মঙ্গলবার, ১৭ জুন, ২০২৫

বিবাহ (২৬) পারস্পরিক জীবন যাপনের পঞ্চম আদব সন্দেহ না করা



বিবাহ (পর্ব – ২৬) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

পারস্পরিক জীবন যাপনের পঞ্চম আদব সন্দেহ না করা —
পঞ্চম আদব, স্ত্রীদের প্রতি কুধারণায় তাদের গোপন বিষয়ের অনুসন্ধানে বাড়াবাড়ি করবে না। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) স্ত্রীদের গোপন বিষয়সমূহের পেছনে পড়তে বারণ করেছেন। কোন কোন রেওয়ায়েত অনুযায়ী তিনি স্ত্রীদের সামনে হঠাৎ উপস্থিত হতে বারণ করেছেন। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এক সফর থেকে প্রত্যাবর্তন করে মদীনায় প্রবেশের পূর্বে বললেন: রাতের বেলায় স্ত্রীদের কাছে যাবেনা। এই আদেশ উপেক্ষা করে দুই ব্যক্তি বাড়ি গিয়ে অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি দেখতে পেল। 
প্রসিদ্ধ এক হাদীসে আছে, - নারী পাঁজরের অস্থির ন্যায় বাঁকা। একে সোজা করতে চাইলে ভেঙ্গে যাবে। অতএব বাঁকা অবস্থায়ই এর দ্বারা উপকৃত হও। নারী চরিত্র সংশোধনের উদ্দেশ‍্যে এ কথাটি বলা হয়েছে। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলছেন, - কোন কোন আত্মসম্মানবোধ আল্লাহ তা'আলা অপছন্দ করেন। তাহল স্ত্রীর উপর পুরুষের আত্মসম্মানবোধ, যা কোন সন্দেহ ছাড়াই হয়। কেননা, এরূপ আত্মসম্মানবোধের উৎস হচ্ছে কুধারণা, যা করা নিষিদ্ধ! আত্মসম্মানবোধ যথাস্থানে প্রশংসনীয়। মানুষের মধ্যে তা অবশ্যই থাকা উচিত। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: আল্লাহর আত্মসম্মানবোধ রয়েছে। মুমিনের আত্মসম্মানবোধ রয়েছে। মানুষের উপর আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা আল্লাহর আত্মসম্মানবোধ। তিনি আরও বলেন: সা'দের আত্মসম্মান দিয়ে তোমরা কি কর? আল্লাহর কসম, আমি সা'দের তুলনায় অধিক আত্মসম্মানের অধিকারী। আল্লাহ তাআলা আমার চেয়ে অধিক আত্মসম্মান রাখেন। এই আত্মসম্মানের কারণেই তিনি বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ পাপাচার হারাম করেছেন। আল্লাহ তাআলার তুলনায় অন্য কারও আপত্তি করা অধিক পছন্দনীয় নয়। এ কারণেই তিনি সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা রসূল প্রেরণ করেছেন। তারীফও তাঁর চেয়ে অধিক অন্য কেউ পছন্দ করে না। এ কারণেই তিনি জান্নাতের ওয়াদা দিয়েছেন। 
এক হাদীসে বলা হয়েছে, আমি মেরাজ রজনীতে জান্নাতের ভেতরে একটি প্রাসাদ দেখেছি। তার আঙ্গিনায় একটি বাঁদী ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই প্রাসাদ কার। কেউ জওয়াব দিল: ওমরের। আমি তার অভ্যন্তরভাগ দেখতে চাইলাম, কিন্তু হে ওমর, তোমার আত্মসম্মানবোধের কথা মনে পড়ে গেল। হযরত ওমর কেঁদে ফেললেন এবং বললেন: আমি কি আপনাকে আত্মসম্মানবোধ দেখাব? 
হযরত হাসান বসরী বলতেনঃ কাফেরদের গা ঘেঁষে চলার জন্যে তোমরা স্ত্রীদেরকে বাজারে পাঠিয়ে দাও! যার আত্মসম্মানবোধ নেই, সে ধ্বংস হোক।আত্মসম্মানবোধের প্রয়োজন তখন হয় না. যখন স্ত্রীর কাছে বেগানা পুরুষ আসে না এবং স্ত্রী বাজারে বের হয় না।
 রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) একবার হযরত ফাতেমা (র.)-কে জিজ্ঞেস করলেন: নারীর জন্যে উত্তম কি, তিনি বললেন: উত্তম, সে বেগানা পুরুষকে দেখবে না এবং কোন বেগানা পুরুষও তাকে দেখবে না। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন: এমন জওয়াব দেবে না কেন, কেমন বাপের মেয়ে! 
সাহাবায়ে কেরাম প্রাচীরের ছিদ্র বন্ধ করে দিতেন, যাতে মহিলারা পুরুষদেরকে না দেখে। হযরত মুয়ায (র.) তাঁর স্ত্রীকে আলো আসার ছিদ্র দিয়ে বাইরে তাকাতে দেখে শাস্তি দিয়েছেন। হযরত ওমর (র.) বলতেন: স্ত্রীদেরকে উৎকৃষ্ট পোশাক দিয়ো না, তা হলে গৃহ মধ্যে থাকবে। কারণ এই, মহিলারা ছন্নছাড়া অবস্থায় বাইরে যাওয়া পছন্দ করে না। 
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: মহিলার গৃহ মধ্যে থাকার অভ্যাস গড়ে তুলুক। তিনি শুরুতে মহিলাদেরকে মসজিদে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। বর্তমানে বৃদ্ধাদের ছাড়া অন্যদের জন্যে মসজিদে যাওয়ার অনুমতি না থাকা উত্তম। বরং এটা সাহাবায়ে কেরামের আমলেও সঙ্গত ছিল না। তাই হযরত আয়েশা (র.) বলেন: রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওফাতের পর মহিলারা যেসব বিষয় উদ্ভাবন করেছে, তা যদি তিনি জানতেন তবে তাদেরকে বাইরে যেতে অবশ্যই নিষেধ করতেন। 
একবার হযরত ইবনে ওমর এ হাদীসটি বর্ণনা করেন, "মহিলাদেরকে মসজিদে যেতে বারণ করো না।"  তখন তাঁর পুত্র বলে উঠল: আল্লাহর কসম, আমরা বারণ করব। হযরত ইবনে ওমর (র.) তৎক্ষণাৎ পুত্রকে প্রহার করলেন এবং ক্রুদ্ধ স্বরে বললেন: আমি বলি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এমন বলেন। আর তুই কিনা তা অমান্য করছিস। এর অর্থ কি, তাঁর পুত্রের এই বিরোধিতার কারণ ছিল, পরিবর্তিত অবস্থা তাঁর জানা ছিল। ইবনে ওমরের ক্রুদ্ধ হওয়ার কারণ, বাহ্যতঃ কোন কারণ বর্ণনা না করেই পুত্র হাদীসের বিপরীত উক্তি করেছিল। অনুরূপভাবে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মহিলাদেরকে বিশেষভাবে ঈদের নামাযে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন, তাও স্বামীদের অনুমতি দেয়ার শর্ত সাপেক্ষে। বর্তমান যুগেও সতী-সাধ্বী নারীদের স্বামীর অনুমতিক্রমে বাইরে যাওয়া জায়েয, কিন্তু না যাওয়াতেই সাবধানতা বেশী।
নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া মহিলাদের বাইরে যাওয়া উচিত নয়। তামাশা ও অনাবশ্যক কাজের জন্যে মহিলাদের বাইরে যাওয়া সাধারণ ভদ্রতারও পরিপন্থী। এতে মাঝে মাঝে অনর্থও সৃষ্টি হয়। 
এর পর বাইরে গেলে পুরুষদের দিক থেকে দৃষ্টি নত রাখবে। আমরা বলি না, নারীর মুখমণ্ডলও নারীর জন্যে গোপনীয়, বরং ফেতনার অবস্থায় পুরুষের মুখমণ্ডল দেখা হারাম। ফেতনার ভয় না থাকলে হারাম নয়। কেননা, পূর্ববর্তী যুগে পুরষরা সর্বদাই খোলামেলা চলাফেরা করেছে এবং মহিলারা অবগুণ্ঠন সাজিয়ে বের হয়েছে। পুরুষদের মুখমণ্ডল মহিলাদের জন্যে গোপনীয় হলে পুরুষদেরকেও অবগুন্ঠন ব্যবহার করার নির্দেশ দেয়া হত।

পরবর্তী পর্ব —
পারস্পরিক জীবন যাপনের ষষ্ঠ আদব আর্থিক 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...