তওয়াফের নিয়ম —
নামাযের ন্যায় কাবাগৃহ তওয়াফকালেও দেহ ও পরিধেয় বস্ত্র পাক হওয়া এবং সতর ঢাকিয়া রাখা একান্ত আবশ্যক। তওয়াফের সময় কথাবার্তা বলা দুরস্ত আছে। চাদর গায়ে দিবার সময় ডান বাহু সম্পূর্ণ বাহিরে রাখিয়া চাদরটি বিস্তারিতভাবে ডান বগলের নিম্ন হইতে উঠাইয়া পিঠ ও বুক ঢাকিয়া চাদরের উভয় পার্শ্ব বাম স্কন্ধের উপর রাখিবে। এইরূপে চাদর গায়ে দেওয়াকে 'যতেবাগ' বলে।কাবাগৃহকে বামে রাখিয়া হাজরে আসওয়াদের নিকট হইতে তওয়াফ শুরু করিবে। তওয়াফকালে কা'বাগৃহ হইতে কমপক্ষে তিন ধাপ দূরে থাকিয়া চলিতে হইবে। কারণ, তদপেক্ষা নিকট দিয়া দৌড়াইলে কা'বাগৃহের গিলাফ বা পর্দার উপর পা পড়িতে পারে। যতদূর পর্যন্ত গিলাফ বা পর্দা বিস্তৃত থাকে ততটুকু স্থানকে কাবাগৃহের অন্তর্ভুক্ত বলিয়া গণ্য করা হয়।
তওয়াফ আরম্ভ করিবার সময় এই দু'আ পড়িবে -
اللَّهُمَّ إِيْمَانًا وَ تَصْدِيقًا بِكِتَابِكَ وَوَفَاء بِعَهْدِكَ وَاتَّبَاعًا لِسُنَّةِ نَبِيِّكَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ -
অর্থাৎ, “হে আল্লাহ্, এই তওয়াফ আপনার প্রতি ঈমানের প্রতীক-স্বরূপ এবং আপনার কিতাবের সত্যতার প্রতি আস্থাজ্ঞাপন ও আপনার প্রতি প্রতিজ্ঞা পালনের জন্য আপনার নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর সুন্নত পালনের উদ্দেশ্যে।”
আর কাবাগৃহের দরজায় পৌঁছিলেএই দু'আ পড়িবে।
اللَّهُمَّ هُذَا الْبَيْتُ بَيْتُكَ وَ هَذَا الْحَرَامُ حَرَمُكَ وَ هَذَا الْأَمْنُ اَمْنُكَ وَ هذَا مُقَامَ الْعَائِذِبِكَ مِنَ النَّارِ -
অর্থাৎ “হে আল্লাহ্, ইহা আপনার গৃহ। এই হরম আপনার হরম। এই নিরাপদ স্থান আপনার আশ্রয়; ইহা দোযখের আগুন হইতে আশ্রয়প্রার্থীদের স্থান।”
তৎপর রুকনে ইয়ামানীতে এই দু'আ পড়িবে –
اللَّهُمَّ اَعُوْذُبِكَ مِنَ الشَّكَ وَالشِّرْكِ وَالْكُفْرِ وَالنِّفَاقِ وَسُوْءٍ الْأَخْلَاقِ وَ سُوءِ الْمَنْظَرِ فِي الْأَهْلِ وَالمَالِوَالْوَلَدِ -
অর্থাৎ “হে আল্লাহ্, অবশ্যই আমি আপনার নিকট আশ্রয় চাহিতেছি- সন্দেহ, শিরক, অবিশ্বাস, মুনাফেকী, শত্রুতা, কুম্বভাব এবং পরিবার, ধন ও সন্তানের প্রতি কুদৃষ্টি হইতে।”
অতঃপর কা'বাগৃহের ছাদের পানি পড়িবার নালী বা পাইপের নিম্নে উপস্থিত হইলে এই দু'আ পড়িবে-
اللَّهُمَّ أَظِلَّنِي تَحْتَ عَرْشِكَ يَوْمَ لاَظِلَّ إِلَّا ظِلُّ عَرْشِكَ اللَّهُمَّ اسْقِنِي بكأس مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِوَسَلَّمَ شَرْبَةً لا أَطْمَاءُ بَعْدَهُ أَبَدًا -
অর্থাৎ “হে আল্লাহ্, যেদিন আপনার আরশের ছায়া ব্যতীত আর কোন ছায়া থাকিবে না সেদিনআপনার আরশের ছায়ার নিচে আমাকে স্থান দিবেন। হে আল্লাহ্, আমাকে হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর পানপত্র হইতে পানীয় পান করাইবেন যেন তৎপর কখনও পিপাসার্ত না হই।"
আরও অগ্রসর হইয়া রুকনে শামীতে পৌছিলে এই দুা'আ পড়িবে –
اللَّهُمَّ اجْعَلَهُ حَبًّا مَّبْرُورًا وَّ سَعْيًا مَشْكُورًا وَّ ذَنْبًا مَّغْفُورًا وَتِجَارَةً لَّنْ تَبُورَ يَا عَزِيزُ يَا غَفُورُ اغْفِرْوَارْحَمْ وَ تَجَاوَزْ عَمَّ تَعْلَمُ إِنَّكَ أَنْتَ الْأَعَزُّ الأَكْرَمُ -
অর্থাৎ “হে আল্লাহ্, এই হজ্জ কবুল করুন, এই পরিশ্রম সফল করুন। আমার গুনাহ্ মাফ করুন, আমার এই তেজারত চিরস্থায়ী করুন। হে প্রতাপান্বিত ও ক্ষমাশীল, ক্ষমা করুন, দয়া করুন। আর(আমার পাপ সম্বন্ধে) আপনি যাহা কিছু জানেন, তাহা ছাড়িয়া দেন (তজ্জন্য আমাকে পাকড়াও করিবেন না)। অবশ্যই আপনি সর্বাপেক্ষা অধিক মহৎ।”
তৎপর রুকনে ইয়ামানীতে পৌঁছিয়া বলিবে –
( اللَّهُمَّ إِنِي اَعُوْذُبِكَ مِنَ الْكُفْرِ وَأَعُوذُبِكَ مِنَ الْفَقْرِ وَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِو مِنَ الْفِتْنَةِ الْمَحْيَاءِوَالْمَمَاتِ وَاَعُوْذُبِكَ مِنَ الْخِزْيِ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ -)
অর্থাৎ, “হে আল্লাহ্, আমি কুফর হইতে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করিতেছি এবং অভাব, কবরের আযাব ও জীবন-মরণের বিপদাপদ হইতে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করিতেছি। আর ইহ-পরকালের অপমান হইতে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করিতেছি।”
এই রুকন হইতে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত যাওয়ার সময় এই দু'আ পড়িবে–
(اللَّهُمَّ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وفِي الْآخِرَةِ وَقِنَا بِرَحْمَتِكَ عَذَابَ
الْقَبْرِ وَعَذَابَ النَّارِ -)অর্থাৎ “হে আল্লাহ্, হে আমাদের প্রভু, ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যান আমাদিগকে দান করুন। আর আপনার অনুগ্রহে কবরের আযাব ও দোযখের আযাব হইতে আমাদিগকে রক্ষা করুন।"
হাজরে আসওয়াদ হইতে আরম্ভ করিয়া উপরোক্ত নিয়মে প্রদক্ষিণ করিয়া আবার হাজরে আসওয়াদের নিকট উপস্থিত হইলে একবার তওয়াফ করা হইল।
এই প্রকারে সাতবার তওয়াফ করিবে এবং প্রত্যেক বার তওয়াফকালে উল্লিখিত দু'আগুলি যথাস্থানে পড়িবে। প্রত্যেক প্রদক্ষিণকে 'শাওত' বলে। প্রথম তিন শাওত দ্রুতগতিতে খুবই উৎসাহের সহিত সম্পন্ন করিতে হয়। কাবাগৃহের নিকট দিয়া লোকের ভিড় হইলে কিছু দূর দিয়া তওয়াফ করিবে যেন দ্রুতগতিতে চলিতে পার। শেষের চারি শাওতে আস্তে আস্তে চলিবে। প্রত্যেক তওয়াফে হাজরেআসওয়াদ চুম্বন (সম্ভব হলে) করিবে এবং রুকনে ইয়ামানীর উপর হাত ফিরাইবে। লোকের ভিড়ের জন্য স্পর্শ করিতে না পারিলে হাতে ইশারা করিবে। (হানাফি মাযহাব মতে উভয় হাত উপরে তুলিয়ে) এইরূপে সাতবার তওয়াফ শেষ হইলে কা'বাগৃহের দ্বার ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে দাঁড়াইবে। পেট, বুক ও ডান গণ্ডদেশ কা'বাগৃহের দেওয়ালের সহিত মিলাইয়া দুই হাতের তালু খোলাভাবে দেওয়ালে স্থাপনপূর্বক তন্মধ্যে মাথা রাখিবে অথবা কা'বা শরীফের চৌকাঠের উপর রাখিবে। এই স্থানটিকে মুল্লাযম বলে। এই স্থানে দু'আ কবুল হয়। এই স্থলে এই দু'আ পড়িবে-
اللَّهُمَّ يَا رَبُّ الْبَيْتَ الْعَتِيقِ اعْتِقْ رَقَبَتِي مِنَ النَّارِ وَاعْذِنِي مِنْ كُلِّ سُوْءٍ وَقَنِعْنِي بِمَا رَزَقْتَنِي وَبَارِكْفِيمَا اتَيْتَنِي -
অর্থাৎ, “হে আল্লাহ্, হে কা'বাগৃহের প্রভু, আমার কাঁধকে দোযখের অগ্নি হইতে রক্ষা করুন এবং সকল মন্দ হইতে আমাকে আশ্রয় দান করুন। আর আমাকে আপনি যাহা কিছু দান করিয়াছেন তাহাতে বরকত দান করুন।"
এই সময় অধিক পরিমাণে দরূদ শরীফ পড়িবে, কৃত পাপের ক্ষমা চাহিবে এবং মনোবাঞ্ছা পূরণের প্রার্থনা করিবে।
তৎপর 'মাকামে ইবরাহীম'-এর সম্মুখে দাঁড়াইয়া দুই রাকআত নামায পড়িবে। ইহা 'তওয়াফের দুইরাকআত' নামে প্রসিদ্ধ। এই পর্যন্ত করিলে তওয়াফ শেষ হইল।
উক্ত দুই রাকআতের প্রথম রাকআতে সূরা কাফিরুন এবং দ্বিতীয় রাকআতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইখলাস পড়িবে। নামাযের পর মুনাজাত করিবে।
সাতবার প্রদক্ষিণ এবং এই দুই রাকআত নামায সম্পন্ন করত হাজরে আসওয়াদের নিকট যাইয়া (সম্ভব হলে) উহাকে চুম্বন করিয়া তাওয়াফকার্য সমাপ্ত করিবে।
অতঃপর সাঈ অর্থাৎ সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে দৌড়ান কার্যে লিপ্ত হইবে।
পরবর্তী পর্ব —
সাঈর নিয়ম

