রবিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৩

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (১৮) শব্দ পরিবর্তিত এলেম



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ১৮)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শব্দ পরিবর্তিত এলেম
প্রকাশ থাকে যে, মন্দ এলেম শরীয়তগত এলেমের সাথে মিশে যাওয়ার কারণ হচ্ছে, মানুষ উৎকৃষ্ট নামসমূহ তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যে ভিন্ন অর্থে পরিবর্তিত করে দিয়েছে। পূর্ববর্তী মনীষীগণ এসব নাম যে উদ্দেশে ব্যবহার করতেন, মানুষ সেসব নাম বিকৃত করে অন্য উদ্দেশে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। এরূপ শব্দ পাঁচটি— ফেকাহ্, এলেম, তওহীদ, তাকীর ও হেকমত। এগুলো উৎকৃষ্ট শব্দ। এগুলো দ্বারা বিশেষিত ব্যক্তিবর্গ দ্বীনের স্তম্ভ হতেন। কিন্তু এখন এগুলো মন্দ অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। এজন্যই এখন এগুলো দ্বারা বিশেষিত ব্যক্তিবর্গের নিন্দা করা হলে তা আশ্চর্য ঠেকে। কেননা, প্রথমে এগুলো দ্বারা উত্তম ব্যক্তিবর্গ বিশেষিত হতেন।

প্রথম শব্দ ফেকাহকে আজকাল বিশেষ অর্থে ব্যবহার করা হচ্ছে- পরিবর্তন করা হয়নি। অর্থাৎ, ফেকাহ্ হচ্ছে আশ্চর্য ধরনের শাখাগত বিষয় ও তার সূক্ষ্ম কারণাদি জানা, এ সম্পর্কে আলোচনা করা এবং এ সম্পর্কিত উক্তিসমূহ মুখস্থ করা। যেব্যক্তি এ সম্পর্কে খুব চিন্তা-ভাবনা করে এবং অধিক মশগুল থাকে, তাকে বড় ফেকাহবিদ বলা হয় । অথচ পূর্ববর্তী যুগে ফেকাহ্ শব্দের এ অর্থ ছিল না; বরং তখন অর্থ ছিল আখেরাতের পথ এবং নফসের সূক্ষ্ম বিপদাপদ ও অনিষ্টকর আমলসমূহ জানা, ঘৃণিত দুনিয়া সম্পর্কে উত্তমরূপে অবহিত হওয়া, আখেরাতের আনন্দ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়া এবং অন্তরে ভয়-ভীতি আচ্ছন্ন থাকা। এর প্রমাণ হচ্ছে–
আল্লাহ্ তা’আলার এই উক্তি-
>“যাতে দ্বীন সম্পর্কে বোধশক্তি অর্জন করে এবং নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে এসে তাদেরকে সতর্ক করে।”
অতএব, যে ফেকাহ্ দ্বারা মানুষকে সতর্ক করা হয়, সেটিই আমাদের বর্ণিত ফেকাহ্। তালাক, গোলাম মুক্ত করার মাসআলা এবং লেয়ান, সলম ও ইজারার শাখাগত বিষয়াদি নয়। কারণ, এগুলো দ্বারা মোটেই সতর্ক করা হয় না। বরং কেউ সদা সর্বদা এসব বিষয়ে মশগুল থাকলে তার অন্তর কঠোর হয়ে যায় এবং মন থেকে ভয় দূর হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
>“তারা তাদের অন্তর দ্বারা হৃদয়ঙ্গম করে না।”
অর্থাৎ তারা ঈমানের কথাবার্তা হৃদয়ঙ্গম করে না। ফতোয়া হৃদয়ঙ্গম না করা উদ্দেশ্য নয়। মনে হয় ফেকাহ্ ও ফাহম সমার্থবোধক দু'টি শব্দ। পূর্বে ও বর্তমানে এগুলো সে অর্থে ব্যবহৃত হত, যা আমরা লিখেছি। আল্লাহ তাআলা বলেন :
>“নিশ্চয় তাদের অন্তরে আল্লাহর চেয়ে তোমাদের ভয় বেশী। এটা এজন্যে যে, তারা বুঝে না।”
এ আয়াতে কাফেররা যে আল্লাহকে কম ভয় করে এবং মানুষকে বেশী ভয় করে সে বিষয়কেই ফেকার অভাব বলে অভিহিত করা হয়েছে। এখন চিন্তা কর, এটা শাখাগত ফতোয়া মনে না রাখার ফল, না আমরা যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছি, সেগুলো না থাকার ফল? রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার কাছে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গকে বলেছিলেন : তোমরা বিজ্ঞ, দার্শনিক ও ফকীহ্। অথচ তারা শাখাগত ফতোয়া অবগত ছিল না।
মা'দ ইবনে ইবরাহীম যুহরী (রহঃ)-কে কেউ প্রশ্ন করল : মদীনা মুনাওয়ারার বাসিন্দাদের মধ্যে অধিক ফকীহ্ কে? তিনি বললেন : যে আল্লাহ তাআলাকে অধিক ভয় করে। তিনি যেন ফেকাহর ফলাফল বলে দিয়েছেন। খোদাভীতি বাতেনী এলেমের ফল- ফতোয়া ও মামলা-মোকদ্দমার ফল নয়।

রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : পূর্ণ ফকীহ কে, আমি কি তোমাদেরকে তা বলব না?
লোকেরা আরজ করল : জি হাঁ বলুন। তিনি বললেন :
>"পূর্ণ ফকীহ সে ব্যক্তি, যে মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করে না, তাঁর আযাব থেকে নির্ভীক করে না এবং অন্য কিছুর আশায় কোরআন বর্জন করে না।"

একবার আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করলেন :
>“যারা ভোর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত আল্লাহর যিকির করে, তাদের সাথে বসা আমার কাছে চারটি গোলাম আযাদ করার চেয়ে অধিক পছন্দনীয়।”
অতঃপর হযরত আনাস (রাঃ) ইয়াযীদ রাকাশী ও যিয়াদ নিমেরীকে সম্বোধন করে বললেন : “পূর্বে যিকিরের মজলিস তোমাদের এসব মজলিসের মত ছিল না। তোমাদের একজন কিসসা বলে, ওয়াজ করে, মানুষের সামনে খোতবা পাঠ করে এবং একের পর এক হাদীস বর্ণনা করে। আর আমরা বসে ঈমানের আলোচনা করতাম, কোরআন বুঝতাম, দ্বীনের ব্যাপারে জ্ঞান অর্জন করতাম এবং আমাদের প্রতি আল্লাহর নেয়ামত বর্ণনা করতাম।” এ রেওয়ায়েতে হযরত আনাস (রাঃ) কোরআন বুঝা ও নেয়ামত বর্ণনাকে 'তাফাক্কুহ্' তথা দ্বীনের জ্ঞান বলেছেন !
এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে— মানুষ পূর্ণ ফকীহ হয় না যে পর্যন্ত আল্লাহর ব্যাপারে অপরকে নিজের প্রতি নাখোশ না করে এবং কোরআনের বহু অর্থে বিশ্বাস না করে। এ রেওয়ায়েতটি আবু দারদার উপর মওকুফও বর্ণিত আছে। তাতে আরও আছে, এরপর সে নিজের নফসের প্রতি মনোনিবেশ করবে এবং তার প্রতি সর্বাধিক নাখোশ থাকবে।

ফারকাদ সনজী (রহঃ) কোন বিশেষ বিষয় হাসান বসরীকে জিজ্ঞেস করলেন। জওয়াব শুনে ফারকাদ বললেন, ফেকাহবিদরা আপনার বিপরীত মত প্রকাশ করেন। হাসান বসরী বললেন : হে ফারকাদ! তুমি কি ফেকাহবিদ স্বচক্ষে কোথাও দেখেছ? ফকীহ সে ব্যক্তি, যে সংসারের প্রতি বিমুখ, পরকালের প্রতি উৎসাহী, দ্বীনের ব্যাপারে বুদ্ধিমান, বিরতিহীনভাবে পরওয়ারদেগারের এবাদতকারী, পরহেযগার, মুসলমানদের বিমুখতা থেকে আত্মরক্ষাকারী, তাদের ধন-সম্পদের প্রতি বিমুখ এবং মুসলমানদের হিতাকাঙ্ক্ষী। এখানে হযরত হাসান বসরী এতগুলো বিষয় উল্লেখ করলেন, কিন্তু একথা বললেন না যে, ফকীহ ফেকাহ শাস্ত্রের শাখাগত ফতোয়ারও হাফেয হবে। আমরা একথা বলি না যে, ফেকাহ শব্দটি বাহ্যিক বিধানাবলীর ফতোয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে না। বরং আমরা বলি, ব্যাপক অর্থে ফতোয়ার ক্ষেত্রেও শব্দটি ব্যবহৃত হত। তবে অধিকাংশ মনীষী ফেকাহ শব্দটি আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্রের অর্থেই ব্যবহার করতেন। এখন শব্দটি বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হওয়ায় মানুষ ধোঁকায় পড়েছে। তারা কেবল ফতোয়ার বিধানাবলীতেই মশগুল হয়ে পড়েছে এবং আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তারা এ পছন্দের উপর মনের দিক থেকে একটি ভরসা পেয়েছে। কেননা, আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্র সূক্ষ্ম বিধায় তা পালন করা কঠিন। তার মাধ্যমে সরকারী পদ, জাঁকজমক ও অর্থকড়ি লাভ করা দুরূহ। তাই শয়তান এই বাহ্যিক ফেকাহ অন্তরে প্রতিষ্ঠিত করার খুব সুযোগ পেয়েছে। যে ফেকাহ্ শরীয়তের একটি উৎকৃষ্ট শাস্ত্র ছিল, শয়তান তা বিশেষ ফতোয়া শাস্ত্রের জন্যে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে।
দ্বিতীয়, এলেম শব্দটি পূর্বে আল্লাহর মারেফত, তাঁর আয়াতসমূহের অবগতি এবং সৃষ্টির মধ্যে তাঁর ক্রিয়াকর্ম চেনার অর্থে ব্যবহৃত হত। হযরত ওমর (রাঃ)-এর ওফাতের পর হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেছিলেন : এলেমের দশ ভাগের নয় ভাগ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তিনি এলেমকে মারেফত বলেছেন এবং নিজেই তফসীর করেছেন যে, এখানে আল্লাহর এলেম উদ্দেশ্য।
মানুষ এ শব্দটিও বিশেষ অর্থে ধরে নিয়েছে। তারা প্রচার করে দিয়েছে, যেব্যক্তি প্রতিপক্ষের সাথে ফেকাহ্ মাসআলা মাসায়েল নিয়ে খুব বিতর্ক করে এবং এতে ব্যাপৃত থাকে, প্রকৃতপক্ষে সে-ই আলেম। শ্রেষ্টত্বের শিরোপা তার মাথায়ই শোভা পায়।
পক্ষান্তরে যে বিতর্কে পারদর্শী নয়, অথবা তাতে পিছিয়ে থাকে, মানুষ তাকে দুর্বল মনে করে এবং আলেমদের মধ্যে গণ্য করে না। বস্তুতঃ এলেমের এ অর্থ পূর্বে ছিল না। এটা তাদেরই কারসাজি। এলেম ও আলেমের ফযীলত সম্পর্কে হাদীসে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে, তা সেসব আলেমের বিশেষণ, যাঁরা আল্লাহ্ তাআলা, তাঁর বিধিবিধান, ক্রিয়াকর্ম ও গুণাবলী সম্পর্কে পরিজ্ঞাত। পক্ষান্তরে এখন আলেম তাদেরকে বলা হয়, যারা শরীয়তের এলেম তো রাখেই না, কেবল বিরোধপূর্ণ মাসআলাসমূহে ঝগড়া-কলহ করার পদ্ধতি আয়ত্ত করেছে। এতেই তারা অদ্বিতীয় আলেমগণের মধ্যে পরিগণিত হয়, যদিও তফসীর, হাদীস ইত্যাদি কিছুই জানে না। এ বিষয়ই অনেক শিক্ষার্থীর জন্যে মারাত্মক অবনতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তৃতীয় শব্দ তওহীদের অর্থ এবং কালাম শাস্ত্র ও বিতর্ক পদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়া, প্রতিপক্ষের বিরোধপূর্ণ কথাবার্তা আয়ত্ত করা, সে সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন তৈরী করা, অধিক আপত্তি বের করা এবং প্রতিপক্ষকে অভিযুক্ত করা। ফলে এ ধরনের অনেক নতুন দল নিজেদের উপাধি সাব্যস্ত করছে 'আহলে আদল ও তওহীদ' এবং কালামশাস্ত্রীদের নাম রেখেছে তওহীদের আলেম। অথচ এ শাস্ত্রের যেসব বিষয়বস্তু উদ্ভব হয়েছে, সেগুলোর কোনটিই প্রথম যুগে ছিল না; বরং তখন যারা বিতর্ক ও কলহের সূত্রপাত করত, তাদের প্রতি ভীষণ অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা হত। সে যুগের লোকেরা কোরআন পাকে বর্ণিত হৃদয়গ্রাহী যুক্তি প্রমাণই হৃদয়ঙ্গম করত এবং তখন কোরআনের শিক্ষাই ছিল পূর্ণ শিক্ষা। তাদের মতে পরকালীন বিষয়কে তওহীদ বলা হত। এটা কালামশাস্ত্রীরা বুঝে না, বুঝলেও আমলে আনেন না। পরকাল বিষয়ের ব্যাখ্যা এই যে, উপায় ও কারণাদির প্রতি লক্ষ্য না করে ভাল মন্দ সকল কর্ম আল্লাহর পক্ষ থেকে হয় বলে বিশ্বাস করতে হবে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর পক্ষ থেকে হয় বলে বিশ্বাস করা যাবে না। এটা তওহীদের একটি প্রধান মূলনীতি। এরই ফল হচ্ছে তওয়াক্কুল, যা যথাস্থানে বর্ণিত হবে। এ তওহীদেরই এক ফল ছিল, হযরত আবু বকর (রাঃ) অসুস্থ হলে তাঁর সহচরগণ বললেন : আমরা আপনার জন্যে চিকিৎসক ডেকে আনি। তিনি বললেন : চিকিৎসকই আমাকে অসুস্থ করেছেন। অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে- হযরত আবু বকর (রাঃ) অসুস্থ হলে তাঁর সহচরগণ জিজ্ঞেস করলেন : চিকিৎসক আপনার রোগ সম্পর্কে কি বলেছে? তিনি বললেন : চিকিৎসক বলেছেন- এটি আমি যা চাই, তাই করি।

তওহীদ এমন একটি উৎকৃষ্ট রত্ন, যার দু'টি আবরণ রয়েছে এবং আর দুটির একটি অপরটি অপেক্ষা রত্ন থেকে দূরবর্তী। লোকেরা তওহীদ শব্দটিকে বিশেষ আবরণের অর্থে এবং সেই বিশেষ শাস্ত্রের অর্থে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, যদ্দ্বারা আবরণের হেফাযত হয়। তারা আসল রত্ন বাদ দিয়েছে। তওহীদের প্রথম আবরণ হচ্ছে মুখে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলা । এ তওহীদ খৃস্টানদের প্রবর্তিত ত্রিত্ববাদের বিপরীত। কিন্তু এ তওহীদ কখনও মোনাফেকের মুখ থেকেও উচ্চারিত হয়; যার অন্তর বাইরের বিপরীত।
তওহীদের দ্বিতীয় আবরণ হচ্ছে মুখে যে কলেমা উচ্চারণ করে, অন্তরে তার বিষয়বস্তুর বিপরীত বিশ্বাস না থাকা; বরং অন্তরে তা সত্য বলে প্রত্যয় থাকা। এটা সর্বসাধারণের তওহীদ। কালামশাস্ত্রীরা এ তওতীদকেই বেদআত থেকে রক্ষা করে। আর আসল রত্ন তওহীদ হচ্ছে উপায় ও কারণাদির প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে সবকিছুকে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিশ্বাস করা এবং বিশেষভাবে তাঁরই এবাদত করা, অন্য কাউকে উপাস্য সাব্যস্ত না করা। যারা নিজের খেয়াল খুশীর অনুসরণ করে, তারা এ তওহীদের বাইরে অবস্থান করে। কেননা, যেব্যক্তি নিজের খেয়ালখুশীর অনুসরণ করে, সে তার খেয়াল খুশীকেই উপাস্য সাব্যস্ত করে নেয়। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন :
>“আপনি সেই ব্যক্তির প্রতি লক্ষ্য করেছেন কি, যে তার খেয়াল খুশীকে উপাস্য করে নিয়েছে?”

রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : মনের খেয়াল খুশী হচ্ছে আল্লাহ তাআলার কাছে সর্বাধিক ঘৃণ্য উপাস্য, যার উপাসনা পৃথিবীতে করা হয়। আসলেও চিন্তা করলে বুঝা যায়, মূর্তিপূজারীরা প্রকৃতপক্ষে মূর্তির পূজা করে না; বরং মনের খেয়াল খুশীর পূজা করে। কারণ, তাদের মন বাপদাদার ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট। তারা সেই আকর্ষণের অনুসরণ করে।

মানুষের প্রতি রাগ করাও এ তওহীদের পরিপন্থী। কেননা, যেব্যক্তি ভালমন্দ সবকিছু আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হয় বলে বিশ্বাস করবে, সে অন্যের প্রতি কিরূপে রাগ করতে পারে? মোট কথা, পূর্বে এ স্তরকে তওহীদ' বলা হত। এটা সিদ্দীকৃগণের স্তর। মানুষ একে কিভাবে পাল্টে দিয়েছে এবং ব্যক্তিক আবরণটি নিয়েই সন্তুষ্ট হয়ে গেছে! তারা এ আবরণকেই প্রশংসা ও গর্বের বস্তু সাব্যস্ত করেছে। অথচ এটা প্রশংসার মূল বিষয় থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। মানুষের অবস্থা সে ব্যক্তির মত, যে প্রত্যূষে ঘুম থেকে উঠে কেবলামুখী হয়ে বলে-“আমি একাগ্রতা সহকারে আমার মুখ সেই সত্তার দিকে করলাম, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন।”
এখন যদি তার অন্তর বিশেষভাবে আল্লাহ তা'আলার দিকে না থাকে, তবে এর অর্থ এই হবে যে, সে প্রত্যহ দিনের শুরুতেই আল্লাহ তা'আলার সাথে মিথ্যা বলে। কেননা, মুখের অর্থ যদি বাহ্যিক মুখ হয় তবে সেটা তো সব দিক থেকে ফিরিয়ে কাবার দিকে রাখা হয়েছে। কা'বা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা'আলার দিক নয় যে, কেউ কা'বার দিকে মুখ করলে আল্লাহ তা'আলার দিকে মুখ করা হবে। আর যদি মুখের অর্থ হয় অন্তরের ধ্যান, যা এবাদতের উদ্দেশ্য, তবে যেখানে অন্তর পার্থিব প্রয়োজন ও স্বার্থসিদ্ধিতে লিপ্ত, অর্থসম্পদ ও জাঁকজমক সঞ্চয়ের কৌশল আবিষ্কারে মগ্ন এবং সম্পূর্ণরূপে সেদিকেই নিবিষ্ট, সেখানে একথা কেমন করে সত্য হবে যে, আমি আমার মুখ সেই আল্লাহর দিকে করলাম, যিনি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন? এ বাক্যটি আসল তওহীদের স্বরূপ জ্ঞাপন করে। বাস্তবে সে-ই তওহীদপন্থী, যে সত্যিকার এক ছাড়া অন্য কাউকে দেখে না এবং অন্তর অন্য দিকে ফেরায় না। এ তওহীদ হচ্ছে এ আদেশ পালন করা :
>“বলুন, আল্লাহ! এরপর তাদেরকে তাদের বৃথা কথনে খেলাধুলা করতে দিন।”
এখানে মুখে বলা অর্থ নয়। কেননা, মুখ অন্তরের অবস্থা বর্ণনা করে, যা কখনও সত্য কখনও মিথ্যা হয়। আল্লাহ তা'আলাকে দেখার স্থান হচ্ছে অন্তর, যা তওহীদের উৎস।

চতুর্থ শব্দ যিকির ও তাযকীর –
এসম্পর্কে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন : “আর আপনি উপদেশ দিতে থাকুন, কারণ নিশ্চয় উপদেশ মুমিনদের উপকারে আসে”
যিকিরের মজলিসের প্রশংসায় অনেক হাদীস বর্ণিত আছে। উদাহরণতঃ রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন-
>“যখন তোমরা জান্নাতের বাগান অতিক্রম কর, তখন বিচরণ কর” (অর্থাৎ, সংগ্রহ করে বেড়াও)। জিজ্ঞেস করা হল : জান্নাতের বাগান কি? তিনি বললেন : যিকিরের মজলিস।
>“মখলুকের ফেরেশতা ছাড়াও আল্লাহ তাআলার কতক ভ্রমণকারী ফেরেশতা আছে, তারা শূন্যে বিচরণ করে। তারা যখন যিকিরের মজলিস দেখে তখন একে অপরকে ডেকে বলে : চল, তোমাদের অভীষ্ট বিষয় এখানে রয়েছে ! অতঃপর তারা যিকিরওয়ালাদের কাছে এসে তাদেরকে ঘিরে নেয় এবং যিকির শুনে। সাবধান, আল্লাহর যিকির কর এবং নসকে উপদেশ দাও।”

লোকেরা এ যিকির পরিবর্তন করে এমন সব বিষয়ের নাম যিকির রেখে দিয়েছে যা আজকালকার ওয়ায়েযরা সব সময় বর্ণনা করে। অর্থাৎ, কিসসা, কবিতা ইত্যাদির বর্ণনা। অথচ কিসসা বেদআত। পূর্ববর্তী মনীষীগণ কিসসা কথকের কাছে বসতে নিষেধ করেছেন। ইবনে মাজা রেওয়ায়েত করেন, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর আমলে কিসসা ছিল না- হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর (রাঃ)-এর আমলে ছিল। ফলে ফেতনা দেখা দেয় এবং কিসসা কথকরা বহিষ্কৃত হয়। ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, একদিন তিনি মসজিদ থেকে বের হয়ে বললেন : কিসসা কথকই আমাকে মসজিদ থেকে বের করেছে। সে না আসলে আমি বের হতাম না।
যমরা বলেন : আমি সুফিয়ান সওরীকে বললাম : আমরা কিসসা কথকের কাছে যাব? তিনি বললেন : বেদআতের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও।
ইবনে আওন বলেন : আমি ইবনে সিরীনের কাছে গিয়ে আরজ করলাম : আজ তেমন ভাল কাজ হয়নি। আমীর কিসসা কথকদের কিসসা বলতে নিষেধ করে দিয়েছেন। তিনি বললেন : আমীর উত্তম তওফীক প্রাপ্ত হয়েছেন।
আ'মাশ (রহঃ) বসরার জামে মসজিদে প্রবেশ করে দেখলেন, এক ব্যক্তি ওয়ায করছে এবং বলছে : আ'মাশ আমার কাছে রেওয়ায়েত করেছেন। একথা শুনে আ'মাশ বৃত্তের মধ্যে ঢুকে পড়লেন এবং বগলের লোম উপড়াতে লাগলেন। ওয়ায়েয বলল : মিয়া, তোমার লজ্জা করে না। আ'মাশ বললেন : আমি তো সুন্নত কাজ করছি। এতে শরমের কি আছে? বরং তুমি মিথ্য বলছ যে, আ'মাশ তোমার কাছে রেওয়ায়েত করেছে। শুন, আমিই আ'মাশ। আমি তোমার কাছে কিছুই রেওয়ায়েত করিনি।

আহমদ বলেন : কিসসা কথক ও ভিক্ষুক সর্বাধিক মিথ্যুক।
হযরত আলী (রাঃ) বসরার জামে মসজিদ থেকে কিসসা কথককে বের করে দেন এবং হযরত হাসান বসরী (রহঃ)-এর কথাবার্তা শুনলেন- তাঁকে বের করেননি। কারণ, তিনি আখেরাত ও মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন, নফসের দোষ ও বিপজ্জনক আমল সম্পর্কে হুশিয়ার করতেন, শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং তা থেকে আত্মরক্ষার উপায় সম্পর্কে আলোচনা করতেন। তিনি আল্লাহ্ নেয়ামত ও তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশে বান্দার অক্ষমতার কথা বলতেন এবং দুনিয়ার নিকৃষ্টতা, দোষ, ক্ষণস্থায়িত্ব, বিশ্বাসঘাতকতা এবং পরকালের পথে বিপদাপদের অবস্থা বর্ণনা করতেন। এটাই শরীয়তসম্মত উৎকৃষ্ট যিকির। এর প্রতিই আবু যর (রাঃ) বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদীসে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে।
“যিকিরের মজলিসে উপস্থিতি হাজার রাকআত (নফল নামায) পড়ার চেয়ে উত্তম। এলেমের মজলিসে যাওয়া হাজার রোগীর কুশল জিজ্ঞাসা করার চেয়ে এবং হাজার জানাযার পশ্চাতে যাওয়ার চেয়ে উত্তম।” কেউ জিজ্ঞেস করল : হুযুর, কোরআন তেলাওয়াতের চেয়েও কি? তিনি বললেন : “কোরআন তেলাওয়াতের উপকারিতা এটি এলেম বলেই।”
আতা (রঃ) বলেন : “যিকিরের একটি মজলিস ক্রীড়া-কৌতুকের সত্তরটি মজলিসের জন্যে কাফ্ফারা হয়ে যায়”।
এখন মিষ্ট ও মসলাযুক্ত কথার উদগাতারা তাদের বাজে কথাবার্তার নাম দিয়েছে তাযকীর। অথচ তারা উৎকৃষ্ট যিকিরের পথ ভুলে কোরআন বহির্ভূত ও অতিরঞ্জিত কিসসা কাহিনীতে ব্যাপৃত। একান্ত সত্য হলেও কতক কিস্সা শোনা উপকারী এবং কতক শোনা অপকারী হয়ে থাকে। যেব্যক্তি এটা অবলম্বন করে, তার মধ্যে সত্য-মিথ্যা এবং উপকারী অপকারী বিষয়বস্তুর সংমিশ্রণ হয়ে যায়। এ কারণেই এ থেকে নিষেধ করা হয়েছে এবং এ কারণেই ইমাম আহমদ বলেন : সত্য অবস্থা বর্ণনাকারীর বড় প্রয়োজন রয়েছে। সুতরাং যদি সে কিসসা কোন নবীর হয়, ধর্ম সম্পর্কিত হয় এবং কথকও সত্যবাদী হয়, তবে এরূপ কিস্সা শুনতে কোন দোষ আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু বর্ণনাকারীর মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকা উচিত। যেসব কিসসায় এমন ত্রুটি ও অসতর্কতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যার তাৎপর্য সর্বসাধারণের বোধগম্য নয়, সেগুলো বর্ণনা করবে না এবং এমন বিরল ত্রুটি-বিচ্যুতিও বর্ণনা করবে না, যার পেছনে ত্রুটিকারী অনেক সৎকর্ম সম্পাদন করেছে, যার ফলে সে ত্রুটি ক্ষমাযোগ্য হয়ে গেছে। কিসসা কথক এ দু'টি বিষয় থেকে বেঁচে থাকলে তার কিসসা কথনে দোষ নেই। এসব শর্তসহ উৎকৃষ্ট কিসসা তাই হবে, যা কোরআন মজীদ ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত রয়েছে। কোন কোন লোক আনুগত্য ও এবাদতে উৎসাহ যোগায় এমন গল্প রচনা করে নেয়া দুরস্ত মনে করে। তারা বলে : আমাদের উদ্দেশ্য মানুষকে সত্যের দিকে আহ্বান করা। কিন্তু এটা শয়তানী কুমন্ত্রণা। কেননা, সত্য ঘটনার অভাব নেই যে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হবে। যেসব বিষয় আল্লাহ্ তা'আলা ও তাঁর রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বর্ণনা করেছেন, সেগুলো সত্ত্বেও ওয়াযে নতুন বিষয় আবিষ্কার করার প্রয়োজন নেই। ছন্দ মিলিয়ে কথা বলার চেষ্টা মকরূহ ও বানোয়াট 'গণ্য হয়েছে। সেমতে সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাসের ছেলে ওমর প্রয়োজনবশতঃ তাঁর কাছে আসেন। তিনি ওমরকে ছন্দপূর্ণ কাব্যে নিজের প্রয়োজনের কথা বর্ণনা করতে শুনে বললেন : এ কারণেই আমি তোমাকে মন্দ মনে করি। তওবা না করা পর্যন্ত আমি তোমার প্রয়োজনের কথা শুনব না। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আবদুল্লাহ্ ইবনে রাওয়াহার মুখে তিনটি ছন্দপূর্ণ বাক্য শুনে বললেন : হে ইবনে রাওয়াহা! নিজেকে ছন্দের বাঁধন থেকে দূরে রাখ। এ থেকে জানা যায়, যে ছন্দ দু'বাক্যের অধিক হয়, তা নিষিদ্ধ ছিল।
জনৈক ব্যক্তি ভ্রূণহত্যায় হত্যার বিনিময় সম্পর্কে বলেছিল :
“যে খায়নি, পান করেনি, চিৎকার করেনি, তার রক্তপণ আমরা কিরূপে দেব? এরূপ বিষয় তো মাফ হয়ে যায়।”
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) একথা শুনে বললেন : বেদুঈন ব্যক্তির ছন্দের অনুরূপ ছন্দ রচনা কর।
ওয়াযের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে কবিতা বলা খারাপ। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন :
>“পথভ্রান্তরাই কবিদের অনুসরণ করে। দেখ না, তারা প্রতি উপত্যকায় মাথা কুটে ফেরে?
>“আমি পয়গম্বরকে কবিতা শিক্ষা দেইনি এবং তা তাঁর জন্যে শোভনীয়ও নয়।”
যেসব কবিতা বলা ওয়ায়েযদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশের মধ্যে এশকের জ্বালা, মাশুকের সৌন্দর্য, মিলনের আনন্দ ও বিরহের যন্ত্রণা বর্ণিত হয়। অথচ ওয়াযের মজলিস সর্বসাধারণ দ্বারাই পূর্ণ থাকে, যাদের অভ্যন্তর কামভাবে পরিপূর্ণ এবং অন্তর সুন্দর বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট। এমতাবস্থায় এসব কবিতা তাদের মনের সুপ্ত বিষয়কে উস্কানি দেয়। ফলে কামাগ্নি প্রজ্বলিত হয়ে উঠে এবং তারা চিৎকার ও হাহুতাশ করে। মোট কথা, অধিকাংশ অথবা সব কবিতার পরিণতিই এক ধরনের অনিষ্টকর বিষয় হয়ে থাকে। তবে যেসব কবিতায় উপদেশ ও প্রজ্ঞা রয়েছে, কেবল সেগুলোই দলীল হিসাবে উল্লেখ করা এবং অন্য কোন প্রকার কবিতা ব্যবহার না করা উচিত।
রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:
>“নিশ্চয় কোন কোন কবিতা প্রজ্ঞাপূর্ণ”।
যদি মজলিসে বিশিষ্ট দ্বীনী ব্যক্তিবর্গ সমবেত থাকে এবং জানা থাকে যে, তাদের অন্তর আল্লাহ তা'আলার মহব্বতে নিমজ্জিত, তবে তাদের জন্যে সে কবিতা ক্ষতিকর নয়, যা বাহ্যতঃ মানুষের উদ্দেশে রচনা করা হয়েছে। কেননা, শ্রোতা যা শুনে তা সে ছাঁচেই গড়ে নেয়, যা তার অন্তরে প্রবল থাকে। ‘সেমা' অধ্যায়ে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
এ কারণেই হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রহঃ) ছয় থেকে দশ জন লোকের মধ্যে ওয়ায করতেন। এর বেশী হলে কিছুই বলতেন না। তাঁর মজলিসে কখনও পূর্ণ বিশ জন লোক হয়নি।
একবার ইবনে সালেমের ঘরের দরজায় কিছু লোক সমবেত হলে এক ব্যক্তি হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রঃ)-কে বলল : আপনি বয়ান করুন। এখানে আপনার বন্ধুবর্গ উপস্থিত রয়েছেন । তিনি বললেন : এরা আমার বন্ধু নয়। এরা মজলিসের লোক। আমার বন্ধু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
কতক সূফী দু'প্রকার কালাম গড়েছেন- একে তো তারা খোদায়ী এক ও মিলনের ব্যাপারে লম্বা চওড়া দাবী, যার পর বাহ্যিক আমলের কোন প্রয়োজন থাকেনি। এমনকি কেউ কেউ আল্লাহর সাথে এক হয়ে যাওয়ার দাবীও করতে থাকে এবং বলে : পর্দা সরে গেছে, দীদার হচ্ছে এবং সামনাসামনি সম্বোধন অর্জিত হচ্ছে। তারা আরও বলে : আমাদের প্রতি এই আদেশ হয়েছে এবং আমরা এই বলেছি। এ ব্যাপারে তারা হুসাইন ইবনে মনসূর হাল্লাজের অনুরূপ হওয়ার দাবী করে, যাকে এমনি ধরনের কয়েকটি কথা বলার কারণে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। তারা ‘আনাল হক' উক্তি এবং হযরত বায়েযীদ বোস্তামীর উক্তিকে সনদ হিসাবে পেশ করে। অর্থাৎ, বায়েযীদ বোস্তামী থেকেও 'সোবহানী, সোবহানী বলার কথা বর্ণিত আছে।
এ ধরনের বাক্যের দ্বারা সর্বসাধারণের অনেক ক্ষতি হয়েছে। এমন কি, কোন কোন কৃষক তার কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে এমনি ধরনের দাবী করতে শুরু করে। কেননা, এ বাক্য অন্তরের কাছে খুব ভাল মনে হয়। এতে বাহ্যিক আমল করতে হয় না। মকাম ও হাল অর্জনের জন্যে আত্মশুদ্ধিও করতে হয় না। কাজেই নির্বোধেরা এরূপ দাবী করবে না কেন এবং পাগলামি ও বাজে কথা বকবে না কেন? কেউ তাদের এ সব বিষয় মানতে অস্বীকার করলে তারা বলে : এ অস্বীকারের কারণ হচ্ছে এলেম ও বিতর্ক। এলেম একটি পর্দা এবং বিতর্ক নফসের আমল। আমরা যা অর্জন করেছি তা নূরের কাশফের মাধ্যমে কেবল বাতেন দ্বারা জানা যায়। মোট কথা, এমনি ধরনের বিষয় পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে সর্বসাধারণের ক্ষতি এত বেড়ে গেছে যে, যদি তাদের মধ্যে কেউ এ ধরনের কিছু কথা বলে, তবে তাকে মেরে ফেলা দশ ব্যক্তিকে জীবিত রাখার তুলনায় ভাল হয়।

হযরত বায়েযীদ বোস্তামী থেকে বর্ণিত উক্তি সম্পর্কে কথা এই যে প্রথমতঃ এর বিশুদ্ধতা স্বীকৃত নয়। দ্বিতীয়তঃ যদি কেউ এরূপ কথা তাঁর মুখে শুনে থাকে, তবে সম্ভবতঃ আল্লাহর উক্তিকেই বর্ণনার আকারে তিনি মনের মধ্যে পুনরাবৃত্তি করছিলেন। যেমন বলতেন :
“নিশ্চয় আমিই আল্লাহ। আমি ছাড়া কোন মাবুদ নেই। অতএব আমার এবাদত কর।” (সূরা তোয়াহা)
এ থেকে এরূপ মনে করা উচিত নয় যে, যিনি এ আয়াত পাঠ করছেন তিনি নিজের অবস্থা বর্ণনা করছেন।
দ্বিতীয় প্রকার কালাম যা হৃদয়ঙ্গম করা যায় না। এটি বাহ্যতঃ ভাল কিন্তু অর্থ ভয়াবহ। এতে কোন প্রকার উপকার হয় না। এসব কালাম স্বয়ং বক্তারই হৃদয়ঙ্গম হয় না; বরং পাগলামি ও বিক্ষিপ্ত চিন্তাধারার কারণে বলে দেয়। এ পাগলামির কারণ, যে কথা তার কানে পড়ে, তার অর্থ কমই স্মরণ রাখে। অধিকাংশ এরূপই।
অথবা বক্তা নিজে বুঝে কিন্তু অপরকে সে কালাম বুঝাতে পারে না। কিংবা মনের ভাব প্রকাশ করার মত বাক্য গঠন করতে সক্ষম হয় না। কারণ, বিদ্যাবুদ্ধি কম। এ ধরনের কালাম দ্বারা অন্তর পেরেশান এবং বুদ্ধি চিন্তাকে হয়রান করা ছাড়া কোন উপকার হয় না। হাঁ, এমন অর্থ বুঝে নেয়া যেতে পারে, যা উদ্দেশ্য নয়। এমতাবস্থায় প্রত্যেক ব্যক্তি এসব কালামের অর্থ নিজের বাসনা অনুযায়ী বুঝবে। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
>“যেব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের কাছে এমন হাদীস বর্ণনা করে, যার অর্থ তারা বুঝে না, সে হাদীস সেই সম্প্রদায়ের জন্যে একটি আপদ হবে।”
তিনি আরও বলেন : “এমন কথা বল, যা তারা বুঝে। যা বুঝে না তা বলো না।”
>“তোমরা কি চাও, আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে মিথ্যাবাদী বলা হোক?” এ উক্তিটি এমন কালাম সম্পর্কে, যার বক্তা নিজে তা বুঝে বটে কিন্তু শ্রোতারা তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না। এরূপ কালাম বলা জায়েয হবে না। এ থেকে জানা যায়, যে কালাম স্বয়ং বক্তাই বুঝে না, তা বলা কেমন করে দুরস্ত হবে?
হযরত ঈসা (আঃ) বলেন : যারা যোগ্য নয়, তাদেরকে জ্ঞানের কথা শুনিয়ো না। শুনালে জ্ঞানের কথার প্রতি তোমার বাড়াবাড়ি হবে। পক্ষান্তরে যারা যোগ্য, তাদের থেকে জ্ঞানের কথা আটকে রেখো না। রাখলে তাদের প্রতি অন্যায় করা হবে। কোমলপ্রাণ চিকিৎসকের মত হয়ে যাও। সে যেখানে রোগ দেখে সেখানেই ওষুধ লাগিয়ে দেয়।
অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে, যেব্যক্তি অযোগ্যদের মধ্যে জ্ঞানের কথা বর্ণনা করে, সে মূর্খ। আর যে যোগ্য থেকে জ্ঞানের কথা আটকে রাখে সে জালেম। জ্ঞানের কথা একটি প্রাপ্য হক। কিছু লোক এর অধিকারী। সুতরাং প্রত্যেক হকদারকে তার হক দিয়ে দেয়া উচিত।
কেউ কেউ শরীয়তের বাহ্যিক শব্দ থেকে যে অর্থ বুঝা যায় তা গ্রহণ করে না এবং তা থেকে এমন বাতেনী বিষয় উদ্ভাবন করে, যার কোন উপকারিতা নেই। যেমন, বাতেনী ফের্কার লোকেরা কোরআন মজীদের ভিন্ন অর্থ বের করে । এটাও হারাম এবং এর ক্ষতি অনেক বেশী। কেননা, শরীয়তের পক্ষ থেকে কোন দলীল ও প্রয়োজন ছাড়াই যখন শব্দের বাহ্যিক অর্থ বাদ দেয়া হবে, তখন শব্দের উপর কোন আস্থা থাকবে না। ফলে আল্লাহ ও রসূলের কালামের উপকারিতা বিনষ্ট হয়ে যাবে। কারণ সকলের বাতেন এক রকম হয় না। তাতে পরস্পর বিরোধিতার আশংকা থাকে । ফলে শব্দকে বিভিন্ন অর্থে ঢেলে নেয়া যেতে পারে। বাতেনী ফেকা এভাবে গোটা শরীয়তকে বরবাদ করেছে। এ ফের্কার লোকেরা কোরআনের যে ব্যাখ্যা করে, তার কয়েকটি দৃষ্টান্ত এই :
আল্লাহ্ তাআলা বলেন: (হে মূসা!) ফেরআউনের কাছে যাও, সে সীমালঙ্ঘন করেছে। বাতেনী ফের্কা বলে : এতে অন্তরের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। ফেরআউনের অর্থও অন্তর। অন্তরই প্রত্যেক মানুষের অবাধ্য।
“তুমি তোমার লাঠি নিক্ষেপ কর।” -বাতেনী ফের্কা বলে : আল্লাহ ব্যতীত যেসব বস্তুর উপর ভরসা করা হয়, সেগুলো নিক্ষেপ করা উচিত।
হাদীসে আছে “তোমরা সেহরী খাও। সেহরীর মধ্যে বরকত আছে।”
বাতেনী ফের্কা বলে : এর অর্থ সেহরীর সময় এস্তেগফার করা। তারা এমনিভাবে ব্যাখ্যা করে। তারা আদ্যোপান্ত কোরআনকে বাহ্যিক অর্থ এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও অন্যান্য আলেমগণ কর্তৃক বর্ণিত তফসীর থেকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যায়। এগুলোর মধ্যে কিছু সংখ্যক যে বাতিল তা নিশ্চিত। যেমন ফেরআউনের অর্থ অন্তর নেয়া। কেননা, ফেরআউন একজন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ব্যক্তি ছিল। সে কাফের ছিল এবং হযরত মূসা (আঃ) তাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন- একথা আমাদের জানা। এমনিভাবে সে শব্দ দ্বারা এস্তেগফার অর্থ নেয়াও বাতিল। কেননা, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তখন আহার করতেন এবং বলতেন :
“তোমরা বরকতের খাদ্যের দিকে এসো।”
মোট কথা, এসব ব্যাখ্যা হারাম ও পথভ্রষ্টতা। এগুলোর মধ্যে কোনটিই সাহাবী ও তাবেয়ীগণ থেকে বর্ণিত নেই। হযরত হাসান বসরী (রহঃ)- যিনি মানুষকে ইসলামের প্রতি আহ্বান ও উপদেশদানে পাগলপারা ছিলেন, তাঁর পক্ষ থেকেও এরূপ ব্যাখ্যা বর্ণিত নেই। হাদীসে আছে-
“যেব্যক্তি নিজের মতানুযায়ী কোরআনের তফসীর করে, তার ঠিকানা জাহান্নাম।”
এ হাদীসে উপরোক্তরূপ বাক্যই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, প্রথমে একটি উদ্দেশ্য ও মত ঠিক করে নিয়ে সেই মত প্রমাণ করার জন্যে কোরআনকে সাক্ষী করা এবং কোরআনের শব্দ থেকে আপন মতলব উদ্ধার করা। অথচ এর পেছনে কোন আভিধানিক সমর্থন নেই।
এ হাদীস থেকে একথা বুঝা ঠিক হবে না যে, চিন্তা গবেষণার মাধ্যমে কোরআনের তফসীর করা যাবে না। কেননা, অনেক আয়াত সম্পর্কে সাহাবী ও তফসীরকারগণের পক্ষ থেকে পাঁচ ছয় ও সাত ধরনের উক্তি বর্ণিত আছে। এটা জানা কথা, সবগুলো উক্তিই রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) থেকে শ্রুত নয়। কেননা, এসব উক্তি মাঝে মাঝে পরস্পর বিরোধীও হয়ে থাকে। সুতরাং এগুলো দীর্ঘ গবেষণাপ্রসূতই হয়ে থাকবে। এ কারণেই রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) সম্পর্কে বলেছিলেন : “হে আল্লাহ! তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করুন।”
যারা উপরোক্তরূপ অপব্যাখ্যা বৈধ মনে করে এবং বলে, এর উদ্দেশ্য মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা, তারা সে ব্যক্তিরই অনুরূপ, যে শরীয়তে উল্লেখ নেই এমন একটি বাস্তব সত্য বিষয়ে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর পক্ষ থেকে একটি হাদীস গড়ে নেয় অথবা যে কোন বিষয় সে সত্য মনে করে, সে সম্পর্কেই রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) থেকে একটি হাদীস তৈরী করে নেয়। এটা জুলুম ও গোমরাহী এবং নিম্নবর্ণিত হাদীসের বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্ত-
>“যে ইচ্ছাকৃতভাবে আমার উপর মিথ্যা বলে, তার ঠিকানা জাহান্নাম।”
বরং শব্দের অপব্যাখ্যা করা আরও খারাপ। কেননা, এর কারণে শব্দের উপর থেকেই আস্থা নষ্ট হয়ে যায় এবং কোরআন বুঝার পথ রুদ্ধ হয়। এখন তুমি জেনে থাকবে যে, শয়তান মানুষের ইচ্ছাকে কিরূপ সৎ জ্ঞান থেকে সরিয়ে মন্দ জ্ঞানের দিকে নিয়ে গেছে। এগুলো মন্দ আলেমদের দ্বারা মর্মার্থ পরিবর্তনের বদৌলত প্রসার লাভ করেছে। যদি তুমি কেবল প্রসিদ্ধির ভিত্তিতে তাদের অনুসরণ কর এবং প্রথম যুগে যেসকল ব্যাখ্যা সুবিদিত ছিল, সেগুলোর প্রতি লক্ষ্য না কর, তবে তোমার অবস্থাও শোচনীয় হবে।

পঞ্চম শব্দ হেকমত।
আজকাল হাকীম শব্দটি চিকিৎসক, কবি ও জ্যোতির্বিদ অর্থে ব্যবহৃত হয়। বরং যেব্যক্তি ফুটপাতে বসে নানা রূপ ভেল্কী দেখায়,, তাকেও হাকীম বলা হয়। অথচ হেকমতের প্রশংসা স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা করেছেন। তিনি বলেন :
>“আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হেকমত (প্রজ্ঞা) দান করেন। যে হেকমত প্ৰাপ্ত হয় সে প্রভূত কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।”
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এ সম্পর্কে বলেন : মানুষ যদি হেকমতের একটি বাক্য শেখে, তবে এটা তার জন্যে পৃথিবী ও পৃথিবীস্থিত সবকিছুর চেয়ে উত্তম। এখন চিন্তা কর, পূর্বে হেকমত কি ছিল আর এখন কার্যতঃ কোন্ অর্থে চলে গেছে। অন্যান্য শব্দ এর উপরই অনুমান করে নাও এবং মন্দ আলেমদের দ্বারা প্রতারিত হয়ো না। কেননা, দ্বীনের উপর তাদের অনিষ্ট শয়তানদের তুলনায় অনেক বেশী। শয়তান তাদের মাধ্যমেই মানুষের মন থেকে দ্বীনকে বহিষ্কার করে।
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়; ঘৃণ্যতম মানুষ কে? তিনি জওয়াব দিতে অস্বীকার করেন এবং বলেন : ইলাহী! ক্ষমা করুন। অতঃপর বার বার জিজ্ঞাসার জওয়াবে তিনি বললেন : ঘৃণ্যতম মানুষ হচ্ছে মন্দ আলেম। সুতরাং ভাল ও মন্দ এলেম জানা হয়ে গেছে এবং আরও জানা হয়েছে যে, কি কারণে ভাল এলেম মন্দ এলেমের সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়। এখন তুমি ইচ্ছা করলে নিজের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষায় পূর্ববর্তী মনীষীদের অনুসরণ করবে। আর যদি প্রতারণার কূপে নিক্ষিপ্ত হতে চাও, তবে পরবর্তীদের সাথে সামঞ্জস্য সৃষ্টি করবে। যেসব জ্ঞান পূর্ববর্তীদের পছন্দনীয় ছিল সেগুলো সব বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আর যে এলেমের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, তার অধিকাংশই বেদআত বা নতুন আবিষ্কার । রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যথার্থই বলেছেন :
>“ইসলামের সূচনা হয়েছে নিঃসঙ্গ অবস্থায় এবং শেষ পর্যন্ত সে নিঃসঙ্গ অবস্থায়ই ফিরে যাবে যেমন সূচনা হয়েছিল।”
অতএব সুসংবাদ একাকীদের জন্যে। প্রশ্ন করা হল : একাকী কারা? তিনি বললেন : যারা আমার সেই সুন্নতের সংস্কার করে, যা মানুষের হাতে নষ্ট হয়ে যায় এবং যারা সেই সুন্নতকে পুনরুজ্জীবিত করে, যাকে মানুষ মেরে ফেলে।”
অন্য রেওয়ায়েতে আছে, “তোমরা আজ যে বিষয় আঁকড়ে রয়েছ, তারা সে বিষয় আঁকড়ে থাকবে।”
অন্য হাদীসে আছে-
>“তারা অনেক লোকের মধ্যে কম সংখ্যক সৎলোক। তাদের বন্ধুর তুলনায় শত্রুর সংখ্যা অনেক বেশী। কেউ এ জ্ঞানের বিষয় বর্ণনা করলে মানুষ তার শত্রু হয়ে যায়।”
এ জন্যেই হযরত সুফিয়ান সওরী (রহঃ) বলেন : যখন তুমি কোন আলেমের অনেক বন্ধু দেখ, তখন বুঝে নাও সে সত্যকে মিথ্যার সাথে মিলিয়ে দিয়েছে। কারণ, সে কেবল সত্য কথা বললে অধিকাংশ মানুষ তার শত্রু হত।

পরবর্তী পর্ব

সোমবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৩

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (১৭) যে জ্ঞান উত্তম গণ্য হয় কিন্তু বাস্তবে উত্তম নয়

  


জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ১৭)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
যে জ্ঞান উত্তম গণ্য হয় কিন্তু বাস্তবে উত্তম নয়
কোন কোন জ্ঞান মন্দ কেন —
প্রশ্ন হতে পারে, যে বস্তু যেমন আছে ঠিক তেমনি জানাকে বলা হয় এলেম। এটা আল্লাহ তাআলার অন্যতম সিফাত বা গুণ। এমতাবস্থায় এলেম মন্দ ও নিন্দনীয় কেমন করে হতে পারে? জওয়াব এই যে, এলেম স্বয়ং মন্দ হয় না; বরং তিনটি কারণের মধ্য থেকে কোন একটি কারণ মানুষের মধ্যে উপস্থিতির কারণে এলেমকে মন্দ বলা হয়। তিনটি কারণ এই -
(১) এমন এলেম, যা আলেমের জন্যে অথবা অন্যের জন্যে ক্ষতিকর পরিণতি বয়ে আনে। যেমন, জাদুবিদ্যা ও তেলেসমাতি বিদ্যাকে মন্দ বলা হয়। অথচ জাদুবিদ্যা সত্য। কোরআন এর সাক্ষী। মানুষ জাদুকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর কাজে ব্যবহার করে। বোখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) উনাকে কেউ জাদু করেছিল। ফলে তিনি অসুস্থ হয় পড়েছিলেন। অবশেষে জিবরাঈল (আঃ) এসে সংবাদ দেন এবং একটি কূপের ভেতরে পাথরের নীচ থেকে সে জাদু সামগ্রী উদ্ধার করা হয়।
[নোট-এখানে উল্লেখ করা জরুরী যে তিনি জানতেননা এমন নয় বরং মানুষের শিক্ষাই এর মধ্যে নিহিত]
জাদু এক প্রকার জ্ঞান, যা পদার্থের বৈশিষ্ট্য ও তারকা উদয়ের মধ্যে গণনামত বিষয়সমূহ জানার মাধ্যমে অর্জিত হয়।
প্রথমে পদার্থ দ্বারা সে ব্যক্তির একটি পুত্তলিকা তৈরী করা হয়, যার উপর জাদু করতে হবে। এরপর তারকা উদয়ের একটি বিশেষ সময়ের জন্যে অপেক্ষো করা হয়। যখন সেই সময় আসে তখন পুত্তলিকার উপর কতিপয় কুফরী কলেমা ও শরীয়ত বিরোধী অশ্লীল বাক্য উচ্চারণ করে এগুলোর মাধ্যমে শয়তানের সাহায্য প্রার্থনা করা হয়। এসব তদবীরের ফলে আল্লাহর নিয়মানুযায়ী জাদুকৃত ব্যক্তির মধ্যে অদ্ভুত অবস্থা সৃষ্টি হয়। জ্ঞান হিসাবে এসব বিষয় জানা মন্দ নয়। কিন্তু মানুষের ক্ষতি করা ছাড়া এবং অনিষ্টের ওসিলা হওয়া ছাড়া অন্য কিছুর যোগ্যতা এসবের মধ্যে নেই বিধায় এ বিদ্যাকে নিন্দনীয় বলা হয়। যদি কোন অত্যাচারী ব্যক্তি কোন ওলীকে হত্যা করতে মনস্থ করে এবং ওলী তার ভয়ে কোন সুরক্ষিত স্থানে আত্মগোপন করেন, তবে জানা সত্ত্বেও ওলীর ঠিকানা অত্যাচারীকে বলা উচিত নয়। এস্থলে মিথ্যা বলা ওয়াজেব। অথচ জিজ্ঞাসার জওয়াবে তার ঠিকানা বলা সত্য অবস্থা প্রকাশ করা ছাড়া কিছু নয়, কিন্তু পরিণতি ক্ষতিকর বিধায় এটা মন্দ।
(২) যে এলেম প্রায়শঃ আলেমের জন্যে ক্ষতিকর হয়ে থাকে- যেমন জ্যোতির্বিদ্যা। এটা সত্তার দিক দিয়ে মন্দ নয়। কেননা, এটা হিসাব সংক্রান্ত বিষয়। কোরআন পাকে বলা হয়েছে; তুমি অর্থাৎ, সূর্য ও চন্দ্রের গতি হিসাব দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
আরওবলা হয়েছে-
“আমি চন্দ্রকে কক্ষপথ নির্ধারিত করে দিয়েছি। অবশেষে সে খেজুরের পুরাতন শাখার ন্যায় সরু হয়ে যায়।”
অথবা জ্যোতির্বিদ্যার সারমর্ম হচ্ছে কারণ দ্বারা ঘটনা বর্ণনা করা। এটা চিকিৎসকের নাড়ি দেখে ভাবী রোগের কথা বলে দেয়ার মতই।
মোট কথা, জ্যোতির্বিদ্যা জানার মানে সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহ্ তাআলা নির্ধারিত নিয়মকে জানা।
কিন্তু শরীয়ত একে মন্দ বলে আখ্যা দিয়েছে। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যখন তকদীরের আলোচনা হয় তখন নীরব হয়ে যাও। যখন জ্যোতির্বিদ্যার কথা বলা হয় তখন নীরব থাক এবং যখন আমার সাহাবীগণের প্রসঙ্গ উঠে তখন নীরব থাক। তিনি আরও বলেন : আমি আমার উম্মতের জন্যে তিনটি বিষয়ে ভয় করি- (ক) শাসকদের জুলুম করা, (খ) জ্যোতির্বিদ্যায় বিশ্বাসী হওয়া এবং (গ) তকদীর অস্বীকার করা।
হযরত ওমর (রাঃ) বলেন : জ্যোতির্বিদ্যা এ পরিমাণে অর্জন কর যাতে স্থলে ও পানিতে পথ প্রাপ্ত হতে পার। এতটুকু অর্জন করেই ক্ষান্ত হও।
তিন কারণে জ্যোতির্বিদ্যা অর্জন করতে নিষেধ করা হয়েছে। প্রথমতঃ অধিকাংশ মানুষের জন্যে এটা ক্ষতিকর। অর্থাৎ, যখন মনে একথা উদয় হয় যে, তারকার গতিবিধির দরুনই এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়, তখন মনে এ বিশ্বাসও বদ্ধমূল হতে থাকে যে, তারকারাজিই প্রভাব বিস্তারকারী এবং সেগুলোই উপাস্য। সেগুলো ঊর্ধ্বাকাশে বিরাজমান থাকে বিধায় মনে সেগুলোর সম্মান বৃদ্ধি পায় এবং আন্তরিক মনোযোগ সেগুলোর দিকে নিবদ্ধ থাকে। কল্যাণের আশা এবং অনিষ্ট থেকে রক্ষাপ্রাপ্তি তারকারাজির সাথেই সম্পৃক্ত বলে ধারণা হতে থাকে। এতে করে আল্লাহ্ তা'আলার স্মরণ মন থেকে মুছে যায়। কেননা, দুর্বল বিশ্বাসীদের দৃষ্টি উপায় পর্যন্তই সীমিত থাকে। পাকা আলেম ব্যক্তি অবশ্যই জানেন, চন্দ্র, সূর্য ও তারকারাজি সকলেই আল্লাহ্ তাআলার আদেশ পালন করে মাত্র। দুর্বল বিশ্বাসী ব্যক্তি সূর্যের কিরণ সূর্যোদয়ের কারণে দেখে। উদাহরণতঃ যদি পিপীলিকাকে বুদ্ধিমান ধরে নেয়া হয় এবং সে কাগজের উপর থেকে লক্ষ্য করে যে, কলমের কালি দ্বারা কাগজ কাল হয়ে যাচ্ছে, তবে সে এটাই বিশ্বাস করবে যে, লেখা কলমেরই কাজ। তার দৃষ্টি কলম থেকে আঙ্গুলের দিকে, আঙ্গুল থেকে হাতের দিকে, হাত থেকে ইচ্ছার দিকে, ইচ্ছা থেকে ইচ্ছাকারী লেখকের দিকে এবং লেখক থেকে তার শক্তি ও হাত সৃষ্টিকারীর দিকে উন্নতি করবে না। মোট কথা, মানুষের দৃষ্টি প্রায়ই নিকটের ও নিম্নের কারণসমূহের মধ্যে নিবদ্ধ থেকে সকল কারণের মূল কারণের দিকে উন্নতি করা থেকে বিরত থাকে। তাই জ্যোতির্বিদ্যা শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নিষেধ করার দ্বিতীয় কারণ, জ্যোতির্বিদ্যার বিষয়াবলী নিছক অনুমানভিত্তিক। তাই এর মাধ্যমে কোন কিছু বলা মূর্খতার উপর ভিত্তি করে বলারই নামান্তর। এমতাবস্থায় এটা মূর্খতা হিসাবে মন্দ-বিদ্যা হিসাবে নয়। কেননা, এটা ছিল হযরত ইদরীস (আঃ)-এর মোজেযা, যা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। জ্যোতির্বিদের কোন কথা ঘটনাচক্রেই সত্য হয়ে থাকে। কেননা, জ্যোতির্বিদ মাঝে মাঝে কোন কারণ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হয়ে থাকে। সেই কারণের পর অনেকগুলো শর্তের অনুপস্থিতির দরুন ঘটনা সংঘটিত হয় না। এ সব শর্ত সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়ার ক্ষমতা মানুষের নেই। সুতরাং যদি ঘটনাচক্রে আল্লাহ্ তাআলা অবশিষ্ট শর্তগুলোও উপস্থিত করে দেন, তখন জ্যোতির্বিদের কথা সত্য হয়ে যায়। অন্যথায় তার কথা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়। এটা এমন যেন কেউ দেখল, পাহাড়ের উপর থেকে মেঘমালা উঠে উঠে একত্রিত হচ্ছে এবং চলাফেরা করছে। এতে সে অনুমান করে বলে দিল, আজ বৃষ্টি হবে। অথচ প্রায়ই এমন মেঘমালার পরেও রৌদ্র উঠে পড়ে এবং মেঘ কেটে যায়। কখনও বৃষ্টি হলেও কেবল মেঘমালাই বৃষ্টিপাতের জন্যে যথেষ্ট নয়, যে পর্যন্ত অন্যান্য কারণগুলোর সমাবেশ না ঘটে।
অনুরূপভাবে মাঝির অনুমান করা যে, নৌকা সহীহ্ সালামত থাকবে। মাঝি বাতাসের গতিবিধি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল থাকে এবং এর উপর ভরসা করেই একথা বলে। অথচ বাতাসের দিক পরিবর্তনের আরও গোপন কারণ রয়েছে। সেগুলো মাঝি জানে না। ফলে কখনও তার অনুমান সত্য এবং কখনও ভ্রান্ত হয়ে থাকে। এ জন্যেই দৃঢ় চিত্ত ব্যক্তিকেও জ্যোতির্বিদ্যা শিক্ষা করতে নিষেধ করা হয়েছে।
তৃতীয় কারণ, এই বিদ্যার দ্বারা কোন উপকারই হয় না। কেননা, এতে অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে মাথা ঘামানো হয়। মানুষের মূল্যবান জীবন অনুপকারী কাজে বিনষ্ট করা যে খুবই ক্ষতিকর, তা বলাই বাহুল্য। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) একবার এক ব্যক্তির চার পাশে অনেক লোককে জমায়েত দেখে জিজ্ঞেস করলেন : লোকটি কে? লোকেরা বলল : সে একজন বড় পণ্ডিত। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন : কি বিষয়ে পণ্ডিত? উত্তর হল, কাব্যে ও আরবদের বংশ জ্ঞানে। তিনি বললেন : এ বিদ্যা উপকারী নয়; বরং এটা এমন মূর্খতা যা ক্ষতিকরও বটে। তিনি আরও বললেন :
“বিদ্যা তিনটি – কোরআনের অকাট্য আয়াত, প্রতিষ্ঠিত সুন্নত এবং কোরআন ও সুন্নতে বর্ণিত ত্যাজ্য সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার বিষয়ক জ্ঞান।”
এতে প্রমাণিত হয়, জ্যোতির্বিদ্যার মত শাস্ত্রে মাথা ঘামানো বিপদাশংকায় পতিত হওয়া এবং মূর্খতায় লিপ্ত হওয়ার নামান্তর। কারণ, তকদীরে যা আছে তা হবেই। তা থেকে আত্মরক্ষা অসম্ভব। চিকিৎসা শাস্ত্র এরূপ নয়। এর প্রয়োজন আছে। সাধারণতঃ এর প্রমাণ দেখা যায়। বিদ্যা যে কিছু লোকের জন্যে নিশ্চিত ক্ষতিকর, তা অস্বীকার করা যায় না। যেমন, পাখীর গোশত দুগ্ধপোষ্য শিশুর জন্যে ক্ষতিকর। বরং কোন কোন লোকের কিছু কিছু বিষয় সম্পর্কে অনবহিত থাকাই উপকারী হয়ে থাকে। বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি চিকিৎসকের কাছে তার স্ত্রীর বন্ধ্যাত্বের অভিযোগ করলে চিকিৎসক স্ত্রীর নাড়ি পরীক্ষা করে বলল : এখন সন্তান লাভের জন্যে চিকিৎসা করার কোন প্রয়োজন নেই। কেননা নাড়ি দেখে মনে হচ্ছে, সে চল্লিশ দিনের মধ্যে মারা যাবে। একথা শুনে স্ত্রী অত্যন্ত ভয় পেয়ে গেল এবং তার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল। সে তার ধন-সম্পদ বন্টন ও ওসিয়ত করে পানাহার পরিহার করল এবং মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। অবশেষে নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হয়ে গেল, কিন্তু স্ত্রীর মৃত্যু হল না। তার স্বামী চিকিৎসককে এ কথা জানালে চিকিৎসক বলল : আমি জানতাম, সে মরবে না। এখন তার সাথে সহবাস কর। তার গর্ভে তোমার সন্তান হবে। স্বামী জিজ্ঞেস করল : এটা কিরূপে বললেন? চিকিৎসক বললেন, অধিক মোটা হওয়ার কারণে মহিলার গর্ভাশয়ের মুখে চর্বির পরত পড়ে যাচ্ছিল। এটাই ছিল গর্ভ ধারণের অন্তরায়। আমি মনে করলাম, মৃত্যু ভয় ছাড়া সে ক্ষীণাঙ্গিনী হবে না। তাই তার মনে মৃত্যুর ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম। এখন তার গর্ভধারণের অন্তরায় দূর হয়ে গেছে। এ গল্প থেকে জানা যায়, কতক বিদ্যা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়ার মধ্যে বিপদাশংকা থাকে। এ থেকেই এ হাদীসের অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা যায়-
>“অনুপকারী বিদ্যা থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি।”
অতএব শরীয়ত যেসব জ্ঞানের নিন্দা করেছে, সেগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না এবং সাহাবায়ে কেরাম ও সুন্নতের অনুসরণ করো। এ অনুসরণেই নিরাপত্তা নিহিত এবং ঘাঁটাঘাঁটিতে বিপদ লুক্কায়িত। এ কারণেই রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
-“নিশ্চয় কোন কোন এলেম মূর্খতা এবং কোন কোন কথা হয়রানির কারণ।”
বলাবাহুল্য, এলেম মূর্খতা হয় না; কিন্তু ক্ষতিসাধনে তার প্রভাব মূর্খতার অনুরূপ হয়ে থাকে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন : সামান্য তওফীক অনেক এলেম অপেক্ষা উত্তম।
হযরত ঈসা (আঃ) বলেন : বৃক্ষ অনেক, কিন্তু সবগুলো উপকারী নয়।

রবিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৩

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (১৬) পূর্বের ফেকাবিদ ও এযুগের ফেকাবিদের পার্থক্য



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ১৬)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
পূর্বের ফেকাবিদ ও এযুগের ফেকাবিদের পার্থক্য
এখন আমরা ইসলামী ফেকাহ'র কিছু অবস্থা বর্ণনা করছি। এতে জানা যাবে, আমরা যা কিছু লিখেছি তা পূর্ববর্তী ফেকাহবিদগণের প্রতি ভর্ৎসনা নয়; বরং তাদের প্রতি ভর্ৎসনা, যারা তাঁদের অনুসরণ দাবী করে এবং নিজেদেরকে তাঁদের মতাবলম্বী বলে প্রকাশ করে, অথচ আমলে তাঁদের বিপরীত।
যাঁরা ফকীহগণের উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং যাঁদের অনুসারীদের সংখ্যা বেশী, তাঁরা হলেন পাঁচ জন- ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালেক, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, ইমাম আবু হানীফা এবং ইমাম সুফিয়ান সওরী (রহঃ)। তাঁদের প্রত্যেকেই এবাদত, সংসারত্যাগ, আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্রে পারদর্শিতা, মানব কল্যাণ সম্পর্কিত জ্ঞান এবং ফেকাহ্ দ্বারা আল্লাহ্ তা'আলার সন্তুষ্টি কামনা- এই পঞ্চ গুণে বিভূষিত ছিলেন। এই পঞ্চ গুণের মধ্য থেকে বর্তমান যুগের ফেকাহবিদগণ মাত্র একটি গুণে তাঁদের অনুসরণ করছেন। অর্থাৎ, বিভিন্ন মাসআলার শাখাগত বিষয়াদিতে দক্ষতা অর্জন ও তা নিয়ে নিমগ্ন থেকেছেন। অবশিষ্ট চারটি গুণ কেবল আখেরাতেরই যোগ্য। আর এই একটি গুণ দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ের জন্যে হতে পারে। কিন্তু এর মাধ্যমে তারা দুনিয়ার কল্যাণ লাভের জন্যে ঝুঁকে পড়েছে এবং এই একটিমাত্র গুণের কারণে তারা পূর্ববর্তী ইমামগণের সাথে সামঞ্জস্য দাবী করে। জিজ্ঞাসা করি, কর্মকার কি ফেরেশতাগণের অনুরূপ হতে পারে?
এখন আমরা উপরোক্ত ইমামগণের অবস্থা বর্ণনা করছি। এতে জানা যাবে, চারটি গুণই তাঁদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। পঞ্চম গুণ অর্থাৎ, ফেকাহশাস্ত্রে দক্ষতা- এটা বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না।
হযরত ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)
হযরত ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) যে এবাদতকারী ছিলেন, একথা এই রেওয়ায়েত দ্বারা বুঝা যায়- তিনি রাত্রিকে তিন ভাগে ভাগ করতেন, একভাগ এলেমের জন্যে, দ্বিতীয় ভাগ নামাযের জন্যে এবং তৃতীয় ভাগ নিদ্রার জন্যে ।
রবী বলেন, ইমাম শাফেয়ী (রঃ) রমযান মাসে ষাট বার কোরআন খতম করতেন এবং তা নামাযেই খতম করতেন। তাঁর অন্যতম শিষ্য বুয়ায়তী রমযানে প্রতিদিন এক খতম করতেন। হাসান কারাবেসী বলেন : আমি ইমাম শাফেয়ীর সাথে অনেকবার রাত্রি যাপন করেছি। তিনি রাত্রির এক তৃতীয়াংশ নামায পড়তেন। আমি দেখেছি, তিনি নামাযে পঞ্চাশ আয়াতের বেশী পড়তেন না। বেশী পড়লে একশ' আয়াত পড়তেন। রহমতের আয়াত পাঠ করার সময় আল্লাহ্ তাআলার কাছে নিজের জন্যে, সকল মুসলমানের জন্যে এবং ঈমানদারদের জন্যে সে রহমতের দোয়া করতেন। পক্ষান্তরে আযাবের আয়াত পাঠ করার সময় নিজেকে এবং মুসলমানদেরকে সে আযাব থেকে মুক্ত রাখার আবেদন করতেন। এভাবে আশা ও ভয় উভয়ই তাঁর মধ্যে একত্রিত থাকত। এ রেওয়ায়েত থেকে বুঝতে হবে, পঞ্চাশ আয়াতের বেশী না পড়া কোরআনী রহস্য সম্পর্কে তাঁর অগাধ পান্ডিত্যেরই জ্বলন্ত প্রমাণ। স্বয়ং তিনি বলেন : আমি ষোল বছর যাবত পেট ভরে আহার করি না। কেননা, উদরপূর্তি দেহ ভারী করে, অন্তর কঠোর এবং বুদ্ধিমত্তা হরণ করে। অধিক নিদ্রা আনয়নের কারণে এতে মানুষের এবাদত হ্রাস পায়। এ উক্তিতে তিনি উদরপূর্তির অনিষ্ট বর্ণনা করে বাস্তব প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। এবাদতে তিনি কতদূর সচেষ্ট ছিলেন, তা তাঁর উদরপূর্তি বর্জন করা থেকেই বুঝা যায়। বলাবাহুল্য, কম আহার এবাদতের মূল। তিনি আরও বলেন : আমি কখনও আল্লাহর নামে মিথ্যা কসম তো দূরের কথা, সত্য কসমও খাইনি। এ উক্তির প্রেক্ষিতে চিন্তা কর, তিনি আল্লাহ তাআলার প্রতি কতটুকু সম্মান প্রদর্শন করতেন এবং আল্লাহর প্রতাপ সম্পর্কে তাঁর কতটুকু জ্ঞান ছিল। জনৈক ব্যক্তি তাঁকে মাসআলা জিজ্ঞেস করলে তিনি চুপ করে রইলেন। লোকটি বলল : আপনার প্রতি আল্লাহর রহমত হোক, আপনি জওয়াব দিচ্ছেন না কেন? তিনি বললেন : চুপ থাকার মধ্যে আমার কল্যাণ, নাকি জওয়াব দেয়ার মধ্যে- একথা না জানা পর্যন্ত আমি জওয়াব দেব না।
এখন চিন্তা কর, তিনি জিহ্বার হেফাযত কতটুকু করতেন! অথচ ফেকাহবিদগণের সকল অঙ্গের চেয়ে জিহ্বাই অধিক নিয়ন্ত্রণহীন। এ থেকে আরও বুঝা যায়, তাঁর কথা বলা ও চুপ থাকা সওয়াব অর্জনের উদ্দেশ্যে হত।
আহমদ ইবনে ইয়াহ্‌ইয়া ইবনে ওয়াবীর বর্ণনা করেন: একবার ইমাম শাফেয়ী লণ্ঠনের বাজার থেকে বের হলে আমরা তাঁর পেছনে চললাম। দেখি, এক ব্যক্তি জনৈক আলেমের সাথে বচসা করছে এবং তাকে মন্দ বলছে। ইমাম শাফেয়ী আমাদের দিকে লক্ষ্য করে বললেন : অশ্লীল কথা শোনা থেকে কানকে রক্ষা কর, যেমন জিহ্বাকে বাজে বকাবকি থেকে রক্ষা করে থাক। কেননা, শ্রোতা বক্তার অশ্লীল বাক্য বিনিময়ে শরীক হয়ে থাকে। নির্বোধ ব্যক্তি তার মগজে যে সর্বাধিক খারাপ বিষয় জমিয়ে রাখে, তা তোমাদের মগজে ঢুকিয়ে দিতে চায়। যদি তার কথা তাকেই ফিরিয়ে দেয়া হয়, অর্থাৎ, শোনা না হয়, তবে এসব যে শুনবে না সে ভাগ্যবান হবে। পক্ষান্তরে যে বলে, সে হতভাগ্য হয়। তিনি বলেন : জনৈক দার্শনিক অন্যের কাছে পত্র লেখল, তোমাকে আল্লাহ তাআলা এলেম দান করেছেন। এই এলেম পাপাচারের অন্ধকার দ্বারা মলিন করো না। নতুবা যেদিন আলেমরা তাদের এলেমের নূরে চলবে, সেদিন তুমি অন্ধকারে থেকে যাবে।
ইমাম শাফেয়ীর সংসারবিমুখতা নিম্নোক্ত রেওয়ায়েত থেকে জানা যায়ঃ
তিনি বলেনঃ যেব্যক্তি দাবী করে যে, তার অন্তরে দুনিয়ার মহব্বত ও স্রষ্টার মহব্বত এক সাথে রয়েছে, সে মিথ্যাবাদী।
হুমায়দী বলেন : ইমাম শাফেয়ী একবার জনৈক শাসনকর্তার সাথে ইয়ামনে গমন করেন এবং সেখান থেকে দশ হাজার দেরহাম নিয়ে মক্কায় ফিরে আসেন। তাঁর জন্যে মক্কার বাইরে এক গ্রামে তাঁবু স্থাপন করা হয়। জনগণ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসতে থাকে। তিনি সম্পূর্ণ অর্থ বণ্টন না করা পর্যন্ত সেখানে অনড় হয়ে রইলেন। একদিন তিনি হাম্মাম (গোসলখানা) থেকে বের হয়ে হাম্মামের মালিককে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে দিলেন। একবার তাঁর হাত থেকে বেত পড়ে গেলে জনৈক ব্যক্তি তা তুলে দিল। তিনি এর বিনিময়ে তাকে পঞ্চাশটি স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে দিলেন। তাঁর দানশীলতা প্রসিদ্ধ। বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না। যুহদ তথা সংসারবিমুখতার মূল হচ্ছে দানশীলতা। কারণ, যেব্যক্তি ধন-সম্পদের মহব্বত রাখে, সে তা আটকে রাখে এবং আলাদা করে না। ধন-সম্পদ সে-ই আলাদা করবে, যার দৃষ্টিতে সংসার নিকৃষ্ট হবে। যুহদের অর্থ তাই।
ইমাম শাফেয়ীর সংসারবিমুখতা, অধিক খোদাভীতি এবং আখেরাতের কাজে নিজেকে মশগুল রাখার ব্যাপারে নিম্নোক্ত রেওয়ায়েতও সাক্ষ্য দান করে :
একবার সুফিয়ান ইবনে উয়ায়না তাঁর সামনে অন্তরের কোমলতা সম্পর্কিত একটি হাদীস বর্ণনা করলে তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়েন। লোকেরা সুফিয়ানকে বলল : তিনি মারা গেছেন। সুফিয়ান বললেন : মারা গেলে সমসাময়িক সকল লোকের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হয়েই মারা গেছেন।
আবদুল্লাহ ইবনে মোহাম্মদ বলখী বলেন : একবার আমি ও ওমর ইবনে বানানা একত্রে বসে এবাদতকারী ও সংসারবিমুখদের কথা আলোচনা করেছিলাম। ওমর বললেন : আমি মোহাম্মদ ইবনে ইদরীস শাফেয়ী অপেক্ষা অধিক পরহেযগার ও মিষ্টভাষী কাউকে দেখিনি। একবার আমি ইমাম শাফেয়ী ও হারেস ইবনে লবীদ সাফা পাহাড়ের দিকে গেলাম। হারেস ছিলেন সালেহ মুরারীর শিষ্য। তিনি সুললিত কণ্ঠে তেলাওয়াত শুরু করলেন। যখন
>“এটা এমন এক দিন যেদিন না তারা কথা বলবে। আর না তাদেরকে অনুমতি দেয়া হবে ওযর পেশ করার।”
পাঠ করলেন, তখন আমি ইমাম শাফেয়ীকে বিবর্ণ হয়ে যেতে দেখলাম। তাঁর দেহ রোমাঞ্চিত হয়ে গেল এবং এবং তিনি কিছুক্ষণ ছটফট করে বেহুঁশ হয়ে গেলেন।
জ্ঞান ফিরে এলে তিনি বলতে লাগলেন : এলাহী, আমি আপনার কাছে মিথ্যুকদের জ্ঞান ও গাফেলদের বিমুখতা থেকে আশ্রয় চাই। এলাহী, আপনার জন্যেই সাধকদের অন্তর বিনম্র এবং ভক্তদের মাথা নত হয়। এলাহী, আপনার বদান্যতা থেকে আমাকে দান করুন এবং আমাকে কৃপার পর্দায় আবৃত্ত করুন। আপন সত্তার কৃপায় আমার ত্রুটি মার্জনা করুন।
আবদুল্লাহ বলেন : এর পর আমরা সকলেই সেখান থেকে উঠে চলে এলাম। আমি যখন বাগদাদ পৌঁছলাম, তখন ইমাম শাফেয়ী ইরাকে ছিলেন। একদিন আমি নদীর, কিনারে বসে অযু করছিলাম। একব্যক্তি আমার কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন বৎস, উত্তমরূপে অযু কর। আল্লাহ্ তাআলা দুনিয়া ও আখেরাতে তোমার সাথে উত্তম ব্যবহার করবেন। আমি পেছন ফিরে দেখলাম, জনৈক বুযুর্গ ব্যক্তির পেছনে অনেক লোকজন রয়েছে। আমি তাড়াতাড়ি অযু করে তাদের পেছনে চললাম। বুযুর্গ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন : তোমার কোন কাজ আছে কি? আমি বললাম : হাঁ, আল্লাহ তাআলা আপনাকে যে এলেম দান করেছেন তা থেকে আমাকে কিছু শিখিয়ে দিন। তিনি বললেন : জেনে রাখ, যে আল্লাহকে সত্য বলে বিশ্বাস করে, সে নিষ্কৃতি পায়। যে দ্বীনের ভয় রাখে, সে ধ্বংসের কবল থেকে রক্ষা পায়। যে দুনিয়াতে সংসারবিমুখ থাকে সে যখন কেয়ামতে আল্লাহ্ প্রদত্ত সওয়াব দেখবে, তখন তার চোখ ঠাণ্ডা হবে। আরও কিছু বলব? আমি বললাম : বলুন। তিনি বললেন : যার মধ্যে তিনটি গুণ থাকে, সে তার ঈমান পূর্ণ করে নিতে পারে। প্রথম, অপরকে সৎকাজের আদেশ করবে এবং প্রথমে নিজে তা মেনে চলবে। দ্বিতীয়, মন্দ কাজ থেকে অন্যকে নিষেধ করবে এবং প্রথমে নিজে বিরত থাকবে। তৃতীয়, আল্লাহ্ তাআলার নির্ধারিত সীমার খেয়াল রাখবে এবং তা অতিক্রম করবে না। আরও কিছু বলব? আমি বললাম : বলুন। তিনি বললেন : দুনিয়াতে সংসারবিমুখ হয়ে থাকবে এবং আখেরাতের প্রতি আগ্রহী হবে। সবকিছুতে আল্লাহ্ তা'আলাকে সত্য জানবে, এতে তুমি মুক্তিপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। এ পর্যন্ত বলে তিনি চলে গেলেন। আমি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, ইনিই ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)।
এ রেওয়ায়েতে তাঁর বেহুঁশ হয়ে যাওয়া এবং উপদেশ দানের কথা চিন্তা কর। এতে তাঁর সংসারবিমুখতা ও প্রবল খোদাভীতি সম্পর্কে জানা যায়। এই ভীতি ও সংসারবিমুখতা আল্লাহ্র মারেফাত ব্যতীত অর্জিত হয় না। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন-
>“বান্দাদের মধ্যে আল্লাহকে তারাই ভয় করে, যারা আলেম তথা জ্ঞানী।”
ইমাম শাফেয়ী এই ভয় ও সংসারের প্রতি নির্লিপ্ততা ফেকাহ্ শাস্ত্রের যেহার, লেয়ান, সলম, ইজারা ইত্যাদি থেকে অর্জন করেননি; বরং কোরআন ও হাদীস থেকে নির্গত আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্রের মাধ্যমে লাভ করেছিলেন। কেননা সকল পূর্ববর্তী ও পরবর্তী দর্শনে কোরআন হাদীস পরিপূর্ণ। পরিপূর্ণ । তাঁর দার্শনিক কথাবার্তা থেকে জানা যাবে, তিনি অন্তরের রহস্য ও আখেরাত সম্পর্কে কতদূর ওয়াকিফহাল ছিলেন। একবার রিয়া কি, এই মর্মে জিজ্ঞাসিত হয়ে তিনি বিনা দ্বিধায় বললেন : রিয়া এক প্রকার ফেতনা, যা বৈষয়িক কামনা-বাসনা অন্তরে উপস্থাপিত করেছে। মন মন্দ কাজে উৎসাহী বিধায় আলেমগণ এর প্রতি আগ্রহী হয়েছে। ফলে তাদের আমল বরবাদ হয়ে গেছে। তিনি বললেন : যখন তুমি আমল করতে গিয়ে আত্মম্ভরিতার আশংকা কর, তখন ভেবে দেখো কার সন্তুষ্টির জন্যে তুমি আমল করছ। তুমি কোন্ সওয়াবের প্রতি আগ্রহ কর এবং কোন্ আযাবকে ভয় কর। তুমি কোন্ নিরাপত্তার জন্যে কৃতজ্ঞ এবং কোন্ বিপদকে স্মরণ কর। এসব বিষয়ের মধ্যে যে কোন একটি নিয়ে চিন্তাভাবনা করলেই তোমার আমল তোমার দৃষ্টিতে তুচ্ছ গণ্য হবে এবং তুমি আত্মম্ভরিতা থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। এ উক্তিতে রিয়ার স্বরূপ ও আত্মম্ভরিতার প্রতিকার লক্ষণীয়। এগুলো অন্তরের জন্য অনিষ্টকর বিষয়সমূহের অন্যতম।
ইমাম শাফেয়ী বলেন : যেব্যক্তি নিজের নফসকে হেফাযতে না রাখে, তার এলেম উপকারী হয় না। যেব্যক্তি এলেম দ্বারা আল্লাহর আনুগত্য করে, সে এলেমের রহস্য বুঝে। প্রত্যেক ব্যক্তির শত্রু মিত্র অবশ্যই থাকে। অতএব তুমি তাদের সাথেই থাক, যারা আল্লাহর আনুগত্যশীল।
বর্ণিত আছে, আবদুল কাহের ইবনে আবদুল আজীজ একজন সৎ ও পরহেযগার ব্যক্তি ছিলেন। তিনি পরহেযগারী সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ীকে বিভিন্ন প্রশ্ন করতেন। ইমাম শাফেয়ীও তাঁর কাছে যাতায়াত করতেন। একদিন তিনি ইমাম শাফেয়ীকে জিজ্ঞেস করলেন : সবর, ইমতেহান (পরীক্ষা) ও তমকীন্ (প্রতিষ্ঠা) এগুলোর মধ্যে কোন্‌টি উত্তম? তিনি বললেন : তমকীন পয়গম্বরগণের মর্তবা। এটা পরীক্ষার পরে অর্জিত হয়। সুতরাং পরীক্ষা হলে সবর হয় এবং সবরের পর তমকীন ও প্রতিষ্ঠা হয়। লক্ষ্য কর, আল্লাহ তাআলা প্রথমে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পরীক্ষা নিয়েছেন এবং পরে প্রতিষ্ঠা দান করেছেন। তদ্রূপ হযরত মূসা ও হযরত আইউব (আঃ)-এর প্রথমে পরীক্ষা নেয়া হয়েছে, এরপর তাঁদেরকে প্রতিষ্ঠা দান করা হয়েছে। হযরত সোলায়মান (আঃ)-এর বেলায় তেমনি প্রথমে পরীক্ষা এবং পরে প্রতিষ্ঠা ও রাজত্ব দান করা হয়েছে। অতএব তমকীন তথা প্রতিষ্ঠা হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ স্তর। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন :
>“এমনিভাবে আমি ইউসুফকে মিসরে প্রতিষ্ঠা দান করেছি।”
হযরত আইউব (আঃ)-এর ভীষণ পরীক্ষা ও প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে বলা হয়েছে
>“আমি তাঁকে তাঁর পত্নী ও তৎসহ আরও লোকদের দান করেছি। এটা আমার পক্ষ থেকে মেহেরবানী এবং এবাদতকারীদের জন্যে উপদেশ।”
ইমাম শাফেয়ীর এ জওয়াবে প্রতীয়মান হয়, কোরআনের রহস্য সম্পর্কে তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল এবং আল্লাহর পথের পথিকদের ‘মকামাত' সম্পর্কে তিনি যথেষ্ট ওয়াকিফহাল ছিলেন। এসব বিষয় আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত।
ইমাম শাফেয়ীকে কেউ জিজ্ঞেস করল : মানুষ কখন আলেম হয়?
তিনি বললেন : মানুষ যখন তার জানা জ্ঞানে পারদর্শী হয়ে অন্য জ্ঞান অন্বেষণ করে এবং যে বিষয় অর্জিত হয়নি, সে সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে, তখন সে আলেম হয়।
সেমতে জালিনূসকে কেউ জিজ্ঞেস করেছিল : আপনি যে এক রোগের জন্যে অনেকগুলো যৌথ উপাদান সম্বলিত ওষুধ লেখেন এর কারণ কি? জালিনূস বললেন : উদ্দেশ্য একই ওষুধ। এর তীব্র প্রভাব হ্রাস করার জন্য অন্য ওষুধ সাথে দেয়া হয়। কেননা, একক ওষুধ মারাত্মক হয়ে থাকে। এ ধরনের আরও অনেক উক্তি দ্বারা মারেফত জ্ঞানে ইমাম শাফেয়ীর উচ্চ মর্তবা বুঝা যায়।
ইমাম শাফেয়ী ফেকাহ্ শাস্ত্র ও ফেকাহ্ শাস্ত্রের বাহাস দ্বারা আল্লাহ্ তাআলার সন্তুষ্টি কামনা করতেন। নিম্নোক্ত রেওয়ায়েতগুলো এর প্রমাণ।
তিনি বলেন : আমি চাই মানুষ এই শাস্ত্র দ্বারা উপকৃত হোক এবং এর কোন কৃতিত্ব আমার দিকে সম্বন্ধযুক্ত না হোক।
এতে জানা গেল, এলেমের অনিষ্ট ও সুখ্যাতি অর্জনের কুফল সম্পর্কে তিনি যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। তিনি এ ব্যাপারে একান্তভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত করতেন এবং খ্যাতির আকর্ষণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতেন।
তিনি বলেন : আমি কখনও কারও সাথে তার ভ্রান্তি কামনা করে মুনাযারা তথা বিতর্ক করিনি। কারও সাথে আলোচনা করার সময় আমি কামনা করেছি যে, সে তওফীক, সততা ও সাহায্যপ্রাপ্ত হোক এবং তার গুণাবলী সম্পর্কে যে গ্রন্থ রচনা করেছেন, বর্ণিত অধিকাংশ বিষয় সেখান থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে।
হযরত ইমাম মালেক (রহঃ)--
হযরত ইমাম মালেক (রহঃ)-ও বর্ণিত পাঁচটি গুণে গুণান্বিত ছিলেন। তাঁকে কেউ প্রশ্ন করল : হে মালেক! এলেম অন্বেষণ করার ব্যাপারে আপনি কি বলেন? তিনি বললেন : ভাল। বরং যেব্যক্তি (এলেমের জন্যে) সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত তোমার সঙ্গ ত্যাগ করে না, তুমিও তার সঙ্গ ত্যাগ করো না। তিনি দ্বীনের প্রতি অতিশয় সম্মান প্রদর্শন করতেন। এমনকি যখন হাদীস বর্ণনা করার ইচ্ছা করতেন, তখন প্রথমে ওযু করতেন, বিছানায় বসে দাড়িতে চিরুনি করতেন, সুগন্ধি ব্যবহার করতেন, অতঃপর গাম্ভীর্যের সাথে হাদীস বর্ণনা করতেন। লোকেরা এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন : আমি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর হাদীসের সম্মান করতে চাই। তিনি বলেন: এলেম একটি নূর। আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা তা দান করেন। অধিক রেওয়ায়েত দ্বারা তা অর্জিত হয় না। এলেমের প্রতি এই সম্মান প্রদর্শন একথাই প্রমাণ করে, তাঁর মধ্যে আল্লাহর মহিমার মারেফত অত্যন্ত প্রবল ছিল।
এলেম দ্বারা ইমাম মালেকের উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। এটা তাঁর এ উক্তি থেকে জানা যায়, দ্বীনের ব্যাপারে বিতর্ক করা অর্থহীন। তাঁর সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ীর এ উক্তিও এর প্রমাণ।
তিনি বলেন, আমি যখন ইমাম মালেকের কাছে উপস্থিত হই তখন তাঁকে ৪৮টি মাসআলা জিজ্ঞেস করা হয়। তিনি ৩২টি প্রশ্নের জওয়াবে বললেন : আমি জানি না। যেব্যক্তির এলেম দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কিছু উদ্দেশ্য থাকে, সে কখনও এমনভাবে অজ্ঞতা স্বীকার করতে সম্মত হয় না। এ জন্যেই ইমাম শাফেয়ী বলেন : আলেমদের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে বলতে হয়, ইমাম মালেক তাঁদের মধ্যে একটি উজ্জ্বল তারকা। ইমাম মালেকের চেয়ে বেশী আমার প্রতি কারও অনুগ্রহ হয়নি।
বর্ণিত আছে, আবু জাফর মনসুর ইমাম মালেককে জবরদস্তি তালাকের হাদীস বর্ণনা করতে নিষেধ করেছিলেন। এরপর এক ব্যক্তিকে এই প্রকার তালাকের মাসআলা জিজ্ঞেস করতে পাঠিয়েছিলেন। লোকটি মাসআলা জিজ্ঞেস করলে তিনি সকলের সামনে বলে দিলেন : যেব্যক্তিকে জবরদস্তিমূলকভাবে তালাক দিতে বাধ্য করা হয়, তার তালাক হয় না। এতে আবু জাফর তাঁকে বেত্রাঘাত করেন, কিন্তু তিনি হাদীসের বর্ণনা বর্জন করেননি।
ইমাম মালেক বলেন : যেব্যক্তি কথায় পাকা- মিথ্যা বলে না, তার বুদ্ধি তার জন্যে কল্যাণকর হয়ে থাকে। বৃদ্ধ বয়সে তার বুদ্ধিতে ত্রুটি দেখা দেয় না। সংসারের প্রতি ইমাম মালেকের নির্লিপ্ততা নিম্নোক্ত রেওয়ায়েত দ্বারা জানা যায়
আমিরুল মুমিনীন মাহদী ইমাম মালেককে জিজ্ঞেস করেন : আপনার কোন গৃহ আছে কি? তিনি বললেন : না, কিন্তু এ সম্পর্কে আমি আপনাকে একটি হাদীস শুনাতে চাই। আমি রবিয়া ইবনে আবী আবদুর রহমানকে বলতে শুনেছি— মানুষের পরিবার-পরিজনই তার গৃহ।
খলীফা হারুনুর রশীদ তাঁকে জিজ্ঞেস করেন : আপনার কোন গৃহ আছে কি? তিনি বললেন- না। খলীফা তাঁকে একটি বাড়ী ক্রয় করার জন্যে তিন হাজার দীনার দিলেন। তিনি তা রেখে দিলেন, ব্যয় করলেন না। অতঃপর খলীফা মদীনা মুনাওয়ারা থেকে রওয়ানা হওয়ার সময় ইমাম মালেককে বললেন : আপনিও আমাদের সাথে চলুন। আমি আপনার হাদীস গ্রন্থ মুয়াত্তার প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করতে চাই, যেমন হযরত ওসমান (রাঃ) কোরআনের প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করেছিলেন। ইমাম মালেক জওয়াবে বললেন, মুয়াত্তার প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করার কোন প্রয়োজন নেই। কেননা, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওফাতের পর তাঁর সাহাবীগণ বিভিন্ন শহরে পৌছে গেছেন এবং হাদীস বর্ণনা করেছেন। ফলে প্রত্যেক শহরের অধিবাসীদের কাছে হাদীস বিদ্যমান রয়েছে।
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন
>“আমার উম্মতের মতবিরোধ রহমতস্বরূপ।”
এখন রইল আপনার সাথে যাওয়ার বিষয়টি। এটাও হতে পারে না। কেননা, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
>“যদি মদীনাবাসীরা বুঝে, তবে মদীনা তাদের জন্যে উত্তম।”
তিনি বলেন
>“মদীনা তার ময়লা এমনভাবে দূর করে দেয়, যেমন কর্মকারের
রেত লোহার ময়লা দূর করে দেয়।”
আপনার দীনার যেমন দিয়েছিলেন তেমনি রাখা আছে। ইচ্ছা হলে নিয়ে যান, ইচ্ছা হলে রেখে যান। অর্থাৎ, আপনি আমাকে মদীনা ত্যাগ করাতে চান এই বলে যে, আপনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আমি দীনারকে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর মদীনার উপর অগ্রাধিকার দেই না। এটা ছিল ইমাম মালেকের সংসারবিমুখতা।
যখন তাঁর এলেম ও শিষ্যদের চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ার কারণে সব দিক থেকে অর্থ-সম্পদ তাঁর কাছে আসতে থাকে, তখন তিনি সমুদয় অর্থ সম্পদ সৎকাজে ব্যয় করে দিতেন। এই দানশীলতা থেকে দুনিয়ার প্রতি তাঁর অনাসক্তি সম্পর্কে জানা যায়। মানুষের কাছে অর্থ সম্পদ না থাকা সংসারবিমুখতা নয়; বরং অর্থ সম্পদের প্রতি অন্তরের বেপরওয়া ভাবকেই বলা হয় সংসারবিমুখতা। হযরত সোলায়মান (আঃ) বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী হয়েও সংসারে নির্লিপ্ত ছিলেন।
ইমাম মালেক দুনিয়াকে হেয় মনে করতেন- একথা ইমাম শাফেয়ী বর্ণিত নিম্নোক্ত রেওয়ায়েত থেকে জানা যায়। তিনি বলেন : আমি ইমাম মালেকের দরজায় খোরাসানী ঘোড়া ও মিসরীয় খচ্চরের এমন উৎকৃষ্ট একটি পাল দেখলাম, যা আমি কোনদিন দেখিনি। আমি তাঁর খেদমতে আরজ করলাম, কি চমৎকার পাল! তিনি বললেন : আবু আবদুল্লাহ! এ পাল আমার পক্ষ থেকে তোমাকে উপঢৌকন। আমি বললাম : আপনি নিজে সওয়ার হওয়ার জন্যে একটি রেখে দিন। তিনি বললেনঃ আমি আল্লাহ তাআলার কাছে লজ্জাবোধ করি, যে মাটিতে তাঁর পয়গম্বর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) শায়িত আছেন, সে মাটি আমার ঘোড়া পদদলিত করবে? এ রেওয়ায়েতে ইমাম মালেকের দানশীলতা লক্ষণীয়। তিনি সকল ঘোড়া ও খচ্চর একযোগে দান করেছিলেন। এরপর মদীনা তাইয়্যেবার পবিত্র মাটির সম্মানের কথাও চিন্তা করা
ইমাম মালেক বর্ণিত নিম্নোক্ত কাহিনী দ্বারা প্রমাণিত হয়, তাঁর এলেমের উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন ও দুনিয়াকে তুচ্ছ জ্ঞান করা।
তিনি বলেন : আমি খলীফা হারুনুর রশীদের কাছে গেলে তিনি বললেন : আপনি আমার কাছে আসা যাওয়া করুন। যাতে আমার ছেলেরা আপনার কাছে মুয়াত্তার হাদীসসমূহ শুনতে পারে। আমি বললাম : আল্লাহ আপনাকে উন্নতি দান করুন। এই এলেম আপনাদের নিকট থেকে বের হয়েছে। আপনারা এর সম্মান করলে সে সম্মানিত হবে। আর যদি আপনারা এর অবমাননা করেন তবে এ এলেম লাঞ্ছিত হয়ে যাবে। মানুষ এলেমের কাছে যায়। এলেম মানুষের কাছে যায় না। খলীফা বললেন : আপনি ঠিকই বলছেন। অতঃপর খলীফা ছেলেদেরকে মসজিদে গিয়ে সকলের সাথে মুয়াত্তা শ্রবণ করার আদেশ দিলেন।

হযরত ইমাম আবু হানীফা কুফী (রহঃ)
হযরত ইমাম আবু হানীফা কুফী (রহঃ)-ও আবেদ, যাহেদ, আরেফ বিল্লাহ, আল্লাহভীরু এবং এলেমের মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি প্রত্যাশী ছিলেন। ইবনে মোবারক বর্ণিত রেওয়ায়েতে তাঁর সাধারণ এবাদতের অবস্থা জানা যায়। তিনি শালীনতাসম্পন্ন ছিলেন এবং অত্যধিক নামায পড়তেন। আসাদ ইবনে আবী সোলায়মান বর্ণনা করেন- তিনি সমস্ত রাত্রি এবাদত করতেন। বর্ণিত আছে, তিনি প্রথমে অর্ধ রাত্রি এবাদত করতেন। এক দিন পথ চলার সময় এক ব্যক্তি তাঁর দিকে ইশারা করল এবং অন্য একজন বলল : ইনি সমস্ত রাত্রি এবাদত করেন। এই মন্তব্য শুনার পর থেকে ইমাম সাহেব সমস্ত রাত্রি এবাদত শুরু করে দেন এবং বলেন : আমি আল্লাহর কাছে লজ্জাবোধ করি এ জন্যে যে, আমি তাঁর যতটুকু এবাদত করি না, মানুষ ততটুকু বলাবলি করে।
নিম্নোক্ত রেওয়ায়েত দ্বারা ইমাম সাহেবের সংসারবিমুখতা প্রমাণিত হয়। রবী ইবনে আসেম বলেন : ইয়াযীদ ইবনে আমর ইবনে হুবায়রার নির্দেশক্রমে আমি ইমাম সাহেবকে তাঁর কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি ইমাম সাহেবকে বায়তুল মালের প্রশাসক নিযুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তিনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে তিনি ইমাম সাহেবকে বিশটি বেত্রাঘাতের আদেশ দেন এবং তা পালিত হয়। লক্ষণীয়, তিনি বেত্রাঘাত সহ্য করলেন বটে, কিন্তু প্রশাসক হতে স্বীকৃত হলেন না। হাকাম ইবনে হেশাম সকফী বলেন : সিরিয়ার জনৈক ব্যক্তি ইমাম সাহেব সম্পর্কে আমার কাছে বর্ণনা করল, তিনি মানুষের মধ্যে সর্বাধিক বিশ্বস্ত ছিলেন। বাদশাহ্ সরকারী ধনভাণ্ডারের চাবি তাঁর হাতে সমর্পণ করতে চাইলেন এবং তা গ্রহণ না করলে তাঁকে বেত্রদণ্ড দেয়া হবে বলে ঘোষণা করলেন। কিন্তু ইমাম সাহেব শেষ পর্যন্ত দুনিয়ার শাস্তি মাথা পেতে নিলেন এবং আল্লাহর আযাব ভোগ করার দুঃসাহস করলেন না।
ইবনে মোবারকের সামনে আবু হানীফার প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে তিনি বললেন : তোমরা সে ব্যক্তির কথা কি বলছ, যাঁর সামনে দুনিয়া পেশ করা হয়েছে, কিন্তু তিনি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
মুহাম্মদ ইবনে শুজা ইমাম সাহেবের জনৈক শিষ্যের উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেন, একবার ইমাম সাহেবকে কেউ বলল : আমীরুল মুমিনীন আবু জাফর মনসুর আপনাকে দশ হাজার দেরহাম দিতে আদেশ করেছেন। ইমাম সাহেব সম্মত হলেন। যেদিন এই দেরহাম আসার কথা ছিল, সেদিন ইমাম সাহেব ফজরের নামায পড়ে মুখ ঢেকে নিলেন এবং কারও সাথে কোন কথা বললেন না। খলীফার দূত হাসান ইবনে কাহতাবা যখন সে অর্থ নিয়ে তাঁর কাছে উপস্থিত হল, তখনও তিনি কিছুই বললেন না। উপস্থিত এক ব্যক্তি দূতকে জানাল, তিনি আমাদের সাথেও কম কথাই বলেন; অর্থাৎ কথা না বলাই তাঁর অভ্যাস। আপনি এই অর্থ এই থলের মধ্যে ভরে গৃহের কোণে রেখে দিন (তাই করা হল)। অতঃপর দীর্ঘ দিন পরে ইমাম সাহেব যখন তাঁর বিষয়-সম্পত্তির ওসিয়ত করেন, তখন পুত্রকে বললেন : আমার মৃত্যু হলে দাফনের পর এ থলেটি হাসান ইবনে কাাবার কাছে নিয়ে যাবে এবং বলবে : এটা আপনার আমানত, যা আপনি আবু হানীফার কাছে সোপর্দ করেছিলেন। ইন্তেকালের পর তাঁর পুত্র ওসিয়ত অনুযায়ী থলেটি পৌঁছে দিলে হাসান ইবনে কাাবা বললেন : আপনার পিতার প্রতি আল্লাহর রহমত হোক। তিনি ধর্ম-কর্মের প্রতি অত্যধিক আকৃষ্ট ছিলেন।
বর্ণিত আছে, ইমাম সাহেবকে বিচারকের পদ গ্রহণ করতে আহ্বান করা হলে তিনি বললেন : এ বিষয়ের যোগ্যতা আমার মধ্যে নেই। লোকেরা জিজ্ঞেস করল : কেন? তিনি বললেন : যদি আমি সত্যবাদী হই, তবে তো বাস্তবিকই এ পদের যোগ্য নই। পক্ষান্তরে যদি মিথ্যাবাদী হই তবে মিথ্যাবাদী কখনও বিচারকের পদ গ্রহণ করার জন্যে উপযুক্ত হতে পারে না।
ইমাম সাহেব যে আখেরাত শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ ছিলেন, ধর্মীয় বিষয়াদিতে ওয়াকিফহাল ছিলেন এবং আরেফ বিল্লাহ ছিলেন, তা এ থেকে জানা যায় যে, তিনি আল্লাহকে অত্যধিক ভয় করতেন এবং সংসারে নির্লিপ্ত ছিলেন। সেমতে ইবনে জুরাইজ (রহঃ) বলেন : আমি অবগত হয়েছি, তোমাদের এই নো'মান ইবনে সাবেত কুফী আল্লাহ্ তা'আলাকে অত্যন্ত ভয় করেন। শুরাইক নখয়ী বলেন : ইমাম আযম খুব চুপচাপ থাকতেন, চিন্তাভাবনায় ডুবে থাকতেন এবং মানুষের সাথে কম কথা
বলতেন।
এসব বিষয় উজ্জ্বল প্রমাণ যে, তিনি এলমে বাতেন ও ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদিতে মশগুল থাকতেন। কারণ, যে চুপচাপ থাকা ও সংসারবিমুখতা প্রাপ্ত হয়, সে জ্ঞানে পরাকাষ্ঠা প্রাপ্ত হয়। এ হচ্ছে ইমামত্রয়ের অবস্থার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা।
হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ও সুফিয়ান সওরীর অবস্থা এই যে, তাঁদের অনুসারী পূর্বোক্ত ইমামত্রয়ের অনুসারীদের তুলনায় কম, কিন্তু তাঁরা পরহেযগারী ও সংসারবিমুখতায় অধিক প্রসিদ্ধ। আলোচ্য গ্রন্থ তাঁদের উভয়ের কর্ম ও উক্তিতে পরিপূর্ণ। তাই এ ব্যাপারে বিশদ বর্ণনার কোন প্রয়োজন নেই।
এখন তুমি ইমামত্রয়ের সীরাত সম্পর্কে চিন্তা কর, এসব অবস্থা, কর্ম ও উক্তি কিসের ফল। তাঁরা যে সংসারবিমুখ ছিলেন এবং খাঁটিভাবে খোদাপ্রেমিক ছিলেন, এটা কি ফেকাহর শাখাগত মাসআলা তথা সলম, ইজারা, যেহার, ঈলা ও লেয়ান জানার ফল হতে পারে, না অন্য শাস্ত্র দ্বারা অর্জিত, যা ফেকাহ্ অপেক্ষা উত্তম ও শ্রেষ্ঠ? আরও চিন্তা কর, যারা নিজেদেরকে তাঁদের অনুসারী বলে দাবী করে, তারা সত্যবাদী না মিথ্যাবাদী?



জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (১৫) তিন প্রকার বিষয় দ্বারা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জিত হতে পারে



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ১৫)

এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

তিন প্রকার বিষয় দ্বারা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জিত হতে পারে--
(১) শুধু এলেম এবং তা হচ্ছে এলমে মুকাশাফা। (২) শুধু আমল; যেমন শাসনকর্তার ন্যায়বিচার করা এবং মানুষকে শৃংখলায় রাখা। (৩) এলেম ও আমলের সমন্বয়ে গঠিত শাস্ত্রই হচ্ছে আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্র। এই শাস্ত্রজ্ঞ আলেম ও আমেল উভয়টি হয়ে থাকে। এখন তুমি নিজেই পছন্দ কর কেয়ামতে আল্লাহ্'র সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত আলেমদের অন্তর্ভুক্ত হবে, না আমেলদের, না উভয় দলের অন্তর্ভুক্ত থাকবে? নিছক সুখ্যাতির অনুসরণ করার তুলনায় এ কাজটি তোমার জন্যে অধিক জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ। জনৈক কবি বলেন : যা দেখ এবং শুন, তা ত্যাগ কর। সূর্য সামনে থাকতে শনি গ্রহের কি প্রয়োজন? এখানে আমরা পূর্ববর্তী ফেকাহবিদগণের কিছু অবস্থা লিপিবদ্ধ করছি। এতে জানা যাবে, যারা নিজেদেরকে তাঁদের মাযহাবের অনুসারী বলে দাবী করে, তারা তাঁদের প্রতি জুলুম করে এবং কিয়ামতে তারাই হবে এই ফেকাবিদগণের বড় দুশমন। কেননা, স্ব স্ব এলেম দ্বারা আল্লাহ্ পাকের সন্তুষ্টি ছাড়া পূর্ববর্তী ফেকাহবিদগণের অন্য কোন লক্ষ্য ছিল না। তাঁদের অবস্থার মধ্যে আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্রজ্ঞদের লক্ষণ পরিদৃষ্ট হয়েছে। সেমতে আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্রজ্ঞদের লক্ষণ প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়ে থাকে, তাঁরা কেবল ফেকাশাস্ত্রেই মশগুল ছিলেন না; বরং আধ্যাত্ম্য জ্ঞানেরও চর্চা করতেন। এটা ঠিক, এ জ্ঞান সম্পর্কে তাঁরা কোন কিতাব লেখেননি এবং কাউকে এর সবকও দেননি। সাহাবায়ে কেরাম যে কারণে ফেকাহশাস্ত্র সম্পর্কে কোন কিতাব লেখেননি এবং দরস দেননি, সে একই কারণে ফেকাবিদগণও তা করেননি। অথচ ফতোয়া শাস্ত্রে সব সাহাবীই এক একজন ফেকাবিদ ছিলেন।

পরবর্তী পর্ব
পূর্বের ফেকাবিদ ও এযুগের ফেকাবিদের পার্থক্য


জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (১৪) কালাম শাস্ত্র ও দর্শনশাস্ত্র



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ১৪)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
কালাম শাস্ত্র ও দর্শনশাস্ত্র-
আমরা জ্ঞানের প্রকারসমূহের মধ্যে কালাম শাস্ত্র ও দর্শনশাস্ত্রের উল্লেখ করিনি এবং এগুলো ভাল কি মন্দ তাও বর্ণনা করিনি। এর কারণ, কালাম শাস্ত্রের যে সকল উপকারিতার প্রমাণ পাওয়া যায়, সেগুলোর সারমর্ম কোরআন ও হাদীসে বিদ্যমান রয়েছে। যেসকল বিষয় কোরআন ও হাদীস বহির্ভূত, সেগুলো হয় বেদআতের অন্তর্ভুক্ত মন্দ বিবাদ বিসম্বাদ, না হয় বিভিন্ন ফেরকার বিরোধ সম্পর্কিত দীর্ঘ বক্তৃতা বিবৃতি। সুতরাং এগুলো সব বাতিল ও অর্থহীন বিষয়। সুস্থ হৃদয় এগুলো দূষণীয় মনে করে এবং সত্যপন্থী কান এগুলো শ্রবণ করতে সম্মত নয়। আর কিছু বিষয় রয়েছে যা দ্বীনের সাথে সম্পর্ক রাখে না এবং সাহাবায়ে কেরামের যুগে তার কোন অস্তিত্বই ছিল না। তখন এসব বিষয় নিয়ে চিন্তা করা বেদআত বলে গণ্য হত। কিন্তু এখন নীতি বদলে গেছে। কারণ, এ ধরনের বেদআত অনেক হয়ে গেছে, যা কোরআন ও হাদীসের দাবীর প্রতি বিমুখ করে। এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটেছে যারা বেদআতের সন্দেহকে মসৃণ করেছে এবং এ সম্পর্কে বক্তৃতা রচনা করেছে। ফলে এসব বিষয় নিয়ে চিন্তা করা প্রথমে নিষিদ্ধ থাকলেও প্রয়োজনের খাতিরে এখন জায়েয; বরং ফরযে কেফায়া হয়ে গেছে।
দর্শনশাস্ত্র
দর্শনশাস্ত্র কোন আলাদা শাস্ত্র নয়; বরং এর চারটি অংশ রয়েছে -
(১) জ্যামিতি ও অংক। পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে, এ উভয়টিই জায়েয। যার সম্পর্কে আশংকা হয় যে, এগুলো পাঠ করলে খারাপ শাস্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়বে, তাকে ছাড়া অন্য কাউকে এগুলো পাঠ করতে নিষেধ করা যাবে না। যার সম্পর্কে আশংকা, তাকে নিষেধ করা দরকার। কারণ, এসব বিষয়ে অধিক পারদর্শী হলে মানুষ বেদআতের দিকে ঝুঁকে পড়ে। অতএব যাদের ঈমান দুর্বল, তাদেরকে উভয় বিষয় পাঠ করা থেকে বাঁচানো উচিত । যেমন, ছোট শিশুকে নদীর কিনারে দাঁড়াতে দেয়া হয় না অথবা নও-মুসলিমকে কাফেরদের সাথে মেলামেশা করা থেকে দূরে রাখা হয়. যাতে তার উপর সংসর্গের প্রভাব না পড়ে।
(২) দ্বিতীয় অংশ ফালসাফা (দর্শন)-এর সাথে সম্পর্কযুক্ত। এতে প্রমাণের অবস্থা ও শর্ত এবং সংজ্ঞার কারণ ও শর্ত বর্ণিত হয়। উভয়টিই কালাম শাস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত।
(৩) এলমে ইলাহিয়াত- অর্থাৎ আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলীর বর্ণনা। এটাও কালাম শাস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত। দার্শনিকরা এক্ষেত্রে কোন নতুন ধরনের জ্ঞান আবিষ্কার করেননি; বরং তাদের মাযহাব আলাদা। তন্মধ্যে কতক কুফর এবং কতক বেদআত। মুতাযেলী হয়ে যাওয়া যেমন আলাদা শাস্ত্র নয়; বরং কালাম শাস্ত্রীদেরই কতক লোক যুক্তি-প্রমাণের অবতারণা করে বাতিল মাযহাব সৃষ্টি করে নিয়েছে, দার্শনিকদের অবস্থাও তেমনি।
(৪) পদার্থবিদ্যা- এর কতক অংশ শরীয়ত বিরোধী। এটা মূলতঃ জ্ঞানই নয় যে, জ্ঞানের প্রকারসমূহের মধ্যে বর্ণনা করা যাবে; বরং এটা মূর্খতা। আর কতক অংশে পদার্থের গুণাবলী, বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন এবং রূপান্তরণের বিষয় আলোচিত হয়। এর অবস্থা চিকিৎসা শাস্ত্রের মত। পার্থক্য এই যে, চিকিৎসকের দৃষ্টি রোগ ও সুস্থতার দিক দিয়ে বিশেষভাবে মানব দেহের উপর নিবদ্ধ থাকে এবং পদার্থবিদদের দৃষ্টি পদার্থের মধ্যে পরিবর্তন ও গতিশীলতার দিকে নিমগ্ন থাকে। কিন্তু চিকিৎসাশাস্ত্র পদার্থবিদ্যার তুলনায় উত্তম। কারণ, এর প্রয়োজন আছে এবং পদার্থবিদ্যার তেমন প্রয়োজন পড়ে না।

সারকথা, কালাম শাস্ত্র ফরযে কেফায়া জ্ঞানসমূহের অন্যতম। এর ফলে সর্বসাধারণের অন্তর বেদআতীদের চিন্তাধারা থেকে মুক্তি পায়। বেদআত পয়দা হওয়ার কারণে এ শাস্ত্র ওয়াজেব হয়েছে। যেমন হজ্জের পথে বেদুঈনদের জুলুম ও রাহাজানির কারণে রক্ষীর আশ্রয় নেয়া জরুরী হয়ে পড়েছে। যদি বেদুঈনরা তাদের অত্যাচার বন্ধ করে দেয়, তবে হজ্জের শর্তসমূহের মধ্যে সাহায্য গ্রহণ করার শর্ত বাদ পড়ে যাবে। অনুরূপ বেদআতীরা যদি তাদের বাজে বকা বন্ধ করে দেয়, তবে সাহাবায়ে কেরামের সময়ে যতটুকু ছিল, এর বেশী কালাম শাস্ত্রের প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকবে না।
অতএব কালাম শাস্ত্রীদের জানা উচিত, ধর্মে তাদের মর্তবা হজ্জের পথে রক্ষীদের মর্তবারই মত। যদি রক্ষী রক্ষা কাজ ছাড়া অন্য কিছু না করে, তবে সে হাজী হবে না। হজ্জের ক্রিয়াকর্ম আদায় করলেই কেবল হাজী হবে। এমনিভাবে যদি কালামশাস্ত্রী কেবল বিতর্ক ও বেদআত দমনেই মশগুল থাকে এবং আখেরাতের পথ অতিক্রম না করে, আত্মার উন্নতি ও সংশোধনে নিয়োজিত না হয়, তবে সে কখনও আলেমে দ্বীনগণের মধ্যে গণ্য হবে না। তার কাছে আকীদা অন্তর ও মুখের বাহ্যিক আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত। হাঁ, সর্বসাধারণ থেকে তার তফাৎ এতটুকু হবে যে, সে বেদআতীদের সাথে লড়াই করতে পারে এবং সাধারণ লোকের হেফাযত করে। কিন্তু আল্লাহ, তাঁর সিফাত ও কর্ম এবং এলমে মুকাশাফায় বর্ণিত বিষয়সমূহের পরিচয় কালাম শাস্ত্রের দ্বারা অর্জিত হয় না । বরং এ শাস্ত্র যে এগুলোর অন্তরায় তাতেও আশ্চর্যের কিছু নেই। একমাত্র মুজাহাদা তথা সাধনার দ্বারাই এসব বিষয় অর্জন করা যায়। মুজাহাদাকে আল্লাহ্ তা'আলা হেদায়েতের মুখবন্ধ সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ-
>“যারা আমার পথে সাধনা করে, অবশ্যই আমি তাদেরকে আমার পথ প্রদর্শন করব। নিশ্চয় আল্লাহ্ সৎকর্মপরায়ণদের সাথে রয়েছেন।”
এখন আমি কালামশাস্ত্রীর সংজ্ঞাও বর্ণনা করলাম যে, সে সর্বসাধারণের বিশ্বাসকে বেদআতীদের যুক্তিজট থেকে মুক্ত রাখে, যেমন রক্ষী হাজীদেরকে বেদুঈনদের লুণ্ঠন থেকে রক্ষা করে।
আমি ফেকাহবিদের সংজ্ঞা এই বর্ণনা করেছি যে, সে সেসব আইন জানে, যদ্দ্বারা বাদশাহ্ একে অপরের উপর সীমালংঘন দমন করতে পারে। ধর্ম শাস্ত্রের তুলনায় এই উভয় কাজ নিম্নস্তরের। অথচ গুণী আলেম বলে যাঁরা প্রসিদ্ধ, তাঁরা হলেন ফেকাহবিদ ও কালামশাস্ত্রী। তাঁরা আল্লাহ তা'আলার কাছে শ্রেষ্ঠ।
এখন যদি কেউ প্রশ্ন করে, আপনি ধর্ম শাস্ত্রের সাথে তুলনা করে এই আলেমগণকে নিম্নস্তরের বলেন কেন? তবে এর জওয়াব এই যে, যেব্যক্তি মানুষের আচার-আচরণ দেখে সত্যের পরিচয় লাভ করে, সে পথভ্রষ্টতার অরণ্যে উদভ্রান্ত হয়ে ফিরে। প্রথমে সত্য জানা দরকার। এর পর মানুষ চেনা উচিত, যদি সে সত্য পথের পথিক হয়। আর যদি তুমি অনুসরণ করেই তুষ্ট থাক এবং মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের প্রসিদ্ধ স্তরের প্রতিই দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখ, তবে সাহাবায়ে কেরামের অবস্থা ও উচ্চ মর্তবা থেকে গাফেল হয়ো না। যাদের কথা তুমি বল, তারা সবাই এ ব্যাপারে একমত যে, সাহাবায়ে কেরাম সর্বশ্রেষ্ঠ। দ্বীনের ব্যাপারে কেউ তাঁদের মত চলতে পারে না, এমনকি তাঁদের কাছেও ঘেঁষতে পারে না। অথচ তাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব কালাম ও ফেকাহ শাস্ত্রের কারণে ছিল না; বরং আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্র ও তার পথ অবলম্বনের কারণে ছিল।
হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর যে শ্রেষ্ঠত্ব অন্যদের উপর ছিল, তা বেশী রোযা রাখা, বেশী নামায পড়া এবং বহু হাদীস রেওয়ায়েতের কারণে ছিল না, ফতোয়া দান ও কালাম শাস্ত্রের দিক দিয়েও ছিল না; বরং সে বিষয়ের দিক দিয়ে ছিল, যা তাঁর বক্ষে প্রবিষ্ট ছিল। তোমার সে রহস্যের অনুসন্ধানে আগ্রহী হওয়া উচিত। এটাই উৎকৃষ্ট ও গুপ্ত ভান্ডার বিশেষ।
যাকে সাধারণ লোকজন বড় মনে করে এবং সম্মান করে, তাকে পরিত্যাগ কর। কেননা, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হাজারো সাহাবী দুনিয়াতে রেখে গেছেন। তাঁরা আল্লাহর দেয়া জ্ঞানে জ্ঞানী ছিলেন। তাঁদের প্রশংসা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিজে করেছেন। তাঁদের কেউ কালাম শাস্ত্র সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ছিলেন না। দশ জনের কিছু বেশী সংখ্যক সাহাবী ছাড়া কেউ নিজেকে ফতোয়া দানের কাজে নিয়োজিত করেননি। হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) সাহাবীগণের অন্যতম ছিলেন। তাঁর কাছে কেউ ফতোয়া জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন : “অমুক শাসনকর্তার কাছে যাও। সে এ কাজ নিজের দায়িত্বে গ্রহণ করেছে। এ প্রশ্নটি তার কাছে রাখ।” এতে ইঙ্গিত ছিল, মোকদ্দমা ও বিধিবিধান সম্পর্কে ফতোয়া দেয়া প্রশাসনের অন্তর্ভুক্ত।
হযরত ওমর (রাঃ)-এর ওফাতের পর হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বললেন : এলেমের দশ ভাগের নয় ভাগ তিরোহিত হয়ে গেছে। লোকেরা বলল : আমাদের মধ্যে বড় বড় সাহাবী বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও আপনি একথা বলছেন কেন? তিনি বললেন : আমার উদ্দেশ্য ফতোয়া ও বিধানের এলেম নয়- আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কিত এলেম উদ্দেশ্য। হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) কি কালাম শাস্ত্র ইত্যাদি বুঝিয়েছিলেন? যদি না বুঝিয়ে থাকেন, তবে তুমি সে এলেমের মারেফত হাসিল করতে আগ্রহ কর না কেন, যার দশ ভাগের নয় ভাগ হযরত ওমরের ওফাতের কারণে তিরোহিত হয়ে গিয়েছিল? অথচ হযরত ওমর (রাঃ) কালাম ও বিতর্কের দরজা বন্ধ করেন। কেউ তাঁর সামনে কোরআনের দু'আয়াতের পরস্পর বিরোধিতার প্রশ্ন উত্থাপন করলে তিনি তাকে দোররা মারতেন এবং তার সাথে মেলামেশা করতে মানুষকে নিষেধ করে দিতেন।
আলেমদের মধ্যে ফেকাহবিদ কালামশাস্ত্রীরা সমধিক প্রসিদ্ধ-
আলেমদের মধ্যে ফেকাহবিদ কালামশাস্ত্রীরা সমধিক প্রসিদ্ধ একথার জওয়াব এই যে, যে বিষয় দ্বারা আল্লাহ তা'আলার কাছে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হয় এবং যার দ্বারা মানুষের মধ্যে প্রসিদ্ধি লাভ করা যায়, তা অন্য জিনিস। সেমতে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর প্রসিদ্ধি ছিল খেলাফতের দিক দিয়ে এবং শ্রেষ্ঠত্ব ছিল সেই রহস্যের কারণে যা তাঁর অন্তরে রক্ষিত ছিল। অনুরূপভাবে হযরত ওমর (রাঃ)-এর প্রসিদ্ধি ছিল রাজনীতির কারণে এবং শ্রেষ্ঠত্ব ছিল সে এলেমের দিক দিয়ে, যার দশ ভাগের নয় ভাগ তাঁর মৃত্যুর ফলে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর লক্ষ্য ছিল আল্লাহ তাআলার নৈকট্য এবং জনগণের প্রতি ন্যায়বিচার ও স্নেহ মমতা। এদিক দিয়ে তাঁর মাহাত্ম্য ছিল অনন্য । এ বিষয়টি তাঁর অন্তরে লুক্কায়িত ছিল । তাঁর অন্যান্য বাহ্যিক ক্রিযয়াকর্ম তো অন্য লোকদের দ্বারাও সম্পাদিত হওয়া সম্ভবপর ছিল, যারা জাঁকজমক, সুখ্যাতি ও নামযশ প্রত্যাশী।
মোট কথা, প্রসিদ্ধি ক্ষতিকর বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত আর শ্রেষ্ঠত্ব গোপন বিষয়ের আওতাভুক্ত, যা কেউ অবগত হতে পারে না। অতএব ফেকাহ ও কালামবিদ যথাক্রমে শাসক ও বিচারকের ন্যায়। তারা কয়েক ধরনের। তাদের কেউ আপন এলেম ও ফতোয়া দ্বারা আল্লাহ্'র সন্তুষ্টি কামনা করে এবং রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর তরীকাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়; নামযশ ও সুখ্যাতি তাদের কাম্য হয় না। আল্লাহ্ তাআলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। আল্লাহ্ তাআলার কাছে তাদের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ, তারা এলেম অনুযায়ী আমল করে এবং ফতোয়া ও দলীল দ্বারা আল্লাহ তাআলার সত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করে। কেননা, প্রত্যেক এলেমই আমল, কিন্তু প্রত্যেক আমল এলেম নয়। চিকিৎসকও তার এলেম দ্বারা আল্লাহ্'র নৈকট্য লাভে সক্ষম। সে তার এলেম দ্বারা আল্লাহ্'র জন্যে কাজ করে বিধায় সওয়াবের অধিকারী হবে। এমনিভাবে যদি শাসনকর্তা জনগণের কাজকারবার আল্লাহর জন্যে করে, তবে সে আল্লাহ্'র কাছে পছন্দনীয় ও সওয়াবের যোগ্য হবে- ধর্ম শাস্ত্রের ব্যাপারে দায়িত্বশীল হওয়ার দিক দিয়ে নয়; বরং এমন কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্যে, যার লক্ষ্য আল্লাহ্ তা'আলার নৈকট্য অর্জন করা।

রবিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৩

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (১৩) আখেরাত বিষয়ক এলেম



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ১৩)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আখেরাত বিষয়ক এলেম (এলমে মুকাশাফা)
উল্লেখ্য, আখেরাত বিষয়ক এলেম দুই প্রকার- এলমে মুকাশাফা ও এলমে মুয়ামালা। এলমে মুকাশাফার অপর নাম এলমে বাতেন। এটা সকল জ্ঞানের চূড়ান্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। সেমতে জনৈক সাধক বলেন : যে ব্যক্তি এ শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না, তার সমাপ্তি অকল্যাণকর হবে বলে আমি আশংকা করি। এ শাস্ত্র সম্পর্কে সর্বনিম্ন জ্ঞান এই যে, একে সত্য বলে বিশ্বাস করবে এবং যোগ্য লোকদের এ জ্ঞানের অধিকারী হওয়ার কথা স্বীকার করবে।
অন্য একজন বলেন : যার মধ্যে বেদআত ও আত্মম্ভরিতা রয়েছে, সে অন্যান্য শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ হয়ে গেলেও এই শাস্ত্রের কোন বিষয় অর্জন করতে পারবে না। এ শাস্ত্র অস্বীকারকারীর সর্বনিম্ন শাস্তি এই যে, এ শাস্ত্র থেকে সে কিছুই লাভ করতে পারে না। এটা সিদ্দীক ও নৈকট্যশীল বান্দাদের শাস্ত্র। এটা একটা নূর। অন্তর যখন তার মন্দ গুণাবলী থেকে পবিত্র ও পরিষ্কার হয়ে যায়, তখন এই নূর অন্তরে প্রকাশ পায়। এ নূরের প্রভাবে মানুষের সামনে রহস্যের বহু দ্বারোদঘাটিত হয়ে যায়। পূর্বে যেসব বিষয়ের কেবল নাম শুনত এবং কিছু অস্পষ্ট অর্থ ধারণা করে নিত, এ নূরের বরকতে এখন সেসবগুলোর অর্থ সুস্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠে। এমনকি, তখন আল্লাহ তা'আলার সত্তার প্রকৃত মারেফত অর্জিত হয় এবং তাঁর চিরন্তন গুণাবলীর, তাঁর কর্মের, দুনিয়া ও আখেরাতের সৃষ্টি রহস্যের এবং আখেরাতকে দুনিয়ার উপর নির্ভরশীল করার বাস্তব মারেফত অর্জিত হয়ে যায়। নবুওয়ত, নবীর অর্থ, ওহী, ফেরেশতা ও শয়তানের অর্থ, মানুষের সাথে শয়তানের শত্রুতার অবস্থা, নবীগণ কর্তৃক ফেরেশতাগণকে জানার স্বরূপ, তাঁদের কাছে ওহী পৌছার অবস্থা, আকাশ ও পৃথিবীর অবস্থা, অন্তরের মারেফত, তার মধ্যে ফেরেশতা ও শয়তানের বাহিনীর মোকাবিলার অবস্থা, ফেরেশতাগণের ইলহাম ও শয়তানদের কুমন্ত্রণার মধ্যে পার্থক্যের পরিচয়, আখেরাত, জান্নাত, দোযখ, কবরের আযাব, পুলসেরাত, মীযান ও হিসাবের পরিচয়, নিম্নোক্ত আয়াতসমূহের তত্ত্ব
>“তুমি তোমার আমলনামা পাঠ কর। আজ তুমি তোমার হিসাব গ্রহণকারীরূপে যথেষ্ট।“
>“আখেরাতের গৃহই প্রকৃত জীবন যদি তারা জানত।”
আল্লাহ তা'আলার সাক্ষাৎ, তাঁকে দেখার অর্থ, তাঁর নৈকট্যশীল হওয়া ও প্রতিবেশী হওয়ার উদ্দেশ্য, ঊর্ধ্ব জগতের সঙ্গ এবং ফেরেশতাগণের নৈকট্য দ্বারা ভাগ্যবান হওয়ার মর্ম, জান্নাতীদের স্তরের মধ্যে এত পার্থক্য হওয়া যে, তারা একে অপরকে আকাশের উজ্জ্বল তারকার মত ঝলমল করতে দেখবে- ইত্যাদি আরও অনেক বিষয় এ নূরের কারণে জ্ঞাত হওয়া যায়।
এ নূরের পূর্বে উপরোক্ত বিষয়সমূহের মর্মে মানুষ মতভেদ করে। মূল বিষয়বস্তু সত্য বলে বিশ্বাস করে ঠিক, কিন্তু আপন স্বার্থের ব্যাপারে কিসের মধ্যে কি বলতে থাকে! কতক লোকের বিশ্বাস- এগুলো সব দৃষ্টান্ত। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা'আলা তার সৎ বান্দাদের জন্যে যা সৃষ্টি করেছেন তা কোন চোখ দেখেনি, কান শুনেনি এবং কারও অন্তর কল্পনাও করেনি। মানুষের জন্যে জান্নাতে গুণাবলী ও নাম ছাড়া কিছু নেই। কারও বিশ্বাস- এগুলোর মধ্যে কিছু বিষয় দৃষ্টান্ত এবং কিছু বিষয় এমন, যার স্বরূপ শব্দ থেকে জানা যায়।
কারও মতে, আল্লাহ তা'আলার মারেফতের পরিণতি ও পূর্ণতা, তাঁকে জানার ব্যাপারে অক্ষমতা স্বীকার করা। কিছু লোক আল্লাহ তা'আলার মারেফত সম্পর্কে বড় বড় দাবী করে।
কেউ কেউ বলে, আল্লাহ তা'আলার মারেফতের চূড়ান্ত স্তর সর্বসাধারণের বিশ্বাসের সীমা; অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা বিদ্যমান, জ্ঞাত, ক্ষমতাশালী, শ্রোতা, দ্রষ্টা, বাক্যালাপকারী।
এলমে মুকাশাফা বর্ণনা করার পেছনে আমাদের উদ্দেশ্য এসব বিষয়ের উপর থেকে পর্দা সরে যাওয়া, সত্য বিষয় চোখে দেখে নেয়ার মত পরিষ্কার ও স্পষ্ট হয়ে যাওয়া এবং এরপর কোন সন্দেহের অবকাশ না থাকা। অন্তরের উপর পাপাচারের মরিচা থরে থরে পড়ে না থাকলে এটা মানুষের সাধ্যাতীত নয়।
আখেরাতের এলেম দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য সেসব পাপাচার থেকে অন্তরের স্বচ্ছ হওয়ার অবস্থা জানা, যেগুলো আল্লাহ তা'আলা, তাঁর গুণ ও কর্মের স্বরূপ জানতে বাধা সৃষ্টি করে। অন্তর স্বচ্ছ ও পরিষ্কার করার একমাত্র উপায় হচ্ছে কামনা-বাসনা থেকে বিরত থাকা এবং সর্বাবস্থায় পয়গম্বরগণের অনুসরণ করা। এ উপায় অবলম্বন করলে অন্তর পরিষ্কার হতে থাকবে, তাতে সত্যের অংশ প্রতিফলিত এবং সত্যের স্বরূপ উদ্ভাসিত হতে থাকবে। এ স্বচ্ছতার পথ রিয়াযত তথা সাধনা ও জ্ঞান ছাড়া কিছুই নয়। সাধনার বিবরণ স্বস্থানে বর্ণিত হবে। এসব জ্ঞান কোন কিতাবে লিখিত হয় না। আল্লাহ তা'আলা যাকে এ জ্ঞান সামান্য দান করেন, সে তা অন্যের কাছে সাধারণভাবে বর্ণনা করে না; কেবল যোগ্য সহচরের কাছেই বর্ণনা করে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিম্নোক্ত হাদীসে এ গোপন জ্ঞানের কথাই উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন : "কতক জ্ঞান লুক্কায়িত ধনভান্ডারের ন্যায়। সাধকবৃন্দ ছাড়া কেউ এগুলো জানে না। তাঁরা এগুলো বললে কেবল সেসব লোকই এ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে যারা আল্লাহর ব্যাপারে বিভ্রান্ত।" সুতরাং আল্লাহ তা'আলা যে আলেমকে এ জ্ঞানের কিছু অংশ দান করেন, তাঁকে হেয় মনে করো না। কেননা, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে হেয় করেননি এবং এ জ্ঞান দান করেছেন।

আখেরাত বিষয়ক এলেম- ২ (এলমে মুয়ামালা)
এলমে মুয়ামালা হচ্ছে অন্তরের ভালমন্দ অবস্থা জানা। ভাল অবস্থা যেমন- সবর, শোকর, ভয়, আশা, সন্তুষ্টি, সংসার বর্জন, খোদাভীতি, অল্পে তুষ্টি, দানশীলতা, সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ স্বীকার করা, মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার করা, আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখা, সচ্চরিত্রতা, সৎভাবে জীবন যাপন করা, সততা, এগুলোর স্বরূপ জানা, এগুলো অর্জনের উপায় জানা, এগুলোর ফলাফল ও আলামত চেনা, এগুলোর মধ্যে কোনটি দুর্বল হয়ে গেলে তাকে শক্তিশালী করার উপায় জানা এবং কোনটি বিলুপ্ত হয়ে গেলে তা সৃষ্টি করার পদ্ধতি আয়ত্ত করা আখেরাত বিষয়ক এলেমের অন্তর্ভুক্ত।
পক্ষান্তরে অন্তরের মন্দ অবস্থা, যেমন দারিদ্র্যের ভয়, তকদীরের প্রতি অসন্তোষ, হিংসা-দ্বেষ পোষণ, বড়ত্ব অন্বেষণ, প্রশংসা কামনা, পার্থিব ভোগ-বিলাসের জন্যে দীর্ঘ জীবনের আকাঙ্ক্ষা, অহংকার, রিয়া, ক্রোধ আস্ফালন, শত্রুতা, লোভ, কৃপণতা, লালসা, বিত্তবানদের সম্মান করা, ফকীরদেরকে হেয় করার প্রয়াস, কোন বিষয়ে একে অপরের উপর বড়াই করা, সত্য বিষয়ে অহমিকা করা, অনর্থক চিন্তা-ভাবনা করা, বেশী কথা বল পছন্দ করা, অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে সেজেগুজে থাকা, ধর্মের কাজে শৈথিল্য করা, নিজেকে বড় মনে করা, নফসের অনিষ্ট থেকে গাফেল হয়ে অন্যের দোষ অন্বেষণ করা, নিশ্চিন্ত হওয়া, আল্লাহর ভয় থেকে মুক্ত থাকা, অপমান বোধ করলে কঠোরভাবে তার প্রতিশোধ নেয়া, সত্য বিষয়ের প্রতিশোধে দুর্বল হওয়া, আল্লাহর আযাব থেকে নির্ভয় হওয়া, এবাদতের উপর ভরসা করা, চক্রান্ত, আত্মসাৎ ও প্রতারণা করা কঠোর প্রাণ হওয়া, রূঢ়ভাষী হওয়া, দুনিয়া নিয়ে খুশী থাকা, পার্থিব সাফল্য না পেয়ে কাতর হওয়া, জুলুম করা, লজ্জা শরম ও দয়া কম হওয়া ইত্যাদি। এগুলো সবই মন্দ। অন্তরের এসব অভ্যাস সকল অনিষ্ট ও কুকর্মের মূল। এর বিপরীত তথা ভাল অভ্যাসসমূহ আনুগত্য ও পুণ্যের মূল। এগুলোর সংজ্ঞা, স্বরূপ, কারণ, ফলাফল ও প্রতিকার জানার নাম আখেরাত শাস্ত্র । এ শাস্ত্রের আলেমগণের ফতোয়া অনুযায়ী এটি ফরযে আইন। যেব্যক্তি এ থেকে বিমুখ থাকবে, সে আখেরাতে সত্যিকার মহাসম্রাটের ক্রোধে নিপতিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। যেমন, বাহ্যিক আমলের প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শনকারী দুনিয়ার শাসনকর্তার তরবারি দ্বারা এবং ফেকাবিদগণের ফতোয়া অনুযায়ী ধ্বংস হয়ে যায়। সারকথা, ফেকাবিদগণ দুনিয়ার কল্যাণের সাথে সম্বন্ধযুক্ত করে ফরযে আইন বিষয়সমূহ দেখে থাকেন । আর আমরা যে জ্ঞানের বিষয় বর্ণনা করেছি, তা মানুষকে আখেরাতের কল্যাণের সাথে সম্বন্ধযুক্ত করে। কোন ফেকাহবিদকে তাওয়াক্কুল অথবা এখলাস সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হলে অথবা রিয়া থেকে আত্মরক্ষার উপায় সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে সে জওয়াবদানে বিরত থাকবে। অথচ এটা তার নিজের উপরও ফরযে আইন। এটা না জানলে তার পরকাল বিনষ্ট হবে। কিন্তু তাকে যদি লেয়ান, যেহার, ঘোড়দৌড় ও তীরন্দাজির মাসআলা জিজ্ঞেস করা হয়, তবে সে এগুলোর সূক্ষ্ম শাখা-প্রশাখার বিরাট দফতর বর্ণনা করে দেবে, যেগুলোর প্রয়োজন শত শত বছর পর্যন্তও কারও হবে না। প্রয়োজন হলেও সেগুলোর বর্ণনাকারীর অভাব হবে না। ফেকাহবিদ দিবারাত্র এগুলোর স্মরণ ও পাঠদান করার মধ্যে অতিবাহিত করে। কিন্তু যে বিশেষ বিষয়টি তার জন্য জরুরী এবং গুরুত্বপূর্ণ, তার প্রতি গাফেল থাকে। এ ব্যাপারে কেউ আপত্তি করলে সে বলে : এটা দ্বীনী এলেম এবং ফরযে কেফায়া। তাই আমি এতে নিয়োজিত আছি। মানুষ এ ধোঁকায় পড়ে ফেকাহর জ্ঞানার্জন করে এবং অপরকে ধোঁকা দেয়। জ্ঞানী ব্যক্তি মাত্রই জানে, যদি ফরযে কেফায়ার হক আদায় করাই তার উদ্দেশ্য হত, তবে ফরযে কেফায়ার পূর্বে ফরযে আইন বিষয়ে জ্ঞানার্জন করত। বস্তুতঃ ফরযে কেফায়া আরও অনেক রয়েছে। সেগুলো ফেকাহ্'র পূর্বে অর্জন করত। কোন কোন শহরে কাফের যিম্মী ছাড়া মুসলমান চিকিৎসক নেই। ফেকাহর যেসকল বিধি-বিধান চিকিৎসা শাস্ত্রের সাথে সম্পর্কযুক্ত, সেগুলোতে কাফেরদের সাক্ষ্য গ্রহণীয় নয়, কিন্তু এতদসত্ত্বেও ফেকাহবিদ চিকিৎসা শাস্ত্র না শেখে এবং ফেকাহ্ শাস্ত্র বিশেষতঃ বিরোধপূর্ণ ও বিতর্কিত মাসআলাসমূহ শিক্ষা করার কাজে বাড়াবাড়ি করে। অথচ এ ধরনের ফতোয়াদান ও মোকদ্দমায় জওয়াব লেখার লোক শহরে ভূরি ভূরি বিদ্যমান রয়েছে। এমতাবস্থায় যখন কিছু লোক এ ফরযে কেফায়া পালনে তৎপর রয়েছে, তখন ফেকাবিদরা এটা শিক্ষা করার অনুমতি কিরূপে দেবে এবং যে চিকিৎসা শাস্ত্র কেউ জানে না, তা বর্জন করার আদেশ কিরূপে দেবে? এর কারণ এছাড়া কিছুই নয় যে, চিকিৎসা শাস্ত্রের জ্ঞানার্জনে ওয়াক্ফ ও ওসিয়তের মুতাওয়াল্লী হওয়া যায় না, এতীমদের ধনসম্পদের রক্ষক হওয়া যায় না, বিচারবিভাগ ও শাসনবিভাগে চাকুরী লাভ করে সমকক্ষদের চেয়ে এগিয়ে যাওয়া যায় না এবং শত্রুদের উপর প্রবলও হওয়া যায় না।
পরিতাপের বিষয়, মন্দ আলেমদের ধোঁকায় দ্বীন মিটে গেছে। আল্লাহ আমাদেরকে এমন বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করুন, যার কারণে তিনি অসন্তুষ্ট হন এবং শয়তান খুশী হয়। বাহ্যদর্শী আলেমগণের মধ্যে যারা পরহেযগার ছিলেন, তাঁরা বাতেনী আলেম ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন আলেমগণের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতেন ।
উদাহরণতঃ ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) শায়বান নামক এক আবেদ রাখালের সামনে এমনভাবে হাঁটু গেড়ে বসতেন : যেমন মক্তবে বালকরা ওস্তাদের সামনে বসে। তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করতেন : অমুক অমুক ব্যাপারে আমি কি করব? লোকেরা ইমাম শাফেয়ীকে বলত : আপনার মত জ্ঞানী গুণী ব্যক্তি এই জংলী লোকটির নিকট কি শিখতে পারেন? তিনি বলতেনঃ তোমরা যা শেখনি, তার তওফীক এ ব্যক্তি প্রাপ্ত হয়েছেন।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহঃ) ও ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন (রহঃ) মারূফ কারখীর কাছে যাতায়াত করতেন। অথচ তিনি যাহেরী এলেমে এঁদের সমকক্ষ ছিলেন না। তাঁরা উভয়ই তাঁকে আমল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনাকেও জিজ্ঞেস করা হয়, আমরা যদি কোন বিষয়ের সম্মুখীন হই এবং কোরআন ও হাদীসে তার বিধান খুঁজে না পাই, তবে কি করব? তিনি বললেন : সাধু পুরুষদের কাছে জিজ্ঞেস করো এবং তাদের পরামর্শ গ্রহণ করো। এ কারণেই বলা হয়েছে, বাহ্যিক আলেমগণ পৃথিবী ও দেশের শোভা এবং বাতেনী আলেমগণ আকাশ ও ফেরেশতাজগতের সৌন্দর্য।
জুনাইদ (রহঃ) বলেন : একদিন আমাকে আমার মুর্শিদ সিররী (রহঃ) বললেন : তুমি আমার কাছ থেকে উঠে কার কাছে গিয়ে বস? আমি বললাম : মুহাসেবী (রহঃ)-এর কাছে। তিনি বললেন : ভাল কথা। তাঁর জ্ঞান ও আদব গ্রহণ করো। কিন্তু তিনি যে কালাম শাস্ত্র ও মুসলিম দার্শনিকদের খণ্ডন করেন তা শেখো না। এরপর আমি তাঁর কাছ থেকে উঠার সময় একথা বলতে শুনলাম : আল্লাহ্ তোমাকে এলেম ও হাদীসওয়ালা সূফী করুন- সূফী হাদীসওয়ালা না করুন। এতে ইঙ্গিত রয়েছে, যেব্যক্তি হাদীস ও এলেম শিখে সূফী হয়, সে সফলতা লাভ করে। আর যেব্যক্তি সূফী হয়ে হাদীস শিক্ষা করে, সে নিজেকে বিপন্ন করে।

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...