শনিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০২৪

মারেফতের মর্মকথা (২৩) তাসাউফের আবশ্যকতা



📚কাশফুল মাহজুব (পর্ব- ২১)  ✍🏻দাতা গঞ্জেবকশ হাজবেরী (রহ.)

তাসাউফের আবশ্যকতা—
তাসাওউফের প্রমাণের আলোচনার সমাপনান্তে হজরত আলী হাজাবিরী (রহঃ) প্রথমে তাসাউফ অস্বীকারকারীদের উত্তরে আবুল হাসান আবু শাহ্নার উক্তি উদ্ধৃত করেন যে-
“আজকাল তো তাসাউফ একটি কথার কথা মাত্র, তার পক্ষে কোন যথার্থ যুক্তি নেই। কিন্তু সাহাবাকেরাম, তাবেয়ীন এবং তাবে তাবেয়ীনদের আমলে তার যথার্থতা ছিল। নিঃসন্দেহে ঐ যুগে তাসাউফ নামে কিছু ছিল না কিন্তু আসল বিষয়বস্তু ঠিকই ছিল।” এই উদ্ধৃতি লিপিবদ্ধ করার পর হজরত আলী হাজবিরী  (রহঃ) বলেন: তাসাউফ সম্পর্কে তোমরা যা বল তা যদি বর্তমান অবস্থা দেখে বল তাহলে আমরাও তার সমর্থক। তাসাউফকে অস্বীকার করার ব্যাপারে তোমাদের অভিমত যদি নাম নিয়ে হয় তবে তা দূষণীয় নয়। কারণ তার মূল বিষয়বস্তু যদি বিদ্যমান থাকে তাহলে নাম নিয়ে কোন ঝগড়া বিবাদ বা একগুয়েমী নেই।
আর যদি তার আসল বিষয়বস্তু সম্পর্কে অস্বীকার কর তাহলে স্মরণ রেখো তা দ্বারা শরীয়তকে অস্বীকারই করা হয় না বরং মহানবি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর প্রশংসনীয় ফজিলত এবং সাহাবায়ে কেরামের প্রশংসনীয় গুণাবলিকেও অস্বীকার করা হবে। কারণ এই জাতীয় অস্বীকার করার পর ধর্মের সব কিছুতেই রিয়াকারী দেখায়। ধর্মের মূল বিষয়বস্তু তো আল্লাহর প্রতি আন্তরিকতা ও ভালবাসার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একে অস্বীকার করলে ধর্ম আর কোথায় থাকল? হাঁ; এখন যদি তোমরা তাকে স্বীকার কর এবং তা যদি বিদ্যমান থাকে তাহলে আমরা তাকেই তাসাউফ বলবো
হজরত আবুল হাসান (র.) বলেন:
“তাসাউফ কোন নির্দিষ্ট আচার-আচরণ বা বিদ্যার সনদপত্রের নাম নয়। বরং সচ্চরিত্র ও সদ গুণাবলির নামই তাসাউফ।” 
আবুল হাসান নূরী (র.) বলেন : 
“কুপ্রবৃত্তি, লোভ-লালসার দাসত্ব থেকে মুক্ত থাকা; অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এবং পার্থিব লৌকিকতা থেকে দূরে থাকার নামই তাসাউফ। 
নিজের ধনসম্পদ অসহায়দের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া এবং দুনিয়াকে অন্যের হাতে ছেড়ে দেওয়ার নামই তাসাউফ।” 
হজরত আবু হাস হাদ্দাদ নিশাপুরী (রহ.) বলেন :
“শরীয়তের নির্দেশ পালন করা এবং পূর্ণ শিষ্টতা রক্ষা করার নামই তাসাউফ। যে ব্যক্তি প্রতিটি মুহূর্তের আদব বা শিষ্টতা মান্য করে চলে সে মানুষের কাঙ্ক্ষিত স্থান লাভ করতে সমর্থ হয়। আর যে তা মেনে চলে না সে তার কাঙ্ক্ষিত স্থানে পৌঁছতে সক্ষম হয় না।

পরবর্তী পর্ব
সুফিদের পোশাক-পরিচ্ছদ

মারেফতের মর্মকথা (২২) সুফিদের শ্রেণিবিন্যাস



📚কাশফুল মাহজুব (পর্ব- ২০)  ✍🏻দাতা গঞ্জেবকশ হাজবেরী (রহ.)

সুফিদের শ্রেণিবিন্যাস—
তাসাওউফের মতে সুফী তিন ভাগে বিভক্ত।
(১) যে স্বীয় সত্তাকে সত্যের মাঝে বিলীন করে দেয় এবং যার মধ্যে কোন ধরনের অপবিত্রতা ও সংকীর্ণতা না থাকে সে সুফী।
(২) যে সাধন-ভজন দ্বারা এমন স্তর লাভ করার চেষ্টা করে এবং তার চাহিদা অনুযায়ী নিজে নিজকে এবং নিজের আচার ব্যবহারকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করে তাকে মুতাসাওয়েফ বলা হয়।
(৩) যে ব্যক্তি পৃথিবীর ধনসম্পদ; মানসম্মান অর্জন করার উদ্দেশ্যে সুফিদের বেশ ধারণ করে, অথচ তাসাউফের সাথে তার কোন সম্পর্কই নেই তাকে ‘মুসতাসাওয়েক’ বলা হয়।
এই তৃতীয় প্রকারের লোকদের ব্যাপারে সুফিদের অভিমত হলো: এরা মাছির মতো হীন এবং ঘৃণিত, পার্থিব লোভ-লালসার দাস। নেকড়ে বাঘ যেমন ছাগ পালের মাঝে ঢুকে তাদের ধ্বংস সাধন করে এরাও তেমনি জনসাধারণের সাথে মেলামেশা করে তাদের ঈমান নষ্ট করে।

পরবর্তী পর্ব—
তাসাউফের আবশ্যকতা

মারেফতের মর্মকথা (২১) প্রকৃত সুফির গুণাবলি



📚কাশফুল মাহজুব (পর্ব- ২০)  ✍🏻দাতা গঞ্জেবকশ হাজবেরী (রহ.)

প্রকৃত সুফির গুণাবলি—
তাসাউফ ও সুফি শব্দ দুটি মূলে ছাফা তথা পবিত্রতা ধাতু থেকে নির্গত। তার বিপরীত শব্দ হলো, অপরিচ্ছন্নতা। তাই যে ব্যক্তি স্বীয় চরিত্র; আচার ব্যবহার সুন্দর করে, স্বভাবকে অন্যায়-অনাচার থেকে দূরে রাখে এবং আল্লাহর দাসত্ব করার গুণাবলি নিজের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে আয়ত্ব করে নেয় সে-ই সুফি এবং আাসাউফধারীদের মধ্যে পরিগণিত হয়। 
অতএব সুফির আসল কাজ হলো আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ধ্যান-ধারণা অন্তর থেকে বিলীন করে দেওয়া এবং পৃথিবীর প্রতি নির্লিপ্ত এবং অনাসক্ত হওয়া। 
হজরত আবু বকর (রা.)-এর মাঝে যে এই দুইটি স্বভাব পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান ছিল।
হজরত আবু বকর (রা.) এর মধ্যে উক্ত দু'টি স্বভাব যে পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান ছিল তার প্রমাণ এতেই দেখা যায় যে মহানবি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর ইনতিকালের পর মদিনাবাসী মুসলিম পাগল প্রায় হয়ে গেলেন। এমনকি তারা সুষ্ঠু চিন্তাধারার ক্ষমতাও অনেকটা হারিয়ে ফেললেন। যার দরুন হজরত ওমর (রা.) খোলা তরবারি হাতে পাগলের মতো বলেছিলেন যে ব্যক্তি বলবে মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মৃত্যুবরণ করেছেন আমি এই তরবারি দ্বারা তার মস্তক ছিন্ন করে ফেলব।
হজরত আবু বকর (র.) এই সংবাদ পেয়ে তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে ছুটে যান তিনি ঘটনার গুরুত্ব উপলব্ধি করে বললেন—
“তোমরা যারা মুহাম্মদের ইবাদত করছ তারা জেনে রেখ মুহাম্মদের মৃত্যু রয়েছে। আর যারা মুহম্মদের প্রভুর ইবাদত করছ তারাও জেনে রেখ যে তিনি জীবিত; তিনি অমর তার মৃত্যু নেই”। সঙ্গে সঙ্গে তিনি এই অর্থ যুক্ত কুরআনের আয়াত পাঠ করলেন- “অন্যান্য নবিদের মতো মুহাম্মদও আল্লাহর একজন রাসূল। তার পূর্বে বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন। তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন তবে কি তোমরা (ধর্ম হতে) পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে ফিরে যাবে?” (সূরা: আলে-ইমরান- ১৪৪)
হজরত আবু বকরের বাণী ও আল্লাহর এরশাদ শুনে সত্যের উপাসকদের দিব্যদৃষ্টি খুলে যায়। হজরত ওমর (রাঃ) উন্মুক্ত তরবারি দূরে ফেলে দিয়ে মাটিতে বসে পড়লেন।
এই দু'টি বস্তু হতে হজরত আবু বকর (রা.) এর অন্তর একেবারে শূন্য ছিল। 
এর প্রমাণে আরও একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে যে, তাবুক যুদ্ধের প্রাক্কালে হজরত আবু বকর তাঁর যথা সর্বস্ব মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর দরবারে এনে হাজির করলেন। মহানবি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, “আবু বকর! তোমার পরিবার পরিজনের জন্য কী রেখে এসেছ?” হজরত আবু বকর স্মিত হাস্যে আরজ করলেন: “আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের মহব্বত এবং অনুসরণ।
এই দুটি বিষয়ই তাসাউফ এবং সুফিদের আসল সম্পদ। 
হজরত জুননূন মিসরি (রহ.) বলেন: 
“যে সত্য বলে এবং যার প্রতিটি পশম এই সাক্ষ্যদান করে যে দুনিয়ার কোন প্রকার আসক্তি তার মাঝে নেই সে-ই সুফী।”

পরবর্তী পর্ব 
(০৪) সুফিদের শ্রেণিবিন্যাস

মারেফতের মর্মকথা (২০) আখলাকের দু'টি শ্রেণি

 

📚কাশফুল মাহজুব (পর্ব- ১৯)  ✍🏻দাতা গঞ্জেবকশ হাজবেরী (রহ.)

আখলাকের দু'টি শ্রেণি—
আখলাক বা সৎ চরিত্রের দু'টি শ্রেণি রয়েছে। প্রথম স্রষ্টার সাথে সৎ স্বভাব অপরটি সৃষ্টির প্রতি সদ্ব্যবহার।
(ক)  আল্লাহর সাথে সদ্ব্যবহার করার অর্থ এই যে, বান্দা আল্লাহর বিধানে রাজি থাকবে। তার কোন কাজেই অভিযোগ করবে না। তার সকল আদেশ-নিষেধ আনত মস্তকে মেনে নিবে।
(খ) সৃষ্টির সাথে সৎ স্বভাবের অর্থ হচ্ছে: সৃষ্টির প্রতি আল্লাহ তায়ালা তাকে যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন- আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে অবশ্য তা পালন করবে এবং নিঃস্বার্থভাবেই আদায় করবে।
হজরত মারতায়াশ (র.) বলেন: সৎ স্বভাবের নামই হচ্ছে তাসাউফ। 
তা তিন প্রকার—
(ক)মহান আল্লাহর প্রতি সদ্ব্যবহার করা। অর্থাৎ তার সকল আদেশ-নিষেধ তাঁরই সন্তুষ্টি বিধানার্থে বিনা বাক্যব্যয়ে মান্য শাশনা করা।
(খ) সৃষ্টির সাথে সদ্ব্যবহার করা। অর্থাৎ বয়স্কদের সাথে সম্মানজনক মাতা আচরণ করা। ছোটদের প্রতি স্নেহ করা এবং সমবয়সীদের সাথে সমান ব্যবহার করা (নিঃস্বার্থভাবে)।
(গ) শয়তান ও কুপ্রবৃত্তির আনুগত্য না করা।
হজরত জোনায়েদ বাগদাদি (রহঃ) বলেন:- তাসাউফের ৮টি নিদর্শন। যথা: সাখাওয়াত, রেজা, সবর, ইশারাত, গুরবাত, পশমী পোশাক, সিয়াহাত এবং আল-ফাকর। নিচে এসবের ঊদাহরণ লিখাহল।
(১) সাখাওয়াত (দানশীলতা)। এর উদাহরণ হজরত ইবরাহীম (আ.)। তিনি তাঁর এবং পুত্রের জীবন আল্লাহর পথে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন।
(২) রেজা (আল্লাহর সন্তুষ্টি)। এর উদাহরণ হজরত ইসমাঈল (আ.)। তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আত্মোৎসর্গ করেছিলেন।
(৩) সবর (ধৈর্য) এর প্রতীক হজরত আইউব (আ.)। নিজের চোখের সামনে পরিবারের সকলকে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখে এবং নিজের সর্ব শরীর কীটে খেয়ে ফেলার পরও তিনি কোনদিন অধৈর্য হন নি।
(৪) ইশারাত (ইঙ্গিত) এর উদাহরণ হজরত যাকারিয়া (আ.)। তিনি আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং ইঙ্গিত ইশারায় কাজ সম্পাদন করতেন।
(৫) গুরবাত (অপরিচিত হওয়া) এর উদাহরণ হজরত ইয়াহইয়া (আ.) তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নিজের দেশেও অপরিচিত ছিলেন।
(৬) পশমী পোশাক পরিধান- হজরত মূসা (আ.) পশমী পোশাক ব্যবহার করতেন।
(৭) সিয়াহাত (ভ্রমণ) এর উদাহরণ ছিলেন হজরত ঈসা (আ.)। তিনি একটি পানপাত্র ও একটি চিরুনী সাথে নিয়ে গৃহ ত্যাগ করেন। পথিমধ্যে একজনকে আঙ্গুল দিয়ে চুল বিন্যাস এবং অঞ্জলি ভরে পানি পান করতে দেখে পান পাত্র এবং চিরুনীও ফেলে দিয়েছিলেন।
(৮) আল-ফাকর (দরিদ্রতা) এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হুজুরে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর দুনিয়া যাপনে। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করার জন্য আল্লাহ পৃথিবীর সকল সম্পদের চাবি তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু একদিন পেট ভরে খাওয়া এবং দুই দিন অনাহারে থাকাকেই তিনি অধিক পছন্দ করলেন। আবার তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন: হে আল্লাহ! আপনি আমাকে দরিদ্র অবস্থায় জীবিত রাখুন দরিদ্র অবস্থায়ই মৃত্যু দান করুন এবং দরিদ্রদের সাথে হাশর করুন।

পরবর্তী পর্ব—
প্রকৃত সুফির গুণাবলি

মারেফতের মর্মকথা (১৯) তাসাউফ



 📚কাশফুল মাহজুব (পর্ব- ১৯)  ✍🏻দাতা গঞ্জেবকশ হাজবেরী (রহ.)

তাসাউফ—
নিম্নের পাঁচটি বিষয় নিয়ে তাসাউফ—
(১) তাসাউফের বাস্তবতা ও প্রকৃতি
(২) আখলাকের দু'টি শ্রেণি
(৩) প্রকৃত সুফির গুণাবলি
(৪) সুফিদের শ্রেণিবিন্যাস
(৫) তাসাউফের আবশ্যকতা

তাসাউফের বাস্তবতা ও প্রকৃতি
হজরত মুহম্মদ ইবনে আলী ইবনে হুসাইন ইবনে আলী ইবনে আবু তালেব (র.) বলেন:– "তাসাউফ সৎ স্বভাবের নাম। মানুষের চরিত্র যত উন্নত হবে তার তাসাউফও ততটা বৃদ্ধি পাবে।”

পরবর্তী পর্ব
আখলাকের দু'টি শ্রেণি

মারেফতের মর্মকথা (১৮) মেকী দরিদ্র

 

📚কাশফুল মাহজুব (পর্ব- ১৮)  ✍🏻দাতা গঞ্জেবকশ হাজবেরী (রহ.)

মেকী দরিদ্র—
যে ব্যক্তি দরিদ্র বা দরবেশ নয় বরং কৃত্রিম দরবেশ সেজে মানুষের প্রশংসা কুড়িয়ে বেড়ায় এবং লোকেও তাকে তাই মনে করে আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে এমন ব্যক্তি চরম জঘন্য এবং নীচ ও হীন। যে কাজেই লোককে আল্লাহ হতে দূরে সরিয়ে রাখে তা সম্মান নয় বরং জঘন্যতম হীনতা। বুযর্গগণ সবসময় তাদের মুরিদদের এই ব্যাপারে সতর্ক ও সাবধান করে দিতেন। 
হজরত জোনায়েদ (র.) দরবেশদের নসিহত করেন: – “হে দরবেশকুল! তোমরা আল্লাহ ওয়ালা নামে পরিচিত; আল্লাহ ওয়ালা হিসেবেই মানুষেরা তোমাদের শ্রদ্ধা করে। কিন্তু তোমরা যখন নির্জনে আল্লাহর সম্মুখে থাক তখন চিন্তা করে দেখ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সাথে তোমাদের সম্পর্ক কতটা বিশুদ্ধ।”
শায়খ আবু সাঈদ (রহ.) বলেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সম্পদশালী সে-ই আসল দরবেশ।” যখন সে আল্লাহর সাথে মিলিত হয় তখন তার আর কিছুই দরকার হয় না। আর যখন দূরে থাকে তখন তার স্বস্তি থাকে না ।

পরবর্তী পর্ব
তাসাউফ

মারেফতের মর্মকথা (১৭) বান্দার সম্পদ আল্লাহর দান

 

📚কাশফুল মাহজুব (পর্ব- ১৭)  ✍🏻দাতা গঞ্জেবকশ হাজবেরী (রহ.)

বান্দার সম্পদ আল্লাহর দান— 
বান্দার শ্রম সাধনা উপলক্ষ বৈ কিছু নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
“হে জনমণ্ডলী! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে মুখাপেক্ষী ও দরিদ্র। আল্লাহই প্রকৃত গনী এবং প্রশংসনীয়।” (সূরা: আল-ফাতির- ১৫) 
আরও বলেন:– “আল্লাহই প্রকৃত গনী তোমরা সবাই মুখাপেক্ষী এবং দরিদ্র।”
(সূরা: মুহাম্মদ- ৩৮)
অতএব বান্দা জন্মগতভাবেই দরিদ্র ও মুখাপেক্ষী। ফলে ধনী হোক অথবা দরিদ্র উভয় অবস্থায়ই মানুষ পরীক্ষার বিষয়বস্তু। মানুষের কর্তব্য দরিদ্রাবস্থায় ধৈর্যধারণ করা এবং স্বচ্ছলতার সময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। 
আল্লাহ তায়ালা হজরত আইউব (আ.)-কে বিপদের কালে ধৈর্যধারণের জন্য উৎকৃষ্ট বান্দা নামে অভিহিত করেছেন। এ কারণে দেখা যায় আইউব (আ.) এর ধৈর্য এবং সুলায়মান (আ.) এর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ উভয়ই আল্লাহর কাছে সমমর্যাদাসম্পন্ন। যেহেতু সম্পদ ও দরিদ্রতা আল্লাহর দান। উভয় অবস্থায়ই তাকে বরণ করে নেয়া ফকিরীর একটি বড় গুণ।
আমার ওস্তাদ হজরত কাসেম কুশাইরী (র.) বলেছেন: মানুষ ধনসম্পদ এবং দরিদ্রতা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করে এবং এটাকে নিজেদের একটি মত ও পথরূপে গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ যদি আমাকে সম্পদ দান করেন তবে আমি অকৃতজ্ঞ হওয়ার পরিবর্তে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব। আর যদি দরিদ্র করেন তাহলে লোভী ও মুখাপেক্ষী হওয়ার চেয়ে ধৈর্যধারণ করব।

পরবর্তী পর্ব-
মেকী দরিদ্র

মারেফতের মর্মকথা (১৬) প্রকৃত ফকির



 📚কাশফুল মাহজুব (পর্ব- ১৬)  ✍🏻দাতা গঞ্জেবকশ হাজবেরী (রহ.)

প্রকৃত ফকির —
একজন বুযুর্গ বলেছেন:– “সহায় সম্বলহীন ব্যক্তি ফকির নয় ; বরং যেই ব্যক্তি পার্থিব লোভ-লালসার প্রতি অনাসক্ত সে-ই আসল ফকির।” 
হজরত শিবলী (র.) বলেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য আর কোন কিছুতে শান্তি না পায় সেই আসল ফকির।”
হজরত রোয়াইম ইবনে মুহম্মদ (রহঃ) বলেন:
“নিজের রহস্য হেফাজতে রাখা, নিজের নফসের প্রতি লক্ষ্য রাখা এবং তাকে বিপদাপদ থেকে রক্ষা করা এবং যথারীতি ফরজ আদায় করা- এসব গুণাবলিই ফকিরীর মাহাত্ম্য।”
তাই আল্লাহ ছাড়া যাবতীয় কিছু হতে দূরে থাকাই ফকিরী। সমস্ত অঙ্গ-প্রতঙ্গকে নাফরমানী হতে বাঁচিয়ে রাখা এবং যাবতীয় অনুচিত কাজ করা থেকে বিরত রাখাই ফকিরী। 

ধনসম্পদ ও দারিদ্র্যতা এই দু’য়ের মধ্যে কোনটি শ্রেষ্ঠ এই সম্বন্ধে বুযুর্গদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। কিন্তু আমি (গ্রন্থকার) বলি এটা একটি অনর্থক তর্ক। গনী বা সম্পদশালী আল্লাহর একটি নাম আর তিনি এর জন্য উপযুক্ত সত্তা। সৃষ্টি এই নামে আখ্যায়িত হতে পারে না। হাঁ তবে যদি রূপক ভাবে কাউকে গনী বলা হয় তবে জায়েয। আল্লাহ স্বয়ং সত্তায় গনী, তিনি উপকরণের স্রষ্টা। তার সম্পদের জন্য না কোন উপকরণ আছে আর না তার প্রয়োজন হয়।

পরবর্তী পর্ব—
বান্দার সম্পদ আল্লাহর দান

মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৪

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (৩১) বৈশিষ্ট্য অর্জনে মানবের বিভিন্ন পদ্ধতি



মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ১৩ 

📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ৩১)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

বৈশিষ্ট্য অর্জনে মানবের বিভিন্ন পদ্ধতি 
জেনে রেখোবৈশিষ্ট্য দুভাবে অর্জিত হয়। একটি পদ্ধতি হলজৈব শক্তিকে সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেলা। সে জন্যে এমন সব উপায়-উপকরণ ব্যবহার করা হয়যাতে ইন্দ্রিয়গুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। সে সবের তৎপরতা শেষ হয়ে যায়সেগুলোর জ্ঞান ও দহন উধাও হয়ে যায়। সার্বক্ষণিকভাবে দেহ ও মন সর্বশক্তিমানের দিকে নিবিষ্ট হয়। আত্মা সেই সব জ্ঞানই গ্রহন করে যা স্থান ও কালের সাথে কোনই সম্পর্ক রাখে না। যে সব বস্তুতে কোনই স্বাদ নেই তার ভেতরে সেই সব বস্তুর আকাঙ্ক্ষা জাগে। এমনকি সে লোকজনের সাথে মেলামেশা ছেড়ে দেয়। তাদের আকর্ষণের বস্তুগলো তার ভেতর বিকর্ষণ সৃষ্টি করে। তাদের ভয় পাবার জিনিসগুলোকে সে আদৌ ভয়ের চোখে দেখে না। জনমানব থেকে সে বিচ্চিন্নতা অবলম্বন করে। বিজ্ঞআলোকপ্রাপ্ত ও সুফী দরবেশগণ এই স্তরে পৌঁছার জন্য সচেষ্ট থাকেন। তবে তার ভেতরে খুব কম লোকই এ স্তরে পৌঁছতে পারেন। অন্যান্য সবাই সেটার আকাঙ্ক্ষা থাকে ও সর্বক্ষণ সেদিকে দৃষ্টি নিবন্ধ রাখে। তারপর কৃত্রিমভাবে সেরূপ হাবভাব প্রদর্শন করে। 
দ্বিতীয় পদ্ধতিতে জৈবিক শক্তিকে বিচ্ছিন্ন না করে তাকে পরিশুদ্ধ করা হয়। তার বক্রতা দূর করা হয়। কিন্তু তার মূল শক্তি বহাল থাকে। তখন অবস্থাটা এই দাঁড়ায় যেকোন এক বোবা লোক যেভাবে বাকসম্পন্ন লোকদের বলার ভংগীকে নকল করে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করেঠিক সেভাবেই জৈবিক শক্তিটি আত্মিক শক্তির কথা ও কাজকে অনুকরণ করে থাকে। যেমনকোন চিত্রকর কোন ব্যক্তির মনের অবস্থা যেমন ভীতিলজ্জা ইত্যাদি এমন ভাবে চিত্রিত করেন যা দেখামাত্র বুঝা যায়এও ঠিক তেমনি ব্যাপার। যেমনকোন সন্তানহারা জননী তার সন্তানের শোকে ইনিয়ে-বিনিয়ে দুর্বোধ্য ভাষায় যা কিছুই প্রকাশ করে তাতেই মানুষের ভেতর জননীর শোকটি রেখাপাত করে। এও ঠিক তেমনি ব্যাপার। 
যখন আল্লাহ পাকের ব্যবস্থাপনা এ সিদ্ধান্ত নেয় যেদুনিয়ার ব্যবস্থাপনার সব চাইতে প্রিয় ও সবচাইতে সহজ পদ্ধতিকে কাজে লাগানো হবেগোটা মানব জাতির সংস্কার ও তাদের সকল ব্যাপার পরিশুদ্ধির ব্যবস্থা করা হবে এবং তাদের ইহ ও পরকালের সামগ্রিক কল্যাণ দান করা হবেতাহলে পয়লা তিনি উপরোক্ত দ্বিতীয় পদ্ধটিটি কায়েমের ব্যবস্থা নেন। তখন সেদিকে মানুষকে ডাকার ও উদ্ধুদ্ধ করার জন্য দুনিয়ায় নবী-রাসূলদের পাঠান। তারপর পয়লা পদ্ধতিটির দিকে শুধুমাত্র প্রাসংগিক ইংগিত-ইশারা করে ছেড়ে দেন! পরিপূর্ণ দলীল-প্রমাণ শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত। 
খোলাসা কথা এই যেপয়লা পদ্ধতিটি শুধু তাদের জন্যে যাদের ভেতরে লাহুতী” আকর্ষণ সর্বাধিক! এ ধরনের লোকের সংখ্যা খুবই নগণ্য। এ পদ্ধতিটি পথ দেখান তারাই যারা সংসার জীবন ত্যাগ করে এবং দুনিয়ায় তাদের দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার দায়িত্ব থাকে না! অবশ্য এ পদ্ধতির পরিপূর্ণতা কখনও দ্বিতীয় পদ্ধীতর সামগ্রিক ব্যাপারটি সামনে না রেখে অর্জিত হয় না। তাছঅড়া এ পদ্ধতিতে কোন না কোন মানবিক গুণ ও বৈশিষ্ট্য থেকে বঞ্চিত হতে হয়। হয় তাব থেকে দুনিয়ার কোন সংস্কার সাধিত হবেনাহয়তো পরকলের জন্যে তার আত্মিক পরিশুদ্ধি ঘটবে না। যদি সবাই সে পথ ধরে তাহলে পৃথিবী বিরান হয়ে যাবে। যদি তা করার জন্যে লোকদের নির্দেশ দেয়া হয়তাহলে অসাধ্য সাধনের নির্দেশ দেয়া হয়। কারণকল্যাণকর ব্যবস্থাপনা মানবের স্বভাবজাত ব্যাপার বই নয়। তাই সমঝদার ও সংস্কারবাদী লোক দ্বিতীয় পদ্ধতি অনুসরণ করেন। তারাই দ্বীন দুনিয়ার নেতৃত্ব লাভ করেন। তাদের পদ্ধীতই কবুল হয় আর তাদের পদ্ধতিই অনুসৃত হয়। তাদেরই পদ্ধতির মাধ্যমে পূর্বসূরী পুণ্যাত্মাবৃন্দ ডান হাতে আমলনামা প্রাপকগণের সাফল্য অর্জন হয়েছে। এ শ্রেণীর লোকই দুনিয়ায় সর্বাধিক। এ পদ্ধতি মেধাবীনির্বোধব্যস্ত ও অবকাশ প্রাপ্ত সবারই অনুসরণযোগ্য। এতে কোন অসাধ্যতা ও কষ্ট নেই। আখেরাতের মুক্তির জন্যে নিজেকে যতখানি পরিশুদ্ধ ও সজ্জিত করা প্রয়োজন তা এতে রয়েছে। কারণএতে যে সব পুণ্য কাজে নির্ধারিত রয়েছে পারলৌকিক শান্তির জন্যে তা যথেষ্ট। এখন থাকে নিঃসঙ্গ থাকার বিধান। তা করবেগেলে পাওয়া যাবেযদিও স্বভাবতই সে সময়টি কারো জানা নেই। তাই কবি বলেন- 
সে দিন তোমার আসছে ধেয়ে 
যে দিনটিকে জানতে না
প্রস্তুতি যার রাখতেনা।। 
মোটকথা মানবিক কল্যাণ ও সৌভাগ্যের সব পদ্ধতি পূর্ণভাবে আয়ত্ত করা অধিকাংশ লোকের পক্ষে প্রায় সাধ্যাতীত ব্যাপার! তাই সে সব ব্যাপারে অজ্ঞতায় ক্ষতির কিছু নেই।

পরবর্তী পর্ব


হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (৩০) মানবিক বৈশিষ্ট্যের তারতম্য



মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ১১ 

📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ৩০)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

মানবিক বৈশিষ্ট্যের তারতম্য 
জেনে রেখোবীরত্ব ও অন্যান্য নৈতিক কল্যাণ সব মানুষের এক হয় না। তাতে মানুষে মানুষে বিভিন্নতা দেখা দেয়। কোন কোন মানুষের ভেতরে তো বীরত্ব গুণ একেবারেই অনুপস্থিত। হয়ত এমন কোন প্রতিকূল পরিবেশ তার অভ্যন্তরে বিরাজ করছে যার ফলে তার কাছ থেকে বীরত্ব আশাই করা যায় না। যেমননপুংসক কিংবা অত্যন্ত দুর্বল চিত্তের লোক বীরত্ব গুণ থেকে বঞ্চিত। কিছু লোক এমন আছে যেসাধারণত তারা বীর নয়কিন্তু সাহস সৃষ্টির কাজকথা ও সাহসী নেতৃত্বের আনুগত্য তাকে বীর বানায়। বীর নেতা ও সহকর্মীদের দৃষ্টান্তকথা ও কাজ তাকে বীরত্বপূর্ণ কাজে পা বাড়াতে উৎসাহিত করে। 
মূলতঃ বেশ কিছু লোক এমন রয়েছে যাদের ভেতরে সুপ্ত যোগ্যতা বিদ্যমান। তবে শুরুতে তা দেখাতে গিয়ে স্বভাতই ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকে। তখন যদি তাকে থামিয়ে দেয়া হয়তাহলে তার উৎসাহ দমে যায় ও অনিচ্ছা সত্ত্বেও চুপ হয়ে যায়। তখন যদি কেউ তার জন্মগত সুপ্ত প্রতিভার অনুরূপ কোন নির্দেশ দেয় তা তখন গন্ধ্রকে আগুন লাগার মতই জ্বলে ওঠে। 
কিছু লোক এমন রয়েছে যার ভেতরে বিশেষ কোন যোগ্যতা পূর্ণ মাত্রায়ই দেয়া হয়েছে। সে কখনও চুপ থাকতে পারবে নাতার জাগ্রত গুণ তাকে চাংগা করে সামনে এগিয়ে নেবে। সে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবেই ছুটে চলবে। কোন কাপুরুষ তাকে হাজার ডেকেও ফেরাতে পারবেনা। এমন কি সমাজের কোন রীতি-নীতির প্রতিকূলতা কিংবা অনুকূলতার তোয়াক্কা না করেই সে তার বিশেষ গুণের সহজ বাস্তবায়ন ঘটিয়ে চলে। এ ধরনের ব্যক্তিই উক্ত গুণের লোকদের নেতৃত্ব দেয়। তার কোন নেতা বা প্রশিক্ষকের প্রয়োজন দেখা দেয় না। যারা এ যোগ্যতায় তার চেয়ে পেছনেতাদের জন্য জরুরী হল তার পদ্ধতিরীতি-নীতিকার্যধারা অনুসরণ করা ও তার ঘটনাবলী স্মরণ করা! তাহলেই তার গুণকৃতিত্ব ও যোগ্যতার ততটুকু সে অর্জন করতে পারবে যতটুকু তার জন্যে নির্ধারিত রয়েছে। 
এভাবে মানুষের যোগ্যতার তারতম্যের প্রকৃতি ও পরিবেশগত অবস্থাও সক্রিয় থাকেযেমনখিযির (আঃ) যে ছেলেটিকে হত্যা করেছিলেন সে প্রকৃতিগতভাবেই কাফির ছিল। 
যেমন আল্লাহ বলেন, ‘সে বধিরবোবা ও অন্ধ তাই পথে আসবে না 
কিছু লোক এমন রয়েছেযার গুণ ও যোগ্যতা প্রকাশ না পেলেও সংস্কারের মাধ্যমে তা সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে। তবে সে জন্যে তার কঠোর সাধনা প্রয়োজন। তেমনি প্রয়োজন ক্রমাগত আমল করা। স্থায়ী আমলের প্রভাবে প্রবৃত্তি প্রভাবিক হয়। এ ধরনের লোকদের প্রয়োজন আম্বিয়ায়ে কেরামের প্রেরণাদায়ক দাওয়াত ও সংশোধন পদ্ধতি। এ ধরণের লোকই সর্বাধিক। আম্বিয়ায়ে কেরামের মিশনের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল এদের দিকেই। 
একদল লোক এমন রয়েছেযাদের ভেতর চারিত্রিক গুণাবলীর মৌল ভিত্তি প্রদত্ত হয়েছে। তাই তার কাজে ক্রটি-বিচ্যুতিও দেখা দেয়। কারণমূল গুণকে শাখা-প্রশাখায় ছড়িয়ে দিয়ে সকল কাজকর্ম সঠিকভাবে করার জন্য তার পথপ্রদর্শক গুরু’ প্রয়োজন। এদের দিকে লক্ষ্য করেই আল্লাহ এরশাদ করে, “অচিরেই তাদের প্রদীপ জ্বলে উঠবে যদিও তাতে এখনও আগুন লাগানো হয়নি। এদের লা হয় সাব্বাক! 
মানব জাতির একটি স্তর হল আম্বিয়ায়ে কেরামের। যাদের ভেতর মানবিক গুণাবলীর পূর্ণতা ঘটেছে। তাদের এ পূর্ণতা যথাযথভাবে অনুসরণ করঅনর্জিত গুণ অর্জন করাঅর্জিত গুণ বহাল রাখা ও অপূর্ণকে পূর্ণতার তালিম দেয়ার ব্যাপারে তাদের জন্য কোন পথ প্রদর্শক দরকার হয়নাএমন কি তাদের কারো কিছু বলতেও হয় না। তারা স্বভাব সুলভ ভাবে যা কিছু করেন তা অন্যদের জন্য অনুসরণযোগ্য বিধান ও পদ্ধতি হয়ে দাঁড়ায়। অন্য সব মানুষ তা স্মৃতিস্থ করে নিজেদের কর্মধারায় পরিণত করে। যখন কোন কর্মকারব্যবসায়ী ও তাদের মত অন্যান্য পেশাদার নিজেদের পেশা চালাতে গিয়ে পূর্বপুরুষ থেকে তা শিখে নিতে হয়তখনসেই উচ্চাংগের নৈতিক উৎকর্ষ অর্জন কি করে উৎকৃষ্ট ও পূর্ণাঙ্গের চরিত্রের মহাপুরুষদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ ছাড়া সম্ভব হতে পারেঅথচ তা শুধু চেষ্টায়ও হয় নাআল্লাহ পাকের তওফীক অর্জন ছাড়া। 
এ ব্যাপারটি এখন সুস্পষ্ট হয়ে গেল যেআম্বিয়ায়ে কেরামের মুখাপেক্ষী হওয়ার একান্তই অপরিহার্য। তাঁদের অনুসরণ করা ও তাঁদের বাণী অনুশীলন করা অত্যন্ত জরুরী। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


পরবর্তী পর্ব
মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ১২ 
বৈশিষ্ট্য অর্জনে মানবের বিভিন্ন পদ্ধতি 

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (২৯) মানবিক বৈশিষ্ট্য, বৈশিষ্ট্যের তাৎপর্য



মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ১১ 

📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ২৯)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

মানবিক বৈশিষ্ট্যবৈশিষ্ট্যের তাৎপর্য 
জেনে রেখোমানুষের কিছু বৈশিষ্ট্য এমন যেতা মানুষ হিসেবে সে প্রকৃতিগত ভাবেই পেয়ে থাকে। তেমনি কিছু বৈশিষ্ট্য তার বৈষয়িক। যা তার পারিপার্শ্বিকতা ও দূরবর্তী কোন প্রভাব থেকে অর্জিত হয়। মানবিক সচ্চরিত্রতা ও বিবেক যে ব্যাপারটিকে অত্যধিক গুরুত্ব দেয় ও লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নেয় তা হলো মানবিক পরিপূর্ণতা বা পূর্ণাঙ্গ মানবতা। 
কারণকখনও কারও এমন কিছু নিয়ে প্রশংসা করা হয়যা তার প্রকৃতিগত অবয়বের সাথে সংশ্লিষ্ট। যেমনতার দৈহিক উচ্চতা কিংবা দেহের বিশালত্বের প্রশংসা। সেটাকেয দি কৃতিত্ব বলা হয়তাহলে সে কৃতিত্বের পূর্ণতা দেখতে পাবে সুউচ্চ ও সুবিশাল পাহাড়-পর্বতে। কখনও কাউকে প্রশংসা করা হয় এমন কিছুর জন্যে যা গাছ-পালায়ও দেখতে পাওয়া যায়। যেমনকারো দ্রুত বর্ধন ডগমগে চেহারাসুন্দর গড়ন ইত্যাদির জন্যে। সেটাই যদি কৃতিত্ব হয়তাহলে লালা কিংবা গোলাপফুল সে কৃতিত্বের সর্বাধিক দাবীদার। কখনও কাউকে এমন কিছুর জন্যে প্রশংসা করা হয়যা জীব-জন্তুর ভেতরেও পাওয়া যায়। যেমনদৈহিক শক্তিসুউচ্চ কণ্ঠখাওয়াশক্ত হাতে পাঞ্জা লড়াজেদী ও প্রতিদ্বন্দ্বীতাপরায়ণ হওয়া ইত্যাদি। যদি সেটাকে কৃতিত্ব বলা হয় তা হলে গাধাকে সেক্ষেত্রে সর্বাধিক কৃতিত্বের দাবীদার বলতে হয়। হ্যাঁকখনও কাউকে এমন কিছুর জন্যে প্রশংসা করা হয়যা শুধু মানুষের মধ্যেই পাওয়া যায়। যেমনমার্জিত চরিত্রউত্তম কর্মধারাউন্নতমানের গুণাবলীউচ্চাংগের শিল্প-নৈপুণ্য ও সুউচ্চ মর্যাদা ইত্যাদি। 
মূলত এগুলোকেই বলা হয় মানবিক যোগ্যতা ও কৃতিত্ব। প্রত্যেক জাতির জ্ঞানী মনীষীগণ এগুলোকেই লক্ষ্য বানিয়ে নেন এবং এসব ছাড়া অন্য যেসব গুণের কথা বলা হয়েছেতারা সেগুলোকে আদৌ কোন প্রশংসনীয় গুণ বলে মনে করেন না। অবশ্য এখনও বিষয়টি সুস্পষ্ট ও পরিশীলিত হয়নি। কারণসে গুণাবলীর মূল বস্তু প্রতিটি জীবের ভেতরই পাওয়া যায়। যেমনবীরত্বের মূলে রয়েছে ক্রোধ সহকারে প্রতিশোধ নেয়াপ্রচণ্ড ভাবে অগ্রসর হওয়া ও বিপজ্জনক কাজে পা রাখা। অথচ এগুলো পুরুষ জীবজন্তুর ভেতরে যথেষ্ট দেখা যায়। কিন্তু সেটাকে তখনই বীরত্ব বলা হয়যখন কোন মানুষ অত্যন্ত বিজ্ঞতার সাথে কল্যাণকর পথে সেগুলোর উপস্থাপনাবাস্তবায়ন ঘটায়। তেমনি কলাকৌশল ও কারিগরী কাজের মূল বস্তু জীব জন্তুর ভেতরেও দেখা যায়। 
বাউউ পাখী তার নিজের বাসা তৈরী করে। কোন কোন জীবতো স্বভাবগত ভাবে এমন শিল্পকর্ম দেখায় যা মানুষকে অনেক কষ্ট করেও সেরূপ করতে ব্যর্থ হতে হয়। 
এ থেকে বুঝা গেল যেসেগুলোও মানুষের মূল কৃতিত্ব বা মৌলিক গুণ নয়বরং সেগুলোও প্রকৃতিগত কৃতিত্বের অন্তর্ভুক্ত! মানুষের মূল কৃতিত্ব বা গুণ হল তার ভেতরকার পশু প্রকৃতিতে মানব প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণে রাখাপ্রবৃত্তির তাড়নাকে বিবেক-বুদ্ধির বশীভূত রাখা। তারই ফলে মানুষ জীব জগতে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও কৃতিত্বের অধিকারী হয়ে থাকে। 
জেনে রেখোমানবিক মূল গুণের সাথে যেসব ব্যাপার সম্পৃক্ত তা দুশ্রেণীতে বিভক্ত। একটি হচ্ছে মানবের জৈবিক প্রয়োজনের কাজগুলো দ্বারা আপন উদ্দেশ্য হাসিল সম্ভব হয় নাবরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসবের চাকচিক্যের মোহে ডুবে আসল উদ্দেশ্য বিস্মৃত হয়। এটা যেমন আংশিক লাভেল আশায় সামগ্রিক লাভ থেকে বঞ্চিত হওয়া। এসব ক্ষুদ্র কৃতিত্ব মূল কৃতিত্বের পরিপন্থী হয়ে থাকে। যেমনকোন লোক নিজের উত্তেজনা সৃষ্টি করে ও কুস্তী লড়ে লড়ে বীরত্ব অর্জন করতে চায়কিংবা আরবী কবিতা ও ভাষণ মুখস্ত করে বিশুদ্ধ আরবী ভাষী হতে চায়। 
মানব চরিত্রের প্রকাশ ঘটে তার স্বজাতির সাথে ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে। তেমনি মানুষের কর্ম কৌশল উদ্ভাবিত হয় তার প্রয়োজনাদি মেটাবার গরজে। তেমনি শিল্প কার্যের প্রয়োজনে যন্ত্রপাতি আবিস্কৃত হয়। তবে এসব কিছুই জীবন সাংগ হবার সাথে সাথেই শেষ হয়ে যায়। তাই কোন ব্যক্তি যদি এ অসম্পূর্ণ গুণ নিয়ে এমনকি তার সাথে সম্পৃক্ত অস্থায়ী ব্যাপারগুলোর প্রতি অসন্তোষ নিয়েও মারা যায়তথাপি সে মানবিক মূল গুণ থেকে বঞ্চিত থেকেই চলে যায়। 
তারপর যদি তার অসম্পূর্ণ গুণ ও কার্যাবলীর পেছনে প্রবৃত্তির তাড়না সৃষ্ট সংকীর্ণ স্বার্থান্ধতা সক্রিয় থেকে থাকেতাহলে তো লাভের বদলে শুধুই ক্ষতি হল। 
দ্বিতীয় শ্রেণী হলসে ব্যাপারগুলো যার প্রভাবে তার ভেতরকার পশু স্বভাব ফেরেশতা স্বভাবের অনুগত হয়ে যায়সেটার নির্দেশেই চলে আর তারই রঙে রঞ্চিত হয়। তার ফেরেশতা স্বভাবটি এরূপ শক্তিশালী হতে হবে যা বিন্দুমাত্র পশু স্বভাবের প্রভাব মেনে নেবেনা। কোনমতে সেটার হিংসার ছাপ তার ওপর পড়বে না। মোমের ওপর আংটির ছাপ যেভাবে পড়ে সে ভাবে কোন মতেই পশু স্বভাবের ছাপ ফেরেশতা স্বভাবের ওপর যেন না পড়েতার উপায় হল এইযখনই আত্মিক শক্তিটির কোন কিছুর প্রয়োজন দেখা দেয় আর তা সে তার দৈহিক শক্তির নিকট কামনা করেতখন জৈবিক শক্তির কাজ হবে সে নির্দেশ পালন করা এবং কোন মনে তা অমান্য না করা। এভাবে আত্মিক শক্তির প্রতিটি নির্দেশ যদি জৈবিক শক্তি পালন করতে থাকেতাহলে সে স্বভাবতই সেগুলোয় অভ্যস্ত হয়ে যাবে। ফলে সে নিজেই সেগুলোর আকাঙ্ক্ষা হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে যে কাজগুলো ফেরেশতা স্বভাব কামনা করে তার পশু স্বভাব তা বাধ্য হয়ে মেনে নেয়তখন স্বভাতই প্রথমটি সন্তুষ্ট এবং দ্বিতীয়টি অসন্তুষ্ট হয়। এ ব্যাপারটি যে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব মেনে চলে বহিঃশক্তির গতিবিধির প্রতি লক্ষ্য করা। এটাও ফেরেশতা স্বভাত বা বিবেকেরই বৈশিষ্ট্যপশু স্বভাব বা প্রবৃত্তি এ বৈশিষ্ট্য থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। 
যখন এ অবস্থা দাঁড়াবে যেপশু প্রবৃত্তি তার বাসনা-কামনাস্বাদ-আহলাদ ও আসক্তি-আকর্ষণ বর্জন করবেতখন তার নাম দেয়া হবে ইবাদাত ও বিয়াযাত বা উপাসনা ও সাধনা। এটাই মানুষের সেই মূল চরিত্র অর্জনের মাধ্যমে হয় যা তার ভেতরে অনুপস্থিত। এ মাকাম বা পর্যায়ের তাৎপর্য এই দাঁড়ালমানবের সত্যিকারের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ইবাদত ছাড়া অর্জিত হয় না। 
এ কারণেই ব্যক্তি মানবের সামগ্রিক কল্যাণের ব্যাপারে মানবিক সত্তার মৌল আলোক বর্তিকা ডাক দিয়ে বলে ও কঠোরভাবে নির্দেশ দেয় যেব্যক্তি মানুষের দ্বিতীয় পর্যায়ের পূর্ণতার জন্যে প্রয়োজন মোতাবেক নির্ধারিত গুণের পরিমার্জন ও উন্নয়ন চাই। সে জন্যে স্বীয় প্রকৃতিকে পরিশোধিত ও সুসজ্জিত করে নিজেকে উচ্চ পরিষদের সদস্যদের পর্যায়ে উন্নীত করাকে জীবনের মূল লক্ষ্য ও সাধনা বলে স্থির করতে হবে। এমন কি নিজের ভেতরে এরূপ যোগ্যতা সৃষ্টি করতে হবে যার ফলে জৈবিক ও আত্মিক উভয় শক্তির ভারসাম্যের প্রভাব সে বিমণ্ডিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে জৈবিক শক্তি আত্মিক শক্তির নির্দেশে পরিচালিত হবে এবং সে ফেরেশতা স্বভাতের মূর্তরূপ ধরে প্রতিভাত হবে। কোন মানুষ যখন সুস্থ মানসিকতার অধিকারী হয়আরতার অস্তিত্ব যখন মানবিক বিধি-বিধান পুরোপুরি ধারণের যোগ্য হয়ে যায়তখন সে উক্ত দুর্লভ গুণ বা বৈশিষ্ট্যের জন্য উদগ্রীব হয়। লোহকে যেভাবে চুম্বক টেনে নিয়ে যায়ঠিক তেমনি তখন সেই ব্যক্তি সত্তাকে উক্ত গুণটি টেনে নেয়। এটা একটা প্রকৃতিগত অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। আল্লাহ পাক এ স্বভাব দিয়েই মানুষ সৃষ্টি করেছেন। 
তাই দেখা যায়যখন কোন জাতি উক্তরূপ ভারসাম্যপূর্ণ স্বভাব আয়ত্ত করে ফেলেতখন তাদের ভেতর এরূপ মনীষী অবশ্যই দেখা দেয় যিনি তাদের সেই প্রশংসনীয় চরিত্রকে পূর্ণথায় পৌঁছে দিতে যত্নবান হন। মূলত সেটাকেই তখন তারা সর্বোচ্চ সৌভাগ্য বলে ভেবে থাকে। রাষ্ট্রনায়ক ও প্রশাসনের দৃষ্টি সে দিকেই থাকে। জনগণও তাদের প্রভাবে অনুরূপ গড়ে উঠে। সমগ্র দুনিয়ায় তারা মানবতার অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে বিরাজ করে। সে দেশে সরকার ও জনতা তখন ফেরেশতাদের দলে শামিল হয়ে যায়। সে দেশের মানুষ ও পুণ্যময় অনুশাসনের বরকতে ধন্য হয়ে চলে। দেশে দেশে তাদের স্বাগত সম্ভাষণ শুরু হয়ে যায়। একমাত্র মানবতার সহজাত মানসিক বিধি-বিধান ছাড়া আরব-আজমসাদা-কালোধার্মিক-অধার্মিককাছের-দূরেরউঁচু-নীচু সর্বস্তরের সকল দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার আর কোন বিধি-বিধান রয়েছে কীনেইতা থাকতেও পারে না। এক মাত্র মানবিক মৌলিক গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যের ওপরেই দুনিয়ার সকল মানুষকে একমত করা যেতোকারণতুমি দেখতে পেলে যে প্রতিটি মানুষের ভেতর ফেরেশতা স্বভাবের বিবেক বিদ্যমান। তাদের মর্যাদা যে কত বড় আর তাদের ভেতরকার উত্তম চরিত্রের লোকদের আসন যে কত ঊর্ধ্বে তাও তুমি দেখতে পেয়েছ। আল্লাহই সর্বশক্তিমান।

পরবর্তী পর্ব
মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ১২ 
মানবিক বৈশিষ্ট্যের তারতম্য

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...