মঙ্গলবার, ১৭ জুন, ২০২৫

বিবাহ (৩০) পারস্পরিক জীবন যাপনের দশম আদব সহবাস সংক্রান্ত



বিবাহ (পর্ব – ৩০) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

পারস্পরিক জীবন যাপনের দশম আদব সহবাস সংক্রান্ত —
দশম আদব হচ্ছে সহবাস সংক্রান্ত আদব। সহবাসে মোস্তাহাব হচ্ছে বিসমিল্লাহ বলে সূরা এখলাস পাঠ করবে এবং আল্লাহু আকবার ও লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়ে এই দোয়া করবে:

‎للَّهُمَّ اجْعَلْهَا ذُرِّيَّةٌ إِنْ كُنْتَ
‎فَذَرْتَ أَنْ تَخْرُجَ ذَلِكَ مِنْ صُلْبِي .

রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ তোমাদের কেউ যখন স্ত্রীর সাথে সহবাস করে, তখন এই দোয়া পড়বে, - "আল্লাহ, আমাকে আলাদা রাখুন শয়তান থেকে এবং শয়তানকে আলাদা রাখুন আপনার দেয়া সন্তান থেকে।"  স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোন সন্তান জন্ম নিলে এই দোয়ার বরকতে শয়তান তার কোন ক্ষতি করবে না। এর পর বীর্যস্খলনের সময় নিকটবর্তী হলে ঠোঁট না নাড়িয়ে মনে মনে এই দোয়া পড়বে, "সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি বীর্য দ্বারা মানব সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে আত্মীয় ও বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন।" সহবাসের সময় নিজেকে এবং স্ত্রীকে কোন বস্তু দ্বারা আবৃত করে নেয়া উচিত। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিজের মস্তক ঢেকে নিতেন এবং বিবিকে বলতেন: গাম্ভীর্য সহকারে থাক। এক হাদীসে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: যখন স্বামী-স্ত্রী সহবাস করতে চায়, তখন যেন গাধার মত উলঙ্গ না হয়। সহবাসের পূর্বে প্রেমালাপ ও চুম্বন করা উচিত। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: তোমাদের কেউ যেন স্ত্রীর উপর চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায় পতিত না হয়: বরং স্বামী স্ত্রীর মধ্যে প্রথমে দূত বিনিময় হওয়া উচিত। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন: ইয়া রসূলাল্লাহ! দূত বিনিময় কি? তিনি বললেন: চুম্বন ও প্রেমালাপ। 
অন্য এক হাদীসে আছে- তিনটি বিষয় পুরুষের অক্ষমতার পরিচায়ক। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে আলাপ না করে, প্রীতি সৃষ্টি না করে, কাছে শয়ন না করেই স্ত্রী অথবা বাঁদীর সাথে সহবাস শুরু করা এবং নিজের প্রয়োজন সেরে নেয়া ও স্ত্রীর প্রয়োজন অপূর্ণ রেখে দেয়া।

তিন রাতে সহবাস করা মাকরূহ- মাসের প্রথম ও শেষ রাতে এবং পনর তারিখের রাতে। কোন কোন আলেম জুমুআর দিন ও জুমুআর রাতে সহবাস করা মোস্তাহাব বলেছেন। পুরুষের বীর্যস্খলন হলে কিছুক্ষণ এমনিভাবে থেমে থাকবে, যাতে স্ত্রীর প্রয়োজনও পূর্ণ হয়ে যায়। কেননা, মাঝে মাঝে স্ত্রীর বীর্যস্খলন বিলম্বে হয়। তখন পুরুষের সরে যাওয়া তার পীড়ার কারণ হয়। একযোগে বীর্যস্খলন হওয়াকে স্ত্রী ভাল মনে করে। স্বামীর উচিত প্রতি চার দিনে একবার সহবাস করা। অবশ্য এর চেয়ে বেশী কমও হতে পারে। তবে এ ব্যাপারে স্ত্রীর চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। কেননা স্ত্রীকে সতী পুণ্যবর্তী বাখা স্বামীর উপর ওয়াজিব। হায়েযের দিনগুলোতে এবং পরে গোসল করার পূর্বে সহবাস করবে না। কোরআন পাকে এর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কথিত আছে, এতে সন্তান কুষ্ঠগ্রস্ত হয়। হায়েযের দিনগুলোতে সহবাস ছাড়া স্ত্রীর সমগ্র শরীর ভোগ করা জায়েয। পেছনের দিক অর্থাৎ, মলদ্বার দিয়ে সহবাস করা নাজায়েয। কেননা, হায়েযওয়ালী স্ত্রীর সাথে সহবাস করা নোংরামির কারণে হারাম। মলদ্বারে সহবাস করলে সর্বাবস্থায় নোংরামি হয়ে থাকে। সুতরাং এর নিষেধাজ্ঞা ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে সহবাসের নিষেধাজ্ঞার চেয়ে অধিকতর কঠোর। আল্লাহ তাআলা বলেন : "এর অর্থ যখন ইচ্ছা আপন শস্যক্ষেত্রে আস। এই অর্থ নয় যে, যেদিক দিয়ে ইচ্ছা আস। হায়েযের দিনগুলোতে নাভি থেকে হাঁটুর উপর পর্যন্ত কাপড় বেঁধে রাখা স্ত্রীর জন্যে মোস্তাহাব। হায়েযের দিনগুলোতে স্ত্রীর সাথে আহার করা ও সাথে শয়ন করা জায়েয। সহবাসের পর পুনরায় সহবাস করতে চাইলে জননেন্দ্রিয় ধুয়ে নেয়া উচিত। রাতের শুরুভাগে সহবাস করা মাকরুহ। কেননা, এতে নাপাক অবস্থায় শয়ন করতে হয়। সহবাসের পর ঘুমাতে অথবা কিছু খেতে চাইলে নামাযের ওযুর মত ওযু করে নেয়া সুন্নত। হযরত ইবনে ওমর (র.) বলেন: আমি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে আরজ করলাম: আমাদের কেউ নাপাক অবস্থায় নিদ্রা যেতে পরে কি না? তিনি বললেন: হাঁ, যদি ওযু করে নেয়। এক্ষেত্রে ওযু ছাড়া নিদ্রা যাওয়ার অনুমতিও রয়েছে। হযরত আয়েশা (র.) বলেন: রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নাপাক অবস্থায় পানিতে হাত না লাগিয়ে ঘুমিয়ে থাকতেন।

সহবাসের অন্যতম আদব হচ্ছে বাইরে বীর্যস্খলন না ঘটানো; বরং বীর্যস্খলন গর্ভাশয়ের মধ্যেই হওয়া উচিত। আল্লাহ যাকে সৃষ্টি করতে চাইবেন সে তো সৃষ্টি হবেই। এমতাবস্থায় বীর্যস্থলন প্রত্যাহার করায় কি লাভ? এর পর বাইরে বীর্যস্খলন ঘটানো বৈধ কি না, এ ব্যাপারে আলেমগণের চারটি বিভিন্ন মাযহাব রয়েছে। কোন কোন আলেম সর্বাবস্থায় একে বৈধ বলেন। কেউ কেউ সর্বাবস্থায় হারাম বলেন। কারও মতে স্ত্রীর সম্মতিক্রমে বৈধ এবং সম্মতি ছাড়া অবৈধ। কোন কোন আলেম বলেন, এটা বাঁদীর সঙ্গে বৈধ এবং স্বাধীন নারীর সাথে অবৈধ।

আমাদের মতে বিশুদ্ধ মাযহাব হচ্ছে, এ কাজটি বৈধ এবং উত্তম বর্জনের অর্থে মাকরূহ। এট! তেমনি মাকরুহ, যেমন বলা হয়, যিকির ও নামায ব্যতীত মসজিদে চুপচাপ বসে থাকা মাকরূহ। এটা মাকরুহ তাহরীমীও নয়, তানযিহীও নয়। কেননা, এর নিষেধাজ্ঞা কোরআন হাদীসে প্রমাণিত নেই।

অতঃপর জানা উচিত, গর্ভপাত করা এবং জীবন্ত শিশু প্রোথিত করা পাপ। কেননা, এতে একটি বিদ্যমান বস্তুর উপর অত্যাচার চালানো হয়। এর পর বিদ্যমান হওয়ারও কয়েকটি স্তর আছে।

(১) বীর্য গর্ভাশয়ে পতিত হওয়া এবং স্ত্রীর বীর্যের সাথে মিলে জীবন লাভের যোগ্য হওয়া। এমতাবস্থায় একে নষ্ট করা পাপ। (২) যদি এটা মাংসপিণ্ড হয়ে যায়, তখন নষ্ট করা পাপ পূর্বের তুলনায় বেশী (৩) যদি সন্তান পূর্ণাঙ্গ হয়ে যায় এবং তাতে প্রাণ সঞ্চার হয় তখন নষ্ট করা আরও বড় পাপ। (৪) যদি সন্তান জীবিতাবস্থায় মাতৃগর্ভে থেকে আলাদা হয়ে যায়, তখন নষ্ট করা সর্বাধিক অন্যায় কাজ!

আমরা গর্ভাশয়ে বীর্য পতিত হওয়াকে অস্তিত্ব লাভের প্রাথমিক স্তর বলেছি- পুরুষাঙ্গ থেকে বীর্যস্খলনকে বলিনি। এর কারণ ভ্রূণ কেবল পুরুষের বীর্যের দ্বারা তৈরী হয় না; বরং পুরুষ ও স্ত্রী উভয়ের বীর্যের সংমিশ্রণে অথবা পুরুষের বীর্য ও হায়েযের রক্তের সংমিশ্রণে তৈরী হয়। জনৈক বিশ্লেষক লেখেছেন, মাংসপিণ্ড আল্লাহ তাআলার আদেশে হায়েযের রক্ত দ্বারা গঠিত হয়। এর সাথে রক্তের সম্পর্ক দুইয়ের সাথে দুধের সম্পর্কের অনুরূপ। হায়েযের রক্ত জমাট হওয়ার জন্যে পুরুষের বীর্যের সংমিশ্রণ জরুরী; যেমন দুধ জমাট বাঁধার জন্যে জমাট দইয়ের সংমিশ্রণ শর্ত। মোট কথা, বীর্য জমাট হওয়ার কাজে নারীর বীর্য একটি স্তম্ভ এবং নারী-পুরুষ উভয়ের বীর্য সন্তানের অস্তিত্ব লাভের জন্যে এমন, যেমন ক্রয়-বিক্রয়ের অস্তিত্ব লাভে এক পক্ষের প্রস্তাব ও অপর পক্ষের গ্রহণ হয়ে থাকে। সুতরাং যদি কোন ব্যক্তি বিক্রয়ের প্রস্তাব করে এবং অপর পক্ষ তা গ্রহণ না করে, তবে অপর পক্ষকে বিক্রয় ভেঙ্গে দেয়ার দোষে দোষী বলা হবে না। হাঁ, প্রস্তাব ও গ্রহণ উভয়টি হয়ে যাওয়ার পর মুখ ফিরিয়ে নেয়া বিক্রয় ভঙ্গ করা বলা হবে। পুরুষের পৃষ্ঠদেশে বীর্য থাকলে যেমন সম্ভান সৃষ্টি হয় না, তেমনি পুরুষাঙ্গ থেকে বের হওয়ার পরেও সন্তান সৃষ্টি হয়না, যে পর্যন্ত নারীর বীর্য অথবা হায়েযের রক্তের সাথে মিশ্রিত না হয়। এখন প্রশ্ন হতে পারে, বাইরে বীর্যস্খলন উপরোক্ত কারণে মাকরূহ না হলেও কুনিয়তের কারণে মাকরূ হবে। কেননা খারাপ নিয়তেই এ ধরনের কাজ করা হয়, যাতে কিছু গোপন শেরকের লেশ থাকে। এর জওয়াব, পাঁচ প্রকার নিয়ত এ কাজের কারণ হয়ে থাকে।

প্রথম নিয়ত বাঁদীদের বেলায়। তা হচ্ছে, পুরুষ দেখে, বাঁদীর গর্ভ থেকে সন্তান হলে বাঁদী মুক্ত হওয়ার যোগ্য হয়ে যায়। ফলে সম্পদ হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাই এমন উপায় করা প্রয়োজন যাতে বাঁদী চিরকাল তার বাঁদী থাকে। বলাবাহুল্য, আপন মালিকানা বিনষ্ট হওয়ার কারণাদি দূর করা নিষিদ্ধ নয়।

দ্বিতীয় নিয়ত স্ত্রীর রূপ-লাবণ্য ও স্বাস্থ্য অটুট রাখা: যাতে সে স্বাস্থ্যবতী ও প্রাণবস্ত থাকে। কেননা, প্রসব বেদনার মধ্যে অনেক বিপদাশংকা থাকে। বলাবাহুল্য, এ ধরনের নিয়তও নিষিদ্ধ নয়।

তৃতীয় নিয়ত সন্তানের সংখ্যাধিক্যের কারণে ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশংকা করা। এটাও নিষিদ্ধ নয়, যাতে মানুষকে অধিক আমদানীর শ্রম স্বীকার করতে এবং অবৈধ আমদানীর পথে পা বাড়াতে না হয়। কেননা, সাংসারিক ব্যয় কম থাকা দ্বীনদারীর জন্য সহায়ক। তবে 
‎وَمَا مِنْ دَا فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا 

বাক্যে আল্লাহ রিযিকের যে ওয়াদা করেছেন, তার উপর ভরসা করার মধ্যেই রয়েছে মাহাত্ম্য ও পূর্ণতা। সুতরাং এই তৃতীয় প্রকার নিয়ত করলে একটি মহৎ ও উত্তম বিষয় বর্জন করা হয়, কিন্তু পরিণামের দিকে লক্ষ্য করে আমরা এটা নিষিদ্ধ বলতে পারি না।

চতুর্থ নিয়ত হচ্ছে এ বিষয়ের আশংকা যে, কন্যা সন্তান জন্যগ্রহণ করলে তাদেরকে বিবাহ দিতে হবে এবং কাউকে জামাত। করার কলংক অর্জন করতে হবে। এ কলংকের ভয়ে আরবরা কন্যা সন্তানকে হত্যা করত এবং জীবন্ত পুঁতে ফেলত। এ নিয়ত অবশ্যই মহাপাপ। এ নিয়তে কেউ গর্ভাশয়ের বাইরে বীর্যস্খলন ঘটালে সে গোনাহগার হবে।

পঞ্চম নিয়ত স্বয়ং স্ত্রীর বাধাদান। সে গর্ভাশয়ের অভ্যন্তরে বীর্যস্খলনে সম্মত হয় না। কারণ, সে নিজেকে ইযযতের অধিকারিণী মনে করে, অতিমাত্রায় পরিচ্ছন্ন থাকতে চায় এবং প্রসব বেদনা, নেফাস ও স্তন্যদান থেকে সযত্নে বেঁচে থাকে। এ ধরনের নিয়ত খুবই গর্হিত। খারেজী সম্প্রদায়ের মহিলাদের এরূপ অভ্যাস ছিল। হযরত আয়েশা (র.) বসরায় তশরীফ নিয়ে গেলে এমনি এক মহিলা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি তাকে কাছেই আসতে দেননি।

মোট কথা, জন্মশাসন দূষণীয় নয় যদি তা সঠিক নিয়তে করা হয়।

এখন প্রশ্ন হয়, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: যেব্যক্তি সন্তান সন্ততির ভয়ে বিবাহ বর্জন করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। অথচ আপনি বিবাহ বর্জন ও বাইরে বীর্যস্খলনকে একই রূপ বলেন এবং সন্তানের ভয়ে একে মাকরূহ বলেন না! এর জওয়াব, আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়- এর অর্থ, সে আমাদের অনুরূপ এবং আমাদের পথ ও সুন্নতের অনুসারী নয়। আমাদের সুন্নত হচ্ছে উত্তম কাজ করা। আবার প্রশ্ন হয়, অন্যত্র রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এ কাজকে গোপন সন্তান প্রোথিতকরণ) বলেছেন, এর পর  (وَإِذَا السؤؤدة)
এ আয়াতখানি তেলাওয়াত করেছেন। এটি সহীহ হাদীসের রেওয়ায়েত। এর জওয়াব, সহীহ রেওয়ায়েতে এর বৈধতাও বর্ণিত হয়েছে। কাজেই উপরোক্ত রেওয়ায়েত দ্বারা মাকরূহে তাহরীমী হওয়া প্রমাণিত হয় না। আরও প্রশ্ন হয়, হযরত ইবনে আব্বাস (র.) বলেন: বাইরে বীর্যস্খলন ঘটানো ক্ষুদ্রাকারের জীবস্ত প্রোথিতকরণ। আমরা এর জওয়াবে বলি, হযরত ইবনে আব্বাসের এই উক্তি একটি 'কিয়াস' তথা অনুমান। তিনি অস্তিত্বকে নিশ্চিত ধরে নিয়ে তা দূর করা ক্ষুদ্রাকারের জীবন্ত প্রোথিতকরণ বলেছেন। এই কিয়াস দুর্বল। তাই হযরত আলী (র.) এটা শুনে মেনে নেননি এবং বলেন, কয়েকটি স্তর অতিক্রম করা ছাড়া জীবন্ত প্রোথিতকরণ প্রমাণিত হয় না। এর পর তিনি এই আয়াত পাঠ করেন, যাতে স্তরগুলো বর্ণিত হয়েছে-
‎( وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ سُفْلَةٍ مِّنْ طِينٍ ثُمَّ جَعَلْنَهُ نُطْفَةٌ فِي قَرَارٍ مَّكِينٍ ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ)
"আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর *তাকে বীর্যের আকারে এক সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছি। এর পর আমি বীর্যকে জমাট রক্তরূপে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর জমাট রক্তকে মাংসপিণ্ডে পরিণত করেছি, এর পর সেই মাংসপিণ্ড থেকে অস্থি সৃষ্টি করেছি, অতঃপর অস্থিকে মাংস দ্বারা আবৃত করেছি। অবশেষে তাকে এক নতুন সৃষ্টিরূপে দাঁড় করিয়েছি।" এর পর তিনি (وَإِذَا الْمَوْؤُدَةُ سُنت) আয়াতটি পাঠ করলেন। সুতরাং হযরত ইবনে আব্বাসের উপরোক্ত কিয়াস কিরূপে শুদ্ধ হতে পারে? কেননা বোখারী ও মুসলিমে হযরত জাবের (র.) থেকে বর্ণিত আছে, "রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর আমলে যখন কোরআন নাযিল হচ্ছিল, তখন আমরা আযল (বাইরে বীর্যস্খলন) করতাম।"
অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে- "আমরা আযল করতাম। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে এই সংবাদ পৌঁছলে তিনি আমাদেরকে নিষেধ করেননি।"

হযরত জাবের থেকে আর একটি সহীহ রেওয়ায়েত রয়েছে, এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে আরজ করল: আমার একটি বাঁদী আছে। সে খেদমত করে এবং বৃক্ষে পানি দেয়। আমি তার সাথে সহবাস করি, কিন্তু আমি চাই না, তার গর্ভ সঞ্চার হোক। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ, "তুমি ইচ্ছা করলে তার সাথে আযল কর, কিন্তু যা তার ভাগ্যে নির্ধারিত রয়েছে তা আসবেই। কয়েকদিন পর লোকটি আবার এসে আরজ করল: আমার সে বাঁদী গর্ভবতী হয়ে গেছে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: আমি তো পূর্বেই বলেছিলাম, তার ভাগ্যে লেখা সম্ভা অবশ্যই আসবে। এসব রেওয়ায়েত বোখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে।


রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: যেব্যক্তির একটি কন্যা থাকে এবং সে তাকে 

পরবর্তী পর্ব —
পারস্পরিক জীবন যাপনের একাদশ আদব সন্তান সংক্রান্ত 

বিবাহ (২৯) পারস্পরিক জীবন যাপনের নবম আদব আপোষ করা



বিবাহ (পর্ব – ২৯) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

পারস্পরিক জীবন যাপনের নবম আদব আপোষ করা—
নবম আদব, যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কলহ হয় এবং বনিবনার কোন উপায় অবশিষ্ট না থাকে, তবে স্বামীর পরিবারের একজন ও স্ত্রীর পরিবারের একজন- এই দুই জন সালিস বসবে। উভয় সালিস তাদের অবস্থা দেখবে। যদি তারা পুনর্মিলন চায়, তবে পুনর্মিলন করিয়ে দেবে। হযরত ওমর (র.) স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আপোষ করানোর জন্যে এক ব্যক্তিকে প্রেরণ করেন। সে আপোষ না করিয়ে ফিরে এলে তিনি তাকে শাসিয়ে বলেন : আল্লাহ তাআলা বলেছেন স্বামী-স্ত্রী সংশোধন চাইলে আল্লাহ তাআলা উভয়ের মধ্যে বনিবনা সৃষ্টি করে দেবেন। অথচ তুমি আপোষ না করিয়েই ফিরে এলে? লোকটি পুনরায় গেল এবং নিয়ত ঠিক করে স্বামী-স্ত্রীর সাথে নম্রভাবে কথাবার্তা বলল। ফলে পুনর্মিলন সক্ষম হয়ে গেল। এটা তখন, যখন উভয়ের পক্ষ থেকে কিংবা স্বামীর পক্ষ থেকে অবাধ্যতা হয়। আর যদি বিশেষভাবে স্ত্রীর পক্ষ থেকে অবাধ্যতা হয়, তবে স্বামী স্ত্রীর উপর প্রবল বিধায় তার উচিত শাসন করা এবং বল প্রয়োগে স্ত্রীকে বাধ্য করা। অনুরূপভাবে যদি স্ত্রী নামায না পড়ে, তবে স্বামী জবরদস্তি তাকে নামায পড়াবে, কিন্তু শাসনে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। তা হচ্ছে, প্রথম উপদেশ দেবে এবং আখেরাতের আযাব ও নিজের শাস্তির বিষয়ে সতর্ক করবে। এটা উপকারী না হলে শয্যায় স্ত্রীর দিকে পিঠ ফিরিয়ে শয়ন করবে অথবা একই ঘরে থেকে নিজের বিছানা আলাদা করে নেবে। তিন রাত পর্যন্ত তাই করবে। যদি তাও কার্যকর না হয়, তবে স্ত্রীকে এমনভাবে মারধর করবে, যাতে কষ্ট তো হয়, কিন্তু জখম হবে না এবং হাড্ডি ভাঙ্গবে না। মুখে মারবে না। এটা নিষিদ্ধ! জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে আরজ করল: স্ত্রীর হক কি? তিনি বললেন: যখন স্বামী খাবে, স্ত্রীকে খাওয়াবে এবং যখন নিজে পরবে, তখন স্ত্রীকে পরাবে। যদি মারার প্রয়োজন হয় তবে নির্মমভাবে মারবে না। আলাদা শয়ন করলে একই ঘরে শয়ন করবে। স্ত্রীর কোন দ্বীনদারীর ব্যাপারে রাগ করলে দশ-বিশ দিন অথবা এক মাস পর্যন্ত স্ত্রীর কাছে শয়ন বর্জন করা স্বামীর জন্যে জায়েয। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)ও এমন করেছেন। একবার উন্মুল মুমিনীন হযরত যয়নব (র.)-এর কাছে তিনি কিছু উপহার প্রেরণ করেন। হযরত যয়নব তা ফেরত পাঠিয়ে দেন। এর পর রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যে বিবির ঘরেই তশরীফ রাখতেন, তিনিই আরজ করতেন: যয়নব আপনার কদর করেনি। আপনার দেয়া উপহার সে প্রত্যাখ্যান করেছে। এতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সকল বিবিকে সতর্কবাণী শুনিয়ে পূর্ণ একমাস তাঁদের সাথে রাগ করে রইলেন। এর পর তাঁদের কাছে গেলেন।

পরবর্তী পর্ব —
পারস্পরিক জীবন যাপনের দশম আদব সহবাস সংক্রান্ত 

বিবাহ (২৮) পারস্পরিক জীবন যাপনের সপ্তম আদব হায়েযের বিধানাবলী শিক্ষা



বিবাহ (পর্ব – ২৮) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

পারস্পরিক জীবন যাপনের সপ্তম আদব হায়েযের বিধানাবলী শিক্ষা —
সপ্তম আদব, পুরুষের পক্ষে হায়েযের বিধানাবলী শেখা উচিত, যাতে এ দিনগুলোতে কি কি বিষয় থেকে বেঁচে থাকা ওয়াজিব, তা জানা যায়। স্ত্রীকেও শিক্ষা দেয়া দরকার, হায়েযের সময়কার কোন কোন নামাযের কাযা পড়তে হবে এবং কোন্ কোন্ নামাযের কাযা পড়তে হবে না। কেননা, কোরআন শরীফে স্ত্রীকে দোযখ থেকে বাঁচানোর জন্যে পুরুষদের প্রতি নির্দেশ রয়েছে  "নিজেদেরকে এবং পরিবার পরিজনকে দোযখ থেকে রক্ষা কর ।"
 অতএব স্ত্রীকে আহলে সুন্নতের বিশ্বাসসমূহ শিক্ষা দেয়া পুরুষের জন্যে অপরিহার্য। যদি স্ত্রী বেদআতে কান দিয়ে থাকে, তবে তা তার মন থেকে দূর করবে। দ্বীনদারীর ব্যাপারে অলসতা করলে তাকে আল্লাহর আযাবের ভয় দেখাবে এবং হায়েয ও এস্তেহাযার প্রয়োজনীয় মাসআলা বলে দেবে। মাসআলা শেখার জন্যে স্বামী যথেষ্ট হলে এর জন্য কোন আলেমের কাছে যাওয়া স্ত্রীর জন্যে বৈধ নয়। পুরুষ স্বল্প জ্ঞান হলেও যদি কোন মুফতীর কাছ থেকে স্ত্রীর প্রশ্নের জওয়াব এনে দিতে পারে, তবুও তার জন্যে বাইরে গমন করা জায়েয নয়। অন্যথায় স্ত্রীর বাইরে যাওয়া এবং জিজ্ঞেস করে নেয়া  যায়েজ নয় : বরং ওয়াজিব। এমতাবস্থায় স্বামী নিষেধ করলে গোনাহগার হবে। যদি স্ত্রী ফরযগুলো শিখে নেয়, তবে অধিক শিক্ষার জন্যে স্বামীর অনুমতি ব্যতিরেকে কোন ওয়াজের মসলিসে যাওয়া জায়েয নয়। স্ত্রী হায়েম এস্তেহাযার কোন বিধান না জানার কারণে পালন করে না এবং স্বামীও শিক্ষা দেয় না, এমতাবস্থায় স্বামী স্ত্রীর সাথে যাবে। নতুবা গোনাহে তার অংশীদার হবে।

পরবর্তী পর্ব —
পারস্পরিক জীবন যাপনের অষ্টম আদব সমতা রক্ষা করা—

বিবাহ (২৭) পারস্পরিক জীবন যাপনের ষষ্ঠ আদব আর্থিক



বিবাহ (পর্ব – ২৭) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

পারস্পরিক জীবন যাপনের ষষ্ঠ আদব আর্থিক —
ষষ্ঠ আদব, স্ত্রীদের প্রয়োজনীয় ব্যয় বহনে সমতা বজায় রাখবে। অর্থাৎ, এতে সংকীর্ণতাও অবলম্বন করবে না এবং অপব্যয়ও করবে না, বরং মধ্যম পর্যায়ে খরচপত্র দেবে। আল্লাহ তাআলা বলেন : "তোমরা খাও, পান কর এবং অপব্যয় করো না।" অন্য আয়াতে বলা হয়েছে- "হাতকে ঘাড়ের সাথে বেঁধে রেখো না এবং পুরোপুরি খুলতে দিয়ো না।" 
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : "তোমগমাদের মধ্যে সে লোক উত্তম, যে তার পরিবার-পরিজনের জন্যে উত্তম।"  অন্য এক হাদীসে তিনি বলেন: "এক দীনার তুমি জেহাদে ব্যয় করবে, এক দীনার গোলাম মুক্ত করার কাজে ব্যয় করবে, এক দীনার কোন মিসকীনকে সদকা দেবে এবং এক দীনার পরিবার-পরিজনের জন্যে ব্যয় করবে। এগুলোর মধ্যে অধিক সওয়াব সে দীনারের হবে, যা তুমি পরিবার-পরিজনের জন্যে ব্যয় করবে।" 
কথিত আছে, হযরত আলী (র.)-এর চার কন্যা ছিলেন। তিনি তাঁদের প্রত্যেকের জন্যে প্রতি চার দিনে এক দেরহাম গোশত ক্রয় করতে দিতেন।
নিজে উৎকৃষ্ট খাদ্য খাবে এবং পরিজনকে তা থেকে খাওয়াবে না, গৃহকর্তার জন্যে এটা সমীচীন নয়, এটা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। যদি গৃহকর্তার এরূপ একা খাওয়াই কাম্য হয়, তবে গোপনে খাওয়া উচিত। অন্যদের সামনে এরূপ খাদ্যের আলোচনা করাও উচিত নয়, যা তাদেরকে খাওয়ানো উদ্দেশ্য নয়। যখন খেতে বসবে, তখন ঘরের সকলকে সঙ্গে নিয়ে বসবে। হযরত সুফিয়ান সওরী (রহ.) বলেন: আল্লাহ তাআলা ও তাঁর ফেরেশতাগণ সে ঘরের লোকজনের প্রতি রহমত প্রেরণ করেন, যারা একত্রে বসে আহার করে।

পরবর্তী পর্ব —
পারস্পরিক জীবন যাপনের সপ্তম আদব হায়েযের বিধানাবলী শিক্ষা —

বিবাহ (২৬) পারস্পরিক জীবন যাপনের পঞ্চম আদব সন্দেহ না করা



বিবাহ (পর্ব – ২৬) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

পারস্পরিক জীবন যাপনের পঞ্চম আদব সন্দেহ না করা —
পঞ্চম আদব, স্ত্রীদের প্রতি কুধারণায় তাদের গোপন বিষয়ের অনুসন্ধানে বাড়াবাড়ি করবে না। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) স্ত্রীদের গোপন বিষয়সমূহের পেছনে পড়তে বারণ করেছেন। কোন কোন রেওয়ায়েত অনুযায়ী তিনি স্ত্রীদের সামনে হঠাৎ উপস্থিত হতে বারণ করেছেন। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এক সফর থেকে প্রত্যাবর্তন করে মদীনায় প্রবেশের পূর্বে বললেন: রাতের বেলায় স্ত্রীদের কাছে যাবেনা। এই আদেশ উপেক্ষা করে দুই ব্যক্তি বাড়ি গিয়ে অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি দেখতে পেল। 
প্রসিদ্ধ এক হাদীসে আছে, - নারী পাঁজরের অস্থির ন্যায় বাঁকা। একে সোজা করতে চাইলে ভেঙ্গে যাবে। অতএব বাঁকা অবস্থায়ই এর দ্বারা উপকৃত হও। নারী চরিত্র সংশোধনের উদ্দেশ‍্যে এ কথাটি বলা হয়েছে। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলছেন, - কোন কোন আত্মসম্মানবোধ আল্লাহ তা'আলা অপছন্দ করেন। তাহল স্ত্রীর উপর পুরুষের আত্মসম্মানবোধ, যা কোন সন্দেহ ছাড়াই হয়। কেননা, এরূপ আত্মসম্মানবোধের উৎস হচ্ছে কুধারণা, যা করা নিষিদ্ধ! আত্মসম্মানবোধ যথাস্থানে প্রশংসনীয়। মানুষের মধ্যে তা অবশ্যই থাকা উচিত। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: আল্লাহর আত্মসম্মানবোধ রয়েছে। মুমিনের আত্মসম্মানবোধ রয়েছে। মানুষের উপর আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা আল্লাহর আত্মসম্মানবোধ। তিনি আরও বলেন: সা'দের আত্মসম্মান দিয়ে তোমরা কি কর? আল্লাহর কসম, আমি সা'দের তুলনায় অধিক আত্মসম্মানের অধিকারী। আল্লাহ তাআলা আমার চেয়ে অধিক আত্মসম্মান রাখেন। এই আত্মসম্মানের কারণেই তিনি বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ পাপাচার হারাম করেছেন। আল্লাহ তাআলার তুলনায় অন্য কারও আপত্তি করা অধিক পছন্দনীয় নয়। এ কারণেই তিনি সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা রসূল প্রেরণ করেছেন। তারীফও তাঁর চেয়ে অধিক অন্য কেউ পছন্দ করে না। এ কারণেই তিনি জান্নাতের ওয়াদা দিয়েছেন। 
এক হাদীসে বলা হয়েছে, আমি মেরাজ রজনীতে জান্নাতের ভেতরে একটি প্রাসাদ দেখেছি। তার আঙ্গিনায় একটি বাঁদী ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই প্রাসাদ কার। কেউ জওয়াব দিল: ওমরের। আমি তার অভ্যন্তরভাগ দেখতে চাইলাম, কিন্তু হে ওমর, তোমার আত্মসম্মানবোধের কথা মনে পড়ে গেল। হযরত ওমর কেঁদে ফেললেন এবং বললেন: আমি কি আপনাকে আত্মসম্মানবোধ দেখাব? 
হযরত হাসান বসরী বলতেনঃ কাফেরদের গা ঘেঁষে চলার জন্যে তোমরা স্ত্রীদেরকে বাজারে পাঠিয়ে দাও! যার আত্মসম্মানবোধ নেই, সে ধ্বংস হোক।আত্মসম্মানবোধের প্রয়োজন তখন হয় না. যখন স্ত্রীর কাছে বেগানা পুরুষ আসে না এবং স্ত্রী বাজারে বের হয় না।
 রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) একবার হযরত ফাতেমা (র.)-কে জিজ্ঞেস করলেন: নারীর জন্যে উত্তম কি, তিনি বললেন: উত্তম, সে বেগানা পুরুষকে দেখবে না এবং কোন বেগানা পুরুষও তাকে দেখবে না। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন: এমন জওয়াব দেবে না কেন, কেমন বাপের মেয়ে! 
সাহাবায়ে কেরাম প্রাচীরের ছিদ্র বন্ধ করে দিতেন, যাতে মহিলারা পুরুষদেরকে না দেখে। হযরত মুয়ায (র.) তাঁর স্ত্রীকে আলো আসার ছিদ্র দিয়ে বাইরে তাকাতে দেখে শাস্তি দিয়েছেন। হযরত ওমর (র.) বলতেন: স্ত্রীদেরকে উৎকৃষ্ট পোশাক দিয়ো না, তা হলে গৃহ মধ্যে থাকবে। কারণ এই, মহিলারা ছন্নছাড়া অবস্থায় বাইরে যাওয়া পছন্দ করে না। 
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: মহিলার গৃহ মধ্যে থাকার অভ্যাস গড়ে তুলুক। তিনি শুরুতে মহিলাদেরকে মসজিদে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। বর্তমানে বৃদ্ধাদের ছাড়া অন্যদের জন্যে মসজিদে যাওয়ার অনুমতি না থাকা উত্তম। বরং এটা সাহাবায়ে কেরামের আমলেও সঙ্গত ছিল না। তাই হযরত আয়েশা (র.) বলেন: রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওফাতের পর মহিলারা যেসব বিষয় উদ্ভাবন করেছে, তা যদি তিনি জানতেন তবে তাদেরকে বাইরে যেতে অবশ্যই নিষেধ করতেন। 
একবার হযরত ইবনে ওমর এ হাদীসটি বর্ণনা করেন, "মহিলাদেরকে মসজিদে যেতে বারণ করো না।"  তখন তাঁর পুত্র বলে উঠল: আল্লাহর কসম, আমরা বারণ করব। হযরত ইবনে ওমর (র.) তৎক্ষণাৎ পুত্রকে প্রহার করলেন এবং ক্রুদ্ধ স্বরে বললেন: আমি বলি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এমন বলেন। আর তুই কিনা তা অমান্য করছিস। এর অর্থ কি, তাঁর পুত্রের এই বিরোধিতার কারণ ছিল, পরিবর্তিত অবস্থা তাঁর জানা ছিল। ইবনে ওমরের ক্রুদ্ধ হওয়ার কারণ, বাহ্যতঃ কোন কারণ বর্ণনা না করেই পুত্র হাদীসের বিপরীত উক্তি করেছিল। অনুরূপভাবে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মহিলাদেরকে বিশেষভাবে ঈদের নামাযে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন, তাও স্বামীদের অনুমতি দেয়ার শর্ত সাপেক্ষে। বর্তমান যুগেও সতী-সাধ্বী নারীদের স্বামীর অনুমতিক্রমে বাইরে যাওয়া জায়েয, কিন্তু না যাওয়াতেই সাবধানতা বেশী।
নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া মহিলাদের বাইরে যাওয়া উচিত নয়। তামাশা ও অনাবশ্যক কাজের জন্যে মহিলাদের বাইরে যাওয়া সাধারণ ভদ্রতারও পরিপন্থী। এতে মাঝে মাঝে অনর্থও সৃষ্টি হয়। 
এর পর বাইরে গেলে পুরুষদের দিক থেকে দৃষ্টি নত রাখবে। আমরা বলি না, নারীর মুখমণ্ডলও নারীর জন্যে গোপনীয়, বরং ফেতনার অবস্থায় পুরুষের মুখমণ্ডল দেখা হারাম। ফেতনার ভয় না থাকলে হারাম নয়। কেননা, পূর্ববর্তী যুগে পুরষরা সর্বদাই খোলামেলা চলাফেরা করেছে এবং মহিলারা অবগুণ্ঠন সাজিয়ে বের হয়েছে। পুরুষদের মুখমণ্ডল মহিলাদের জন্যে গোপনীয় হলে পুরুষদেরকেও অবগুন্ঠন ব্যবহার করার নির্দেশ দেয়া হত।

পরবর্তী পর্ব —
পারস্পরিক জীবন যাপনের ষষ্ঠ আদব আর্থিক 

বিবাহ (২৫) পারস্পরিক জীবন যাপনের চতুর্থ আদব শাসন করা



বিবাহ (পর্ব – ২৫) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

পারস্পরিক জীবন যাপনের চতুর্থ আদব শাসন করা —
চতুর্থ আদব, স্ত্রীর চাহিদার এত বেশী অনুসরণ করবে না যাতে তার মেযাজ বিগড়ে যায় এবং তার সামনে নিজের কোন ভয়ভীতি না থাকে বরং এতে সমতার প্রতি লক্ষ্য রাখবে। খারাপ কিছু দেখলে তাতে কখনও সম্মত হবে না। স্ত্রী শরীয়ত অথবা ভদ্রতা বিরোধী কোন কিছু করলে তৎক্ষণাৎ ক্রোধ প্রকাশ করবে। হযরত হাসান বসরী (রহ.) বলেন: যেব্যক্তি স্ত্রৈণ অর্থাৎ, স্ত্রী যা চায় তাই করে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে উপুড় করে দোযখে ফেলে দেবেন। 
হযরত ওমর (র.) বলেন, স্ত্রীদের মর্জির বিপরীত কাজ কর, এতে বরকত হয়। তিনি আরও বলেন: স্ত্রীদের সাথে পরামর্শ কর এবং তারা যে পরামর্শ দেয় তার বিপরীত কর।  
হাদীসে আছে- স্ত্রীর গোলাম ধ্বংস হোক। এর কারণে, স্ত্রীর খাহেশের বিষয়াদিতে তার আনুগত্য করলে তার গোলামী করা হবে। আল্লাহ্ তা'আলা তাকে স্ত্রীর মালিক করেছেন, কিন্তু সে নিজেকে তার গোলাম করে দিয়েছে। ফলে ব্যাপার উল্টে গেছে। সে কোরআনে বর্ণিত শয়তানের এই উক্তিরও আনুগত্য করেছে- 
"আমি মানুষকে আদেশ করব, তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে পাল্টে দিক। পুরুষের হক ছিল অনুসৃত হওয়ার অনুসাবী হওয়ার নয়। অথচ আল্লাহ্ তা'আলা পুরুষদেরকে নারীদের উপর শাসক সাব্যস্ত করেছেন।
যেমন বলা হয়েছে, "পুরুষরা স্ত্রীদের উপর শাসক। সুতরাং স্ত্রীদের লাগাম সামান্য শিথিল করে দিলে তারা পুরুষদেরকে কয়েক হাত হেঁচড়ে নিয়ে যাবে। পক্ষান্তরে লাগাম টেনে রাখলে এবং জায়গা মত কঠোর হলে স্ত্রীরা আয়ত্তে থাকবে"। 
ইমাম শাফেয়ী বলেন: তিনটি বস্তু এমন রয়েছে, তুমি তাদের সম্মান করলে তারা তোমাকে অপদস্থ করবে এবং তুমি অপদস্থ করলে তারা তোমাকে সম্মান করবে। তাদের মধ্যে একটি হচ্ছে স্ত্রী দ্বিতীয়টি খাদেম এবং  তৃতীয়টি নিবর্তী। ইমাম শাফেয়ীর উদ্দেশ্য, যদি কেবল সন্মান কর এবং মাঝে মাঝে নরমের সাথে সাথে শক্ত না হও, শক্ত কথা না বল, তবে নিঃসন্দেহে মাথায় চড়ে বসবে। মোট কথা, আকাশ ও পৃথিবী সমতা এবং মধ্যবর্তিতার উপরই প্রতিষ্ঠিত। মধ্যবর্তিতা থেকে সামান্য বিচ্যুত হলে ব্যাপার উল্টে যায়। তাই বুদ্ধিমানের উচিত হল স্ত্রীর সাথে আনুকূল্য ও বিরোধিতায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করা এবং প্রত্যেক ব্যাপারে সত্যের অনুসরণ করা, যাতে তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকা যায়। কেননা, স্ত্রীদের কলাকৌশল অত্যন্ত মন্দ এবং তাদের অনিষ্ট প্রকাশ্য। তাদের মানসিকতায় অসদাচরণ ও জ্ঞানবৃদ্ধির স্বল্পতা প্রবল। এতে সমতা তখনই আসবে, যখন নরম ও শক্ত উভয় প্রকার ব্যবহার তাদের সাথে করা হয়। 
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: তিনটি বিপদ থেকে আশ্রয় চাইবে। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে দুশ্চরিত্রা নারী। সে বার্ধক্যের পূর্বেই বৃদ্ধ করে দেয়। 
রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিবিগণ ছিলেন মহিলাদের মধ্যে সর্বোত্তম। তাঁদের সম্পর্কে তিনি বলেছেন : তোমরা ইউসুফ (আঃ)-এর সহচরী: রসূলুল্লাহ [সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম] ওফাতের পূর্বে যখন রোগশয্যায় শায়িত ছিলেন এবং নামায পড়ানোর শক্তি তাঁর ছিল না, তখন এরশাদ করেন: আবু বকরকে নামায পড়াতে বল। এতে হযরত আয়েশা আপত্তি করে বলেন: আমার পিতা কোমলচিত্ত। মানুষ আপনার স্থান শূন্য দেখে তিনি স্থির থাকতে পারবেন না। তখন রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উপরোক্ত বাক্য করেন। অর্থাৎ, তুমি যে আবু বকরকে নামায পড়াতে নিষেধ করছ, এটা সত্য পরিহার করে খেয়াল-খুশীর দিকে ঝুঁকে পড়ার শামিল। 
এক হাদীসে আছে- "যে সম্প্রদায়ের মালিক নারী, তার কল্যাণ হবে না।

পরবর্তী পর্ব — 
পারস্পরিক জীবন যাপনের পঞ্চম আদব সন্দেহ না করা

বিবাহ (২৪) পারস্পরিক জীবন যাপনের তৃতীয় আদব প্রমোদ



বিবাহ (পর্ব – ২৪) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

পারস্পরিক জীবন যাপনের তৃতীয় আদব প্রমোদ —
তৃতীয় আদব, পীড়ন সহ্য করা সত্ত্বেও স্ত্রীদের সাথে হাসি তামাশা ও আনন্দ করবে। এতে তাদের মন প্রফুল্ল হবে। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিয়ম ছিল, তিনি বিবিগণের সাথে ব্যঙ্গ-কৌতুক করতেন এবং কাজে ও চরিত্রে তাদের স্তরে নেমে যেতেন। এমন কি বর্ণিত আছে, তিনি হযরত আয়েশার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতাও করেছেন। একদিন হযরত আয়েশা দৌড়ে জিতে গেলেন। এর পর একদিন রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) দৌড়ে এগিয়ে গেলেন এবং বললেন: আয়েশা! (র.) এটা সেদিনের প্রতিশোধ। 
হাদীসে আছে, অন্য সব মানুষের তুলনায় রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বিবিগণের সাথে অধিক আনন্দ করতেন। হযরত আয়েশা (র.) বলেন: একদিন আমি আবিসিনিয়ার লোকদের আওয়াষ শুনলাম। তারা আশুরার দিন খেলাধুলা করছিল। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে বললেন: তুমি কি তাদের খেলা দেখতে চাও। আমি বললাম: হাঁ। তিনি খেলোয়াড়দেরকে ডাকলেন। তারা হাযির হলে তিনি দরজার উভয় কপার্টের মাঝখানে দাড়িয়ে গেলেন এবং নিজের হাত কপাটের উপরে ছড়িয়ে দিলেন। আমি আমার চিবুক তাঁর হাতের উপর রেখে খেলা দেখতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: আয়েশা, আর কত। আমি দুই কিংবা তিন বার বললামঃ আর একটু রাখুন। অতঃপর তিনি এরশাদ করলেন: আয়েশা, আর না। এবার শেষ কর। আমি, বললাম ঠিক আছে, চলুন তার পর রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) খেলোয়াড়দেরকে ইশারা করলে তারা চলে গেল। এক হাদীসে বলা হয়েছে: "মুমিনদের মধ্যে অধিক কামেল মুমিন সে ব্যক্তি, যার অভ্যাস ভাল এবং সে পরিবার পরিজনের প্রতি অধিক কৃপাশীল"। 
এক হাদীসে আছে  "সর্বোত্তম সে ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীদের জন্যে সর্বোত্তম। আমি আমার স্ত্রীদের জনে! তোমাদের চাইতে উত্তম।"
হযরত ওমর (র.) কঠোর চিত্ত হওয়া সত্ত্বেও বলেন: পুরুষের উচিত নিজের ঘরে শিশুদের মত থাকা। যখন তার কাছে কোন জিনিস চাওয়া হয় তখন পুরুষ হয়ে যাবে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত জাবেরকে বলেছিলেন, কুমারী নারীকে বিবাহ করলে না কেন, যাতে তুমি তার সাথে কৌতুক করতে এবং সে তোমার সাথে আনন্দ করতো।

পরবর্তী পর্ব —
পারস্পরিক জীবন যাপনের চতুর্থ আদব শাসন করা —

বিবাহ (২৩) পারস্পরিক জীবন যাপনের দ্বিতীয় আদব সদাচরণ



বিবাহ (পর্ব – ২৩) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

পারস্পরিক জীবন যাপনের দ্বিতীয় আদব সদাচরণ —
দ্বিতীয় আদব স্ত্রীর সাথে সদাচরণ করা এবং দয়াপরবশ হয়ে তাদের নিপীড়ন সহ্য করা। কেননা, তাদের জ্ঞানবুদ্ধি অপূর্ণ। আল্লাহ তা'আলা বলেন : "মহিলাদের সঙ্গে সদাচরণ সহকারে জীবন যাপন কর"। 
ওফাতের সময় রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওসিয়ত ছিল তিনটি বিষয়। সেগুলো বলতে বলতেই তাঁর কন্ঠস্বর স্তিমিত হয়ে যাচ্ছিল। তিনি বলছিলেন, "নামায কায়েম কর, নামায কায়েম কর। তোমরা যেসকল গোলাম ও বাঁদীর মালিক, তাদেরকে তাদের সাধ্যাতীত কাজ করতে বলো না। স্ত্রীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। তারা তোমাদের হাতে বন্দী। তোমরা তাদেরকে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকারের মাধ্যমে গ্রহণ করেছ এবং তাদের লজ্জাস্থান আল্লাহর কলেমা উচ্চারণ করে হালাল করেছ।"
এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে- যেব্যক্তি তার স্ত্রীর অসদাচরণে সবর করবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে এই পরিমাণ সওয়াব দেবেন, যে পরিমাণ হযরত আইউব (আঃ)-কে তাঁর বিপদের কারণে দিয়েছিলেন। 
পক্ষান্তরে যে স্ত্রী তার স্বামীর বদমেযাজীতে সবর করবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে ফেরাউন-পত্নী আছিয়ার সমান সওয়াব দান করবেন। 
প্রসঙ্গতঃ স্মরণ রাখা দরকার, স্ত্রীর সাথে সদাচরণের অর্থ স্ত্রী পীড়ন না করলে সদাচরণ করা নয়; বরং অর্থ হচ্ছে, স্ত্রীর পীড়নের জওয়াবে সদাচরণ করা। স্ত্রী রাগ করলে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর অনুসরণে তার রাগ সহ্য করা। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিবিগণও তাঁর সামনে রাগ করতেন এবং তাঁদের কেউ কেউ সারাদিন তাঁর সাথে কথা বলতেন না। তিনি এসব বিষয় নীরবে সহ্য করতেন এবং তাঁদের সাথে কঠোর ব্যবহার করতেন না। 
হযরত ওমর (রা.)-এর পত্নী একবার তাঁর কথার জওয়াব দিলে তিনি রাগতস্বরে বললেন: হে উদ্ধত, তুমি আমার কথার জওয়াব দিচ্ছ। পত্নী বললেন: রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিবিগণও তাঁর কথার জওয়াব দেন। অথচ রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তোমার চেয়ে অনেক শ্রেষ্ঠ। 
হযরত ওমর বললেন: হাফসা জওয়াব দিয়ে থাকলে সে খুব খারাপ করেছে। অতঃপর তিনি কন্যা হাফসাকে সম্বোধন করে বললেন: হে হাফসা, সিদ্দীকের কন্যা হবার লোভ করো না। সে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর আদরিণী। তুমি কখনও রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কথার জওয়াব দেবে না।
বর্ণিত আছে, পবিত্র বিবিগণের একজন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর বুকে হাত রেখে তাঁকে ধাক্কা দেন। এ জন্যে তাঁর মা তাঁকে শাসালে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাকে বললেন: ছাড়,
তাকে কিছু বলো না। এই পত্নীরা তো এর চেয়ে বড় কান্ডও করে! 
একবার রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ও হযরত আয়েশা (র.)-এর মধ্যে কিছু কথা কাটাকাটি হলে তাঁরা উভয়েই হযরত আবু বকরের কাছে বিচারপ্রার্থী হন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত আয়েশাকে বললেন: তুমি আগে বলবে, না আমি বলব। 
হযরত আয়েশা আরজ করলেন: আপনি বলুন, কিন্তু সত্য সত্য বলবেন। একথা শুনে হযরত আবু বকর (র.) কন্যা আয়েশাকে সজোরে এক চপেটাঘাত করে বললেন : তুই কি বলছিস, হযরত কি সত্য ছাড়া মিথ্যা বলতে পারেন। 
হযরত আয়েশা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর আশ্রয় চাইলেন এবং তাঁর পেছনে গিয়ে লুকালেন। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত আবু বকর (র.)-কে বললেন: আমরা তোমাকে এজন্যে ডাকিনি এবং তুমি এরূপ করবে এটাও আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না। 
একবার কোন এক কথায় রাগান্বিত হয়ে হযরত আয়েশা (র.) বললেন, আপনিই বলেন, আপনি পয়গম্বর। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মুচকি হেসে তা সহ্য করে নিলেন। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত আয়েশাকে বলতেন: আয়েশা, আমি তোমার রাগ ও সন্তুষ্টি বুঝে নিতে পারি। তিনি আরজ করলেন: আপনি তা কেমন করে বুঝতে পারেন? তিনি বললেন: যখন তুমি আমার প্রতি সন্তুষ্ট থাক, তখন কসম খেতে গিয়ে বল- মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর আল্লাহর কসম, আর রাগের অবস্থায় বল- ইবরাহীম (আ.)-এর আল্লাহর কসম। হযরত আয়েশা আরজ করলেন: আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি কেবল আপনার নামটিই বর্জন করি। 
কথিত আছে, ইসলামে সর্বপ্রথম যে প্রেম হয়, তা ছিল রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ও হযরত আয়েশা (রা.)-এর মধ্যকার প্রেম। তিনি হযরত আয়েশাকে বলতেন: আমি তোমার সাথে এমন যেমন আবু সূরা তার স্ত্রী উম্মে সূরার সাথে ছিল, কিন্তু আমি তোমাকে তালাক দিব না। (শামায়েলে তিরমিযীতে বর্ণিত উম্মে সূরার হাদীসটি সুবিদিত। তা একদিন এগার জন মহিলা হযরত আয়েশার কাছে সমবেত হয়ে নিজ নিজ স্বামীর অবস্থা বর্ণনা করল। এই এগার জনের মধ্যে উম্মে সরাও ছিল। তার স্বামী তার সাথে অনেক সদ্ব্যবহার করেছিল এবং অবশেষে তালাক দিয়েছিল। হযরত আয়েশা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে এই মহিলাদের বিস্তারিত কাহিনী বর্ণনা করেছিলেন। তখন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে একথা বলেছিলেন।) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) পত্নীদেরকে বলতেন: তোমরা আয়েশার ব্যাপারে আমাকে পীড়ন করো না। আল্লাহর কসম, আমার কাছে যখন ওহী আসে, তখন আমি তার লেপের নীচে থাকি। (অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে কারও কাছে এরূপ হয়নি।) হযরত আনাস (র.) বলেন: রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নারী ও শিশুদের প্রতি সবার তুলনায় অধিক দয়াশীল ছিলেন।

পরবর্তী পর্ব —
পারস্পরিক জীবন যাপনের তৃতীয় আদব প্রমোদ


বিবাহ (২২) পারস্পরিক জীবন যাপনের প্রথম আদব ওলিমা



বিবাহ (পর্ব – ২২) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

পারস্পরিক জীবন যাপনের প্রথম আদব ওলিমা —;
প্রথম আদব ওলিমা, এটা মোস্তাহাব। হযরত আনাস (র.) বলেন, - "রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফের গায়ে হলুদের চিহ্ন দেখে জিজ্ঞেস করলেন- এটা কি? তিনি আরজ করলেন, আমি এক মহিলাকে বিয়ে করেছি এবং খোরমার বীচি পরিমাণ স্বর্ণ মোহরানা সাব্যস্ত করেছি। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: মোবারক হোক। একটি ছাগল দিয়ে হলেও ওলীমা কর। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত সফিয়্যাকে বিয়ে করার পর খোরমা ও ছাতু দিয়ে ওলীমা করেন। 
স্বামীকে মোবারকবাদ দেয়া মোস্তাহাব। যেব্যক্তি তার কাছে আসবে, সে এরূপ বলবে : আল্লাহ তোমাকে মোবারক করুন, তোমার প্রতি বরকত নাযিল করুন এবং তোমাদের মধ্যে পুণ্য কাজে মতৈক্য সৃষ্টি করে দিন।
হযরত আবু হোরায়রা (র.) রেওয়ায়েত করেন, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, হালাল ও হারামের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে দফ বাজানো ও হৈচৈ করা। আরও বলা হয়েছে- "এ বিবাহ ঘোষণা কর, একে মসজিদে সম্পন্ন কর এবং এর জন্যে দফ্ বাজাও।
রবী বিনতে মোয়াওভেষ রেওয়ায়েত করেন, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমার কাছে বাসর রাত্রির ভোরে এসে আমার শয্যায় বসে গেলেন। আমাদের কয়েকজন বালিকা দফ বাজাচ্ছিল এবং বদর যুদ্ধে আমার পরিবারের নিহত ব্যক্তিদের কীর্তিগাথা আবৃত্তি করছিল। তাদের একজন এমনও বলে ফেলল, আমাদের মধ্যে একজন নবী আছেন, যিনি আগামীকাল যা ঘটবে তা জানেন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাকে একথা বলতে বারণ করে বললেন: পূর্বে যা বলছিলে, তাই বল।

পরবর্তী পর্ব —
পারস্পরিক জীবন যাপনের দ্বিতীয় আদব সদাচরণ 

বিবাহ (২১) বরের স্বভাব-চরিত্র যাচাই করা



বিবাহ (পর্ব – ২১) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

বরের স্বভাব-চরিত্র যাচাই করা —
বরের স্বভাব-চরিত্র ভালরূপে যাচাই করে নেয়া কনের অভিভাবকেরও কর্তব্য। অভিভাবকের উচিত, কনের প্রতি স্নেহপরবশ হওয়া এবং এমন ব্যক্তির সাথে তাকে বিবাহ না দেয়া, যার দৈহিক গঠনে কোন ত্রুটি আছে, অথবা যার স্বভাব-চরিত্র ভাল নয় অথবা যে দ্বীনদারীতে দুর্বল অথবা স্ত্রীর হক আদায়ে অক্ষম অথবা বংশগত দিক দিয়ে কনের সমকক্ষ নয়। 
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: কনেকে বিবাহ দেয়ার মানে তাকে বাঁদী করা। অতএব নিজের কন্যাকে কোথায় দিচ্ছ তা দেখে নাও। কনের জন্যে সাবধানতা অবলম্বন করা খুবই জরুরী। কেননা, বিবাহের কারণে সে এমন বন্দিদশায় পড়ে যা থেকে রেহাই পেতে পারে না। পুরুষ এরূপ নয়। সে সর্বাবস্থায় তালাক দিতে সক্ষম। যখন কোনব্যক্তি তার কন্যার বিবাহ কোন জালেম, পাপাচারী, বেদআতী অথবা মদখোরের সাথে দেয়, তখন সে নিজের দ্বীনদারীতে কলংক লেপন করে এবং আল্লাহ তা'আলার ক্রোধের পাত্র হয়।কেননা, সে আত্মীয়তার অধিকার ক্ষুণ্ণ করে এরূপ পাত্রের হাতে কন্যাদান করে। 
এক ব্যক্তি হযরত হাসান বসরী (রহ.)-এর খেদমতে আরজ করল: কয়েকজন লোক আমার কন্যার জন্যে বিবাহের পয়গাম পাঠিয়েছে। আমি কার সাথে তাকে বিবাহ দেব। তিনি বললেন: তাদের মধ্যে যেব্যক্তি খোদাভীরু, তার সাথে বিবাহ দাও। কেননা, সে তোমার কন্যাকে ভালবাসবে এবং খাতির সমাদর করবে। সে তোমার কন্যাকে অপছন্দ করলেও জুলুম করবেনা। 
রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: যেব্যক্তি পাপাচারীর হাতে কন্যাদান করে, সে আত্মীয়তা ছিন্ন করে।

পারস্পরিক জীবন যাপনের আদব
স্বামীর করণীয় আদব—
যেসকল আদবের প্রতি লক্ষ্য রাখা স্বামীর জন্যে জরুরী, নিম্নে সেগুলো বিস্তারিত উল্লেখ করা হল!

পরবর্তী পর্ব —
পারস্পরিক জীবন যাপনের প্রথম আদব ওলিমা 

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...