বৃহস্পতিবার, ২৫ মে, ২০২৩

যুহদ তথা সংসার অনাসক্তি - ২



যুহদের ফযীলত -

আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন- 

>“কারূন তার সম্প্রদায়ের সামনে জাঁকজমক সহকারে উপস্থিত হল। যারা পার্থিব জীবন কামনা করত, তারা বলল আহা, কারূনকে যা দেয়া হয়েছে, তা যদি আমাদেরকেও দেয়া হত ! প্রকৃতই সে মহাভাগ্যবান। আর যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছিল, তারা বলল : ধিক তোমাদেরকে, যে ঈমানদার, তার জন্যে আল্লাহ প্রদত্ত সওয়াবই শ্রেষ্ঠ”।

এ আয়াতে যুহদকে আলেমদের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এটা যুহদের চূড়ান্ত প্রশংসা। আরও বলা হয়েছে— 

>“সবর করার কারণে তারা তাদের পুরস্কার দু’বার পাবে”।

তাফসীরকারগণ বলেন : যারা দুনিয়াতে যুহদ করতে গিয়ে সবর করেছে, আয়াতে তাদেরকে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ আরও বলেন–

>“যে ব্যক্তি আখেরাতের ফসল কামনা করে, আমি তার ফসল বাড়িয়ে দেই৷ আর যে দুনিয়ার ফসল চায়, তাকেও দুনিয়ার কিছু অংশ দেই এবং সে আখেরাতে কিছুই পাবে না”।

আরও বলা হয়েছে-

>“আমি কাফেরদের কতককে পরীক্ষা করার জন্যে পার্থিব যে চাকচিক্য ভোগ করতে দিয়েছি, সেদিকে আপনি কখনও লক্ষ্য করবেন না। আপনার পালনকর্তার রিযক শ্রেষ্ঠ ও দীর্ঘস্থায়ী”।

অন্য আয়াতে আছে  - 

>“তারা অখেরাতের বিপরীতে পার্থিব জীবনকে পছন্দ করে৷ এটা কাফেরদের বিশেষণ”।

এ থেকে জানা যায়, মুমিন সেই, যে এর বিপরীত বিশেষণে বিশেষিত হয়। অর্থাৎ, আখেরাতকে পছন্দ করে। 


রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : 

>“যে ব্যক্তি দুনিয়ার কর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকে, আল্লাহ তা'আলা তার কাজ বিশৃঙ্খল ও রূযী অনিশ্চিত করে দেন। সে দারিদ্র্যের সম্মুখীন হয়। তার দুনিয়া ততটুকু অর্জিত হয়, যতটুকু লিখিত আছে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কেবল আখেরাতের চিন্তা করে, আল্লাহ তা'আলা তার প্রচেষ্টাকে সংহত এবং জীবিকাকে সুরক্ষিত রাখেন। তার অন্তর ধনী হয়ে যায় এবং দুনিয়া লাঞ্ছিত হয়ে তার কাছে ধরা দেয়”।

এক হাদীসে আছে, 

>“যখন তোমরা কাউকে চুপ থাকতে ও দুনিয়াতে যুহদ করতে দেখ, তখন তার নিকটবর্তী হওয়ার চেষ্টা কর। কেননা, তাকে প্রজ্ঞা শিখানো হয়”।

আল্লাহ বলেন  : 

>“যে প্রজ্ঞাপ্রাপ্ত হয়, সে অশেষ কল্যাণপ্রাপ্ত হয়”।

অন্য এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে : 

>“যদি তুমি আল্লাহর মহব্বত চাও, তবে দুনিয়াতে যুহদ অবলম্বন কর”।  এতে যুহদকে মহব্বতের কারণ বলা হয়েছে। 


আহলে বায়ত থেকে বর্ণিত এক হাদীসে বলা হয়েছে :

>”যুহদ ও পরহেযগারী মানুষের অন্তরসমূহে ঘুরাফেরা করে। যদি ঈমান ও লজ্জাশীল কোন অন্তর পায়, তবে সেখানে থেকে যায়। অন্যথায় চলে যায়।

হযরত হারেসা (রাঃ) একবার রসূলূল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনার খেদমতে আরয করলেন আমি নিশ্চিতই ঈমানদার।

তিনি বললেন তোমার ঈমানের  স্বরূপ কি? 

হারেসা (রাঃ) আরয করলেন : আমি নিজেকে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছি। দুনিয়ার পাথর ও সোনা আমার কাছে সমান। আমি যেন জান্নাত ও দোযখের মধ্যস্থলে আমার রবের আরশের কাছে দাঁড়িয়ে আছি। রসূলূল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন : তুমি ঠিকই  চিনেছ! এখন এর উপর কায়েম থেকো। অতঃপর তিনি বললেন :  “আল্লাহ তাঁর এই বান্দার অন্তর ঈমানের আলোকে আলোকিত করেছেন”।

এখানে লক্ষণীয় যে, হযরত হারেসা (রাঃ) ঈমানের স্বরূপ যুহদের মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন।


এক আয়াতে অছে,  

>“আল্লাহ যাকে পথ প্রদর্শন করতে চান, তার অন্তর ইসলামের জন্যে উন্মোচিত করে দেন”।

এই অন্তর উন্মোচনের অর্থ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন যখন নূর প্রবেশ করে, তখন তার জন্যে বক্ষ খুলে যায়। সাহাবায়ে কেরাম আরয করলেন এর কোন লক্ষণ আছে কি? তিনি বললেন  : হাঁ, এর লক্ষণ হচ্ছে ধ্বংসশীল দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা, আখেরাতের দিকে প্রত্যাবর্তন করা এবং মৃত্যুর পূর্বে তার প্রস্তুতি নেয়া । এখানে যুহদকে ইসলামের লক্ষণ সাব্যস্ত করা হয়েছে।


এক হাদীসে বলা হয়েছে- 

>“তোমরা আল্লাহর কাছে যথার্থ লজ্জা কর”। 

সাহাবীগণ আরয করলেন “আমরা তো আল্লাহর কাছে লজ্জা করি”। 

তিনি বললেন  : “না, কর না। কারণ, তোমরা এমন ঘর নির্মাণ কর, যাতে বসবাস কর না এবং এমন সামগ্রী সঞ্চয় কর, যা ভোগ কর না”। এই হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, এই উভয় বিষয় আল্লাহর প্রতি লজ্জাবোধ করার পরিপন্থী।


একবার এক স্থান থেকে একটি প্রতিনিধি দল রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করল আমরা মুমিন। তিনি বললেন  : তোমাদের মুমিন হওয়ার পরিচয় কি? তারা বলল “বিপদে সবর করা, সুখ-সাচ্ছন্দ্যে শোকর করা, আল্লাহর নির্দেশে সন্তুষ্ট থাকা এবং শত্রুর উপর বিপদ এলে আনন্দিত না হওয়া”।

রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করলেন যদি তোমরা এমনি হও, তবে যা খাওয়ার নয়, তা সঞ্চয় করবে না, যে ঘর বসবাস করার নয়, তা নির্মাণ করবে না এবং যে বস্তু ত্যাগ কর, তার আগ্রহ করবে না । এই হাদীসে যুদহকে ঈমানের পরিশিষ্ট বলা হয়েছে। 

হযরত জাবের (রাঃ) বলেন : 

রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) খোতবায় এরশাদ করলেন  : 

>“যে ব্যক্তি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে এবং এর সাথে অন্য কিছু মিশ্রিত করবে না, তার জন্যে জান্নাত ওয়াজিব”।

হযরত আলী (রাঃ) দাঁড়িয়ে আরয করলেন : ইয়া রসূলাল্লাহ! অন্য কিছু মিশ্রিত না করার মানে কি? এর ব্যাখ্যা করে দিন। 

তিনি বললেন : “এর অর্থ হচ্ছে দুনিয়াকে প্রিয় মনে করা”। 


কিছু লোক রসূলগণের মত কথাবার্তা বলে, কিন্তু কাজ যালেম শাসকবর্গের মত। অতএব, যার মধ্যে এসব বিষয়ের কোন কিছু নেই, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব। 


হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন : একবার রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর ক্ষুধার অবস্থা দেখে আমি কান্না সামলাতে পারিনি।

আরয করলাম, ইয়া রসূলাল্লাহ ! “আপনি আল্লাহ তা'আলার কাছে খাদ্য প্রার্থনা করেন না কেন”?

তিনি বললেন : “হে আয়েশা, সেই সত্তার কসম, যার কবযায় আমার প্রাণ, যদি আমি আমার পরওয়ারদেগারের কাছে স্বর্ণের পাহাড় প্রার্থনা করতাম, তবে আল্লাহ আমার ইচ্ছামত স্বর্ণের পাহাড় বশীভূত করে দিতেন এবং সে (পাহাড়) আমার সাথে সাথে চলত। কিন্তু আমি দুনিয়ার ক্ষুধাকে তৃপ্তির উপর, দারিদ্র্যকে ধনাঢ্যতার উপর এবং দুঃখকে খুশীর উপর অবলম্বন করে নিয়েছি। হে আয়েশা ! দুনিয়া মোহাম্মদ ও তার পরিবারবর্গের জন্যে উপযুক্ত নয়। আয়েশা! আল্লাহ তা'আলা বড় বড় পয়গম্বরগণের জন্যে যা পছন্দ করেছেন, আমার জন্যেও তাই পছন্দ করেছেন। যে আদেশ তাদেরকে দিয়েছেন, আমার জন্যে তাই মনোনীত করেছেন”।


কোরআন পাকে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন :  “অন্যান্য পয়গম্বরগণ যেমন সবর করেছেন, আপনিও তেমনি সবর করুন”।

আল্লাহর কসম, আমি তাঁর আনুগত্য থেকে পালাতে পারি না। তাদের মত আমিও যথাসাধ্য সবর করব। আল্লাহর তাওফীক ছাড়া সবর করার শক্তিও নেই। 


হযরত উমর (রঃ)-এর খেলাফতকালে যখন অনেক দেশ বিজিত হল, তখন তাঁর কন্যা উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা (রাঃ) পিতার খেদমতে আরয করলেন  : যখন দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিনিধিদল আপনার কাছে আসে তখন আপনি মিহিন বস্ত্র পরিধান করুন এবং আপনি নিজেও খান এবং অপরকেও খেতে দিন। হযরত উমর (রঃ) বললেনঃ হে হাফসা, তোমার তো জানা আছে যে, স্বামীর অবস্থা তার পত্নীই অধিক জানে। হযরত হাফসা বললেন : হাঁ, অবশ্যই। তিনি বললেনঃ তোমাকে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি— তুমি কি জান না যে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তিনি এত বছর নবী রইলেন কিন্তু তিনি ও তাঁর পরিবারবর্গ কখনও দিনের খাদ্য তৃপ্ত হয়ে খেতে পারেননি। তারা দিনে খেলে রাতে অভুক্ত থাকতেন এবং রাতে খেলে দিনে অভুক্ত থাকতেন। 

তুমি জান, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এত বছর পয়গম্বর ছিলেন, কিন্তু খয়বর বিজিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি ও তাঁর পরিবারবর্গ পেট ভরে খোরমাও খেতে পারেননি। তুমি জান, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) একটি কম্বল দু’ভাজ করে তার উপর শয়ন করতেন। এক রাত্রিতে কেউ সেটাকে চার ভাঁজ করে দিল। তিনি তার উপর খুব সুখে নিদ্রা গেলেন। অতঃপর জেগে এরশাদ করলেন  : তোমরা আমাকে রাত্রি জাগরণে বাধা দিয়েছ। এখন থেকে কম্বলকে আগের মত দু'ভাজ করে বিছাবে। 

হযরত উমর (রঃ) বললেনঃ হে হাফসা ! তুমি আরও জান, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) পরার কাপড় ধোয়ার জন্যে খুলতেন এবং ধুয়ে রৌদ্রে দিতেন। ইতিমধ্যে বেলাল (রঃ) এসে নামাযের কথা জানাত। নামাযে যাওয়ার জন্যে উনার কাছে অন্য কাপড় থাকত না। তাই সে কাপড় শুকালেই তিনি নামাযে যেতেন। তুমি জান, বনী কুফরের জনৈকা মহিলা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার জন্যে দুটি চাদর, একটি লুঙ্গি ও একটি উত্তরীয় তৈরি করেছিল এবং এগুলোর মধ্যে প্রথমে একটি চাদর পাঠিয়ে দিয়েছিল। কারণ, অন্যগুলো তখনও তৈরি হয়নি। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এই একটি মাত্র চাদরই গায়ে জড়িয়ে নামাযে বের হলেন। চাদরের দুই প্রান্ত ঘাড়ের কাছে বেঁধে নিয়েছিলেন। কারণ, তখন তাঁর দেহে অন্য কোন কাপড় ছিল না। এভাবেই তিনি নামায পড়লেন। মোটকথা, হযরত উমর কন্যার কাছে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর যুহদের অবস্থা এত বেশী বর্ণনা করলেন যে, হযরত হাফসা কাঁদতে লাগলেন এবং তিনিও সজোরে হু হু করে কেঁদে উঠলেন। মনে হচ্ছিল যেন এখনই তাঁর প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাবে। কোন কোন রেওয়ায়েতে হযরত উমর (রঃ)-এর আরও কথা বর্ণিত আছে 

***************

#যুহদ

#এহইয়া_উলুমিদ্দীন

#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

@everyone

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...