অব্যাহত গোনাহের প্রতিকার
প্রকাশ থাকে যে, মানুষ দুই প্রকার।
(১) এমন মানুষ, যাদের মন্দ কাজ-কর্মের প্রতি প্রবণতা নেই এবং যারা অনিষ্ট থেকে বেঁচে থাকা এবং পুণ্যের উপরই লালিত-পালিত হয়। এরূপ মানুষ সম্পর্কে হাদীসে বলা হয়েছে–
“তোমার পরওয়ারদেগার এমন যুবককে পছন্দ করেন, যার মূর্খতা ও হাস্য-কৌতুকের প্রবণতা নেই”। কিন্তু এ ধরনের মানুষ বিরল ও দুষ্প্রাপ্য।
(২) দ্বিতীয় প্রকার এমন মানুষ, যারা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে না। এদের এক প্রকার অব্যাহতভাবে গোনাহকারী এবং দ্বিতীয় প্রকার তওবাকারী। এখানে আমাদের উদ্দেশ্য অব্যাহত গোনাহের প্রতিকার ও চিকিৎসার বর্ণনা করা।
'বলা বাহুল্য, চিকিৎসা ছাড়া আরোগ্যলাভ সম্ভব হয় না। যেহেতু রোগের কারণসমূহের বিপরীত কাজ করার নাম চিকিৎসা, তাই যে ব্যক্তি রোগের কারণ সম্পর্কে জ্ঞাত হবে না, সে চিকিৎসার ব্যাপারেও অজ্ঞাত থাকবে। কারণজনিত রোগের চিকিৎসা হচ্ছে সেই কারণকে নির্মূল ও নিষ্ক্রিয় করে দেয়া। প্রত্যেক বস্তু তার বিপরীত বস্তু দ্বারা নিষ্ক্রিয় হয়। এখন অব্যাহত গোনাহের প্রতি লক্ষ্য করলে জানা যাবে এর কারণ হচ্ছে গাফলতি তথা অনবধানতা ও খাহেশ। তন্মধ্যে গাফলতি সকল অনিষ্টের মূল। সেমতে আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন :
“এরাই গাফেল। বস্তুত আখেরাতে এরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে”।
অতএব গাফলতি ও খাহেশের বিপরীত বিষয় দ্বারাই অব্যাহত গোনাহের প্রতিকার করতে হবে। গাফলতির বিপরীত বিষয় হচ্ছে সচেতনতা এবং খাহেশের বিপরীত বিষয় খাহেশ-উদ্দীপক বিষয়াদি বর্জনে সবর করা। সুতরাং অব্যাহত গোনাহের চিকিৎসা এমন ঔষধ দ্বারা করতে হবে, যার মধ্যে সচেতনতার মিষ্টতা ও সবরের তিক্ততা উভয়টি বিদ্যমান।
জানা উচিত যে, সকল জ্ঞান ও সচেতনতাই আন্তরিক রোগের চিকিৎসা। কিন্তু প্রত্যেক রোগের জন্যে এক বিশেষ জ্ঞান নির্দিষ্ট রয়েছে। আমরা এখানে অব্যাহত গোনাহের সেই বিশেষ জ্ঞান সম্পর্কে আলোচনা করব, যা এ রোগে ফলপ্রদ। তবে সহজে বুঝার জন্যে দৈহিক রোগের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করব।
প্রথমেই জানা দরকার যে, রোগীকে কয়েকটি বিষয়ে বিশ্বাসী হতে হয়।
প্রথমত, মানতে হবে যে, রোগ ও সুস্থতা উভয়টির জন্যে কিছু কিছু কারণ রয়েছে, যা আল্লাহ পাক আমাদের এখতিয়ারে রেখে দিয়েছেন। এতে মূল চিকিৎসার প্রতি বিশ্বাস জন্মে। যার এই বিশ্বাস নেই, সে রোগ-ব্যাধির চিকিৎসাও করায় না এবং মৃত্যুর উপযুক্ত হয়ে যায়। অনুরূপভাবে অব্যাহত গোনাহ রোগে প্রথমে মূল শরীয়তের প্রতি ঈমান থাকা চাই। অর্থাৎ, বিশ্বাস থাকতে হবে যে, পারলৌকিক সৌভাগ্যেরও একটি কারণ আছে, যাকে এবাদত বলা হয় আর পারলৌকিক দুর্ভাগ্যেরও একটি কারণ আছে, যাকে পাপ বলা হয়।
দ্বিতীয়ত, কোন বিশেষ চিকিৎসকের প্রতি রোগীর এরূপ আস্থা থাকা দরকার যে, সে চিকিৎসা শাস্ত্রে পারদর্শী ও বিচক্ষণ। তার দেয়া ঔষধ সঠিক কাজ করে। সে কখনও ভুল চিকিৎসা করে না। এমনিভাবে যারা অব্যাহত গোনাহে লিপ্ত, তাদের ঈমান থাকতে হবে যে, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) সত্যবাদী। তিনি যা বলেছেন, বাস্তবে তাই হবে। চুল পরিমাণ ব্যতিক্রম হবে না।
তৃতীয়ত, রোগীর উচিত চিকিৎসক যেসব ফল খেতে নিষেধ করে, সেগুলো না খাওয়া এবং যেসব ক্ষতিকর বিষয় থেকে বিরত থাকতে বলে, সেগুলো থেকে বিরত থাকা, যাতে পরহেয না করার ভয় অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এমনিভাবে অব্যাহত গোনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের সে সমস্ত আয়াত ও হাদীস শ্রবণ ও মান্য করা উচিত, যেগুলোতে “তাকওয়া” তথা পরহেযগারীর প্রতি উৎসাহ প্রদান এবং গোনাহে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারে হুশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে। এতে অন্তরে ভয় সৃষ্টি হবে এবং সবর শক্তিশালী হবে, যা এই চিকিৎসার পরবর্তী স্তম্ভ।
চতুর্থত, রোগীর উচিত চিকিৎসক তার বিশেষ রোগের জন্য যা বলে দেয় এবং যে সকল বস্তু নিষিদ্ধ করে দেয়, সেগুলোর প্রতি খুব মনোযোগী হওয়া। অর্থাৎ, প্রথমে সে নিজের অবস্থা, ক্রিয়াকর্ম ও পানাহারের বিবরণ চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নেবে যে, কোন্ বস্তু তার বিশেষ রোগের জন্য ক্ষতিকর। কেননা, প্রত্যেক রোগীর প্রত্যেক বস্তু পরিত্যাগ করা জরুরী নয়। বরং প্রত্যেক বিশেষ রোগের জন্যে বিশেষ চিকিৎসা রয়েছে। এমনিভাবে প্রত্যেক মানুষ সকল খাহেশ ও সকল গোনাহে লিপ্ত হয় না। প্রত্যেক মোমেন ব্যক্তি বিশেষ এক গোনাহ্ অথবা বিশেষ কিছু গোনাহে লিপ্ত থাকে। তার প্রথমে জানতে হবে এর দ্বারা ধর্মের কতটুকু ক্ষতি হয়। এরপর জানা দরকার এ থেকে সবর কিভাবে করা যায় এবং যে গোনাহ হয়েছে, তা কিভাবে মিটানো যায় !
বলা বাহুল্য, এ সমস্ত বিষয়ের জ্ঞান বিশেষভাবে আলেমদের কাছ থেকেই লাভ করা যায়, যারা পয়গম্বরগণের ওয়ারিস। সুতরাং গোনাহগার ব্যক্তি যখন নিজের গোনাহ জেনে নেয়, তখন তার এই রোগের চিকিৎসা কোন চিকিৎসক অর্থাৎ আলেমে দ্বীন দ্বারা শুরু করা উচিত। রোগী যদি নিজের রোগ জানতে না পারে, তবে আলেমের উচিত তাকে তার রোগের কথা বলে দেয়া। এর উপায় এই যে, প্রত্যেক আলেম এক একটি মহল্লা অথবা গ্রামের দায়িত্ব নেবে এবং সেখানকার অধিবাসীদেরকে ধর্ম বিষয়ে শিক্ষাদান করবে। তাদের জন্যে যেসব বিষয় উপকারী এবং যেসব বিষয় ক্ষতিকর, তা পৃথক পৃথক ভাবে বলে দেবে। সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের কারণসমূহ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করবে। সে এই অপেক্ষায় থাকবে না যে, কেউ এসে নিজের রোগের কথা তাকে বলবে; বরং স্বয়ং মানুষকে ডেকে এনে উপদেশ দেবে। কেননা, আলেম সমাজ পয়গম্বরগণের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী। পয়গম্বরগণ মানুষকে মূর্খতার উপর ছেড়ে দেননি; বরং তাদেরকে সমাবেশে একত্রিত করেছেন এবং স্পষ্ট ভাষায় উপদেশ দিয়েছেন। শুরুতে তাদের ঘরে ঘরে উপস্থিত হয়েছেন এবং এক একজনকে তালাশ করে হেদায়াত করেছেন। কেননা, যারা অন্তরের রোগী, তারা তাদের রোগের অবস্থা জানে না। যেমন, কারও মুখমন্ডলে যদি ধবলকুণ্ঠের দাগ থাকে এবং তার কাছে আয়না না থাকে, তবে সে তার রোগের অবস্থা জানতে পারবে না যে পর্যন্ত অন্য কেউ তাকে বলে না দেয়। এটা সকল আলেমের উপর ফরযে আইন। শাসকবর্গের কর্তব্য প্রত্যেক গ্রামে ও মহল্লায় একজন করে দ্বীনদার ফেকাহবিদ আলেম নিযুক্ত করা। যদি কোন ব্যক্তি আলেমের বর্ণিত চিকিৎসা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে, তবে তাকে শাসকদের হাতে সোপর্দ করা উচিত, যাতে তারা তার অনিষ্ট থেকে জনগণকে রক্ষা করে। যেমন কেউ বদ্ধ পাগল হয়ে গেলে তাকে পাগলা গারদে পাঠিয়ে দেয়া হয়, যাতে তার উৎপাত থেকে জনসাধারণ রক্ষা পায়।
আন্তরিক রোগ দৈহিক রোগের তুলনায় অনেক বেশী। এর কারণ তিনটি। প্রথমত, অন্তরের রোগী জানে না যে, সে রোগী। দ্বিতীয়ত, এ রোগের পরিণতি দুনিয়াতে প্রত্যক্ষ হয় না। দৈহিক রোগের পরিণতি মৃত্যু তো সকলেই প্রত্যক্ষ করে। গোনাহের পরিণতি অন্তরের মৃত্যু, যা দুনিয়াতে জানা যায় না। তাই গোনাহের প্রতি ঘৃণা কম হয়ে থাকে। তৃতীয়ত, এ রোগের চিকিৎসক দুর্লভ। কারণ, এ রোগের চিকিৎসক হচ্ছে আলেম সম্প্রদায়। বর্তমান যুগে তারা নিজেরাই কঠিন রোগে আক্রান্ত। যেহেতু প্রায় সকলেই রোগাক্রান্ত, তাই তাদের রোগের ক্ষতি ও কুফল প্রকাশমান নয়। তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং এমন কথা বলে, যা দ্বারা তাদের রোগ আরও বেড়ে যায়।
বলা বাহুল্য, সর্বনাশা রোগ হচ্ছে দুনিয়ার মোহ আর এ রোগটিই চিকিৎসক তথা আলেমদের ভেতরে প্রবল। তারা মানুষকে দুনিয়ার মোহ থেকে সতর্ক করে না এই ভয়ে যে, কেউ যদি বলে দেয় অপরকে উপদেশ না দিয়ে নিজে আত্মরক্ষা করুন! এ কারণেই রোগটি ব্যাপকাকারে ছড়িয়ে পড়েছে এবং মানুষ ধ্বংসের পথে অগ্রসর হচ্ছে। না আছে ঔষধ, না আছে চিকিৎসকের নাম-নিশানা। তারা যখন ওয়ায করে, তখন বেশীর ভাগ উদ্দেশ্য এটাই থাকে যে, কোনরূপে মানুষ তাদের প্রতি আকৃষ্ট হোক। এটা মানুষকে মাগফেরাতের আশায় আশান্বিত করা ছাড়া হতে পারে না। তাই ওয়াযের মধ্যে আশার কারণসমূহ ও রহমতের প্রমাণসমূহ অধিক বর্ণনা করা হয়। এরূপ ওয়ায শুনে যখন মানুষ ঘরে ফিরে, তখন গোনাহের সাহস আরও বৃদ্ধি পায় এবং আল্লাহর অনুকম্পার উপর ভরসা বেড়ে যায়। যদিও আশা ও ভয় উভয়টিই প্রতিকার; কিন্তু দু'ব্যক্তির জন্যে, যারা পৃথক পৃথক রোগে আক্রান্ত। যে ব্যক্তির মধ্যে ভয় এত প্রবল যে, সংসারধর্ম বিসর্জন দিতে চায় এবং যে কাজ করতে অক্ষম, তার সাথে নিজেকে জড়িত করে ফেলে, এরূপ ব্যক্তির অধিক ভয়কে আশার কারণসমূহ বর্ণনা করে হ্রাস করা উচিত, যাতে তার ভয় ভারসাম্যের পর্যায়ে চলে আসে। কিন্তু যে ব্যক্তি গোনাহে নিমজ্জিত থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর কৃপার উপর গর্বিত, তার চিকিৎসা ভয়ের কারণসমূহ বর্ণনা করা ছাড়া অন্য কিছু নয়। মোটকথা, চিকিৎসকদের নষ্টামির কারণে রোগ দুরারোগ্য হয়ে গেছে।
পরবর্তী পর্ব
ওয়াযের উপকারী পদ্ধতি

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন