বৃহস্পতিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- (৩৭) কিয়ামতের দিন আমলনামা উন্মুক্ত হইবার বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৩৭)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

কিয়ামতের দিন আমলনামা উন্মুক্ত হইবার বিবরণ-
হযরত আবুযর (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, জনাব নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “প্রত্যেক লোকের জন্য প্রত্যহ একটি নূতন আমলনামা তৈরি হয়। যে লোক কেবল গুনাহই করে, তাওবাহ করে না, তাহার সেইদিনের আমলনামা অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে। কিন্তু যে লোক তাওবাহ এস্তেগফার করে আল্লাহ তায়ালা তাহার গুনাহসমূহ ক্ষমা করিয়া দেন যার ফলে তাহার আমলনামা উজ্জ্বলভাবে বিকশিত হয়।"

প্রখ্যাত ফকীহ আবু লাইছ সমরকন্দি (রহঃ) বলিয়াছেন, প্রত্যেক লোকের সহিত দুইজন ফেরেশতা থাকেন। তাহারা দিন-রাত সেই লোকের তত্ত্বাবধান করেন। তাহারা তাহার নিশ্বাস-প্রশ্বাস, নেক-বদ, ন্যায়-অন্যায়, আনন্দ-তামাসা ইত্যাদি প্রত্যেক কৃতকার্য লিখিয়া রাখেন। যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “আর নিশ্চয়ই তোমাদের সহিত দুইজন তত্ত্বাবধানকারী রহিয়াছেন।” তাহারা প্রতিদিন সকাল-বিকাল তাহার কৃতকার্য আল্লাহর নিকট পেশ করেন। তাহা ছাড়া ১৫ই শাবান রাত্রে, শবে বরাত ও শবে কদরের রাত্রে পূর্ণ বৎসরের আমলনামা জমায়েত করা হয় আর বাহুল্য বাক্যগুলি নিশ্চিহ্ন করিয়া শীলমোহর করতঃ সযত্নে রাখা হয়। 

যখন বান্দার জান কবজ শুরু হয়, তখন সেইগুলি একত্রিত করতঃ মৃত্যুর পর কণ্ঠহারের মত গলায় ঝুলাইয়া দেওয়া হয়। কবরে উহা তাহার গলায় ঝুলিতে থাকে। যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “আর প্রত্যেক লোকের আমলনামা তাহার গলায় লটকাইয়া দেওয়া আমাদের উপর অপরিহার্য করিয়াছি।” অর্থাৎ প্রত্যেকের আমলনামা প্রকৃতই তাহার গলায় ঝুলাইয়া দেওয়া হয়। হার এবং তৌক যেমন গলার সৌন্দর্য পরিবর্ধিত করে তেমনি আমলনামাও উহাতে পরান হয়। রোজ কিয়ামতে আল্লাহ বান্দার আমলনামা প্রকাশ করিবেন। সে তাহার আমলনামা খোলা দেখিতে পাইবে। তখন তাহাকে বলা হইবে যে, তুমি উহা পাঠ কর। সে উহা পাঠ করতঃ নিজের কৃত নেক-বদ দেখিয়া নিজের সম্পর্কে ভালমন্দ কল্পনা করিতে সক্ষম হইবে।

রোজ কিয়ামতে যখন আল্লাহ পাক হিসাব-নিকাশ লইতে ইচ্ছা করিবেন, তখন , শিলাবৃষ্টির ন্যায় প্রত্যেকের আমলনামা তাহার উপর পতিত হইবে। তখন ফেরেশ্তা ঘোষণা করিবেন, “হে অমুক! তুমি নিজের আমলনামা ডাহিন হাতে গ্রহণ কর। হে অমুক! তুমি নিজের আমলনামা বামহাতে গ্রহণ কর। হে অমুক! তুমি নিজের আমলনামা পিছনের দিক হতে বামহাতে গ্রহণ কর।” সেদিন পুণ্যবান বান্দাই কেবল ডাহিন হাতে তাহার আমলনামা লাভ করিবে। গুনাহ্গার পাপী বামহাতে আমলনামা পাইবে। আর কাফের বেদ্বীন পশ্চাৎ দিক হইতে আমলনামা গ্রহণ করিবে। যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “সুতরাং যাহার আমলনামা ডাহিন হাতে দেওয়া হইবে, তাহার হিসাব সহজে তাড়াতাড়ি হইবে এবং সে আনন্দিতচিত্তে স্বীয় পরিবার-পরিজনদের নিকট প্রত্যাবর্তন করিবে।” এই হিসাবে দেখা যায় হাশর মাঠে মানুষ তিন শ্রেণীতে বিভক্ত হইবে। কাফের বেদ্বীন বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্তশীল হইবে। ধর্মপ্রাণ মুমিন বান্দাদের হিসাব অতি তাড়াতাড়ি হইবে, গুনাহগারদের হিসাব অত্যন্ত কঠিনভাবে শেষ হইবে এবং শাস্তি ভোগ করতঃ পরিণামে চিরস্থায়ী দোযখ হইতে মুক্তি পাইবে। 

নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হইতে আরও বর্ণিত আছে যে, “মানুষ ঐ পর্যন্ত আল্লাহর সামনে দাঁড়াইয়া থাকিবে, যে পর্যন্ত না আল্লাহ তাহাকে জিজ্ঞাসা করিবেন, “হে বান্দা! তুমি কত বয়স পাইয়াছ এবং উহা কি কাজে খরচ করিয়াছ?” 

তারপর আল্লাহ তাহার আমলনামা পরীক্ষা করিয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিবেন, “বল, ইহাতে যাহা আছে, এই , সমস্তই তুমি করিয়াছ, না আমার ফেরেশ্তাগণ ইচ্ছামত নিজেরা ইহা লিখিয়াছে।” বান্দা বিনয়ের সহিত উত্তর করিবে, “না, আল্লাহ! আমি নিজেই এই সমস্ত কাজ করিয়াছি।” পরিশেষে আল্লাহ তাহাকে বলিবেন, “হে বান্দা! পৃথিবীতে আমি এই সমস্ত গোপন রাখিয়াছি! যাও, আজ আমি তোমাকে মাফ করিলাম। আজ তুমি নির্বিঘ্নে বেহেশতে দাখিল হও। আজ সমস্তই মাফ করিয়া দিলাম।" আল্লাহর করুণায় এই ব্যক্তি জিজ্ঞাসাবাদের পর মুক্তি পাইবে! আর যাহার হিসাব সহজ হইবে, তাহার সম্পর্কে আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন যে, “যাহার আমলনামা ডাহিন হাতে দেওয়া হইবে, তাহার হিসাব অতি তাড়াতাড়ি হইবে। এই সম্পর্কে কেহ হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)কে জিজ্ঞাসা করিল, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! সহজ হিসাব কিরূপ হইবে?" উত্তরে আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “বান্দা তাহার আমলনামার দিকে চাহিয়া থাকিবে আর তখনই তাহাকে ক্ষমা করিয়া দেওয়া হইবে।” হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, রোজ কিয়ামতে আল্লাহ পাক মুমিন বান্দাদের সঙ্গে এমন আচরণ করিবেন, যেমন হযরত ইউছুফ (আঃ) স্বীয় ভাইদের সহিত করিয়াছিলেন। তিনি তাহাদিগকে বলিয়াছিলেন, “আজ তোমাদের দোষ ধরা হইবে না।” অনুরূপভাবে আল্লাহ পাক বলিবেন, “হে আমার বান্দা! তুমি দুনিয়াতে কি কাজ করিয়াছ জান?” উত্তরে 'জানি' অথবা 'জানিনা' বলিবার সাহস কাহারও হইবে না। আরও আছে যে, আল্লাহ পাক যখন হিসাব-নিকাশে মনোনিবেশ করিবেন, আল্লাহ পাকের পক্ষ হইতে কেহ উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করিবেন, “হে কোরায়েশ বংশীয় নবী! আজ আপনি কোথায়?” ইহা শ্রবণান্তে নবী পাক (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরশের নীচে গমন করিয়া আল্লাহর এত তারীফ ও তাস্বীহ পড়িবেন যে সমস্ত সৃষ্ট প্রাণী আশ্চর্যান্বিত হইবে। তারপর হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিজ উম্মতদিগকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত না করার জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করিবেন। আল্লাহ পাক তাঁহার উম্মতগণকে হাজির করিতে নির্দেশ দিবেন। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাহাদিগকে তখনই আল্লাহর সামনে উপস্থিত হইতে বলিবেন। তাহারা তখনই নিজ নিজ কবরের উপরে দাঁড়াইয়া থাকিবে। সেই অবস্থায়ই আল্লাহ তাহাদের হিসাব লওয়া শুরু করিবেন। তন্মধ্যে যাহাদের হিসাব আল্লাহ সহজ করিবেন তাহাদের উপর তিনি ক্রোধান্বিত হইবেন না। তাহাদের গুণাহগুলিকে তিনি তাহাদের আমলনামার ভিতরে এবং নেকগুলিকে উহার উপরে রাখিবেন এবং তাহাদের মস্তকে হীরা ও মণিমুক্তা খচিত একটি তাজ ও প্রত্যেককে সত্তরটি বেহেশ্তী পোশাক পরিধান করাইবেন। তাহা ছাড়া সোনা, রূপা ও মতির তিনটি কঙ্কন দ্বারাও তাহাদিগকে সৌন্দর্য মন্ডিত করিবেন। তারপর তাহারা স্বীয় মুমিন ভ্রাতৃগণের সহিত দেখা করিতে যাইবে, কিন্তু তাহারা তাহাদিগকে চিনিতে অক্ষম হইবে। তখন তাহাদের ডাহিন হাতে আমলনামা চমকাইতে থাকিবে। উহাতে তাহাদের পুণ্যকর্মাদি ও দোযখের আযাব হইতে নিস্তার লাভের সুসংবাদের সঙ্গে অনন্তকাল বেহেশতে অবস্থানের হুকুম লেখা থাকিবে। তাহারা স্বীয় বন্ধুদিগকে জিজ্ঞাসা করিবেন, “তোমরা কি আমাকে চিনিতে পার নাই? আমি অমুকের তনয় অমুক। আল্লাহ পাক আমাকে মর্যাদা দান করিয়াছেন, দোযখের শাস্তি হইতে পরিত্রাণ দিয়াছেন এবং অনন্তকাল বেহেশতে অবস্থান করিবার এজাজত দিয়াছেন।”

অপর সম্প্রদায়কে বামহস্তে আমলনামা দেওয়া হইবে এবং তাহাদের গুনাহগুলি আমলনামার প্রথম দিকে সাজানো থাকিবে। পরিণামে তাহাদিগকে কঠিন আযাব ভোগ করিতে হইবে। তাহাদের সৎকাজ ও পুণ্যগুলি হিসাবে ধরা হইবে না। তাহাদের প্রত্যেকটি দাঁত মক্কা ও মদীনার কোবায়েছ ও ওহোদ পাহাড়ের মত বড় হইবে। আগুনের টুপী ও গলানো তামার পোশাক তাহাদিগকে পরান হইবে। তাহাদের গলদেশে গন্ধকের পাহাড় কষিয়া বাঁধিয়া জ্বলন্ত অনলকুন্ডে ফেলা হইবে। তাহাদের উভয় হাত ঘাড়ের উপর দিয়া বাঁধিয়া দেওয়া হইবে। যখন তাহারা স্বীয় বন্ধুদের সহিত দেখা করিতে যাইবে, তখন উহারা ভয়ে পলায়ন করিবে এবং তাহাদিগকে চিনিতে সক্ষম হইবে না। তখন তাহারা সকলেই বলিতে থাকিবে, “আমি অমুকের ছেলে অমুক।" পরিশেষে কাফেরদিগকে ফেরেশতাগণ নীচুমুখ করিয়া দোযখে নিক্ষেপ করিবে। তাহারা স্বীয় আমলনামা পশ্চাদ্দিক হইতে বামহস্তে লাভ করিবে। যেমন, নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “যখন কাফেরদিগকে নাম ধরিয়া হিসাব-নিকাশের জন্য ডাকা হইবে, তখন একজন আযাবের ফেরেশ্তা তাহার বুক চিরিয়া পশ্চাদ্দিকে তাহার হাত বাহির করিয়া তাহার আমলনামা দিবে।” নাউজু বিল্লাহি মিন্‌হু!

পরবর্তী পর্ব-
তুলাদণ্ড বা মিজান খাঁড়া করিবার বিবরণ-

দাকায়েকুল আখবার- (৩৬) ইহকালে ও পরকালে মানুষের উপর আপতিত দুঃসময়



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৩৬)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ইহকালে ও পরকালে মানুষের উপর আপতিত দুঃসময়
হাদীস শরীফে আছে যে, 'জান কবজের সময় যখন মানুষের চক্ষুদ্বয় ফাটিয়া যায়, নাসিকারন্ধ্র বিস্তারিত হয়, ওষ্ঠদ্বয় লটকাইয়া যায়, গগুদ্বয় বিবর্ণ হইয়া যায়, নখগুলি সবুজ রং হয়, মুখমন্ডল ঘামে ভিজিয়া যায়, কোমল দেহ শক্ত হইয়া যায়, বাকশক্তি রুদ্ধ হইয়া আসে, বান্দা উত্তর দিতে ও কথা বলিতে অসমর্থ হয়, সে নিজের কৃত নেক-বদ ও পরিত্যক্ত ধন-সম্পদ দেখিতে থাকে এবং অতীতাবস্থা অনন্তে মিলিয়া যায়, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জোড়াগুলি শিথিল হইয়া পড়ে, সমস্ত আশা-ভরসা বিনষ্ট হয়, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ স্থানচ্যূত হয়, আত্মীয়-স্বজন কাটিয়া পড়ে, সেই সময়ের যাতনার তুল্য কষ্ট কখনও আর হয় না।' তখন সে এতই ব্যস্ত হয় যে, তাহার জ্ঞান লোপ পায়। সেই সময় ঈমান নষ্ট করিবার জন্য শয়তান চক্রান্ত করিতে থাকে। অতএব মৃত্যুর জন্য এই সময়টাই অত্যন্ত ভীতিপ্রদ হয়। তখন তাওবাহর দরজা বন্ধ হইয়া যায়। তখন কালেমা শাহাদাত পাঠ করার মত উত্তম আমল আর নাই। অধিকন্তু পরকালে যখন পুনরুত্থানের জন্য সিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হইবে, সেই সময়ও মুর্দারের জন্য অত্যন্ত ভীতিপ্রদ। তখন সকলেই নগ্নদেহে কবর হইতে উঠিবে। অত্যাচারিত ব্যক্তি অত্যাচারীকে ধরিয়া আল্লাহর নিকট উপস্থিত করিবে। সেইদিনের অবস্থা এত ভয়াবহ হইবে যে, আল্লাহ নিজে গুনাহগারদিগকে সওয়াল করিবেন এবং ফেরেশতাগণ ইহার সাক্ষ্য দিবে। অবশেষে আল্লাহ পাক বদকারদিগকে দোযখে কঠিন শাস্তির জন্য প্রেরণ করিবেন এবং নেককারদিগকে বেহেশতে অফুরন্ত সুখে বসবাস করিতে হুকুম দিবেন। সেই ভীষণাবস্থা প্রত্যক্ষ করিয়া গর্ভবতীর গর্ভ নষ্ট হইয়া যাইবে। মানুষ উন্মাদের মত বিক্ষিপ্তভাবে দৌড়াদৌড়ি করিতে থাকিবে। তাহারা এই সকল আযাবের ভয়ে চীৎকার করিবে। তখন বালক বৃদ্ধে পরিণত হইয়া যাইবে। সেইদিন সম্বন্ধে আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “দ্বিতীয় ফুৎকার একটি কঠিন শব্দ ছাড়া কিছুই নহে।” আরও এরশাদ হইতেছে, “সেইদিন কাফেরদিগকে দোযখের দিকে দলে দলে হাঁকাইয়া নেওয়া হইবে এবং মোত্তাকীদিগকে দলে দলে জান্নাতের দিকে পরিচালিত করা হইবে।”

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, রোজ হাশরে সাতটি জিনিস মানুষের স্বপক্ষে অথবা বিপক্ষে সাক্ষ্যদান করিবে। (১) স্থান-যেমন আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “যেদিন তাহার কর্মস্থল নেক-বদের সাক্ষ্য দান করিবে।” (২) সময়-যেমন হাদীস শরীফে আছে, “সময়ের প্রত্যহ উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা।” (৩) জিহ্বা-যেমন আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “যেদিন তাহাদের হস্ত-পদ ও জিহ্বা তাহাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যদান করিবে ।” (৪ ও ৫) কেরামান কাতেবীন-যেমন আল্লাহ পাক এরশাদ করিয়াছেন, “আর নিশ্চয়ই তোমাদের সহিত কেরামান কাতেবীন নামক দুইজন মর্যাদাশীল তত্ত্বাবধায়ক ফেরেশ্তা রহিয়াছেন, যাহারা তোমাদের আমল সম্পর্কে পরিজ্ঞাত।” (৬) আমলনামা - যেমন আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন- “ইহাই আমাদের দপ্তর, যাহা তোমাদের সম্পর্কে যথার্থ সত্য নির্ধারণ করিয়া থাকে।” (৭) রাওহান ফেরেশ্তা-যেমন আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “আমি তোমাদের কৃতকর্মের সাক্ষী ছিলাম।” সুতরাং হে গুনাহগার! চিন্তা কর, তখন তোমার অবস্থা কিরূপ হইবে, যখন তাহারা তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে?

পরবর্তী পর্ব-
কিয়ামতের দিন আমলনামা উন্মুক্ত হইবার বিবরণ

দাকায়েকুল আখবার- (৩৫) বেহেশতকে হাজির করিবার বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৩৫)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বেহেশতকে হাজির করিবার বিবরণ-
আল্লাহ পাক এরশাদ করিয়াছেন, “বেহেশতকে মোত্তাকীগণের জন্য হাজির করা হইবে এবং পথভ্রষ্টদের জন্য দোযখকে খোলা হইবে।”

হাদীস শরীফে আছে যে, “রোজ কিয়ামতে আল্লাহ পাক হযরত জিব্রাইল (আঃ) কে বলিবেন, 'হে জিব্রাইল! মোত্তাকীদের জন্য বেহেশতকে নিকটবর্তী কর এবং পথভ্রষ্টদের জন্য দোযখকে উন্মুক্ত কর।' তখন বেহেশ্তকে আরশের দক্ষিণ দিকে এবং দোযখকে উত্তর দিকে হাজির করা হইবে। তারপর দোযখের উপরে পুলছিরাতকে স্থাপন করা হইবে এবং মিজানকে খাড়া করা হইবে এবং আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম সফিউল্লাহ, ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ, মূসা কালিমুল্লাহ, ঈসা রূহুল্লাহ ও তাঁহার প্রিয় হাবীব মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে মিজানের উত্তর দিকে দাঁড়াইতে নির্দেশ দিবেন আর বেহেশতের দারোগা, রেদওয়ান (আঃ) ও দোযখের দারোগা মালেক (আঃ) কে বেহেশত ও দোযখের দ্বারগুলি উন্নমুক্ত করিতে বলিবেন। পরিশেষে রহমতের ফেরেশতাদিদকে বেহেশতি লেবাছ ও আযাবের ফেরেশতাদিগকে জিঞ্জির, তৌক ও কাত্রান বিরঞ্জিত লেবাছ লইয়া আসিতে নির্দেশ দিবেন। তখন কেহ ঘোষণা করিবে, “হে আদম সন্তান! মিজানের দিকে তাকাও, অমুকের তনয় অমুকের পাপ-নেক ওজন করা হইতেছে।" আরও ঘোষণা করা হইবে যে, “হে বেহেশ্তীগণ! চিরতরে বেহেশতে দাখিল হও এবং হে দোযখীগণ! তোমরাও চিরতরে দোযখে প্রবেশ করিয়া আযাব ভোগ করিতে থাক। তোমাদের আর মৃত্যু হইবে না।” যেমন আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন,-“ওয়া আজির হুম্ ইয়াওমাল্ হাছরাতি ইজ কাদ্বাল্ আমরু” অর্থাৎ হে মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ! মানব সম্প্রদায়কে সেই অনুশোচনার দিন সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শন করুন, যেদিন আল্লাহ পাক মীমাংসার নির্দেশ প্রদান করিবেন।

পরবর্তী পর্ব-
ইহকালে ও পরকালে মানুষের উপর আপতিত দুঃসময়

দাকায়েকুল আখবার- (৩৪) প্রাণী জগতকে একত্রিত করিবার বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৩৪)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

প্রাণী জগতকে একত্রিত করিবার বিবরণ-
হাদীস শরীফে আছে যে, রোজ কিয়ামতে আল্লাহ পাক সমস্ত পূর্ববর্তী ও পরবর্তী প্রাণী জগতকে হাশর ময়দানে জড়ো করিবেন। তখন সূর্য তাহাদের মাথার উপর চলিয়া আসিবে এবং উহার প্রখর উত্তাপে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হইবে। তারপর হাতির শুড়ের ন্যায় একটি ছায়া দোযখের মধ্য হইতে প্রকাশ পাইবে। তখন ঘোষণা করা হইবে, “হে প্রাণী জগত! তোমরা ছায়ার নিচে গমন কর।” তখন মুমিন, কাফের ও মোনাফেক এই তিন শ্রেণীতে বিভক্ত হইয়া লোকজন সেইদিকে অগ্রসর হইবে, তাহারা ছায়ার নিকটবর্তী পৌঁছিলে উহা নূরের জ্যোতি, উষ্ণ ও ধোঁয়া তিনটি শাখায় বিভক্ত হইয়া যাইবে। যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন,- “ইত্ত্বালিকু ইলা জিল্লিজি ছালাছি শাব” অর্থাৎ তিন শাখাযুক্ত ছায়ার দিকে অগ্রসর হও। তন্মধ্যে উষ্ণশাখা মুনাফেকদিগকে, ধোঁয়া শাখা কাফেরদিগকে এবং নূরের জ্যোতি মুমিনদের ছায়া দান করিবে। পৃথিবীতে সামান্য গরমের মধ্যে মুনাফেকগণ পুণ্য কাজে অবহেলা করিয়াছিল। এইজন্য উষ্ণ শাখাই তাহাদের প্রাপ্য। যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “এবং মুনাফেকগণ বলিয়াছিল, 'তোমরা গরমের মাঝে যুদ্ধে গমন করিও না,' বলিয়া দিন যে, দোযখের আগুন ইহা হইতে অধিক গরম, যদি তাহারা অনুধাবন করিতে সক্ষম হইত।” আর কাফেরগণ পৃথিবীতে অন্ধকারে পতিত ছিল। এইজন্য তাহাদের ভাগ্যে ধুম্র ছায়া মিলিবে। যেমন, আল্লাহ ঘোষণা করিয়াছেন, “যাহারা কুফরি করিয়াছে, শয়তানই হইল তাহাদের বন্ধু। তাহারা তাহাদিগকে আলো হইতে অন্ধকারের দিকে লইয়া যায়। তাহারা দোযখী এবং অনন্তকাল সেখানে অবস্থান করিবে। আর মুমিনদের উপর নূরের জ্যোতি ছায়া দান করিবে। কেননা তাহারা পৃথিবীতে আলোর পথে ছিল; সুতরাং আখেরাতেও আলোর মধ্যে থাকিবে। যেমন, আল্লাহ পাক এরশাদ করিয়াছেন, “আল্লাহই মুমিনদের বন্ধু । তিনি তাহাদিগকে অন্ধকার হইতে আলোর দিকে বাহির করিয়া লইয়া আসেন।” অধিকন্তু মুমিনদের চিহ্ন সম্বন্ধে আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন যে, “রোজ কিয়ামতে বিশ্বাসী নারী পুরুষদের অগ্র-পশ্চাতে নূরের জ্যোতি বিচরণ করিতে তুমি দেখিতে পাইবে, (ঘোষণা করা হইবে) তোমরা আজ সেই বেহেশতের সুসংবাদ গ্রহণ কর যাহার নিম্নদেশে স্রোতস্বিনী প্রবাহিত হইবে।"

হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন যে, “আল্লাহ পাক যখন প্রাণী জগতকে প্রকত্রিত করিবে, তখন তাঁহার তরফ হইতে ঘোষণা করা হইবে যে, “হে সম্ভ্রান্তগণ! তোমরা কোথায়?” তখন এক সম্প্রদায়ের লোক দ্রুতবেগে জান্নাতের দিকে অগ্রসর হইবে। ফেরেশতাগণ জিজ্ঞাসা করিবে, “তোমরা কে? এত তাড়াতাড়ি জান্নাতের দিকে গমন করিতেছ?” তাহারা উত্তর করিবে, “আমরাই সম্ভ্রান্ত দল!” 

পুনরায় জিজ্ঞাসা করা হইবে, “তোমরা কিরূপে সম্ভ্রান্ত হইলে?” প্রত্যুত্তরে বলিবে, “অত্যাচারে ধৈর্যাবলম্বন করিয়া এবং অন্যায়কে মাফ করিয়া।” ফেরেশতাগণ সন্তুষ্ট হইয়া বলিবে, “নিশ্চয়ই এ ধরনের আমলকারীদের জন্যেই বেহেশত নির্ধারিত রহিয়াছে।" 

তারপর ধৈর্যশীলদিগকে ডাকা হইলে একদল লোক উঠিয়াই জান্নাতের দিকে তাড়াতাড়ি অগ্রসর হইবে। ফেরেশতাগণ তাহাদিগকে প্রশ্ন করিবে, “তোমরা কে? এত দ্রুতগতিতে জান্নাতের দিকে অগ্রসর হইতেছ?” তাহারা উত্তর করিবে, “আমরাই ধৈর্যশীল।” জিজ্ঞাসা করা হইবে, “তোমরা কেমন করিয়া ধৈর্যশীল হইলে?” উত্তর করিবে, “আমরা আল্লাহ পাকের বন্দেগীতে এবং গুনাহ হইতে বাঁচিয়া থাকিতে ধৈর্যাবলম্বন করিয়াছিলাম।” অতএব তাহাদিগকে বেহেশতে গমন করিতে নির্দেশ দেওয়া হইবে।

পরিশেষে ডাকা হইবে, “হে আল্লাহর প্রেমিকগণ! তোমরা কোথায়?” তখন একদল লোক উঠিয়া তাড়াতাড়ি বেহেশতের দিকে ধাবিত হইবে। ফেরেশতারা প্রশ্ন করিবে, “তোমরা কে? এত ত্বরিতগতিতে বেহেশতের দিকে যাইতেছ?” উত্তর করিবে, “আমরা একে অন্যকে ভালবাসিয়াছি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান-সদকাহ করিয়াছি।” তখন তাহাদিগকে বেহেশতে যাওয়ার হুকুম দেওয়া হইবে।

হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন যে, “তাহারা জান্নাতে দাখেল হইবার পর নেক-বদ ওজন করিবার জন্য মিজান খাড়া করা হইবে এবং হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর ‘লেওয়ায়ে হামদ' অর্থাৎ প্রশংসার পতাকা উন্নত শিরে উড়িতে থাকিবে।” একদিন আঁ হযরত . (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে উক্ত পতাকার আকতি ও বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হইলে তিনি উত্তর করিলেন, “উহার দৈর্ঘ্য এক হাজার বৎসর পথের সমান ও প্রস্থ আকাশ পাতালের দূরত্বের সমপরিমাণ হইবে। আর উহাতে লেখা থাকিবে “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।” উহার উপরের অংশ লাল ইয়াকুত এবং হাতলদন্ড সাদা রূপার ও জমরজদে তৈরী হইবে। উহাতে তিনটি নূরের গুচ্ছ থাকিবে। তন্মধ্যে একটি পূর্বদিকে একটি পশ্চিমদিকে এবং অপরটি পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করিবে। উহাতে তিনটি লাইন বা সারি লেখা থাকিবে। প্রথম সারিতে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” দ্বিতীয় সারিতে “আল্হাম্‌দু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন” এবং তৃতীয় সারিতে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” লেখা থাকিবে। প্রত্যেক সারি এক হাজার বৎসরের পথের সমান লম্বা হইবে। এই লেওয়ায়ে হামদের মধ্যে আরও সত্তর হাজার ঝান্ডা এবং প্রত্যেক ঝান্ডার নীচে সত্তর হাজার নিশান হইবে। প্রত্যেক সারিতে পাঁচলক্ষ ফেরেশ্তা তাসবীহ ও তাহলীল পাঠে নিমগ্ন থাকিবে। “লেওয়ায়ে হামদ বেইয়াদী” অর্থাৎ প্রশংসার পতাকা আমার হাতে থাকিবে- এই হাদীসের ব্যাখ্যা করিতে গিয়া মুহাম্মদ জোরজনী (রাঃ) বলিয়াছেন যে, “রোজ কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মুমিন উহার নীচে দাঁড়াইবে। সমস্ত বেঈমান দোযখের কিনারায় অবস্থান করিবে। তারপর উহা সরানো হইলে কাফেরদিগকে দোযখের দিকে হাঁকাইয়া নেওয়া হইবে।”

হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “রোজ কিয়ামতে আল্লাহ পাক সাত প্রকার লোককে আরশের নীচে জায়গা দিবেন। সেইদিন আরশের ছায়া ব্যতীত অন্য কোনও ছায়া থাকিবে না। (১) ইনসাফগার রাজা-বাদশাহ, (২) যে যুবক আল্লাহর এবাদতে আত্মনিয়োগ করিয়াছে, (৩) যাহারা আল্লাহর ওয়াস্তে একে অন্যকে মহব্বত করিয়াছে, (৪) যে পুরুষ সুন্দরী, লাবণ্যময়ী এবং কুলীন রমণীর ব্যভিচারের আহ্বানে আত্মসংযম করিয়াছে। যুবক রমণীকে বলিয়াছে, “আমি দুনিয়ার প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি।" (৫) যে আত্মম্ভরিতার ভয়ে নির্জনে আল্লাহর এবাদত করিয়াছে এবং চোখের পানিতে বুক ভাসাইয়াছে, (৬) যে এমন সংগোপনে সদকাহ দান করিয়াছে যে, বামহাত অনুভব করিতে সক্ষম হয় নাই ডানহাত কি দান করিয়াছে, (৭) যাহার হৃদয় সর্বদাই মসজিদের প্রতি আকৃষ্ট রহিয়াছে।

হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলিয়াছেন, “রোজ কিয়ামতে 
সত্যবাদিতার ঝান্ডা হযরত আবুবকর (রাঃ) এর হস্তে থাকিবে এবং সমস্ত সত্যবাদী এর নীচে শান্তিলাভ করিবে।
 ন্যায়পরায়ণতার ঝান্ডা হযরত ওমর (রাঃ)এর হস্তে থাকিবে এবং সমস্ত ন্যায়পরায়ণ বান্দা উহার নীচে আরামে থাকিবে। 
দান-দক্ষিণার ঝান্ডা হযরত ওসমান (রাঃ)এর হস্তে থাকিবে এবং সমস্ত দানশীল ব্যক্তি উহার নীচে অবস্থান করিবে। 
শাহাদতের ঝান্ডা হযরত আলী (রাঃ)এর হস্তে থাকিবে এবং সমুদয় শহীদ উহার ছায়ায় থাকিবে। 
বিজ্ঞতার ঝান্ডা হযরত মাআজ বিন্ জাবাল (রাঃ) এর হস্তে থাকিবে এবং সমস্ত বিজ্ঞ ব্যক্তি উহার নীচে অবস্থান করিবে। 
সাধুত্বের ঝান্ডা হযরত আবু যর (রাঃ) এর হস্তে থাকিবে এবং সমস্ত সাধু ব্যক্তি উহার নীচে অবস্থান করিবে। 
দারিদ্র্যতার ঝাণ্ডা আবু দারদাহ (রাঃ) এর হস্তে থাকিবে এবং সমস্ত দরিদ্র ব্যক্তি উহার নীচে অবস্থান করিবে। 
কেরাতের ঝান্ডা হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) এর হস্তে থাকবে এবং সমস্ত কারী উহার নীচে অবস্থান করিবে। 
মুয়াজ্জিনের ঝান্ডা হযরত বেলাল (রাঃ) এর হস্তে থাকিবে এবং সমস্ত মুয়াজ্জিন উহার নীচে থাকিবে।
খুনের ঝান্ডা হযরত হোসাইন ইবনে আলী (রাঃ)এর হস্তে থাকিবে এবং খুন হওযা লোক উহার নীচে থাকিবে। 
যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “ইয়াউমা নাউ কুল্লু উনাছিন বিইমামিহিম” অর্থাৎ সেদিন আমি প্রত্যেক ব্যক্তিকে তাহার সর্দারের নামে ডাকিব।

হাদীস শরীফে আরও আছে যে, রোজ কিয়ামতে যখন সমুদয় প্রাণী জগত জড়ো হইবে তখন তাহারা অতিশয় তৃষ্ণার্ত হইবে। তাহাদের শরীর হইতে অত্যদিক ঘাম বাহির হইবে এবং তাহারা অজ্ঞান হইয়া যাইবে। এমন সময় আল্লাহ পাক হযরত জিব্রাইল (আঃ)-কে বলিবেন, “হে জিব্রাইল! তুমি মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে বল, যেন তিনি স্বীয় উম্মতদিগকে সেই নামের সহিত আমার নিকট প্রার্থনা করিতে বলেন যেই নামে সঙ্কট মুহূর্তে পৃথিবীতে তাহারা আমার সমীপে দোয়া করিত।” উহা শ্রবণ করিয়া সমুদয় উম্মতে মুহাম্মদী উচ্চৈঃস্বরে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম" বলিতে থাকিবে। আর আল্লাহ পাক তৎক্ষণাতই হিসাব-নিকাশ শুরু করিবেন। 

অন্যান্য নবীর উম্মতদিগকে আল্লাহ পাক বলিবেন, “যদি উম্মতে মুহাম্মদী আমার নাম না লইত, তবে হিসাব নিকাশ আরও এক হাজার বৎসর দেরী করিতাম।” আল্লাহ পাক সর্বপ্রথম পশু-পাখী, হিংস্ৰ প্রাণীর বিচার শুরু করিবেন। সেখানে শিংহীন পশু শিংওয়ালা পশুর অন্যায়ের প্রতিশোধ লইবে! শেষ পর্যন্ত আল্লাহ পাকের নির্দেশে মাটি হইয়া যাইবে। তখন কাফেরগণ আক্ষেপ করিয়া বলিবে, “হায়! আমরাও যদি মাটি হইয়া যাইতাম।”

হযরত মোকাতেল (রাঃ) বলিয়াছেন যে, 'দশটি পশু বেহেশতে দাখিল হইবে। (১) হযরত সালেহ (আঃ)এর উনী, (২) হযরত ইব্রাহীম (আঃ)এর গো-শাবক, (৩) হযরত ইসমাইল (আঃ)-এর দুম্বা, (৪) হযরত মূসা (আঃ)-এর গাভী, (৫) হযরত ইউনুস (আঃ)-এর মৎস, (৬) হযরত উজাইর (আঃ)-এর গর্দভ, (৭) হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর সহিত বাক্যালাপকারী পিপীলিকা, (৮) হযরত বিলকিস রানীর নিকট প্রেরিত দূত হুদহুদ পাখী, (৯) হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর হিজরতের বাহন উষ্ট্রী এবং (১০) আসহাবে কাহাফের সঙ্গী কুকুর। বর্ণিত আছে যে, ইহাকে দুম্বার আকারে বেহেশতে দাখিল করা হইবে এবং উহার নাম পরিবর্তন করিয়া 'ফারওয়ান' অথবা 'হেরমান' অথবা 'কিতুমির' রাখা হইবে। উহাকে হলুদ রঙ্গে রঞ্জিত করা হইবে।

সুতরাং চিন্তা করিয়া দেখুন, কুকুর আসহাবে কাহাফের সহিত মিলিয়া গেল কিন্তু শত প্রচেষ্টায়ও ইহাকে পৃথক করা সম্ভব হইল না। অনুরূপভাবে কোন গুনাহগার যদি দীর্ঘ পঞ্চাশ বৎসর তৌহিদের পরিমন্ডলে জীবনাতিবাহিত করে, তাহা হইলে আল্লাহ পাক তাহাকে কেমন করিয়া করুণা ও রহম হইতে দূরে রাখিবেন? 

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, রোজ কিয়ামতে উম্মতে মুহাম্মদীর একজন (দীনদার) আলেমকে হাজির করা হইলে, আল্লাহ পাক জিব্রাইল (আঃ)-কে নির্দেশ দিবেন, “হে জিব্রাইল? তাহাকে হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট লইয়া যাও।” তখন অবিলম্বে আলেমের হস্তধারণ করতঃ তিনি তাহাকে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সম্মুখে লইয়া যাইবেন। সেই সময় হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) পেয়ালা দ্বারা স্বীয় হস্তে উম্মতদিগকে পানি পান করাইতে থাকিবেন এবং উক্ত আলেমকে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিজ অঞ্জলি ভরিয়া পানি পান করাইবেন। 

তখন কেহ প্রশ্ন করিবে, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদিগকে পেয়ালা দ্বারা পানি পান করাইলেন, কিন্তু ঐ আলেমকে অঞ্জলি ভরিয়া পানি পান করাইলেন কেন?” উত্তরে হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিবেন, কারণ পৃথিবীতে মানুষ যখন বেচা-কেনা ও দুনিয়ার কাজকর্মে নিমগ্ন ছিল, তখন আলেম সম্প্রদায় নিশ্চয়ই জ্ঞানানুশীলন ও ধর্ম চর্চায় আত্মনিয়োগ করিয়াছিল ।' 

প্রখ্যাত ফেকাহবিদ হযরত আবু লাইছ সমরকন্দি (রহঃ) বলিয়াছেন যে, “আল্লাহর অলীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও আল্লাহর শত্রুদের শত্রুতা সাধনের ন্যায় উত্তম আমল আর নাই।” 

হাদীস শরীফে আছে যে, একদিন হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহর নিকট আরজ করিলে আল্লাহ তায়ালা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন; “হে মূসা! বল, আমার জন্য তুমি কি আমল করিয়াছ?" মূসা (আঃ) উত্তর করিলেন, “হে আল্লাহ! আমি আপনার জন্য নামায পড়িয়াছি, রোযা রাখিয়াছি, আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করিয়াছি, দান-সদকাহ করিয়াছি, তাসবীহ ও তাহ্লীল পাঠ করিয়াছি, আপনার যিকির করিয়াছি ও আপনার কালাম পাঠ করিয়াছি।” উত্তরে আল্লাহ পাক বলিলেন, “হে মূসা!” নামায ঈমানের চিহ্ন, রোযা তোমার জন্য ঢাল হইবে, আর দান-সদকাহ তোমার জন্য ছায়া দানকারী হইবে। তাসবীহ ও তাহলীলের বদলে তোমার জন্য জান্নাতে একটি বৃক্ষ তৈরি করা হইবে। আমার কালাম পাঠের বদলে তুমি হুর পাইবে এবং জিকিরের বিনিময়ে নূরের জ্যোতি লাভ করিবে। হে মূসা! এই সব কিছু ত কেবল নিজের জন্যই করিয়াছ, কিন্তু আমার জন্য কি করিয়াছ, বল।” মূসা প্রার্থনা করিলেন, হে আল্লাহ! বলুন, 'আপনার জন্য আমি কি আমল করিব?' আল্লাহ পাক বলিলেন, “হে মূসা! তুমি কি আমার বন্ধুদের সহিত কখনও বন্ধুত্ব করিয়াছ এবং আমার শত্রুদের সহিত শত্রুতা করিয়াছ?' ইহাতে হযরত মূসা (আঃ) অনুধাবন করিলেন যে, আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসা ও আল্লাহর শত্রুদের সঙ্গে শত্রুতা সাধনের মত উত্তম আমল আর নাই।”

তারপর আল্লাহ তায়ালা নিকটবর্তীদের হিসাব-নিকাশে মনোযোগ দিবেন। জিজ্ঞাসা করিবেন, “জালেম ও অত্যাচারীর দল কোথায়?” ফেরেশতাগণ একজন জালেমকে তাঁহার সমীপে হাজির করিবেন। আল্লাহ পাক তাহাদের নেক আমল অত্যাচারিতকে দিবেন।

সেখানে ধন-রত্নের বিনিময় চলিবে না। এইভাবে দেওয়ার ফলে যখন জালেমের কোন নেক থাকিবে না, তখন মজলুমের গুনাহ দ্বারা জালেমের আমলনামা পূর্ণ করিয়া দিবেন এবং জালেমকে হাবিয়া দোযখে প্রেরণ করিবেন। সেইদিন কাহারও উপর অণুমাত্র জুলুমও করা হইবে না। প্রকৃতই আল্লাহ পাক অতিশীঘ্র বদলা দান করিবেন। এই প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, 'আল্লাহ পাক হযরত মূসা (আঃ)-কে অহীর মারফত জানাইয়া দিলেন, “হে মূসা! তুমি তোমার উম্মতদিগকে শুধুমাত্র একটি কাজ হইতে বাঁচিয়া থাকিতে বল। তবে আমি তাহাদিগকে বেহতে দাখিল করিব।” 

তিনি প্রার্থনা করিলেন, “হে আল্লাহ! উহা কি?” এরশাদ হইল, “তাহারা যেন দাবীদার বা বাদানুবাদকারীকে রাজী রাখে।” মূসা (আঃ) আরজ করিলেন, “যদি ইহার পূর্বে মরিয়া যায়?” আল্লাহ বলিলেন, “হে মূসা! আমি চিরস্থায়ী ও চিরজীবি; সুতরাং আমাকেই যেন রাজী রাখে।” মূসা (আঃ) আরজ করিলেন, “হে আল্লাহ! কি প্রকারে আপনাকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব?” এরশাদ হইল, “চারি প্রকারে, যথা অন্তরের তাওবাহ দ্বারা, জিহ্বার ক্ষমা প্রার্থনা দ্বারা, চোখের পানি ফেলিয়া এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা আমার এবাদত করিয়া আমার সন্তুষ্টি লাভ করিতে পারিবে।”

পরবর্তী পর্ব
বেহেশতকে হাজির করিবার বিবরণ


দাকায়েকুল আখবার- (৩৩) সৃষ্টিজগতকে হাশরের মাঠে লইয়া যাওয়ার বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৩৩)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সৃষ্টিজগতকে হাশরের মাঠে লইয়া যাওয়ার বিবরণ
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, “কাফেরদিগকে পদব্রজে হাঁকাইয়া হাশর ময়দানে উঠান হইবে আর মুমিনদিগকে উৎকৃষ্ট উটের পিঠে সওয়ার করাইয়া আল্লাহ পাকের দরবারে উপস্থিত করা হইবে।” যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “সেদিন মুমিনদিগকে মেহমানের ন্যায় আল্লাহর দরবারে একত্রিত করিব আর গুনাহগারদিগকে তৃষ্ণাকাতর অবস্থায় হাঁকাইয়া দোযখে সমবেত করিব।” হুযুর করীম (সঃ) এরশাদ করিয়াছেন যে, “মুমিন বান্দাদিগকে উৎকৃষ্ট উটের পিঠে সওয়ার করাইয়া হাশরের মাঠে উপস্থিত করা হইবে।” আর রোজ কিয়ামতে আল্লাহ পাক ফেরেশতাদিগকে নির্দেশ দিবেন, “হে ফেরেশতাগণ! আমার প্রিয় বান্দাদিগকে পদভরে হাঁটাইয়া আমার কাছে হাজির করিও না, বরং উত্তম উঠের পিঠে আরোহণ করাইয়া তাহাদিগকে আমার নিকট উপস্থিত করিও। পৃথিবীতে আরোহী হওয়া যাহাদের সহজাত অভ্যাস ছিল। সর্বপ্রথম পিতার ঔরসে, তারপর মাতৃ উদরে নিম্নপক্ষে ছয়মাস তাহারা অতিবাহিত করিয়াছে। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর স্তন্য পান, দুই বৎসর মায়ের কোলে ও পিতার কাঁধে চড়িয়া কাটাইয়াছে তারপর ভূ-পৃষ্ঠে, পানিতে, নৌকা, গাধা, ঘোড়া ও খচ্চরে চড়িয়া পরিভ্রমণ করিয়াছে। অতএব হাশর মাঠেও তাহাদিগকে পদব্রজে চালাইও না। কেননা তাহারা হাঁটিতে অনভ্যস্ত ছিল। এইজন্য তাহাদের নিমিত্ত উট অথবা কোরবানীর জন্তুর ব্যবস্থা কর।” পরিশেষে তাহারা উহাতে আরোহণ করিয়া আল্লাহ পাকের সন্নিধানে উপস্থিত হইবে। এইজন্যই মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “তোমরা নিজের কোরবানীকে মোটা তাজা কর, কারণ উহা পুলছিরাতে তোমাদের বাহন হইবে।”

পরবর্তী পর্ব-
প্রাণী জগতকে একত্রিত করিবার বিবরণ

দাকায়েকুল আখবার (৩২) প্রাণী জগতের কবর হইতে পুনরুত্থান



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৩২)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

প্রাণী জগতের কবর হইতে পুনরুত্থান
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, সমস্ত জীব স্বীয় কবর হইতে উত্থিত হইয়া উক্ত স্থানে চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত দন্ডায়মান থাকিবে। তখন তাহারা পানাহার করিবে না এবং কাহারও সহিত বাক্যালাপও করিবে না। ক্রমাগত চল্লিশ বৎসর ঠায় দাঁড়াইয়া থাকিবে। জনৈক ব্যক্তি মহানবী (সঃ)-কে জিজ্ঞাসা করিল, “ইয়া রাসূলাল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! রোজ কিয়ামতে আপনি স্বীয় উম্মতদিগকে কেমনভাবে চিনিবেন?” উত্তরে মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “সেইদিন আমার উম্মতগণের হাত, পা ও চেহারা, অজুর চিহ্নস্থল উজ্জ্বল থাকিবে।" 

হাদীস শরীফে আরও আছে যে, রোজ কিয়ামতে প্রাণী জগতের উত্থানের পর একদল ফেরেশতা তাহাদের মস্তকের সন্নিকটে আসন গ্রহণ করিয়া তাহাদের শিয়রের ধূলাবালি পরিষ্কার করিতে আরম্ভ করিবে; কিন্তু কপালের ধূলা পরিষ্কার করিতে সক্ষম হইবে না। তখন আল্লাহ পাকের পক্ষ হইতে জনৈক ফেরেশতা ঘোষণা করিবে, “হে বন্ধু! ইহা কবরের মাটি নহে। অতএব ইহা দূর করিবার বৃথা চেষ্টা পরিত্যাগ কর। যতক্ষণ পর্যন্ত নামাযী ও বেনামাযির পার্থক্য প্রকাশ না পাইবে এবং পুলছিরাত পার হইয়া বেহেশতে প্রবেশ না করিবে, সে পর্যন্ত উহা কপালে থাকিতে দাও। ফলে দর্শকবৃন্দ অনুধাবন করিতে সক্ষম হইবে যে, সেই ব‍্যক্তি আমার প্রকৃত বান্দা ও অনুগত খাদেম ছিল।”

হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “রোজ হাশরে আল্লাহ যখন কবরবাসীদিগকে উঠাইবেন, তখন রেদওয়ানকে নির্দেশ দিবেন যে, “হে রেদওয়ান! আমি রোযাদারদিগকে তৃষ্ণার্ত ও ক্ষুধার্ত অবস্থায় উত্থিত করিয়াছি। অতএব তাহাদের জন্য বেহেশ্তী বালক ও খাদেমদিগকে আকাঙ্ক্ষিত দ্রব্য খাদ্য ও পানীয় উপস্থিত কর।" তখনই রেদওয়ান বেহেশ্তী, বালক ও খাদেমদিগকে নূরের তব্‌ক্কা লইয়া হাজির হইতে হুকুম করিবেন। তৎক্ষণাত বেহেশ্তী ফল-ফলারি, আহার্য ও পানীয় লইয়া তাহার নিকট এত বালক ও খাদেম উপস্থিত হইবে যে, তাহাদের সংখ্যা আকাশের তারা, বৃক্ষরাজীর পাতা, বালূ-কণা ও পানির বিন্দু হইতেও সমধিক হইবে। তাহারা রোযাদারদিগকে পানাহার করাইবে এবং বলিবে, “আজ পূর্ব প্রেরিত বস্তুর প্রতিদান নিঃসঙ্কোচে পানাহার করুন। 

হে আল্লাহ! আমাদিগকেও এই শ্রেণীর আহার্য দান করুন।"

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “রোজ কিয়ামতে কবর হইতে উত্থিত হইবার পর তিন শ্রেণীর লোকের সহিত ফেরেশতাগণ করমর্দন করিবে। যাহারা আল্লাহর পথে শহীদ হইয়াছে, যাহারা রমজান মাসে রোযা রাখিয়াছে এবং যাহারা আরাফাতের দিন রোযা রাখিয়াছে।"

হযরত আয়েশা (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “বেহেশতের মধ্যে হীরা, জাওহার, মণি-মুক্তা ও সোনা-রূপার তৈরী একটি মহল আছে।” আমি আরজ করিলাম, “হে আল্লাহর রাসূল! ইহা কাহার জন্য?” তিনি বলিলেন, “যাহারা আরাফাতের দিন রোযা রাখিয়াছে।” তিনি আরও বলিলেন, “হে আয়েশা! আরাফাতের দিন ও জুময়ার দিন আল্লাহর নিকট অত্যন্ত প্রিয়। সেইদিন আল্লাহ পাকের অগণিত রহমত নাযিল হয়। 

যে লোক আরাফার দিন রোযা রাখে, আল্লাহ পাক তাহার জন্য ত্রিশটি রহমতের দুয়ার খুলিয়া দেন। সে ইফ্‌তার ও পানি পান করিবার সময় তাহার শরীরের প্রত্যেক শিরা-উপশিরা ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া বলে, “হে আল্লাহ! সূর্য উদয় পর্যন্ত তাহার উপর তোমার করুণা বর্ষণ কর।” 

অপর এক বর্ণনায় আছে যে, রোযাদার কবর হইতে উত্থিত হইবার সময় নিজ মুখে রোযার সুগন্ধ পাইবে। তাহাদের সামনে মজাদার আহার্য ও মিঠা পানি হাজির করিয়া বলা হইবে, “আপনারা আজ' পরম সুখে পানাহার করিয়া স্বীয় ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিবারণ করুন। কেননা অপরাপর মানুষ যখন পরম তৃপ্তির আহার্য গ্রহণে মত্ত ছিল, তখন আপনারা ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত ছিলেন। আজ আপনারা সুখ অনুভব করুন।” অন্যান্য মানুষ যখন হিসাব-নিকাশ দিতে ব্যস্ত থাকিবে তখন তাহারা পানাহার সমাপন করিয়া সুখ লাভ করিতে থাকিবে।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, “দশ শ্রেণীর লোকের শরীর কবরে পচিবে না; যথা-(১) শহীদ, (২) হাক্কানী আলেম, (৩) গাজী বা ধর্ম যোদ্ধা, (৪) কোরআনে হাফেজ, (৫) মোয়াজ্জিন, (৬) ইনসাফগার রাজা-বাদশাহ, (৭) প্রসবকালীন মৃত্যু বরণকারী রমণী, (৮) যাহাকে অন্যায়ভাবে নিধন করা হইয়াছে, (৯) জুময়ার দিনে বা রাত্রে মৃত ব্যক্তি, (১০) আলাফাতের দিনে মৃত ব্যক্তি। 

আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলিয়াছেন, “রোজ কিয়ামতে সকলেই সদ্য প্রসূত শিশুর ন্যায় নগ্নদেহে হাশর ময়দানে উত্থিত হইবে।” হযরত আয়েশা (রাঃ) আরজ করিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! পুরুষ লোকেরাও কি স্ত্রীলোকদের সহিত একত্রেই থাকিবে?" হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, হ্যাঁ, মিলিয়া মিশিয়াই থাকিবে।" হযরত আয়েশা (রাঃ) আক্ষেপ করিয়া বলিলেন, “হায়! লজ্জা ও অপমানের অবতারণা হইবে, যখন একে অন্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করিবে।” 

তখন আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বিবি আয়েশার (রাঃ) কাঁধে মৃদু আঘাত করিয়া বলিলেন, “হে ছিদ্দিক নন্দিনী! সেদিন একে অন্যের প্রতি কুদৃষ্টি নিক্ষেপ করিবে না, কেননা সকলেই স্বীয় চিন্তায় নিমগ্ন থাকিবে এবং উর্ধ্বনেত্রে আকাশের দিকে চাহিয়া থাকিবে। তাহাদের মধ্যে কেহ পা পর্যন্ত, কেহ হাঁটু পর্যন্ত, কেহ উদর পর্যন্ত, কেহ বক্ষদেশ পর্যন্ত, কেহ গলা পর্যন্ত, কেহ তার অধিক ঘর্ম-স্রোতে সাঁতার কাটিতে থাকিবে। সেদিন এমন কোন মর্যাদাশীল ফেরেশতা, নবী ও রাসূল অথবা শহীদ কবর হইতে উত্থিত হইবে না যাহারা হিসাব-নিকাশ দেওয়া ও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত দাঁড়াইয়া থাকিবার ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত ও পেরেশান হইবে না।" 

হযরত আয়েশা (রাঃ) আরও আরজ করিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল ।! কেহ কি সেদিন আরোহীরূপে হাশর মাঠে উত্থিত হইবে।” হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “হ্যাঁ অবশ্যই। নবী ও রাসূল এবং তাহাদের পরিবার-পরিজন ছাড়াও রজব, সাবান ও রমযান মাসের রোযাদারগণ আরোহী হইয়া হাশর ময়দানে উঠিবে।”

মা আয়েশা (রাঃ) পুনরায় আরজ করিলেন, “কেহ কি সেদিন আত্মতৃপ্তি সহকারে উপস্থিত হইবে?” হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “হ্যাঁ, নবী ও রাসূল এবং তাহাদের পরিবার-পরিজন ব্যতীত রজব, সাবান ও রমজান মাসের রোযাদারগণও পরিতৃপ্ত হইয়া হাশর মাঠে সমবেত হইবে, তাহারা ক্ষুধা-তৃষ্ণা হইতে মুক্ত থাকিবে এবং অপর সকলেই ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত হইবে।”

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, রোজ কিয়ামতে ফেরেশতাগণ লোকদিগকে বাইতুল মোকাদ্দাসের নিকটবর্তী ‘সাহেরা' নামক স্থানে জড়ো করিতে নিবেন। যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “ফাইন্নামা হিয়া যাজ্বরাতুওঁ ওয়াহিদাতুন ফাইজা হুম বিছাহিরাহ্” অর্থাৎ দ্বিতীয়বার সিঙ্গায় ফুৎকার এক ধমক বা শাসানো ধ্বনি ভিন্ন কিছু নহে। 

অতঃপর তাহারা সাহেরা বা সমতল ময়দানে জড়ো হইবে। আরও বর্ণিত আছে যে, “কিয়ামতের মাঠে মানুষের সারি হইবে একশত বিশটি। প্রত্যেক সারি লম্বায় চল্লিশ হাজার ও প্রস্থে এক হাজার বৎসরের পথের সমান হইবে। তন্মধ্যে মাত্র তিনটি সারি হইবে মুমিন বান্দাদের। বাকী অন্যান্য সারিতে বেদ্বীন কাফেরগণ থাকিবে।” 

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে, জনাব নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “আমার উম্মতগণ একশত বিশ সারিতে বিভক্ত হইবে।” এই বর্ণনাই সত্য। মুমিনগণের হস্ত-পদ ও মুখমন্ডল অতিশয় উজ্জ্বল ও ফর্সা হইবে এবং কাফেরদের মুখমন্ডল বিশ্রী ও কৃষ্ণবর্ণ হইবে। তাহারা শৃঙ্খলাবদ্ধ হইয়া শয়তানের সহিত শাস্তি ভোগ করিবে।


পরবর্তী পর্ব 
সৃষ্টিজগতকে হাশরের মাঠে লইয়া যাওয়ার বিবরণ

দাকায়েকুল আখবার- (৩‍১) পুনরুত্থানের জন্য সিঙ্গা ফুৎকারের বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৩১)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

পুনরুত্থানের জন্য সিঙ্গা ফুৎকারের বিবরণ-
তারপর আল্লাহ তা'আলা হযরত ইস্রাফীল (আঃ)-কে পুনরুত্থানের জন্য সিঙ্গা ফুৎকারের নির্দেশ দিবেন এবং সেই মুহূর্তে ঘোষণা করিবেন, “হে পরিত্যক্ত রূহ সকল! হে গলিত হাড়, মাংস ও দেহ কাঠামো! হে বিচ্ছিন্ন ইন্দ্ৰিয় ও শিরা-উপশিরা! হে গলিত চামড়া ও বিক্ষিপ্ত ত্বকসমূহ আজ ফয়সালা ও হিসাব নিকাশের জন্য সত্বর উত্থিত হও।” 
সকলেই তখন গাত্রোত্থান করিবে। কবর হইতে পুনরুত্থিত হইয়া তাহারা আকাশ ও পৃথিবীকে পরিবর্তিত, পাহাড়-পর্বতকে বিক্ষিপ্ত, গর্ভবর্তী উদ্ভিগুলিকে বিচ্ছিন্ন, হিংস্র জন্তুগুলিকে জড়ীভূত, সাগর-মহাসাগরগুলিকে বিশুষ্ক, রূহগুলির শরীরের সহিত সংযোজিত, আযাবের ফেরেশ্তাদিগকে সমীপবর্তী, সূর্যকে কিরণহীন, তুলাদন্ডকে সংস্থাপিত প্রত্যক্ষ করিবে। 
সেদিন সকলেই নিজ নিজ আমল ও কর্ম অনুধাবন করিতে সক্ষম হইবে। যেমন আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ রহিয়াছে, "পাপীগণ সেইদিন চীৎকার করতঃ বলিবে, “হায়! আমাদের ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী, আজ কে আমাদিগকে নিদ্রোত্থিত করিল? পরম দয়াময় এই ওয়াদাই করিয়াছিলেন এবং রাসূলগণ যথার্থ সত্য বলিয়াছেন।” তারপর সবাই নগ্নপদে ও নগ্নদেহে কবর হইতে উত্থিত হইবে। 

একদা জনৈক ব্যক্তি হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে এই আয়াতের অর্থ জিজ্ঞাসা করিল-“যেদিন সিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হইবে, তোমরা সেদিন দলেবলে উপস্থিত হইবে।” ইহা শ্রবণান্তে আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কান্নায় ভাঙ্গিয়া পড়িলেন এবং চোখের পানিতে তাঁহার বসন সিক্ত হইয়া গেল। 
অতঃপর তিনি বলিলেন, “হে প্রশ্নকর্তা! তোমার প্রশ্ন অত্যন্ত জটিল। শোন, রোজ কিয়ামতে আমার উম্মতগণ বারটি দলে বিভক্ত হইয়া পুনরুত্থিত হইবে। 

(১) যাহারা জনসমাজে অশান্তি ও গোলযোগ সৃষ্টি করিয়াছে তাহাদিগকে বানরের আকারে হাশরের ময়দানে উত্থিত করা হইবে। যেমন আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করিয়াছেন- ("আল্ ফিত্‌নাতু আশাদ্দু মিনাল ক্বাতুল”) অর্থাৎ "অশান্তি সৃষ্টি করা ব্যভিচার হইতে জঘন্যতর"।

(২) যাহারা হারাম খাদ্য দ্বারা শরীরের বৃদ্ধি সাধন করিয়াছে তাহাদিগকে শূকরের আকারে হাশরের মাঠে উত্থিত করা হইবে।

(৩) যে হাকীম বা সরদার ন্যায়বিচার করে নাই বরং অন্যায় হুকুম জারী করিয়াছে, তাহাদিগকে অন্ধ অবস্থায় হাশরের মাঠে উত্থিত করা হইবে। তাহারা অন্ধকারে ইতস্ততঃ ঘুরিতে থাকিবে। যেমন, আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করিয়াছেন, “তোমরা যখন বিচারক হও, তখন ন্যায়ের ভিত্তিতে মীমাংসা করিও। অবশ্যই আল্লাহ তা'আলা তোমাদিগকে শ্রেষ্ঠতম উপদেশ দান করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।”

(৪) যাহারা নিজের এবাদত-বন্দেগীতে অহঙ্কার ও ফখর করিয়াছে, রোজ কিয়ামতে তাহাদিগকে বোবা ও বধির করিয়া উঠান হইবে। যেমন, আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করিয়াছেন, “অবশ্যই আল্লাহ তা'আলা গর্বকারীদিগকে ভালবাসেন না।”

(৫) যে আলেমগণের কাজে ও কথায় সঙ্গতি ছিল না রোজ হাশরে তাহাদের মুখ হইতে পুঁজ, রক্ত পড়িতে থাকিবে এবং তাহারা নিজের জিহ্বা কামড়াইবে। যেমন, আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করিয়াছেন, “তোমরা কি মানুষকে নেককাজ করিতে আদেশ দাও, মূলতঃ নিজেরা নেককাজ হইতে ভুলিয়া থাক; তবে কি তোমরা বুদ্ধি রাখ না?”

(৬) আর যাহারা মিথ্যা-সাক্ষী দান করিয়াছে, রোজ হাশরে তাহাদের শরীর আগুনে দগ্ধ করিয়া উঠান হইবে। যেমন, আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করিয়াছেন “যাহা সম্পর্কে তোমাদের জানা নাই, তাহা যখন তোমরা উচ্চারণ কর এবং ইহাকে তুচ্ছ মনে কর, মূলতঃ ইহা আল্লাহর নিকট জঘন্য অপরাধ। যখন তোমরা ইহা শ্রবণ কর, তখন কেন বল নাই যে, ইহা আমাদের জন্য অনুচিত। হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র ও মহান এবং মিথ্যা সাক্ষ্য জঘন্য অপরাধ।”

(৭) যাহারা নিজের লোভ-লালসা ও কু-ইচ্ছা-পরিপূর্ণ করতঃ জীবনের কাল কাটাইয়াছে, রোজ হাশরে তাহাদের পদদ্বয়কে মাথার চুল দ্বারা কপালের উপর কষিয়া বাঁধিয়া দেওয়া হইবে। তখন তাহাদের শরীর হইতে অত্যধিক দুর্গন্ধ নির্গত হইবে। যেমন, আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করিয়াছেন, “ইহারাই সেই লোক, যাহারা আখেরাতের, বিনিময়ে দুনিয়াকে খরিদ করিয়াছে”।

(৮) আর যাহারা আল্লাহর হক আদায় করিতে গড়িমসি ও অবজ্ঞা করিয়াছে, রোজ হাশরে তাহাদিগকে পাগলের মত কম্পিত কলেবরে উঠান হইবে। যেমন, আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করিয়াছেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের পরিশ্রম- অর্জিত ও আমার প্রদত্ত পবিত্র বস্তু হইতে দান-খয়রাত কর।”

(৯) পরনিন্দাকারী, পরদোষ অন্বেষণকারী, দুর্নাম রটনাকারী ও চোগলখোরকে রোজ হাশরে গন্ধক অথবা কেতরানের বস্তু পরাইয়া হাশর ময়দানে উঠান হইবে। যেমন, আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করিয়াছেন, “পরদোষ তালাস করিও না এবং কাহারও পশ্চাতে নিন্দা বা বদনাম করিও না। তোমাদের কেহ স্বীয় মৃত ভাইয়ের মাংস খাইতে পছন্দ করে কি? অতএব ইহাকেও তোমরা ঘৃণা কর।”

(১০) চোগলখোরদের জিহ্বাকে অনেক দীর্ঘ করিয়া হাশর ময়দানে উত্থিত করা হইবে। 

(১১) যাহারা মসজিদে বসিয়া দুনিয়াদারীর কথাবার্তা বলিয়াছে তাহাদিগকে পাগলের মত করিয়া হাশরের মাঠে উঠান হইবে। যেমন, আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করিয়াছেন,- (“ফাইন্নাল্ মাছাজ্বিদা লিল্লাহি ফামা তা মা আল্লাহি আহাদা”) অর্থাৎ "মসজিদ আল্লাহর এবাদতের নিমিত্ত; তাই উহাতে আল্লাহ তা'আলার সহিত অন্য কাহাকেও স্মরণ করিও না।

(১২) হাশরের ময়দানে সুদখোরদিগকে শূকরের আকৃতিতে উঠান হইবে। যেমন, আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করিয়াছেন,- “তোমরা দ্বিগুণ হারে সুদ ভক্ষণ করিও না।” 

হযরত মাআজ ইবনে জাবাল (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “অনন্ত দয়াময় আল্লাহ কিয়ামতের পরিতাপ ও অনুশোচনার দিন তাঁর উম্মতগণকে বারটি শ্রেণীতে বিভক্ত করিয়া হাশর ময়দানে উপস্থিত করিবেন।

(১) প্রথম শ্রণীকে হাত, পা শূন্যভাবে কবর হইতে উত্থিত করা হইবে এবং আল্লাহর পক্ষ হইতে ঘোষণা করা হইবে যে, 'ইহারা প্রতিবেশীকে যাতনা-কষ্ট দিয়া তাওবাহ না করিয়া মরিয়াছে। এইজন্য পরিণামে তাহারা প্রজ্বলিত নরক মাঝে পতিত হইবে।' যেমন, আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করিয়াছেন, “তোমরা পাড়া-প্রতিবেশী, নিকটাত্মীয় ও দূর সম্পর্কীয় আত্মীয়দের সহিত সৌহার্দ বজায় রাখিও।”

(২) দ্বিতীয় শ্রেণী- যাহারা নামাযে শৈথিল্য প্রদর্শন করিয়াছে এবং বিনা তাওবায় মৃত্যু মুখে পতিত হইয়াছে। রোজ হাশরে তাহাদিগকে চতুষ্পদ জন্তু অথবা শূকরের আকৃতিতে হাশর ময়দানে উত্থিত করা হইবে এবং আল্লাহর পক্ষ হইতে ঘোষণা করা হইবে, “ইহাই তাহাদের উপযুক্ত দন্ড এবং পরিশেষে তাহারা দোযখে নিক্ষিপ্ত হইবে।” যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “যাহারা নিজের নামায আদায়ে শৈথিল্য প্রদর্শন করিয়াছে তাহাদের ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী।”

(৩) তৃতীয় শ্রেণীর উদর পাহাড়ের মত বিশাল ও বিস্তৃত এবং ইহা খচ্চরের মত ভীষণ ও প্রকান্ড সর্প ও বিচ্ছুতে ভরপুর থাকিবে। এমতাবস্থায় তাহারা হাশর ময়দানে উপস্থিত হইলে আল্লাহর তরফ হইতে উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করা হইবে যে, “ইহারা যাকাত আদায় না করিয়া তাওবাহ ব্যতীত মারা গিয়াছে। এইজন্য জ্বলন্ত নরকানলে প্রবেশ করাই তাহাদের পক্ষে শ্রেয়। যেমন, আল্লাহ পাক এরশাদ করিয়াছেন, “যাহারা সোনা-রূপা জমা করে কিন্তু উহা হইতে আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না, তাহাদিগকে কঠিন আযাবের সুসংবাদ প্রদান কর।” সেই প্রতিদান দিবসে প্রতিটি অর্থকড়ি দোযখের আগুনে উত্তপ্ত করিয়া তাহাদের পার্শ্বদেশে, পৃষ্ঠে ও কপালে দাগ দেওয়া হইবে এবং বলা হইবে, “ইহাই তোমাদের সঞ্চিত ধনরাশি, এখন ইহার আযাব ভোগ কর।”

(৪) চতুর্থ শ্রেণীকে এমন অবস্থায় হাশর ময়দানে উত্থিত করা হইবে যে, তাহাদের মুখ হইতে রক্ত ও অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বাহির হইবে এবং পেটের নাড়িভূড়ি বিক্ষিপ্তভাবে ইতস্ততঃ পড়িয়া থাকিবে। আল্লাহর তরফ হইতে জনৈক ঘোষক ঘোষণা করিবে যে, “তাহারা বেচা-কিনায় মিথ্যার আশ্রয় লইয়া তাওবাহ ছাড়া মরিয়াছে। অতএব অনলকুন্ডে প্রবেশ করাই তাহাদের উপযুক্ত প্রতিফল ।” যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন “যাহারা স্বল্পমূল্যের বদলে আল্লাহর অঙ্গীকার ও নিজের ওয়াদাকে বিক্রয় করে, তাহাদের জন্য আখেরাতে নেকীর কোন অংশই থাকিবে না।”

(৫) পঞ্চম শ্রেণী এমনভাবে কবর হইতে উত্থিত হইবে যে, তাহাদের শরীর হইতে লাশের চেয়ে অধিক দুর্গন্ধ বাহির হইবে। তখন আল্লাহর তরফ হইতে ঘোষণা করা হইবে যে, “তাহারা প্রকৃতই আল্লাহকে ভয় না করিয়া মানুষের ভয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে গুনাহ করিয়া তাওবাহ ছাড়া মরিয়াছে। ইহাই তাহাদের জন্য উপযুক্ত প্রতিফল এবং পরিণামে তাহারা নরককুন্ডে প্রবিষ্ট হইবে।” যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “তাহারা গুনাহকে লোকচক্ষুর অন্তরাল করে কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টি হইতে লুকাইতে সক্ষম হয় না, কেননা তিনি তাহাদের সঙ্গেই বিরাজমান।”

(৬) ষষ্ঠ শ্রেণীকে গলদেশ কাটা অবস্থায় হাশর ময়দানে উত্থিত করা হইবে। ইহারা মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়াছিল এবং তাওবাহ ছাড়া মৃত্যুবরণ করিয়াছিল। এইজন্য তাহাদের এই শাস্তি হইয়াছে এবং শেষকালে তাহারা দোযখে নিক্ষিপ্ত হইবে। যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “তোমরা মিথ্যাকথা হইতে বাঁচিয়া থাক এবং আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপনের পর তাঁহার সহিত অংশী স্থাপন করিও না।” এই প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক আরও এরশাদ করিয়াছেন, “যাহারা মিথ্যা সাক্ষ্য দান করে না এবং খেলাধূলার নিকটবর্তী হইলে পুণ্যবানদের পথ অনুসরণ করে” (তোমরাই প্রকৃত বিশ্বাসী)।

(৭) সপ্তম শ্রেণী এমতাবস্থায় কবর হইতে উত্থিত হইবে যে, তাহাদের মুখে জিহ্বা থাকিবে না এবং তাহাদের মুখ হইতে পুঁজ ও বমি নির্গত হইবে, তখন আল্লাহর তরফ হইতে ঘোষণা করা হইবে যে, “তাহারা সত্য সাক্ষ্য গোপন করিয়া তাওবাহ ছাড়া মরিয়াছিল। কাজেই ইহাই তাহাদের উপযুক্ত শাস্তি।” যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “তোমরা সত্য সাক্ষ্য গোপন করিও না আর যে গোপন করিল, সে যেন তাঁহার হৃদয়কে পাপে আচ্ছাদিত করিল, বস্তুতঃ আল্লাহ পাক তোমাদের কার্যাবলী সম্পর্কে পরিজ্ঞাত।”

(৮) অষ্টম শ্রেণী অবনত মস্তকে কবর হইতে উত্থিত হইবে এবং তাহাদের পদদ্বয় মাথার উপর দৃঢ়ভাবে বাঁধিয়া দেওয়া হইবে। তাহাদের যৌনাঙ্গ হইতে রক্ত, পুঁজ ও ছাদীদের স্রোতধারা প্রবাহিত হইবে। আল্লাহর পক্ষ হইতে ঘোষণা করা হইবে, "ইহারা ', ব্যভিচার করিয়া বিনা তাওবায় মরিয়াছিল।” এইজন্য দোযখে পতিত হওয়া ও এমতাবস্থায় হাশরে উঠা যথার্থ হইয়াছে।” যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “তোমরা জিনার সন্নিকটে যাইও না, নিশ্চয়ই ইহা লজ্জাকর কাজ এবং নিতান্ত মন্দ পথ।”

(৯) নবম শ্রেণী কৃষ্ণ মুখমন্ডল ও রক্তবর্ণ চক্ষুবিশিষ্ট আকারে হাশরে উপস্থিত হইবে এবং তাহাদের পেট আগুনে ভরপুর থাকিবে। তখন আল্লাহর অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করিয়া মরিয়াছিল, সুতরাং দোযখে প্রবিষ্ট হওয়া এবং এমতাবস্থায় হাশর হওয়া ঠিকই হইয়াছে । যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “অবশ্যই যাহারা এতীমদের ধন-রত্ন গর্হিতভাবে আত্মসাৎ করিয়াছে, তাহারা যেন আগুন দ্বারা নিজেদের পেট ভর্তি করিয়াছে এবং সত্বরই তাহারা দোযখে প্রবিষ্ট হইবে।” 

(১০) দশম শ্রেণী কুষ্ট ও শ্বেত রোগাক্রান্ত হইয়া হাশর মাঠে উত্থিত হইবে। তখন আল্লাহর পক্ষ হইতে ঘোষণা করা হইবে যে, তাহারা পিতা-মাতার সহিত অসদ্ব্যবহার করিয়া বিনা তাওবায় মরিয়াছিল। অতএব ইহাই তাহাদের উপযুক্ত শাস্তি এবং পরিণামে তাহারা দোযখবাসী হইবে।” যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “তোমরা আল্লাহর এবাদত কর, তাঁহার সহিত কাহাকেও অংশী স্থাপন করিও না আর পিতা-মাতার সহিত সদাচরণ কর।”

(১১) একাদশ শ্রেণী এমতাবস্থায় হাশরে উত্থিত হইবে যে, তাহাদের দন্ডরাজি ষাড়ের শিং-এর ন্যায় দীর্ঘ ও তীক্ষ্ণ, ওষ্ঠদ্বয় বক্ষের উপর ঝুলানো, জিহ্বা পেট ও রানের উপর লম্বমান হইবে এবং উদর হইতে গলিত ধাতু নির্গত হইবে। তখন আল্লাহর তরফ হইতে ঘোষণা করা হইবে যে, “পৃথিবীতে তাহারা ছিল শরাবখোর। তাহারা বিনা তাওবায় মরিয়াছিল। এইজন্য ইহাই তাহাদের উপযুক্ত শাস্তি এবং পরিণামে তাহারা দোযখী হইবে।” যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “হে ঈমানদারগণ! শরাব, জুয়া, শরাঘাতে প্রাণীকে মারা ও আজলাম অপবিত্র। ইহা শয়তানের কুকর্ম মাত্র। অতএব তোমরা এই সকল হইতে দূরে থাক, তোমরা সফল হইবে।”

(১২) দ্বাদশ শ্রেণীকে এমতাবস্থায় হাশরে উত্থিত করা হইবে যে, তাহাদের চেহারা পূর্ণিমার চাঁদের মত সমুজ্জ্বল হইবে। তাহারা চক্ষুর দৃষ্টি হরণকারী বিজলীর মত তীরবেগে পুরছিরাত পার হইবে। তখন আল্লাহর তরফ হইতে জনৈক ফেরেশতা ঘোষণা করিবে, “তাহারা পৃথিবীতে নেককাজ করিয়াছিল এবং সময় মত জামাতের সহিত পাঁচ ওয়াক্ত নামায সম্পাদন করিয়াছিল আর তাওবাহ করিয়া মরিয়াছিল। অতএব ইহাই তাহাদের উপযুক্ত পুরস্কার। পরিণামে তাহারা বেহেশতে প্রবেশ করিবে।” যেমন, আল্লাহ পাক আরও ঘোষণা করিয়াছেন, “তোমরা ভয় ও চিন্তা করিও না এবং ওয়াদাকৃত জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ কর।" আল্লাহ পাক আরও ঘোষণা করিয়াছেন, “আল্লাহ তায়ালা তাহাদের উপর রাজী আছেন এবং তাহারাও আল্লাহর উপর পরিতুষ্ট থাকিবে । ইহা সেই ব্যক্তির জন্য, যে নিজ প্রতিপালককে ভয় করে।”


পরবর্তী পর্ব
প্রাণী জগতের কবর হইতে পুনরুত্থান

শনিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৪

ইশক বা প্রেম-আসক্তি



ইশক বা প্রেম-আসক্তি
📚আত্মার আলোকমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ইশক —
‘মহব্বত' বলতে কোন সুন্দর ও মনোরম বস্তুর প্রতি অন্তরে আগ্রহ ও আকর্ষণ সৃষ্টি হওয়াকে বুঝায। এই আগ্রহ ও আকর্ষণই যখন অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে তীব্রতর রূপ ধারণ করে, তখন তার নাম হয় ‘ইশক’। এই ইশকের ক্ষেত্রে সর্বশেষ পর্যায়ে আশেক বা প্রেমিক ব্যক্তি প্রেমাস্পদের জন্য নিবেদিত প্রাণ দাসানুদাসে পরিণত হয়। স্বীয় প্রেমাস্পদের খাতিরে নিজের ধন-দৌলত, মান-সম্মান সব অকাতরে বিসর্জন দেয়।
প্রেমিকা যুলায়খা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ইশকে উন্মত্ত হয়ে স্বীয় রূপ-গুণ ও ধন-সম্পদ সবকিছু বিলীন করে দিয়েছিলেন। সত্তরটি উটের বোঝা পরিমাণ তার স্বর্ণ-রৌপ্যের অলংকার ছিল; এসবকিছুকে তিনি একমাত্র হযরত ইউসুফের জন্য উৎসর্গ করে দেন। যে কেউ তার কাছে এসে যদি শুধু এতটুকু বলতো যে, আমি তোমার ইউসুফকে দেখেছি, তা হলে বলার সাথে সাথে তাকে একটি অমূল্য স্বর্ণের মালা উপহার দিয়ে জীবনের তরে ধনবান করে দিতেন। 
অবশেষে তিনি নিজে সম্পূর্ণ রিক্ত হস্ত দরিদ্রে পরিণত হয়েছিলেন। তার এ অবস্থাকে কেন্দ্র করে লোকমুখে প্রবাদ প্রচলিত ছিল — 'ইউসুফের নামে সর্বস্ব'। 
ইশক ও মহব্বতের আতিশয্যে তিনি সবকিছু থেকে উদাসীন ও বিস্মৃত হয়ে যেদিকে তাকাতেন, সেদিকেই কেবল ইউসুফ আর ইউসুফই দেখতে পেতেন; এমনকি আসমানের তারকারাজিতেও তিনি ইউসুফের নাম লেখা দেখতেন। 
বর্ণিত আছে — এই যুলায়খা যখন ইসলামে দীক্ষা গ্রহণ করেন তথা ঈমানী নুর লাভে ধন্য হন, অতঃপর হযরত ইউসুফের (আ.) সাথে প্রণয়সূত্রে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ তখন তিনি তার থেকে পৃথক হয়ে নিরব একাকীত্বে এমনভাবে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হয়ে যান যে, শুধুমাত্র এই ইবাদতের জন্য তিনি সর্বপ্রকার জাগতিক সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণরূপে নির্লিপ্ত হয়ে থাকেন। 
হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম যখন পেয়ার-সোহাগের জন্য দিনের বেলায় তাঁকে আহবান করতেন, তখন তিনি রাতের ইঙ্গিত করে মুলতবী করতেন। আবার যখন রাতে আমন্ত্রণ জানাতেন, তখন দিবসের কথা বলে নিস্কৃতি চাইতেন। 
একদা হযরত ইউসুফকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন : 'হে ইউসুফ ! আল্লাহ্ তা'আলার  পরিচয় লাভ করার পূর্বে আমি তোমাকে ভালবাসতাম; এখন আমি আল্লাহ্ তা'আলার পরিচয় পেয়ে গেছি; তাই একমাত্র তার মহব্বত ও ভালবাসা ছাড়া আমার অন্তর থেকে সকল গায়রুল্লাহর মহব্বত দূর হয়ে গেছে এবং এজন্যে আমি কোন বিনিময়ও কামনা করি না।' 
হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম বললেন : “হে যুলায়খা ! আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে হুকুম করেছেন। এবং বলেছেন যে, তোমার গর্ভ থেকে দুটি পুত্রসন্তান জন্ম নিবে এবং তাদেরকে নুবুওয়াত প্রদান করা হবে। 
যুলায়খা বললেন : “যেহেতু আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে হুকুম করেছেন এবং এজন্যে আমাকে উপায় ও ওসীলা হিসাবে নির্ধারণ করেছেন, তাই এ হুকুম আমার জন্য শিরধার্য। অতঃপর তিনি মিলনে সম্মত হন।
প্রেমাস্পদের তরে আত্মলীন–
একদা লায়লার প্রেমিক মজনুকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল– তোমার নাম কি? 
সে বলেছিল, আমার নাম লায়লা ! বস্তুতঃ প্রেমাস্পদের তরে আত্মলীন হওয়ার ফলশ্রুতিতে নিজের অস্তিত্ব বিস্মৃত হওয়ার কারণেই এমনটা হয়েছে। 
এক ব্যক্তি মজনূকে বলেছিল কিহে মজনু ! লায়লা কি মরে গেছে? 
সে উত্তর করেছিল লায়লা অবশ্যই মারা যায় নাই, সে আমার অন্তরে বিরাজমান; আমিই লায়লা। 
একদা মজনু লায়লার বাড়ীর পার্শ্ব দিয়ে যাওয়ার সময় আসমানের দিকে দৃষ্টি উচু করে দেখছিল। তখন এক ব্যক্তি বলেছিল– “হে মজনু ! আকাশের দিকে তাকাচ্ছ কেন? লায়লার গৃহপ্রাচীরের দিকে দৃষ্টি কর, এভাবে হয়ত তাকে এক নজর দেখে নিতে পারবে। 
তখন মজনু বলেছিল : "আমি আকাশের তারকারাজি দেখছি, এগুলো আমার কাছে অতি প্রিয়; কারণ, এগুলোর ছায়া লায়লার বাড়ীর উপর পতিত হয়।"
মহব্বতের হাকীকত–
মনসূর হাল্লাজ সম্পর্কে বর্ণিত আছে, লোকেরা তাঁকে আঠার দিন। পর্যন্ত বন্দী করে রেখেছিল। 
এ সময় হযরত শিবলী (রহঃ) তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন : “হে মনসূর ! বলুন, মহব্বতের হাকীকত কি? তিনি বলেছিলেন : আজকে নয়, আগামী কল্য জিজ্ঞাসা করবেন। 
পরের দিন লোকেরা তাকে বন্দীশালা থেকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাচ্ছিল। তখন হযরত শিবলীও সে পথ অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন। মনসূর তাকে দেখে চিৎকার করে বললেনঃ হে শিবলী ! শুনে নিন - মহব্বতের হাকীকত হচ্ছে, সূচনাতে অগ্নিদগ্ধ হওয়া আর পরিণামে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া।
মনসূর যখন এ বাস্তব সত্যকে প্রত্যক্ষ করলেন যে, একমাত্র আল্লাহর সত্তা চিরঞ্জীব, শাশ্বত; আর সবকিছুই ভঙ্গুর ও ধ্বংসপ্রাপ্ত, অনুরূপ তিনি যখন দৃঢ়ভাবে হৃদয়ঙ্গম করে নিলেন এবং অন্তরে তার বদ্ধমূল হয়ে গেল যে, জগতের সবকিছুতে একমাত্র আল্লাহরই সত্তা, কুদরত ও মহিমা বিরাজমান, তখন তিনি নিজের নামটুকুও বিস্মৃত হয়ে গেলেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হতো, আপনি কে? তিনি বলতেন : "আনাল হক" "আমি হক্ব"।
মহব্বতের আলামত —
মহব্বতের আলামত (লক্ষণ) তিনটি— জনৈক বুযুর্গ বলেছেন খাটি মহব্বতের আলামত (লক্ষণ) তিনটি : (১) নিজের বা অপর কোন মাখলুকের নয়। স্বয়ং মাহবুব তথা প্রেমাষ্পদের যবানে কথা বলা । (২) সমগ্র মাখলুকের সংসর্গ ত্যাগ করে কেবল মাহবুবের সান্নিধ্য অবলম্বন করা (৩) অপরাপর সকলের সন্তুষ্টি ও তোষামোদ পরিহার করে কেবল মাহবুবের সন্তুষ্টির জন্য ব্যগ্রচিত্ত হওয়া ।
ইশকের নিগূঢ়তত্ব —
ইশকের নিগূঢ়তত্ব হচ্ছে, গোপনীয়তার পর্দা ও আবরণ উৎখাত করে দেওয়া, আচ্ছাদিত রহস্যাবলী উন্মোচিত করে দেওয়া, প্রেমাস্পদের ধ্যানমগ্নতা ও স্মৃতিচারণের অমৃত আস্বাদ ও উন্মত্ততায় আত্মহারা হওয়া, যেন শরীরের কোন অঙ্গ কর্তন করা হলেও বিন্দুমাত্র অনুভব না হয়।
এক ব্যক্তি ফুরাত নদীর তীরে গোসল করছিল। এমন সময় অপর এক ব্যক্তির কণ্ঠে নিম্নের এ আয়াতটির তিলাওয়াত শুনেছিল? 
"হে অপরাধীরা । আজ তোমরা ভিন্ন হয়ে যাও”। (সুরা ইয়াসীন : ৫৯) 
আয়াতটির তিলাওয়াত শুনার সাথে সাথে এর হৃদয়বিদারক প্রতিক্রিয়ার প্রভাবে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে তৎক্ষণাৎ সে নদীতে ডুবে মারা যায়।
মুহম্মদ আবদুল্লাহ বাগদাদী (রহঃ) বলেছেন : ‘আমি বসরা শহরে জনৈক যুবককে দেখেছি, উচু একটি অট্টালিকার ছাদের উপর থেকে উকি দিয়ে সে পথচারীকে উদ্দেশ্য করে বলছে – ইশক ও মহব্বতের তরে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে কেউ কোনদিন কল্যাণ সাধন করতে পারে নাই। সুতরাং যদি কোন নিবেদিত প্রাণ ব্যক্তি প্রেমাস্পদের তরে প্রাণ বিসর্জন দিতে চায়, তা হলে সে যেন এভাবে মৃত্যুবরণ করে। একথা বলে সে তৎক্ষণাৎ ছাদের উপর থেকে মাটিতে পড়ে গেল । পরক্ষণেই লোকজন তাকে উঠিয়ে দেখে, সে মৃত্যুবরণ করেছে।
হযরত জুনাইদ বাগদাদী (রহঃ) বলেনঃ ‘প্রকৃত তাসাওউফ হচ্ছে সর্বপ্রকার খবর ও অবস্থা থেকে বেখবর ও গাফেল থাকার নাম।
একদা হযরত যুনুন মিসরী (রহঃ) মক্কা মুকারমায় মসজিদে হারামের একটি স্তম্ভের নীচে একজন যুবককে দেখলেন নেহায়েত পীড়িত ও বিবস্ত্র অবস্থায় পড়ে আছে; তার বেদনা ভারাক্রান্ত অন্তর থেকে আহ আহ শব্দ বের হচ্ছে। 
হযরত যুনুন বলেন : এ অবস্থা দেখে আমি তাকে সালাম দিয়ে পরিচয় জিজ্ঞাসা করলাম। সে বললো : আমি একজন মুসাফির আশেক; প্রেম-পীড়িত হয়ে পথে পড়ে আছি। তার উত্তর শুনে আমি বিষয়টি উপলব্ধি করে বললাম : ‘আমিও তোমার মতই একজন। একথা শুনে সে কাঁদতে লাগলো এবং আমিও তার সাথে কাঁদলাম। অতঃপর সে জিজ্ঞাসা করলো : "তুমিও যে কাদলে ?” আমি বললাম : ‘তোমার মত আমিও একজন আশেক মুসাফির। একথা শুনে সে আরও অধিক পরিমাণে কাঁদতে লাগলো এবং এ অবস্থাতেই হঠাৎ সজোরে এক চিৎকার দিয়ে মারা গেল। অতঃপর আমি কাপড় দিয়ে তার শরীর আচ্ছাদিত করে কাফন খরিদ করার জন্য বাজারে গমন করলাম। বাজার থেকে কাফন এনে দেখি, সে নাই। তখন আমি আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললাম : সুবহানাল্লাহ (কোথায় গেল) ! এমন সময় একটি গায়েবী আওয়ায আমার কানে ভেসে আসলো— “হে যুনুন ! সে এমন এক পথিক, যাকে শয়তান আক্রমণ করতে চেয়েছে; কিন্তু পারে নাই, তোমার সম্পদের কিয়দাংশ তাকে স্পর্শ করতে চেয়েছে; তা ও হয় নাই, রিদওয়ান ফেরেশতা তাকে জান্নাতে আহ্বান জানিয়েছে; তা ও সে প্রত্যাখ্যান করেছে। 
আমি জিজ্ঞাসা করলাম : এখন সে কোথায় আছে?  
উত্তর আসলো "যোগ্য আসনে, সর্বাধিপতি সম্রাটের সান্নিধ্যে।" (কামারঃ ৫৪) 
লোকটিকে উক্ত পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। এর কারণ হচ্ছে সে আল্লাহর আশেক ছিল, অত্যধিক ইবাদতে নিমগ্ন থাকতো এবং তওবা ও অনুতাপে দ্রুত অগ্রগামী হতো।
জনৈক বুযুর্গকে ইশক ও মহব্বতের তাৎপর্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছিলেন : 
"মাখলুকের সাথে সম্পর্ক কম রাখবে, অধিকতর নির্জনতা ও একাকীত্ব অবলম্বন করবে, সর্বদা চিন্তাশীল থাকবে, নিচুপ থাকবে, চক্ষু উত্তোলন করবে কিন্তু দৃষ্টিপাত করবে না, সম্বোধন করা হলে শুনবে না, কিছু বলা হলে অনুধাবন করবে না, মুসীবতে ধৈর্যহারা হবে না, ক্ষুধার্ত হলে অনুভব করবে না, বিবস্ত্র হলে খবর থাকবে না, গালি বা ভৎর্সনা দিলে বুঝবে না, মানবকে ভয় করবে না, নির্জনে আল্লাহ তা'আলার ধ্যানে মগ্ন থাকবে, সর্বদা তার প্রতি আকৃষ্ট থাকবে, একাকীত্বে মুনাজাত করবে, পার্থিব ঝঞ্চাটে দুনিয়াদার লোকদের সাথে জড়িত হবে না।
হযরত আবু হুরাব বখশী (রহঃ) মহব্বত সম্পর্কে নিম্নের কয়েকটি পংক্তি আবৃত্তি করেছেন, যেগুলোর সারমর্ম হচ্ছে : ‘পার্থিব কোন ব্যাপারে ধোকায় পড়ো না; প্রতারিত হয়ো না। কেননা : এসবই প্রেমিকের জন্য প্রেমাস্পদের উপঢৌকন। দুঃখ-কষ্ট ও বালা-মুসীবত যা প্রেমাস্পদের পক্ষ থেকে এসে থাকে, সবই সে আনন্দচিত্তে বরণ করে নেয়। অভাব-অনটন ও দারিদ্রকেও প্রেমাস্পদের পক্ষ থেকে নগদ দান, সম্মান ও সন্তুষ্টির প্রতীক জ্ঞান করে নেয়। প্রকৃত প্রেমিকের আরেকটি লক্ষণ হচ্ছে, শত্রুর শত ধিক্কার ও প্রতারণা সত্ত্বেও তার পদঙ্খলন হয় না; বরং উত্তরোত্তর প্রেমাস্পদের প্রতি তার প্রত্যয় ও আসক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে।
একদা হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম একজন যুবকের পার্শ্ব দিয়ে পথ অতিক্রম করছিলেন। যুবকটি বাগানে পানি-সিঞ্চন কার্যে রত ছিল। হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে দেখে সে আরয করলো : “হে আল্লাহর নবী ! আপনি দো'আ করুন, যেন আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে তার মহব্বতের অণু পরিমাণ অংশ দান করেন। হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম বললেন :
“তোমার মধ্যে তা’ সহ্য করার ক্ষমতা নাই।”  
যুবক বললো  : “তা’ হলে অর্ধাণু পরিমাণ মহব্বতের জন্য দো'আ করুন ।”  
অতঃপর হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালাম দো'আ করলেন “হে মহান প্রভু ! এই যুবককে আপনার মহব্বতের অর্ধাণু পরিমাণ দান করুন ।” 
দো'আর পর হযরত ঈসা (আঃ) আপন পথে চলে গেলেন। দীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়ার পর তিনি সেই যুবকের বাড়ীর পার্শ্ব দিয়ে যাওয়ার সময় তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। লোকেরা বললো, বহুদিন যাবত যুবকটি পাগল অবস্থায় কালাতিপাত করছে এবং বর্তমানে সে পর্বতের চূড়ায় চুড়ায় ঘুরে বেড়ায়। 
এ খবর শুনে হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালাম দো'আ করলেন  “হে আল্লাহ্ সেই নওজওয়ানের সাথে আমাকে সাক্ষাৎ করিয়ে দিন।”  
দো'আর পর হযরত ঈসা (আঃ) দেখতে পেলেন– সেই যুবক অসংখ্য পর্বতমালার মাঝখানে একটি উঁচু শিখরে আসমানের দিকে মুখ করে দাড়িয়ে আছে। 
হযরত ঈসা (আঃ) তাকে সালাম দিলেন; কিন্তু সে কোন উত্তর দিল না। পুনরায় হযরত ঈসা নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন  : “আমি ঈসা”। 
এ সময় আল্লাহ’র পক্ষ হতে হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালামের প্রতি ওহী আসলো- “হে ঈসা ! যার অন্তরে আমার মহব্বতের অর্ধাণু পরিমাণও প্রবেশ করেছে, সে কখনও মানুষের আওয়ায শুনতে পারে না। 
শুনে রাখ, - আমার মহত্ব ও পরাক্রমশীলতার কসম, তুমি যদি করাত দিয়ে তাকে চৌচির করে দাও, তবুও সে বিন্দুমাত্রও অনুভব করবে না।” 
যে ব্যক্তি নিজের জীবনে তিনটি বিষয়ের দাবী করেছে; অথচ আত্মাকে অপর তিনটি বিষয়ের কলুষতা হতে মুক্ত করতে পারে নাই, সে নির্ঘাত ধোকায় পড়ে রয়েছে  :  
(১) হৃদয়ে আল্লাহ্’র যিকরের সুমিষ্ট আস্বাদের দাবী করে; অথচ দুনিয়ার মহব্বত পরিত্যাগ করে নাই।
(২) ইবাদতে ইখলাস ও নিষ্ঠার দাবী করে; অথচ মানুষের কাছে সম্মান ও সুযশের লিপ্সা পরিহার করে নাই।
(৩) আল্লাহ্’র মহব্বতের দাবী করে; অথচ নিজেকে তুচ্ছ ও নিকৃষ্টতম জ্ঞান করে না।
হুযূর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন  : “অদূর ভবিষ্যতে আমার উম্মতের উপর এমন এক সময় আসবে, যখন তারা পাঁচটি বিষয়কে ভালবাসবে; কিন্তু সেই সঙ্গে অপর পাঁচটি বিষয়কে ভুলে যাবে, 
(১) তারা দুনিয়াকে ভালবাসবে; কিন্তু আখেরাতকে ভুলে যাবে।
(২) তারা ধন-দৌলতকে ভালবাসবে; কিন্তু এর হিসাব-নিকাশের কথা ভুলে যাবে।
(৩) তারা সৃষ্টিকে ভালোবাসবে, কিন্তু সৃষ্টিকর্তাকে অবহেলা করবে।
(৪) তারা পাপকার্যকে ভালবাসবে; কিন্তু তওবা করতে ভুলে যাবে।
(৫) তারা বড় বড় অট্টালিকাকে ভালবাসবে; কিন্তু কবরের কথা ভুলে যাবে।”
মনসূর ইবনে আম্মার (রহঃ) এক যুবককে নসীহত করতে গিয়ে বলেছিলেন  : “হে যুবক ! তুমি সদা-সর্বদা সতর্ক থাক; যৌবন যেন তোমাকে প্রতারিত না করে; বহু নওজওয়ানকে দেখা গেছে–জীবনের কৃত পাপরাশি হতে তওবা করতে বিলম্ব করেছে, অন্তরে দীর্ঘ আশা পোষণ করেছে, মৃত্যুকে স্মরণ করে নাই আর শুধু বলেছে, আগামী কল্য অথবা পরশু তওবা করবো; এভাবে দীর্ঘ সময় অতীত হওয়ার পর অবশেষে তওবার সুযোগ আর হয় নাই, বঞ্চিত ও প্রতারিত হয়েই সে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে এবং একেবারে রিক্ত হস্তে কবরে গিয়েছে। পার্থিব প্রচুর ধন-সম্পদ, দাস-দাসী, পিতা-মাতা, আওলাদ-পরিজন কিছুই তার উপকারে আসে নাই। যেমন পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন : “(ক্বিয়ামতের দিন) কোন অর্থ-সম্পদ ও সস্তান-সন্ততি কারও কোন উপকারে আসবে না। একমাত্র সেই ব্যক্তি মুক্তি পাবে, যে সুস্থ অস্তঃকরণ নিয়ে আল্লাহ্’র কাছে পৌছবে"।  (শু'আরা  : ৮৮,৮৯) 
ওগো খোদা ! আমাদেরকে মৃত্যুর পূর্বে তওবার তাওফীক দান করুন, গাফলতি ও উদাসীনতা হতে মুক্তি দান করুন, কিয়ামতের ময়দানে আপনার হাবীব সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম উনার শাফা'আত নসীব করুন।(আমিন)
বস্তুতঃ প্রকৃত ঈমানের পরিচয় হচ্ছে, সুযোগের প্রথম মুহূর্তেই তওবা করা, কৃত পাপকার্যের উপর অনুতপ্ত হওয়া, লজ্জা ও অনুশোচনায় ভেঙ্গে পড়া, নশ্বর পৃথিবীর নূন্যতম রিযিক ও দ্রব্যের উপর তুষ্ট থাকা, যাবতীয় দুনিয়াবী ব্যাপারে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত থাকা এবং ইখলাস ও নিষ্ঠার সাথে আল্লাহ্’র ইবাদতে নিমগ্ন থাকা। 
একদা জনৈক কৃপণ ও মুনাফিক ব্যক্তি নিজের স্ত্রীকে কসম দিয়ে বলেছিলো  : “তুমি যদি কোন মিস্কীনকে দান-খয়রাত কর, তা’হলে আমি তোমাকে তালাক দিয়ে দিবো।”  পরবর্তী কোন এক সময়ে একজন মিস্কীন এসে গৃহের দরজায় হাঁক ছেড়ে বললো : “হে গৃহবাসী ! আমাকে আল্লাহ্’র ওয়াস্তে কিছু দান কর”। ঘর থেকে স্ত্রী তাকে তিনটি রুটি দান করলো। রুটি নিয়ে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে অকস্মাৎ সেই মিস্কীন মুনাফিকের সম্মুখীন হয়ে গেলে জিজ্ঞাসা করলো : “তুমি এ রুটি কোত্থেকে পেলে”?  মিস্কীন লোকটি মুনাফিকের গৃহের কথা বললো। অতঃপর সে বাড়ীতে গিয়ে স্ত্রীকে শাসনের স্বরে জিজ্ঞাসা করলো'আমি কি তোমাকে কসম দিয়ে বলি নাই? দান-খয়রাত করলে তালাক দিয়ে দিবো? স্ত্রী বললো : “আমি আল্লাহর নামে দান-খয়রাত করেছি”। এ কথা শুনে মুনাফিক চটে গিয়ে একটি অগ্নিকুণ্ড প্রজ্জ্বলিত করে উত্তপ্ত অগ্নিতে তাকে আল্লাহর নামে ঝাপ দিতে আদেশ করলো। নির্দেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রী গহনা অলঙ্কারে সজ্জিতা হয়ে প্রস্তুত হয়ে গেল। এ সময় মুনাফিক স্বামী তাকে গহনা-অলঙ্কার খুলে ফেলার নির্দেশ দিলে স্ত্রী উত্তরে বললো'বন্ধু বন্ধুর জন্য সাজ-সজ্জা গ্রহণ করে থাকে; এখন আমি আমার প্রিয় বন্ধুর সাক্ষাত লাভে ধন্য হতে যাচ্ছি - একথা বলেই সে অগ্নিকুণ্ডে ঝাপিয়ে পড়লো। অতঃপর মুনাফিক আগুনের গর্তটি উপর দিয়ে ঢেকে রেখে চলে গেলো। তিন দিন পর ফিরে এসে গর্তটি খুলে দেখলো তার স্ত্রী দিব্যি যেমন ছিলো তেমনি সহী–সালামতে জীবিত রয়েছে। এ দৃশ্য দেখে সে বিস্ময়াভিভূত হয়ে গেলো; এমন সময় অদৃশ্য একটি আওয়ায ভেসে আসলো ‘তুমি কি একথা বিশ্বাস কর না যে, অগ্নি আমার প্রিয়জনকে কখনো স্পর্শ করে না।”
ফেরআউনের স্ত্রী হযরত আছিয়া (আঃ) নিজের ঈমানদার হওয়ার বিষয়টি বহুকাল পর্যন্ত ফেরআউন থেকে গোপন করে রেখেছিলেন। অবশেষে বিষয়টি ফেরআউনের গোচরীভূত হওয়ার পর হযরত আছিয়াকে সে বিভিন্নরূপে শাস্তি প্রদানের হুকুম দিল। সেমতে তাঁকে বহু রকমে উৎপীড়ন করা হয়। ফেরআউন তাঁকে বলেছিল : “হে আছিয়া ! তুমি তোমার দ্বীনকে পরিত্যাগ কর”।  কিন্তু হযরত আছিয়া দ্বীন ও ঈমানের উপর অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে স্থিত ছিলেন। পরিশেষে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে কীলক (পেরেক) পুতে দেওয়া হয়েছিল। এ অবস্থায়ও ফেরআউন যখন তাকে দ্বীন ও ঈমান পরিত্যাগ করার নির্দেশ দিচ্ছিল, তখন তিনি উত্তর করছিলেন'হে ফেরআউন ! তুমি আমার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পার; কিন্তু অন্তঃকরণ তো আল্লাহর হাতে; সেখানে তুমি কোনরূপ অধিকার বা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে না; জেনে রাখ, তুমি যদি আমার প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে টুকরা টুকরা করে ফেলো, তাতে আমার ঈমানে কোন প্রকার দুর্বলতা সৃষ্টি হওয়া তো দূরের কথা; বরং এতে আমার ঈমান আরও বৃদ্ধি পাবে। 
এ সময় হযরত মুসা আলাইহিস্ সালাম হযরত আছিয়ার পার্শ্ব দিয়ে পথ অতিক্রম করছিলেন, তখন হযরত আছিয়া তাকে জিজ্ঞাসা করলেন "হে মুসা ! আপনি বলুন খোদা আমার প্রতি সন্তুষ্ট আছেন কিনা'? হযরত মুসা আলাইহিস্ সালাম বললেন : "হে আছিয়া আসমানের ফেরেশতাকুল তোমার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান এবং আল্লাহ্ তা'আলা তাঁদের সম্মুখে তোমার বিষয়ে গৌরব করছেন, তোমার যা মনোবাসনা আছে, আল্লাহর কাছে তুমি এখন তা' চেয়ে নাও, তিনি তোমার দো'আ কবুল করবেন"। 
তখন হযরত আছিয়া দো'আ করলেন; কুরআনের ভাষায়  “হে আমার পালনকর্তা ! আপনার সন্নিকটে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন, আমাকে ফেরআউন ও তার দুষ্কর্ম হতে উদ্ধার করুন এবং আমাকে জালেম সম্প্রদায় হতে মুক্তি দিন"। (তাহরীম : ১১)
হযরত সালমান (রঃ) হতে বর্ণিত ফেরআউন তার স্ত্রী আছিয়াকে প্রখর রৌদ্রে শাস্তি দিতো। তখন ফেরেশতারা আপন আপন ডানার সাহায্যে তাকে ছায়া দান করতো। হযরত আছিয়া তখন বেহেশতে স্বীয় আবাসস্থল দেখতে পেতেন। 
হযরত আবূ হুরায়রাহ্ (রঃ) থেকে বর্ণিত- ফেরআউন তার স্ত্রী আছিয়ার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে চারটি কীলক (পেরেক) পুতে দিয়েছিল এবং বুকের উপর ভারী চাকী বা পেষণ যন্ত্র স্থাপন করে রেখেছিল। এহেন উৎপীড়নের সময় তার চেহারাকে প্রখর উত্তাপময় সূর্যের দিকে ফিরিয়ে দিতো। এ সময় হযরত আছিয়া আকাশ পানে মাথা উঠিয়ে দো'আ করতেন “ওগো খোদা ! তোমার অতি নিকটে বেহেশ্ত মাঝে আমাকে আবাস দান করুন ।”  হযরত হাসান (রঃ) বলেন : 'আল্লাহ্ তা'আলা হযরত আছিয়াকে অতি উত্তমরূপে মুক্তি দান করেছেন এবং বেহেশতে তাঁকে অতি উচ্চ মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি বেহেশতে যেকোন স্থানে বিচরণ করেন এবং পানাহার করে থাকেন'। অতএব সাধকের কর্তব্য হচ্ছে, - সর্বদা আল্লাহর পানাহ্ চাওয়া; একমাত্র তাঁরই নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা। কেননা আপদ-বিপদ ও উৎপীড়ন থেকে মুক্তির জন্য দো'আ করা পুত-চরিত্র নেক বান্দাদের তরীকা ও আদর্শ এবং এটাই প্রকৃত ঈমানের লক্ষণ। 
পরবর্তী পর্ব-

মহব্বত ও অনুরাগ



মহব্বত ও অনুরাগ
📚মুকাশাফাতুল-কুলুব ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

কথিত আছে, এক বিজন প্রান্তরে একটি কুৎসিত-কদাকার দৃশ্যের উপর জনৈক ব্যক্তির দৃষ্টি পতিত হলে জিজ্ঞাসা করেছিল-'তুমি কে?' উত্তরে সে বলেছিল, 'আমি তোমার অন্যায়, অনাচার ও পাপাচারের দৃশ্য'। 

লোকটি বললো-'তোমা হতে মুক্তি পাওয়ার উপায় কি?' 
উত্তরে সে জানালো, 'আমার ধ্বংসাত্মকতা ও বীভৎস রূপ হতে মুক্তি পেতে হলে হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার প্রতি দরূদ পাঠ কর। 

যেমন হাদীস শরীফে আছে: – "আমার উপর দরূদ পাঠ কর। কেননা, এটা তোমার জন্য পুলসিরাতের অন্ধকারে নূর ও জ্যোতির কাজ দিবে। 

জুমা'র দিন যে ব্যক্তি আমার প্রতি আশি বার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ্ তা'আলা তার আশি বৎসরের গুনাহ্ মাফ করে দিবেন।"

জনৈক ব্যক্তি হুযূর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার প্রতি দরূদ পড়ার ব্যাপারে খুবই গাফেল ছিল। 
একদা রাসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনাকে সে স্বপ্নে দেখে যে, তিনি নিজ পবিত্র মুখমণ্ডলকে সেই লোকের দিক হতে ফিরিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। 
সে আরয করলো- 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্! (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আপনি কি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট?' 

হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তিনি বললেন- 'না, অসন্তুষ্ট নই।' 

লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করলো-'তা'হলে আপনি আমার দিকে ফিরে তাকাচ্ছেন না কেন?' 

আল্লাহর রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন,– এর কারণ হচ্ছে এই যে, আমি তোমাকে চিনি না।
 
লোকটি জিজ্ঞাসা করলোঃ হুযূর! আপনি আমাকে না চিনার কারণ কি? অথচ আমি আপনার একজন উম্মতী, আর এ সম্পর্কে উলামায়ে কেরাম বলেছেন-পিতা তার পুত্রকে যেমন চিনে, আপনি আপনার উম্মতের প্রত্যেককে তার চেয়েও বেশী চিনেন। 

হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন : 'উলামায়ে-কেরাম ঠিকই বলেছেন; কিন্তু তুমি আমাকে দরূদ পড়ার মাধ্যমে স্মরণ কর না; উম্মতের প্রত্যেক ব্যক্তিকে আমি আমার প্রতি দরূদ প্রেরণের মাধ্যমে এবং এরই অনুপাতে চিনে থাকি, আমার প্রতি দরূদের পরিমাণ যার যত বেশী, তার সাথে আমার পরিচয় তত বেশী।' 

অতঃপর সেই ব্যক্তি ঘুম থেকে জাগ্রত হয়। স্বপ্নযোগে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার পবিত্র মুখে উক্তরূপ বিবরণ শোনার পর সে দৈনিক একশত বার দরূদ পড়ার দৃঢ় সংকল্প করে। এভাবে সে প্রত্যহ নিজ দায়িত্ব সম্পন্ন করে চলেছে। 

এরপর আরেক বার স্বপ্নের মাধ্যমে তার আল্লাহর রাসূলের যিয়ারত নসীব হলো, তখন হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাকে সম্বোধন করে বললেন: "আমি তোমাকে চিনি এবং কিয়ামতের ময়দানে আমি তোমার জন্য সুপারিশ করবো"।

প্রিয় সাধক! উপরোক্ত ঘটনায় হুযুরের কাছে পরিচিত হওয়ার এবং সুপারিশ পাওয়ার মহান নে'আমত লাভের পিছনে যে কারণটি রয়েছে, তা' হলো, সে আল্লাহর রাসূলের প্রতি আসক্ত হয়েছে এবং তাঁর মহব্বত ও ভালবাসা তার অন্তরে স্থান করে নিয়েছে। 

"হে নবী! আপনি বলে দিন-তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবেসে থাক, তা'হলে আমাকে অনুসরণ কর"। পবিত্র কুরআনের এ আয়াতখানির 'শানে নুযূল' বা অবতরণের পটভূমিও ছিল তাই; 

একদা সাহাবী হযরত কা'ব ইবনে আশরাফ (র.) তাঁর সঙ্গীদেরকে ইসলামে দীক্ষা গ্রহণের জন্য আহ্বান জানালে পর তারা বলেছিল: 'আমরা তো আল্লাহর পুত্রতুল্য; আমাদেরকে তিনি অত্যন্ত ভালবাসেন।' তাদের এ উক্তির জওয়াবেই কুরআনের এ আয়াতখানি নাযিল হয়। এতে আল্লাহ্ তা'আলা হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে হুকুম করেছেন : "বলুন (হে নবী!), তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস, তা'হলে আমাকে অনুসরণ কর।' (আলে-ইমরান: ৩১)

অর্থাৎ,-আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে যে দ্বীন বা জীবন- বিধান নিয়ে এসেছি, আমার অনুসরণ করে তোমাদের বাস্তব জীবনে তা' রূপায়িত কর। এভাবে যদি তোমরা আমার অনুগত হও, তা' হলে তোমরা যে পুরস্কারে ধন্য হবে তা' হচ্ছে,– (কুরআনের ভাষায়) "আল্লাহ্ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। অবশ্যই তিনি পরম দয়ালু ও করণাময়"। (আলে-ইমরান: ৩১)

সত্যিকার মু'মিন ও খোদাভক্তদের আল্লাহ্ তা'আলাকে মহব্বত করার অর্থ হচ্ছে-তাঁরা আল্লাহ্ তা'আলার প্রতিটি আদেশ-নিষেধ পালন করেন, একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার আনুগত্যকে সকল গায়রুল্লাহ'র উপর প্রাধান্য দেন, তাঁর সন্তুষ্টি লাভের জন্য আত্মোৎসর্গ করেন। অনুরূপ, 'সত্যিকার মু'মিন ও খোদাভক্তদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা মহব্বত করেন' এর অর্থ হচ্ছে-'আল্লাহ্ তা'আলা তাদের প্রশংসা করেন, গুণাবলী বর্ণনা করেন, তাদের উত্তম পুরস্কার দান করেন, গুণাহ্ মাফ করেন। দয়া ও অনুগ্রহ করেন, পাপকার্যে লিপ্ত হওয়া থেকে হিফাযত করেন, নেক আমল ও ইবাদতের তাওফীক দান করেন।'

চারটি বিষয় এমন রয়েছে, যেগুলো দাবী করতে হলে অপর চারটি বিষয়ে অভ্যস্থ হতে হবে। অন্যথায় এ দাবীদার মিথ্যুক বলে বিবেচিত হবে:

এক. যে ব্যক্তি বেহেশকে ভালবাসার দাবী করে এবং বেহেশতে প্রবেশের তীব্র অনুরাগ প্রদর্শন করে; অথচ নেক আমল ও ইবাদতে মগ্ন হয় না, সে মিথ্যুক।

দুই যে ব্যক্তি হুযুর সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম উনার প্রতি মহব্বতের দাবী করে; অথচ দ্বীনের খাদেম উলামা ও বুযুর্গানে-দ্বীনকে মহব্বত করে না, সে মিথ্যুক।

তিন, যে ব্যক্তি দোযখাগ্নিকে ভয় করার দাবী করে; অথচ পাপকার্য পরিত্যাগ করে না, সে মিথ্যুক।

চার. যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা'আলার প্রতি মহব্বত ও ভালবাসার দাবী করে; অথচ বালা-মুসীবত ও আপদ-বিপদের পরীক্ষায় অধৈর্য হয়ে শেকায়াত ও অভিযোগ ব্যক্ত করে, সে মিথ্যুক।

হযরত রাবেয়া বসরি (রহঃ) বলেছেন : "মুখে আল্লাহকে মহব্বত করার দাবী কর; অথচ কার্যতঃ তাঁর না-ফরমানীতে লিপ্ত রয়েছো- এটা নিঃসন্দেহে যুক্তিহীন ও অপাংক্তেয় দাবী। বস্তুতঃই যদি তোমার দাবী সত্য হতো, তা' হলে অবশ্যই তুমি তাঁর অনুগত হয়ে চলতে। কেননা, একথা স্বতঃসিদ্ধ যে, সত্যিকারের প্রেমিক প্রেমাস্পদের অনুগত হয়ে থাকে।"

মোটকথা, মহব্বতের চিহ্নই হচ্ছে, মাহবুব বা প্রেমাস্পদের অনুগত হওয়া, তার অনুকরণ ও অনুসরণ করা এবং সর্ববিধ অবাধ্যতা ও অমান্যতা থেকে পরহেয করা।

একদা হযরত শিবলী (রহঃ)-এর নিকট একদল লোক এসে হাজির হলে তিনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তোমরা কারা? উত্তরে তারা বলেছিল : 'আমরা আপনার ভক্ত; আপনাকে আমরা ভালবাসি, মহব্বত করি।' একথা শুনে হযরত শিবলী তাদেরকে লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়তে লাগলেন। পাথরের আঘাত সহ্য করতে না পেরে তারা দৌড়ে পালাতে লাগলো। তখন হযরত শিবলী তাদেরকে প্রশ্ন করলেন: 'কিহে! পালাচ্ছ কেন? প্রকৃতই যদি তোমরা আমাকে ভালবাসতে, তা' হলে আমার পরীক্ষায় তোমরা ধৈর্যধারণ না করে পলায়ন করছো কেন?' অতঃপর হযরত শিবলী (রহঃ) উক্তি করলেন : 'আল্লাহর মহব্বত ও ভালবাসায় যারা মত্ত, তারা খোদায়ী ইশকের শরাব পান করে নিয়েছে; ফলে, তাদের জন্য এ জগত ও মনুষ্য আবাস সংকীর্ণ হয়ে গেছে। তারা আল্লাহর যথার্থ পরিচয় লাভ করেছে; তাই আল্লাহর মহিমা ও পরাক্রমে তারা উন্মত্ত-নিবেদিত। তারা আল্লাহর পেয়ার-আশনাইর অমৃত-সুধায় নেশাবিভোর; তাই আল্লাহর প্রেম সাগরে তারা নিমজ্জিত হয়েছে, তার সান্নিধ্যে মুনাজাত ও প্রেম নিবেদনের আস্বাদে আত্মহারা হয়েছে।' অতঃপর হযরত শিবলী (রহঃ) এ পংক্তিটি আবৃত্তি করলেন : "হে মাওলা! ইশ্ক ও মহব্বতের স্মরণই আমাকে বেহুঁশ করে দিয়েছে। আর প্রকৃত প্রেমিক স্বভাবতঃই বেহুঁশ হয়ে থাকে।'

কথিত আছে, উট যখন মাতাল হয়ে যায়, চল্লিশ দিন পর্যন্ত দানা- পানি গ্রহণ করে না; অথচ পূর্বের তুলনায় কয়েকগুণ অধিক বোঝাও সে বহন করে। এর কারণ হচ্ছে, প্রেমাস্পদের স্মরণ তখন তার অন্তরে উত্তাল তরঙ্গের ঢেউ খেলতে থাকে, প্রিয়তমের অনুরঞ্জনে মাতোয়ারা-আত্মহারা হয়ে খাদ্য গ্রহণে বিস্মৃত হয়ে যায়, অধিকতর বোঝা বহনেও অস্বস্তি অনুভব করে না। 
ওহে সাধক! নিজের ব্যাপারে চিন্তা কর-আল্লাহর জন্য তুমি কি কখনও হারাম ও নিষিদ্ধ বিষয়াবলী পরিহার করেছো? কখনও কি পানাহার ত্যাগ করেছো? একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের লক্ষ্যে কোন কঠিন সাধনায় কি ব্রতী হয়েছো বা ভারী বোঝা বহন করেছো? যদি এগুলোর কোনটাই তুমি করে না থাক, তা' হলে তোমার সকল উক্তি, সকল দাবী অসার ও অর্থহীন। এহেন দাবী না দুনিয়াতে কোন কাজে আসবে, না আখেরাতে কোন উপকারে আসবে; এতদ্বারা তুমি না দুনিয়ার মাখলুকের নিকট সম্মানের পাত্র হবে, না সৃষ্টিকর্তার নিকট পুরস্কারের যোগ্য বিবেচিত হবে।

হযরত আলী রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন: 'বেহেশতের প্রতি অনুরাগী ব্যক্তির লক্ষণ হচ্ছে,- নেক আমল ও ইবাদতের প্রতি দ্রুত ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে
সে ধাধিত হবে। 

আর যে ব্যক্তির অন্তরে দোযখের ভীতি রয়েছে সর্বদা সে নফস ও কু-প্রবৃত্তির বিরোধিতা করবে। অনুরূপ মৃত্যুর প্রতি যে দৃঢ় বিশ্বাসী, সে কখনও পার্থিব মায়া-মোহ ও আস্বাদ-আকর্ষণে মত্ত হবে না।'

হযরত ইব্রাহীম খাওয়াস (রহঃ)-কে মহব্বতের তাৎপর্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন: 'আল্লাহর মহব্বত যার অন্তরে আছে, তার নিজস্ব এরাদা-ইচ্ছা বলতে কিছুই থাকে না। সমুদয় বৃত্তি ও মনোস্কামনা ইক্কের আগুনে দন্ধিভূত হয়ে যায়, স্বীয় সত্তাকে সে আল্লাহর মহিমা ও পরাক্রমের অতল ও অকূল সাগরে নিমজ্জিত করে দেয়।'

পরবর্তী পর্ব

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...