আত্মপ্রসাদের নিন্দা
>“হুনায়ন যুদ্ধে তোমরা নিজেদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে আত্মপ্রসাদে লিপ্ত হলে বটে, কিন্তু তা তোমাদের কোনই উপকার করেনি।”
এখানে আত্মপ্রসাদ নিন্দার ভঙ্গিতে উল্লেখ করা হয়েছে। >“তারা ধারণা করল, তাদের দুর্গসমূহ তাদেরকে আল্লাহর হাত থেকে রক্ষা করবে। অতঃপর আল্লাহর শাস্তি এমন জায়গা থেকে তাদের কাছে আসল যার কল্পনাও তারা করেনি।”
এ আয়াতে কাফেরদের দুর্গ নিয়ে আত্মপ্রসাদের নিন্দা করা হয়েছে। এক হাদীসে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) তিনটি বিষয়কে বিনাশকারী বলে অভিহিত করেছেন। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে আত্মপ্রসাদ।
হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেন : দুটি বিষয় ধ্বংসাত্মক-একটি নৈরাশ্য, অপরটি আত্মপ্রসাদ। এরূপ বলার কারণ এই যে, সৌভাগ্য দুটি বিষয় দ্বারাই অর্জিত হয় একটি চেষ্টা ও অধ্যবসায়, অপরটি কর্মতৎপরতা। নিরাশ ব্যক্তি চেষ্টা করে না, আর যে আত্মপ্রসাদে লিপ্ত, সে নিজেকে সৌভাগ্যশালী বলে বিশ্বাস করে। তাই অর্জন করা থেকে বিরত থাকে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন : (পালা তু্যাক্কু আনফুছাহুম)
ইবনে জুরায়জের মতে এর অর্থ কেউ যেন কোন সৎকাজ করে এ কথা না বলে যে, সে করেছে। যায়দ ইবনে আসলাম বলেন : নিজেকে সৎকর্মপরায়ণ বলে বিশ্বাস করো না। এটা আত্মপ্রসাদ।
উহুদ যুদ্ধে হযরত তালহা (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-কে শত্রুর আঘাত থেকে মুক্ত রাখার জন্যে তাঁর উপর পড়ে গিয়েছিলেন, যাতে শত্রুর আঘাত তাঁর নিজের গায়েই লাগে। ফলে, তাঁর হাতের তালু ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল এবং রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) অক্ষত ছিলেন। এটা একটা মহৎ প্রচেষ্টা ছিল বিধায় তাঁর দৃষ্টিতেও পরবর্তী সময়ে এর যথেষ্ট মাহাত্ম্য ছিল। হযরত উমর (রাঃ) নিজের অন্তর্দৃষ্টি দ্বারা তাঁর এই আত্মপ্রসাদ জেনে নেন এবং বলেন : রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর জন্যে তালহার হাত ক্ষতবিক্ষত হওয়ার পর থেকেই তার মধ্যে আত্মপ্রসাদ পরিলক্ষিত হচ্ছে।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় এই যে, এমন পুণ্যবান সাহাবীও যখন আত্মপ্রসাদ থেকে বাঁচতে পারলেন না, তখন দুর্বলচেতা মানুষ সাবধানতা অবলম্বন না করলে তাদের কি দশা হবে !
হযরত মুতরিফ (রহঃ) বলেন : আমি যদি সারারাত নাক ডাকিয়ে ঘুমাই এবং সকালে এই গাফলতির জন্যে অনুতাপ করি, তবে এটা সারারাত তাহাজ্জুদ পড়ে সকাল বেলায় আত্মপ্রসাদ বা আত্মতৃপ্তিতে লিপ্ত হওয়ার চেয়ে ঢের উত্তম। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন :
>“যদি তোমরা গোনাহ না কর, তবে আমি তোমাদের জন্যে এর চেয়েও মারাত্মক বিষয়ের আশংকা করি। সেটা হচ্ছে আত্মপ্রসাদ।
এখানে আত্মপ্রসাদকে সকল গোনাহের চেয়ে বড় বলা হয়েছে।
বিশর ইবনে মনসুর (রহঃ) সদা এবাদতে মগ্ন থাকতেন। ফলে তাকে দেখলে আল্লাহ ও কিয়ামতের কথা স্মরণ হত। একদিন তিনি দীর্ঘক্ষণ নামায পড়লেন। জনৈক ব্যক্তি পিছন থেকে তাকে দেখল। সালাম ফিরানোর পর তিনি লোকটিকে বললেন : তুমি আমার যে অবস্থা দেখেছ, তাতে আশ্চর্যান্বিত হয়ো না। অভিশপ্ত ইবলীসও ফেরেশতাদের মধ্যে থেকে দীর্ঘকাল পর্যন্ত এবাদত করেছিল। কিন্তু তার পরিণাম কি হয়েছে, তাতো তোমার অজানা নেই। হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে কেউ প্রশ্ন করল : মানুষ কখন খারাপ হয়? তিনি বললেন : “যখন সে নিজেকে ভাল মনে করতে থাকে”।
আল্লাহ তা'আলা বলেন : >“তোমরা অনুগ্রহ প্রকাশ করে ও কষ্ট দিয়ে আপন সৎকর্ম বাতিল করো না।”
অনুগ্রহ প্রকাশ করা হচ্ছে দানকে বড় মনে করার ফল। বলা বাহুল্য, কোন আমলকে বড় মনে করাই আত্মপ্রসাদ বা আত্মপ্রীতি। অতএব জানা গেল যে, আত্মপ্রীতি নিশ্চিতই মন্দ কাজ।
পরের পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন