ক্রোধ, বিদ্বেষ, ঈর্ষা এবং উহা হইতে পরিত্রাণের উপায়--
ক্রোধ সীমা ছাড়াইয়া প্রবল হইয়া উঠিলে জঘণ্য হইয়া থাকে। অগ্নি ক্রোধের মূল এবং অন্তরের উপর ইহার প্রভাব।
শয়তানের সহিত ক্রোধের সম্বন্ধ রহিয়াছে, সে স্বয়ং বলিয়াছে-
>“তুমি আমাকে অগ্নি হইতে সৃজন করিয়াছ এবং তাহাকে (আদমকে) মৃত্তিকা হইতে সৃজন করিয়াছ।”
আগুন সর্বক্ষণ গতিশীল ও চঞ্চল; আর মাটি ধীর ও শান্ত। ক্রোধান্ধ ব্যক্তির সহিত হযরত আদম আলায়হিস্ সালামের সমস্ত সম্বন্ধ ছিন্ন হইয়া শয়তানের সঙ্গে তাহার সম্বন্ধ স্থাপিত হয়।
হযরত ইবনে ওমর রদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-উনাকে জিজ্ঞাসা করিলেন- “ইয়া রাসূলাল্লাহ্, আল্লাহর ক্রোধ হইতে আমাকে দূরে রাখিতে পারে, এরূপ কোন কাজ আছে?” তিনি বলিলেন-
>“তাহা এই যে, তুমি ক্রুদ্ধ হইবে না।”
তিনি আবার নিবেদন করিলেন- “ইয়া রসূলাল্লাহ্, আমাকে এরূপ একটি সংক্ষিপ্ত কাজের কথা বলিয়া দিন যাহাতে আমি উত্তম পরিণামের আশা করিতে পারি।
রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলিলেন-
>“স্বেচ্ছায় ক্রুদ্ধ হইও না”।
তিনি বারবার একই প্রশ্ন করিতেছিলেন এবং রসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) প্রত্যেক বারই ঐ উত্তর দিতেছিলেন।
রসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন-
>“সির্কা যেরূপ মধু ধ্বংস করে, ক্রোধ তদ্রূপ ঈমান ধ্বংস করে।”
হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম হযরত ইয়াহ্ইয়া আলায়হিস্ সালামকে বলিলেন- “ক্রুদ্ধ হইও না।” তিনি বলিলেন- “ইহা সম্ভবপর নহে; কেননা, আমি মানুষ।” হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম বলিলেন-'ধন জমা করিও না।” তিনি বলিলে- "হাঁ, ইহা সম্ভবপর।”
ক্রোধ দমনের ফজিলত--
ক্রোধের মূলোচ্ছেদ মানবের পক্ষে সম্ভবপর নহে। কিন্তু ক্রোধ দমন করা নিতান্ত আবশ্যক। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন :
>“এবং ক্রোধ সংবরণকারী ও মানবের মার্জনাকারীকে (আল্লাহ্ ভালবাসেন)”।
যাহারা ক্রোধ দমন করিতে পারে এই আয়াতে আল্লাহ্ তাহাদের প্রশংসা করিয়াছেন।
রসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন-
>“যে ব্যক্তি ক্রোধ দমন করে আল্লাহ্ তা’আলা তাহার উপর হইতে স্বীয় আযাব বিদূরিত করেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি কর্তব্য পালনে স্বীয় ত্রুটি স্বীকার করে, তিনি তাহার ত্রুটি মাফ করেন এবং যে ব্যক্তি রসনা (জিহ্বা) সংযত রাখে আল্লাহ্ তাহার গোপনীয় দোষ লুক্কায়িত রাখেন।"
তিনি আরো বলেন-
>“যে ব্যক্তি ক্রোধ সংবরণ করিতে পারে কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তাহার অন্তর সন্তোষ দ্বারা ভরপুর করিয়া দিবেন।” তিনি আরও বলেন-
>“দোযখের একটি দ্বার আছে; এই দ্বার দিয়া শরীয়ত বিরুদ্ধ ক্রোধ প্রকাশকারী ব্যতীত আর কেহই প্রবেশ করিবে না।" তিনি আরো বলেন-
>“লোক চুমুকে যাহা পান করে, উহার মধ্যে ক্রোধ পান (সংরবণ) অপেক্ষা আর কোন বস্তু পানই আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় নহে। যে ব্যক্তি ক্রোধ দমন করে, আল্লাহ্ তাহার অন্তর ঈমান দ্বারা পরিপূর্ণ করিয়া দেন।”
হযরত ফুযায়ল ইব্নে আইয়ায (রঃ), হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) এবং আরও কতিপয় বুযুর্গ একবাক্যে বলেন- “ক্রোধের সময় সহিষ্ণুতা এবং লোভের সময় ধৈর্য অপেক্ষা উৎকৃষ্ট কাজ আর কিছুই নাই।”
এক ব্যক্তি হযরত ওমর ইবনে আবদুল আযীয (রঃ)-কে কটু কথা বলিল। তিনি মস্তক অবনত করিয়া বলিলেন- “আমাকে তুমি ক্রুদ্ধ করত শয়তান কর্তৃক আমাকে স্বীয় মর্যাদা হইতে নামাইয়া লইতে চাহিতেছ? ক্ষমতা ও প্রভুত্বের গর্বে আজ আমি তোমার উপর ক্রুদ্ধ হইলে কল্য কিয়ামত দিবস তুমি আমা হইতে প্রতিশোধ গ্রহণ করিবে, ইহা কখনও হইতে পারে না।” এই বলিয়া তিনি নীরব রহিলেন।
একজন নবী আলায়হিস্ সালাম লোকদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন- “এমন কেহ আছে কি, যে আমার উপদেশসমূহ পালন করিবে ও প্রতিজ্ঞা করিবে যে, কখনও ক্রুদ্ধ হইবে না এবং আমার তিরোধানের পর আমার প্রতিনিধি হইয়া থাকিতে ও বেহেশতে আমার সমান মর্যাদা পাইতে আশা করে?”
এক ব্যক্তি স্বীকার করিলেন এবং ঐরূপ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইলেন। তিনি এই ব্যক্তি দ্বারা আরও দুইবার প্রতিজ্ঞা করিয়া লইলেন। অনন্তর সেই ব্যক্তি দৃঢ়তার সহিত স্বীয় প্রতিজ্ঞা পালন করত উক্ত নবী আলায়হিস্ সালামের প্রতিনিধি হইলেন এবং জগতে ‘যুলকুল্' অর্থাৎ দায়িত্ব পালক নামে প্রসিদ্ধি লাভ করিলেন
পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন