষ দেখে, বাঁদীর গর্ভ থেকে সন্তান হলে বাঁদী মুক্ত হওয়ার যোগ্য হয়ে যায়। ফলে সম্পদ হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাই এমন উপায় করা প্রয়োজন যাতে বাঁদী চিরকাল তার বাঁদী থাকে। বলাবাহুল্য, আপন মালিকানা বিনষ্ট হওয়ার কারণাদি দূর করা নিষিদ্ধ নয়।

দ্বিতীয় নিয়ত স্ত্রীর রূপ-লাবণ্য ও স্বাস্থ্য অটুট রাখা: যাতে সে স্বাস্থ্যবতী ও প্রাণবস্ত থাকে। কেননা, প্রসব বেদনার মধ্যে অনেক বিপদাশংকা থাকে। বলাবাহুল্য, এ ধরনের নিয়তও নিষিদ্ধ নয়।

তৃতীয় নিয়ত সন্তানের সংখ্যাধিক্যের কারণে ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশংকা করা। এটাও নিষিদ্ধ নয়, যাতে মানুষকে অধিক আমদানীর শ্রম স্বীকার করতে এবং অবৈধ আমদানীর পথে পা বাড়াতে না হয়। কেননা, সাংসারিক ব্যয় কম থাকা দ্বীনদারীর জন্য সহায়ক। তবে 
‎وَمَا مِنْ دَا فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا 

বাক্যে আল্লাহ রিযিকের যে ওয়াদা করেছেন, তার উপর ভরসা করার মধ্যেই রয়েছে মাহাত্ম্য ও পূর্ণতা। সুতরাং এই তৃতীয় প্রকার নিয়ত করলে একটি মহৎ ও উত্তম বিষয় বর্জন করা হয়, কিন্তু পরিণামের দিকে লক্ষ্য করে আমরা এটা নিষিদ্ধ বলতে পারি না।

চতুর্থ নিয়ত হচ্ছে এ বিষয়ের আশংকা যে, কন্যা সন্তান জন্যগ্রহণ করলে তাদেরকে বিবাহ দিতে হবে এবং কাউকে জামাত। করার কলংক অর্জন করতে হবে। এ কলংকের ভয়ে আরবরা কন্যা সন্তানকে হত্যা করত এবং জীবন্ত পুঁতে ফেলত। এ নিয়ত অবশ্যই মহাপাপ। এ নিয়তে কেউ গর্ভাশয়ের বাইরে বীর্যস্খলন ঘটালে সে গোনাহগার হবে।

পঞ্চম নিয়ত স্বয়ং স্ত্রীর বাধাদান। সে গর্ভাশয়ের অভ্যন্তরে বীর্যস্খলনে সম্মত হয় না। কারণ, সে নিজেকে ইযযতের অধিকারিণী মনে করে, অতিমাত্রায় পরিচ্ছন্ন থাকতে চায় এবং প্রসব বেদনা, নেফাস ও স্তন্যদান থেকে সযত্নে বেঁচে থাকে। এ ধরনের নিয়ত খুবই গর্হিত। খারেজী সম্প্রদায়ের মহিলাদের এরূপ অভ্যাস ছিল। হযরত আয়েশা (র.) বসরায় তশরীফ নিয়ে গেলে এমনি এক মহিলা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি তাকে কাছেই আসতে দেননি।

মোট কথা, জন্মশাসন দূষণীয় নয় যদি তা সঠিক নিয়তে করা হয়।

এখন প্রশ্ন হয়, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: যেব্যক্তি সন্তান সন্ততির ভয়ে বিবাহ বর্জন করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। অথচ আপনি বিবাহ বর্জন ও বাইরে বীর্যস্খলনকে একই রূপ বলেন এবং সন্তানের ভয়ে একে মাকরূহ বলেন না! এর জওয়াব, আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়- এর অর্থ, সে আমাদের অনুরূপ এবং আমাদের পথ ও সুন্নতের অনুসারী নয়। আমাদের সুন্নত হচ্ছে উত্তম কাজ করা। আবার প্রশ্ন হয়, অন্যত্র রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এ কাজকে গোপন সন্তান প্রোথিতকরণ) বলেছেন, এর পর  (وَإِذَا السؤؤدة)
এ আয়াতখানি তেলাওয়াত করেছেন। এটি সহীহ হাদীসের রেওয়ায়েত। এর জওয়াব, সহীহ রেওয়ায়েতে এর বৈধতাও বর্ণিত হয়েছে। কাজেই উপরোক্ত রেওয়ায়েত দ্বারা মাকরূহে তাহরীমী হওয়া প্রমাণিত হয় না। আরও প্রশ্ন হয়, হযরত ইবনে আব্বাস (র.) বলেন: বাইরে বীর্যস্খলন ঘটানো ক্ষুদ্রাকারের জীবস্ত প্রোথিতকরণ। আমরা এর জওয়াবে বলি, হযরত ইবনে আব্বাসের এই উক্তি একটি 'কিয়াস' তথা অনুমান। তিনি অস্তিত্বকে নিশ্চিত ধরে নিয়ে তা দূর করা ক্ষুদ্রাকারের জীবন্ত প্রোথিতকরণ বলেছেন। এই কিয়াস দুর্বল। তাই হযরত আলী (র.) এটা শুনে মেনে নেননি এবং বলেন, কয়েকটি স্তর অতিক্রম করা ছাড়া জীবন্ত প্রোথিতকরণ প্রমাণিত হয় না। এর পর তিনি এই আয়াত পাঠ করেন, যাতে স্তরগুলো বর্ণিত হয়েছে-
‎( وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ سُفْلَةٍ مِّنْ طِينٍ ثُمَّ جَعَلْنَهُ نُطْفَةٌ فِي قَرَارٍ مَّكِينٍ ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ)
"আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর *তাকে বীর্যের আকারে এক সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছি। এর পর আমি বীর্যকে জমাট রক্তরূপে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর জমাট রক্তকে মাংসপিণ্ডে পরিণত করেছি, এর পর সেই মাংসপিণ্ড থেকে অস্থি সৃষ্টি করেছি, অতঃপর অস্থিকে মাংস দ্বারা আবৃত করেছি। অবশেষে তাকে এক নতুন সৃষ্টিরূপে দাঁড় করিয়েছি।" এর পর তিনি (وَإِذَا الْمَوْؤُدَةُ سُنت) আয়াতটি পাঠ করলেন। সুতরাং হযরত ইবনে আব্বাসের উপরোক্ত কিয়াস কিরূপে শুদ্ধ হতে পারে? কেননা বোখারী ও মুসলিমে হযরত জাবের (র.) থেকে বর্ণিত আছে, "রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর আমলে যখন কোরআন নাযিল হচ্ছিল, তখন আমরা আযল (বাইরে বীর্যস্খলন) করতাম।"
অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে- "আমরা আযল করতাম। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে এই সংবাদ পৌঁছলে তিনি আমাদেরকে নিষেধ করেননি।"

হযরত জাবের থেকে আর একটি সহীহ রেওয়ায়েত রয়েছে, এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে আরজ করল: আমার একটি বাঁদী আছে। সে খেদমত করে এবং বৃক্ষে পানি দেয়। আমি তার সাথে সহবাস করি, কিন্তু আমি চাই না, তার গর্ভ সঞ্চার হোক। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ, "তুমি ইচ্ছা করলে তার সাথে আযল কর, কিন্তু যা তার ভাগ্যে নির্ধারিত রয়েছে তা আসবেই। কয়েকদিন পর লোকটি আবার এসে আরজ করল: আমার সে বাঁদী গর্ভবতী হয়ে গেছে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: আমি তো পূর্বেই বলেছিলাম, তার ভাগ্যে লেখা সম্ভা অবশ্যই আসবে। এসব রেওয়ায়েত বোখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে।


রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: যেব্যক্তির একটি কন্যা থাকে এবং সে তাকে 

পরবর্তী পর্ব —
পারস্পরিক জীবন যাপনের একাদশ আদব সন্তান সংক্রান্ত 

বিবাহ (২৯) পারস্পরিক জীবন যাপনের নবম আদব আপোষ করা



বিবাহ (পর্ব – ২৯) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

পারস্পরিক জীবন যাপনের নবম আদব আপোষ করা—
নবম আদব, যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কলহ হয় এবং বনিবনার কোন উপায় অবশিষ্ট না থাকে, তবে স্বামীর পরিবারের একজন ও স্ত্রীর পরিবারের একজন- এই দুই জন সালিস বসবে। উভয় সালিস তাদের অবস্থা দেখবে। যদি তারা পুনর্মিলন চায়, তবে পুনর্মিলন করিয়ে দেবে। হযরত ওমর (র.) স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আপোষ করানোর জন্যে এক ব্যক্তিকে প্রেরণ করেন। সে আপোষ না করিয়ে ফিরে এলে তিনি তাকে শাসিয়ে বলেন : আল্লাহ তাআলা বলেছেন স্বামী-স্ত্রী সংশোধন চাইলে আল্লাহ তাআলা উভয়ের মধ্যে বনিবনা সৃষ্টি করে দেবেন। অথচ তুমি আপোষ না করিয়েই ফিরে এলে? লোকটি পুনরায় গেল এবং নিয়ত ঠিক করে স্বামী-স্ত্রীর সাথে নম্রভাবে কথাবার্তা বলল। ফলে পুনর্মিলন সক্ষম হয়ে গেল। এটা তখন, যখন উভয়ের পক্ষ থেকে কিংবা স্বামীর পক্ষ থেকে অবাধ্যতা হয়। আর যদি বিশেষভাবে স্ত্রীর পক্ষ থেকে অবাধ্যতা হয়, তবে স্বামী স্ত্রীর উপর প্রবল বিধায় তার উচিত শাসন করা এবং বল প্রয়োগে স্ত্রীকে বাধ্য করা। অনুরূপভাবে যদি স্ত্রী নামায না পড়ে, তবে স্বামী জবরদস্তি তাকে নামায পড়াবে, কিন্তু শাসনে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। তা হচ্ছে, প্রথম উপদেশ দেবে এবং আখেরাতের আযাব ও নিজের শাস্তির বিষয়ে সতর্ক করবে। এটা উপকারী না হলে শয্যায় স্ত্রীর দিকে পিঠ ফিরিয়ে শয়ন করবে অথবা একই ঘরে থেকে নিজের বিছানা আলাদা করে নেবে। তিন রাত পর্যন্ত তাই করবে। যদি তাও কার্যকর না হয়, তবে স্ত্রীকে এমনভাবে মারধর করবে, যাতে কষ্ট তো হয়, কিন্তু জখম হবে না এবং হাড্ডি ভাঙ্গবে না। মুখে মারবে না। এটা নিষিদ্ধ! জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে আরজ করল: স্ত্রীর হক কি? তিনি বললেন: যখন স্বামী খাবে, স্ত্রীকে খাওয়াবে এবং যখন নিজে পরবে, তখন স্ত্রীকে পরাবে। যদি মারার প্রয়োজন হয় তবে নির্মমভাবে মারবে না। আলাদা শয়ন করলে একই ঘরে শয়ন করবে। স্ত্রীর কোন দ্বীনদারীর ব্যাপারে রাগ করলে দশ-বিশ দিন অথবা এক মাস পর্যন্ত স্ত্রীর কাছে শয়ন বর্জন করা স্বামীর জন্যে জায়েয। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)ও এমন করেছেন। একবার উন্মুল মুমিনীন হযরত যয়নব (র.)-এর কাছে তিনি কিছু উপহার প্রেরণ করেন। হযরত যয়নব তা ফেরত পাঠিয়ে দেন। এর পর রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যে বিবির ঘরেই তশরীফ রাখতেন, তিনিই আরজ করতেন: যয়নব আপনার কদর করেনি। আপনার দেয়া উপহার সে প্রত্যাখ্যান করেছে। এতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সকল বিবিকে সতর্কবাণী শুনিয়ে পূর্ণ একমাস তাঁদের সাথে রাগ করে রইলেন। এর পর তাঁদের কাছে গেলেন।

পরবর্তী পর্ব —
পারস্পরিক জীবন যাপনের দশম আদব সহবাস সংক্রান্ত 

বিবাহ (২৮) পারস্পরিক জীবন যাপনের সপ্তম আদব হায়েযের বিধানাবলী শিক্ষা



বিবাহ (পর্ব – ২৮) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

পারস্পরিক জীবন যাপনের সপ্তম আদব হায়েযের বিধানাবলী শিক্ষা —
সপ্তম আদব, পুরুষের পক্ষে হায়েযের বিধানাবলী শেখা উচিত, যাতে এ দিনগুলোতে কি কি বিষয় থেকে বেঁচে থাকা ওয়াজিব, তা জানা যায়। স্ত্রীকেও শিক্ষা দেয়া দরকার, হায়েযের সময়কার কোন কোন নামাযের কাযা পড়তে হবে এবং কোন্ কোন্ নামাযের কাযা পড়তে হবে না। কেননা, কোরআন শরীফে স্ত্রীকে দোযখ থেকে বাঁচানোর জন্যে পুরুষদের প্রতি নির্দেশ রয়েছে  "নিজেদেরকে এবং পরিবার পরিজনকে দোযখ থেকে রক্ষা কর ।"
 অতএব স্ত্রীকে আহলে সুন্নতের বিশ্বাসসমূহ শিক্ষা দেয়া পুরুষের জন্যে অপরিহার্য। যদি স্ত্রী বেদআতে কান দিয়ে থাকে, তবে তা তার মন থেকে দূর করবে। দ্বীনদারীর ব্যাপারে অলসতা করলে তাকে আল্লাহর আযাবের ভয় দেখাবে এবং হায়েয ও এস্তেহাযার প্রয়োজনীয় মাসআলা বলে দেবে। মাসআলা শেখার জন্যে স্বামী যথেষ্ট হলে এর জন্য কোন আলেমের কাছে যাওয়া স্ত্রীর জন্যে বৈধ নয়। পুরুষ স্বল্প জ্ঞান হলেও যদি কোন মুফতীর কাছ থেকে স্ত্রীর প্রশ্নের জওয়াব এনে দিতে পারে, তবুও তার জন্যে বাইরে গমন করা জায়েয নয়। অন্যথায় স্ত্রীর বাইরে যাওয়া এবং জিজ্ঞেস করে নেয়া  যায়েজ নয় : বরং ওয়াজিব। এমতাবস্থায় স্বামী নিষেধ করলে গোনাহগার হবে। যদি স্ত্রী ফরযগুলো শিখে নেয়, তবে অধিক শিক্ষার জন্যে স্বামীর অনুমতি ব্যতিরেকে কোন ওয়াজের মসলিসে যাওয়া জায়েয নয়। স্ত্রী হায়েম এস্তেহাযার কোন বিধান না জানার কারণে পালন করে না এবং স্বামীও শিক্ষা দেয় না, এমতাবস্থায় স্বামী স্ত্রীর সাথে যাবে। নতুবা গোনাহে তার অংশীদার হবে।

পরবর্তী পর্ব —
পারস্পরিক জীবন যাপনের অষ্টম আদব সমতা রক্ষা করা—

বিবাহ (২৭) পারস্পরিক জীবন যাপনের ষষ্ঠ আদব আর্থিক



বিবাহ (পর্ব – ২৭) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

পারস্পরিক জীবন যাপনের ষষ্ঠ আদব আর্থিক —
ষষ্ঠ আদব, স্ত্রীদের প্রয়োজনীয় ব্যয় বহনে সমতা বজায় রাখবে। অর্থাৎ, এতে সংকীর্ণতাও অবলম্বন করবে না এবং অপব্যয়ও করবে না, বরং মধ্যম পর্যায়ে খরচপত্র দেবে। আল্লাহ তাআলা বলেন : "তোমরা খাও, পান কর এবং অপব্যয় করো না।" অন্য আয়াতে বলা হয়েছে- "হাতকে ঘাড়ের সাথে বেঁধে রেখো না এবং পুরোপুরি খুলতে দিয়ো না।" 
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : "তোমগমাদের মধ্যে সে লোক উত্তম, যে তার পরিবার-পরিজনের জন্যে উত্তম।"  অন্য এক হাদীসে তিনি বলেন: "এক দীনার তুমি জেহাদে ব্যয় করবে, এক দীনার গোলাম মুক্ত করার কাজে ব্যয় করবে, এক দীনার কোন মিসকীনকে সদকা দেবে এবং এক দীনার পরিবার-পরিজনের জন্যে ব্যয় করবে। এগুলোর মধ্যে অধিক সওয়াব সে দীনারের হবে, যা তুমি পরিবার-পরিজনের জন্যে ব্যয় করবে।" 
কথিত আছে, হযরত আলী (র.)-এর চার কন্যা ছিলেন। তিনি তাঁদের প্রত্যেকের জন্যে প্রতি চার দিনে এক দেরহাম গোশত ক্রয় করতে দিতেন।
নিজে উৎকৃষ্ট খাদ্য খাবে এবং পরিজনকে তা থেকে খাওয়াবে না, গৃহকর্তার জন্যে এটা সমীচীন নয়, এটা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। যদি গৃহকর্তার এরূপ একা খাওয়াই কাম্য হয়, তবে গোপনে খাওয়া উচিত। অন্যদের সামনে এরূপ খাদ্যের আলোচনা করাও উচিত নয়, যা তাদেরকে খাওয়ানো উদ্দেশ্য নয়। যখন খেতে বসবে, তখন ঘরের সকলকে সঙ্গে নিয়ে বসবে। হযরত সুফিয়ান সওরী (রহ.) বলেন: আল্লাহ তাআলা ও তাঁর ফেরেশতাগণ সে ঘরের লোকজনের প্রতি রহমত প্রেরণ করেন, যারা একত্রে বসে আহার করে।

পরবর্তী পর্ব —
পারস্পরিক জীবন যাপনের সপ্তম আদব হায়েযের বিধানাবলী শিক্ষা —

বিবাহ (২৬) পারস্পরিক জীবন যাপনের পঞ্চম আদব সন্দেহ না করা



বিবাহ (পর্ব – ২৬) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

পারস্পরিক জীবন যাপনের পঞ্চম আদব সন্দেহ না করা —
পঞ্চম আদব, স্ত্রীদের প্রতি কুধারণায় তাদের গোপন বিষয়ের অনুসন্ধানে বাড়াবাড়ি করবে না। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) স্ত্রীদের গোপন বিষয়সমূহের পেছনে পড়তে বারণ করেছেন। কোন কোন রেওয়ায়েত অনুযায়ী তিনি স্ত্রীদের সামনে হঠাৎ উপস্থিত হতে বারণ করেছেন। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এক সফর থেকে প্রত্যাবর্তন করে মদীনায় প্রবেশের পূর্বে বললেন: রাতের বেলায় স্ত্রীদের কাছে যাবেনা। এই আদেশ উপেক্ষা করে দুই ব্যক্তি বাড়ি গিয়ে অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি দেখতে পেল। 
প্রসিদ্ধ এক হাদীসে আছে, - নারী পাঁজরের অস্থির ন্যায় বাঁকা। একে সোজা করতে চাইলে ভেঙ্গে যাবে। অতএব বাঁকা অবস্থায়ই এর দ্বারা উপকৃত হও। নারী চরিত্র সংশোধনের উদ্দেশ‍্যে এ কথাটি বলা হয়েছে। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলছেন, - কোন কোন আত্মসম্মানবোধ আল্লাহ তা'আলা অপছন্দ করেন। তাহল স্ত্রীর উপর পুরুষের আত্মসম্মানবোধ, যা কোন সন্দেহ ছাড়াই হয়। কেননা, এরূপ আত্মসম্মানবোধের উৎস হচ্ছে কুধারণা, যা করা নিষিদ্ধ! আত্মসম্মানবোধ যথাস্থানে প্রশংসনীয়। মানুষের মধ্যে তা অবশ্যই থাকা উচিত। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: আল্লাহর আত্মসম্মানবোধ রয়েছে। মুমিনের আত্মসম্মানবোধ রয়েছে। মানুষের উপর আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা আল্লাহর আত্মসম্মানবোধ। তিনি আরও বলেন: সা'দের আত্মসম্মান দিয়ে তোমরা কি কর? আল্লাহর কসম, আমি সা'দের তুলনায় অধিক আত্মসম্মানের অধিকারী। আল্লাহ তাআলা আমার চেয়ে অধিক আত্মসম্মান রাখেন। এই আত্মসম্মানের কারণেই তিনি বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ পাপাচার হারাম করেছেন। আল্লাহ তাআলার তুলনায় অন্য কারও আপত্তি করা অধিক পছন্দনীয় নয়। এ কারণেই তিনি সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা রসূল প্রেরণ করেছেন। তারীফও তাঁর চেয়ে অধিক অন্য কেউ পছন্দ করে না। এ কারণেই তিনি জান্নাতের ওয়াদা দিয়েছেন। 
এক হাদীসে বলা হয়েছে, আমি মেরাজ রজনীতে জান্নাতের ভেতরে একটি প্রাসাদ দেখেছি। তার আঙ্গিনায় একটি বাঁদী ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই প্রাসাদ কার। কেউ জওয়াব দিল: ওমরের। আমি তার অভ্যন্তরভাগ দেখতে চাইলাম, কিন্তু হে ওমর, তোমার আত্মসম্মানবোধের কথা মনে পড়ে গেল। হযরত ওমর কেঁদে ফেললেন এবং বললেন: আমি কি আপনাকে আত্মসম্মানবোধ দেখাব? 
হযরত হাসান বসরী বলতেনঃ কাফেরদের গা ঘেঁষে চলার জন্যে তোমরা স্ত্রীদেরকে বাজারে পাঠিয়ে দাও! যার আত্মসম্মানবোধ নেই, সে ধ্বংস হোক।আত্মসম্মানবোধের প্রয়োজন তখন হয় না. যখন স্ত্রীর কাছে বেগানা পুরুষ আসে না এবং স্ত্রী বাজারে বের হয় না।
 রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) একবার হযরত ফাতেমা (র.)-কে জিজ্ঞেস করলেন: নারীর জন্যে উত্তম কি, তিনি বললেন: উত্তম, সে বেগানা পুরুষকে দেখবে না এবং কোন বেগানা পুরুষও তাকে দেখবে না। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন: এমন জওয়াব দেবে না কেন, কেমন বাপের মেয়ে! 
সাহাবায়ে কেরাম প্রাচীরের ছিদ্র বন্ধ করে দিতেন, যাতে মহিলারা পুরুষদেরকে না দেখে। হযরত মুয়ায (র.) তাঁর স্ত্রীকে আলো আসার ছিদ্র দিয়ে বাইরে তাকাতে দেখে শাস্তি দিয়েছেন। হযরত ওমর (র.) বলতেন: স্ত্রীদেরকে উৎকৃষ্ট পোশাক দিয়ো না, তা হলে গৃহ মধ্যে থাকবে। কারণ এই, মহিলারা ছন্নছাড়া অবস্থায় বাইরে যাওয়া পছন্দ করে না। 
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: মহিলার গৃহ মধ্যে থাকার অভ্যাস গড়ে তুলুক। তিনি শুরুতে মহিলাদেরকে মসজিদে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। বর্তমানে বৃদ্ধাদের ছাড়া অন্যদের জন্যে মসজিদে যাওয়ার অনুমতি না থাকা উত্তম। বরং এটা সাহাবায়ে কেরামের আমলেও সঙ্গত ছিল না। তাই হযরত আয়েশা (র.) বলেন: রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওফাতের পর মহিলারা যেসব বিষয় উদ্ভাবন করেছে, তা যদি তিনি জানতেন তবে তাদেরকে বাইরে যেতে অবশ্যই নিষেধ করতেন। 
একবার হযরত ইবনে ওমর এ হাদীসটি বর্ণনা করেন, "মহিলাদেরকে মসজিদে যেতে বারণ করো না।"  তখন তাঁর পুত্র বলে উঠল: আল্লাহর কসম, আমরা বারণ করব। হযরত ইবনে ওমর (র.) তৎক্ষণাৎ পুত্রকে প্রহার করলেন এবং ক্রুদ্ধ স্বরে বললেন: আমি বলি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এমন বলেন। আর তুই কিনা তা অমান্য করছিস। এর অর্থ কি, তাঁর পুত্রের এই বিরোধিতার কারণ ছিল, পরিবর্তিত অবস্থা তাঁর জানা ছিল। ইবনে ওমরের ক্রুদ্ধ হওয়ার কারণ, বাহ্যতঃ কোন কারণ বর্ণনা না করেই পুত্র হাদীসের বিপরীত উক্তি করেছিল। অনুরূপভাবে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মহিলাদেরকে বিশেষভাবে ঈদের নামাযে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন, তাও স্বামীদের অনুমতি দেয়ার শর্ত সাপেক্ষে। বর্তমান যুগেও সতী-সাধ্বী নারীদের স্বামীর অনুমতিক্রমে বাইরে যাওয়া জায়েয, কিন্তু না যাওয়াতেই সাবধানতা বেশী।
নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া মহিলাদের বাইরে যাওয়া উচিত নয়। তামাশা ও অনাবশ্যক কাজের জন্যে মহিলাদের বাইরে যাওয়া সাধারণ ভদ্রতারও পরিপন্থী। এতে মাঝে মাঝে অনর্থও সৃষ্টি হয়। 
এর পর বাইরে গেলে পুরুষদের দিক থেকে দৃষ্টি নত রাখবে। আমরা বলি না, নারীর মুখমণ্ডলও নারীর জন্যে গোপনীয়, বরং ফেতনার অবস্থায় পুরুষের মুখমণ্ডল দেখা হারাম। ফেতনার ভয় না থাকলে হারাম নয়। কেননা, পূর্ববর্তী যুগে পুরষরা সর্বদাই খোলামেলা চলাফেরা করেছে এবং মহিলারা অবগুণ্ঠন সাজিয়ে বের হয়েছে। পুরুষদের মুখমণ্ডল মহিলাদের জন্যে গোপনীয় হলে পুরুষদেরকেও অবগুন্ঠন ব্যবহার করার নির্দেশ দেয়া হত।

পরবর্তী পর্ব —
পারস্পরিক জীবন যাপনের ষষ্ঠ আদব আর্থিক 

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...