📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
ক্ষুধার ফযীলত ও উদরপূর্তির নিন্দা
রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন :
“তোমরা নফসের বিরুদ্ধে ক্ষুধা ও পিপাসা দ্বারা জেহাদ কর। এতে এমন সওয়াব, যেমন আল্লাহর পথে জেহাদকারীর সওয়াব। আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষুধা পিপাসার চেয়ে অধিক প্রিয় কোন আমল নেই”।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন : আকাশের ফেরেশতা সেই ব্যক্তির কাছে আসে না, যে তার পেট ভরে নেয়। এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করল : মানুষের মধ্যে উত্তম কে? তিনি বললেন : যে কম খায়, কম হাসে এবং এমন পোশাকে সন্তুষ্ট থাকে, যা দ্বারা তার গুপ্ত অঙ্গ আবৃত করতে পারে।
আবু সায়ীদ খুদরীর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন : “পশমী বস্ত্র পরিধান কর এবং আধাপেট খাও। এটা নবুওয়তের একাংশ”। হযরত হাসান (রঃ) এর রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে : “কেয়ামতে আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ মর্তবাশালী সেই ব্যক্তি হবে, যে অধিক ক্ষুধার্ত থাকবে এবং যিকির বেশী করবে। কেয়ামতে আল্লাহর কাছে অধিক ঘৃণিত সে ব্যক্তি হবে, যে অধিক নিদ্রা যায়, অধিক খায় এবং অধিক পান করে।”
বর্ণিত আছে, রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) প্রয়োজনেও ক্ষুধার্ত থাকতেন, অর্থাৎ এটা তাঁর পছন্দনীয় ছিল। এক হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তির পানাহার দুনিয়াতে কম, আল্লাহ তাকে নিয়ে ফেরেশতাদের সামনে গর্ব করেন এবং বলেন : আমার বান্দাকে দেখ, আমি তাকে দুনিয়াতে পানাহার কম দিয়েছি। সে সবর করেছে। তোমরা সাক্ষী থাক, যে লোকমা সে ছেড়ে দেবে, তার বিনিময়ে জান্নাতে তাকে উচ্চ মর্তবা দান করব। এক হাদীসে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন :
“তোমরা অন্তরকে অধিক পানাহার দ্বারা মেরে ফেলো না। অন্তর কৃষিক্ষেত্রের মত। তাতে পানি বেশী হলে ফসল বিনষ্ট হয়ে যায়।'
উসামা ইবনে যায়েদ ও আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীসে রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন : কেয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলার অধিক নিকটবর্তী সে ব্যক্তিই হবে, যে দুনিয়াতে অধিক ক্ষুধার্ত, পিপাসার্ত ও চিন্তান্বিত থাকবে। এ ধরনের লোকেরা হচ্ছে গোপন মুত্তাকী। এরা আত্মপ্রকাশ করলে কেউ তাদেরকে চেনে না এবং অদৃশ্য হয়ে গেলে কেউ খোঁজে না। ফেরেশতারা তাদেরকে ঘিরে রাখে। তারাই ভাল লোক। আল্লাহ তা'আলার আনুগত্যও উত্তমরূপে তারাই করে। লোকেরা নরম নরম শয্যায় শয়ন করে। আর তারা নিজেদের মস্তক ও হাঁটু বিছিয়ে দেয়। পয়গম্বরগণের চরিত্র ও ক্রিয়াকর্ম তাদের মুখস্থ। যে জায়গা থেকে তারা চলে যায়, সেই জায়গা কাঁদে। যে শহরে তাদের কেউ না থাকে, সেই শহরের উপর গযব নাযিল হয়। তারা দুনিয়ার জন্যে মৃতের উপর কুকুরের মত লড়াই করে না। যে পরিমাণ খেলে নিঃশ্বাস বাকী থাকে, তারা সেই পরিমাণই খায় এবং ছিন্নবস্ত্র পরিধান করে। মলিন অবস্থার কারণে লোকে তাদেরকে রোগগ্রস্ত মনে করে ; অথচ তাদের কোন রোগ নেই। কেউ কেউ মনে করে, তাদের জ্ঞানবুদ্ধি বিলুপ্ত; অথচ এটাও নয়। পরকালের গৌরব তাদের জন্যেই। হে উসামা, যে শহরে এরূপ লোক দৃষ্টিগোচর হয়, জেনে নেবে, সেই শহরের শান্তির কারণ তারাই। যে সম্প্রদায়ের মধ্যে তারা থাকে, আল্লাহ সেই সম্প্রদায়কে আযাব দেন না। ভূপৃষ্ঠও তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং আল্লাহ তা'আলাও তাদের প্রতি রাযী। মানুষের মধ্যে তাদেরকে রাখার কারণ তাদের দ্বারা যথাসম্ভব মানুষকে মুক্তি দেয়া। তুমি যদি আমৃত্যু ক্ষুধা-পিপাসা সহ্য করতে পার, তবে কর। এর কারণে তুমি উচ্চ মর্যাদা পাবে এবং নবীগণের কাতারে দাখিল হবে। তোমার আত্মা যখন ফেরেশতাদের কাছে যাবে, তখন তারা আনন্দিত হবে এবং আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করবেন।হযরত আবু হুরায়রার রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন :
“পশম পরিধান কর এবং কর্মতৎপর থাক। আধাপেট আহার কর। তাহলে আকাশের ফেরেশতাদের মধ্যে দাখিল হয়ে যাবে।'
হযরত ঈসা (আঃ) বলেন : হে হাওয়ারীগণ, তোমাদের পাকস্থলীকে ক্ষুধাতুর এবং দেহ উলঙ্গ রাখ, যাতে তোমাদের অন্তর আল্লাহকে দেখে। তওরাতে লিখিত আছে- আল্লাহ তা’আলা কোন স্থূলদেহী আলেমকে পছন্দ করেন না। কেননা, দৈহিক স্থূলতা অনবধানতা ও অধিক আহার জ্ঞাপন করে। এটা আলেমের জন্যে ভাল নয়। তাই হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেন :
“যে আলেম পেট ভরে খেয়ে মোটা হয়েছে, আল্লাহ তাকে পছন্দ করেন না। এক হাদীসে আছে, শয়তান মানুষের মধ্যে রক্তের মত বিচরণ করে। তোমরা ক্ষুধা ও পিপাসা দ্বারা তার চলাচলের পথ সংকীর্ণ করে দাও। এক হাদীসে বলা হয়েছে- “মুমিন এক নাড়ি-ভুঁড়িতে এবং কাফের সাত নাড়ি-ভুঁড়িতে খায়”।
অর্থাৎ মুমিনের তুলনায় কাফের সাত গুণ বেশী খায় কিংবা তার খাহেশ মুমিনের চেয়ে সাত গুণ বেশী হয়। রূপক অর্থে খাহেশের স্থলে নাড়ি-ভুঁড়ি ব্যবহৃত হয়েছে। হাদীসের অর্থ এরূপ নয় যে, কাফেরের নাড়ি-ভুঁড়ি বাস্তবে মুমিনের তুলনায় বেশী হয়। হযরত হাসান (রঃ)-এর রেওয়ায়াতে আছে, হযরত আয়েশা (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-কে একথা বলতে শুনেছেন : “তোমরা সর্বদা জান্নাতের দরজার কড়া নাড়। তোমাদের জন্যে তা খুলে যাবে।”
হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেন : জান্নাতের দরজার কড়া কিরূপে নাড়া দেব ? তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন : “ক্ষুধা ও পিপাসা দ্বারা”।
হযরত আবু হুযায়ফা (রাঃ) একবার রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর মজলিসে ঢেকুর তুললে তিনি বললেন : অধিক ঢেকুর তুলো না। কেননা, কেয়ামতের দিন সে ব্যক্তিই অধিক ক্ষুধার্ত হবে, যে দুনিয়াতে বেশী পেট ভরে খায়।
হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন : রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) কখনও পেটভরে আহার করেননি। মাঝে মাঝে তাঁর ক্ষুধা দেখে হযরত আয়েশা (রঃ)-এর করুণা হত এবং তিনি কেঁদে দিতেন। তিনি তাঁর পেটে হাত বুলিয়ে বলতেন : আপনার প্রতি আমি উৎসর্গ। দুনিয়া থেকে এতটুকু অংশ তো নিন, যদ্দ্বারা শক্তি বহাল থাকে এবং ক্ষুন্নিবৃত্তি হয়ে যায়। জওয়াবে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলতেন : আয়েশা, আমার ভাইগণ অর্থাৎ প্রধান প্রধান পয়গম্বরগণ আমার চেয়েও অধিক কষ্ট সহ্য করেছেন। এসব কষ্টে সবর করে তাঁরা যখন পরওয়ারদেগারের কাছে গেছেন, তখন অত্যন্ত সম্মানিত হয়েছেন এবং অপরিসীম সওয়াব লাভ করেছেন। আমি লজ্জাবোধ করি, কোথাও জীবনে কিছু আরাম ভোগ করার কারণে আখেরাতে তাঁদের চেয়ে কম মর্তবা লাভ করি। আখেরাতে কম মর্তবা পাওয়া অপেক্ষা দুনিয়াতে কয়েক দিন সবর করা সহজ। আপন ভাইদের সাথে মিলিত হওয়া ছাড়া আমার কাছে অন্য কিছু ভাল মনে হয় না। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন : আল্লাহর কসম, এই কথাবার্তার পর এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে যান।
হযরত আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন- একবার হযরত ফাতেমা (রাঃ) একখন্ড রুটি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে উপস্থিত করেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন : এটা কি ? হযরত ফাতেমা বললেন : আমি একটি রুটি তৈরী করেছিলাম। আমার মনে চাইল, তাই এ খন্ডটি আপনার জন্যে এনেছি। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) রুটির টুকরাটি খেয়ে বললেন : তিন দিন পর তোমার পিতার মুখে এই প্রথম খাদ্য পৌঁছল।
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন : রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) সারা জীবনে কখনও পরিবার-পরিজনকে লাগাতার তিন দিন পেট ভরে গমের রুটি দেননি। তিনি বলতেন : “দুনিয়াতে যারা ক্ষুধার্ত, আখেরাতে তারা তৃপ্ত হবে। আল্লাহ তা'আলার কাছে সে ব্যক্তি অধিক ঘৃণিত, যার বদহজম লেগে থাকে এবং পেট ভরে আহার করে। বান্দা খাহেশ সত্ত্বেও যে লোকমাটি ছেড়ে দেয়, তার বিনিময়ে সে জান্নাতে একটি স্তর লাভ করে।
ক্ষুধার ফযীলত সম্পর্কে মহাজন উক্তিও অনেক।
হযরত ওমর (রাঃ) বলেন : উদরপূর্তি থেকে নিজেকে রক্ষা কর। কেননা, এটা জীবদ্দশায় দুর্মূল্যের এবং মৃত্যুর পর দুর্গন্ধের কারণ।
হযরত শাকীক বলখী (রঃ) বলেন : এবাদত একটি পেশা, যার দোকান হচ্ছে নির্জনতা এবং হাতিয়ার ক্ষুধা।
হযরত লোকমান (রঃ) আপন পুত্রকে বলেন : রস, যখন পাকস্থলী পূর্ণ থাকে, তখন চিন্তা ঝিমিয়ে পড়ে এবং এবাদতের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বেকার বসে থাকে।
হযরত ফযল ইবনে আয়ায নিজেকে সম্বোধন করে বলতেন : তোমার কিসের ভয়? ক্ষুধার? ক্ষুধাকে ভয় করা উচিত নয়। কেননা, এর কারণেই তুমি আল্লাহ তা'আলার সামনে হালকা-পাতলা থাক। আল্লাহর রসূল ও তাঁর সকল সাহাবী ক্ষুধার্ত থাকতেন।
কাহমস (রঃ) বলেন : ইলাহী, আপনি আমাকে ক্ষুধার্ত রেখেছেন, উলঙ্গ রেখেছেন এবং অন্ধকার রাতে প্রদীপহীন রেখেছেন। কেমন কেমন ওসীলা দ্বারা আমাকে এই মর্তবায় পৌঁছিয়েছেন।
তওরাতে উল্লিখিত আছে- আল্লাহকে ভয় কর এবং যখন পেট ভরে আহার কর, তখন ক্ষুধার্তকে স্মরণ কর।
আবু সোলায়মান (রঃ) বলেন : রাতের খাদ্য থেকে এক লোকমা কম খাওয়া আমার কাছে সারারাত জেগে এবাদত করার চেয়ে ভাল মনে হয়। তিনি আরও বলেন : আল্লাহর ভান্ডার থেকে ক্ষুধা তাকেই দান করা হয়, যাকে তিনি পছন্দ করেন। হযরত সহল ইবনে আবদুল্লাহ তস্তরী (রঃ) পঁচিশ দিন পর্যন্ত খেতেন না এবং এক দেরহামের আটা দিয়ে এক বছর চালিয়ে দিতেন। তিনি ক্ষুধার উচ্চ মর্তবা বিশ্বাস করতেন এবং এ সম্পর্কে অতিশয়োক্তি করে বলতেন : কেয়ামতের দিন কোন নেক আমলের এতটুকু সওয়াব হবে না, যতটুকু রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর অনুসরণে বাড়তি খাদ্য ত্যাগ করলে হবে। তিনি আরও বলেন : যারা আখেরাত তলব করে, তাদের জন্যে খাওয়ার চেয়ে অধিক ক্ষতিকর কিছু নেই। প্রজ্ঞা ও জ্ঞান ক্ষুধার মধ্যে এবং গোনাহ ও মূর্খতা তৃপ্তির মধ্যে নিহিত। যে হাদীসে বলা হয়েছে, পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্যে, সেই হাদীসের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন : যে ব্যক্তি এই পরিমাণের চেয়ে বেশী খায়, সে তার পুণ্য খায়। এর চেয়ে উচ্চ মর্তবার কথা তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন : খাদ্য খাওয়ার তুলনায় না খাওয়া অধিক প্রিয় না হওয়া পর্যন্ত কারও ফযীলত লাভ হবে না। এক রাত ক্ষুধার্ত থাকলে আল্লাহর কাছে দু'রাত ক্ষুধার্ত থাকার জন্যে দোয়া করবে। এই অবস্থা অর্জিত হলে সে খাদ্য না খাওয়া প্রিয় মনে করবে। তিনি আরও বলেন : যারা আবদাল হয়েছেন, তারা পেটকে ক্ষুধার্ত রাখা, রাত্রি জাগরণ ও একান্তবাস দ্বারা আবদাল হয়েছেন। আবদুল ওয়াহেদ ইবনে যায়দ বলেন : আল্লাহর কসম, আল্লাহর মহব্বত পাওয়া যায় না, কিন্তু ক্ষুধা দ্বারা। ওলীগণ পানির উপর দিয়ে হেঁটে যান না, কিন্তু ক্ষুধার বদৌলত। তারা নিমেষের মধ্যে পথের দূরত্ব অতিক্রম করেন না, কিন্তু ক্ষুধার কারণে।
পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন