রবিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৩

জ্ঞান জ্ঞানার্জন (৩) জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সাহাবী ও তাবেয়ীগণের উক্তি


জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সাহাবী ও তাবেয়ীগণের উক্তি

জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ৩ )
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সাহাবী ও তাবেয়ীগণেরও অনেক উক্তি বর্নিত আছে। হযরত আলী (র.) কোমায়লকে বলেন, "হে কোমায়ল ! জ্ঞান ধন-সম্পদ অপেক্ষা উত্তম । জ্ঞান তোমার হেফাজত করে, আর তুমি ধন-সম্পদের হেফাজত কর। জ্ঞান শাসক আর ধন-সম্পদ শাসিত । ধন ব্যয় করলে হ্রাস পায় আর জ্ঞান ব্যয় করলে বেড়ে যায় ।"

তিনি (আলী র.) আরো বলেন : "জ্ঞানী ব্যক্তি রোজাদার, এবাদতকারী ও জেহাদকারী অপেক্ষা উত্তম। আলেম ব্যক্তির মৃত্যু হলে ইসলামে এমন শুন্য দেখা দেয় যা তার উত্তরশুরি ছাড়া কেউ পূরণ করতে পারে না ।" 

তার কথিত একটি আরবী অনুবাদ এরূপ : "সকল মানুষ আকার আকৃতিতে এক রূপ সকলের পিতা আদম এবং সকলের মা হাওয়া । তারা যদি মূল উপাদান দিযে গর্ব করতে চায়, তবে পানি ও মৃত্তিকা ব্যতিত তাদের মূল উপাদান আর কি? হা যার দেহে আলেমদের গর্বের আলখেল্লা আলা রয়েছে। কেননা সে নিজে যেমন পথপ্রাপ্ত, তেমনি অপরেরও পথ-প্রদর্শক। সৌন্দর্যের বস্তু তার অর্জিত রয়েছে। এটাই মানুষের মর্যাদা। 

মূর্খরা সদাই জ্ঞানীদের সাথে শত্রুতা পোষন করে। তথাপি তুমি এমন জ্ঞান অর্জন কর, যদ্বারা চিরঞ্জীব হতে পার। সকল মানুষ মৃত; কিন্তু জ্ঞানী চিরজীবী।

আবুল আসওয়াদ (রহ.) বলেন : জ্ঞানের ছেয়ে বেশী ইজ্জতের কোন কোন বিষয় নেই। বাদশাহ জনগণের শাসক হয়ে থাকে এবং জ্ঞানীরা বাদশাহদের শাসক হয়।

হযরত ইবনে আব্বাস (র.) বলেন,- হযরত সোলায়মান ইবনে দাউদ (আ.)-কে এলেম, ধন-সম্পদ ও রাজত্বের মধ্য থেকে যে কোন একটি বেছে নেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। তিনি এলেম পছন্দ করেছিলেন। ফলে তাকে এলেমের সাথে ধন ও রাজত্বও দেয়া হয়েছিল।

হযরত ইবনে মোবারক (রহ.)-কে কেউ জিজ্ঞাসা করল : মানুষ কে? তিনি বললেন : "সংসারবিমুখ দরবেশ।" প্রশ্ন হল : নীচ কে? উত্তর হল : "যারা নিজেদের দ্বীন বিক্রি করে খায়।" 

মোট কথা জ্ঞানী ব্যক্তি ছারা অন্য কাউকে তিনি মানুষ বলেননি। কেননা যে বৈশিষ্ট মানুষ ও চতুষ্পদ বস্তুর মধ্যে পার্থক্য সূচিত করে তা হচ্ছে জ্ঞান। মানুষ তখনই মানুষ বলে কথিত হবে যখন তার মধ্যে গৌরব ও শ্রেষ্ঠত্বের কারণ বিদ্যমান থাকবে। 

মানুষের মর্যাদা দৈহিক শক্তির কারণে নয়। কেননা, উট তার ছেয়ে বেশী শক্তির অধিকারী। মানুষের মর্যাদা বিশাল বপু হওয়ার কারণেও নয়। কেননা, হিংস্র জন্তুর বীরত্ব মানুষের ছেয়ে বড়। বরং একমাত্র জ্ঞানের দিক দিয়ে মানুষ সম্ভ্রান্ত। জ্ঞানের জন্যই মানুষ সৃ্ষ্টি। 

জনৈক দার্শনিক বলেন : কেউ আমাকে বলুক, যে ব্যক্তি এলেম পায়নি, সে কি পেয়েছে এবং যে ব্যক্তি এলেম পেয়েছে, তার পাওয়ার আর কি বাকী আছে?

ফাতাহ্ মুসেলী বলেন : রোগীকে রোজ রোজ খাদ্য, পানীয় ও ওষুধপত্র না দিলে সে কি মরে যাবেনা? লোকেরা বলল : নিসন্দেহে মরে যাবে। তিনি বললেন : আত্মার অবস্থাও তদ্রূপ। আত্মাকে তিন দিন এলেম ও জ্ঞান থেকে উপোস রাখলে সে মরে যায়। তার এ উক্তি যথার্থ। কেননা জ্ঞান ও প্রজ্ঞা হচ্ছে আত্মার খোরাক; এগুলোর মধ্যেই তার জীবন; যেমন দেহের খোরাক খাদ্য। যার জ্ঞান নেই তার অন্তর রুগ্ন। মৃত্যু তার জন্য অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তার আত্মার রোগ ও মৃত্যুর খবর রাখেনা।দুনিয়ার মহব্বত ও কাজ-কারবারে লেগে থাকার কারণে তার চেতনা লোপ পায়। যেমন ভয় ও নেশার আতিসয্যে জখমের ব্যাথা অনুভূত হয় না; যদিও বাস্তবে ব্যাথা থাকে। কিন্তু মৃত্যু যখন দুনিয়ার বোঝা ও সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়, তখন সে আত্মার মৃত্যুর কথা জানতে পারে এবং পরিতাপ করে। অবশ্য দহন পরিতাপে কোন উপকার হয়না। ভীত ব্যক্তির ভয় অথবা মাতালের নেশা দূর হয়ে গেলে ভয় ও নেশার অবস্থায় তার যে সব যখম লাগে, সেগুলো সে হাড়ে হাড়ে টের পেতে থাকে। সত্য উদঘাটিত হওয়ার সেই দিনের (হাসরের দিন) ভয়াবহতা থেকে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি। কেননা এখন মানুষ ঘুমিয়ে আছে। মৃত্যু হলে জাগ্রত হবে।

হযরত হাসান বসরী (রহ.) বলেন : জ্ঞানী লোকদের লেখার কালি এবং শহীদের রক্ত ওজন করা হলে কালির ওজন বেশী হবে । 

হযরত ইবনে মাসুদ (র.) )বলেন : "হে লোকসকল ! জ্ঞান অর্জন কর জ্ঞানকে তুলে নেয়ার পূর্বে । জ্ঞান তুলে নেয়ার অর্থ জ্ঞানী লোকদের মৃত্যুবরণ করা । আল্লাহর কসম, যার হাতে আমার প্রাণ - যারা আল্লাহর পথে শহীদ হয়েছে, তারা জ্ঞানীলোকদের মাহাত্ম্য দেখে আকাঙ্ক্ষা করবে যে, আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে জ্ঞানী অবস্থায় পুনরুখ্বিত করলে ভাল হত । কেউ জ্ঞানী হয়ে জন্মগ্রহন করে না, বরং অনুশীলনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জিত হয়।"

হযরত ইবনে আব্বাস (র.) বলেন : রাতের কিছু অংশে জ্ঞান চর্চা করা আমার মতে সারারাত জাগ্রত থেকে নফল এবাদত করা অপেক্ষা উত্তম । এ বিষয়টি হযরত আবু হুরায়রা (র.) ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) থেকেও বর্ণিত আছে।

"আয় পরোয়ারদেগর আমাদেরকে ইহকালের পুণ্য এবং পরকালের পুণ্য দান করুন" এ আয়াতের তফসীর প্রসঙ্গে হযরত হাসান (রহ.) বলেন : দুনিযার পুণ্য জ্ঞান ও আরাধনা। পরকালের পুন্য অর্থ জান্নাত ।

জনৈক দার্শনিককে কেউ প্রশ্ন করল : কোন্ বস্তু সঞ্চয় করা দরকার? উত্তর হল : এমন বস্তু সঞ্চয় করা উচিৎ, যা তোমার নৌকা ডুবে গেলে তোমার সাথে সাতার কাটতে থাকে। অর্থাৎ, জ্ঞানই হচ্ছে সঞ্চয়যোগ্য বস্তু। কারণ দেহরূপী নৌকা মৃত্যুরূপী সলিলে সমাধিলাভ করলে পর এটাই সাথী থাকে।

অন্য এক দার্শনিক বলেন : "যে ব্যক্তি প্রজ্ঞাকে নিজের লাগাম বানায়ে নেয়, মানুষ তাকে ইমাম করে নেয়। যে ব্যক্তি জ্ঞানে খ্যাতি অর্জন করে মানুষ তাকে ইজ্জত সন্মানের দৃষ্টিতে দেখে।"

ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন : জ্ঞানের এক গৌরভ এইযে, "একে কোন ব্যক্তির সাথে সামান্যতম সম্পর্কযুক্ত করা হলে সে আনন্দিত হয়। উদাহরণত: যদি বলা হয়, অমুক ব্যক্তি এব্যাপারে জ্ঞান রাখে, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আনন্দ অনুভব করে। পক্ষান্তরে সে এবিষয়ে জ্ঞান রাখেনা -একতা কাউকে বললে সে দুঃখিত হয়।"

হযরত ওমর বিন খাত্তাব (র.) বলেন : "হে লোকসকল! জ্ঞানব্রতী হও। আল্লাহ্ তা'আলার কাছে একটি মহব্বতের চাদর আছে। যে ব্যক্তি কোন বিষয়ে জ্ঞান অন্বেষন করে, আল্লাহ্ তা'আলা সে চাদর তাকে পরিয়ে দেন। এরপর সে ব্যক্তি কোন গুনাহ করলেও তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি (তওবার) লাভের তওফিক দান করা হয়। পুনরায় গুনাহ্ করলেও তাকে আল্লাহ্'র সন্তুষ্টি লাভের তওফিক দান করা হয়। পুনরায় গুনাহ করলেও আল্লাহ্ তাকে ওই তওফিক দান করেন । তৃতীয়বার গুনাহ করার পরও এরূপ করা হয় । এভাবে বারবার তওফিক দানের উদ্দেশ্য হচ্ছে, তার কাছ থেকে সেই চাদরটি ছিনিয়ে না নেয়া, যদিও তার গুনাহ বৃদ্ধি পেতে পেতে মৃত্যু পর্যন্ত পৌছে ।"

আহনাফ (রহ.) বলেন, "মনে হয় জ্ঞানীগন সমগ্র ইজ্জতের মালিক হয়ে যাবে । যে ইজ্জত জ্ঞানের দ্বারা সুদৃঢ না হয় তার পরিনতি হয় লাঞ্ছনা।"

সালেম ইবনে আবী জা'দ বলেন : "আমি ক্রীতদাস ছিলাম । প্রভু আমাকে তিনশ দিরহামের বিনিময়ে মুক্ত করে দিলে আমি কি কাজ শিখে জীবিকা নির্বাহ করব সে সম্পর্কে ভাবতে লাগলাম । অবশেষে জ্ঞানকে পেশা করে নিলাম । এর পর এক বছর অতীত না হতেই শহরের শাসক আমার সাথে সাক্ষাত করতে এলেন । আমি তাকে ফিরিযে দিলাম; কাছে আসতে দিলাম না ।"

যু্হরা ইবনে আবুবকর বলেন : আমার পিতা আমাকে জ্ঞানব্রতী হতে চিটি লিখলেন । তিনি লিখলেন- যদি তুমি নিঃস্ব হয়ে যাও তবে জ্ঞান হবে তোমার ধন । আর যদি ধনাঢ্য হয়ে যাও তবে জ্ঞান হবে অঙ্গসজ্জা ।
হযরত লোকমান তাঁর ছেলেকে উপদেশ দিলেন : হে বৎস জ্ঞানীদের কাছে বস । কেননা আল্লা্হ্ তা'আলা জ্ঞানের নুর দ্বারা অন্তরকে জীবিত করেন । যমিন বৃষ্টির পানি দ্বারা মাটিকে শস্যশ্যামল করেন ।

জনৈক দার্শনিক বলেন : জ্ঞানী ব্যক্তি মারা গেলে তার জন্য পানিতে মাছ এবং শুন্যে পাখীরা পর্যন্ত ক্রন্দন করে। বাহ্যত: তাকে দেখা না গেলেও তার স্মৃতি অন্তরে জাগ্রত থাকে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...