শনিবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৪

বিভ্রান্তি (পর্ব- ৫) প্রথম প্রকার শিক্ষিতদের বিভ্রান্তি




বিভ্রান্তি (পর্ব- ৫)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শিক্ষিতদের বিভ্রান্তি – ১

একদল শিক্ষিত লোক প্রচুর ধর্মীয় ও যৌক্তিক বিদ্যা শিক্ষা করে এবং তা নিয়ে এত ব্যস্ত থাকে যে, বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতি মোটেই ভ্রুক্ষেপ করে না। তারা বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গোনাহ থেকে বিরত রাখে না এবং এবাদত পালন করে না। তারা আরও ধারণা করে আমরা আল্লাহ তাআলার কাছে মর্যাদাশীল। আল্লাহ আমাদের মত শিক্ষিতদেরকে আযাব দেবেন না; বরং সাধারণ লোকের পক্ষে আমাদের সুপারিশ কবুল করবেন। বাস্তবে এটা তাদের বিভ্রান্তি কেননা, গভীর দৃষ্টিতে দেখলে জানা যাবে, বিদ্যা দু’প্রকার। 

(১) মোকাশাফা; অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর গুণাবলীকে জানা, যাকে পরিভাষায় মারেফত' বলা হয়।

(২) মোয়ামালা; অর্থাৎ, হালাল-হারাম, ভাল ও মন্দ চরিত্র, তার প্রতিকার এবং মন্দ চরিত্র থেকে আত্মরক্ষার উপায় ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করা। 

আমল তথা কর্ম করার উদ্দেশ্যে এই দ্বিতীয় প্রকার বিদ্যা অর্জন করা হয়। আমল উদ্দেশ্য না হলে বিদ্যার কোন সার্থকতা নেই। যে বিদ্যার উদ্দেশ্য হয় আমল, সেই আমলই সেই বিদ্যার মূল্য হয়ে থাকে।

উদাহরণতঃ জনৈক রোগী একজন বিচক্ষণ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে চিকিৎসক তাকে কতগুলো বনজ ঔষধ, সেগুলোর প্রাপ্তিস্থান, চূর্ণকরণ, মিশ্রিতকরণ, প্রস্তুত প্রণালী, সেবনবিধি ইত্যাদি বিস্তারিত বলে দিল। রোগী সেগুলো শুনে সুন্দর হস্তাক্ষরে একটি ব্যবস্থাপত্র লিখে নিল। অতঃপর বাড়ী ফিরে সে প্রত্যেহ সে ব্যবস্থাপত্র পাঠ করতে শুরু করল তা পাঠ করে শুনাল। কিন্তু ব্যবস্থা অনুযায়ী বাজার থেকে সেগুলো কিনে ঔষধ তৈরি করল না এবং সেবনও করল না। অথচ তার কাছ থেকে শুনে অনেকেই। সেই ঔষধ তৈরি করে সেবন করল এবং রোগের হাত থেকে মুক্তি পেল। এমতাবস্থায় এই ব্যক্তির রোগমুক্তি আশা করা যায় কি? তার বিদ্যা তার কোন উপকারে আসবে কি? হাঁ, সে যদি পয়সা খরচ করে উপাদানগুলো বাজার থেকে কিনে ঔষধ তৈরি করে এবং যেভাবে সেবন করা দরকার, সেভাবে সেবন করে, সাথে সাথে নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর বস্তু আহার করা থেকে বিরত থাকে, তবে তার রোগমুক্তি আশা করা যায়। এতেও আরোগ্য লাভ না করার সম্ভাবনা থেকে যায়। কিন্তু মোটেই ঔষধ সেবন না করে আরোগ্য আশা করা খামখেয়ালী বৈ কিছু নয়। এমনিভাবে যে ব্যক্তি ফেকাহ, এবাদতের বিধিবিধান ইত্যাদি বিদ্যা শিক্ষা করে; কিন্তু নিজে আমল করে না, গোনাহসমূহ জেনেও গোনাহ থেকে আত্মরক্ষা করে না, মন্দ চরিত্র অধ্যয়ন করে এবং নিজেকে পরিশোধিত করে না এবং সচ্চরিত্রতার জ্ঞান অর্জন করে কিন্তু নিজে তা দ্বারা ভূষিত হয় না, সে নিশ্চিতই বিভ্রান্ত। আল্লাহ তা'আলা বলেন "যে নিজেকে পরিশোধিত করবে, সেই সফল হবে"।

এখানে একথা বলা হয়নি যে, যে পরিশোধনের জ্ঞান অর্জন করবে, সে সফল হবে। এক্ষেত্রে শয়তান আরও একটি ধোকা উপস্থিত করে। তা এই যে, জ্ঞানার্জনের সাথে ঔষধের কোন সম্পর্ক নেই। কেননা, ঔষধের জ্ঞান রোগ দূর করে না ঠিক; কিন্তু জ্ঞানার্জন খোদায়ী নৈকট্য ও সওয়াব লাভের কারণ হয়ে থাকে। সেমতে বিদ্যার ফযীলত সম্পর্কে অনেক হাদীস বর্ণিত আছে। এসব হাদীসে আমল ছাড়াই বিদ্যা অর্জনের মাহাত্ম বর্ণিত হয়েছে। বলা বাহুল্য, অজ্ঞ ব্যক্তিমাত্রই শয়তানের এই ধোকায় পড়ে যায়। কেননা, এটা মানসিক প্রবণতার অনুকূল। পক্ষান্তরে বিজ্ঞ ব্যক্তি শয়তানকে এই জওয়াব দেয় যে, তুই আমাকে বিদ্যার ফযীলত মনে করিয়ে দিচ্ছিস এবং অসৎ আমলহীন বিদ্বান ব্যক্তিদের সম্পর্কে যেসব শাস্তিবাণী উচ্চারিত হয়েছে, সেগুলো বেমালুম ভুলিয়ে দিচ্ছিস। দেখ, আল্লাহ বলেন : 

>"তার দৃষ্টান্ত কুকুরের মত"।

অন্য আয়াতে আছে— 

>"যাদেরকে তাওরাতের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল, অতঃপর তারা তা পালন করেনি, তাদের দৃষ্টান্ত গাধার মত, যে রাশি রাশি কিতাবের বোঝা বহন করে"।

কুকুর ও গাধার সমতুল্য হওয়ার চেয়ে বড় অপমান আর কি হবে? হাদীসে আছে, 

>"যার বিদ্যা বেশী এবং সুপথপ্রাপ্তি কম, সে আল্লাহ থেকে দূরেই চলে যায়"। 

আরও আছে, "আমলহীন আলেমকে দোযখে নিক্ষেপ করা হবে। তার অন্ত্রসমূহ বের হয়ে পড়বে এবং গাধা যেমন ঘানি ঘুরায়, তেমনি সে অগ্নিতে ঘুরবে"। 

হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেন : 'মূখের দুর্ভোগ একবার। সে লেখাপড়া করেনি। আল্লাহর মরযী হলে সে লেখাপড়া করত। কিন্তু বিদ্বানের দুর্ভোগ সাতবার। অর্থাৎ তার বিদ্যা তার বিরুদ্ধে প্রমাণ হবে এবং তাকে বলা হবে- বিদ্যা অর্জন করে তুমি কি আমল করেছ? আল্লাহর নেয়ামতের শোকর কিভাবে আদায় করেছ?' রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন- "কিয়ামতের দিন সর্বাধিক আযাব সেই শিক্ষিত ব্যক্তির হবে, যার শিক্ষা তার কোন উপকারে আসেনি; অর্থাৎ, সে আমল করেনি।" এ ধরনের আরও অসংখ্য রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে। এগুলো অসৎ বিদ্বান ব্যক্তির মরযীর অনুকূল নয়। তাই শয়তান এগুলো স্মরণ করায় না


আরও একদল শিক্ষিত লোক আমল করে; কিন্তু কেবল বাহ্যিক এবাদত পালন করে এবং গোনাহ থেকেও বেঁচে থাকে। তারা অন্তরের নিন্দনীয় দোষসমূহের প্রতি মোটেই নজর দেয় না। উদাহরণতঃ অহংকার, হিংসা, রিয়া, জাকজমকপ্রীতি, সুখ্যাতি অন্বেষণ ইত্যাদি থেকে বেঁচে থাকে না। কেউ কেউ তো এগুলোকে দোষ বলেও মনে করে না। তারা এসব হাদীসের প্রতি লক্ষ্য করে না যে, 

>সামান্যতম রিয়াও শিরক। 

>যার অন্তরে কণা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে যাবে না।

>হিংসা পুণ্য কাজকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে, যেমন আগুন লাকড়ীকে খেয়ে ফেলে। 

এগুলো ছাড়াও মন্দ-চরিত্র এর অধ্যায়ে আরও অনেক হাদীস বর্ণিত রয়েছে। এ শ্রেণীর শিক্ষিত লোক নিজের বাহ্যিক আকৃতি, খুব সুন্দর করে, কিন্তু অন্তরের আকৃতি সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়। অথচ রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : "আল্লাহ তা'আলা তোমাদের বাইরের আকৃতি ও অর্থ-সম্পদ দেখেন না; বরং অন্তর ও আমল দেখেন। অন্তরই মূল এবং মুক্তি এর নিরাপত্তার উপরই নির্ভরশীল। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ  "কিন্তু যে আল্লাহর কাছে আসে সুস্থ অন্তর নিয়ে" এই প্রকার শিক্ষিতদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে মৃতদের কবর, যা বাহ্যত খুব সুসজ্জিত; কিন্তু অভ্যন্তরে গলিত লাশ অথবা অন্ধকার কক্ষ। গোনাহের মূল শিকড় হচ্ছে মন্দ স্বভাব, যা অন্তরের অভ্যন্তরে প্রোথিত। অন্তর থেকে এগুলো সাফ না করলে বাহ্যিক এবাদত দ্বারা কি ফল পাওয়া যাবে? উদাহরণতঃ এক ব্যক্তির গায়ে খোস-পাঁচড়া দেখা দিল। চিকিৎসক তাকে মালিশ করার এবং পান করার ঔষধ বলে দিল, যাতে মালিশের ঔষধ দ্বারা ত্বকের উপকার হয় এবং সেবনের ঔষধ দ্বারা মূল শিকড় বিনষ্ট হয়। কিন্তু রোগী কেবল মালিশের ঔষধ লাগিয়েই ক্ষান্ত রইল এবং সেবনের ঔষধ ব্যবহার করল না; বরং এমন নিষিদ্ধ খাদ্য ভক্ষণ করল, যা দ্বারা খোস-পাঁচড়া আরও বেড়ে যায়। এমতাবস্থায় এই রোগীর খোস-পাচড়া কোনদিন দূর হবে না যদি হাজার বারও গায়ে ঔষধ মালিশ করে। কেননা, শিকড় তো ভিতরে অবস্থিত। সেটা দূর হলে এটাও দূর হবে।


পরবর্তী পর্ব

দ্বিতীয় প্রকার শিক্ষিতদের বিভ্রান্তি

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...