নফল নামায - (পর্ব - ২)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সুন্নত সমুহ
(১) ফজরের সুন্নত
পাঞ্জেগানা নামাযের মধ্যে ফজরের সুন্নত দু'রাকআত। এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : “ফজরের দু'রাকআত দুনিয়া ও দুনিয়াস্থিত সবকিছু অপেক্ষা উত্তম।” এর সময় সোবহে সাদেক থেকে শুরু হয়ে যায়। আকাশের কিনারায় ফজরের পূর্বে বিস্তৃত শুভ্র রেখাকে সোবহে সাদেক বলা হয়। শুরুতে এটা চেনা খুবই কঠিন। এর জন্যে চন্দ্রের উদয় অস্তের সময় জানতে হবে। প্রতি মাসে দু'বার চন্দ্র দ্বারা সোবহে সাদেক চেনা যায়। ছাব্বিশতম রাতে চাঁদ সোবহে সাদেকের সাথে উদিত হয় এবং দ্বাদশতম রাতে চাদের অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে প্রায় সোবহে সাদেক হয়ে যায়। যে আখেরাত তলব করে, তার জন্যে চাঁদের এসব মনযিল চেনা জরুরী। এতে রাত্রিকালীন সময়ের পরিমাণ ও সোবহে সাদেক চেনা যায়। যখন ফজরের ফরয সময় শেষ হয়, তখন সুন্নতের সময়ও শেষ হয়ে যায়। অর্থাৎ, সূর্যোদয়ের সময় এরপর নামায পড়া যায় না। ফরযের পূর্বে এ দু'রাকআত পড়া সুন্নত। মসজিদে আসার পর যদি ফরযের তকবীর হয়ে যায়, তবে ফরয নামাযেই শামিল হয়ে যাবে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ “নামাযের তকবীর হয়ে গেলে ফরয ছাড়া কোন নামায পড়া যাবে না।” ফরয নামায শেষ হলে সুন্নত পড়ে নেবে। সূর্যোদয়ের পূর্বে পড়লে তাও আদায় হবে। কেননা, সময়ের মধ্যে সুন্নত ফরযের অনুগামী। তবে জামাআত ফওত না হলে এ সুন্নত ফরযের পূর্বে পড়া সুন্নত।
মোস্তাহাব এই, এ সুন্নত গৃহে সংক্ষেপে পড়ে মসজিদে যাবে এবং দু'রাকআত তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়ে বসে যাবে। ফরয পড়া পর্যন্ত কোন নামায পড়বে না । এর পর সূর্যোদয় পর্যন্ত যিকিরে মশগুল থাকবে।
(২) যোহরের সুন্নত
যোহরের সুন্নত ছয় রাকআত। ফরযের পূর্বে চার রাকআত এবং পরে দু'রাকআত। এ দু'রাকআত সুন্নতে মোআক্কাদা। হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) থেকে রেওয়ায়েত করেন, যেব্যক্তি সূর্য ঢলে পড়ার (যাওয়াল) পর চার রাকআত নামায পড়ে এবং তার কেরাআত, রুকু ও সেজদা ভালরূপে করে, তার সাথে সত্তর হাজার ফেরেশতা নামায পড়ে এবং রাত্রি পর্যন্ত তার জন্যে মাগফেরাতের দোয়া করে।
(৩) আসরের সুন্নত
আসরের পূর্বে চার রাকআত নফল নামায। হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : “আল্লাহ সেই বান্দার প্রতি রহম করুন যে আসরের পূর্বে চার রাকআত পড়ে।” সুতরাং রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর দোয়ায় দাখিল হওয়ার আশা নিয়ে এই চার রাকআত পড়া মোস্তাহাব। তিনি যোহরের দু'রাকআতের অনুরূপ নিয়মিতভাবে আসরের এই চার রাকআত পড়েন নি।
(৪) মাগরিবের সুন্নত-
মাগরিবের ফরযের পর দু'রাকআত সুন্নত। এক্ষেত্রে একটি ভিন্ন রেওয়ায়েত উবাই ইবনে কাব, ওবাদা ইবনে সামেত, আবু যর, যায়দ ইবনে সাবেত প্রমুখ সাহাবী থেকে বর্ণিত আছে যে, মাগরিবের ফরযের পূর্বে আযান ও একামতের মাঝখানে দু'রাকআত দ্রুত পড়ে নেয়া উচিত। কোন কোন সাহাবী বলেনঃ আমরা মাগরিবের পূর্বে দু'রাকআত পড়তাম। ফলে নতুন আগন্তুক মনে করত, আমরা মাগরিব পড়ে নিয়েছি। এটা আসলে এই হাদীসের ব্যাপকতার মধ্যে দাখিল- “প্রত্যেক দু'আযান অর্থাৎ, আযান ও একামতের মধ্যে নামায রয়েছে। যে চায় সে পড়ুক।” হযরত ইমাম আহমদ (রহঃ) এই দু'রাকআত পড়তেন। কিন্তু লোকেরা এজন্যে তাঁর সমালোচনা শুরু করলে তিনি তা পরিত্যাগ করেন।
>নিজস্ব মত--
[(এ থেকে বুঝা যায় মাগরিবের ফরযের পূর্বে কোন নামাজ নেই) পরে দুরাকাত সুন্নত। সুন্নতের পরে দু’রাকাত নফল। হানিফি মাজহাবে ইহাই নিয়ম]
(৫) মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী নফল নামায ও সুন্নতে মোআক্কাদা। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কর্ম দ্বারা এর রাকআত সংখ্যাদ্বয় বর্ণিত আছে। এ নামাযের সওয়াব অনেক। কোন কোন তফসীরবিদ বলেনঃ এ (তাদের পার্শ্ব নিদ্রার স্থান থেকে আলাদা থাকে।) আয়াতে ঐ নামাযই বুঝানো হয়েছে। নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ “যে মাগরিব ও এশার মাঝখানে নামায পড়ে, তার এ নামায আল্লাহর দিকে রুজুকারীদের নামায।” তিনি আরও বলেন : “যেব্যক্তি মাগরিব ও এশার মাঝখানে নিজেকে মসজিদে আবদ্ধ রাখে এবং নামায ও কোরআন পাঠ ছাড়া অন্য কোন আলাপ-আলোচনা না করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্যে জান্নাতে দুটি প্রাসাদ তৈরী করেন, যা পরস্পরের একশ' বছরের দূরত্বে অবস্থিত। তার জন্যে উভয় প্রাসাদের মধ্যস্থলে এত বৃক্ষ রোপণ করেন, দুনিয়ার সকল বাসিন্দা তাতে ঘুরাফেরা করতে চাইলে তাদের জন্যে স্থান সংকুলান হবে।”
[যতটুকু ধারনা লেখক এখানে আওয়াবিনের নামাজ বুঝাতে চেয়েছন, কারণ মাগরিবের ও এশার সুন্নত (‘সংখ্যাদ্বয়’ শব্দ দ্বারা) তিনি পূর্বেই উল্লেখ করেছেন।
(৬) এশার সুন্নত ও নফল-
এশার ফরযের পর চার রাকআত সুন্নত। হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এশার পর চার রাকআত পড়ে শুয়ে পড়তেন। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ নামায একটি সুরক্ষিত কল্যাণ। যার ইচ্ছা কম নিক এবং যার ইচ্ছা বেশী নিক। এ থেকে জানা গেল, প্রত্যেকেই নফল নামায ততটুকু অবলম্বন করবে, যতটুকু তার কল্যাণের প্রতি আগ্রহ থাকে। উপরোক্ত বর্ণনা থেকে একথা প্রকাশ পেয়েছে, নফলসমূহের মধ্যে কতক অধিক মোআক্কাদ (জোরদার) এবং কতক কম মোআক্কাদ। সুতরাং অধিক মোআক্কাদ নফল ছেড়ে দেয়া মোটেই সমীচীন নয়। কেননা, নফল নামায ফরযের জন্যে পরিপূরক হয়ে থাকে। কাজেই নফল বেশী না পড়লে ফরয ত্রুটিযুক্ত ও অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়া বিচিত্র নয়।
[এখানে উল্লেখ করা জরুরী যে হানিফি মাযহাব অনুযায়ী এশার পর দু’রাকাত সুন্নতে মোয়াক্কাদা এবং দু রাকাত নফল পূর্বের সুন্নতের কথা মাগরিবের নামাজের সাথে উল্লেখ হয়েছে]
বেতের ওয়াজিব-
(৭) বেতেরের নামায। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন : রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এশার পরে তিন রাকআত বেতের পড়তেন। প্রথম রাকআতে ‘সুরা আলা’ দ্বিতীয় রাকআতে ‘কাফিরূন’ এবং তৃতীয় রাকআতে ‘সূরা এখলাস’ পাঠ করতেন। এক হাদীসে আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বেতেরের পর দু'রাকআত বসে বসে পড়তেন এবং নিদ্রার পূর্বে দু'রাকআত পড়তেন। প্রথম রাকআতে সূরা যিলযাল এবং দ্বিতীয় রাকআতে তাকাসুর পাঠ করতেন। রাত্রিকালীন নফল নামাযের শেষে বেতের পড়া উত্তম। সুতরাং তাহাজ্জুদের পরে বেতের পড়া ভাল।
[এখানে উল্লখ্য যে, যারা উক্ত সুরা সমুহ না জানেন নিজের যে কোন জানা সুরা পড়তে সমস্যা নেই]
পরবর্তী পর্ব
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন