মঙ্গলবার, ২ জুলাই, ২০২৪

মখলূক – ৮



মখলূক— (পর্ব – ৮)

📚মিনহাজুল আবেদীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


শরিয়তে নির্জনতার অবস্থান—

এবার আসল আলোচনায় আসা যাক। উদ্দেশ্য ছিল নির্জনতা ও নিঃসঙ্গ জীবন অবলম্বন সম্পর্কে আলোচনা করা। কিন্তু আলোচনা প্রসঙ্গে আমরা অনেক দূরে এসে পড়েছি। যা হোক যদি কেউ প্রশ্ন তোলেন যে, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) তো বলেছেনঃ আমার উম্মতের বৈরাগ্য হলো মসজিদে অবস্থান করা। এর দ্বারা সংসার ত্যাগ ও নিঃসঙ্গ জীবন অবলম্বনকে তো নিষিদ্ধই করা হয়েছে।

এর জবাবে আমি বলবো যে, হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর এ নির্দেশটি ফিতনার যুগের জন্য নয়। তাছাড়া, মসজিদে অবস্থান করলেও যদি মানুষের সাথে সাক্ষাতকার এবং অন্য কোন ব্যাপারে জড়িত না হয়, তাহলে বাহ্যিক দিক দিয়ে মানুষের মধ্যে থাকলেও অন্তরের দিক দিয়ে তো সংসার থেকে আলাদাই রয়ে যায়। সংসার ত্যাগ ও নিঃসঙ্গ জীবন অবলম্বনের প্রকৃত উদ্দেশ্যও তাই। জাহেরী ও বাতেনী — একই সাথে উভয় দিক থেকে সংসার ত্যাগ ও নিঃসঙ্গ জীবন অবলম্বন আমার উদ্দেশ্যও নয়। ইব্রাহীম বিন আদহাম (রঃ) এ দিকে ইঙ্গিত করেই বলেছেনঃ একাকী অথচ সমষ্টিগতভাবে অবস্থান করতে হবে এমতাবস্থায় যে, আল্লাহর প্রতি থাকবে বন্ধুত্ব আর মানুষের প্রতি থাকবে ভীতি।


প্রশ্ন উঠতে পারে যে, উলামায়ে কিরামের দরসগাহ এবং সূফীদের খানকায় অবস্থান করা সম্পর্কে উলামায়ে কিরামের অভিমত কি? উলামায়ে কিরামের নিকট এ পদ্ধতিটি অত্যন্ত উত্তম ও একক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। কেননা, এতে উভয় উদ্দেশ্যই সফল হতে পারে। প্রথমত, এ পদ্ধতি গ্রহণের ফলে একদিকে যেমন

মানুষ থেকে দূরে থাকার উদ্দেশ্যটিও হাসিল হয় অপরপক্ষে তেমনি মানুষের সাথে মেলামেশা করা -অথচ তাদের দ্বারা সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা (আল্লাহর ইবাদতের পথে মানুষ সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা) থেকে আত্মরক্ষা পাওয়াও সম্ভব হয়। দ্বিতীয়ত, এ পদ্ধতি অবলম্বনের ফলে জুম'আ, জামা'আত প্রভৃতিতেও অংশ গ্রহণের সুযোগ লাভ করা যায় এবং ইসলামী নির্দেশাদি বৃদ্ধিতে সাহায্য করা সম্ভব হয়।

সুতরাং এ পদ্ধতি অবলম্বনের ফলে সংসার ত্যাগের পন্থা অবলম্বনকারীরা যে নিরাপত্তা পেয়ে থাকেন, তা লাভ করা সম্ভব হয় এবং সাধারণ মানুষের জন্য যেসব কল্যাণ সংশ্লিষ্ট এ অবস্থায় তাও বিদ্যমান থাকে। কেননা, এতে করে সাধারণ মানুষের সাথে থাকার ফলে শক্তি, বরকত এবং নসীহত হাসিল হয়। সুতরাং উলামায়ে কিরামের দরগাহ ও সূফীদের খানকাহ্ এতদুভয় স্থানে অবস্থান করার পন্থাটি সবদিক থেকেই সামঞ্জস্যপূর্ণ ও উত্তম। এ পন্থাটিই সর্বাপেক্ষা নিরাপদও। এ সকল দিক বিবেচনা করেই অধিকাংশ আবেদীন এ পন্থাটি অবলম্বন করেছেন। ফলে তাঁরা মানুষের মধ্যে অবস্থান করে আল্লাহ্ বান্দাদের দীনের ব্যাপারে সাহায্য এবং তাদের মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার সুযোগ লাভ করেছেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা মানুষের মধ্যে অবস্থান করার ফলে মানুষও তাঁদের শিষ্ট-রীতিনীতি প্রত্যক্ষ এবং তাঁদের আদর্শ-চালচলন লক্ষ্য করে তাঁদের অনুসরণ করার সুযোগ লাভ করেছে। কেননা মুখে বক্তৃতা করার চাইতে পরিবেশ সৃষ্টি করে শিক্ষাদানই অধিক উপকারী। সুতরাং ধর্মীয় জ্ঞান ও ইবাদত সম্পর্কিত বিষয়ে শিক্ষাদানের জন্য এ পদ্ধতির অনুসরণই অধিকতর উত্তম, ফলপ্রসূ ও সঠিক বলে বিবেচনা করা হয় । :


অতঃপর প্রশ্ন উঠতে পারে যে, পীর সাহেবদের সাথে মুরীদদের অবস্থান উচিত— না নিঃসঙ্গ ও আলাদা জীবন অবলম্বন করা উচিত।


যদি সূফীগণ (পীর সাহেবগণ) প্রথম শ্রেণীর ও সলফে সালেহীনের আদর্শের দৃঢ় অনুসারী হন, তবে তাঁকে উত্তম ধর্মীয় ভ্রাতা, উৎকৃষ্ট সাথী এবং আল্লাহর বান্দাদের উৎকৃষ্ট সাহায্যকারী বিবেচনা করা যায়। সুতরাং তাঁর থেকে আলাদা জীবন অবলম্বন সঙ্গত নয়। আসলে তাঁরা হচ্ছেন প্রকৃত যাহেদ-পন্থী। শোনা যায়, এ শ্রেণীর লোক মানুষকে পরহেজগার হওয়ার ব্যাপারে সাহায্য করেন এবং সত্য অবলম্বন ও সবর ইখতিয়ার করার উপদেশ দিয়ে থাকেন।


আর যদি সূফীগণ সলফে সালেহীন থেকে বর্ণিত মত ও পথ পরিত্যাগ করেন তাহলে সে মুরীদের পক্ষে তার পীবের ব্যাপারে সেই হুকুমই বর্তাবে, যে হুকুম তার জন্য অন্যান্য মানুষের ব্যাপারে বর্তে থাকে। এমতাবস্থায় মুরীদ যদি পীরের নির্ধারিত সীমার মধ্যে সর্বদা অবস্থান করে, নিজের জিহ্বাকে সংযত রাখে এবং পরের উত্তম কার্যে অংশগ্রহণ ও সমস্ত জঞ্জাল থেকে দূরে অবস্থান করে- - তাহলে সে দুনিয়া ত্যাগী ছাড়াও নিঃসঙ্গ ও একাকী জীবন অবলম্বনকারী হিসেবে পরিগণিত হবে এবং পলায়নী মনোবৃত্তি অবলম্বনকারীদের থেকে দূরে অবস্থান করা ও তার পক্ষে সম্ভব হবে।


অতঃপর যদি মুরীদ নিজেকে পীরের নির্ধারিত সীমা থেকে বহির্গত করে নিজের সংশোধন ও সুষ্ঠুতা বিধানের ইচ্ছা করে এবং তার সাহচর্যে যে আপদ আসতে পারে, তা থেকে মাহ্ফুজ হয়ে যায় তথাপি মনে রাখা উচিত যে, এ সব দরসগাহ্ ও খানকাহ্ প্রকৃতপক্ষে শক্তিশালী কেল্লার মতোই। যে ব্যক্তি চেষ্টা করে, সে চোর-ডাকাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এ স্থানে আশ্রয় নিতে পারে। অপরপক্ষে বাইরে অবস্থানকারীর অবস্থা ঠিক উন্মুক্ত ময়দান ও প্রান্তরে বিচরণকারীর মতো, যেখানে শয়তানের অশ্বারোহী সৈন্য সর্বদা প্রদক্ষিণ করে থাকে। তারা সে অসহায় বিচরণকারীর মাল-মাত্তা লুট করে নেয় অথবা তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যেতে পারে। এভাবে প্রান্তরে বিচরণ করা যে কতখানি ঝুঁকির ব্যাপার, তা সহজেই অনুমান করা যায়। সেখানে চতুর্দিকেই বিপদের আশঙ্কা – চারদিকেই বিক্ষিপ্ত মহাশত্রুদল। তারা যে কোন মুহূর্তে আক্রমণ করে যা খুশী তা-ই করবার সুযোগ পায়। এমতাবস্থায় দুর্বল মানুষের জন্য মজবুত কিল্লায় আশ্রয় গ্রহণ ব্যতীত অন্য কোন গত্যন্তর নেই। তবে শক্তিশালী ও সচেতন মানুষের কথা আলাদা। তাদের কাছে কিল্লা এবং প্রান্তর একই সমান। সুতরাং তার জন্য পীর নির্ধারিত সীমারেখা ত্যাগে কোন ভয় বা আশঙ্কার কারণই নেই। তথাপি সকল অবস্থায়ই সীমারেখা ও কিল্লায় অবস্থানই নিরাপদ ও নির্ঝঞ্ঝাট। কেননা, এর ব্যতিক্রমে সাহসী হলেও সর্বদাই তাকে বিব্রত ও পেরেশান অবস্থার সাথে সংগ্রামে লিপ্ত থাকতে হয়।


এ সকল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মুরীদ এবং কল্যাণকামী ব্যক্তির পক্ষে আল্লাহর কোন বান্দার হাত ধরা এবং তাঁর সাথে দুঃখ-কষ্ট সহ্য করাই সবচাইতে উত্তম ও ভাল। শক্তিমান বয়স্ক মানুষের জন্যও এ সব বুযুর্গ ব্যক্তিকে উপেক্ষা বা তাদের সংস্রব থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে কোন বাধা নেই।


তবে এসব ব্যাপারে গভীর চিন্তা-ভাবনার পর অত্যন্ত সতর্কতার সাথেই অগ্রসর হওয়া দরকার। 

যা হোক, এবার ধর্মীয় ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ ও পত্রাদি বিনিময় প্রভৃতি সম্পর্কে আলোচনা করা যাক ।

ধর্মীয় ভ্রাতার সাথে সাক্ষাৎ করা আল্লাহ্ তা'আলার বান্দাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এবং অন্তঃকরণের সংশোধন সহ আল্লাহ্ তা'আলা পর্যন্ত পৌঁছার উৎকৃষ্ট একটি পন্থা। তবে এ ব্যাপারেও দু'টি শর্তের প্রতি দৃষ্টি রাখা কর্তব্য। প্রথমত, এ ব্যাপারে কিছুতেই বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। নবীয়ে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-কে বলেছিলেনঃ তিন দিন পরপর সাক্ষাৎ করবে – এ ধরনের সাক্ষাতই অতিরিক্ত বন্ধুত্বের কারণ হয়ে থাকে। দ্বিতীয়ত, রিয়া প্রদর্শনী মনোভাব, গীবত ও বাজে বিষয় থেকে বিরত থাকতে হবে। তেমনি তাঁর (যার সাথে সাক্ষাৎ বা পত্র বিনিময় করা হয়) অধিকারসমূহও রক্ষা করতে হবে – যাতে করে তোমার উপর এবং তোমার ভ্রাতার উপর কোন প্রকারের বিপদাপদ নেমে না আসে।

বর্ণিত আছেঃ একদা ফুযায়েল (র) ও সুফিয়ান (র) পরস্পর আলাপ-আলোচনা করলেন। অতঃপর উভয়েই খুব কাঁদতে লাগলেন। সুফিয়ান (র) বললেন, `আয় আবূ আলী (ফুযায়েলের ডাক নাম), আমি এমন কোন বৈঠকেই যোগদান করিনি, যার সওয়াব এ বৈঠকের সওয়াবের চাইতে অধিক বলে আশা করতে পারি।' অপরপক্ষে ফুযায়েল (র) বললেন, 'আমি এ বৈঠকের চাইতে অপর কোন বৈঠকের জন্য আমার অধিক ভয়ের কারণ মনে করছি না।'

তখন সুফিয়ান (র) জিজ্ঞেস করলেন, 'একথা আপনি কেন বলছেন?' ফুযায়েল (র) জবাব দিলেন, 'কেন, আপনি কি খুব ভাল ও উত্তম কথা আমার নিকট বর্ণনা করেননি এবং আমিও কি আপনার সামনে তালাশ করে খুব ভাল ও উত্তম কথা পেশ করিনি?' এ ব্যাপারটিই আপনার ও আমার জন্য গরিমার কারণ হয়ে গেছে'। ফুযায়েলের এ কথা শুনে সুফিয়ান (র) খুবই কাঁদতে লাগলেন ।


সুতরাং তোমার সাথীর সাথে তোমার বসা ও সাক্ষাতকার সতর্ক ও সতর্ক দৃষ্টির সীমারেখা যেন অতিক্রম করে না যায়। এভাবে সব কিছু প্রতি পালন করতে সক্ষম হলে তোমার সংসার ত্যাগ এবং মানুষের সংস্রব থেকে দূরে থাকার মধ্যেও কোন ত্রুটি এবং খারাপ কিছু থাকবে না। এমতাবস্থায় তোমার এবং তোমার সাথীর উপর কোন আপদ এবং দুর্ভোগ আপতিত হবে না। বরং এতে লাভ হবে বিরাট উপকার এবং মহৎ কল্যাণ ।



এখন প্রশ্ন হলোঃ নিঃসঙ্গ জীবন অবলম্বন ও মানুষের সংস্রব থেকে দূরে থাকার জন্য সহজে শক্তি অর্জনের ব্যাপারে কোন্ বিষয় উৎসাহ ও প্রেরণা দান করতে সক্ষম? 

সহজ ও বিনাক্লেশে এ শক্তি অর্জনের জন্য তিনটি মৌলিক পন্থা অনুসরণ করাই যথেষ্ট হতে পারে। প্রথমত, ইবাদতে ইলাহীতে সমস্ত সময় ব্যয়িত করতে হবে। কেননা ইবাদতে ইলাহীই অধিকতর উৎকৃষ্ট ও নিরাপদ বৃত্তি। অপরপক্ষে মানুষের সাথে মোলাকাত, দীনতা ও চিত্তবিনোদনের নিদর্শন সুতরাং যখন তুমি দেখবে যে, তোমার নফস প্রয়োজন ও আবশ্যকতা ছাড়াও মানুষের সাথে সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা বলার জন্য আগ্রহান্বিত এবং উদগ্রীব হয়ে উঠছে, তখন বুঝবে যে, এটা একটা বেহুদা ব্যাপার মাত্র। এর পরিণতি চিত্তবিনোদন ও অবাধ্যতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য। জনৈক ব্যক্তি কি সুন্দরভাবেই না বিষয়টি অভিব্যক্ত করেছেনঃ


'তোমার অবসর আমাকে নিরাপত্তার দিকে টেনে এনেছে। অনেক সময়ই অবসর লোক বেহুদা কার্যে লিপ্ত হয়। সুতরাং যখন তুমি পূর্ণভাবে ইবাদতে ইলাহী আদায় করা শুরু করবে, তখন মুনাজাতে ইলাহীর মধুরতা ও মিষ্টতা তোমার অনুভূত হতে থাকবে। আর আল্লাহর সান্নিধ্য-পিপাসা মানুষের সাহচর্য থেকে তোমাকে রাখবে বিরত এবং তাদের সাথে উঠা-বসা ও কথাবার্তা বলার ব্যাপারে তোমার মনে হবে ভীতির সঞ্চার।


হযরত মূসা (আ) যখন মুনাজাতে ইলাহী থেকে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন তাঁর মনে মানুষ সম্পর্কে ভীতির সঞ্চার হয়েছিল। এমনকি, মানুষের কথাবার্তা যাতে তাঁর কানে না পৌঁছাতে পারে, তজ্জন্য তিনি তাঁর কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিতেন। সে সময় মানুষের কথাবার্তা মানুষের কথাবার্তার মতোই ছিল, কিন্তু বর্তমানে তো তা গাধার আওয়াজের ন্যায়ই শ্রুত হয়। সুতরাং বুযুর্গ ব্যক্তিগণ যা বলে গেছেন, তা-ই অবলম্বন করা কর্তব্য। তাঁরা বলে গেছেনঃ


আল্লাহ তা'আলাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত হও। সমস্ত মানব জাতিকে এক দিকে সরিয়ে রাখ। আল্লাহ্র সত্যিকারের মহব্বতকামী প্রত্যাশীর একথা ভালভাবে উপলব্ধি করা উচিত যে, সে মানুষের মধ্যে থাকবে সত্য, কিন্তু তাতে নিজেকে হারিয়ে ফেলবে না। মনে রাখবে, মানুষকে তুমি যেভাবেই নাড়াচাড়া কর না কেন, দেখবে সর্বাবস্থায়ই সে বিচ্ছুর ন্যায়। দ্বিতীয়ত, লোভ ও লালসাকে তোমার প্রথমবারেই নিশ্চিহ্ন করে ফেলা উচিত; তাহলে তোমার জন্য মানুষের সংস্রব থেকে দূরে থাকা এবং নিঃসঙ্গ ও একাকী জীবন অবলম্বন সহজ হয়ে যাবে। কেননা, যখন মানুষের নিকট তোমার লাভালাভের ও আশা-আকাঙ্ক্ষার কিছু থাকবে না, তখন তোমার সাথে তাদের থাকা আর না থাকা একই সমান হয়ে দাঁড়াবে।


তৃতীয়ত, মানুষের সংস্রবের আপদসমূহ নিরীক্ষণ ও পর্যালোচনা করো এবং নিজের অন্তঃকরণে তা বদ্ধমূল করে দাও।


এ তিনটি বিষয়কে সুষ্ঠুভাবে পালন করতে পারলে স্বভাবতই তোমাকে তা মকলুকের সংস্রব থেকে সরিয়ে আল্লাহ তা'আলার দিকে ফিরিয়ে দেবে এবং তুমি সুযোগ লাভ করবে আল্লাহর ইবাদত ও খেদমতের জন্য নির্ঝঞ্জাট ও নিঃসঙ্গ জীবন। এমনিভাবেই তুমি আল্লাহ্ রাব্বুল ইয়্যতের দুয়ারের আসল চাবিকাঠি দৃঢ়ভাবে ধরে রাখতে সক্ষম হবে। অবশিষ্ট হেফাজত ও তৌফিকের সবটুকু আল্লাহই দান করবেন।



পরবর্তী পর্ব

শয়তান

মখলূক – ৭


মখলূক— (পর্ব – ৭)

📚মিনহাজুল আবেদীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


ফিতনার যুগে আলিমদের কর্তব্য—

ফিতনা যখন ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করবে, প্রতিটি কাজই বিপরীত হওয়া শুরু করবে, মানুষ ধর্মীয় বিষয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, মুমিনকে কোন কাজের যোগ্য মনে করা হবে না, কেউই আলিমের সন্ধান করবে না, উপদেশপূর্ণ বাক্যের কোন মূল্য থাকবে না এবং নিজের ধর্মের ব্যাপারেও যখন কেউ সাহায্য করবে না,

মানুষের সর্বস্তরে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে ফিতনা যখন পরিব্যাপ্ত হয়ে পড়বে,

বিশেষ শ্রেণীর মানুষ ধর্মীয় নির্দেশ পালনে শৈথিল্য প্রদর্শন করবে,

এমতাবস্থায় আলিমের জন্যও নির্জনতা ও নিঃসঙ্গ জীবন অবলম্বন এবং জনসাহচর্য পরিত্যাগ করে গোপনে জীবন যাপনের একটা ওজর পাওয়া যেতে পারে। আমার আশঙ্কা হয় যে, আমি যেসব বিষয় বর্ণনা করলাম সে সঙ্কটপূর্ণ ও কঠিন যুগেই কেবল তা বিদ্যমান থাকবে, তারই বা কি নিশ্চয়তা আছে? সুতরাং বাহ্য দৃষ্টিতে ধরা না পড়লেও আদতে এর মধ্যেই মানুষের সাহচর্য ত্যাগ ও নির্জনতা এবং নিঃসঙ্গ জীবন অবলম্বনের নির্দেশ বিদ্যমান রয়েছে। বিষয়টিকে খুব গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। কেননা এ ক্ষেত্রে ভ্রান্তির খুবই আশঙ্কা এবং তাতেই ক্ষতির আশঙ্কাও বেশী

এখন হয়তো কেউ প্রশ্ন করতে পারেন যে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম) কি বলেননি যে : 

“জামা'আত ও সংঘবদ্ধতাকে আঁকড়ে থাক; কেননা জামা'আতের উপরই আল্লাহর রহমত বিদ্যমান। (আর মনে রাখবে) শয়তান হলো মানুষের জন্য ব্যাঘ্রস্বরূপ। জামা'আত থেকে বিচ্ছিন্ন, দূরে ও প্রান্তে অবস্থানকারী এবং যে ব্যক্তি জামা'আত থেকে পৃথক হইয়া একা থাকে, শয়তান তাকে ধরে নিয়ে যায়”।

এবং তিনি কি আরও বলেননি ? “শয়তান নিঃসঙ্গ ও একা ব্যক্তির সাথে সাথে থাকে। কিন্তু দু'জন হলেই দূরে অবস্থান করে”।


হ্যাঁ, সত্যই উপরিউক্ত কথাগুলো রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) স্বয়ং বলেছেন। কিন্তু তিনি তো একথা বলেছেন যে, নিজের গৃহকে আঁকড়ে থাক, বিশেষ বিশেষ লোকের সাহচর্য অবলম্বন করো এবং সাধারণের সংশ্রব একেবারে বর্জন করো। সুতরাং দেখা যাচ্ছে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যেমন জামা'আতে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন, তেমনি গোলযোগপূর্ণ সময়ে মানুষের সংশ্রব বর্জন ও নির্জন জীবন যাপনেরও নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু তাই বলে তাঁর এতদুভয় নির্দেশের মধ্যে কোন বৈপরীত্য নেই। বরং দু'টি নির্দেশের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে নেয়া দরকার। প্রথমত, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) যেখানে জামা'আতকে আঁকড়ে থাকার কথা বলেছেন, সেখানে তিনি জামা'আত অর্থে ধর্মীয় বিষয় ও ধর্মীয় আহকাম সম্পর্কে বলেছেন। কেননা, উম্মতে মুহাম্মদীয়া কখনও অধর্মের ব্যাপারে একমত হতে পারে না এবং এ ক্ষেত্রে কেউ যদি ইজমায়ে উম্মতের বিরুদ্ধে চলে যায়, তবে তার ক্ষেত্রে উক্ত হাদীস প্রযোজ্য হতে পারে অথবা জমহুর উলামাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যাপারে রায় প্রকাশ করলে, তার জন্যও এ হাদীস সাবধান বাণী হিসেবে প্রযোজ্য হয়। তেমনি জমহুর উলামাদের থেকে পৃথক হয়ে যাওয়ার ব্যাপারেও হতে পারে। এসবই পরিত্যাজ্য কাজ এবং এগুলোর পরিণাম স্বভাবতই বিপদগামী হওয়া। তবে হ্যাঁ, ধর্মের ঘনিষ্ঠতা রক্ষার জন্যই যদি পৃথক হওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে সেটা আলাদা কথা। তা অবশ্যই করা যেতে পারে।


‘জামা'আত আঁকড়ে থাক' – এর দ্বিতীয় অর্থ এ হতে পারে যে, জুম'আ - জামা'আত পরিত্যাগ করো না। কেননা এগুলোর মধ্যে ধর্মীয় শক্তি প্রকাশ পায় এবং এগুলোর মধ্যেই ইসলামের পরিপূর্ণতা লাভ হয়। তাছাড়া, এ ধরনের অনুষ্ঠানের দ্বারা কাফির ও বিধর্মীদেরও তুষানলে নিপতিত করা সম্ভব হয় । সুতরাং এ ধরনের অনুষ্ঠান আল্লাহ্র রহমত থেকে নিশ্চয়ই শূন্য থাকবে না। এজন্য আমরা একা জীবন অবলম্বনকারীকে বলে থাকি, উত্তম ও ভাল সকল সমাবেশেই তার অংশগ্রহণ করা উচিত— অপরপক্ষে গোলযোগপূর্ণ ও ক্ষতিকারক সমাবেশ থেকে দূরে অবস্থান সে করতে পারে। কেননা এসব স্থানে প্রতি পদেই অসুবিধা বিদ্যমান।


‘জামা'আত আঁকড়ে থাক'-এর তৃতীয় অর্থ এ হতে পারে যে, ধর্মীয় ব্যাপারে যারা দুর্বল, শান্তি ও নিরাপদকালে তাদের আলাদা না হওয়ার জন্য তাকীদ করা হয়েছে।


তবে যারা ধর্মীয় ব্যাপারে শক্তিশালী এবং আল্লাহর সকল বিষয়েও যথেষ্ট ওয়াকিফহাল, তারা যদি দেখতে পায় যে, ফিতনার সে সময় এসে গেছে,

রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) যে যুগের ব্যাপারে উম্মতকে সাবধান করে গেছেন এবং সে সময় নির্জনতা ও একাকী জীবন যাপনের নির্দেশ দিয়েছেন, তাহলে তখন তাদের জন্য নির্জনতা ও একাকী জীবন যাপনই উত্তম ও ভাল। কেননা, এমন যুগে মানুষের সাথে মেলামেশার মধ্যে ফাসাদ ও বিপদের ঝুঁকি বিদ্যমান থাকে। তবে ইসলামী বিষয় সংক্রান্ত সমাবেশ এবং সাধারণ কল্যাণকার্য থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া উচিত নয়। যদি মানুষের সংস্রব বর্জন, নির্জনতা ও একাকী জীবন যাপনই একান্ত উদ্দেশ্য হয়, তাহলে কোন পর্বত শীর্ষে অথবা কোন জনমানবহীন স্থানে চলে যাওয়াই উত্তম। কারণ তথায় গেলে নিজের ধর্মকে অন্তত সংরক্ষণ করতে সক্ষম হবে।


মোদ্দাকথা আল্লাহ্ যাকে জুম'আ, জামা'আত ও অন্যান্য সকল ইসলাম বিষয়ক সমাবেশে অংশ গ্রহণের সামর্থ্য দান করেছেন সে যেখানেই আর যে পরিস্থিতিতেই অবস্থান করুক না কেন, তাতে তার অংশগ্রহণ করা উচিত – যাতে করে এর মহান সওয়াব থেকে বঞ্চিত না হতে হয়। কেননা ধর্মীয় সমাবেশ--তা সে যেখানেই হোক না কেন, আল্লাহর তরফ থেকেই হয়ে থাকে। অবশ্য অনেক সময় মানুষের দোষ-ত্রুটির জন্য তাতেও ফাসাদ ও ফাটল সৃষ্টি হয়ে যায়। আবদাল ও কুতুবদের সম্পর্কে এ ধরনের কথাই শুনতে পাওয়া যায় । ইসলামী বিষয়ে যেখানেই কোন সমাবেশ হোক না কেন, তাঁরা সেখানেই উপস্থিত হন। তাঁরা যেখানেই যেতে চান, সেখানেই পৌঁছে যেতে পারেন। তাঁদের জন্য ধরাটি একটি পদক্ষেপের স্থান মাত্র।


বর্ণিত আছে, এ সকল বুযুর্গের জন্য যমীনকে শুইয়ে দেয়া হয় এবং শান্তির সাথে তাদের আহবান করা হয়। আর তাদের উপর বিস্তার করে থাকে কেরামত ও কল্যাণের ছায়া।


যাঁরা এ ব্যাপারে সাফল্য অর্জন করেছেন, আমি তাঁদের মোবারকবাদ জানাই। আল্লাহ্ তাদের নিজ সংকল্পে দৃঢ় থাকার তৌফিক দান করুন, যারা নিজের নফসকে রেহাই দেয়ার ব্যাপারে ঔদাসীন্য অবলম্বন করেছে আর লক্ষ্যস্থলে পৌঁছতে অপারগ, আমাদের ন্যায় অন্বেষীদের তিনি সাহায্য করুন।


আমি নিজের অবস্থাকে নিম্নোক্ত কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করার প্রয়াস পাব : 

অন্বেষী দল সাফল্য অর্জন করেছে এবং তারা তাদের উদ্দেশ্যে উপনীত হয়ে গেছে। আর বন্ধুগণ বন্ধুদের দ্বারাই সাফল্য অর্জন করেছে। অথচ, আমরা উদ্দেশ্যে উপনীত হওয়া ও সে পথ থেকে বিরত থাকা- এ দুইয়ের মাঝখানে কম্পমান ও অস্থিরতায় ডুবে আছি। নিকটকে দূর আর দূরের মধ্যে নৈকট্য তালাশ করছি। তাছাড়া এ নফসটিও এমন যে, সে অসম্ভব জিনিসকেই জ্ঞানের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

সুতরাং আমাদের এমন জিনিস পান করাও যাতে সকল বেদনা দূর হয়ে যায় এবং সিরাতুল মুস্তাকীমের সোজা পথ হাসিল হয়।


ওহে রোগ-জীর্ণদের চিকিৎসক। এ রোগীদের আহত অন্তঃকরণের বর্তমানে এ একটিই কামনা। ওহে বিপদ ত্রাতা, আমি জানি না, কি দিয়ে আমার এ রোগের চিকিৎসা করবো। আমি এ-ও জানি না যে, কি দিয়ে কিয়ামতের দিন সাফল্য লাভ করবো?

--

মখলূক – ৬



মখলূক— (পর্ব – ৬)

📚মিনহাজুল আবেদীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


ধর্মের নেতাদের দুটি জিনিষ আবশ্যক—

এখানে আরও একটি বিষয় অবশ্যই স্মরণীয় যে, যে ব্যক্তির নিকট ধর্মীয় ব্যাপারে সমাজ নির্ভরশীল, মানুষের মধ্যে অবস্থানের জন্য তাঁর দু'টি জিনিসের অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রথমত, অসীম ধৈর্য, বিপুল সহিষ্ণুতা, উদার দৃষ্টি ও সকল ব্যাপারে আল্লাহর সাহায্য ও সহযোগিতা লাভের যোগ্যতা। দ্বিতীয়ত, সমাজের অন্যান্য সকল ব্যাপারে যদিও তিনি সশরীরে স্বয়ং অবস্থান করবেন তথাপি তাঁকে সকল বিষয় থেকে আলাদা থাকতে হবে। সুতরাং যখন তিনি কথাবার্তা বলবেন, তিনি ধর্মীয় বিষয়টিকেই প্রাধান্য দেবেন। যদি কেউ সাক্ষাৎ করতে আসে, তবে তার মর্যাদা ও সম্মান অনুযায়ী তাকে মর্যাদা দান ও সম্মান প্রদর্শন করবেন। যদি মানুষ তাঁকে উপেক্ষা করে বা তাঁর সম্পর্কে উদাসীন হয়ে যায়, তবে এ অবস্থাকে সৌভাগ্য মনে করবে। সমাজ যদি নেক ও সত্য কাজে ব্যাপৃত হয়, তবে তার বিরোধিতা করবে অথবা তা থেকে দূরে অবস্থান করবে। অবশ্য যদি দেখা যায় যে, উপদেশ কাজে আসবে, তবে উক্ত কার্যে বাধা দান করবে বা নিজের গোস্বা প্রকাশ করবে। এমনিভাবে, সমস্ত শক্তি ও ক্ষমতা দিয়ে তাঁকে তাঁর হক আদায় করতে হবে। মানুষের সাক্ষাৎ বা ইবাদতে অংশ গ্রহণ করে হোক অথবা সমাজে যে বিষয়ের অভাব আছে, তা পূরণ করেই হোক -- ধর্মীয় ব্যাপারে সমাজের প্রতি যে দায়িত্ব তাঁর আছে, তা পালন করবে। মনে রাখবে, এর কোন বদলার প্রত্যাশী হতে পারবে না। এ ধরনের কোন ধারণা রাখা এবং ধর্মীয় ব্যাপারে মানুষের মনে অসঙ্গত ধারণা সৃষ্টি করাও চলবে না। যদি সামর্থ্য থাকে, তবে ধর্মীয় ব্যাপারে হক আদায়ের জন্য অকুণ্ঠচিত্ত থাকবে।

সমাজের মন্দ দিকগুলো দূর করার চেষ্টা করবে। তাদের খোশখবর দান করবে। নিজেকে সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং নিজের অভাবের বিষয় সর্বদা গোপন রাখবে। তাহলে মানুষ বাহ্যত তাঁকেই তাদের অনুসরণীয় মনে করবে এবং অন্তরেও তাঁর ন্যায় হওয়ার জন্য চিন্তা-ভাবনা করবে।

এ সব বিষয় ছাড়া তাঁর জন্য আরও কতিপয় কর্তব্য রয়েছে। যথা নিজের ব্যাপারেও সর্বদা সতর্ক ও সচেতন এবং বিশেষ ইবাদতে লিপ্ত থাকতে হবে। 

যেমন হযরত উমর 'আল-ফারূক (রা) বলেছেনঃ যদি রাতে বিশ্রাম লাভ করি, তাহলে আমার নফসকে লোকসানের দিকে ঠেলে দিতে হয, আর যদি দিনে বিশ্রাম গ্রহণ করি, তবে মানুষের হক নষ্ট করতে হয়। সুতরাং এই দুই সময়ের মধ্যে বিশ্রাম নেয়ার অবকাশ কোথায়?

উপরিউক্ত বিষয়টিকেই কতিপয় কবিতার মধ্যেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

যেমন-

যদি তুমি ইমামদের জীবনাদর্শের প্রতি আকর্ষণ অনুভব কর তবে নিজের নফসকে এমন দৃঢ় কর যেন বিপদাপদ তোমাকে টলাতে না পারে। নফসকে আত্মমর্যাদায় বলীয়ান করে প্রতিটি খারাপ জিনিস উদ্ভবের মুকাবিলা করতে হবে এবং এমনিভাবে ধৈর্য শিক্ষা দেবে যে, তা যেমন বক্ষে প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়।


তোমার জিহ্বা থাকবে নীরব, তোমার চতুর্দিক থাকবে বন্ধ। তেমনি তোমার গোপনীয়তা থাকবে সত্যিই লুক্কায়িত – বুদ্ধিমানের নিকট এটাই - সবচাইতে প্রসিদ্ধ লাভ করেছে।

তোমার মন্দ সমালোচনা হবে, দরজা থাকবে বন্ধ। মুখে থাকবে মুচকি হাসি – কিন্তু পেট থাকবে খালি। তোমার অন্তর আহত, তোমার ব্যবসা অচল, - তোমার মর্যাদা বিলুপ্ত – সর্বত্র কেবল তোমার দোষ-ত্রুটির আলোচনা। তবুও দিনরাত তুমি কাল ও মানুষের অভিশাপ হজম করে চলেছ। অন্তরে যদি তাঁদের (মহৎ ব্যক্তির) আদর্শ অনুসরণের আকঙ্খা পোষণ কর, তবে দিনে মানুষের কাজে পুরস্কার বা কৃতজ্ঞতা ব্যতীতই লিপ্ত হয়ে যাও এবং রাতে সেই মিলনানন্দে ডুবে যাও, একই কাফেলার অন্য লোক যে আনন্দের খবরও জানে না।


সুতরাং জীবনের রাত্রিসমূহকে সে মহাসঙ্কটপূর্ণ ও কঠিন দিনের উপায় লাভে নিয়োজিত কর, যে দিন অন্য কোন কিছুই কাজে আসবে না ।


মোটকথা, মানুষের মধ্যে অবস্থানকালে স্বয়ং মানুষের সাহচর্যে থাকবে ঠিক; কিন্তু অন্তর থাকবে বহু দূরে – অতি দূরে। আল্লাহর কসম, এ অবস্থায় উপনীত হওয়া খুবই কঠিন। সংসারটাও বড়ই সংকুল। এ বিষয়টি সম্পর্কে আমাদের ওস্তাদ সাহেব ওসীয়ত করতে গিয়ে বলেছেনঃ “আয় বৎস, যুগের মানুষের সাথে অবস্থান করলেও তাদের সৃষ্ট স্রোতের টানে ভেসে যেও না। তিনি আরও বলেছেনঃ ব্যাপারটা খুবই কঠিন। কেননা, জীবনটা জীবিতদের সাথে আর অনুসরণ করতে হয় মৃত ব্যক্তিদের।


হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মসউদ (রা) বলেছেনঃ মানুষের সাথে মেলামেশা কর, কিন্তু তোমার অন্তর যেন তাদের সাথে কথা না বলে। তাঁর এ কথাটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও মহান, সন্দেহ নেই।


মখলূক – ৫



মখলূক— (পর্ব – ৫)

📚মিনহাজুল আবেদীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


নির্জনতা ও নিঃসংগতা জীবন অবলম্বন নির্দেশ—২

দ্বিতীয় শ্রেণীর লোক—

যে ব্যক্তি জ্ঞানের ব্যাপারে মানুষের নিকট প্রত্যাশী অথবা তার নিকটই মানুষ জ্ঞান লাভেচ্ছ কিংবা ধর্মীয় ব্যাপারে তাঁর নিকট মানুষের প্রয়োজন রয়েছে— যেমন, কোন ব্যক্তি জনসমাজে থাকলে তিনি হয়তো কোন একটি সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন বা কোন বিদ'আত দূর করতে সক্ষম কিংবা কথায় বা কাজে মানুষকে নেক কাজের দিকে আহবান করতে পারেন এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার ক্ষমতাও রাখেন — এমতাবস্থায় এ শ্রেণীর লোকের পক্ষে মানুষের সঙ্গ ত্যাগ ও নির্জনতা অবলম্বন কোনক্রমেই সঙ্গত নয়। বরং মানুষের মধ্যেই তার অবস্থান করা উচিত। কারণ তাতে আল্লাহ্ তা'আলার মকলুকের নসীহতের কার্য হবে, আল্লাহর দীনের হেফাজত হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দ্বারা আহকাম-আরকানও বর্ণিত হবে। কেননা, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন : 

“যখন বিদ'আত আত্মপ্রকাশ করে এবং আলিম নীরবতা অবলম্বন করে তেমন আলিমের উপর আল্লাহ্ তা'আলার অভিশাপ নাযিল হোক”।


যখন কোন আলিম বিদ'আতপূর্ণ সমাজে অবস্থান করে নীরবতা অবলম্বন করবেন, তখন তাঁর বেলায়ই উপরিউক্ত হাদীস প্রযোজ্য হবে। এমতাবস্থায় তিনি সেখান থেকে দূরে চলে গিয়ে নির্জনতা ও নীরবতা অবলম্বন করতে চাইলেও তা জায়েয হবে না।

ওস্তাদ আবি বকর বিন ফুরক সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি স্থির করলেন যে, আল্লাহর ইবাদতের জন্য মখলুক থেকে আলাদা অবস্থান করবেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি একটি পাহাড়ে উঠছিলেন। এমন সময় তাঁকে সম্বোধন করে আওয়াজ এলোঃ 'আয় আবূ বকর' যখন তুমি আল্লাহ্ তা'আলার মখলুকের মধ্যে তাঁর নিদর্শনসমূহের অন্যতম নিদর্শনের পর্যায়ে উপনীত হয়েছ, তখনই তুমি আল্লাহর বান্দাদের পরিত্যাগ করে চলেছ। এ আহবান শুনে তিনি প্রত্যাবর্তন করলেন এবং এ কারণেই ওস্তাদ আবি বকর বিন ফুরক তাঁর অবশিষ্ট জীবন মানুষের সাহচর্যেই কাটিয়েছেন।


মামুন বিন আহমদ আমার নিকট বর্ণনা করেছেন, ওস্তাদ আবি-ইসহাক কোন এক ইবাদত গোযার ব্যক্তিকে বলেছিলেন : 

তুমি তো মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর উম্মতদের বিদ'আতের হাতেই সমর্পণ করেছ, আর নিজে এখানে এসে বনের ঘাস চিবিয়ে দিন গোযরান করছ।


ইবাদত-গোযার ব্যক্তি এ কথার জবাবে বললেনঃ মানুষের সাথে অবস্থানের শক্তি ও ক্ষমতা আমার নেই। আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে বরং সেই ক্ষমতা ও শক্তি দান করেছেন।


অতঃপর আবি ইসহাক মানুষের মধ্যে অবস্থানকেই স্বীকার করে নেন এবং শরীয়তের একটি মূল্যবান গ্রন্থ প্রণয়ন করেন।


এ বুযুর্গদের মধ্যে ইলমের যেমন পরিপূর্ণতা ঘটেছিল তেমনি আমলের ব্যাপারেও তাঁরা নজীর স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাছাড়া, আখিরাতের খাটি পথ অবলম্বনের ব্যাপারে তাঁদের সূক্ষ্ম দৃষ্টিক্ষমতা ছিল। আল্লাহ্ এ সকল বুযুর্গ ব্যক্তির প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন। 

মখলূক – ৪



মখলূক— (পর্ব – ৪)

📚মিনহাজুল আবেদীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


নির্জনতা ও নিঃসংগতা জীবন অবলম্বন নির্দেশ—১

এখন প্রশ্ন হলো আমাদের সামনে মখলুক অর্থাৎ সৃষ্ট-জগতের বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে। কোন্ পর্যায়ে কিভাবে আমাদের নির্জনতা ও নিঃসঙ্গ জীবন অবলম্বন করা উচিত, সে সম্পর্কে আলোচনা করা দরকার।

এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মানুষকে দু'ভাগে ভাগ করা যায়। 

প্রথম, এমন অনেকেই আছেন, যাদের মখলুক থেকে জ্ঞান অথবা অন্য কোন কিছু গ্রহণের প্রয়োজনই নেই এবং তাদের কাছেও মানুষের কোন প্রয়োজন নেই। এই শ্রেণীর মানুষের পক্ষে মানুষ থেকে নিঃসঙ্গতা অর্জনই উত্তম। জুম'আ, জামা'আত, ঈদ, হজ্জ ও ইলমের মজলিস-এ সব ব্যতীত আর কখনো মানুষের সাহচর্যে তার না যাওয়াই উত্তম। তবে সাংসারিক বিষয়ের মধ্যে যদি এমন কোন জরুরী ব্যাপার দেখা দেয়, যা না হলেই চলে না – তাহলে সে ব্যাপার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাথে দেখা করতে পারেন। সব সময় নিজেকে আত্মগোপন রাখার এবং যে বিষয়ে জ্ঞান নেই অথবা যে সম্পর্কে জ্ঞানার্জন সম্ভব নয়, তার প্রকৃত রূপটিকেই দৃঢ়বদ্ধভাবে আঁকড়িয়ে থাকাই তার কর্তব্য।

এ শ্রেণীর ব্যক্তি যদি সম্পূর্ণ নির্জনতা ও নিঃসঙ্গ জীবন অবলম্বন করতে চান এবং মখলুক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করেন, তবে কোন অবস্থাতেই কোনক্রমেই কারো সাথে যেন সাক্ষাৎ না করেন-- এমনকি, জুম'আ জামা'আতেও নয় । অবশ্য যদি মানুষ সাক্ষাৎ পরিত্যাগ ও সম্পূর্ণ নির্জনতা অবলম্বন লাভজনক বিবেচিত হয়।


এ ব্যবস্থাটি (অর্থাৎ সম্পূর্ণ নির্জনতা ও নিঃসঙ্গ জীবন যাপনের জন্য জামা'আত, জুমা পরিত্যাগ করা) দুইভাবে কার্যকরী করা যেতে পারে। প্রথমত, এমন কোন জায়গায় চলে যেতে হবে, যেখানে উক্ত আহকামগুলো আদৌ ফরয হবে না। যেমন, কোন নির্জন পাহাড়ের চূড়া-- যেখানে কোন জনবসতি নেই। ইবাদত গোয়ার ব্যক্তিগণ মানুষ ও অন্যান্য মলূক থেকে দূরে থাকার জন্য এ উপায়টিই বেশি অবলম্বন করে থাকেন-- এটা অধিক কার্যকরী ও হয়।


দ্বিতীয়ত, যদি সত্যিকারভাবে জানতে পারা যায় যে, উক্ত আহকামগুলো আদায় করতে গিয়ে মানুষের সাথে মেলামেশার ফলে যে ক্ষতি সাধিত হবে, তা আহকামগুলো পরিত্যাগ করার চাইতে মারাত্মক– তাহলে তাঁর পক্ষে আহকামগুলো পরিত্যাগ করার একটি কৈফিয়ত পাওয়া যেতে পারে।


আমি স্বয়ং মক্কায় কতিপয় এমন ব্যক্তিকে দেখেছি যারা বায়তুল্লাহর নিকট অবস্থান করা সত্ত্বেও এবং সুস্থ শরীরে থাকা অবস্থায়ও জামা'আতে হাযির হতেন না। এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে আমার মনে সন্দেহের উদয় হলে আমি একদিন তাদের একজনের নিকট বিষয়টি প্রকাশ করলাম। তখন তিনি সে ওজরই জানালেন, যা আমি এই মাত্র বলে এসেছি (অর্থাৎ যদি সত্যিকারভাবে কেউ উপলব্ধি করতে পারেন যে, জামা'আত পরিত্যাগ করার চাইতে তাতে যোগদানের ফলে মানুষের সাথে মেলামেশায় অধিক ক্ষতি হবে।)


একথার পরিষ্কার অর্থ এই যে, যদি সত্যিকারভাবে বুঝতে পারা যায় যে, মসজিদে জামা'আতে হাযির হওয়ার অর্জিত সওয়াবের দ্বারা মসজিদে যেতে ও মানুষের সাথে মেলামেশার ফলে যে গুনাহ্ হবে তার ক্ষতিপূরণ হবে না।


আমি বলছি, এসব ব্যাপারে অপারগের জন্য কোন বাধ্যবাধকতা নেই। কেননা আল্লাহ্ তা'আলা মানুষের অপারগতা সম্পর্কে খুবই ওয়াকিফহাল। তিনি মানুষের অন্তঃকরণের খবর সবচাইতে বেশী জানেন। মোটকথা, জুম'আ ও জামা'আতে মানুষের সাথে মেলামেশা করবে। তবে নির্জনতা অবলম্বনের সুষ্ঠু উপায় হল মানুষ ও মকলুকাত থেকে দূরে কোথাও গিয়ে অবস্থান করা- যাতে - কোন প্রকারেই এ সবের ঝঞ্ঝাটে পড়তে না হয়। যেখানে গেলে জুম'আ· জামা'আত - এ সব দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনই না হয়, তেমন জায়গায়ই চলে যাওয়া উচিত।

কেননা কোন শহরে বা জনসমাজে অবস্থান এবং সকলের মধ্য থেকে কোন ওজরের ভিত্তিতে জুম'আ ও জামা'আতে হাযির না হওয়ার যে (অধিকতর ক্ষতির আশঙ্কায়) অবস্থাটি বর্ণিত হলো, তা উপলব্ধি করা কঠিন কাজ। কারণ এ বিষয়টি উপলব্ধি করার জন্য সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টিক্ষমতা ও অন্য ধরনের উপলব্ধি শক্তির প্রয়োজন। তা না হলে তার উপর থেকে উক্ত আহকামের বাধ্যবাধকতা দূর হলো কিনা, তা সঠিকভাবে বুঝতেই পারবে না। তাছাড়া, এ ক্ষেত্রে ভ্রান্তি ও কু-ধারণা সৃষ্টির আশঙ্কাও বিদ্যমান। প্রথম দু'টি পন্থাই বরং নিরাপদ ও সহজ।



বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...