তওবা - (পর্ব - ৪)
আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন :
> “হে মুমিনগণ, তোমরা সম্মিলিতভাবে আল্লাহর সামনে তওবা কর — যাতে সফলকাম হও“।
এখানে সকল ঈমানদারকে তওবা করার ব্যাপক আদেশ করা হয়েছে।
> “তোমরা যারা ঈমান এনেছো শুন, তোমরা আল্লাহর সামনে পরিষ্কার মনে তওবা কর।”
এ আয়াতে “নাসূহ” শব্দ ব্যবহার করে বুঝানো হয়েছে যে, আল্লাহর জন্যে খাঁটি ও অবিমিশ্র তওবা কর।
> “আল্লাহ ভালবাসেন তওবাকারীকে এবং ভালবাসেন পবিত্রতা অবলম্বনকারীকে ।” এ আয়াতটি তওবার ফযীলত জ্ঞাপন করে।
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন :
> “যে গোনাহ থেকে তওবা করে, সে সেই ব্যক্তির মত, যার কোন গোনাহ নেই।”
এক হাদীসে দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা হয়েছে- এক ব্যক্তি সফর করতে করতে এক প্রতিকূল জায়গায় বিশ্রামের জন্যে যাত্রা বিরতি করল। সঙ্গে তার পাথেয় বহনকারী উট। লোকটি মাটিতে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর জাগ্রত হয়ে দেখল তার উটটি নেই। সে ক্ষোভে ও দুঃখে ম্রিয়মাণ হয়ে উটটিকে খুঁজতে লাগল। অবশেষে যখন রৌদ্রতাপ, পিপাসা ও ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ল, তখন মনে মনে বললঃ আমি যেখানে ছিলাম, সেখানেই চলে যাব এবং মৃত্যুর অপেক্ষায় শুয়ে থাকব। সেমতে সেখানে পৌঁছে মাথার উপর হাত রেখে শুয়ে পড়ল এবং তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলতেই দেখল পাথেয় বহনকারী উটটি শিয়রের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। উটটি ফিরে পাওয়ার কারণে এই ব্যক্তির যে আনন্দ হতে পারে, তার চেয়ে অনেক বেশী আল্লাহ তা'আলা মুমিন বান্দার তওবার কারণে আনন্দিত হন।
> হযরত হাসান (রঃ) বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-এর তওবা কবুল করলে পর ফেরেশতারা তাঁকে মোবারকবাদ দিল। হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর কাছে এসে বললেনঃ হে আদম, আল্লাহ তা'আলা আপনার তওবা কবুল করায় আপনার কলিজা ঠাণ্ডা হয়েছে নিশ্চয়? হযরত আদম (আঃ) জওয়াব দিলেন জিবরাঈল, যদি তওবা কবুল করার পরও আমাকে সওয়াল করা হয়, তবে আমার ঠিকানা কোথায় হবে?
তখনই তাঁর প্রতি ওহী আগমন করল- হে আদম, তুমি তোমার সন্তানদের জন্যে দুঃখকষ্টও রেখে গেলে এবং তওবাও। অতএব, তাদের মধ্যে যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব, যেমন তোমার ডাকে সাড়া দিয়েছি। আর যে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি কৃপণতা করব না। কেননা, আমার নাম “করীব” (নিকটবর্তী) এবং “মুজীব” (সাড়া দানকারী)। হে আদম, আমি তওবাকারীদেরকে কবর থেকে যখন উত্থিত করব, তখন তারা আসতে থাকবে এবং সুসংবাদ শুনতে থাকবে। তারা যে দোয়া করবে, তা কবুল হবে।
মোটকথা, তওবার সংজ্ঞা হচ্ছে বর্তমানে গোনাহ পরিত্যাগ করা এবং ভবিষ্যতে তা না করার জন্যে সংকল্পবদ্ধ হওয়া, সাথে সাথে অতীতের ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণ করে নেয়া।
এই তওবা তাৎক্ষণিকভাবে ওয়াজিব। কেননা, গোনাহকে ক্ষতিকর মনে করা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যে ব্যক্তি গোনাহ পরিত্যাগ করে না, তার মধ্যে ঈমানের এই অংশটি অনুপস্থিত।
নিম্নোক্ত হাদীসে এ কথাই বুঝানো হয়েছে—
> “যিনাকার ব্যক্তি যখন যিনা করতে থাকে, তখন সে ঈমানদার থাকে না। অর্থাৎ যিনা যে আল্লাহর অসন্তোষ সৃষ্টিকারী একটি গোনাহ, এ বিষয়ের ঈমান যিনাকারের মধ্যে থাকে না। এর অর্থ এই নয় যে, তার মধ্যে মূল ঈমানই থাকে না; অর্থাৎ আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করা। অতএব বুঝা গেল, আল্লাহকে জানা, তাঁর একত্ব স্বীকার করা, তাঁর গুণাবলী, ঐশী গ্রন্থসমূহ এবং রসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা যিনার পরিপন্থী নয়। তাই যিনার কারণে এই ঈমান বিনষ্ট হবে না।
উদাহরণতঃ কোন চিকিৎসক রোগীকে বলল : এটা বিষ। এটা খেয়ো না। যদি রোগী সেই বস্তু খেয়ে ফেলে, তবে বলা হবে যে, সে চিকিৎসকের এ কথাটির সত্যতা স্বীকার করে না এবং এর অর্থ এই হবে না যে সে চিকিৎসকের অস্তিত্ব এবং তার চিকিৎসক হওয়া বিশ্বাস করে না। এ থেকে জানা গেল যে, গোনাহগার ব্যক্তি পূর্ণ ঈমানদার হয় না এবং ঈমান একই বস্তু বিশ্বাস করার নাম হয় না; বরং এর সত্তরের উপর শাখা রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বোচ্চ শাখা হচ্ছে কালেমা তাইয়েবার সাক্ষ্য দেয়া এবং নিম্নতম শাখা হচ্ছে রাস্তা থেকে ক্ষতিকর বস্তু সরিয়ে দেয়া৷
ঈমানের সঠিক দৃষ্টান্ত হচ্ছে মানুষ। আত্মার অনুপস্থিতিতে যেমন মানুষ মানুষ হয় না, তেমনি একত্ববাদ স্বীকার না করলে ঈমান ঈমান হয় না। যে ব্যক্তি কেবল তাওহীদ ও রেসালতের সাক্ষ্য দেয় এবং আমলে ত্রুটি করে, সে এমন মানুষের মত, যার হাত, পা, চক্ষু, কর্ণ ইত্যাদি বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নেই। এরূপ মানুষের মৃত্যু যেমন অতি নিকটে, তেমনি যে ব্যক্তি কেবল কালেমা তাইয়েবা ও রেসালতের সাক্ষ্য দেয়, সেও এই অবস্থার কাছাকাছি। সামান্য ঝড়ো হাওয়ায় তার ঈমানের বৃক্ষ সমূলে উৎপাটিত হয়ে যায়। অর্থাৎ মৃত্যুদূতের আগমনের সময় যে ভীতিপ্রদ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, তার কারণে ঈমান উধাও হয়ে যায়। দুর্বল ঈমান এই পরিস্থিতি বরদাশত করতে পারে না । এরূপ মুমিনের “খাতেমা” তথা জীবনাবসান শুভ না হওয়ার আশংকা থাকে। খাতেমার সময় সেই ঈমানই বাকী থাকে, যার ভিত্তি সার্বক্ষণিক আনুগত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।
কোন কোন গোনাহগার ব্যক্তি আনুগত্যশীল ব্যক্তিকে বলে, আমার মধ্যে ও তোমার মধ্যে পার্থক্য কি? তুমিও ঈমানদার, আমিও ঈমানদার। যেমন লাউগাছ দেবদারু গাছকে বলেছিল, আমিও বৃক্ষ, তুমিও বৃক্ষ। কাজেই আমাদের মধ্যে কোন তফাৎ নেই। কিন্তু জওয়াবে দেবদারু গাছ বলেছিল, নামের অভিন্নতার এই বিভ্রান্তি তোমার তখন দূর হবে, যখন কালবৈশাখীর ঝড় আসবে। তখন তোমার শিকড় উপড়ে যাবে এবং পাতা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। আর আমি পূর্ববৎ সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকব। সুতরাং গোনাহগার ব্যক্তি যদি দোযখ বাসকে ভয় না করে এবং মৃত্যুর পরওয়া না করে, তবে তাকে বলা হবে দেখ, সুস্থ-সবল ব্যক্তি অসুখ-বিসুখের আশংকা করে এবং যখন অসুস্থ হয়ে যায়, তখন মৃত্যুকে ভয় করে। এমনিভাবে গোনাহগারেরও উচিত অশুভ খাতেমাকে ভয় করা। যদি খোদা না করুন, খাতেমা খারাপ হয়, তবে দোযখের অগ্নিতে থাকা জরুরী। কেননা, ঈমানের জন্যে গোনাহ তেমনি, যেমন দেহের জন্যে ক্ষতিকর খাদ্য। ক্ষতিকর খাদ্য পাকস্থলীতে একত্রিত হয়ে আস্তে আস্তে পিত্তাদির মেযাজ বিগড়াতে থাকে, যা মানুষ টের পায় না। এরপর হঠাৎ সে রুগ্ন হয়ে পড়ে এবং মৃত্যুবরণ করে। গোনাহ ঈমানের মধ্যে এমনিভাবে প্রভাব বিস্তার করে এবং একদিন ঈমানকেই ডুবিয়ে দেয়। সুতরাং ধ্বংসশীল দুনিয়াতে মৃত্যুর ভয়ে যখন বিষাক্ত ও ক্ষতিকর খাদ্য না খাওয়া তাৎক্ষণিক ওয়াজিব, তখন চিরন্তন ধ্বংসের ভয়ে ধ্বংসাত্মক কাজকর্ম না করা আরও উত্তমরূপে তাৎক্ষণিক ওয়াজিব হবে।
বিষপানকারী স্বীয় ভুলের জন্যে অনুতপ্ত হয়ে যেমন তৎক্ষণাৎ উদরকে বিষমুক্ত করার জন্যে বমি করতে অথবা অন্য কোন উপায় অবলম্বন করতে সচেষ্ট হয়, তেমনিভাবে যে গোনাহ করে, তার জন্যে গোনাহ থেকে তৎক্ষণাৎ ফিরে আসা ওয়াজিব।
এরপর যতদিন সে জীবিত থাকে, ততদিন এই ক্ষতিপূরণ করতে সচেষ্ট হবে। সুতরাং গোনাহগারের উচিত দ্রুত তওবার প্রতি মনোনিবেশ করা। নতুবা গোনাহের বিষক্রিয়ার ফলে ঈমানের আত্মা প্রভাবিত হয়ে যাবে। এরপর ওয়ায-নসীহত কোন উপকারে আসবে না এবং গোনাহগার ব্যক্তি ধ্বংসপ্রাপ্তদের তালিকাভুক্ত হয়ে নিম্নোক্ত আয়াতের প্রতীক হয়ে যাবে-
> “আমি তাদের গলদেশে চিবুক পর্যন্ত বেড়ি পরিয়েছি, ফলে তারা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে গেছে। আমি তাদের সামনে ও পেছনে প্রাচীর স্থাপন করেছি' এবং তাদের দৃষ্টি আচ্ছন্ন করে দিয়েছি। ফলে, তারা দেখতে পায় না। আপনি তাদেরকে সতর্ক করুন বা না করুন, তারা ঈমান আনবে না।”
এ আয়াতগুলো কাফেরদের সম্পর্কে বলা হয়েছে- এরূপ মনে করে বিভ্রান্ত হওয়া ঠিক নয়। কেননা, পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, ঈমানের শাখা সত্তরেরও বেশী এবং যিনাকার মুমিন অবস্থায় যিনা করে না। এ থেকে জানা যায়, যে ব্যক্তি শাখার অনুরূপ ঈমান থেকে বঞ্চিত হবে, সে খাতেমার সময় মূল ঈমান থেকেও বঞ্চিত হবে, যেমন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যা আত্মার শাখা, তা না থাকলে মানুষের মূল আত্মাও বিলুপ্ত হয়ে যায়। কেননা, শাখা ব্যতীত মূল কায়েম থাকতে পারে না।
পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন