মঙ্গলবার, ২৫ জুলাই, ২০২৩

অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৫) অহংকারের স্বরূপ ও তার লাভ-লোকসান



অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৫)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

অহংকারের স্বরূপ ও তার লাভ-লোকসান—

অহংকার দু'প্রকার। একটি বাহ্যিক, অপরটি অভ্যন্তরীণ। অভ্যন্তরীণ অহংকার হচ্ছে মনের অভ্যাস এবং বাহ্যিক অহংকার হচ্ছে ক্রিয়াকর্ম, যা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। বাস্তবে অভ্যন্তরীণ অভ্যাসকেই অহংকার বলা সঙ্গত। ক্রিয়াকর্ম এই অভ্যাসেরই ফলাফল। অভ্যাসই ক্রিয়াকর্মের কারণ হয়ে থাকে। অঙ্গের উপর যখন অভ্যাসের প্রতিক্রিয়া ফুটে ঊঠে, তখন ‘অহংকার করেছে’ বলা হয়। 


মোটকথা, মানসিক চরিত্রসমূহের মধ্যে একটি চরিত্রকে বলা হয় অহংকার। তা হচ্ছে নিজেকে অন্যের উপর সেরা দেখে আনন্দ পাওয়া এবং তাতেই আকৃষ্ট হওয়া।


বলা বাহুল্য, অহংকার একটি আপেক্ষিক বিষয়। এতে একাধিক বিষয়ের উপস্থিতি দরকার– 

(১) অহংকারী, (২) যার সাথে অহংকার করা হয়, (৩) যে বিষয় নিয়ে অহংকার করা হয়।


অহংকার ও আত্মপ্রীতির মধ্যে তফাৎ এখানেই৷ আত্মপ্রীতিতে কেবল কর্তার উপস্থিতিই যথেষ্ট। মানুষ যদি একাই সৃজিত হয় এবং তার সাথে অন্য কোন কিছু না থাকে, তবে সে আত্মপ্রীতিতে লিপ্ত হতে পারবে- অহংকার করতে পারবে না। এ থেকে বুঝা গেল, অহংকারে কেবল নিজেকে বড় মনে করা যথেষ্ট নয়। কেননা, মাঝে মাঝে মানুষ নিজেকে বড় মনে করে। কিন্তু অপরকে নিজের চেয়েও বড় অথবা সমান জ্ঞান করে। এতে অহংকার হয় না। অনুরূপভাবে অপরকে হেয় মনে করাও অহংকারের জন্যে যথেষ্ট নয়। কেননা, মাঝে মাঝে মানুষ অপরকে হেয় মনে করে; কিন্তু নিজেকে তার চেয়েও অধিক হেয় মনে করে। এমতাবস্থায় সে অহংকারী হয় না। অপরকে নিজের অনুরূপ মনে করলেও অহংকার হয় না। অহংকারের জরুরী বিষয় হচ্ছে নিজের একটি মর্যাদা জানা এবং অপরের একটি মর্যাদা জানা। অতঃপর নিজের মর্যাদাকে অপরের মর্যাদার চেয়ে সেরা মনে করা। 

বিশ্বাসের মধ্যে এ তিনটি বিষয় একত্রিত হলে অহংকার হবে। কেবল নিজের মর্যাদা জানার নাম অহংকার নয়; বরং এই জানার কারণে ও বিশ্বাসের ফলে মনের মধ্যে একটি ফুৎকার পড়ে এবং মান-সম্মান ও আনন্দের দিকে গতিশীল হয়। সম্মান ও আনন্দের দিকে এই গতিশীলতাকেই অহংকার বলা হয়। হাদীস শরীফেও উপরোক্ত ফুৎকার উল্লিখিত হয়েছে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :

“(হে আল্লাহ!) আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই অহংকারের ফুৎকার থেকে।”


জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে ফজরের নামাযের পর ওয়ায করার অনুমতি চাইলে তিনি এমনিভাবে তাকে বলেছিলেন : আমার আশংকা হয় যে, তুমি ফুলে-ফেঁপে 'সপ্তর্ষিমণ্ডল পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। 


এ থেকে জানা গেল যে, মানুষ যখন অহংকার করে, তখন ফুলে উঠে। এই ফুলে উঠাকে মাহাত্ম্যবোধও বলা হয়। সেমতে হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ) নিম্নোক্ত আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে তাই বলেছেন– “তাদের অন্তরে কেবল অহংকারই রয়েছে, যে পর্যন্ত তারা পৌঁছতে সক্ষম হবে না।”

অর্থাত, এমন মাহাত্ম্যবোধ যা বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ ক্রিয়াকর্মের কারণ হয়ে থাকে। অতঃপর সে ক্রিয়াকর্মকে অহংকার বলা হয়। অর্থাৎ, যখন কারও কাছে তার নিজের মর্যাদা অপরের চেয়ে বড় সাব্যস্ত হয়, তখন সে অপরকে হেয় জ্ঞান করে তার কাছ থেকে দূরে থাকতে চাইবে। তার কাছে বসা, তার সাথে আহারে শরীক হওয়া অপছন্দ করবে। অহংকারের মাত্রা বেশী হলে মনে করবে, এ লোকটির উচিত আমার সামনে গোলামের মত নত হয়ে দাঁড়ানো।


অহংকারের অনিষ্ট খুব মারাত্মক। এর কারণে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ধ্বংস হয়ে যায় এবং আবেদ, সংসারত্যাগী এবং শিক্ষিত লোকগণ কমই এ থেকে মুক্ত থাকে, জনসাধারণের তো কথাই নেই। 


অহংকার যে ধ্বংসাত্মক, তার বড় প্রমাণ রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর এই উক্তি : “যার অন্তরে কণা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে দাখিল হবে না।”


এর কারণ এই যে, অহংকারের কারণে বান্দা ঈমানের কোন চরিত্র অর্জন করতে পারে না। উদাহরণতঃ মানুষ যে পর্যন্ত অহংকারী থাকে, সে নিজের জন্যে যা প্রিয়, তা অন্য মুমিনের জন্যে প্রিয় মনে করবে না। 


বিনয় হল পরহেযগারদের চরিত্রের মূল বিষয়, অহংকারী ব্যক্তি তা করতে পারবে না। অহংকারে থাকা অবস্থায় কেউ হিংসা-বিদ্বেষ বর্জন করতে পারবে না। সদা সত্য কথা বলতে পারবে না। ক্রোধ ও রাগ দমন করতে সক্ষম হবেনা। নিজে নম্রতা সহকারে কাউকে উপদেশ দেবে না এবং অন্যের উপদেশে কান লাগাবে না। মোটকথা, এমন কোন মন্দ অভ্যাস নেই, যা অহংকারী ব্যক্তি নিজের অহংকার রক্ষার খাতিরে করতে বাধ্য না হবে। পক্ষান্তরে এমন কোন উৎকৃষ্ট গুণ নেই, যা সে নিজের মানহানির ভয়ে বর্জন না করবে। এ কারণেই বলা হয়েছে, যার অন্তরে কণা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে দাখিল হবে না। 


আর মন্দ চরিত্র কখনও একা বিদ্যমান থাকে না। কারও মধ্যে একটি মন্দ চরিত্র থাকলে সে অপরটিকে টেনে আনে। সে অহংকার সর্বনিকৃষ্ট, যা কারও কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং সত্যকে মেনে নিতে ও তার অনুগত হতে দেয় না। এমনি ধরনের অহংকার সম্পর্কে কোরআনুল করীমে বলা হয়েছে : 

 “ফেরেশতারা হাত প্রসারিত করে বলবে- বের কর তোমাদের প্রাণ। আজ তোমাদের প্রতিদান দেয়া হবে অপমানজনক শাস্তি। কারণ, তোমরা আল্লাহর বিরুদ্ধে অসত্য বলতে এবং তার আয়াতসমূহ থেকে অহংকার করতে।”


“যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত, তারা অহংকারীদেরকে বলবে, তোমরা না থাকলে আমরা অবশ্যই ঈমানদার হতাম।”


হযরত ঈসা (আ.) বলেনঃ "নরম মাটিতে ফসল উৎপন্ন হয়, পাথরে হয় না।" এমনিভাবে শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান বিনম্র অন্তরে প্রভাব বিস্তার করে; অহংকারীর অন্তরে করে না। লক্ষণীয়, যদি মানুষ তার মাথা অতিমাত্রায় উঁচু করে এবং ছাদ পর্যন্ত নিয়ে যায়, তবে ছাদে টক্কর লেগে তার মাথাই চূর্ণ হবে। আর যে ব্যক্তি নুয়ে থাকবে, সে ছাদ দ্বারা আরাম ও ছায়া সবই পাবে।



পরবর্তী পর্ব

যার সাথে অহংকার করা হয়, তার স্তর এবং অহংকারের ফল

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...