মহব্বত ও অনুরাগ
📚মুকাশাফাতুল-কুলুব ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)
কথিত আছে, এক বিজন প্রান্তরে একটি কুৎসিত-কদাকার দৃশ্যের উপর জনৈক ব্যক্তির দৃষ্টি পতিত হলে জিজ্ঞাসা করেছিল-'তুমি কে?' উত্তরে সে বলেছিল, 'আমি তোমার অন্যায়, অনাচার ও পাপাচারের দৃশ্য'।
লোকটি বললো-'তোমা হতে মুক্তি পাওয়ার উপায় কি?'
উত্তরে সে জানালো, 'আমার ধ্বংসাত্মকতা ও বীভৎস রূপ হতে মুক্তি পেতে হলে হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার প্রতি দরূদ পাঠ কর।
যেমন হাদীস শরীফে আছে: – "আমার উপর দরূদ পাঠ কর। কেননা, এটা তোমার জন্য পুলসিরাতের অন্ধকারে নূর ও জ্যোতির কাজ দিবে।
জুমা'র দিন যে ব্যক্তি আমার প্রতি আশি বার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ্ তা'আলা তার আশি বৎসরের গুনাহ্ মাফ করে দিবেন।"
জনৈক ব্যক্তি হুযূর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার প্রতি দরূদ পড়ার ব্যাপারে খুবই গাফেল ছিল।
একদা রাসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনাকে সে স্বপ্নে দেখে যে, তিনি নিজ পবিত্র মুখমণ্ডলকে সেই লোকের দিক হতে ফিরিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে রয়েছেন।
সে আরয করলো- 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্! (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আপনি কি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট?'
হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তিনি বললেন- 'না, অসন্তুষ্ট নই।'
লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করলো-'তা'হলে আপনি আমার দিকে ফিরে তাকাচ্ছেন না কেন?'
আল্লাহর রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন,– এর কারণ হচ্ছে এই যে, আমি তোমাকে চিনি না।
লোকটি জিজ্ঞাসা করলোঃ হুযূর! আপনি আমাকে না চিনার কারণ কি? অথচ আমি আপনার একজন উম্মতী, আর এ সম্পর্কে উলামায়ে কেরাম বলেছেন-পিতা তার পুত্রকে যেমন চিনে, আপনি আপনার উম্মতের প্রত্যেককে তার চেয়েও বেশী চিনেন।
হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন : 'উলামায়ে-কেরাম ঠিকই বলেছেন; কিন্তু তুমি আমাকে দরূদ পড়ার মাধ্যমে স্মরণ কর না; উম্মতের প্রত্যেক ব্যক্তিকে আমি আমার প্রতি দরূদ প্রেরণের মাধ্যমে এবং এরই অনুপাতে চিনে থাকি, আমার প্রতি দরূদের পরিমাণ যার যত বেশী, তার সাথে আমার পরিচয় তত বেশী।'
অতঃপর সেই ব্যক্তি ঘুম থেকে জাগ্রত হয়। স্বপ্নযোগে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার পবিত্র মুখে উক্তরূপ বিবরণ শোনার পর সে দৈনিক একশত বার দরূদ পড়ার দৃঢ় সংকল্প করে। এভাবে সে প্রত্যহ নিজ দায়িত্ব সম্পন্ন করে চলেছে।
এরপর আরেক বার স্বপ্নের মাধ্যমে তার আল্লাহর রাসূলের যিয়ারত নসীব হলো, তখন হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাকে সম্বোধন করে বললেন: "আমি তোমাকে চিনি এবং কিয়ামতের ময়দানে আমি তোমার জন্য সুপারিশ করবো"।
প্রিয় সাধক! উপরোক্ত ঘটনায় হুযুরের কাছে পরিচিত হওয়ার এবং সুপারিশ পাওয়ার মহান নে'আমত লাভের পিছনে যে কারণটি রয়েছে, তা' হলো, সে আল্লাহর রাসূলের প্রতি আসক্ত হয়েছে এবং তাঁর মহব্বত ও ভালবাসা তার অন্তরে স্থান করে নিয়েছে।
"হে নবী! আপনি বলে দিন-তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবেসে থাক, তা'হলে আমাকে অনুসরণ কর"। পবিত্র কুরআনের এ আয়াতখানির 'শানে নুযূল' বা অবতরণের পটভূমিও ছিল তাই;
একদা সাহাবী হযরত কা'ব ইবনে আশরাফ (র.) তাঁর সঙ্গীদেরকে ইসলামে দীক্ষা গ্রহণের জন্য আহ্বান জানালে পর তারা বলেছিল: 'আমরা তো আল্লাহর পুত্রতুল্য; আমাদেরকে তিনি অত্যন্ত ভালবাসেন।' তাদের এ উক্তির জওয়াবেই কুরআনের এ আয়াতখানি নাযিল হয়। এতে আল্লাহ্ তা'আলা হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে হুকুম করেছেন : "বলুন (হে নবী!), তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস, তা'হলে আমাকে অনুসরণ কর।' (আলে-ইমরান: ৩১)
অর্থাৎ,-আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে যে দ্বীন বা জীবন- বিধান নিয়ে এসেছি, আমার অনুসরণ করে তোমাদের বাস্তব জীবনে তা' রূপায়িত কর। এভাবে যদি তোমরা আমার অনুগত হও, তা' হলে তোমরা যে পুরস্কারে ধন্য হবে তা' হচ্ছে,– (কুরআনের ভাষায়) "আল্লাহ্ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। অবশ্যই তিনি পরম দয়ালু ও করণাময়"। (আলে-ইমরান: ৩১)
সত্যিকার মু'মিন ও খোদাভক্তদের আল্লাহ্ তা'আলাকে মহব্বত করার অর্থ হচ্ছে-তাঁরা আল্লাহ্ তা'আলার প্রতিটি আদেশ-নিষেধ পালন করেন, একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার আনুগত্যকে সকল গায়রুল্লাহ'র উপর প্রাধান্য দেন, তাঁর সন্তুষ্টি লাভের জন্য আত্মোৎসর্গ করেন। অনুরূপ, 'সত্যিকার মু'মিন ও খোদাভক্তদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা মহব্বত করেন' এর অর্থ হচ্ছে-'আল্লাহ্ তা'আলা তাদের প্রশংসা করেন, গুণাবলী বর্ণনা করেন, তাদের উত্তম পুরস্কার দান করেন, গুণাহ্ মাফ করেন। দয়া ও অনুগ্রহ করেন, পাপকার্যে লিপ্ত হওয়া থেকে হিফাযত করেন, নেক আমল ও ইবাদতের তাওফীক দান করেন।'
চারটি বিষয় এমন রয়েছে, যেগুলো দাবী করতে হলে অপর চারটি বিষয়ে অভ্যস্থ হতে হবে। অন্যথায় এ দাবীদার মিথ্যুক বলে বিবেচিত হবে:
এক. যে ব্যক্তি বেহেশকে ভালবাসার দাবী করে এবং বেহেশতে প্রবেশের তীব্র অনুরাগ প্রদর্শন করে; অথচ নেক আমল ও ইবাদতে মগ্ন হয় না, সে মিথ্যুক।
দুই যে ব্যক্তি হুযুর সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম উনার প্রতি মহব্বতের দাবী করে; অথচ দ্বীনের খাদেম উলামা ও বুযুর্গানে-দ্বীনকে মহব্বত করে না, সে মিথ্যুক।
তিন, যে ব্যক্তি দোযখাগ্নিকে ভয় করার দাবী করে; অথচ পাপকার্য পরিত্যাগ করে না, সে মিথ্যুক।
চার. যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা'আলার প্রতি মহব্বত ও ভালবাসার দাবী করে; অথচ বালা-মুসীবত ও আপদ-বিপদের পরীক্ষায় অধৈর্য হয়ে শেকায়াত ও অভিযোগ ব্যক্ত করে, সে মিথ্যুক।
হযরত রাবেয়া বসরি (রহঃ) বলেছেন : "মুখে আল্লাহকে মহব্বত করার দাবী কর; অথচ কার্যতঃ তাঁর না-ফরমানীতে লিপ্ত রয়েছো- এটা নিঃসন্দেহে যুক্তিহীন ও অপাংক্তেয় দাবী। বস্তুতঃই যদি তোমার দাবী সত্য হতো, তা' হলে অবশ্যই তুমি তাঁর অনুগত হয়ে চলতে। কেননা, একথা স্বতঃসিদ্ধ যে, সত্যিকারের প্রেমিক প্রেমাস্পদের অনুগত হয়ে থাকে।"
মোটকথা, মহব্বতের চিহ্নই হচ্ছে, মাহবুব বা প্রেমাস্পদের অনুগত হওয়া, তার অনুকরণ ও অনুসরণ করা এবং সর্ববিধ অবাধ্যতা ও অমান্যতা থেকে পরহেয করা।
একদা হযরত শিবলী (রহঃ)-এর নিকট একদল লোক এসে হাজির হলে তিনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তোমরা কারা? উত্তরে তারা বলেছিল : 'আমরা আপনার ভক্ত; আপনাকে আমরা ভালবাসি, মহব্বত করি।' একথা শুনে হযরত শিবলী তাদেরকে লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়তে লাগলেন। পাথরের আঘাত সহ্য করতে না পেরে তারা দৌড়ে পালাতে লাগলো। তখন হযরত শিবলী তাদেরকে প্রশ্ন করলেন: 'কিহে! পালাচ্ছ কেন? প্রকৃতই যদি তোমরা আমাকে ভালবাসতে, তা' হলে আমার পরীক্ষায় তোমরা ধৈর্যধারণ না করে পলায়ন করছো কেন?' অতঃপর হযরত শিবলী (রহঃ) উক্তি করলেন : 'আল্লাহর মহব্বত ও ভালবাসায় যারা মত্ত, তারা খোদায়ী ইশকের শরাব পান করে নিয়েছে; ফলে, তাদের জন্য এ জগত ও মনুষ্য আবাস সংকীর্ণ হয়ে গেছে। তারা আল্লাহর যথার্থ পরিচয় লাভ করেছে; তাই আল্লাহর মহিমা ও পরাক্রমে তারা উন্মত্ত-নিবেদিত। তারা আল্লাহর পেয়ার-আশনাইর অমৃত-সুধায় নেশাবিভোর; তাই আল্লাহর প্রেম সাগরে তারা নিমজ্জিত হয়েছে, তার সান্নিধ্যে মুনাজাত ও প্রেম নিবেদনের আস্বাদে আত্মহারা হয়েছে।' অতঃপর হযরত শিবলী (রহঃ) এ পংক্তিটি আবৃত্তি করলেন : "হে মাওলা! ইশ্ক ও মহব্বতের স্মরণই আমাকে বেহুঁশ করে দিয়েছে। আর প্রকৃত প্রেমিক স্বভাবতঃই বেহুঁশ হয়ে থাকে।'
কথিত আছে, উট যখন মাতাল হয়ে যায়, চল্লিশ দিন পর্যন্ত দানা- পানি গ্রহণ করে না; অথচ পূর্বের তুলনায় কয়েকগুণ অধিক বোঝাও সে বহন করে। এর কারণ হচ্ছে, প্রেমাস্পদের স্মরণ তখন তার অন্তরে উত্তাল তরঙ্গের ঢেউ খেলতে থাকে, প্রিয়তমের অনুরঞ্জনে মাতোয়ারা-আত্মহারা হয়ে খাদ্য গ্রহণে বিস্মৃত হয়ে যায়, অধিকতর বোঝা বহনেও অস্বস্তি অনুভব করে না।
ওহে সাধক! নিজের ব্যাপারে চিন্তা কর-আল্লাহর জন্য তুমি কি কখনও হারাম ও নিষিদ্ধ বিষয়াবলী পরিহার করেছো? কখনও কি পানাহার ত্যাগ করেছো? একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের লক্ষ্যে কোন কঠিন সাধনায় কি ব্রতী হয়েছো বা ভারী বোঝা বহন করেছো? যদি এগুলোর কোনটাই তুমি করে না থাক, তা' হলে তোমার সকল উক্তি, সকল দাবী অসার ও অর্থহীন। এহেন দাবী না দুনিয়াতে কোন কাজে আসবে, না আখেরাতে কোন উপকারে আসবে; এতদ্বারা তুমি না দুনিয়ার মাখলুকের নিকট সম্মানের পাত্র হবে, না সৃষ্টিকর্তার নিকট পুরস্কারের যোগ্য বিবেচিত হবে।
হযরত আলী রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন: 'বেহেশতের প্রতি অনুরাগী ব্যক্তির লক্ষণ হচ্ছে,- নেক আমল ও ইবাদতের প্রতি দ্রুত ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে
সে ধাধিত হবে।
আর যে ব্যক্তির অন্তরে দোযখের ভীতি রয়েছে সর্বদা সে নফস ও কু-প্রবৃত্তির বিরোধিতা করবে। অনুরূপ মৃত্যুর প্রতি যে দৃঢ় বিশ্বাসী, সে কখনও পার্থিব মায়া-মোহ ও আস্বাদ-আকর্ষণে মত্ত হবে না।'
হযরত ইব্রাহীম খাওয়াস (রহঃ)-কে মহব্বতের তাৎপর্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন: 'আল্লাহর মহব্বত যার অন্তরে আছে, তার নিজস্ব এরাদা-ইচ্ছা বলতে কিছুই থাকে না। সমুদয় বৃত্তি ও মনোস্কামনা ইক্কের আগুনে দন্ধিভূত হয়ে যায়, স্বীয় সত্তাকে সে আল্লাহর মহিমা ও পরাক্রমের অতল ও অকূল সাগরে নিমজ্জিত করে দেয়।'
পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন