হকদারের হক পর্ব- ১
বন্ধুত্বের ফযীলত
আল্লাহ যাহার হিত কামনা করেন তাহাকে উৎকৃষ্ট বন্ধু দান করেন, যেন সে আল্লাহ্কে ভুলিয়া গেলে বন্ধু তাহাকে স্মরণ করাইয়া দেয়; আর সে আল্লাহর স্মরণে লিপ্ত থাকিলে বন্ধু তাহার সঙ্গী ও সহায়ক থাকে। তিনি আরও বলেনঃ দুইজন মু'মিন পরস্পর মিলিত হইলে একের দ্বারা অন্যের কোন ধর্মীয় উপকার না হইয়া পারে না। তিনি অন্যত্র বলেন : কোন ব্যক্তি অপরকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে স্বীয় ভ্রাতারূপে গ্রহণ করিলে তাহাকে বেহেশতে এমন উন্নত মর্যাদা প্রদান করা হইবে যাহা অন্য কোন নেককার্য দ্বারা লাভ করা যায় না। হযরত আবূ ইদরীস খাওলানী (রঃ) হযরত মুআয (রাঃ)-কে বলিলেন : আমি আল্লাহর ওয়াস্তে তোমাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিলাম। তিনি বলিলেন : আমি তোমাকে শুভ সংবাদ প্রদান করি যে, আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনাকে বলিতে শুনিয়াছি-
>“কিয়ামত দিবস আরশের আশে পাশে কুরসীসমূহ স্থাপিত হইবে। কতিপয় লোক উহাতে উপবেশন করিবে। তাহাদের চেহারা পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় দীপ্তিমান হইবে। সমস্ত লোক তো ভীত থাকিবে, অথচ এই সকল কুরসীতে সমাসীন লোক নির্ভয়ে থাকিবে; সব লোক ভীত-সন্ত্রস্ত থাকিবে; (কিন্তু) এই সকল লোক প্রশান্ত থাকিবে। কুরসীতে সমাসীন এই সমস্ত লোক আল্লাহ্ তা'আলার বন্ধু। তাহাদের কোন ভয় বা চিন্তা থাকিবে না।”
সাহাবাগণ নিবেদন করিলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ্ ! (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁহারা কারা? রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেনঃ
"তাহারা এইরূপ লোক যাহারা আল্লাহর উদ্দেশ্যে একে অন্যের সহিত বন্ধুত্ব স্থাপন করিয়াছিল"।
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ
>“যে দুই ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে বন্ধুত্ব স্থাপন করে তন্মধ্যে আল্লাহ্ সেই ব্যক্তিকে অধিক ভালবাসেন যে স্বীয় বন্ধুকে অধিক ভালবাসে।” তিনি আরও বলেন : আল্লাহ্ বলেন :
>“যাহাদের একজন অপরজনের সহিত আমার উদ্দেশ্যে সাক্ষাত করে, একজন অপরজনের সহিত আমার উদ্দেশ্যে বন্ধুত্ব স্থাপন করে, আমার উদ্দেশ্যে একজন অপরজনকে ক্ষমা করে এবং আমার জন্য একে অন্যকে সহায়তা করে, তাহারা আমার বন্ধু হওয়ার যোগ্য।”
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
>“কিয়ামত দিবস আল্লাহ্ বলিবেন, যে সকল লোক আমার জন্য পরস্পর বন্ধুত্ব করিয়াছিল তাহারা কোথায়? আজ মানবের আশ্রয়ের জন্য কোথাও ছায়া নাই; আমি তাহাদিগকে স্বীয় (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় প্রদান করিব।”
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ
>“কিয়ামত দিবস সাত প্রকার লোক আল্লাহর আরশের ছায়া লাভ করিবে, তাহারা ব্যতীত অপর কেহই কোন ছায়া পাইবে না। তাহারা হলো-
(১) সুবিচারক ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ্।
(২) যে যুবক যৌবনের প্রারম্ভ হইতে আল্লাহ্ ইবাদতে লিপ্ত রহিয়াছে।
(৩) যে ব্যক্তি মসজিদ হইতে বহির্গত হইয়া পুনরায় মসজিদে প্রবেশ করা পর্যন্ত সময়ে তাহার হৃদয় মসজিদের প্রতি আকৃষ্ট থাকে।
(৪) যে দুই ব্যক্তি কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে পরস্পর বন্ধুত্ব স্থাপন করে, আল্লাহর উদ্দেশ্যেই মিলিত হয় এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে সংসর্গ বর্জন করে।
(৫) যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহ তা’আলাকে স্মরণ করিয়া রোদন করে।
(৬) যে ব্যক্তিকে কোন ধনবতী ও সুন্দরী যুবতী নিজের দিকে আহ্বান করে এবং সে বলে 'আমি আল্লাহকে ভয় করি।'
(৭) সেই ব্যক্তি যেন ডান হাতে এমনভাবে দান করে যে তাহার বাম হাতও জানিতে না পারে।"
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
>"যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে তাহার মুসলমান ভ্রাতার সহিত সাক্ষাত করে, এক ফেরেশতা তাহার পশ্চাতে ঘোষণা করিয়া বলে-আল্লাহর বেহেশত তোমার জন্য মুবারক হউক।" তিনি আরও বলেনঃ
>"এক ব্যক্তি তাহার কোন বন্ধুর সহিত সাক্ষাত করিতে যাইতেছিল। আল্লাহর আদেশে পথিমধ্যে এক ফেরেশতা তাহার সহিত সাক্ষাত করিল।
ফেরেশতা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল- তুমি কোথায় যাইতেছ?
সে বলিল-অমুক ভ্রাতার সহিত সাক্ষাত করিতে যাইতেছি।
ফেরেশতা জিজ্ঞাসা করিল-তাহার নিকট তোমার কোন কাজ আছে কি?
সে বলিল-কোন কাজ নাই।
ফেরেশতা আবার জিজ্ঞাসা করিল--তাহার সহিত তোমার কোন আত্মীয়তা আছে কি?
সে বলিল-কিছুই নহে।
ফেরেশতা পুনরায় জিজ্ঞাসা করিল-সে তোমার কোন উপকার করিয়ছে কি?
সে বলিল-কিছুই নহে।
ফেরেশতা জিজ্ঞাসা করিল- তবে কেন যাইতেছ?
সে বলিল-আল্লাহর উদ্দেশ্যে তাহার নিকট যাইতেছি এবং তাহাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিয়াছি।
ফেরেশতা বলিল-তোমাকে এই শুভ সংবাদ প্রদানের জন্য আল্লাহ্ আমাকে তোমার নিকট প্রেরণ করিয়াছেন যে, সেই ব্যক্তিকে তুমি ভালবাস বলিয়া আল্লাহ্ তোমাকে ভালবাসেন এবং তোমার জন্য তাঁহার উপর বেহেশত ওয়াজিব করিয়া লইয়াছেন।"
রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ
>"সেই বন্ধুত্ব এবং শত্রুতা ঈমানের দৃঢ়তম দলীল যাহা আল্লাহর ওয়াস্তে হইয়া থাকে।"
আল্লাহ্ কোন নবী (আঃ)-এর উপর ওহী প্রেরণ করিলেন,
>"তুমি যে যুহদ (অর্থাৎ সংসার বিরাগ ও পরকাল আসক্তি) অবলম্বন করিয়াছ, ইহাতে স্বীয় শান্তি লাভের জন্য তাড়াতাড়ি করিয়াছ। কারণ ইহাতে সংসার ও সাংসারিক দুঃখ-কষ্ট হইতে মুক্তি পাইয়াছ। আর তুমি যে আমার ইবাদতে মশগুল হইয়াছ ইহাতে স্বীয় মর্যাদা লাভ করিয়াছ। কিন্তু ভাবিয়া দেখ, তুমি কি কখনও আমার বন্ধুগণের সহিত বন্ধুত্ব এবং আমার শত্রুদের সহিত শত্রুতা করিয়াছ?"
আল্লাহ্ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর ওহী প্রেরণ করিলেন :
>"হে ঈসা ! আপনি যদি পৃথিবী ও আকাশের অধিবাসীবৃন্দের সমস্ত ইবাদত একা সম্পন্ন করেন এবং এই সকল ইবাদতের মধ্যে আমার উদ্দেশ্যে অন্যের সহিত বন্ধুত্ব বা শত্রুতা না থাকে তবে এই সমস্ত ইবাদত নিষ্ফল।"
হযরত ঈসা (আঃ) বলেন:
>"পাপীদের সহিত শত্রুতা করিয়া তোমরা আল্লাহর প্রিয়পাত্র হও, তাহাদিগ হইতে দূরে থাকিয়া আল্লাহর নিকটবর্তী হও এবং তাহাদের প্রতি ক্রোধ করিয়া আল্লাহর সন্তোষ অন্বেষণ কর"।
লোকে জিজ্ঞাসা করিলঃ হে রূহুল্লাহ ! আমরা কাহার সহিত উঠাবসা করিব? তিনি বলিলেনঃ
>"এমন লোকের নিকট বস যাহাকে দর্শন করিলে আল্লাহর স্মরণ তোমাদের অন্তরে জাগ্রত হয়, যাহার কথা তোমাদের জ্ঞান বৃদ্ধি করে এবং যাহার কার্যাবলী তোমাদিগকে পরকালের প্রতি আকৃষ্ট করে"।
আল্লাহ্ হযরত দাউদ (আঃ)-এর উপর ওহী প্রেরণ করিলেনঃ হে দাউদ ! মানব-সমাজ পরিত্যগ করতঃ আপনি নির্জনে বসিয়াছেন কেন? তিনি নিবেদন করিলেন : ইয়া আল্লাহ্ ! আপনার মহব্বত আমার অন্তর হইতে সৃষ্টের স্মরণ বিস্মৃত করিয়া দিয়াছে এবং আমি সকলের প্রতি বিরক্ত হইয়া পড়িয়াছি। নির্দেশ হইলঃ হে দাউদ ! সাবধান হোন এবং নিজের জন্য ভাই বন্ধু বানাইয়া নেন। আর যে ব্যক্তি ধর্ম-পথে আপনার সহায়ক না হয়, তাহা হইতে দূরে থাকুন; কারণ সে ব্যক্তি আপনার হৃদয় অন্ধকার করিয়া ফেলিবে এবং আপনাকে আমা হইতে দূরে সরাইয়া রাখিবে।
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন :
>"আল্লাহর এক ফেরেশতা আছে, তাহার দেহের অর্ধাংশ বরফ দ্বারা ও অপর অর্ধাংশ অগ্নি দ্বারা সৃষ্ট। এই ফেরেশতা বলে : "ইয়া আল্লাহ্! যেমন আপনি বরফ ও অগ্নির মধ্যে সখ্যতা স্থাপন করিয়াছেন তদ্রূপ আপনার নেক বান্দাগণের অন্তরে সখ্যতা স্থাপন করিয়া দেন।"
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ
>"যাহারা আল্লাহর উদ্দেশ্যে পরস্পর বন্ধুত্ব স্থাপন করে তাহাদের জন্য বেহেশতে লোহিত বর্ণ ইয়াকৃত নির্মিত একটি স্তম্ভ তৈয়ার করা হইবে। ইহার উপর সত্তর হাজার বালাখানা থাকিবে। তথা হইতে তাহারা বেহেশতবাসিগণকে ঝুঁকিয়া দেখিবে। তাহাদের মুখমণ্ডলের জ্যোতি বেহেশতবাসিগণের উপর এমনভাবে প্রতিফলিত হইবে যেমন পৃথিবীর উপর সূর্যকিরণ প্রতিফরিত হইয়া থাকে। বেহেশতবাসিগণ বলিবে-চল, আমরা তাহাদিগকে দেখিয়া আসি। তাহাদের পরিধানে সবুজ রেশমী পোশাক থাকিবে এবং তাহাদের ললাটে লিখিত থাকিবে (আল মুতাহাব্বুনা ফি আল্লাহ্) এই সকল লোক আল্লাহর উদ্দেশ্যে পরস্পর বন্ধুত্ব স্থাপনকারী।"
হযরত ইব্ন সামাক (রঃ) মৃত্যুকালে আল্লাহর নিকট নিবেদন করিলেনঃ ইয়া আল্লাহ্ ! আপনি জানেন, আমি পাপ করিবার সময় আপনার অনুগত বান্দাগণকে ভালবাসিতাম। এই কার্যের ফলস্বরূপ আমার পাপসমূহ মাফ করিয়া দেন।
হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন : আল্লাহর উদ্দেশ্যে বন্ধুত্ব স্থাপনকারিগণ যখন একে অন্যকে দেখিয়া আনন্দিত হয় তখন তাহাদের নিকট হইতে গুনাহ্ এইরূপভাবে ঝরিয়া পড়ে যেমন বৃক্ষ হইতে পত্র ঝরিয়া পড়িতে থাকে।
পরবর্তী পর্ব
আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসার নিদর্শন

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন