হজ্জের উপদেশ —
হজ্জ-যাত্রা এক হিসেবে পরলোক যাত্রার সমতুল্য। কারণ, হজ্জ-যাত্রা কা'বা শরীফের উদ্দেশ্যে হয় এবং পরলোক যাত্রা কা'বা শরীফের অধিপতির উদ্দেশ্যে হইয়া থাকে। অতএব, হজ্জ যাত্রার প্রত্যেক ঘটনায় পরলোকে যাত্রার অবস্থা স্মরণ করা উচিত। এই যাত্রাকালে পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধবেরনিকট হইতে বিদায় গ্রহণ মৃত্যুকালে তাহাদের নিকট হইতে বিদায় গ্রহণের সমতুল্য। হজ্জ-যাত্রার পূর্বে মানুষ যেমন পার্থিব সকল বাধ্যবাধকতা হইতে মুক্ত হইয়া রওয়ানা হয় তদ্রূপ শেষ বয়সে পরকাল-যাত্রার পূর্বে দুনিয়ার সকল চিন্তা হইতেও তাহার মনকে মুক্ত করা আবশ্যক। অন্যথায় পরকাল-যাত্রা নিতান্ত যন্ত্রণাদায়ক হইবে। হজ্জে যাওয়ার সময় যেরূপ যথেষ্ট পরিমাণে পাথেয় সংগ্রহ করিয়া লইতে হয় এবং যাহাতে উহা বিনষ্ট ও লুণ্ঠিত হইয়া নির্জন মরুপ্রান্তরে সম্বলহীন হইয়া পড়িতে নাহয় তজ্জন্য অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হয়, তদ্রূপ পরকালে ভয়ঙ্কর বিপদ সমাকীর্ণ হাশরের মাঠ অতিক্রম করার জন্য দুনিয়া হইতে পরলোকে মঙ্গলজনক সওয়াবও প্রচুর পরিমাণে সঙ্গে লওয়াএকান্ত আবশ্যক এবং সে সওয়াবকে অত্যন্ত সতর্কতার সহিত পাহারা দেওয়া উচিত। হজ্জে যাত্রাকালে হাজীগণ যাহা সহজে বিনষ্ট হয় এমন দ্রব্য সঙ্গে লয় না। কারণ, তাহারা জানে যে, উহা অস্থায়ী হওয়ার দরুন পাথেয়ের উপযোগী নহে। এইরূপ যে ইবাদত লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে করা হইয়াছে এবং যে ইবাদত ত্রুটিপূর্ণ, উহাও পরলোক-যাত্রার সম্বল হইতে পারে না। হজ্জ-যাত্রাকালে যানবাহনে আরোহণপূর্বক পরকালের পথে জানাযায় আরোহণের কথা স্মরণ করিবে। কারণ, ইহা অবশ্যই জানা আছে যে, হজ্জের-পথে বাহনের ন্যায় কবরে যাইবার পথেও বাহন পাওয়া যাইবে। আর ইহাও অসম্ভব নহে যে, হজ্জের সওয়ারী হইতে অবতরেণর সময় মিলিবে না; বরং তখনই জানাযার আরোহণের সময় আসিয়া পড়িবে। হজ্জের সফর এরূপ হওয়া আবশ্যক যাহাতে উহা পরকালের সফরের পাথেয় হওয়ার উপযোগী হয়। ইহরাম বাঁধিবার উদ্দেশ্যে সাধারণ প্রচলিত পোশাক পরিত্যাগ পূর্বক ইহরামের সাদা ও সেলাইবিহীন দুইটি চাদর পরিধান করিবার সময় পরলোক-গমনের পথে কাফনের কাপড়ের কথাস্মরণ করিবে। কারণ, কাফনের কাপড়ও সাধারণ প্রচলিত পোশাক হইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র হইবে। পাহাড়ও অরণ্যের বিপদাপদের সম্মুখীন হইলে কবরের মনকার-নাকীর ফেরেশতা ও সাপ-বিচ্ছুর কথা স্মরণ করিবে। কবর হইতে হাশরের ময়দান পর্যন্ত বিপদাপদ পরিপূর্ণ অতি বৃহৎ অরণ্য বিদ্যমান রহিয়াছে।পথপ্রদর্শনের সহায়তা ব্যতীত যেমন গভীর অরণ্যে বিপদ হইতে অব্যাহতি পাওয়া যায় না, ইবাদত ব্যতীত তদ্রূপ কবরের বিভীষিকা হইতে রক্ষা পাওয়ার অন্য কোন উপায় নাই। হজ্জের পথে অরণ্য দিয়া যাইবার সময় যেমন পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ত্যাগ করত একাকী চলিতে হয়, কবরেও তদ্রূপ একাকী যাইতে হয়। 'লাব্বায়েক' বলিবার সময় মনে করিবে, ইহা আল্লাহ্ আহ্বানের উত্তর মাত্র।কিয়ামত দিবসে আল্লাহ্ আহ্বান শুনা যাইবে। সেই আহ্বানের ভয়ের কথা স্মরণ করিবে এবং ইহার আশঙ্কায় নিমজ্জিত থাকিবে।
ইহরামের সময় হযরত আলী ইবনে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর চেহারা পাণ্ডুবর্ণ ধারণ করিত, সমস্ত শরীর ভয়ে কম্পিত হইত এবং 'লাব্বায়েক' উচ্চারণ করিতে পারিতেন না। লোকে জিজ্ঞাসা করিল- "আপনি 'লাব্বায়েক' বলেন না কেন?” তিনি বলিলেন- “লাব্বায়েক বলিলে 'লা লাব্বায়েক' (অর্থাৎতুমি মনে প্রাণে আমার দরবারে উপস্থিত হও নাই) উত্তর আসে কিনা, আমার এই ভয়।” এই বলিয়াই তিনি বেহুঁশ হইয়া উটের পৃষ্ঠ হইতে পড়িয়া গেলেন।
হযরত আবূ সুলাইমান দারানী (রহ.)-এর মুরীদ হযরত আহমদ ইবনুল হওয়ারী (রহ.) বলেন যে, "তাঁহার পীর ইহরাম বাঁধিয়া “লাব্বায়েক” বলিতে পারেন না। এমতাবস্থায় এক মাইল পর্যন্ত অগ্রসর হইয়া বেহুঁশ হইয়া পড়িলেন। তৎপর চেতনা লাভ করিয়া তিনি বলিলেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা হযরত মূসা আলায়হিস সালামের উপর ওহী নাযিল করিয়াছিলেন: "তোমার অত্যাচারী উম্মতদিগকে আমাকে স্মরণ করিতে ও আমার নাম লইতে নিষেধ কর। কারণ, যে ব্যক্তি আমাকে স্মরণ করে, আমি তাহাকে স্মরণ করি। কিন্তু স্মরণকারী অত্যাচারী হইলে আমি তাহাকে অভিশাপের সহিত স্মরণকরিয়া থাকি।" তৎপর তিনি আরও বলেন- "আমি শুনিয়াছি, যে ব্যক্তি সন্দেহজনক মাল হইতে হজ্জের পাথেয় সংগ্রহ করে, সে যদি 'লাব্বায়েক' বলে, ইহার উত্তরে তাহাকে বলা হয়-"তোমার হস্তস্থিত পাথেয় যে পর্যন্ত ইহার হকদারকে ফিরাইয়া না দিবে সে পর্যন্ত তোমার 'লাব্বায়েক' আমি কবূল করিবনা।
কিন্তু কা'বা শরীফের তওয়াফ ও সাফা-মারওয়ার মধ্যস্থলে দৌড়ার দৃষ্টান্ত এইরূপ- যেমন, কোন দীনহীন অসহায় ব্যক্তি শাহী দরবারে উপস্থিত হইয়া স্বয়ং বাদশাহের নিকট স্বীয় দুঃখের কথা নিবেদন করিবার সুযোগ অন্বেষণ করিতে থাকে এবং রাজপ্রাসাদের চারিদিকে ঘুরিয়া বেড়ায়। মধ্যে মধ্যে দরবারে যাতায়াত করে এবং সুপারিশ করিবার লোক খুঁজিতে থাকে। আর ততসঙ্গে বাদশাহের অনুগ্রহ দৃষ্টিতাহার প্রতি আকর্ষণের এবং বাদশাহকে স্বচক্ষে দর্শনের আশাও হৃদয়ে পোষণ করিতে থাকে। ঠিকতদ্রূপ হাজীগণ কা'বা শরীফের চারিদিকে ঘুরিয়া বেড়ায় এবং সাফা-মারওয়ার মধ্যস্থলে আল্লাহ্ দর্শনের আশায় দৌড়াদৌড়ি করে; তৎপর আরাফার দরবার ভূমিকে স্বীয় দুঃখ নিবেদনের জন্য সর্বসঙ্গে উপস্থিত হয়। আরাফার ময়দানের জগতের সকল দেশ হইতে বিভিন্ন ভাষাভাষী লোক যখন সমবেত হইয়া নিজ নিজ ভাষায় প্রার্থনা করিতে থাকে তখনকার দৃশ্যটি কিয়ামত দিবস হাশরের ময়দানে সমস্ত জগতের লোক সমবেত হওয়ার অনুরূপ। প্রত্যেকেই নিজের চিন্তায় অস্থির থাকিবে, প্রত্যেকেই অনুগ্রহের আশা এবং নিগ্রহের ভয়ে অধীর প্রতীক্ষায় দণ্ডায়মান থাকিবে।
কঙ্কর নিক্ষেপের উদ্দেশ্য হইল একদিকে ইবাদতরূপে প্রকৃত বন্দেগী প্রকাশ এবং অপরদিকে এই কার্য হযরত ইবরাহীম আলায়হিস সালামের কার্যের সহিত সামঞ্জস্য রাখে। উক্ত স্থানে শয়তান আসিয়া হযরত ইবরাহীম আলায়হিস সালামের অন্তরে সন্দেহ জন্মাইবার চেষ্টা করিয়াছিল। এইজন্যই তিনি শয়তানের উপর কঙ্কর নিক্ষেপ করিয়াছিলেন। তোমার মনে যদি এই ধারণা উদ্রেক হয় যে, হযরত ইবরাহীম আলায়হিস সালাম স্বচক্ষে শয়তানকে দেখিতে পাইয়াছিলেন, আমি তো দেখিতে পাইতেছিনা; এমতাবস্থায় অনর্থক প্রস্তর নিক্ষেপ করিব কেন? এইরূপ ধারণা তোমার হৃদয়ে উদিত হইলে মনে করিবে, শয়তান প্ররোচনা দ্বারা তোমার অনিষ্ট করিবার চেষ্টা করিতেছে। বিনা দ্বিধায় প্রস্তর নিক্ষেপকরত তুমি শয়তানের পাঁজর ভাঙ্গিয়া দাও। প্রস্তর নিক্ষেপ অবশ্যই শয়তানের পাঁজর ভাঙ্গিয়া যায়।আর তুমি নিজকে আল্লাহর প্রকৃত আজ্ঞাবহ দাস বলিয়া প্রমাণ কর, তাঁহার উপর উৎসর্গ করিয়া দাও।আর বিশ্বাস কর, "প্রস্তরাঘাতে আমি শয়তানকে শাস্তি দিলাম এবং পরাজিত করিলাম।"
হজ্জ হইতে প্রাপ্ত উপদেশাবলীর এত বিস্তৃত বিবরণ প্রদানের উদ্দেশ্য এই- ইহা যদি কোন ব্যক্তি সামান্য জ্ঞানও জন্মে তবে তাহার বুদ্ধিমত্তা, অনুরাগ ও চেষ্টা অনুযায়ী উহার গূঢ় রহস্য তাহার নিকট উদ্ভাসিত হইয়া উঠিবে এবং প্রতিটি কার্য হইতে সে নির্ধারিত ফল লাভ করিতে সক্ষম হইবে। ইহাই ইবদতের প্রাণ। আর এই অর্থ বুঝিতে পারিলে প্রত্যেক কার্যের বাহ্য আকৃতি হইতে ইহার আধ্যাত্মিক গূঢ় মর্মের দিকে সে অধিকতর অগ্রসর হইতে পারিবে।
প্রথম পর্ব—

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন