রবিবার, ২৫ জুন, ২০২৩

জিহ্বার বিপদাপদ - (পর্ব - ৮) অভিসম্পাত ও ভর্ৎসনা - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)



জিহ্বার বিপদাপদ - পর্ব - ৮
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

অভিসম্পাত ও ভর্ৎসনা
এটা জন্তু-জানোয়ার, মানুষ ও জড় পদার্থ সকলের জন্যে সমান। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন-
“তোমরা একে অপরকে আল্লাহর লানত, আল্লাহর গযব বা জাহান্নাম দ্বারা অভিসম্পাত করো না।"
হযরত আয়েশা (রাঃ) রেওয়ায়াত করেন- একবার রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) হযরত আবু বকরকে তার এক গোলামের প্রতি অভিসম্পাত করতে শুনলেন। তিনি তাঁর কাছে গিয়ে বললেন : হে আবু বকর, সিদ্দীকও অভিসম্পাত করে? কাবার পালনকর্তার কসম! এ বাক্যটি তিনি কয়েকবার উচ্চারণ করলেন।
হযরত আবু বকর (রাঃ) সেদিনই গোলামটিকে মুক্ত করে দিলেন এবং রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে এসে আরজ করলেন : এখন থেকে আমি কখনও এরূপ ভুল করব না।
এক হাদীসে বলা হয়েছে-
“অভিসম্পাতকারীরা কেয়ামতের দিন সুপারিশকারীও হবে না, সাক্ষ্যদাতাও হবে না।”
লানত তথা অভিসম্পাতের অর্থ আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া। সুতরাং এ শব্দটি তার ক্ষেত্রেই বলা দুরস্ত হবে, যার মধ্যে রহমত থেকে দূরে সরে যাওয়ার বিশেষণ পাওয়া যায়। এরূপ বিশেষণ হচ্ছে কুফর ও জুলুম। অতএব কাফেরের উপর অথবা জালেমের উপর অভিসম্পাত হোক, একথা বলা জায়েয। মোট কথা, শরীয়তে যেমন বর্ণিত আছে, সেসব শব্দ দ্বারা অভিসম্পাত করা উচিত। কেননা, এতে বিপদও আছে। কারণ এটা অদৃশ্য জ্ঞানের দাবী যে, তার অভিশপ্তকে আল্লাহ তাআলা রহমত থেকে দূর করে দিয়েছেন। এটা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানতে পারে না অথবা আল্লাহ আপন রসূলকে বলে দিলে তিনি জানতে পারেন।
জানা উচিত, তিনটি বিশেষণ লানতের দাবী রাখে- কুফর, বেদআত ও পাপাচার। এসব বিশেষণে লানত করার পন্থা তিনটি। প্রথম, ব্যাপক বিশেষণ সহকারে লানত করা; যেমন ‘কাফের, বেদআতী ও ফাসেকদের উপর আল্লাহর লানত হোক' বলা; অথবা ‘ইহুদী, খৃষ্টান, যিনাকার, জালেম ও সুদখোরের উপর লানত হোক বলা। এই উভয়বিধ পন্থায় লানত করা জায়েয। তবে বেদআতীদের উপর লানত করতে সর্বসাধারণকে নিষেধ করা উচিত। কেননা, কোটি বেদআত, তা চেনা, কঠিন। হাদীসে এর জন্যে কোন শব্দ বর্ণিত নেই। তৃতীয় কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লানত করা। উদাহরণতঃ যায়দ কাফের, ফাসেক অথবা বেদআতী হলেও যায়দের উপর অভিসম্পাত হোক বলা যাবে না, কিন্তু শরীয়তে যার উপর লানত প্রমাণিত আছে, তার উপর লানত হোক বলায় দোষ নেই; যেমন ‘ফেরাউন ও আবু জাহলের উপর লানত হোক' বলা, কিন্তু কোন নির্দিষ্ট জীবিত ব্যক্তি কট্টর কাফের হলেও তার উপর লানত করা ঠিক নয়; সম্ভবতঃ সে মৃত্যুর পূর্বে তওবা করতঃ মুমিন হয়ে যাবে।
ইয়াযীদ হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ)-কে হত্যা করেছিল অথবা হত্যার অনুমতি দিয়েছিল। তাকে লানত বলা জায়েয কিনা? এ প্রশ্নের জওয়াব হচ্ছে, হত্যা ও হত্যার অনুমতি উভয়টি যথার্থ প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত হয় না। হত্যা ও হত্যার অনুমতি প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে ঘাতক বলা যায় না। কেননা, হত্যা কবীরা গোনাহ্। কোন মুসলমানকে বিনা প্রমাণে হত্যাকারী বলা যায় না। রসূলে
আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন : যদি কেউ কাউকে কাফের অথবা ফাসেক বলে, বাস্তবে সে এরূপ না হলে যে বলে তার প্রতিই ফিরে আসে। যদি কেউ বলে, “ইমাম হোসাইনের হত্যাকারীর উপর লানত হোক”- তবে এটা জায়েয কিনা? জওয়াব হল- এর সাথে একথাও বলা উত্তম, যদি সে তওবা না করে মরে থাকে, তবে তার উপর লানত হোক। কেননা, তওবার পর মৃত্যুবরণ করারও সম্ভাবনা আছে। দেখ, ওয়াহশী (রাঃ) রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) পিতৃব্য হযরত হামযা (রাঃ)-কে কাফের অবস্থায় শহীদ করেছিলেন। এরপর মুসলমান হয়ে কুফর ও হত্যা সবকিছু থেকে তওবা করেছিলেন। এখন কেউ তার উপর লানত করতে পারবে না। এখানে ইয়াযীদকে লানত করার প্রসঙ্গটি উত্থাপন করার কারণ, আজকাল মানুষ লানত করার ব্যাপারে তড়িঘড়ি মুখ খোলে। অথচ হাদীসে বলা হয়েছে- মুমিন লানতকারী হয় না। সুতরাং যে কাফের অবস্থায় মারা যায়, তাকে ছাড়া কাউকে লানত করা ঠিক নয়। যদি একান্তই মনে চায়, তবে নির্দিষ্ট ব্যক্তির উল্লেখ না করে ব্যাপক বিশেষণ সহকারে লানত করবে। লানত করার চেয়ে আল্লাহ্র যিকির করা উত্তম। এটা না হলে চুপ থাকার মধ্যেই নিরাপত্তা।

পরবর্তী পর্ব-
গান ও কবিতা আবৃত্তি

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...