হকদারের হক পর্ব- ২
আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসার নিদর্শন
একই মক্তব, মাদ্রাসা বা গ্রামে অবস্থান অথবা ভ্রমণে একত্রে থাকার কারণে যে ভালবাসার উৎপত্তি হয় তাহা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসার অন্তর্ভুক্ত নহে। আবার দেখিতে মনোহর, বচনে মিষ্টভাষী এবং অন্তরে সরল ও অকপট হওয়ার দরুন অপরের প্রতি যে ভালবাসার উদ্রেক হয়, তাহাও আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসার অন্তর্ভুক্ত নহে। কাহারও সাহায্যে পদমর্যাদা কিংবা ধন-সম্পদ লাভ হইলে অথবা কাহারও সহিত সাংসারিক কোন কার্যে নিবদ্ধ থাকিলে যে ভালবাসা জন্মে তাহাও আল্লাহ্ উদ্দেশ্যে ভালবাসার অন্তর্গত নহে।
আল্লাহ্ ও আখিরাতের উপর যাহার ঈমান নাই তাহার সহিতও এইরূপ ভালবাসা জন্মিতে পারে। ঈমান ব্যতীত আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসা হইতে পারে না।
আল্লাহ্ উদ্দেশ্যে ভালবাসার দুইটি সোপান আছে।
প্রথম সোপান : আল্লাহর উদ্দেশ্যে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ভালবাসা। কিন্তু এই স্বার্থ ধর্ম আল্লাহর জন্য হইতে হইবে। যেমন ধর্মবিদ্যা শিক্ষা দেন বলিয়া উস্তাদকে ভালবাসা। এই বিদ্যার উদ্দেশ্য পরকাল হইলে এবং সাংসারিক পদমর্যাদা ও ধনলাভের জন্য না হইলেও উস্তাদের প্রতি ভালবাসাকে আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসা বলা যাইবে। কিন্তু পর্থিব মান-মর্যাদা ও ধন-দৌলত লাভ করা, বিদ্যা অর্জনের উদ্দেশ্যে হইলে উহাকে আল্লাহর ওয়াস্তে বলা যাইবে না। সদকা প্রদানকারী যদি এমন লোককে ভালবাসে যে তাহার নিকট হইতে সদকা গ্রহণপূর্বক শর্তানুসারে গরীব-দুঃখীদিগকে উহা পৌছাইয়া দেয় কিংবা তাহাদের আতিথ্য করিয়া থাকে অথবা এমন লোককে যদি ভালবাসে যে গরীব-দুঃখীদের জন্য উত্তমরূপে খাদ্য পাকাইয়া থাকে তবে এই ভালবাসা আল্লাহর ওয়াস্তে বলিয়া গণ্য হইবে। যে ব্যক্তি খাদ্য-বস্ত্র প্রদান করতঃ নিরুদ্বেগে ও একাগ্রচিত্তে ইবাদত করিবার সুযোগ দান করে তাহার প্রতি ভালবাসাও আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসার মধ্যে গণ্য হইবে। কিন্তু শর্ত এই যে, খাদ্য-বস্ত্ৰ পাইয়া নিশ্চিত মনে ইবাদত করিবার উদ্দেশ্য থাকিতে হইবে। বহু আলিম ও আবিদ এই উদ্দেশ্যে ধনীদের সহিত বন্ধুত্ব স্থাপন করিয়া থাকেন এবং ফলে উভয় দলই আল্লাহর ভালবাসা লাভ করিয়া থাকেন।
মন্দ কার্য হইতে স্বামীকে বাঁচাইবে এবং এমন সন্তান জন্মিবার উপলক্ষ হইবে যে পিতার মঙ্গলের জন্য যুদ্ধ করিবে, এই কারণে স্বীয় স্ত্রীকে ভালবাসিলে এই ভালবাসাও আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসা বলিয়া গণ্য হইবে এবং এইরূপ স্ত্রীকে ভরণ-পোষণের ব্যয়ও সদকার মধ্যে গণ্য। ভৃত্য প্রভুর খেদমত করে এবং সে তাহার কার্যভার গ্রহণপূর্বক প্রভূকে নিশ্চিন্ত মনে ইবাদতের অবসর প্রদান করে বলিয়া ভৃত্যকে ভালবাসিলে ইবাদতে অবসর করার দরুন ভৃত্যের প্রতি যে ভালবাসাটুকু হয়, তাহা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসা বলিয়া গণ্য হইবে এবং উহার সওয়াবও পাওয়া যাইবে।
দ্বিতীয় সোপান : যে ভালবাসা নিঃস্বার্থভাবে একমাত্র আল্লাহর ওয়াস্তেই হইয়া থাকে এবং যাহাতে উভয় পক্ষের অন্য কোন প্রকার স্বার্থের লেশমাত্রও থাকে না, উহাই এই উচ্চ সোপানের ভালবাসা। ইহা পূর্বোক্ত স্বার্থসংশ্লিষ্ট ভালবাসা অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর। শিক্ষা প্রদান, শিক্ষা গ্রহণ, ইবাদতে অবসরলাভ এবং বিধ কোন প্রকার স্বার্থই ইহাতে থাকে না। আল্লাহর আজ্ঞানুবর্তী ও তাঁহার প্রিয়পাত্র বলিয়া কাহাকেও ভালবাসিলে ইহাকে এই শ্রেণীর ভালবাসা বলে। কিংবা অন্ততঃপক্ষে ইহা মনে করিয়াও যদি কেহ কাহাকেও ভালবাসে যে, এই ব্যক্তি আল্লাহর বান্দা, তাঁহারই সৃষ্টি, তবে ইহাও আল্লাহর ওয়াস্তে বন্ধুত্বের অন্তর্ভুক্ত এবং ইহার বড় সওয়াব পাওয়া যাইবে। কারণ, এইরূপ ভালবাসা আল্লাহর প্রতি এমন মহব্বত হইতে জন্মিয়া থাকে যাহা ইশকের পর্যায়ে উন্নীত হইয়াছে। যেমন, কেহ কাহারও প্রতি আশিক হইলে সে মাশুকের অলি-গলি এবং তাহার মহল্লাকেও ভালবাসে। আর প্রিয়জনের গৃহ প্রাচীরও তাহার নিকট প্রিয় হইয়া পড়ে। এমন কি যে কুকুর প্রিয়জনের গলিতে যাতায়াত করে, ইহাও অন্যান্য কুকুর অপেক্ষা উক্ত আশিকের নিকট অধিক প্রিয় হইয়া উঠে। অতএব যাহারা তাহার প্রেমাষ্পদকে ভালবাসে অথবা যাহাদিগকে তাহার প্রেমাষ্পদ ভালবাসে তাহাদিগকে, এমন কি যাহারা প্রেমাষ্পদের আজ্ঞানুবর্তী চাকর-বাকর, দাস-দাসী তাহাদিগকে এবং তাহার আত্মীয়-স্বজনকেও প্রেমিক স্বতঃই ভালবাসিয়া থাকে। কারণ, প্রেমাম্পদের সহিত সংশ্লিষ্ট সম্বন্ধযুক্ত বস্তু ও ব্যক্তির প্রতি ভালবাসা স্বতঃই প্রেমিকের অন্তরে অনুপ্রবেশ করে। প্রিয়জনের প্রতি প্রেম যত অধিক, তাহার সহিত সংশ্লিষ্ট ও তাহার অনুগত ব্যক্তিগণের প্রতিও সেই প্রেমের প্রতিক্রিয়ারূপ ভালবাসা তত অধিক হইয়া থাকে ।
সুতরাং যাহার অন্তরে আল্লাহর মহব্বত বৃদ্ধি পাইয়া ইশকের পর্যায়ে উন্নীত হইয়াছে তিনি সাধারণভাবে তাঁহার সমস্ত বান্দাকে এবং বিশেষভাবে তাঁহার প্রিয়পাত্রগণকে ভালবাসিয়া থাকেন। সমস্ত মাখলুকাত স্বীয় প্রেমাস্পদের অপরিসীম শক্তির পরিচায়ক ও তাঁহার শিল্পনৈপুণ্যের জ্বলন্ত নিদর্শন, এইজন্য তিনি এই সমস্তকেই ভালবাসিয়া থাকেন। অপর কারণ এই যে, আশিক মাশুকের হস্তলিপি ও শিল্পকলাকেও ভালবাসিয়া থাকে।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সমীপে কেহ নূতন ফল আনয়ণ করিলে তিনি উহার সম্মান করিতেন এবং স্বীয় চক্ষু মুবারকে লাগাইয়া বলিতেন যে, উহার সৃষ্টিকাল আল্লাহর নিকটবর্তী অর্থাৎ উহা প্রকৃত শিল্পী আল্লাহর নূতন শিল্প নৈপূণ্য।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন