সংসারত্যাগী ও এবাদতকারীদের বিভ্রান্তি
এরাও কয়েকটি দলে বিভক্ত। কারও নামাযে, কারও তেলাওয়াতে, কারও হজ্জে, কারও জেহাদে এবং কারও সংসার অনাসক্তিতে বিভ্রান্তি হয়। তবে বিজ্ঞ ব্যক্তি কখনও বিভ্রান্ত হয় না। এরূপ লোকের সংখ্যা নিতান্তই কম। এদের মধ্যে এক শ্রেণীর লোক ফরয ছেড়ে নফল ও মোস্তাহাব নিয়ে ব্যস্ত থাকে। উদাহরণতঃ কেউ উযু করতে গেলে নানা ধরনের সন্দেহ-সংশয়বশত সীমাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে। এমনকি, যে পানি শরীয়তের দৃষ্টিতে পাক, তাতেও তাদের খটকা থাকে এবং নাপাকীর দূরবর্তী সম্ভাবনাকেও তারা নিকটবর্তী মনে করতে থাকে। অথচ হালাল ভক্ষণের ক্ষেত্রে তারাই নিকটবর্তী সম্ভাবনাকে দূরবর্তী জ্ঞান করে। বরং মাঝে মাঝে অকৃত্রিম হারামও খেয়ে ফেলে। যদি তারা পানির সাবধানতাকে খাওয়ার মধ্যে ব্যবহার করত, তবে এটা সাহাবায়ে কেরামের জীবনধারার অনুরূপ হত। হযরত উমর (রাঃ) একবার জনৈক খৃস্টান মহিলার ঘটি থেকে পানি নিয়ে উযু করে নেন; অথচ নাপাকীর সম্ভাবনা প্রকট ছিল। কিন্তু খাওয়ার ব্যাপারে তাঁর এতদূর সাবধানতা ছিল যে, অনেক হালাল বস্তুও হারামে লিপ্ত হওয়ার ভয়ে বর্জন করতেন। এই বিভ্রান্তদের কেউ কেউ উযু-গোসলে পানির অপচয় করে; অথচ এব্যাপারে অকাট্য নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত রয়েছে। কেউ কেউ এতই সন্দেহপ্রবণ যে, উযু করতে করতে জামাআত খতম হয়ে যায় অথবা নামাযের সময়ই চলে যায়। সময় থাকলেও তারা ভ্রান্ত, এতে কোন সন্দেহ নেই। আসলে শয়তান মানুষকে খুব উত্তম পন্থায় এবাদত থেকে বিরত রাখে। এধরনের ধারণা সৃষ্টি করে যে, মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কোন কোন এবাদতকারীর উপর নামাযের নিয়ত করার সময় সন্দেহ প্রবল হয়ে যায়। শয়তান তাদেরকে নিয়ত ঠিক করে নেয়ার সময় দেয় না; বরং এত পেরেশান করে যে, হয় জামাআত খতম হয়ে যায়, না হয়। নামাযের সময় চলে যায়। যদি তারা তাকবীর বলে তাহরীমা বেঁধে নেয়, তবে নামাযের বিশুদ্ধতায় সন্দেহ পোষণ করতে থাকে। কখনও “আল্লাহু আকবার” বলার মধ্যে এত সন্দেহ করে যে, সাবধানতার আতিশয্যে তাকবীরের শব্দ বদলে যায়। নামাযের শুরুতে এ অবস্থা হয়, এরপর সমগ্র নামাযে গাফেল থাকে এবং মনকে উপস্থিত করে না। তারা বিভ্রান্তির কারণে মনে করে যে, এসব কাণ্ড আল্লাহর কাছে খুব প্রিয়।
কতক লোকের উপর, “আলহামদু” ও অন্যান্য সকল ওযীফার মাখরাজসহ বিশুদ্ধ উচ্চারণের সন্দেহ প্রবল থাকে। তারা সর্বদাই এ ব্যাপারে খুব সাবধানতা অবলম্বন করে এবং একেই অত্যাবশ্যক মনে করে অন্যান্য বিষয়ে চিন্তাই করে না। তারা আয়াতের অর্থ, তার উপদেশ ও রহস্য হৃদয়ঙ্গম করার সাথে কোন সম্পর্কই রাখে না। এটা বড় বিভ্রান্তি। কেননা, আল্লাহ তা'আলা মানুষকে এমনভাবে কোরআন তেলাওয়াত করার আদেশ দিয়েছেন, যেমন তারা দৈনন্দিন কথাবার্তা বলে। অতএব, এতে এহেন বানোয়াট কোত্থেকে এল? তাদের দৃষ্টান্ত এমন, যেমন কোন ব্যক্তিকে একটি বার্তা বাদশাহের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য প্রেরণ করা হল। সে বাদশাহের দরবারে পৌঁছে বার্তার শব্দসমূহের সঠিক উচ্চারণে সমগ্র মনোযোগ নিবিষ্ট করল এবং এক এক শব্দকে ঠিক করতে গিয়ে কয়েকবার উচ্চারণ করল। কিন্তু বার্তার বিষয়বস্তু কি ছিল এবং বাদশাহের দরবারের শিষ্টাচার কি কি ইত্যাদি বিষয়ের প্রতি ক্ৰক্ষেপও করল না। এরূপ ব্যক্তির শাস্তি পাগলা গারদে পাঠিয়ে দেয়া ছাড়া আর কি হতে পারে?
এর বিপরীতে কিছুসংখ্যক লোক ঘাস কাটার ন্যায় কোরআন পাঠ করে। তারা মাঝে মাঝে একদিনে এক খতম করে। তারা মুখে কোরআন পাঠ করে; কিন্তু অন্তরে নানা প্রকার আশা-আকাঙ্ক্ষা বিচরণ করতে থাকে। অর্থের দিকে তো কোন মনোযোগই থাকে না যে শাস্তিবাণী ও উপদেশবাণী দ্বারা অন্তর কিছুটা প্রভাবিত হবে।
একদল লোক রোযা রাখার জন্যে পাগল থাকে। তারা সর্বদা অথবা পবিত্র দিনগুলোতে রোযা রাখে। কিন্তু নিজের জিহ্বাকে গীবত থেকে, অন্তরকে রিয়া থেকে, পেটকে হারাম থেকে এবং কথাবার্তাকে বাজে বিষয়াদি থেকে বাঁচিয়ে রাখে না। সারাদিন অনর্থক বকবক করতে থাকে। এতদসত্ত্বেও নিজেকে উত্তম মনে করে। যা ফরয তা করে না এবং নফল নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তাও আবার যেমন করা উচিত, তেমন করে না। এটা প্রকাশ্য ধোকা। কিছু লোক হজ্জকর্মে বিভ্রান্ত। তারা অপরের হক ও ঋণ আদায় না করে, পিতামাতার অনুমত্ ছাড়াই এবং হালাল পাথেয় সঙ্গে না নিয়েই হজ্জ করতে বের হয়ে পড়ে। পথিমধ্যে নামায ও অন্যান্য ফরয কর্ম বিনষ্ট করে এবং অশ্লীলতা ও কলহ-বিবাদ থেকে বিরত থাকে না। এরপর যখন বাড়ী ফিরে আসে, তখন অন্তরে কুচরিত্রতা ও বদস্বভাবের ভাণ্ডার থাকে। এতদসত্ত্বেও তারা হজ্জ করাকে উত্তম মনে করে।
পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন