শনিবার, ৩০ মার্চ, ২০২৪

যাকাত (পর্ব– ৫) যাকাতের হকদার



যাকাত পর্ব– ৫
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যাকাতের হকদার
দান খয়রাতের জন্যে এমন লোক তালাশ করা, যাদের দ্বারা দান-খয়রাত মর্যাদাশীল ও পবিত্র হয়। যেনতেন লোকের হাতে তা পৌঁছে দেয়া ঠিক নয়। ছয়টি গুণের মধ্যে থেকে দুটি গুণ যাদের মধ্যে পাওয়া যায় তাদেরকে খয়রাত দেবে। 

(১) প্রথম- এমন লোক তালাশ করবে, যে পরহেযগার, সংসারবিমুখ ও কেবল আখেরাতের ব্যবসায়ে লিপ্ত। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : "পরহেযগার ব্যক্তির খাদ্য ছাড়া খেয়ো না এবং তোমার খাদ্য যেন পরহেযগার ছাড়া কেউ না খায়"৷
এর কারণ, পরহেযগার ব্যক্তি খেয়ে তার পরহেযগারীকে শক্তি যোগাবে। ফলে যে খাওয়াবে সে তার এবাদতে শরীক হয়ে যাবে। হাদীসে আরও আছে- "তোমরা তোমাদের খাদ্য পরহেযগারদেরকে খাওয়াও আর অনুগ্রহ যা কর, ঈমানদারদের প্রতি কর"। জনৈক আলেম তার দানের মাল সুফী ফকীরগণ ছাড়া অন্য কাউকে দিতেন না। তাকে কেউ বলল : এ মাল বিশেষ এক সম্প্রদায়কে না দিয়ে সকল ফকীরকে দিলেই তো ভাল হত। তিনি বললেন : না, এই বিশেষ সম্প্রদায়ের সাহসিকতা আল্লাহর জন্যে ব্যয়িত হয়ে যায়। তারা উপবিষ্ট হলে তাদের সাহসিকতা বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। সুতরাং এক ব্যক্তিকে দান করে যদি আমি তার সাহসিকতা আল্লাহর দিকে আকৃষ্ট করতে পারি, তবে এটা আমার মতে হাজার ব্যক্তিকে দান করা অপেক্ষা উত্তম, যাদের সাহসিকতা কেবল সংসারের দিকেই নিবিষ্ট। এ উক্তিটি হযরত জুনায়দ বাগদাদী (রহঃ)-এর কাছে কেউ উত্থাপন করলে তিনি একে চমৎকার উক্তি বলে অভিহিত করলেন এবং বললেন : এ লোকটি একজন ওলী আল্লাহ। বহু দিন যাবত আমি এর চেয়ে উত্তম উক্তি শ্রবণ করিনি। কথিত আছে, এক সময় এই বুযুর্গ ব্যক্তি আর্থিক সংকটে পড়ে দোকান বন্ধ করে দিতে মনস্থ করেন। হযরত জুনায়দ (রহঃ) তাঁর কাছে কিছু পুঁজি প্রেরণ করে বললেন : এই অর্থ দ্বারা দোকানের মাল কিনে নাও, দোকান বন্ধ করো না। তোমার মত ব্যক্তির জন্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিকর নয়। লোকটি ছিলেন সবজি বিক্রেতা। কোন দরিদ্র লোক তাঁর কাছ থেকে সবজি ক্রয় করলে তিনি দাম নিতেন না।

(২) দ্বিতীয়তঃ বিশেষভাবে এলেমধারী ব্যক্তিকে খয়রাত দেবে। তাকে দিলে তার এলেমকে সাহায্য যোগানো হবে। এলেম এবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ যদি তাতে নিয়ত ঠিক থাকে। হযরত ইবনে মোবারক (রহঃ) দান-খয়রাত বিশেষভাবে এলেমধারীদেরকে দিতেন। কেউ তাঁকে বলল : আপনার খয়রাত ব্যাপকভাবে দিলেই তো ভাল হত। তিনি বললেন : আমি নবুওয়তের মর্তবার পর আলেমদের মর্তবা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কোন মর্তবা আছে বলে জানি না। আলেমের মন যদি অভাব অনটনে ব্যাপৃত থাকে, তবে সে এলেমের জন্যে সময় সুযোগ পাবে না। কাজেই তাঁকে দেয়ার অর্থ এলেমের জন্যে তাঁকে সুযোগ করে দেয়া।

(৩) তৃতীয়- তাকওয়ায় সাচ্চা ও তওহীদে পাকা ব্যক্তিকে খয়রাত দেবে। তওহীদে সাচ্চা হওয়ার অর্থ, যখন কারও কাছ থেকে খয়রাত গ্রহণ করবে, তখন আল্লাহ তাআলার হামদ ও শোকর করবে এবং মনে করবে, এ নেয়ামত তাঁরই পক্ষ থেকে। মধ্যবর্তী ব্যক্তির প্রতি লক্ষ্য করবে না। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর দরবারে বান্দার শোকর এটাই যে, সে সকল নেয়ামত আল্লাহর পক্ষ থেকে মনে করবে। লোকমান (আঃ) তাঁর পুত্রকে উপদেশ দেন, নিজের ও আল্লাহ তাআলার মাঝখানে অপরকে নেয়ামতদাতা সাব্যস্ত করবে না। যেব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অপরের শোকর করে, সে যেন নেয়ামতদাতাকে চেনেই না এবং বিশ্বাস করে না যে, মধ্যবর্তী ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নিয়ন্ত্রণাধীন। কেননা, আল্লাহ তাআলাই তাকে দানে বাধ্য করেছেন এবং দানের আসবাবপত্র সরবরাহ করেছেন। সে যদি দান না করতে চাইত, তবে তা পারত না। কেননা, পূর্বাহে আল্লাহ মনে জাগরূক করেছেন যে, দান করার মধ্যেই তার ইহলৌকিক কল্যাণ নিহিত। যেব্যক্তি এটা বিশ্বাস করে, তার দৃষ্টি আল্লাহ ব্যতীত অপরের দিকে যাবে না। দাতার জন্য এরূপ ব্যক্তির বিশ্বাস প্রশংসা ও শোকরের চেয়ে বেশী উপকারী। যেব্যক্তি দান করার কারণে প্রশংসা ও দোয়া করে, সে দান না করার কারণে নিন্দা এবং বদ দোয়াও করতে পারবে। বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কোন এক ফকীরের কাছে কিছু খয়রাত প্রেরণ করে দূতকে বলে দিলেন : ফকীর যা বলে মনে রাখবে। ফকীর খয়রাত গ্রহণ করে বলল : আল্লাহর শোকর, যিনি রিযিকদানকারীকে ভুলেন না এবং শোকরকারীকে বরবাদ করেন না। ইলাহী! আপনি আমাকে বিস্তৃত না হলে আপনার রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে এমন করুন যে, তিনি আপনাকে না ভুলে যান। দূত এসে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জানালে তিনি ফকীরের উক্তিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। দেখ, এই ফকীর তার দৃষ্টি কিভাবে আল্লাহ তাআলাতে নিবদ্ধ করেছে! 
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এক ব্যক্তিকে তওবা করতে বললে সে বলল : আমি কেবল আল্লাহ' তা'আলার দিকে তওবা করি- মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর দিকে নয়। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন : তুমি হকদারের হক চিনতে পেরেছ। হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর অপবাদ মোচনের আয়াত অবতীর্ণ হলে হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁকে বললেন : আয়েশা! দাঁড়াও, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর মস্তক চুম্বন কর। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন : আল্লাহর কসম, আমি এরূপ করবো না। আমি আল্লাহ ব্যতীত কারও কাছে কৃতজ্ঞ নই। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন : আবু বকর! তাকে ছাড়, কিছু বলো না। এক রেওয়ায়েতে আছে, হযরত আয়েশা (রাঃ) পিতা আবু বকরকে এই জওয়াব দেন -
"আল্লাহ তাআলার শোকর। এতে আপনার ও আপনার সঙ্গীর অর্থাৎ রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কোন অনুগ্রহ নেই। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অস্বীকৃতি জানাননি, অথচ অপবাদ মোচনের তাঁর মাধ্যমেই হযরত আয়েশার কাছে পৌঁছেছিল। নেয়ামত আল্লাহ তাআলা ছাড়া অপরের পক্ষ থেকে মনে করা কাফেরদের বৈশিষ্ট্য। সেমতে আল্লাহ বলেন-
"যখন এককভাবে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়, তখন যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, তাদের অন্তর স্তব্ধ হয়ে যায়। আর যখন আল্লাহ ব্যতীত অন্য দেবদেবীদের নাম উচ্চারণ করা হয়, তখন তারা হর্ষোৎফুল্ল হয়ে যায়।"

যেব্যক্তির অন্তর মাধ্যমের প্রতি তাকানো থেকে মুক্ত নয় এবং একে নিছক মাধ্যম মনে করে না, তার মন যেন শেরকে খফী তথা গোপন শেরক থেকে আলাদা হয়নি। তার উচিত আল্লাহকে ভয় করা এবং স্বীয় তওহীদকে শেরকের ময়লা ও সন্দেহ থেকে পরিষ্কার করা।

(৪) চতুর্থ- যারা আপন অবস্থা গোপন রাখে, অভাব-অভিযোগ ও কষ্টের কথা খুব একটা বর্ণনা করে না, অথবা যেব্যক্তি পূর্বে ধনী ছিল, এখন সর্বস্বহারা, কিন্তু পূর্বের অভ্যাস পরিত্যাগ করে না এবং পুরোপুরি ভদ্রতা বজায় রেখে জীবন যাপন করে- এরূপ লোককে খয়রাত দেবে। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন- "সওয়াল থেকে বেঁচে থাকার কারণে মূর্খরা তাদেরকে ধনী মনে করে। তুমি তাদেরকে চেহারা দেখে চিনতে পারবে। তারা মানুষের গায়ে পড়ে সওয়াল করে না"। অর্থাৎ, সওয়াল করার মধ্যে আতিশয্য করে না। কারণ, তারা আপন বিশ্বাসে ধনী এবং সবর দ্বারা সম্মানী। প্রত্যেক মহল্লায় ধার্মিক লোকদের মাধ্যমে এরূপ ব্যক্তিদের তালাশ করা উচিত। এরূপ সম্ভ্রমী লোকদের মনের অবস্থা খয়রাতকারীদের জানা উচিত। কেননা, তাদেরকে খয়রাত দেয়া প্রকাশ্য সওয়ালকারীদেরকে খয়রাত দেয়ার তুলনায় কয়েক গুণ বেশী সওয়াব রাখে।

(৫) পঞ্চম- যারা অধিক সন্তান-সন্ততিসম্পন্ন অথবা রোগাক্রান্ত অথবা কোন কারণে দুর্দশাগ্রস্ত, তাদেরকে খয়রাত দেবে। আয়াতে বলা হয়েছে : সেসব ফকীরের জন্যে, যারা আল্লাহর পথে আটকা পড়েছে, তারা স্বদেশে চলাফেরা করতে পারে না। অর্থাৎ, যারা আখেরাতের পথে পরিবার-পরিজনের কারণে অথবা রুজি-রোজগারের স্বল্পতার কারণে অথাব আত্মসংশোধনের কারণে আটকা পড়েছে। ফলে দেশে সফর করার শক্তি রাখে না। কেননা, এসব কারণে তাদের হাতে পায়ে জিঞ্জির পড়েছে। হযরত ওমর (রাঃ) এক গৃহের লোকদেরকে এক পাল ছাগল অথবা দশটি ছাগল অথবা আরও বেশী দান করতেন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সন্তান-সন্ততির সংখ্যা অনুযায়ী দান করতেন। হযরত ওমর (রাঃ)-কে কেউ জাহ্দুল বালা'র উদ্দিষ্ট অর্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন : সন্তান সন্ততির আধিক্য এবং অর্থ সম্পদের স্বল্পতা।

(৬) ষষ্ঠ- যে ফকীর আত্মীয় এবং রক্তের সাথে সম্পর্কশীল, তাকে খয়রাত দেবে। এতে খয়রাতও হবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্কও বজায় থাকবে। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার মধ্যে অনেক সওয়াব। হযরত আলী (রাঃ) বলেন : যদি আমি এক দেরহাম দিয়ে আমার কোন ভাইয়ের আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখি, তবে তা আমার মতে বিশ দেরহাম খয়রাত করা অপেক্ষা উত্তম। যদি বিশ দেরহাম দিয়ে সম্পর্ক বজায় রাখি, তবে এটা একশ' দেরহাম খয়রাত করার চেয়ে ভাল। পরিচিতদের মধ্যে বন্ধুদেরকে আগে দান করা উচিত; যেমন অপরিচিতদের তুলনায় আত্মীয়কে আগে দেয়া উত্তম।
মোট কথা, এসব প্রার্থিত গুণের প্রতি লক্ষ্য রেখে খয়রাত দেয়া উচিত। এগুলোর প্রত্যেকটিতে অনেক স্তর রয়েছে। সর্বোচ্চ স্তর অন্বেষণ করা উচিত। কোন ব্যক্তির মধ্যে এসব গুণের মধ্য থেকে কয়েকটি পাওয়া গেলে তাকে নেয়ামত মনে করতে হবে। যে উপযুক্ত লোক খোঁজাখুঁজি করবে, সে দ্বিগুণ সওয়াব পাবে। ভুল হয়ে গেলেও এক সওয়াব নষ্ট হবে না।

পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...