শনিবার, ৩০ মার্চ, ২০২৪

যাকাত (পর্ব– ৪) যাকাতের আভ্যন্তরীণ শিষ্টাচার



যাকাত পর্ব– ৪
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যাকাতের আভ্যন্তরীণ শিষ্টাচার —
জানা উচিত, যারা আখেরাতের কামনা করে, তাদের জন্যে যাকাত প্রদানে কয়েকটি আদব বা শিষ্টাচার রয়েছে। 
যাকাত প্রদানের প্রথম আদব –
যাকাত ওয়াজেব হওয়ার কারণ হৃদয়ঙ্গম করা এবং একথা অনুধাবন করা, যাকাত কোন দৈহিক এবাদত নয়; আর্থিক ক্ষমতা প্রয়োগ। এতদসত্ত্বেও এটা ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ সাব্যস্ত হল কেন? যাকাত ওয়াজেব হওয়ার কারণ তিনটি–
(১) যাকাত ওয়াজেব হওয়ার কারণ – ১
শাহাদতের উভয় কলেমা পাঠের মানে হল তওহীদকে অপরিহার্য করা এবং মাবুদের একত্বের সাক্ষ্য প্রদান করা। এটা এমনভাবে পূর্ণ করতে হবে, যেন তওহীদে বিশ্বাসী ব্যক্তির কাছে এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন কিছু প্রিয় না থাকে। কেননা, মহব্বত অংশীদারিত্ব কবুল করে না এবং কেবল মুখে তওহীদ উচ্চারণ করা তেমন উপকারী নয়। বরং মহব্বত আছে কিনা, প্রিয় বস্তুর বিচ্ছেদ দ্বারা তা পরীক্ষা করা যায়। মানুষের কাছে মাল ও অর্থকড়ি অত্যন্ত প্রিয় বস্তু। কেননা, এটাই সাংসারিক কার্যোদ্ধারের মোক্ষম হাতিয়ার। দুনিয়াতে মানুষ অর্থ-সম্পদকেই আপন মনে করে এবং মৃত্যুকে ঘৃণা করে। অথচ মৃত্যুর মধ্যে আরাধ্য পরম প্রিয়ের সাক্ষাৎ ঘটে। তাই মানুষের দাবীর সত্যতা যাচাই করার জন্যে কাম্য ও প্রিয় অর্থ সম্পদ আল্লাহর পথে বিসর্জন দিতে বলা হয়েছে। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা বলেন :
“আল্লাহ্ মুমিনদের জান ও মাল বেহেশতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন”।

বলাবাহুল্য, এটা জেহাদ অর্থাৎ আল্লাহ্ তাআলার দীদার লাভের আগ্রহে প্রাণ বিসর্জন দেয়া এবং অর্থকড়ি থেকে হাত গুটিয়ে নেয়া সাথে সম্পর্ক রাখে। অর্থ ব্যয় করার এই রহস্যের প্রতি লক্ষ্য করলে মানুষ তিন শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে যায়। 

প্রথম শ্রেণী তারা, যারা তওহীদকে সত্যিকাররূপে মেনে এবং অঙ্গীকার পূর্ণ করে সমস্ত ধনসম্পদ থেকে হাত গুটিয়ে নেয়। তারা নিজেদের কাছে না কোন আশরাফী রাখে, না টাকা-পয়সা। যাকাত ওয়াজেব হওয়ার কোন সুযোগই তারা রাখে না। জনৈক বুযুর্গ ব্যক্তিকে কেউ জিজ্ঞেস করল : দুশ' দেরহামে কি পরিমাণ যাকাত ওয়াজেব? তিনি বলেন : শরীয়তের আইনে সাধারণ মানুষের উপর পাঁচ দেরহাম ওয়াজেব, কিন্তু আমাদের উপর গোটা দুশ' দেরহামই দিয়ে দেয়া ওয়াজেব। 
একবার রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যখন দান খয়রাতের ফযীলত বর্ণনা করলেন, তখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (র.) তাঁর সমস্ত ধনসম্পদ এবং হযরত ওমর (র.) অর্ধেক মাল দান করলেন। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত আবু বকরকে জিজ্ঞেস করলেন : তুমি তোমার পরিবারের জন্যে কি রেখেছ? তিনি বললেন : আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলকে রেখেছি। 
হযরত ওমরকে জিজ্ঞেস করলেন : তুমি কি রেখেছ? তিনি বললেন : পরিবারের জন্যে ততটুকু রেখে দিয়েছি, যতটুকু এখানে উপস্থিত করেছি। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন : তোমাদের উভয়ের মধ্যে ততটুকু তফাৎ, যতটুকু তোমাদের কথার মধ্যে তফাৎ। 

দ্বিতীয় শ্রেণী তারা, যারা অর্থ সম্পদ সঞ্চয় করে রাখে এবং অভাব-অনটনের সময় খয়রাতের মওসুমের অপেক্ষা করতে থাকে। তাদের মর্তবা প্রথম শ্রেণীর তুলনায় কম। সঞ্চয় করার পেছনে তাদের উদ্দেশ্য থাকে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যয় করা, বিলাসব্যসনে উড়িয়ে না দেয়া এবং প্রয়োজন মেটানোর পর কিছু বেঁচে গেলে সময় সুযোগ বুঝে তা সৎপথে ব্যয় করা। তারা কেবল যাকাতের অর্থ প্রদান করেই ক্ষান্ত থাকে না; বরং অন্য দান-খয়রাত করে। নখয়ী, শা'বী, আতা ও মুজাহিদ প্রমুখ আলেমের অভিমত, অর্থ সম্পদের মধ্যে যাকাত ছাড়া আরও হক আছে। শা'বীকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন : হাঁ, আরও হক আছে। তুমি আল্লাহ তা'আলার এই এরশাদ শ্রবণ করনি?
“ভয় এবং মালের মহব্বত সত্ত্বেও তা আত্মীয় ও অনাথদেরকে দান করে। এই আলেম (আমি তাদেরকে যা দেই, তা থেকে তারা ব্যয় করে।) এবং (তোমরা আমার দেয়া রিযিক থেকে ব্যয় কর।) আয়াত দুটিকেও তাদের দাবীর সপক্ষে পেশ করে বলেন : এসব আয়াত যাকাতের আয়াত দ্বারা রহিত হয়নি; বরং মুসলমানদের পারস্পরিক হক এসব আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। অর্থ এই, ধনী ব্যক্তি কোন অভাবগ্রস্তকে পেলে যাকাত ছাড়া অন্য মাল দ্বারা তার অভাব দূর করবে। এ সম্পর্কে ফেকাহ্ শাস্ত্রের বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, অভাবের কারণে কেউ মরণাপন্ন হয়ে গেলে তার অভাব দূর করা অন্যদের উপর ফরযে কেফায়া। কিন্তু এতে বলা যায়, ধনী ব্যক্তির উপর কেবল এতটুকু ওয়াজেব, যে পরিমাণ অর্থ দ্বারা তার অভাব দূর হয়ে যায়, সেই পরিমাণ অর্থ তাকে কর্জ দেবে। যাকাত দিয়ে থাকলে দান করে দেয়া তার উপর ওয়াজেব নয়। কেউ কেউ বলেন : দান করাই ওয়াজেব- কর্জ দেয়া দুরস্ত নয়। মোট কথা, এ ব্যাপারে মতভেদ আছে। তবে কর্জ দেয়া হচ্ছে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে যাওয়া, যা সর্বসাধারণের স্তর।

তৃতীয় শ্রেণী তারা, যারা কেবল ওয়াজেব যাকাত আদায় করেই ক্ষান্ত থাকে বেশীও দেয় না এবং কমও দেয় না। এটা সর্বনিম্ন মর্তবা। - সাধারণ মানুষ তাই করে। কারণ তারা ধন-সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট ও কৃপণ হয়ে থাকে এবং পরকালের আসক্তি তাদের মধ্যে কম। তাই আল্লাহ তাআলা বলেন :
“যদি তিনি তোমাদের কাছে অর্থ সম্পদ চান এবং পীড়াপীড়ি করেন, তবে তোমরা কৃপণতা করবে।

(২) যাকাত ওয়াজেব হওয়ার দ্বিতীয় কারণ- 
যাকাত ওয়াজেব হওয়ার দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, মানুষকে কৃপণতা দোষ থেকে মুক্ত করা। কেননা, এটা হচ্ছে অন্যতম বিনাশকরী দোষ। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : 
“তিনটি বিষয় বিনাশকারী- লোভ, খেয়ালখুশী এবং আত্মপ্রীতি। 
আল্লাহ্ তাআলা বলেন : “যাদেরকে লোভ-লালসা থেকে বাঁচিয়ে রাখা হয়, তারাই সফলকাম”। বলাবাহুল্য, অর্থ সম্পদ দান করার অভ্যাস গড়ে তোলাই কৃপণতা দোষ দূর করার উপায়। এ কারণের দিক দিয়ে যাকাত পবিত্রকারী ; অর্থাৎ যাকাত যাকাতদাতাকে কৃপণতার মারাত্মক অপবিত্রতা থেকে পবিত্র করে দেয়। এ পবিত্রকরণ ততটুকু হবে, যতটুকু মানুষ দান করে এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করে আনন্দ ও খুশী অনুভব করবে। 
(৩) যাকাত ওয়াজেব হওয়ার তৃতীয় কারণ -
যাকাত ওয়াজেব হওয়ার তৃতীয় কারণ হল- নেয়ামতের শোকর আদায় করা। কেননা, আল্লাহ তাআলার নেয়ামত যেমন বান্দার শরীরে নিহিত নেয়ামতের শোকর, তেমনি আর্থিক এবাদত অর্থসম্পদে নিহিত নেয়ামতেরও শোকর। সুতরাং যেব্যক্তি গরীবকে অভাবী হয়ে তার কাছে হাত-পাততে দেখেও আল্লাহ তাআলার শোকর করে না যে, আল্লাহ তাকে ধনী করেছেন এবং অপরকে তার প্রতি মুখাপেক্ষী করেছেন, সে অত্যস্ত নীচ। 

যাকাত প্রদানের দ্বিতীয় আদব –
ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিগণ যাকাত ওয়াজেব হওয়ার পূর্বেই তা আদায় করে দেয়া, যাতে তাদের খোদায়ী আদেশ পালনে আগ্রহ বুঝা যায়, গরীবরা মানসিক শান্তি লাভ করে এবং সময়ের বাধাবিঘ্ন থেকে মুক্ত থাকা যায়। বিলম্বে যাকাত আদায় করার মধ্যে অনেক বিপদাপদের আশংকা থাকে। 
প্রথমতঃ এতে গোনাহে লিপ্ত হওয়ার আশংকা থাকে। সুতরাং অন্তরে পুণ্যের প্রেরণা প্রকাশ পেলে তাকে সুবর্ণ সুযোগ জ্ঞান করবে। এরূপ প্রেরণা ফেরেশতা কর্তৃক অবতীর্ণ হয়ে থাকে। মুমিনের অন্তর আল্লাহ তাআলার দু'অঙ্গুলির মধ্যস্থলে থাকে। তাতে পরিবর্তন আসতে দেরী লাগে না। এছাড়া শয়তান দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অপকর্মের আদেশ করে। তাই সৎকর্মের প্রেরণা অন্তরে উদয় হওয়া গনীমত মনে করবে। একত্রে যাকাত দিলে তা আদায় করার জন্যে কোন উত্তম মাস নির্দিষ্ট করে নেবে, যাতে মাসের গুণে নৈকট্য অধিক অর্জিত হয়। উদাহরণতঃ বছরের প্রথম ও সম্মানিত মাস মহররম মাসে অথবা পবিত্র রমযান মাসে যাকাত দেবে। কেননা, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়ালিহি ওয়াসাল্লাম) এ মাসে সর্বাধিক দান খয়রাত করতেন; এমনকি গৃহে কোন কিছু রাখতেন না। রমযানে শবে কদরেরও ফযীলত আছে, যাতে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। মুজাহিদ (রহ.) বলতেন : রমযান বলো না। কেননা, এটা আল্লাহ তাআলার একটি নাম; বরং রমযান মাস বলো। যিলহজ্জ মাসও অন্যতম সম্মান ও ফযীলতের মাস। এতে হজ্জে আকবর হয়। কোরআনে উল্লিখিত আইয়্যামে মালূমাত এবং আইয়্যামে মাদুদাত এ মাসেই রয়েছে। রমযান মাসের শেষ দশ দিন এবং যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন অধিক ফযীলত রাখে।

যাকাত প্রদানের তৃতীয় আদব–
তৃতীয় আদব হচ্ছে সুখ্যাতি ও রিয়া থেকে দূরে থাকার জন্যে গোপনে যাকাত আদায় করা -
রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :  “সর্বোত্তম দান এই যে, দরিদ্র ও সম্বলহীন ব্যক্তি শ্রমের মাধ্যমে উপার্জন করে তা গোপনে কোন ফকীরকে দিয়ে দেবে”। 
জনৈক আলেম বলেন : তিনটি বিষয় দান-খয়রাতে সওয়াব ভান্ডার। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে গোপনে দান করা। 
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : বান্দা গোপনে কোন কাজ করলে আল্লাহ তাআলা তা গোপন খাতায় লিপিবদ্ধ করেন। যদি তা প্রকাশ করে তবে আল্লাহ তাআলা তা গোপন খাতা থেকে প্রকাশ্য খাতায় স্থানান্তর করেন। এর পর যদি সে এ কর্মের কথা অন্য কাউকে বলে, তবে গোপন ও প্রকাশ্য উভয় খাতা থেকে তা দূর করে রিয়ার খাতায় লেখে দেয়া হয়। 
এক মশহুর হাদীসে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তাআলা সাত ব্যক্তিকে সেদিন ছায়াতলে রাখবেন যেদিন আরশের ছায়া ব্যতীত কোন ছায়া থাকবে না। তাদের মধ্যে একজন সেই ব্যক্তি, যে কোন কিছু দান করলে তার বাম হাতও জানতে পারে না যে, ডান হাত কি দান করেছে। 

এক হাদীসে আছে আল্লাহ বলেনঃ - “দান খয়রাত গোপনে ফকীরদের হাতে পৌঁছাও, তবে এটা তোমাদের জন্যে উত্তম। অতঃপর সে গোপন দান আল্লাহ তাআলার ক্রোধ নির্বাপিত করে।
গোপনে দান করার উপকারিতা হচ্ছে রিয়া ও খ্যাতির কুফর থেকে আত্মরক্ষা করা। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যারা খ্যাতির জন্যে দান করে, দানের কথা অন্যের কাছে বলে এবং দান করে অনুগ্রহ প্রকাশ করে, আল্লাহ তাআলা তাদের দান কবুল করেন না। যে দানের কথা অন্যের কাছে বলে বেড়ায় সে খ্যাতি অন্বেষণ করে। যে জনসমাবেশে দান করে, সে রিয়াকার। গোপনে দান করলে এ দুটি বিপদ থেকে মুক্ত থাকা যায়। বুযুর্গগণ গোপনে খয়রাত করার ব্যাপারে অনেক সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। গ্রহীতা যাতে দাতাকে চিনতে না পারে সে ব্যাপারে তাঁদের চেষ্টার অন্ত ছিল না। এজন্যে কেউ কেউ অন্ধের হাতে খয়রাত রেখে দিতেন। কেউ ফকীরের গমন পথে ও তার বসার জায়গায় খয়রাত ফেলে রাখতেন। কেউ ঘুমন্ত ফকীরের কাপড়ের কোণে খয়রাত বেঁধে দিতেন। কেউ অন্যের হাতে ফকীরের কাছে পৌঁছে দিতেন যাতে ফকীর দাতার অবস্থা না জানে । তারা আল্লাহর ক্রোধ নির্বাপিত করার উপায় সৃষ্টি করা এবং খ্যাতি ও রিয়া থেকে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যে এভাবে দান খয়রাত করতেন। যদি কোন এক ব্যক্তিকে অবহিত না করে খয়রাত করা অসম্ভব হয়, তবে মিসকীনকে সমর্পণ করার জন্যে একজন উকিলের হাতে খয়রাত সোপর্দ করা উত্তম। এতে মিসকীন জানতে পারবে না, দাতা কে? কারণ মিসকীন জানলে রিয়া ও অনুগ্রহ উভয়টি হয়। আর উকিলের জানার মধ্যে কেবল রিয়াই হবে। সুখ্যাতি লাভের উদ্দেশে দান করলে দানকর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে। কেননা, যাকাতের উদ্দেশ্য কৃপণতা দূর এবং ধনসম্পদের মহব্বত হ্রাস করা। ধনসম্পদের মহব্বতের তুলনায় খ্যাতির মহব্বত মনকে অধিক আচ্ছন্ন করে। আখেরাতে উভয়টিই ক্ষতিকর। কিন্তু কৃপণতা কবরে দংশনকারী বিচ্ছুর এবং রিয়া বিষধর সর্পের আকৃতি লাভ করবে। মানুষকে উভয় শত্রু দুর্বল ও নির্ধন করার আদেশ দেয়া হয়েছে, যাতে এদের যন্ত্রণা সম্পূর্ণ দূরীভূত হয় অথবা হ্রাস পায়৷

যাকাত প্রদানের চতুর্থ আদব—
যেখানে জানা যায়, প্রকাশ্যে দান করলে অন্যরা উৎসাহিত হবে, সেখানে প্রকাশ্যে দান করবে। এক্ষেত্রে রিয়া থেকে আত্মরক্ষা করার উপায় আমরা রিয়া অধ্যায়ে বর্ণনা করেছি। প্রকাশ্যে দান করা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন : "যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান খয়রাত কর, তবে তা খুবই ভাল"। 
এটা এমন স্থলে, যেখানে অপরকে উৎসাহিত করা উদ্দেশ্য হয় অথবা সওয়ালকারী জনসমাবেশে সওয়াল করে। এক্ষেত্রে রিয়ার ভয়ে প্রকাশ্যে দান বর্জন করা উচিত নয় ; বরং দান করা উচিত এবং মনকে যথাসম্ভব রিয়া থেকে মুক্ত রাখা দরকার। কারণ, প্রকাশ্যে দান করার মধ্যে অনুগ্রহ প্রকাশ ছাড়া আর একটি অপকারিতা আছে। তা হচ্ছে, ফকীরের মুখোশ উন্মোচন করে দেয়া। কেননা, অধিকাংশ ফকীর তাদের স্বরূপ প্রকাশ পাওয়া অপছন্দ করে। সুতরাং প্রকাশ্যে প্রার্থনা করে সে যখন নিজের পর্দা নিজেই খুলে দেয়, তখন তার বেলায় এই অপকারিতা নিষিদ্ধ নয়। উদাহরণতঃ কেউ যদি গোপনে ও লোকচক্ষুর অন্তরালে পাপাচার করে, তবে প্রকাশ করা ও খোঁজাখুঁজি করা অন্যের জন্যে নিষিদ্ধ। কিন্তু যেব্যক্তি নিজে পাপাচার প্রকাশ করে, অন্যেরা তার পাপাচার প্রকাশ করলে তা তার জন্যে শাস্তির কারণ হবে। কিন্তু এ শাস্তির আসল কারণ সে নিজেই। এ জন্যেই রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছেন : "যেব্যক্তি লজ্জার মুখোশ দূরে নিক্ষেপ করে, তার গীবত গীবত নয়৷
আল্লাহ তাআলা বলেন : "আমি যা দিয়েছি, তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় কর"।
এ আয়াতে প্রকাশ্যে দান করারও আদেশ করা হয়েছে। কারণ, এতে অন্যদেরকে উৎসাহিত করার উপকারিতা আছে।
মোট কথা, প্রকাশ্যে দান করার মধ্যে যেসব উপকারিতা ও অপকারিতা রয়েছে, সেগুলো সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করে নেয়া উচিত। ব্যক্তি বিশেষে এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন অবস্থা হয়ে থাকে। কতক পরিস্থিতিতে কতক ব্যক্তির জন্য প্রকাশ্যে দান করাই উত্তম হয়। উপকারিতা ও অপকারিতা জানার পর কিভাবে দান করা উত্তম, তা আপনা আপনিই ফুটে উঠবে।

যাকাত প্রদানের পঞ্চম আদব— 
হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদাকা বাতিল করো না।

দান-খয়রাতকে খোঁটা ও কষ্ট দ্বারা পণ্ড না করা।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন ‎(لا تُبْطِلُوا صَدقُتِكُمْ بِالْمَن والاذى)  তোমরা তোমাদের দান-খয়রাতকে খোঁটা ও কষ্ট দ্বারা বাতিল করো না। এ দুটি শব্দের স্বরূপ সম্পর্কে জ্ঞানীগণ মতভেদ করেছেন। কেউ বলেন: (খোঁটা ) শব্দের অর্থ দানের কথা আলোচনা করা এবং (কষ্ট) শব্দের উদ্দেশ্য প্রকাশ্যে দান করা। সুফিয়ান সওরী (র.) বলেন: যেব্যক্তি খোঁটা করে, তার দান নিষ্ফল হয়ে যায়। কেউ জিজ্ঞেস করল: খোঁটা কিভাবে হয়? তিনি বললেন: দানের কথা আলোচনা করা এবং মানুষের কাছে বলে বেড়ানো। কেউ বলেন: খোঁটা -এর উদ্দেশ্য হল দানের বিনিময়ে ফকীরের কাছ থেকে কাজ নেয়া আর কষ্ট শব্দের অর্থ ফকীরকে লজ্জা দেয়া। কারও মতে, খোঁটা হল দান করে ফকীরের কাছে অহংকার করা। আর সওয়াল করার কারণে ফকীরকে ধমকানো হলো কষ্ট  রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: "আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ প্রকাশকারীর দান কবুল করেন না"। 
আমার মতে খোঁটা -এর একটি শিকড় ও ভিত্তি আছে, যা অন্তরের অবস্থাসমূহের অন্যতম। এই অবস্থা মুখে ও অঙ্গ প্রত্যঙ্গে প্রতিফলিত হয়। সুতরাং এর মূল হচ্ছে নিজেকে এরূপ মনে করা যে, সে ফকীরের প্রতি অনুগ্রহ করেছে। অথচ তার মনে করা উচিত ছিল, ফকীর তার প্রতি অনুগ্রহ করেছে। সে আল্লাহ তা'আলার হক তার কাছ থেকে আদায় করে নিয়েছে। ফলে সে পবিত্র হবে ও দোযখ থেকে মুক্তি পাবে। 
যদি ফকীর দান কবুল না করত, তবে সে এই হকের মধ্যে আবদ্ধ থাকত। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: দান-খয়রাত ফকীরের হাতে পৌঁছার পূর্বে আল্লাহ্ তাআলার হাতে পড়ে কাজেই বুঝা উচিত, দাতা আল্লাহ তা'আলার হক দেয় আর ফকীর তা গ্রহণ করে আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে তার রিযিক নেয়। দানের মাল প্রথমে আল্লাহ তাআলার হয়ে যায়, এর পর ফকীর পায়। 
মনে করুন, এই ধনী ব্যক্তির যিম্মায় যদি কারও কর্জ থাকত এবং সে বলে দিত, এই কর্জের টাকা আমার খাদেম অথবা গোলামকে দিয়ে দিয়ো, যার পানাহার ও ভরণ-পোষণ আমার যিম্মায়, তবে খাদেম অথবা গোলামকে কর্জের টাকা দিয়ে ধনী ব্যক্তি কি মনে করতে পারত, সে তার প্রতি অনুগ্রহ করেছে? এরূপ মনে করলে এটা তার নির্বুদ্ধিতা ও মূর্খতা হবে। কেননা, পানাহার ও ভরণ পোষণ যার দায়িত্বে, সে-ই তার প্রতি অনুগ্রহ করে। ধনী ব্যক্তি তো কেবল তার কর্জের টাকা শোধ করে। সুতরাং কর্জ শোধ করা নিজেরই উপকার- অন্যের প্রতি অনুগ্রহ নয়। 
উপরে যাকাত ওয়াজেব হওয়ার যে তিনটি কারণ আমরা উল্লেখ করেছি, সেগুলো অথবা তার কোন একটি কারণ বুঝে নিলে কোন দাতা নিজেকে অন্যের প্রতি অনুগ্রহকারীরূপে চিন্তা করতে পারবে না। বরং এটাই বুঝবে যে, সে নিজের প্রতিই অনুগ্রহ করেছে; অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার মহব্বত প্রকাশ করার জন্যে অথবা নিজেকে কৃপণতার অনিষ্ট থেকে মুক্ত করার জন্যে অথবা ধনসম্পদের শোকর আদায় করার জন্যে দান করছে। এ তিন অবস্থায় তার মধ্যে ও ফকীরের মধ্যে অনুগ্রহের কোন ব্যাপার নেই। এ মূল কথা বিস্মৃত হলে এবং নিজেকে ফকীরের প্রতি অনুগ্রহকারী মনে করলে সে দানের কথা আলোচনা করে এবং ফকীরের কাছে প্রতিদান কামনা করে।

 (কষ্ট)  শব্দের বাহ্যিক অর্থ ধমকানো, কটু কথা বলা ও কঠোর ব্যবহার করা, কিন্তু অন্তরে এর উৎপত্তির কারণ দু'টি- এক, ধনসম্পদ থেকে হাত গুটিয়ে নেয়া খারাপ মনে করা এবং দুই, এরূপ মনে করা, আমি ফকীর অপেক্ষা উত্তম। অভাবী হওয়ার কারণে ফকীর মতবায় আমার চেয়ে কম। এ দুটি বিষয়ই মূর্খতাপ্রসূত। 

উদাহরণতঃ অর্থকড়ি দেয়া খারাপ মনে করা নির্বুদ্ধিতা। কারণ, কেউ যদি হাজার দেরহামের বিনিময়ে এক দেরহাম দেয়া খারাপ মনে করে, তবে তার চেয়ে নির্বোধ আর কে হবে? আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালীন সওয়াবের জন্যে অর্থ দান করা হয়। এগুলো অর্থের তুলনায় বহু গুণে শ্রেষ্ঠ। অথবা কৃপণতার অনিষ্ট দূর করার জন্যে অর্থ দান করা হয়। অথবা বেশী নেয়ামত পাওয়ার আশায় কিংবা শোকারগুজারীর জন্যে দান করা হয়। এসব কারণের মধ্যে কোনটিই খারাপ নয়। 
দ্বিতীয় বিষয়টি অর্থাৎ নিজেকে ফকীর অপেক্ষা উত্তম মনে করা মূর্খতা। কেননা, মানুষ যদি ধনাঢ্যতার তুলনায় দারিদ্র্যের ফযীলত জানতে পারে এবং ধনীদের বিপদাপদ অবগত হতে পারে, তবে সে কখনও ফকীরকে হেয় মনে করবে না। বরং তার মাধ্যমে বরকত হাসিল করবে এবং তার মর্তবা কামনা করবে। কারণ, ধনীদের মধ্যে যেব্যক্তি সৎকর্মপরায়ণ হবে, সে ফকীরদের চেয়ে পাঁচ'শ বছর পরে জান্নাতে প্রবেশাধিকার পাবে। এ কারণেই রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : "কাবার প্রভুর কসম, তারাই অধিক ক্ষতিগ্রস্ত"। হযরত আবু যর (রা.) জিজ্ঞেস করলেন : তারা কারা? তিনি বললেন : "যাদের কাছে প্রভূত ধনদৌলত রয়েছে"!

আল্লাহ্ তাআলা ফকীরের জন্যে ধনী ব্যক্তিকে কাজে লাগিয়ে রেখেছেন । সে স্বীয় প্রচেষ্টায় অর্থ উপার্জন করে, পরিশ্রম করে তা বাড়ায় এবং হেফাযত করে। এর পর ফকীরকে প্রয়োজন অনুযায়ী দান করা তার জন্যে জরুরী করে দেয়া হয়েছে। সুতরাং যে ফকীরের রুজির জন্যে সে কাজ কারবার করে, তাকে কিরূপে হেয় মনে করতে পারে? ফকীর ধনী ব্যক্তির চেয়ে এ বিষয়ে শ্রেষ্ঠ, ধনী ব্যক্তি অপরের হক নিজের যিম্মায় গ্রহণ করে এবং অনেক দুঃখ কষ্ট সহ্য করে। মৃত্যু পর্যন্ত প্রয়োজনাতিরিক্ত ধনসম্পদের হেফাযত করে। যখন সে মারা যায়, তখন অন্যে সেই ধনসম্পদ ভক্ষণ করে। এমতাবস্থায় ফকীরকে দেয়া কিরূপে খারাপ হতে পারে? এভাবে যখন দান করা খারাপ মনে করবে না; তখন ফকীরকে পেয়ে খুশী হবে, তার প্রশংসা করবে এবং তার অনুগ্রহ স্বীকার করবে।

ফলে (من ও اذی) খোঁটা ও কষ্ট কিছুই থাকবে না। দান করার পর নিজেকে অনুগ্রহকারী মনে করার একটি বাহ্যিক প্রতিকার আছে। তা হচ্ছে, দাতা ফকীরের সামনে এমন কাজ করবে, যা কোন অনুগ্রহপ্রাপ্ত ঋণী ব্যক্তি করে। সেমতে কোন কোন বুযুর্গ ফকীরের সামনে দান রেখে নিজে দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং দান কবুল করার জন্যে তাকে অনুরোধ করতেন। মনে হত যেন তিনিই সওয়ালকারী । বুযুর্গগণ তাঁদের কাছে ফকীরের আগমন ভাল মনে করতেন না; বরং তাঁরা স্বয়ং ফকীরের কাছে গিয়ে দান করা সমীচীন মনে করতেন। কতক বুযুর্গ হাতে দানের অর্থ রেখে ফকীরের দিকে হাত বাড়িয়ে দিতেন যাতে ফকীর তা তুলে নেয় এবং ফকীরের হাতই উপরে থাকে।


//

 হযরত আয়েশা ও উম্মে সালামা (রাঃ) যখন কিছু খয়রাত কোন ফকীরের কাছে প্রেরণ করতেন, তখন দূতকে বলে দিতেন : ফকীর দোয়ার যেসব বাক্য বলবে, সেগুলো মুখস্থ করে আসবে। দূত ফিরে এসে দোয়ার বাক্য বর্ণনা করলে তাঁরাও সেসব দোয়ার বাক্য ফকীরের জন্যে উচ্চারণ করতেন এবং বলতেন, আমাদের খয়রাত বাঁচানোর জন্যে আমরা দোয়ার বদলে দোয়া করে দিলাম। মোট কথা, পূর্ববর্তীগণ দান করে ফকীরের কাছে দোয়া আশা করতেন না। কেননা, দোয়াও দানের একটি প্রতিদানের মত। কেউ তাদের জন্যে দোয়া করলে বিনিময়ে তার জন্যে তেমনি দোয়া তাঁরা করে দিতেন। হযরত ওমর ও তদীয় পুত্র আবদুল্লাহ (রাঃ) তাই করেছিলেন। যাকাতের মধ্যে من ও اذی না থাকার শর্ত নামাযের মধ্যে খুশু তথা বিনয়ের শর্তের স্থলবর্তী। এটা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। নামায সম্পর্কে হাদীসে বলা হয়েছে "মানুষ নামাযের যতটুকু অংশ বুঝে, ততটুকুই পায়"। যাকাত সম্পর্কে বলা হয়েছে : "আল্লাহ্ তাআলা কোন অনুগ্রহ প্রকাশকারীর খয়রাত কবুল করেন না"। আল্লাহ তাআলা বলেন "তোমরা অনুগ্রহ প্রকাশ করে ও দানগ্রহীতার মনে কষ্ট দিয়ে তোমাদের খয়রাতসমূহ বরবাদ করো না"। এ শর্তের অনুপস্থিতিতেও ফেকাহবিদরা ফতোয়া দেন, তার যাকাত আদায় হয়ে গেছে। এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।

>>ষষ্ঠ আদব
নিজের দানকে কম মনে করা। কারণ, অনেক মনে করলে আত্মপ্রীতিতেও লিপ্ত হবে, যা একটি মারাত্মক ব্যাধি। আত্মপ্রীতি আমলসমূহ বাতিল করে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন : "হুনায়ন যুদ্ধের কথা স্মরণ কর, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে আত্মপ্রীতিতে লিপ্ত করে দিয়েছিল, অতঃপর তা তোমাদের কোন উপকার করেনি"।
বলা হয়, এবাদতকে যতই ক্ষুদ্র জ্ঞান করা হবে, তা আল্লাহর কাছে ততই বড় হবে। পক্ষান্তরে গোনাহকে যতই বড় মনে করা হবে, তা আল্লাহর কাছে ততই ক্ষুদ্র হবে। জনৈক বুযুর্গ বলেন : তিনটি বিষয় ব্যতীত খয়রাত পূর্ণ হয় না- এক, খয়রাতকে ক্ষুদ্র জ্ঞান করা, দুই খয়রাত আদায়ে বিলম্ব না করা এবং তিন, গোপনে খয়রাত করা।
আত্মপ্রীতি ও বড় মনে করা সকল এবাদতেই রয়েছে। এর প্রতিকার হল এলেম ও আমল। এলেম একথা জানা যে, সমস্ত মালের মধ্যে দশ ভাগের একভাগ অথবা চল্লিশ ভাগের এক ভাগ খুবই কম। এ পরিমাণ খয়রাত নেহায়েত নিম্নস্তরের খয়রাত। সুতরাং এই নিম্নস্তরের খয়রাতের জন্যে লজ্জা করা উচিত- একে বড় মনে করা উচিত নয়। আর যদি কেউ সমস্ত মাল অথবা অধিকাংশ মাল খয়রাত করে তবে তার চিন্তা করা উচিত যে, মাল তার কাছে কোত্থেকে এল এবং সে তা কোথায় ব্যয় করছে। মাল তো আসলে আল্লাহ তাআলার। তিনি অনুগ্রহপূর্বক বান্দাকে দান করেছেন এবং ব্যয় করার তওফীক দিয়েছেন। সুতরাং আল্লাহর পথে অধিকাংশ দান করে তাকে বড় মনে করা উচিত নয়। যদি দোয়ার নিয়তে মাল দান করে, তবে যার বিনিময়ে দ্বিগুণ ত্রিগুণ সওয়াব পাবে, তাকে বড় মনে করবে কেন? আমল এই যে, লজ্জিত হয়ে দান করবে। কারণ, অবশিষ্ট মাল নিজের কাছে রেখে দেয়া হয়। এটা যেন এমন, যেমন কেউ কারও কাছে কিছু আমানত রাখে। এর পর ফেরত দেয়ার সময় কিছু অংশ ফেরত দেয় এবং কিছু অংশ রেখে দেয়। এটা লজ্জার বিষয় নয় কি? মাল সমস্তটাই আল্লাহর। তিনি সমস্তটা দান করার আদেশ দেননি। কারণ, কৃপণতার কারণে এ আদেশ পালন করা তোমাদের জন্যে কঠিন হত। সেমতে তিনি নিজেই বলেন "যদি তিনি আতিশয্য সহকারে সমস্ত মাল দান করার আদেশ দেন, তবে তোমরা কৃপণতা করবে; সানন্দে ও সন্তুষ্ট চিত্তে দান করবে না"।

>>সপ্তম আদব 
নিজের মালের মধ্যে যা উৎকৃষ্ট; পবিত্র ও অধিক পছন্দনীয় তাই খয়রাতের জন্যে বেছে নেয়া। কেননা, আল্লাহ তাআলা পবিত্র। তিনি পবিত্র মালই কবুল করেন। হযরত আনাস (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন : সুসংবাদ সেই ব্যক্তির জন্যে, যে গোনাহ ছাড়া হালাল উপায়ে অর্জিত মাল দান করে। নিকৃষ্ট মাল দান করার মানে হচ্ছে নিজের অথবা পরিবারের লোকদের জন্যে উৎকৃষ্ট মাল রাখা এবং আল্লাহ্ তাআলার উপর অন্যদেরকে অগ্রাধিকার দেয়া। এটা নিঃসন্দেহে বেআদবী । যদি কেউ মেহমানের সাথে এরূপ ব্যবহার করে এবং ভাল খাদ্য নিজেরা খেয়ে মেহমানের সামনে খারাপ খাদ্য পেশ করে, তবে মেহমান নিঃসন্দেহে তার শত্রু হয়ে যাবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন : "মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের উপার্জন থেকে এবং আমি মাটি থেকে যা উৎপন্ন করি, তা থেকে পবিত্র বস্তু ব্যয় কর। তোমরা ব্যয় করার জন্যে অপবিত্র বস্তুর নিয়ত করো না, যা তোমরা নিজেরা চক্ষু বন্ধ না করে গ্রহণ করতে পার না। অর্থাৎ এমন বস্তু দান করো না, যা তোমরা লজ্জা ও অপছন্দ ছাড়া গ্রহণ কর না"।
মোট কথা, আপন পালনকর্তার জন্যে এমন বস্তু পছন্দ করো না। হাদীসে আছে, এক দেরহাম লক্ষ দেরহামকেও পেছনে ফেলে দেয়। কারণ, মানুষ এই একটি দেরহামকে তার উৎকৃষ্ট ও হালাল মাল থেকে সানন্দে দান করে। আর কখনও লক্ষ দেরহাম এমন মাল থেকে দান করা হয়, যাকে সে নিজেই খারাপ মনে করে। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা তাদের নিন্দা করেছেন, যারা আল্লাহর জন্যে এমন বস্তু সাব্যস্ত করে, যা তারা নিজেদের জন্যে খারাপ মনে করে। আল্লাহ বলেন : "তারা তাদের অপছন্দনীয় বস্তু আল্লাহর জন্যে সাব্যস্ত করে। তাদের মুখ মিথ্যা বর্ণনা করে, পুণ্য তাদের জন্যই। এটা স্বতঃসিদ্ধ, তাদের জন্যে রয়েছে অগ্নি"।

>>অষ্টম আদব
দান খয়রাতের জন্যে এমন লোক তালাশ করা, যাদের দ্বারা দান-খয়রাত মর্যাদাশীল ও পবিত্র হয়। যেনতেন লোকের হাতে তা পৌঁছে দেয়া ঠিক নয়। ছয়টি গুণের মধ্যে থেকে দুটি গুণ যাদের মধ্যে পাওয়া যায় তাদেরকে খয়রাত দেবে। 
(১) এমন লোক তালাশ করবে, যে পরহেযগার, সংসারবিমুখ ও কেবল আখেরাতের ব্যবসায়ে লিপ্ত।
(২) বিশেষভাবে এলেমধারী ব্যক্তিকে খয়রাত দেবে।
(৩) তাকওয়ায় সাচ্চা ও তওহীদে পাকা ব্যক্তিকে খয়রাত দেবে।
(৪) যারা আপন অবস্থা গোপন রাখে, অভাব-অভিযোগ ও কষ্টের কথা খুব একটা বর্ণনা করে না, অথবা যেব্যক্তি পূর্বে ধনী ছিল, এখন সর্বস্বহারা, কিন্তু পূর্বের অভ্যাস পরিত্যাগ করে না এবং পুরোপুরি ভদ্রতা বজায় রেখে জীবন যাপন করে- এরূপ লোককে খয়রাত দেবে।
(৫) যারা অধিক সন্তান-সন্ততিসম্পন্ন অথবা রোগাক্রান্ত অথবা কোন কারণে দুর্দশাগ্রস্ত, তাদেরকে খয়রাত দেবে।
(৬) যে ফকীর আত্মীয় এবং রক্তের সাথে সম্পর্কশীল, তাকে খয়রাত দেবে। এতে খয়রাতও হবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্কও বজায় থাকবে।
পরের পর্বে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

পরবর্তী পর্ব

শুক্রবার, ২৯ মার্চ, ২০২৪

যাকাত (পর্ব– ৩) যাকাত ওয়াজেব হওয়ার কারণ



যাকাত পর্ব– ৩
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যাকাত ওয়াজেব হওয়ার কারণ-
উল্লেখ্য, যাকাতদাতা ব্যক্তি কয়েকটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখবে। প্রথমতঃ মনে মনে ফরয যাকাত দেয়ার নিয়ত করা। অমুক অমুক মালের যাকাত দেই— এরূপ নির্দিষ্ট করা জরুরী নয়। ওলীর নিয়ত উন্মাদ ও অপ্রাপ্ত বয়স্কের নিয়তের স্থলবর্তী হবে। তদ্রূপ শাসনকর্তার নিয়ত মালের মালিকের নিয়তের স্থলাভিষিক্ত হবে- যদি মালের মালিক যাকাত না দেয়। কিন্তু এটা দুনিয়ার বাহ্যিক বিধান। আখেরাতে সে দাবী থেকে মুক্ত হবে না যে পর্যন্ত নতুনভাবে যাকাত না দেয়। যাকাত দেয়ার জন্য কাউকে উকিল করা হলে এবং তখন নিয়ত করে নিলে অথবা উকিলকে নিয়তেরও উকিল করা হলে যথেষ্ট হবে। কেননা, নিয়তের জন্যে উকিল করাও নিয়ত। দ্বিতীয়তঃ বছর পূর্ণ হয়ে গেলে তড়িঘড়ি যাকাত দেয়া উচিত। সদকায়ে ফেতর ঈদের দিন থেকে বিলম্বিত করা উচিত নয়। 
যেব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মালের যাকাত দিতে বিলম্ব করে, সে গোনাহগার হবে। এর পর যদি তার মাল বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং যাকাতের প্রাপককে পাওয়ার সামর্থ্য থাকে, তবে যাকাত - তার যিম্মায় থেকে যাবে। যদি যাকাতের প্রাপক না পাওয়ার কারণে বিলম্ব হয় এবং ইতিমধ্যে মাল বিলুপ্ত হয়ে যায় তবে যাকাত যিম্মায় থাকবে না। বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বেও যাকাত দেয়া জায়েয যদি মাল নেসাব পরিমাণে হয়ে যায়। দু'বছরের যাকাত অগ্রিম দেয়াও জায়েয। অগ্রিম যাকাত দিলে যদি যাকাত গ্রহীতা মিসকীন বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে মারা যায় অথবা ধর্মত্যাগী হয়ে যায় অথবা অন্য কোন মাল প্রাপ্তির কারণে ধনী হয়ে যায়, অথবা মালের মালিকের মাল বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে যা কিছু সে অগ্রিম দিয়েছিল তা যাকাতরূপে গণ্য হবে না। দেয়ার সময় ফিরিয়ে দেয়ার শর্ত যোগ করে না থাকলে এটা ফেরত লওয়াও সম্ভবপর নয়। কাজেই মালের মালিককে অবশ্যই পরিণতির দিকে লক্ষ্য রেখে অগ্রিম যাকাত দিতে হবে।

তৃতীয়তঃ যাকাতস্বরূপ যে মাল ওয়াজেব হয়, তার বিনিময়ে মূল্য দিতে পারবে না; বরং যে মাল ওয়াজেব হয় তাই দেবে। এমনকি, স্বর্ণের বিনিময়ে রূপা এবং রূপার বিনিময়ে স্বর্ণ দেবে না, যদিও মূল্য বাড়িয়েই দেয়া হয়। সম্ভবতঃ যারা ইমাম শাফেয়ীর উদ্দেশ্য বুঝে না, তারা এ ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শন করে। তারা কেবল দেখে, ফকীরের অভাব দূর করাই উদ্দেশ্য। অথচ এটা প্রকৃত জ্ঞানের কথা নয়। কেননা, ফকীরের অভাব দূর করা যাকাতের উদ্দেশ্য ঠিকই; কিন্তু এটা পূর্ণ উদ্দেশ্য নয়; বরং উদ্দেশ্যের একটি অংশ মাত্র। শরীয়তের ওয়াজের বিষয়সমূহ তিন প্রকার। এক, নিছক এবাদত। এতে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের কোন দখল নেই। উদাহরণতঃ হজ্জে কংকর নিক্ষেপ করা। এতে কাজটি শুরু করাই শরীয়তের উদ্দেশ্য, যাতে বান্দা তার দাসত্ব ও গোলামী এমন কাজ দ্বারা প্রকাশ করে, যার অর্থ বোধগম্য নয়। কেননা, যে কাজের অর্থ বোধগম্য, তা সম্পাদনে মানুষের মনও সাহায্য করে। ফলে তাতে খাঁটি দাসত্ব প্রকাশ পায় না। কারণ একমাত্র মাবুদের আদেশের কারণেই কর্ম সম্পাদন করাকে দাসত্ব বলা হয়। হজ্জের অধিকাংশ ক্রিয়াকর্ম এমনি ধরনের। এ কারণেই রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) স্বীয় এহরামে এরশাদ করেন :
আমি উপস্থিত আছি দাসত্বস্বরূপ হজ্জের জন্যে। অর্থাৎ, এ এহরাম কেবল আনুগত্যের মাধ্যমে দাসত্ব প্রকাশ করা এবং যেভাবে আদেশ হয়েছে তা মেনে নেয়া এমন কোন যুক্তি ব্যতিরেকে, যা এ আদেশ পালনে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। দ্বিতীয় প্রকার ওয়াজেব কর্ম এমন, যার পেছনে কোন যুক্তিযুক্ত উদ্দেশ্য রয়েছে- নিছক এবাদত বা দাসত্ব প্রকাশ উদ্দেশ্য নয়; যেমন কর্জ শোধ করা এবং ছিনিয়ে নেয়া বস্তু ফেরত দেয়া। এতে নিয়ত ও কর্মই ধর্তব্য নয়; বরং হকদারের কাছে তার হক আসল অথবা বিনিময়- যেকোন আকারে পৌঁছে গেলেই ওয়াজেব আদায় হয়ে যাবে। এ দু'প্রকার ওয়াজেব সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা, ফলে সকলেরই বোধগম্য কিন্তু তৃতীয় প্রকার ওয়াজেব কর্মে বান্দার অভাব দূর করা এবং তার দাসত্ব পরীক্ষা করা উভয় বিষয় উদ্দেশ্য। এ প্রকার ওয়াজেব কর্মে উভয় বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা ওয়াজেব এবং যে বিষয় অধিক প্রকাশ্য, তার দিকে লক্ষ্য রেখে অপর বিষয়টি ভুলে যাওয়া উচিত নয়। কেননা, অপর বিষয়টি অর্থাৎ দাসত্ব পরীক্ষার দিকটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ হওয়া বিচিত্র নয়। যাকাত এমনি ধরনের একটি ওয়াজেব কর্ম। ইমাম শাফেয়ী ব্যতীত অন্য কেউ এ নিগূঢ় তত্ত্ব সম্পর্কেও ওয়াকিফহাল নয়। যাকাতে গরীবের অভাব দূর করা একটি প্রকাশ্যতম বিষয় বিধায় এটা সহজে বোধগম্য। বিস্তারিত বর্ণনা অনুযায়ী যাকাত প্রদান করে দাসত্ব প্রকাশ করাও শরীয়তের লক্ষ্য। এদিক দিয়েই যাকাত নামায ও হজ্জের সমকক্ষ হয়ে ইসলামের একটি স্তম্ভ সাব্যস্ত হয়েছে। এতে সন্দেহ নেই, প্রত্যেক প্রকারের মাল পৃথক করা, তা থেকে যাকাতের পরিমাণ বের করা এবং তা বর্ণিত আট প্রকার খাতে বন্টন করা একটি কঠিন কাজ। এতে শৈথিল্য করলে গরীবের স্বার্থে কোন ত্রুটি দেখা দেয় না; কিন্তু দাসত্ব প্রকাশে অবশ্যই ত্রুটি থেকে যায়।

চতুর্থতঃ যাকাতের অর্থ অন্য শহরে স্থানান্তর করবে না। কেননা প্রত্যেক শহরের মিসকীন সেই শহরের যাকাতের দিকে তাকিয়ে থাকে। স্থানান্তর করা হলে তাদের আশা ভঙ্গ হবে। স্থানান্তর করলে এক উক্তি অনুযায়ী যাকাত আদায় হয়ে যাবে, কিন্তু মতভেদজনিত সন্দেহ থেকে বেঁচে থাকা ভাল। কাজেই প্রত্যেক শহরের যাকাতের মাল সেই শহরের গরীবদের মধ্যে বন্টন করবে।

পঞ্চমতঃ কোরআনের বর্ণিত আট প্রকার খাতের মধ্যে থেকে যে কয় প্রকার খাত শহরে বিদ্যমান আছে, যাকাতের মাল ততভাগে ভাগ করবে। কেননা, নির্ধারিত খাতে যাকাতের অর্থ পৌঁছানো যাকাতদাতার উপর ওয়াজেব। নিন্মের আয়াতের বাহ্যিক অর্থ তাই। “যাকাত এই লোকদের কাছে পৌঁছা উচিত”। এ আয়াতটি এমন, যেমন কোন রুগ্ন ব্যক্তি ওসিয়ত করে, তার এক-তৃতীয়াংশ মাল ফকীর ও মিসকীনদের জন্যে। এ ওসিয়ত এটাই চায় যে, তার মালের মধ্যে উভয় প্রকার লোক অংশীদার থাকবে। আয়াতেও সকল প্রকারের অংশীদারিত্ব বুঝানো হয়েছে। এবাদত অধ্যায়ে বাহ্যিক বিষয়াদিতে লিপ্ত হওয়া থেকে বেঁচে থাকা উচিত এবং আভ্যন্তরীণ বিষয়াদির প্রতিও দৃষ্টি দেয়া বাঞ্ছনীয়। আট প্রকারের মধ্যে দু'প্রকার খাত তো অধিকাংশ শহরেই অনুপস্থিত। এক, অন্তর জয় করার জন্যে যাদেরকে যাকাত দেয়া হয় এবং দুই, যাকাতের কর্মচারীবৃন্দ। চার প্রকার খাত সকল শহরেই বিদ্যমান আছে- ফকীর-মিসকীন, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি ও নিঃস্ব মুসাফির। দু'প্রকার খাত কতক শহরে পাওয়া যায় এবং কতক শহরে পাওয়া যায় না । তারা হল গাযী ও মুকাতাব।
সুতরাং যাকাতদাতার শহরে যদি পাঁচ প্রকার খাত বিদ্যমান থাকে, "তবে যাকাতের অর্থ সমান পাঁচ ভাগে ভাগ করবে এবং প্রত্যেক প্রকার খাতকে এক ভাগ দেবে। প্রত্যেক খাতের সমান সংখ্যক ব্যক্তিকে দেয়াই ওয়াজেব নয়; বরং এক প্রকারের দশ ব্যক্তিকে এবং অন্য প্রকারের বিশ ব্যক্তিকে দেয়ার অধিকার যাকাতদাতার রয়েছে। তবে প্রত্যেক প্রকারের সংখ্যা যেন তিন জনের কম না হয়। সুতরাং শহরে পাঁচ প্রকার খাত বিদ্যমান থাকলে যাকাত পনর ব্যক্তির মধ্যে বন্টন করবে। যাকাতের পরিমাণ কম হওয়ার কারণে এভাবে বন্টন করা কঠিন হলে অন্য যাকাতদাতাদের সাথে শরীক হয়ে যাবে এবং সকলের মাল একত্রিত করে পনর ব্যক্তিকে সমর্পণ করবে, যাতে তারা পরস্পরে ভাগাভাগি করে নেয়। কেননা, সকলকে দেয়া জরুরী।

পরবর্তী পর্ব

যাকাত (পর্ব - ২) যাকাতের প্রকারভেদ

 

যাকাত পর্ব– ২
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যাকাতের প্রকারভেদ 
ধন-সম্পদের দিক দিয়ে যাকাত ছয় প্রকার। নিম্নে প্রত্যেক প্রকার আলাদা আলাদা বর্ণনা করা হচ্ছে।

(১) প্রথম প্রকার: গৃহপালিত জন্তুর যাকাত 
প্রত্যেক মুসলমান স্বাধীন ব্যক্তির উপর ওয়াজেব। তার বালেগ ও বুদ্ধিমান হওয়া শর্ত। এখন যে চতুষ্পদ জন্তুর উপর যাকাত ওয়াজেব হয় তার জন্যে শর্ত পাঁচটি ; 
>প্রথমতঃ বিশেষ চতুষ্পদ জন্তু হওয়া। কেননা, যাকাত কেবল উট, গরু ও ছাগলের মধ্যে ফরয। ঘোড়া, খচ্চর ও গাধার মধ্যে ফরয নয়। 
>দ্বিতীয় : জঙ্গলে ঘাস খাওয়া কেননা, যেসকল জন্তু গৃহেই ঘাস খায়, সেগুলোর উপর যাকাত নেই। 
>তৃতীয়তঃ এক বছর সময় অতিবাহিত হওয়া। কেননা, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : “যে মালের উপর দিয়ে এক বছর অতিবাহিত হয় না, তাতে যাকাত নেই”।
এ বিধানে বাচ্চা জন্তু বড় জন্তুর অনুগামী হয়। অর্থাৎ, বড় জন্তুর উপর দিয়ে এক বছর অতিবাহিত হয়ে গেলে বাচ্চাদেরও যাকাত দিতে হবে, যদিও সেগুলোর এক বছর পূর্ণ না হয়। বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই যা বিক্রয় করে দেয়া হয় অথবা দান করা হয়, তা হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হবে না। 
>চতুর্থতঃ মালের উপর পূর্ণ মালিকানা শর্ত। ফলে হারানো মালের যাকাত দেয়া ওয়াজেব নয়, যে পর্যন্ত তা পুনরায় হস্তগত না হয়। হস্তগত হলে অতীত দিনেরও যাকাত ওয়াজেব হবে। যার কর্জ তার সম্পূর্ণ মালের অধিক, তার উপর যাকাত নেই। কেননা, এরূপ মালের কারণে সে ধনী নয়। এ মাল প্রয়োজনের অতিরিক্ত হলে তাকে ধনী বলা যেত। 
>পঞ্চমতঃ নেসাব পূর্ণ হওয়া। এটা প্রত্যেক চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যে আলাদা আলাদা। উদাহরণতঃ উটের সংখ্যা পাঁচ না হওয়া পর্যন্ত তাতে যাকাত নেই। উট পাঁচটি হলে তাতে পূর্ণ এক বছর বয়সের একটি ভেড়া অথবা পূর্ণ দু'বছর বয়সের একটি ছাগল যাকাতস্বরূপ দিতে হবে। দশটি উটে দু'টি, পনরটিতে তিনটি এবং বিশটিতে চারটি ছাগল দিতে হবে। উট পঁচিশটি হলে তাতে একটি বিনতে মাখায অর্থাৎ উটের মাদী বাচ্চা, যা দ্বিতীয় বছরে পদার্পণ করে দিতে হবে। ছত্রিশটি উটে একটি বিনতে লাবুন, অর্থাৎ উটের মাদী বাচ্চা, যা তৃতীয় বছরে পদার্পণ করে দিতে হবে। ছেচল্লিশটি উটে একটি হিক্কা অর্থাৎ, চতুর্থ বছরের মাদী উট দিতে হবে। একষট্টিটি উটে জিযআ, অর্থাৎ পাঁচ বছর বয়সের একটি উষ্ট্রী দিতে হবে। ছিয়াত্তরে দুটি বিনতে লাবুন, একানব্বইয়ে দু'হিক্কা এবং একশ' একুশ “উটে তিনটি বিনতে লাবুন দিতে হবে। এর পর উটের সংখ্যা একশ' ত্রিশ হয়ে গেলে প্রতি পঞ্চাশটিতে একটি হিক্কা এবং প্রতি চল্লিশটিতে একটি বিনতে লাবুন যাকাত দিতে হবে। এই হিসাবে একশ' ত্রিশটিতে একটি হিক্কা ও দুটি বিনতে লাবুন যাকাত দিতে হবে। গাভী ও বলদে ত্রিশটি হওয়া পর্যন্ত যাকাত নেই। ত্রিশটি হয়ে গেলে একটি তরী (দ্বিতীয় বছরে উপনীত নর বাছুর) যাকাত দিতে হবে। চল্লিশটি হলে একটি মুসিন্না অর্থাৎ, যে মাদী বাছুর তৃতীয় বছরে পদার্পণ করে- দিতে হবে। ষাটটি হলে দুটি তবী দিতে হবে। এর পর প্রত্যেক চল্লিশটিতে একটি মুসিন্না ও প্রত্যেক ত্রিশটিতে একটি তবী যাকাত দিতে হবে। চল্লিশটি না হওয়া পর্যন্ত ছাগল ভেড়ার মধ্যে যাকাত নেই। চল্লিশটি হলে তাতে একটি ভেড়ার ‘জিযআ’ (পূর্ণ এক বছরের ভেড়া) অথবা ছাগলের ‘ছানিয়া' (পূর্ণ দু'বছরের ছাগল) দিতে হবে। এরপর একশ' বিশ পর্যন্ত এ হার অব্যাহত থাকবে। একশ' একুশটি হলে দুশ' পর্যন্ত দু'টি ছাগল দিতে হবে। দুশ'এক হয়ে গেলে তিনশ' নিরানব্বই পর্যন্ত তিনটি ছাগল এবং চারশ' হয়ে গেলে চারটি ছাগল দিতে হবে। অতঃপর প্রতি শ'তে একটি করে ছাগল দিতে হবে। নেসাবের মধ্যে দু'শরীকের যাকাত এক মালিকের মতই হবে। উদাহরণতঃ দু'ব্যক্তির শরীকানায় চল্লিশটি ছাগল থাকলে তাদের উপর এক ছাগলই ওয়াজেব হবে এবং তিন ব্যক্তির শরীকানায় একশ' বিশটি ছাগল থাকলে সকলের উপর এক ছাগলই ওয়াজেব হবে । অথচ আলাদা করলে প্রত্যেক ব্যক্তির ভাগে চল্লিশটি করে ছাগল পড়ে এবং তাতে একটি করে ছাগল ওয়াজেব হতে পারে। পালের মধ্যে সুস্থ জন্তু থাকলে অসুস্থ জন্তু যাকাতস্বরূপ গ্রহণ করা জায়েয নয়। ভাল জন্তুর মধ্যে ভাল এবং মন্দ জন্তুর মধ্যে মন্দ জন্তুই নিতে হবে।
(২) দ্বিতীয় প্রকার : খাদ্য জতীয় ফসলের যাকাত  
এরূপ ফসল আটশ' সের অর্থাৎ বিশ মণ হলে তাতে দশ ভাগের একভাগ যাকাত দিতে হবে। ফলমূল ও তুলার মধ্যে যাকাত নেই। খোরমা ও কিশমিশ শুষ্ক অবস্থায় বিশ মণ হলে তাতে যাকাত ওয়াজেব।
(৩) তৃতীয় প্রকার : রৌপ্য ও স্বর্ণের যাকাত  
যদি খাঁটি রৌপ্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা হয় এবং এক বছর অতিবাহিত হল, তার যাকাত চল্লিশ ভাগের এক ভাগ। রৌপ্য আরও বেশী হলে এ হিসাবেই যাকাত ওয়াজেব হবে, যদিও এক দেরহাম বেশী হয়। স্বর্ণের নেসাব সাড়ে সাত তোলা। এতেও বছরান্তে চল্লিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত ওয়াজেব। এক রতি বেশী হলেও এ হিসাবেই যাকাত দিতে হবে। পক্ষান্তরে নেসাব থেকে এক রতি কম হলেও যাকাত ওয়াজেব হবে না।

(৪) চতুর্থ প্রকার পণ্য দ্রব্যের যাকাত- 
এতে সোনা রূপার মত চল্লিশ ভাগের একভাগ যাকাত দিতে হয়। এর বছর গণনা সেদিন থেকে হবে, যেদিন পণ্যদ্রব্য কেনার নেসাব পরিমাণ নগদ অর্থ ব্যবসায়ীর মালিকানায় আসে। যদি সেই নগদ অর্থ নেসাবের কম হয় অথবা দ্রব্যের বিনিময়ে ব্যবসা করার নিয়তে মাল ক্রয় করে, তবে বছরের শুরু ক্রয় করার সময় থেকে হবে। বছরের শেষে পণ্যদ্রব্যের যে মুনাফা অর্জিত হয়, মূলধনের উপর এক বছর অতিবাহিত হয়ে গেলে মুনাফার উপর যাকাত ওয়াজেব হয়ে যায়। মুনাফার উপর নতুনভাবে বছর অতিবাহিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।

(৫) পঞ্চম প্রকার : মাটির নীচে পুঁতে রাখা মাল ও খনিজ সামগ্রীর যাকাত 
পুঁতে রাখা মাল মানে সেই মাল, যা কুফরের আমলে পুঁতে রাখা হয় এবং এমন জমিনে পাওয়া যায়, ইসলামী আমলে যার উপর কারও মালিকানা হয়নি। যেব্যক্তি এই পুঁতে রাখা মাল পাবে, তার কাছ থেকে সোনা-রূপা হলে এক পঞ্চমাংশ নেয়া হবে। এতে বছর অতিবাহিত হওয়ার শর্ত নেই। নেসাবের শর্ত না হওয়াও উত্তম। কেননা, এক পঞ্চমাংশ ওয়াজেব হওয়ার কারণে যুদ্ধলব্ধ মালের সাথে এর সামঞ্জস্য বেশী। নেসাবের শর্ত রাখা হলেও তা অবান্তর নয়। কেননা, এই এক পঞ্চমাংশ এবং যাকাতের মাসরাফ তথা ব্যয় খাত একই। এ কারণেই সহীহ্ মাযহাব অনুযায়ী খাঁটি সোনা রূপাকেই 'দফীনা' তথা পুঁতে রাখা মাল বলা হবে, অন্য কিছুকে নয়। খনিজ পদার্থের মধ্যে কেবল সোনা-রূপার উপরই যাকাত ওয়াজেব হয়- অন্য কোন দ্রব্যের উপর ওয়াজেব হয় না । সোনা-রূপা খনি থেকে বের করে নেয়ার পর বিশুদ্ধতম উক্তি মোতাবেক তাতে চল্লিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত ওয়াজেব হবে। এ উক্তি অনুযায়ী নেসাব হওয়া শর্ত। বছর অতিবাহিত হওয়ার ব্যাপারে দু'উক্তির মধ্যে এক উক্তি হচ্ছে, খনির সোনা-রূপার মধ্যে এক পঞ্চমাংশ ওয়াজেব। কাজেই বছর অতিবাহিত হওয়ার শর্ত নেই।

সাবধানতা হচ্ছে অল্প হোক কি বেশী, সকল প্রকার খনি থেকে এক পঞ্চমাংশ প্রদান করা এবং বিশেষভাবে সোনা-রূপার খনি নয়- প্রত্যেক খনি থেকে এক-পঞ্চমাংশ দেয়া- যাতে মতভেদের কোন সন্দেহ অবশিষ্ট না থাকে।
(৬) ষষ্ঠ প্রকার সদকায়ে ফেতর- 
এটা এমন প্রত্যেক মুসলমানের উপর ওয়াজেব, যার কাছে ঈদুল ফেতরের দিনে তার এবং তার পরিবারের খাদ্যের অতিরিক্ত এক ছা' খাদ্য মৌজুদ থাকে। তিন সের আধা ছটাকে এক ছা' হয়। সদকায়ে ফেতরের পরিমাণ মাথাপিছু এক ছা'। পরিবারে যে খাদ্য খাওয়া হয়, তা অথবা তা থেকে উত্তম খাদ্য দেবে। সুতরাং পরিবারে গম খাওয়া হলে যব দেয়া দুরস্ত নয়। বিভিন্ন প্রকার খাদ্য খাওয়া হলে যেটি উত্তম সেটি দেবে; যেকোন একটি দিলেও হবে। (১) পুরুষ গৃহকর্তার উপর তার স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি এবং যাদের ভরণ-পোষণ করতে হয়, এমন আত্মীয়দের সদকা দেয়া ওয়াজেব। যেমন, বাপ-দাদা, মা-নানী ইত্যাদি। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : তোমরা যাদের ভরণ পোষণ কর তাদের সদকায়ে ফেতর আদায় করে দাও। স্ত্রী নিজের পক্ষ থেকে ফেতরা দিয়ে দিলে যথেষ্ট হবে। যদি কারও কাছে এতটুকু খাদ্যই অতিরিক্ত হয়, যা কতক লোকের পক্ষ থেকে দিতে পারে, তবে কতক লোকের পক্ষ থেকেই আদায় করবে। তবে যাদের ভরণ-পোষণের তাকিদ বেশী, প্ৰথমে তাদের ফেতরা দেবে।

মোট কথা, প্রত্যেক ধনী ব্যক্তির এসব বিধান জেনে নেয়া উচিত এবং কোন বিরল পরিস্থিতির উদ্ভব হলে আলেমগণের কাছ থেকে ফতোয়া নিয়ে তার উপর আমল করা দরকার।

হানাফী মাযহাব মতে সদকায়ে ফেতর এমন প্রত্যেক মুসলমানের উপর ওয়াজেব, যে প্রয়োজনীয় বাসস্থান, অন্ন বস্ত্র ও সাজসরন্জামের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ মালের মালিক হয়। এ নেসাবের উপর বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়। এ সদকা সে নিজের থেকে, নিজের সন্তানদের পক্ষ থেকে এবং খেদমতের গোলামদের পক্ষ থেকে আদায় করবে। স্ত্রী এবং বয়স্ক সন্তানদের পক্ষ থেকে দিতে হবে না। সদকায়ে ফেতরের পরিমাণ গম ও গম জাতীয় খাদ্যের অর্ধ ছা' এবং যব ও খেজুরের এক ছা'। এ পরিমাণ গমের মূল্য দিলেও সদকায়ে ফেতর আদায় হবে।

পরবর্তী পর্ব

বৃহস্পতিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৪

যাকাত (পর্ব– ১) যাকাতের বর্ণনা - এহইয়াউ উলুমিদ্দিন



যাকাত পর্ব– ১
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যাকাতের বর্ণনা—
জানা উচিত, আল্লাহ তাআলা যাকাতকে ইসলামের একটি স্তম্ভ করেছেন এবং নামাযের পর এর কথাই উল্লেখ করেছেন। বলা হয়েছে : “তোমরা নামায কায়েম কর এবং যাকাত প্রদান কর”। 
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : “ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। এ বিষয়ে - সাক্ষ্য দেয়া, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর বান্দা ও রসূল, নামায কয়েম করা এবং যাকাত প্রদান করা।

যারা যাকাত প্রদান করে না, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কঠোর শাস্তিবাণী উচ্চারণ করেছেন। বলা হয়েছে :
“যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিন”।

এ আয়াতে আল্লাহর পথে ব্যয় করার অর্থ যাকাত প্রদান করা। আহ্নাফ ইবনে কয়স (রাঃ) বলেন : আমি কযেকজন কোরায়েশের মধ্যে উপবিষ্ট ছিলাম, এমন সময় হযরত আবু যর (রাঃ) সেখান দিয়ে গমন করলেন। তিনি বললেন : কাফেরদেরকে শুনিয়ে দাও একটি দাগের খবর, যা তাদের পিঠে লাগবে এবং পাঁজরের হাড্ডি হয়ে বের হবে। আরেকটি দাগ তাদের গ্রীবায় লাগবে এবং কপাল পার হয়ে যাবে। অতঃপর তিনি বললেন : আমি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে এমন সময়ে পৌঁছলাম, যখন তিনি কাবা গৃহের ছায়ায় উপবিষ্ট ছিলেন। তিনি আমাকে দেখে বললেন : “কাবার পালনকর্তার কসম, তারাই বেশী ক্ষতিগ্রস্ত”। 
আমি আরজ করলাম : হুযুর, কাদের কথা বলছেন? তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন : “যাদের কাছে প্রচুর ধন-সম্পদ রয়েছে। কিন্তু যারা ডানে, বামে, সম্মুখে ও পেছনে ধন-সম্পদ ছড়ায় এবং খয়রাত করে (তাদের কথা আলাদা)”, এরূপ লোকের সংখ্যা খুব কম। তিনি আরও বললেন : “যে উটওয়ালা, ছাগলওয়ালা ও গরুওয়ালা তাদের যাকাত প্রদান করে না, কেয়ামতের দিন এসব জন্তু খুব বড় ও মোটাতাজা হয়ে আসবে এবং এ ব্যক্তিকে শিং দ্বারা গুঁতো মারবে আর খুর দ্বারা পিষ্ট করবে। যখন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সকল জন্তু তাকে মারা শেষ করবে, তখন পুনরায় এমনিভাবে শুরু করবে। মানুষের মধ্যে ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত এই আযাব অব্যাহত থাকবে”।

পরবর্তী পর্ব

রবিবার, ১০ মার্চ, ২০২৪

রোযা (৬) নফল রোযা - এহইয়াউ উলুমিদ্দিন


রোযা - (পর্ব- ৬)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - 🖌️ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
নফল রোযা
প্রকাশ থাকে যে, উত্তম দিনে রোযা রাখা উত্তম হয়ে থাকে। উত্তম দিনসমূহের মধ্যে কতক সম্বৎসরের মধ্যে, কতক প্রত্যেক মাসে এবং কতক প্রতি সপ্তাহে পাওয়া যায়। সম্বৎসরের মধ্যে যেসব দিন পাওয়া যায়, সেগুলো হচ্ছে আরাফার দিন, আশুরার দিন, যিলহজ্জের প্রথম দশ দিন ও মহররমের দশ দিন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) শা'বান মাসে এত বেশী রোযা রাখতেন যে, মনে হত তাও যেন রমযান মাস। এক হাদীসে আছে- রমযানের রোযার পর উত্তম রোযা হচ্ছে মহররমের রোযা। এর কারণ, মহররম বছরের প্রথম মাস। এ মাসকে সৎ কাজ দ্বারা পরিপূর্ণ করলে সারা বছর এর বরকত আশা করা যায়। এক হাদীসে আছে- মহররম। মাসে একদিন রোযা রাখা অন্য মাসের ত্রিশ রোযার চেয়েও উত্তম। রমযান মাসে একদিন রোযা রাখা মহররমে ত্রিশ রোযার চেয়ে উত্তম। এক হাদীসে আছে- যেব্যক্তি মহররম মাসে তিন দিন অর্থাৎ বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবারে রোযা রাখে, তার প্রত্যেক রোযার বিনিময়ে সাতশ' বছরের এবাদতের সওয়াব লেখা হয়। এক হাদীসে আছে- শাবানের অর্ধেকের পর রমযান পর্যন্ত কোন রোযা নেই। এ কারণেই রমযানের পূর্বে কিছু দিন রোযা না রাখা উত্তম। শাবানের রোযার সাথে রমযানের রোযা মিলিয়ে দেয়াও জায়েয। কারণ রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) একবার এরূপও করেছেন। কোন কোন সাহাবী সম্পূর্ণ রজব মাস রোযা রাখা মাকরূহ বলেছেন, যাতে রমযান মাসের মত না হয়ে যায়। মোট কথা, যিলহজ্জ, মহররম রজব ও শাবান উত্তম মাস। এক হাদীসে আছে, যিলহজ্জের দশ দিনের তুলনায় এমন কোন দিন নেই, যাতে আমল করলে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় হয়। এর এক দিনের রোযা সারা বছরের রোযার সমান। এর এক রাত্রির জাগরণ শবে কদরে জাগরণের সমান। লোকেরা জিজ্ঞেস করল : আল্লাহর পথে জেহাদ করাও কি এই দিনের আমলের সমান নয়। তিনি বললেন: জেহাদও সমান নয়, তবে যদি তার ঘোড়া মারা যায় এবং সে নিজে শহীদ হয়।

যেসকল দিন মাসের মধ্যে উত্তম পাওয়া যায়, সেগুলো হচ্ছে মাসের শুরু, মধ্যবর্তী ও শেষ দিনসমূহ। মাসের মধ্যবর্তী দিনগুলোকে আইয়ামে-বীয বলা হয়। এগুলো হচ্ছে চান্দ্রমাসের তের, চৌদ্দ ও পনর তারিখ। সপ্তাহের উত্তম দিন হচ্ছে সোম, বৃহস্পতি ও শুক্রবার। উল্লিখিত উত্তম দিনগুলোতে রোযা রাখা ও বেশী পরিমাণে খয়রাত করা মোস্তাহাব। এসব দিনের বরকতে আমলের সওয়াব অনেক বেড়ে যায়।

সর্বকালের রোযার মধ্যে আরও অতিরিক্ত দিনসহ এ সকল দিনও শামিল। কিন্তু এ ব্যাপারে সাধককুলের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ সর্বকালের রোযা মাকরূহ বলেন। হাদীস থেকে তাই বুঝা যায়। সর্বকালীন রোযার এক প্রকার হচ্ছে দুই ঈদের দিন এবং তাশরীকের দিনগুলোতেও রোযা রাখা। একে সওমে দাহর বলা হয়। এই প্রকার রোযা যে মাকরূহ, তা বলাই বাহুল্য। এ ছাড়া সর্বকালীন রোযার মধ্যে রোযার বিরতি জনিত সুন্নত, থেকে মুখ ফেরানো হয় এবং রোযাকে নিজের উপর জরুরী করে নেয়া হয়। অথচ আল্লাহর পক্ষ থেকে রোযা না রাখার যে অনুমতি আছে, তা পালন করা আল্লাহ পছন্দ করেন, যেমন ফরয ও ওয়াজেব পালন করা তিনি পছন্দ করেন। এ কারণেও সর্বকালীন রোযা মাকরূহ। যদি সর্বকালীন রোযা রাখার মধ্যে উপরোক্ত দুটি অনিষ্টের মধ্য থেকে একটিও না হয় এবং সর্বকালীন রোযা রাখার মধ্যে নফসের কল্যাণ জানা যায়, তবে সর্বকালীন রোযা রাখবে। কেননা, অনেক সাহাবী ও তাবেয়ী সর্বকালীন রোযা রেখেছেন। হযরত আবু মূসা আশআরী (রঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ "যেব্যক্তি দাহরের রোযা রাখে, জাহান্নামে তার জন্য কোন স্থান থাকে না"।

রোযার আর একটি স্তর হচ্ছে অর্ধ দাহরের রোযা রাখা। অর্থাৎ, একদিন রোযা রাখা ও একদিন রোযা না রাখা। এভাবে সারা জীবন রোযা রাখা। এটা নফসের জন্যে অধিক কঠিন। ফলে নফস খুব দমিত হয়। হাদীসে এ রোযার ফযীলত বর্ণিত আছে। এ রোযায় বান্দা একদিন সবর করে ও একদিন শোকর করে। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ আমার সামনে দুনিয়ার ধন-ভান্ডারের চাবি এবং ভূপৃষ্ঠে সমাহিত ধন-সম্পদ পেশ করা হয়েছে। আমি সেগুলো প্রত্যাখ্যান করে বলেছিঃ আমি একদিন অভুক্ত থাকব এবং একদিন পেট পুরে আহার করব। যেদিন পেট পুরে খাব, সেদিন আপনার প্রশংসা করব। আর যেদিন অভুক্ত থাকব, সেদিন আপনার কাছে মিনতি করব। এক হাদীসে আছে- "আমার ভাই দাউদ (আঃ)-এর রোযা উত্তম রোযা ছিল। তিনি একদিন রোযা রাখতেন ও একদিন রোযা রাখতেন না"।

জীবনের অর্ধেক দিন রোযা রাখা সম্ভব না হলে এক-তৃতীয়াংশ দিন রোযা রাখবে। অর্থাৎ, একদিন রোযা রাখবে এবং দুদিন রোযা রাখবে না। মাসের প্রথম তিন দিন, আইয়ামে বীযের তিন দিন এবং শেষ তিন দিন রোযা রাখলে এক-তৃতীয়াংশে এবং উত্তম দিনেও রোযা হয়ে যায়। সপ্তাহে সোম, বৃহস্পতি ও শুক্রবারে রোযা রাখলে এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশী হয়ে যায়।

যেব্যক্তি অন্তরের সূক্ষ্ম অবস্থা বুঝে এবং আপন অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখে, কোন কোন সময় চায়, সে সর্বকালে রোযা রাখুক এবং কখনও চায়, সর্বকালে রোষা না রাখুক। আবার কখনও চায়, মাঝে মাঝে রোযা রাখুক। এ কারণেই বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কখনও এত রোযা রাখতেন যে, লোকেরা মনে করত তিনি আর কখনও রোযা ছাড়বেন না। কখনও এত বেশী দিন রোযাহীন অবস্থায় অতিবাহিত করতেন যে, মানুষ মনে করত, তিনি আর রোযা রাখবেন না। তিনি রাত্রিকালে এত বেশী নিদ্রা যেতেন, মনে করা হত, তাহাজ্জুদের জন্যে গাত্রোত্থান করবেন না। আবার জাগরণও এত বেশী করতেন যে, বলা হত আর নিদ্রা যাবেন না। কোন কোন আলেম নিরন্তর চার দিনের বেশী রোযাহীন অবস্থায় থাকা মাকরূহ বলেছেন। তাঁদের মতে এটা অন্তরকে কঠোর করে, বদভ্যাস সৃষ্টি করে এবং কামনা বাসনার দ্বার উন্মুক্ত করে। বাস্তবে রোযাহীন অবস্থা অধিকাংশ লোকের মধ্যে এ প্রভাবই সৃষ্টি করে। বিশেষতঃ যারা দিনে ও রাতে দু'বার আহার করে, তাদের জন্যে এটা খুবই ক্ষতিকর।

সমাপ্ত

রোযা - ৫) রোষার আভ্যন্তরীণ শর্তসমূহ


রোযা - (পর্ব- ৫)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - 🖌️ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

রোষার আভ্যন্তরীণ শর্তসমূহ
প্রকাশ থাকে যে, রোযার তিনটি স্তর আছে- সাধারণের রোযা, বিশেষ ব্যক্তিগণের রোযা এবং বিশিষ্টতম ব্যক্তিবর্গের রোযা।

সাধারণের রোযা হচ্ছে, উদর ও লজ্জাস্থানকে কামোদ্দীপনা পূর্ণ করা থেকে বিরত রাখা; যেমন পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের রোযা হচ্ছে চক্ষু, কর্ণ, জিহ্বা, হাত-পা এবং সমস্ত অঙ্গকে গোনাহ থেকে বিরত রাখা এবং বিশিষ্টতম ব্যক্তিবর্গের রোযা হচ্ছে, অন্তরকে দুঃসাহস, পার্থিব চিন্তা এবং আল্লাহ ব্যতীত সকল বিষয় থেকে ফিরিয়ে রাখা। এই প্রকার রোযা আল্লাহ তাআলা ও আখেরাত ছাড়া অন্য বস্তুর চিন্তা এবং সাংসারিক চিন্তার কারণে নষ্ট হয়ে যায়। হাঁ, ধর্ম পালনের জন্যে যতটুকু পার্থিব চিন্তা জরুরী, ততটুকুর চিন্তা রোযা নষ্ট করে না। কেননা, এটা আখেরাতের পাথেয়- দুনিয়ার নয়। এমনকি, বুযুর্গগণ বলেন: যেব্যক্তি দিনের বেলায় এ চিন্তায় ব্যাপৃত হয় যে, ইফতারীর ব্যবস্থা করে নেয়া, দরকার, তাকে ভ্রান্ত বলা হবে। কেননা, সে আল্লাহ তাআলার কৃপার উপর ভরসা কম করে এবং তাঁর প্রতিশ্রুত রিযিকে বিশ্বাস কম রাখে। এটা নবী, সিদ্দীক ও নৈকট্যশীলগণের স্তর। আমরা এ স্তরের অধিক বর্ণনা দিতে চাই না। এই রোযা তখন অর্জিত হয়, যখন মানুষ সমস্ত সাহসিকতা সহকারে আল্লাহ তাআলার প্রতি মনোনিবেশ করে, অন্য সবকিছুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং এই আয়াতের বিষয়বস্তু তার উপর আচ্ছন্ন হয়ে যায়- “বলুন, আল্লাহ, অতঃপর তাদেরকে তাদের ছিদ্রান্বেষা নিয়ে খেলা করতে দেন”।

বিশিষ্ট অর্থাৎ সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিদের রোযা অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে গোনাহের কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখার মাধ্যমে অর্জিত হয়। ছয়টি বিষয় দ্বারা এই রোযা পূর্ণতা লাভ করে।

(১) দৃষ্টি নত রাখা, মন্দ বিষয়সমূহের প্রতি দৃষ্টিপাত না করা এবং

আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে দেয় এমন বিষয় থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখা। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: মন্দ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করা শয়তানের একটি বিষ মিশ্রিত তীর। আল্লাহ তাআলার ভয়ে যে এটা বর্জন করে, আল্লাহ তাকে এমন ঈমান দান করেন, যার মিষ্টতা সে অন্তরে অনুভব করে। 
হযরত জাবের (রাঃ) রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) থেকে রেওয়ায়েত করেন: “পাঁচটি বিষয় রোযাদারের রোযা নষ্ট করে দেয়- মিথ্যা বলা, কুটনামি করা, পশ্চাদনিন্দা করা, মিথ্যা কসম খাওয়া এবং কামভাব সহকারে দৃষ্টিপাত করা।

(২) অনর্থক কথাবার্তা, মিথ্যা, পরনিন্দা, অশ্লীলতা, জুলুম, কলহ বিবাদ ইত্যাদি গর্হিত কর্ম থেকে রসনা সংযত রাখা, সাধ্যমত নিরবতা পালন করা এবং যিকির ও তেলাওয়াতে ব্যাপৃত থাকা এটা জিহ্বার রোযা! সুফিয়ান সওরী (রঃ) বলেন: পরনিন্দা রোযা বিনষ্ট করে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) থেকে বর্ণিত আছে- দুটি অভ্যাস রোযা নষ্ট করে- পরনিন্দা ও মিথ্যা। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: রোযা ঢাল। তোমাদের কেউ যখন রোযা রাখে, তখন যেন মূর্খোচিত ও অশ্লীল কথা না বলে। কেউ তার সাথে ঝগড়া করলে অথবা গালি দিলে সে যেন বলে দেয়- আমি রোযাদার। এক হাদীসে আছে- রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর আমলে দু'জন মহিলা রোযা রাখে। রোযার শেষ ভাগে তাদের ক্ষুধা ও পিপাসা তীব্র আকার ধারণ করে এবং তারা মৃত্যুর নিকটবর্তী হয়ে পড়ে। তারা রোযা ভঙ্গের অনুমতি নেয়ার জন্যে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে একজনকে প্রেরণ করল। তিনি প্রেরিত লোকের হাতে একটি পেয়ালা দিয়ে বললেন: মহিলাদ্বয়কে বলো, তারা যা খেয়েছে তা যেন এই পেয়ালায় বমি করে দেয়। একজন মহিলা তাজা রক্ত ও টাটকা মাংস দিয়ে অর্ধেক পেয়ালা ভরে দিল। অপর মহিলাও এসব বস্তু বমি করল। ফলে পেয়ালা কানায় কানায় ভর্তি হয়ে গেল। ব্যাপার দেখে লোকেরা বিস্ময় প্রকাশ করল। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: তারা উভয়েই আল্লাহর হালাল করা বস্তু দ্বারা রোযা রেখেছে এবং হারাম করা বস্তু দ্বারা রোযা নষ্ট করেছে। তারা একে অপরের কাছে বসে পরনিন্দায় মেতে উঠেছে। তাদের এই পরনিন্দাই পেয়ালায় গোশতের আকারে দেখা যাচ্ছে।

(৩) কুকথা শ্রবণ থেকে কর্ণকে বিরত রাখা। কেননা, যেসব কথা বলা হারাম সেগুলো শ্রবণ করাও হারাম। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা মিথ্যা শ্রবণকারী ও হারাম ভক্ষণকারীদের পাশাপাশি উল্লেখ করেছেন। বলা হয়েছে: "তারা মিথ্যা শ্রবণকারী ও হারাম ভক্ষণকারী"। আরও বলা হয়েছে- "তাদের দরবেশ ও আলেমগণ তাদেরকে গোনাহের কথা বলতে এবং হারাম ভক্ষণ করতে নিষেধ করে না কেন"?
সুতরাং পরনিন্দা শুনে চুপ থাকা হারাম। আল্লাহ বলেন "তখন তোমরাও তাদের মত।" 
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ (কথনকারী ও শ্রবণকারী উভয়েই গোনাহে শরীক।

(৪) হাত, পা ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে খারাপ বিষয় থেকে এবং ইফতারের সময় পেটকে সন্দেহযুক্ত খাদ্য থেকে বিরত রাখা। কেননা, যদি কেউ সারাদিন হালাল থেকে বিরত থাকে এবং হারাম দ্বারা ইফতার করে, তবে তার রোযা কিছুই হয় না। সে সেই ব্যক্তির মত, যে একটি প্রাসাদ তৈরী করে এবং একটি নগরী বিধ্বস্ত করে। কেননা, হালাল খাদ্যের আধিক্যই ক্ষতিকর। এ ক্ষতি হ্রাস করার জন্যে রোযার বিধান যেব্যক্তি অনেক ওষুধ সেবনের ক্ষতিকে ভয় করে বিষ পান করে, সে নির্বোধ। হারাম খাদ্য বিষতুল্য, যা ধর্ম বরবাদ করে এবং হালাল খাদ্য ওষুধ স্বরূপ, যা কম খাওয়া উপকারী এবং বেশী খাওয়া ক্ষতিকর।

রোযার উদ্দেশ্য হালালের ক্ষতি হ্রাস করা। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন- "অনেক রোযাদারের রোযায় ক্ষুধা ও তৃষ্ণা ছাড়া কিছুই লাভ হয় না"। কেউ কেউ বলেন, যে হারাম দ্বারা ইফতার করে, হাদীসে তাকেই বুঝানো হয়েছে। কারও কারও মতে সে ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যে হালাল খাদ্য থেকে বিরত থাকে এবং মানুষের গোশত অর্থাৎ গীবত দ্বারা ইফতার করে, যা হারাম। আবার কেউ কেউ বলেন, যেব্যক্তি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গোনাহ থেকে বাঁচিয়ে রাখে না, হাদীসে তাকে বুঝানো হয়েছে।

(৫) ইফতারে হালাল খাদ্য এত বেশী খেতে নেই যাতে পেট স্ফীত হয়ে যায়। কেননা, আল্লাহ তাআলার কাছে হালাল খাদ্য দ্বারা পরিপূর্ণ পেটের চেয়ে অধিক মন্দ পাত্র আর একটিও নেই। এছাড়া সারা দিনের। ক্ষুধা ও পিপাসার ক্ষতি ইফতারের সময় পূরণ করে নেয়া হলে মানুষ রোযা দ্বারা শয়তানকে কিরূপে দাবিয়ে রাখবে এবং কামভাবকে কিরূপে চূর্ণ করবে? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, রোযার মধ্যে নানা প্রকারের খাদ্যের আয়োজন হয়ে থাকে। সেমতে মানুষের অভ্যাস এই দাঁড়িয়েছে যে, তারা রমযান মাসের জন্যে সব খাদ্য গুছিয়ে রাখে এবং রমযানে এত বেশী খায়, যা অন্য সময় কয়েক মাসেও খায় না। বলাবাহুল্য, রোযার উদ্দেশ্য পেট খালি রাখা এবং কামনা-বাসনাকে চূর্ণ করা, যাতে তাকওয়া শক্তিশালী হয়। কিন্তু সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উদরকে অভুক্ত রাখার পর যখন খাদ্যস্পৃহা অনেক বেড়ে যায়, তখন পেট পুরে ও তৃপ্তি সহকারে সুস্বাদু খাদ্য খেলে নফসের আনন্দ শক্তি আরও দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং এমন সব কুবাসনা জাগ্রত হয়, যা রমযান মাস না হলে হয় তো জাগ্রত হত না। মোট কথা, যেসব শক্তি মানুষকে মন্দ কাজের দিকে টেনে নেয়ার ওসিলা এবং শয়তানের হাতিয়ার, সেগুলোকে দুর্বল করা রোযার উদ্দেশ্য। এটা অল্প ভক্ষণ ছাড়া অর্জিত হয় না। অর্থাৎ, রোযার রাতে এতটুকু খাবে, যতটুকু রোযা ছাড়া প্রত্যেক রাতে খাওয়ার অভ্যাস ছিল। রোযা রেখে দ্বিপ্রহর ও রাত্রির খাদ্য এক সাথে খেয়ে ফেললে সেই রোযা দ্বারা কোন উপকার হবে না। ক্ষুধা, পিপাসা ও দৈহিক দুর্বলতা উপলব্ধি করার কারণে দিনের বেলায় বেশী নিদ্রা না যাওয়া মোস্তাহাব। রাতেও কিছু দুর্বলতা থাকা ভাল, যাতে তাহাজ্জুদ ও ওজিফা সহজসাধ্য হয়। এতে শয়তান মনের আশেপাশে ভিড়তে পারবে না। ফলে মানুষের দৃষ্টিতে ঊর্ধ্বজগত উদ্ভাসিত হয়ে গেলে তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই।
শবে কদর সেই রাত্রকেই বলে, যাতে ঊর্ধ্বজগতের কিছু মানুষের কাছে উন্মোচিত হয়ে যায়। যেব্যক্তি অন্তর ও বুকের মধ্যে খাদ্যের আড়াল সৃষ্টি করে, সে ঊর্ধ্ব জগতের অন্তরালে থেকে যায়।

(৬) ইফতারের পর মনে একাধারে আশা ও ভয় এবং সন্দেহ থাকা। কেননা, একথা কারও জানা নেই যে, রোযাদারের রোযা কবুল হয়েছে কিনা এবং সে নৈকট্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কিনা। প্রত্যেক এবাদত শেষে এমনি ধরনের অবস্থা থাকা ভাল। বর্ণিত আছে, হযরত হাসান বসরী ঈদের দিন একদল লোকের কাছ দিয়ে গমন করলেন, যারা তখন হাস্যরত ছিল। তিনি বললেন: আল্লাহ তাআলা রমযান মাসকে দৌড়ের মাঠ করেছেন, যাতে সকল মানুষ তার আনুগত্যের জন্যে মাঠে দৌড় দেয়। কিছু লোক তো অগ্রসর হয়ে মনযিলে মকছুদে পৌঁছে গেছে। আর কিছু লোক পেছনে থেকে নিরাশ হয়েছে। যেদিন অগ্রগামীরা তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছেছে এবং বাতিলপন্থীরা বঞ্চিত রয়েছে, সেদিন যারা হাসি-তামাশা করে, তাদের প্রতি বিস্ময় লাগে। আল্লাহর কসম, প্রকৃত পরিস্থিতি ফুটিয়ে তোলা হলে মকবুল ব্যক্তিরা আনন্দের আতিশয্যে ক্রীড়া-কৌতুক বর্জন করবে এবং প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিরা দুঃখের আতিশয্যে হাস্য, রসিকতা থেকে বিরত থাকবে। আহনাফ ইবনে কায়স (রাঃ)-কে কেউ বলল: আপনি বুড়ো মানুষ। রোযা আপনাকে দুর্বল করে দেয়। এ জন্যে কোন উপায় করা আপনার জন্যে মঙ্গলজনক। তিনি বললেন: আমি একটি দীর্ঘ সফরের জন্যে রোযাকে প্রস্তুত করছি। আল্লাহ তাআলার আনুগত্যে সবর করা তাঁর আযাবে সবর করার তুলনায় অনেক সহজ। এ পর্যন্ত রোযার ছয়টি আভ্যন্তরীণ বিষয় বর্ণিত হল।
যেব্যক্তি কেবল উদর ও লজ্জাস্থানের কামনা-বাসনা থেকে বিরত থাকে এবং এগুলো পালন করে না, ফেকাহবিদগণ তাদের রোযা জায়েয বলে থাকেন। এখন যদি প্রশ্ন হয়, ফেকাহবিদগণ যে রোযাকে জায়েয বলেন, আপনি তা অশুদ্ধ বলেন কেন, তবে আমার পক্ষ থেকে এর জওয়াব হচ্ছে, ফেকাহবিদগণ বাহ্যদর্শী। তাঁরা এমন দলীল দ্বারা বাহ্যিক শর্তাবলী প্রমাণ করেন, যা বাতেনী শর্তাবলীর মধ্যে আমাদের বর্ণিত দলীলের তুলনায় নেহায়েত দুর্বল। বিশেষতঃ পরনিন্দা, কলহ-বিবাদ ইত্যাদি ক্ষেত্রে। বাহ্যদর্শী ফেকাহবিদগণকে এমন বিধান দিতে হয়, যাতে গাফেল ও সংসারাসক্ত ব্যক্তিরাও দাখিল থাকতে পারে। তাই বহ্যিক শর্তাবলী দৃষ্টে অনেক বিষয়কে তাদের শুদ্ধ বলতে হয়। 
কিন্তু আখেরাতবিদগণের মতে শুদ্ধ হওয়ার অর্থ কবুল হওয়া। আর কবুল হওয়ার মানে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা। তাঁরা বলেন: রোযার উদ্দেশ্য আল্লাহ তাআলার একটি গুণ ক্ষুধা পিপাসা থেকে মুক্ত হওয়াকে নিজের অভ্যাসে পরিণত করা এবং কামনা-বাসনা চূর্ণ করার ব্যাপারে যথাসাধ্য ফেরেশতাগণের অনুসরণ করা। মানুষের মর্তবা চতুষ্পদ জন্তুর মর্তবা থেকে ঊর্ধ্বে; কেননা, মানুষ বিবেকের সাহায্যে তার কামনা-বাসনা চূর্ণ করতে সক্ষম। কিন্তু চেষ্টার মাধ্যমে কামনা বাসনা নিয়ন্ত্রণ করতে হয় বলে মানুষের মর্তবা ফেরেশতাগণের নীচে। এ কারণেই মানুষ যখন কামনা-বাসনায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে, তখন সে নিম্নতমদের স্তরে নেমে যায় এবং চতুষ্পদ জন্তুর কাতারে শামিল হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যখন মানুষ কামনা-বাসনার মূলোৎপাটন করতে সক্ষম হয়, তখন মর্যাদার উচ্চতম শিখরে আরোহণ করে ফেরেশতাগণের স্তরে পৌঁছে যায়। ফেরেশতাগণ আল্লাহ তাআলার নিকটবর্তী। যে লোক তাদের অনুসরণ করে এবং তাদের মত অভ্যাস গড়ে তোলে, সে-ও তাদের মত আল্লাহ তাআলার নিকটবর্তী হয়ে যায়।এই নৈকট্য স্থান ও দূরত্বের দিক দিয়ে নয়; বরং গুণাবলীর দিক দিয়ে।
মনস্তত্ত্ববিদদের মতে রোযার মূল উদ্দেশ্য যখন এই, তখন দ্বিপ্রহরের খাদ্য দেরী করে সন্ধ্যার খাদ্যের সাথে একেবারে খেয়ে নিলে এবং সারাদিন কামনা বাসনায় নিমজ্জিত থাকলে কি উপকার হবে? এরূপ রোযা দ্বারা উপকার হলে এই হাদীসের অর্থ কি যে, অনেক রোযাদারের রোযা ক্ষুধায় তৃষ্ণা ছাড়া কিছুই অর্জিত হয় না? এ কারণেই জনৈক আলেম বলেন:
অনেক রোযাদার রোযাখোর এবং অনেক রোযাখোর রোযাদার হয়ে থাকে। অর্থাৎ, রোযাখোর হয়েও রোযাদার তারা, যারা আপন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গোনাহ থেকে মুক্ত রেখে পানাহার করে এবং রোযাদার হয়েও রোযাখোর তারা, যারা ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত তো থাকে; কিন্তু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গোনাহ থেকে বিরত রাখে না। রোযার অর্থ ও মূল লক্ষ্য অবগত হওয়ার' পর জানা গেল, যেব্যক্তি পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বেঁচে থাকে; কিন্তু গোনাহের কাজ করে রোযা নষ্ট করে দেয়, সে সেই ব্যক্তির মত, যে ওযুর মধ্যে ওযুর অঙ্গ তিন বার মাসেহ করে নেয়। এখানে সে বাহ্যতঃ তিন বার মাসেহ করল; কিন্তু আসল উদ্দেশ্য যে ধৌত করা ছিল, তা ছেড়ে দিল। এরূপ ব্যক্তির নামায অজ্ঞতার কারণে তার মুখের উপর প্রত্যাখ্যাত হবে। যেব্যক্তি খেয়ে রোযা নষ্ট করে এবং আপন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গোনাহের কাজ থেকে বিরত রাখে, সে সেই ব্যক্তির মত, যে ওযুর মধ্যে এক একবার অঙ্গ ধৌত করে। তার নামায ইনশাআল্লাহ মকবুল। কেননা, সে আসল ফরয আদায় করেছে, যদিও ফযীলত বর্জন করেছে। আর যেব্যক্তি পানাহার বর্জন করে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারাও রোযা রাখে অর্থাৎ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গোনাহের কাজ থেকে বিরত রাখে, সে সেই ব্যক্তির মত, যে ওযুর মধ্যে প্রত্যেক অঙ্গ তিন বার ধৌত করে। সে আসল ও ফযীলত উভয়টি অর্জন করেছে, যা পূর্ণতার স্তর।
রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: নিশ্চয় রোযা একটি আমানত। তোমাদের প্রত্যেকের উচিত এই আমানতের হেফাযত করা। অতঃপর তিনি এই আয়াত পাঠ করলেন:
"আল্লাহ আদেশ করেন, তোমরা আমানত আমানতের মালিকদের কাছে পৌঁছে দাও"। আয়াত পাঠ শেষে তিনি আপন কান ও চোখের উপর হাত রেখে বললেন: কানে শুনা এবং চোখে দেখা আমানত। যদি শুনা ও দেখা রোযার অন্যতম আমানত না হত, তবে তিনি কখনও বলতেন না যে, কেউ বিবাদ করতে চাইলে বলে দেবে- আমি রোযাদার। অর্থাৎ, আমি আমার জিহ্বা আমানত রেখেছি। আমি তার হেফাযত করব। তোমাকে জওয়াব দিয়ে এই হেফাযত কিরূপে নষ্ট করব? 

পরবর্তী পর্ব
নফল রোযা

রোযা - (৪) রোযার সুন্নতসমূহ



রোযা - (পর্ব- ৪)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - 🖌️ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
রোযার সুন্নতসমূহ

রোযার সুন্নত ছয়টি 
(১) বিলম্বে সেহরী খাওয়া, 
(২) খোরমা অথবা পানি দ্বারা মাগরিবের নামাযের পূর্বে ইফতার করা, 
(৩) দ্বিপ্রহরের পরে মেসওয়াক না করা, 
(৪) রমযান মাসে দান খয়রাত করা, 
(৫) কোরআন পড়া ও পড়ানো এবং 
(৬) মসজিদে এতেকাফ করা; বিশেষতঃ শেষ দশ দিনে। 

রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) রমযানের শেষ দশ দিন খুব এবাদত করতেন- নিজেও মেহনত করতেন এবং পরিবারের লোকজনকেও মেহনত করাতেন। কারণ, এই দশ দিনের মধ্যে শবে কদর রয়েছে। এই দশ দিন নিরন্তর এতেকাফ করা উত্তম। এতেকাফের নিয়ত করার পর শরীয়তসম্মত প্রয়োজন ব্যতিরেকে মসজিদ থেকে বের হলে নিরন্তর এতেকাফ হবে না। যেমন, কোন রোগীকে দেখার জন্যে, সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে, জানাযায় শরীক হওয়ার জন্যে এবং যিয়ারত করার জন্যে বের হওয়া। প্রস্রাব পায়খানার জন্যে বের হলে কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু ওযু ব্যতীত অন্য কোন কাজে মশগুল হওয়া যাবে না। দেহের কিছু অংশ: মসজিদ থেকে বের করলে এতেকাফের নিরন্তরতা ভঙ্গ হবে না। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিজের মস্তক আয়েশা (রাঃ)-এর কক্ষে বের করে দিতেন এবং তিনি চিরুনি করে দিতেন।

পরবর্তী পর্ব
রোষার আভ্যন্তরীণ শর্তসমূহ

বোযা (পর্ব-৩) রোযার কাযা ও কাফফারা



রোযা - পর্ব- ৩
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন
🖌️ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

রোযার কাযা ও কাফফারা
কোন ওযরের কারণে অথবা ওযর ছাড়াই রোযা না রাখলে তার কাযা করা ওয়াজেব। রমযানের রোযার কাযা একাদিক্রমে (ফাঁক না দিয়ে) করা ওয়াজেব নয়। সহবাস ব্যতীত অন্য কোন কারণে রোযার কাফফারা ওয়াজেব হয় না। (হানাফী মাযহাবে ওযর ব্যতীত ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার অথবা সহবাস করে রোযা ভঙ্গ করলে কাযা ও কাফফারা উভয়টি ওয়াজেব হয়।) উদাহরণতঃ পানাহার এবং সহবাস ব্যতীত বীর্যপাত ঘটালে কেবল কাযা ওয়াজেব হবে- কাফফারা নয়। কাফফারা হল একটি গোলাম মুক্ত করা। এটি সম্ভব না হলে একাদিক্রমে দু'মাস রোযা রাখা। এটাও সম্ভব না হলে ষাট জন মিসকীনকে পেট ভরে খাওয়ানো। যাদের রোযা নিজেদের দোষে নষ্ট হয়ে যায়, তাদের উপর ইমসাক অর্থাৎ দিনের অবশিষ্ট অংশ পানাহার থেকে বিরত থাকা ওয়াজেব। কষ্টের আশংকা না থাকলে সফরে রোযা রাখা এবং কষ্টের আশংকা থাকলে রোযা না রাখা উত্তম। শায়খে ফানী অর্থাৎ যে বৃদ্ধ রোযা রাখার ক্ষমতা রাখে না, সে প্রত্যেক রোযার বিনিময়ে অর্থ সা' গম দান করবে।

পরবর্তী পর্ব
রোযার সুন্নতসমূহ

রোযা (পর্ব - ২) রোযার বাহ্যিক ওয়াজেবসমূহ



রোযা - পর্ব- ২ 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন
🖌️ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

রোযার বাহ্যিক ওয়াজেবসমূহ–
(১) রমযান মাসের সূচনা জ্ঞাত হওয়া। এটা চাঁদ দেখা অথবা আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে শাবানের ত্রিশ দিন পূর্ণ হওয়ার মাধ্যমে জ্ঞাত হওয়া যায়। চাঁদ দেখার উদ্দেশ্য চাঁদ দেখা যাওয়ার কথা জানা, যা একজন আদেল ব্যক্তির কথায় হতে পারে। ঈদুল ফেতরের চাঁদ দুজন আদেল ব্যক্তির কথা ছাড়া প্রমাণিত হয় না। যেব্যক্তি একজন আদেল ব্যক্তির কাছে চাঁদ দেখার কথা শুনে এবং বিশ্বাস করে, তার উপর রোযা ওয়াজেব হবে, যদিও সরকারীভাবে রোযা রাখার আদেশ না হয়। যদি এক শহরে চাঁদ দেখা যায় ও অন্য শহরে দেখা না যায় এবং উভয় শহরের মধ্যবর্তী দূরত্ব বেশী হলে প্রত্যেক শহরের বিধান আলাদা হবে। (প্রকাশ থাকে যে, হানাফী মাযহাবে দেশের এক শহরে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে সকল শহরের মানুষের উপর রোযা রাখা ওয়াজেব হবে, দূরত্ব বেশী হোক কিংবা কম।)

(২) প্রত্যেক রোযার জন্যে রাত থেকে নির্দিষ্ট করে ও বিশ্বাস সহকারে নিয়ত করা। সুতরাং সমগ্র রমযান মাসের নিয়ত এক দফায় করে নিলে যথেষ্ট হবে না। দিনের বেলায় নিয়ত করলে রমযানের রোযা হবে না; বরং নফল রোযা হবে। (হানাফী মাযহাব অনুযায়ী দ্বিপ্রহরের পূর্ব পর্যন্ত নিয়ত করা চলে।) শুধু রোযার নিয়ত করলে জায়েয হবে না, বরং নির্দিষ্ট করে রমযানের ফরয রোযার নিয়ত করতে হবে। (হানাফী মাযহাব অনুযায়ী শুধু রোযা কিংবা নফল রোযার নিয়ত করলেও রমযানের ফরয রোযাই হবে।) আগামীকাল রমযান হলে রোযা রাখব- এরূপ সন্দেহজনক নিয়ত করা যথেষ্ট নয়। বরং পূর্ণ বিশ্বাস সহকারে নিয়ত করতে হবে। (হানাফী মাযহাবে এটা জরুরী নয়।)

(৩) রোযা স্মরণ থাকা অবস্থায় পেটে কোন কিছু যেতে না দেয়া। সুতরাং রোযা রেখে জেনে-শুনে কিছু খেলে অথবা পান করলে অথবা নাকের ছিদ্র পথে কোন বস্তু পেটে চলে গেলে অথবা পেটে ওষুধ প্রবেশ করালে রোযা ভেঙ্গে যাবে। যে বস্তু ইচ্ছা ব্যতিরেকে পেটে চলে যায়; যেমন পথের ধুলাবালি অথবা মাছি অথবা কুলি করার সময় পানি, তাতে রোযা ভঙ্গ হয় না। কিন্তু কুলিতে গরগরা করার সময় পেটে পানি চলে গেলে রোযা ভেঙ্গে যাবে। কেননা, এটা রোযাদারের ত্রুটি। রোযার কথা ভুলে গিয়ে পানাহার করলে রোযা ভঙ্গ হবে না।

(৪) স্ত্রীসহবাস থেকে বিরত থাকা। যদি রাত্রে সহবাস করে অথবা স্বপ্নদোষ হয় এবং নাপাক অবস্থায় সকাল হয়ে যায়, তবে তাতে রোযা নষ্ট হয় না।

(৫) বীর্যপাত করা থেকে বিরত থাকা। অর্থাৎ, ইচ্ছাকৃতভাবে সহবাসের মাধ্যমে অথবা সহবাস ছাড়াই বীর্যস্খলন ঘটাবে না। এরূপ করলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। স্ত্রীকে চুম্বন করলে অথবা কাছে শোয়ালে রোযা নষ্ট হয় না, যে পর্যন্ত বীর্যপাত না হয়, কিন্তু এসব কাজ মাকরূহ।

(৬) বমি করা থেকে বিরত থাকা। ইচ্ছা করে বমি করলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। আপনা আপনি হলে রোযা নষ্ট হবে না। গলা থেকে অথবা বুক থেকে শ্লেষ্মা নির্গত হলে রোযা নষ্ট হবে না। যদি শ্লেষ্মা মুখে পৌঁছার পর তা গিলে ফেলে তবে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে।

পরবর্তী পর্ব
রোযার কাযা ও কাফফারা


রোযা - (পর্ব- ১) রোযার তাৎপর্য


রোযা - পর্ব- ১
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন
🖌️ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

রোযার তাৎপর্য
প্রকাশ থাকে যে, রোযা ঈমানের এক-চতুর্থাংশ। কারণ, এক হাদীসে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : “রোযা সবরের অর্ধেক” এবং অন্য এক হাদীসে বলেন :”সবর ঈমানের অর্ধেক”। এ থেকে জানা গেল, রোযা ঈমানের অর্ধেকের অর্ধেক অর্থাৎ এক-চতুর্থাংশ।
রোযা আল্লাহ্ তাআলার সাথে সম্পর্কযুক্ত বিধায় ইসলামের সকল রোকনের মধ্যে এটা সেরা রোকন। সেমতে আল্লাহ তাআলার উক্তি রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এক হাদীসে কুদসীতে বর্ণনা করেছেন। উক্তিটি এই: “সকল সৎ কাজের সওয়াব দশ গুণ থেকে সাতশ' গুণ পর্যন্ত হবে; কিন্তু রোযা একান্তভাবে আমার জন্যে বিধায় আমিই এর প্রতিদান দেব”। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: “সবরকারীদেরকে বেহিসাব সওয়াব দান করা হবে”। 

রোযা সবরের অর্ধেক। তাই এর সওয়াব হিসাব-কিতাবের আওতা বহির্ভূত হবে। শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্যে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর এ উক্তিই যথেষ্ট, তিনি এরশাদ করেন : “আল্লাহর কসম, যার হাতে আমার প্রাণ- নিশ্চয় রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহ তাআলার কাছে মেশকের চেয়েও উত্তম”। 
আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, “রোযাদার তার কামনা-বাসনা ও পানাহার একমাত্র আমার জন্যে পরিত্যাগ করে। অতএব রোযা আমার জন্যে এবং আমিই এর প্রতিদান দেব”। 
রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন: “জান্নাতের একটি দ্বারকে বলা হয় 'বাবুর রাইয়ান'। এতে রোযাদারগণ ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ করবে না। রোযাদারকে তার রোযার বিনিময়ে আল্লাহর দীদারের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে”। 
আরও বলা হয়েছে: “রোযাদারের দুটি আনন্দ। এক আনন্দ ইফতারের সময় এবং এক আনন্দ তার পালনকর্তার দীদার লাভ করার সময়”।

এক হাদীসে আছে- “প্রত্যেক বস্তুর একটি দরজা আছে। এবাদতের দরজা হল রোযা”। 
আরও বলা হয়েছে: “রোযাদারের নিদ্রা এবাদত”। 
হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: যখন রমযান মাস শুরু হয়, তখন জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত হয় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। শয়তানকে শিকল পরানো হয়। জনৈক ঘোষণাকারী ঘোষণা করে- যারা কল্যাণ কামনা কর, তারা এগিয়ে আস এবং যারা অনিষ্ট কামনা কর তারা সরে যাও। 
কোরআনের এক আয়াতে বলা হয়েছে- তোমরা অতীত দিনগুলোতে যা পাঠিয়েছ, তার বিনিময়ে আজ জান্নাতে স্বচ্ছন্দে পানাহার কর। এর তফসীর প্রসঙ্গে ওকী বলেন, এখানে অতীত দিন বলে রোযার দিন বুঝানো হয়েছে। কেননা, রোযার দিনে তারা পানাহার ত্যাগ করেছিল। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সংসার ত্যাগ ও রোযাকে গর্বের বিষয়সমূহের মধ্যে এক কাতারে রেখেছেন। সংসার ত্যাগ সম্পর্কে তিনি বলেন: আল্লাহ তাআলা যুবক এবাদতকারীকে নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করেন এবং বলেন, হে আমার জন্যে আপন বাসনা বর্জনকারী যুবক, হে আমার সন্তুষ্টিতে যৌবন অতিবাহিতকারী যুবক! তুমি আমার কাছে ফেরেশতার মতই। পক্ষান্তরে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) রোযাদার সম্পর্কে বলেন: আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের উদ্দেশে বলেন,. “ফেরেশতাগণ! আমার বান্দাকে দেখ, সে আমার কারণে তার কামনা-বাসনা ও পানাহার ত্যাগ করেছে। কেউ জানে না তাদের আমলের প্রতিদানস্বরূপ তাদের জন্যে কি লুক্কায়িত রয়েছে, যা তাদের চক্ষুকে শীতল করবে”।
কোরআনের এ আয়াতের তফসীর প্রসঙ্গে কোন কোন তফসীরকার বলেন, এখানে আমল বলে রোযা বুঝানো হয়েছে। কেননা, সবরকরীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, “সবরকারীকে বেহিসাব পুরস্কার দেয়া হবে”।

এ থেকে জানা যায়, সবরকারীর জন্যে অগণিত সওয়াবের স্তূপ সাজানো হবে, যা অনুমানও করা যায় না। এরূপ হওয়াই সমীচীন। কেননা, রোযা আল্লাহ তাআলার জন্যে এবং তাঁর সাথে সম্পর্কযুক্ত হওয়ার কারণে গৌরবোজ্জ্বল। সকল এবাদতই আল্লাহর জন্যে। তবুও রোযা কাবা গৃহের ন্যায় প্রাধান্য রাখে, যদিও সমস্ত ভূপৃষ্ঠই আল্লাহর। রোযার এই প্রাধান্য দুটি কারণে- 
(১) রোযা রাখার অর্থ কয়েকটি বিষয় থেকে বিরত থাকা এবং কয়েকটি বিষয় বর্জন করা। এটি আভ্যন্তরীণ কাজ। এতে এমন কোন আমল নেই, যা চোখে দেখা যায়। অন্যান্য এবাদত মানুষের দৃষ্টিতে থাকে। কিন্তু রোযা আল্লাহ ব্যতীত কেউ দেখে না। 
(২) রোযা আল্লাহ তাআলার শত্রুর উপর চাপ সৃষ্টি করে এবং প্রবল হয়। কেননা, কামনা-বাসনা হচ্ছে শয়তানের ওসিলা বা হাতিয়ার, যা পানাহারের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়। এ কারণেই রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: শয়তান মানুষের ধমনী (রক্ত চলার পথে) বিচরণ করে। সুতরাং ক্ষুধা তৃষ্ণা দ্বারা তার পথসমূহ সংকীর্ণ করে দাও। এদিকে লক্ষ্য করে রসূলে পাক (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে বলেছিলেন: সর্বদা জান্নাতের দরজা খঠখটাও। আরজ করা হল: কিসের মাধ্যমে? তিনি বললেন: ক্ষুধার মাধ্যমে। যেহেতু রোযা বিশেষভাবে শয়তানের মূলোৎপাটন করে, তার চলার পথ রুদ্ধ এবং সংকীর্ণ করে, তাই রোযা বিশেষভাবে আল্লাহর সাথে সম্পর্কযুক্ত হওয়ার যোগ্য হয়েছে। কেননা, শয়তানের মূলোৎপাটনে আল্লাহ সাহায্য করেন। বান্দাকে সাহায্য করা নির্ভর করে বান্দার পক্ষ থেকে আল্লাহকে সাহায্য করার উপর। 
সে মতে আল্লাহ্ তা’আলা বলেন : যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, তবে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পদযুগল সুদৃঢ় রাখবেন।
মোট কথা, চেষ্টা শুরু করা বান্দার পক্ষ থেকে এবং বিনিময়ে হেদায়েত তথা সৎপথ প্রদর্শন আল্লাহর পক্ষ থেকে হবে। 
যেমন- আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,
“যারা আমার পথে অধ্যবসায় করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথ প্রদর্শন করি। আরও বলেন: 
“আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন না করে”। 
পরিবর্তনের জন্যে কামনা-বাসনাকে চূর্ণ বিচূর্ণ করার আদেশ দেয়া হয়েছে। কেননা, কামনা বাসনা শয়তানের বিচরণ ক্ষেত্র। যে পর্যন্ত এই বিচরণ ক্ষেত্র সবুজ শ্যামল থাকবে, শয়তানের বিচরণ বন্ধ হবে না। বিচরণ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ্ তা’আলার প্রতাপ বান্দার কাছে প্রকাশ পাবে না এবং দীদারের পথে পর্দা পড়ে থাকবে। 
রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: “যদি মানুষের অন্তরে শয়তানের যাতায়াত না থাকত, তবে মানুষ ঊর্ধ্বজগত নিরীক্ষণ করতে সক্ষম হত”। 
এদিক দিয়ে রোযা এবাদতসমূহর দরজা ও ঢাল।

পরবর্তী পর্ব

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...