মঙ্গলবার, ১১ জুলাই, ২০২৩

অন্তর বা হৃদয় (১৭) শয়তানকে দূরে রাখার উপায়



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ১৭) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শয়তানকে দূরে রাখার উপায় 
এর পূর্বে পর্যন্ত অন্তরের দিকে শয়তানের প্রবেশপথ সম্পর্কে কিঞ্চিৎ বর্ণনা দেয়া হল। তার সবগুলো পথ লিপিবদ্ধ করা আমাদের সাধ্যের বাইরে। তবে জানা উচিত, মানুষের যত মন্দ স্বভাব রয়েছে, সবগুলো শয়তানের হাতিয়ার এবং প্রবেশপথ। এখন প্রশ্ন হয়, শয়তানকে দূরে রাখার উপায় কি এবং তাকে দূরে রাখার জন্যে মুখে “লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” বলে দেয়া যথেষ্ট কি না? জওয়াব, শয়তানের সকল পথ বন্ধ করে দেয়াই অন্তরকে তার কুপ্রভাব থেকে বাঁচিয়ে রাখার উপায়। অর্থাৎ, অন্তরকে যাবতীয় মন্দ স্বভাব থেকে মুক্ত করতে হবে। এর বর্ণনা অত্যন্ত দীর্ঘ। এখণ্ডে কেবল মারাত্মক স্বভাবগুলো বর্ণনা করাই আমাদের লক্ষ্য। প্রত্যেকটি স্বভাবের জন্যে একটি আলাদা অধ্যায় জরুরী ভবিষ্যতে এর বিশদ বর্ণনা হবে।যেমন এখানে এতটুকু বলা জরুরী যে, যখন অন্তর এসব স্বভাব থেকে মুক্ত হয়ে যায়, তখন শয়তান তাতে কেবল আনাগোনাই করতে থাকে- স্থায়ীভাবে আসন গাড়ে না। আল্লাহর যিকির এই আনাগোনার পথে বাধা হয়ে যায়। কেননা, অন্তর কুস্বভাব থেকে মুক্ত হলেই যিকির তাতে স্থায়িত্ব লাভ করে, নতুবা যিকিরও কেবল আনাগোনার পর্যায়ে থেকে যায়। অন্তরের উপর তার কোন ক্ষমতা থাকে না এবং শয়তানকেও দূর করতে পারে না। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা নিম্নোক্ত আয়াতে শয়তান দূর করার বিষয়টিকে মুত্তাকীদের সাথে সম্পৃক্ত করে উল্লেখ করেছেন :

“নিশ্চয় যারা মুত্তাকী, তাদেরকে শয়তান স্পর্শ করলে তারা হুঁশিয়ার হয়ে যায়, অতঃপর তৎক্ষণাৎ চক্ষুষ্মান হয়ে যায়।”

মোট কথা, শয়তানকে ক্ষুধার্ত কুকুরের অনুরূপ মনে করতে হবে। কারও কাছে ভাত, মাংস ইত্যাদি না থাকলে কেবল 'ধ্যাৎ' বললেই সরে যাবে; কিন্তু সামনে খাদ্যসামগ্রী থাকলে ক্ষুধার্ত কুকুর অবশ্যই খাদ্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইবে। তখন কেবল 'ধ্যাৎ' বলে কুকুরকে সরানো যাবে না। এমনিভাবে যে অন্তরে শয়তানের খাদ্য নেই, তার কাছ থেকে শয়তান শুধু যিকির দ্বারা সরে যাবে; কিন্তু কামপ্রবৃত্তি প্রবল হলে অন্তর শয়তানের করায়ত্ত হয়ে যাবে এবং আল্লাহর যিকিরকে দূরে সরিয়ে রাখবে । মুত্তাকীদের অন্তর কুপ্রবৃত্তি ও মন্দ স্বভাব থেকে মুক্ত থাকে বিধায় তাতে শয়তানের আগমন কুপ্রবৃত্তির কারণে নয়; বরং গাফলতির কারণে হয়ে থাকে। যখন তাদের অন্তর যিকির থেকে গাফেল থাকে, তখন নিজের পথ বের করে নেয়। পুনরায় আবার যিকির শুরু করলে শয়তান হটে যায়। এর প্রমাণ, আল্লাহ তাআলা শয়তান দূর করার জন্যে বলেছেনঃ

“অতঃপর আশ্রয় প্রার্থনা কর আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শয়তান থেকে।” এমনিভাবে যিকির সম্পর্কিত আরও অনেক আয়াত এবং হাদীস থেকে একথা প্রতীয়মান হয়। 

হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে- একবার মুমিনের শয়তান ও কাফেরের শয়তান এক জায়গায় মিলিত হল। কাফেরের শয়তান অত্যন্ত স্বাস্থ্যবান মসৃণ ও সুন্দর পোশাক পরিহিত ছিল। অপরপক্ষে মুমিনের শয়তান বিবস্ত্র, শীর্ণ ও ধূলি ধূসরিত ছিল। কাফেরের শয়তান তাকে শুধাল : তুমি এমন শীর্ণ কেন? সে বলল : আমি যার সাথে থাকি, সে পানাহার, বস্ত্র পরিধান এবং মাথায় তেল মালিশ করার সময় 'বিসমিল্লাহ' বলে। ফলে আমি খানাপানি, বস্ত্র ও তেল পাই না। তাই ক্ষুধার্ত, উলঙ্গ ও এলোকেশী হয়ে থাকি। একথা শুনে কাফেরের শয়তান বলল : ভাই, আমি যার সাথে থাকি, সে এসব কাজে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে না। তাই আমি তার সকল কাজে শরীক থাকি। 

মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসে প্রত্যহ ফজরের নামাযের পর এই দোয়া করতেন- “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের উপর এক শত্রুকে ক্ষমতা দান করেছেন, যে আমাদের দোষত্রুটি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। সে এবং তার দলবল আমাদেরকে এমন জায়গা থেকে দেখে, যেখান থেকে আমরা তাদেরকে দেখি না। হে আল্লাহ! অতএব আপনি তাকে আশা থেকে নিরাশ করুন, যেমন তাকে আপনার রহমত থেকে নিরাশ করেছেন। তাকে আমাদের থেকে হতাশ করুন, যেমন আপনার ক্ষমা থেকে হতাশ করেছেন। তার মধ্যে ও আমাদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করুন, যেমন তার মধ্যে ও আপনার রহমতের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করেছেন।” তিনি বলেন: একদিন মসজিদের পথে শয়তানের সাথে আমার সাক্ষাৎ হল। সে জিজ্ঞেস করল: আমাকে চেনেন? আমি বললামঃ তুমি কে? সে বলল, আমি ইবলীস। আমি শুধালাম : কি উদ্দেশে এসেছ? সে বলল : আমি চাই আপনি এই দোয়া কাউকে না শেখান। আমি আপনার পথে কণ্টক হব না। আমি বললাম : আমি কাউকে নিষেধ করব না। যে কেউ পড়তে পারে। তোমার মনে যা চায় তাই কর। 

হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবী লায়লা বলেন : এক শয়তান রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে এয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে নামাযের অবস্থায় আগুনের মশাল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। কেরাআত ও এস্তেগফারের পরও সে সরে যেত না। এরপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে এয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে আরজ করলেন : আপনি এই দোয়া পাঠ করুন “আমি আল্লাহ তাআলার পরিপূর্ণ কালেমাসমূহ দ্বারা আশ্রয় প্রার্থনা করি, যেগুলোর খেলাফ করে না সাধু ও অসাধুরা - সেই বস্তুর অনিষ্ট থেকে, যা পৃথিবীতে প্রবেশ করে এবং পৃথিবী থেকে নির্গত হয়, যা আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয় এবং আকাশে উত্থিত হয়, আর দিবারাত্রির ফেতনার অনিষ্ট থেকে এবং দিবারাতে আগত দুর্ঘটনার অনিষ্ট থেকে।”রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে এয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম) এই দোয়া পাঠ করলে শয়তানের মশাল নিভে যায় এবং সে উপুড় হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। 

হযরত হাসান বসরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে- হযরত জিব্রাঈল (আঃ) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে এয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম)-এর খেদমতে এসে আরজ করলেন, “এক শয়তান আপনার সাথে প্রতারণা করতে চায়। আপনি যখন শয্যা গ্রহণ করেন, তখন আয়াতুল কুরসী পড়ে নেবেন।”

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে - “আমার কাছে শয়তান এসে বাদানুবাদ শুরু করলে আমি তার গলা টিপে ধরলাম। আল্লাহর কসম! আমি তাকে ততক্ষণ ছাড়িনি, যতক্ষণ না তার থুথুর শীতলতা আমার হাতে অনুভব করলাম। যদি আমার ভাই সোলায়মান (আঃ) দোয়া না করতেন, তবে সে মসজিদে ভূতলশায়ী হয়ে থাকত।”

আরও বর্ণিত আছে - “হযরত ওমর (রঃ) যে পথে চলেছেন, সেই পথে শয়তান চলেনা” এর কারণ, তাঁর অন্তর শয়তানের প্রবেশপথ ও খাদ্য থেকে পবিত্র ছিল অর্থাৎ খাহেশের কোন দখল ছিল না। সুতরাং যদি অন্য কোন ব্যক্তি যিকির দ্বারা হযরত ওমর (রাঃ)-এর ন্যায় শয়তানকে দূরে রাখতে চায়, তবে এটা অসম্ভব। উদাহরণতঃ কোন ব্যক্তি ওষুধ সেবন করে কিন্তু পরহেয করে না; অথচ পাকস্থলী দূষিত পদার্থে পরিপূর্ণ। এমতাবস্থায় ওষুধের উপকার আশা করা যায় না। এখানে যিকরকে ওষুধ এবং তাকওয়াকে পরহেয মনে করতে হবে। যে অন্তর আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে মুক্ত, যিকির দ্বারা সেই অন্তর থেকে শয়তান দূর হবে।

আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন - “নিশ্চয় এতে চিন্তার বিষয় আছে তার জন্যে, যার অন্তর আছে।” সুতরাং যদি কেউ শয়তান থেকে মুক্তি পেতে চায়, তবে তাকে প্রথমে তাকওয়ার পরহেয অবলম্বন করতে হবে, এরপর যিকিরের ওষুধ সেবন করতে হবে। তাহলেই শয়তান তার কাছ থেকে পলায়ন করবে, যেমন হযরত ওমর (রাঃ)-এর কাছ থেকে পলায়ন করেছিল। 

ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বেহ বলেন : “আল্লাহকে ভয় কর এবং বাহ্যত শয়তানকে মন্দ বলো না, যখন অন্তরে তুমি তার বন্ধু অর্থাৎ আজ্ঞাবহ।”


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...