জিহ্বার বিপদাপদ - পর্ব - ১০
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
হাসিঠাট্টা
আসলে এটাও খারাপ ও নিষিদ্ধ, কিন্তু অল্প হলে দোষ নেই। হাদীসে আছে “আপন ভাইয়ের কথার মধ্যে কথা বলো না এবং তার সাথে ঠাট্টা করো না”। কথার মধ্যে কথা বললে অপরের মনে কষ্ট হয়; তাকে মিথ্যুক ও মূর্খ সাব্যস্ত করা হয়। হাসিঠাট্টার মধ্যে এটা নেই। তবুও হাসিঠাট্টা নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ হচ্ছে বাড়াবাড়ির করা। এতে মন সর্বক্ষণ খেলাধুলা ও কৌতুকে ব্যাপৃত হয়ে পড়ে। খেলাধুলা যদিও মোবাহ, কিন্তু সর্বক্ষণ এতে লিপ্ত থাকা নিষিদ্ধ। অধিক হাসির কারণে অট্টহাসির পথ খুলে যায়, যদ্দরুন অন্তর মরে যায় এবং অন্তরে শত্রুতা সৃষ্টি হয়। ভাবমুর্তি বিনষ্ট হয়ে যায়। হাসি এসব দোষ থেকে মুক্ত হলে নিন্দনীয় নয়। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন- “আমি হাসিঠাট্টা করি, কিন্তু সত্য ছাড়া - মিথ্যা বলি না”। এটা তাঁরই বৈশিষ্ট্য। অন্যদের উদ্দেশ্য তো হয়ে থাকে যেভাবেই হোক কেবল অপরকে হাসানো। হযরত ওমর (রাঃ) বলেন : যে বেশী হাসে, তার ব্যক্তিত্বের প্রভাব হ্রাস পায়। যে আনন্দ গীত গায়, সে মানুষের দৃষ্টিতে পাতলা হয়ে যায়। যে এ কাজ বেশী করে, সে এ নামেই খ্যাত হয়ে যায়। যে বেশী কথা বলে, সে বেশী ভুল করে। যে বেশী ভুল করে তার লজ্জা কমে যায়। যার লজ্জা কম, তার পরহেযগারীও কম। যার পরহেযগারী কম, তার অন্তর মরে যায়। আর একটি কারণ হচ্ছে, হাসির কারণে মানুষ আখেরাত থেকে গাফেল হয়ে যায়।
রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন : “যদি তোমরা জানতে যা আমি জানি, তবে ক্রন্দন করতে বেশী এবং হাসতে কম”। ওহায়ব ইবনে ওয়ারদ কিছু লোককে ঈদুল ফিতরের দিন হাসাহাসি করতে দেখে বললেন : যদি এদের মাগফেরাত হয়ে থাকে, তবে এটা শোকরকারীদের কাজ নয়। আর মাগফেরাত না হয়ে থাকলে এটা ভীতদেরও কাজ নয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন : যে ব্যক্তি গোনাহ করে হাসে, সে কাঁদতে কাঁদতে দোযখে যাবে।
যে হাসি সরবে হয় তাই খারাপ। অর্থাৎ যা মুচকি হাসির চেয়ে বেশী তা নিষিদ্ধ। নীরব হাসি, যাকে আরবীতে ‘তাবাস্সুম' বলা হয়, তা ভাল। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) তিনিও মুচকি হাসতেন।
এক্ষণে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর হাসি ঠাট্টা কিরূপ ছিল, তার কয়েকটি নমুনা পেশ করা হচ্ছে। হযরত হাসান (রাঃ) রেওয়ায়াত করেন, এক বৃদ্ধা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে হাযির হলে তিনি তাকে বললেন : কোন বৃদ্ধ জান্নাতে যাবে না। এ কথা শুনে বৃদ্ধা কান্না জুড়ে দিল। তিনি বললেন, আরে, কাঁদ কেন? তুমি যখন জান্নাতে যাবে, তখন বৃদ্ধ থাকবে না, ষোড়শী হয়ে যাবে। আল্লাহ্ তাআলা বলেছেন : চলো আমি তাদেরকে আবার সৃষ্টি করব এবং কুমারী যুবতীতে পরিণত করব। যায়দ ইবনে আসলাম রেওয়ায়াত করেন, উম্মে আয়মন নাম্নী জনৈকা মহিলা রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে এসে আরজ করল : আমার স্বামী আপনাকে দাওয়াত দিচ্ছে। তিনি বললেন : তোমার স্বামী কি সেই ব্যক্তি নয়, যার চোখে শুভ্রতা আছে? মহিলা বলল, তার চোখ তো ভাল । তাতে শুভ্রতা নেই। তিনি বললেন : অবশ্যই আছে। মহিলা কসম খেয়ে বলল : নেই। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন : এমন কোন ব্যক্তি নেই, যার চোখে শুভ্রতা নেই। অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষের চক্ষু কোটর সাদা ও কাল হয়ে থাকে।
অন্য একজন মহিলা তাঁর খেদমতে এসে সওয়ারীর জন্যে একটি উট প্রার্থনা করলে তিনি বললেন : আমি তোমাকে সওয়ারীর জন্যে একটি উটের বাচ্চা দেব। মহিলা বলল : বাচ্চা নিয়ে আমি কি করব? তিনি বললেন : উট তো উটের বাচ্চাই হয়ে থাকে।
যাহ্হাক ইবনে সুফিয়ান কেলাবী যারপরনাই কুশ্রী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি যখন বয়াত করার জন্যে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে উপস্থিত হলেন, তখন হযরত আয়েশা (রাঃ)-ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তখন পর্যন্ত পর্দার বিধান ছিল না। বয়াতের পর যাহ্হাক আরজ করলেন : আমার দু'জন স্ত্রী আছে, যারা এই গোরা মহিলা অর্থাৎ হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর চেয়েও ভাল। আপনি বিবাহ করলে তাদের একজনকে আপনার কাছে পাঠিয়ে দেই। হযরত আয়েশা (রাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন : তারা সুশ্রী, না তুমি সুশ্রী? সে বলল : আমি তাদের চেয়ে অনেক ভাল। এই সওয়াল জওয়াব শুনে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) এই ভেবে হাসি সংবরণ করতে পারলেন না যে, এমন সুরত নিয়েও সে নিজেকে সুশ্রী মনে করে।
নায়ীমান আনসারী একজন হাস্যকারী ব্যক্তি ছিল, কিন্তু খুব মদ্যপান করত। মদ্যপানের পর তাকে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে উপস্থিত করা হলে তিনি আপন জুতা দিয়ে তাকে খুব প্রহার করতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও আদেশ করতেন, তাঁরাও জুতা মারতেন। অনেকবার এরূপ প্রহৃত হওয়ার পর একদিন জনৈক সাহাবী বললেন : তোমার প্রতি আল্লাহর লানত। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) সাহাবীকে বললেন : এরূপ বলো না। এ ব্যক্তি আল্লাহ ও রসূলের প্রতি মহব্বত রাখে। এই নায়ীমানের অবস্থা ছিল, মদীনায় কখনও দুধ অথবা অন্য কোন খাদ্যবস্তু এলে সে তা ক্রয় করে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে উপস্থিত করত এবং বলত, হুযুর, এ বস্তুটি আমি আপনার জন্যেই ক্রয় করেছি এবং হাদিয়া এনেছি। যখন সেই বস্তুর মালিক দাম চাইতে আসত, তখন তাকেও রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে উপস্থিত করে বলত, হুযুর অমুক বস্তুর দামটি দিয়ে দিন। তিনি বলতেন : তুমি তো আমাকে হাদিয়া দিয়েছিলে। সে আরজ করত, আমার কাছে দাম ছিল না, কিন্তু মন চাচ্ছিল, আপনি এ বস্তুটি খান। এরপর রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) হেসে দাম দিয়ে দিতেন। অতএব এ ধরনের হাসিঠাট্টা কখনও কখনও করা জায়েয।
পরবর্তী পর্ব-
উপহাস ও কৌতুক

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন