যার সাথে অহংকার করা হয়, তার স্তর এবং অহংকারের ফল—
মানুষ মজ্জাগতভাবে যালেম ও মূর্খ বিধায় সে কখনও স্রষ্টার সাথে এবং কখনও সৃষ্টির সাথে অহংকার করে। এদিক দিয়ে অহংকার তিন প্রকার।
প্রথম, আল্লাহর সাথে অহংকার। এটা সর্বনিকৃষ্ট অহংকার। এর কারণ কেবল মূর্খতা ও অবাধ্যতাই হয়ে থাকে। যেমন নমরূদ অহংকারবশত স্থির করেছিল যে, সে আল্লাহর সাথে লড়াই করবে অথবা যেমন অভিশপ্ত ফেরাউন খোদায়ী দাবী করেছিল। সে আল্লাহর বান্দা হতে অস্বীকার করেছিল। এই প্রকার অহংকার সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন : “ঈসা মসীহ এবং নৈকট্যশীল ফেরেশতাগণ আল্লাহর বান্দা হওয়াকে অপছন্দ করে না। যে কেউ তাঁর বান্দা হওয়াকে অপছন্দ করবে এবং যারাই আমার এবাদত করতে অহংকার করবে, তারা জাহান্নামে দাখিল হবে লাঞ্ছিত হয়ে।”
দ্বিতীয়, রসূলগণের সাথে অহংকার করা। অহংকারী ব্যক্তি নিজেকে সম্মানী ও উচ্চ জ্ঞান করে তাদের মতই কোন ব্যক্তির অনুসারী হতে অস্বীকার করে। এই অহংকার কখনও চিন্তাভাবনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ, রেসালত কি, তা চিন্তাই করা হয় না। এ কারণেই সর্বক্ষণ অহংকারের দরুন মূর্খতার মধ্যে থেকে আনুগত্য করে না এবং নিজেকে সত্যপন্থী বলে ধারণা করতে থাকে। কখনও চিন্তা-ভাবনা করে; কিন্তু মন রসূলগণের আনুগত্য করে না। আল্লাহ তা'আলা কোরআনুল করীমে কাফেরদের অনেক উক্তি উদ্ধৃত করেছেন। যেমন–
>”তারা বলত- আমরা কি আমাদের মতই মানুষকে মেনে নেব?”
>“তোমরা (নবী) তো আমাদের মতই মানুষ।”
>“যদি তোমরা তোমাদের মতই একজন মানুষের অনুগত হয়ে যাও, তবে তোমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে”।
>“যারা আমার সাথে সাক্ষাতের আশা করে না, তারা বলে, আমাদের প্রতি ফেরেশতা অবতীর্ণ হল না কেন অথবা আমরা পরওয়ারদেগারকে দেখে নিতাম। তারা মনের মধ্যে খুব অহংকার পোষণ করে।”
ফেরাউন সম্পর্কে বলা হয়েছে :
>“সে নিজে এবং তার বাহিনী পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে অহংকার করেছে।”
ফেরাউন আল্লাহ ও রসূল উভয়ের সাথে অহংকার করেছিল। সেমতে হযরত ওয়াহাব (রহঃ) বলেন : হযরত মূসা (আঃ) ফেরাউনকে বলেছিলেন : তুমি ঈমান আন। তোমার রাজত্ব তোমার হাতেই থাকবে। ফেরাউন বলল : আমি হামানের সাথে পরামর্শ করে নিই। হামানকে জিজ্ঞেস করলে সে বলল : এখন তো আপনি উপাস্য। লোকজন আপনার উপাসনা করে। ঈমান আনলে আপনি দাস হয়ে যাবেন এবং অন্যের উপাসনা করবেন। অতঃপর ফেরাউন আল্লাহ তা'আলার দাস হতে এবং মূসা (আঃ)-এর অনুসরণ করতে অস্বীকার করল।
মক্কার কোরায়শদের উক্তি কোরআন পাক এভাবে উল্লেখ করেছে :
>“এই কোরআন মক্কা ও তায়েফ এ দুই জনপদের কোন মহান ব্যক্তির উপর নাযিল হল না কেন?”
কাতাদাহ (রাঃ) বলেনঃ এটা ছিল ওলীদ ইবনে মুগীরা এবং আবূ মসউদ ছাকাফীর উক্তি। তারা বলত, মোহাম্মদ তো একজন এতীম বালক। তাকে আল্লাহ কিরূপে আমাদের নবী করলেন? কোন বড় সরদার ব্যক্তিকে নবী করলেন না কেন? আল্লাহ তাদের জওয়াবে বলেন :
“তারাই কি আপনার প্রভুর রহমত বন্টন করে?” কোরায়শরা রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে আরও বলেছিল, আমরা আপনার দরবারে কিরূপে বসতে পারি? এখানে তো দরিদ্র মুসলমানরা সব সময় আনাগোনা করে। তাদের এই হেয় জ্ঞান করার জওয়াবে আল্লাহ বলেন : “আপনি তাদেরকে তাড়িয়ে দেবেন না, যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের প্রভুকে ডাকে। তারা তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে।”
“আপনি নিজেকে তাদের সাথে আবদ্ধ রাখুন, যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের প্রভুকে ডাকে। তারা তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে। আপনার চক্ষু যেন তাদেরকে ছেড়ে অন্যত্র না যায়।”
মোটকথা, কতক কোরায়শ কাফের এমন ছিল, যারা অহংকারের কারণে চিন্তাভাবনা থেকে বিরত ছিল এবং রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যে সত্য নবী ছিলেন, এ বিষয়ে মূর্খ ছিল। আবার কতক এমন ছিল, যারা জানত তিনি সত্য নবী; কিন্তু অহংকারের কারণে মুখে তা স্বীকার করত না। আল্লাহ বলেন : “যখন তাদের কাছে তাদের জানা বিষয় আগমন করল, তখন তারা অস্বীকার করে বসল।' এই দ্বিতীয় প্রকার অহংকার প্রথম প্রকারের চেয়ে কম হলেও তার কাছাকাছি।
তৃতীয়, বান্দার সাথে অহংকার করা, অর্থাৎ নিজেকে বড় ও অপরকে হেয় জ্ঞান করার কারণে কারও আনুগত্য না করা। এটা প্রথম ও দ্বিতীয় প্রকার অহংকারের তুলনায় কম হলেও দু’কারণে খুবই মারাত্মক। প্রথম কারণ, বড়ত্ব, মাহাত্ম্য ও ইযযত সর্বশক্তিমান আল্লাহর জন্যেই শোভনীয়। বান্দা দুর্বল ও অক্ষম বিধায় তার অহংকার করা উচিত নয়। অতএব, বান্দা যখন অহংকার করে, তখন সে যেন আল্লাহ তা'আলার বিশেষ গুণে তাঁর অংশীদার হতে চায়। এটা মাথায় বাদশাহের মুকুট পরিধান করে কোন গোলামের সিংহাসনে বসে পড়ার মত। এখানে চিন্তা করা দরকার যে, বাদশাহ এরূপ গোলামের প্রতি কতটুকু ক্রুদ্ধ হবেন। কেননা, গোলামের কাজটি নিরতিশয় ধৃষ্টতাপূর্ণ। এ কারণেই এক হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন :
>“মাহাত্ম্য আমার পরিধেয় এবং অহম আমার চাদর। এতে যে আমার সাথে বিরোধ করবে, আমি তাকে চুরমার করে দেব”।
বান্দার সাথে অহংকার করা আল্লাহ তা'আলারই বৈশিষ্ট্য বিধায় যে ব্যক্তি বান্দার সাথে অহংকার করবে, সে আল্লাহর সাথে বিরোধকারী সাব্যস্ত হবে। এটা নিঃসন্দেহে মারাত্মক অপরাধ।
দ্বিতীয় কারণ এই যে, অহংকারের কারণে মানুষ আল্লাহ তা'আলার বিধি-বিধানের বিরোধিতা করতে বাধ্য। কেননা, অহংকারী ব্যক্তি যখন কারও মুখ থেকে সত্য কথা শুনে, তখন অহংকারবশত তা মেনে নেয় না; বরং অস্বীকার করতে তৎপর হয়ে উঠে। এ কারণেই যে সকল শিক্ষিত ব্যক্তি ধর্মীয় ব্যাপারাদিতে মোনাযারা তথা বিতর্ক করে, তারা দাবী এটাই করে যে, নিছক সত্য আবিষ্কার করা ও তা প্রতিষ্ঠা করাই উদ্দেশ্য। কিন্তু এরপর তারা সত্যকে মেনে নিতে অহংকারীদের ন্যায় অস্বীকার করে। এক পক্ষের মুখ দিয়ে সত্য প্রকাশিত হয়ে গেলে অপরপক্ষ তা মানে না এবং মিথা প্রমাণ করার জন্যে ও তা খন্ডন করার জন্যে সচেষ্ট থাকে। এটা কাফের ও মোনাফিকদের অভ্যাস। কোরআন পাকে আছে :
>“কাফেররা বলল: তোমরা এই কোরআন শ্রবণ করো না এবং এতে গোলমাল সৃষ্টি কর, যাতে তোমরা প্রবল থাক।”
যারা প্রবল হওয়ার জন্যে এবং অপরকে নিরুত্তর করে দেয়ার জন্যে বাহাস করে—সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যে নয়, তারা এই অভ্যাসে মোনাফিকদের সাথে শরীক।
মোটকথা, মানুষের সাথে অহংকার অত্যন্ত মন্দ অভ্যাস। এর কারণে আল্লাহ তা'আলার বিধানাবলীর সাথে অহংকার হয়ে যায়। অহংকারে বিশ্বজোড়া খ্যাতিসম্পন্ন ইবলীশের কথা কোরআন মজীদে এ কারণেই উল্লিখিত হয়েছে, যাতে মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করে। সে বলেছিল : আমি ៖ মানুষের চেয়ে উত্তম। আমি আগুন দ্বারা সৃজিত, আর মানুষ মাটির দ্বারা। ইবলীশের এই অহংকারের পরিণতিতে সে সেজদার আদেশ মানতে অস্বীকার করেছে। অতএব, তার অহংকার সূচনাতে ছিল আদম (আঃ) -এর সাথে এবং পরিণামে আল্লাহর সাথে হয়ে গেল। ফলে, সে চিরতরে ধ্বংস হয়ে গেল।
বর্ণিত আছে, হযরত ছাবেত ইবনে কায়েস ইবনে শাম্মাম রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করেন : আপনি জানেন, আমি অত্যধিক পরিচ্ছন্নতাপ্রিয়। এটা কি অহংকারে গণ্য হবে? তিনি জওয়াবে বললেন : না, এটা অহংকার নয়; বরং অহংকার হচ্ছে সত্য বিষয়ের অবাধ্য হওয়া, মানুষের দোষ অন্বেষণ করে তাদেরকে হেয় করা। অতএব যে ব্যক্তি নিজেকে অপরের চেয়ে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করে, অন্য মুসলমান ভাইকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখে এবং সত্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রত্যাখ্যান করে, সে বান্দার ব্যাপারাদিতে অহংকারী হবে। অপরপক্ষে যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করতে লজ্জাবোধ করে এবং রসূলের অনুসরণ করে বিনম্র হতে কুণ্ঠিত হয়, সে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ব্যাপারাদিতে অহংকারী হবে।
পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন