মঙ্গলবার, ২ জুলাই, ২০২৪

মখলূক – ৩




মখলূক— (পর্ব – ৩)

📚মিনহাজুল আবেদীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


দ্বিতীয় কারণ--মখলূক থেকে স্বাতন্ত্র্য ও নিঃসঙ্গ জীবন অবলম্বনের দ্বিতীয় কারণ এই যে, মখলুকের সাথে যদি আল্লাহর পবিত্রতা শামিল না হয়, তবে এমতাবস্থায় রিয়া, আত্মপ্রদর্শনী প্রভৃতি কারণ উদ্ভূত বিষয় এসে আল্লাহর ইবাদতের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে— এ সবই বান্দার মধ্য থেকে সামনে এসে হাযির হয়। ইয়াহ্ইয়া ইবনে মায আরাযী সত্যই বলেছেনঃ মানুষের সাথে মেলামেশাই রিয়ার একটি প্রধান উপজীব্য। যারা সত্যিকারের যাহেদ (দুনিয়া ত্যাগী), তারা এসব বিষয় সম্পর্কে সাবধান থাকতেন – এমনকি এজন্য তারা মানুষের সাথে মেলামেশাই পরিত্যাগ করেছেন। হরমে হায়ান হযরত উয়ায়েস করনী (রঃ)-র নিকট আরয করেছিলেন, 'আপনি সাক্ষাৎ দান করে আমাকে গৌরবান্বিত করুন। জবাবে তিনি বলেছিলেনঃ আমি তোমার সাথে এমন একটি সম্পর্ক স্থাপন করেছি যা সাক্ষাতকারের চাইতে অনেক বেশী উপকারী। এ সম্পর্কটি হল, তোমার অসাক্ষাতেই তোমার জন্য দোয়া করা। কেননা সাক্ষাৎ ও প্রদর্শনের মধ্যে রিয়া ও প্রদর্শনী প্রকাশের আশংকা বিদ্যমান থাকে।

ইব্রাহীম আদহাম (রঃ) যখন একবার আগমন করেছিলেন তখন সুলায়মান খাওয়াসকে প্রশ্ন করা হলো, আপনি তাঁর সাথে দেখা করতে এলেন না কেন? তিনি জবাব দিলেনঃ আমি একটি বিদ্রোহী শয়তানের সাথে সাক্ষাৎ করাকে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার চাইতে বেশী পছন্দ করি। সুতরাং আমি কি করে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসবো? সুলায়মান খাওয়াসের এ মন্তব্য উপস্থিত সকলের নিকটই অসহ্য বোধ হতে লাগল। তখন তিনি ব্যাখ্যা করে বললেনঃ আমার আশংকা এই যে, আমি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার ফলে আমি তার জন্য একটি গৌরব ও প্রদর্শনীমূলক বস্তু হয়ে না পড়ি। অপরপক্ষে যদি শয়তানের সাথে সাক্ষাৎ হয়, তবে তাকে তাঁর নিকট আগমন করার পথে আমি বাধা দিব। আমার ওস্তাদ এক মারেফাত পন্থীর সাথে একদা সাক্ষাৎ করেছিলেন। প্রথমে কিছুক্ষণ তাঁরা উভয়ে কথাবার্তা বলে কাটিয়ে দিলেন। অতঃপর উভয়েই দোয়া শুরু করলেন। দোয়ার মধ্যে আমার ওস্তাদ সাহেব বলতে লাগলেনঃ আমরা যে মজলিসে এখন বসে আছি, এর চাইতে ফযীলতপূর্ণ মজলিসের কথা আমার স্মরণেই আসে না। তখন সেই মারেফত পন্থী বলতে লাগলেনঃ আমি এমন কোন বৈঠকেই থাকি নাই, যে বৈঠকে মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভয় জন্মেছে – কেবল এ বৈঠকে ব্যতীত। কেননা আপনি কি উত্তম শিক্ষাপ্রদ এবং মূল্যবান কথা আমার সামনে বর্ণনা করেন নাই? আমিও তো তাই করেছি। তাহলে নিশ্চয়ই এতে করে রিয়া হয়ে গেছে। এ কথা শুনে আমার ওস্তাদ সাহেব অনেকক্ষণ পর্যন্ত কাঁদতে থাকলেন এবং কাঁদতে কাঁদতে তাঁর হিচকি দেখা দিল। অতঃপর তিনি নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলেন 

“আহা, যদি এমন তৌফিক হাসিল হতো যার দ্বারা অত্যন্ত ভীত অবস্থায় সর্বনিয়স্তার দরবারে ইনসাফের দরখাস্ত পেশ করতে পারা যায়। আল্লাহ তা'আলার সামনে নিজের গুনাহ্ খাতা নিয়ে অনুতপ্ত হয়ে হাযির হয়েছি। তিনি ছাড়া তো আমার উপর দয়া প্রদর্শনের আর কেউ নেই। আয় বিশ্ব-প্রতিপালক! আমি তোমার নিকট সে সব গুনাহগারের প্রত্যেকের জন্যই মাগফিরাত কামনা করছি, যারা গুনাহর বাড়াবাড়ি করেছে সত্য, কিন্তু অনুতপ্ত ও লজ্জিত হয়ে রাতের আঁধারে এই বলে দোয়া করছেঃ কি অনুতাপ এমন গুনাহ্ যে সমগ্র বিশ্বকেই ঘিরে ফেলেছে। যাহেদ ও আবেদ ব্যক্তিদের সাক্ষাতকারেরই এ অবস্থা। তাহলে বুঝতেই পারা যায় নাফরমান ও দুনিয়া লোভী ব্যক্তিদের সাক্ষাতকার কোন পর্যায়ে পড়ে? তাছাড়া মূর্খ ও বদকারদের তো কথাই নেই।

অত্যন্ত গোলযোগ ও জটিলতা নিয়েই আত্মপ্রকাশ করেছে এ কালটি? বর্তমানে মানুষ কেবল লোকসান আর লোকসানেই লিপ্ত রয়েছে। এ সব গোলযোগ ও জটিলতা তোমাকেও ইবাদতে ইলাহী সম্পর্কে উদাসীন করে ফেলবে, অথচ মানুষের সাহচর্যে লাভজনক কিছুই হবে না। অধিকন্তু আল্লাহর ইবাদতের জন্য যতটুকু অগ্রসর হয়েছিলে, তাও ধ্বংস করে দেবে। কেননা আল্লাহর ইবাদতের জন্য যে সব গুণ অর্জন করেছ, যুগের হাওয়ায় নিপতিত হলে তাও সংরক্ষণ করতে তোমার মুশকিল হবে, এমনকি অসম্ভব হয়ে পড়বে।

সুতরাং মানুষ থেকে নিঃসঙ্গ ও একা জীবন যাপন এবং এ গোলযোগপূর্ণ যুগের আবহাওয়া থেকে দূরে অবস্থান অবশ্য কর্তব্য। এমতাবস্থায় পরম করুণাময় আল্লাহ্ তা'আলাই তাঁর করুণাধারায় তোমার হেফাজতের ব্যবস্থা করবেন।

মখলুখ পর্ব – ২




মখলূক— (পর্ব – ২)

📚মিনহাজুল আবেদীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


যে যুগে সংসার ত্যাগ করা উচিত—

ভাইসব, মনে রাখবেন, হযরত রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কোন্ যুগে সংসার ত্যাগ করতে হবে, তা বাতলিয়ে দিয়েছেন। তিনি সে যুগের ও সে যুগের মানুষেরও বিস্তারিত বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে গেছেন। সে সঙ্গে তিনি সে যুগে সংসার ত্যাগ করে একা জীবন যাপনের নির্দেশও দিয়ে গেছেন। 

হযরত রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিশ্চিতভাবেই পুণ্যের বিষয় সম্পর্কে সর্বাপেক্ষা বেশী ওয়াকিফহাল ছিলেন এবং আমাদের জন্য আমাদের চাইতে অধিক উপদেশ ও উত্তম পন্থা বাতলিয়ে দেয়ার যোগ্য ছিলেন। সুতরাং তিনি যেভাবে বর্ণনা করেছেন, তার সাথে যদি তোমার যুগ মিলে যায়, তবে তাঁর নির্দেশ পালনের জন্য অগ্রসর হও এবং তাঁর এ মহান উপদেশ শিরোধার্য করে লও। 

সাবধান, এ ব্যাপারে তোমার মনে যেন সামান্যতমও সন্দেহের অবকাশ না থাকে। কেননা, তোমার যুগে তোমার পক্ষে কি কর্তব্য সঠিক, সে সম্পর্কে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) পূর্ণ ওয়াকিফহাল ছিলেন। বরং তাঁর নির্দেশের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে ধোঁকায় নিপতিত হয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের জন্য ধ্বংস ডেকে এনো না।


যে যুগে সংসার ত্যাগ ও একা জীবন যাপন করতে হবে, তার পরিচয় নিম্নোক্ত প্রসিদ্ধ হাদীসসমূহে পাওয়া যায়। 

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন :

“আমরা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট বসেছিলাম। তিনি ফিতনার সময়ের কথা উল্লেখ করে বললেনঃ যখন দেখবে যে, মানুষের মধ্যে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ শুরু হয়ে গেছে, আমানত বিনষ্ট করছে (এ সময়) রসূলূল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) তাঁর এক হাতের অংগুলিসমূহ অপর হাতের অংগুলির মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেখিয়ে বললেন যে, এ রকম হয়ে যাবে। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ) এ সময় আরয করলেনঃ আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক। হুযূর, সে সময় আমাদের কি করতে হবে? জবাবে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ “(সে সময়) গৃহেই সব সময় অবস্থান করবে এবং যে জিনিস মন্দ বিবেচিত হবে, তা পরিত্যাগ করবে। এ সময় কেবলমাত্র নিজেকেই সামলাতে থাক, সাধারণের সকল ব্যাপার থেকে দূরে অবস্থান করো”।


অন্যত্র রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ

“এরূপ হবে ফিতনার যুগে”--তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ ফিতনার যুগের পরিচয় কি? 

জবাবে তিনি বললেনঃ “যখন কোন ব্যক্তি তার সাথী সম্পর্কে নিরাপত্তা বোধ করতে পারবে না”।

আবদুল্লাহ্ বিন মসউদ (রাঃ) হারিস বিন উমায়রা (রাঃ) থেকে রেওয়ায়েত করেছেন। তিনি বর্ণনা করেনঃ রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন- “তুমি যদি জীবিত থাক, তাহলে তোমার সামনেই এমন যুগ আগমন করবে, যখন খোতবাদাতা ও বক্তা বেশী হবে, কিন্তু আলিমের সংখ্যা হবে নগণ্য; সওয়ালকারী হবে বেশী, দাতার সংখ্যা হবে অল্প”। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনাকে জিজ্ঞেস করা হলো : সে যুগটা কখন আগমন করবে? তিনি জবাব দিলেনঃ “যখন নামাযের কোন গুরুত্ব উপলব্ধি করা হবে না, সূদের কারবার সরগরম হয়ে ওঠবে এবং ধর্মকে দুনিয়ার সামান্য মালমাত্তার বদলে বিকিয়ে দেয়া হবে। এ অবস্থা থেকে নাজাত কামনা করা উচিত।


উপরিউক্ত হাদীসসমূহ থেকে যে দৃশ্য ফুটে উঠে, তার চাক্ষুষ প্রমাণ এ যুগ ও এ-যুগের মানুষের মধ্যে সঠিকভাবেই পরিলক্ষিত হয়। সুতরাং নিজেকে রক্ষার ব্যবস্থা সম্পর্কে অবশ্যই ভাবনা-চিন্তা করা উচিত নয় কি? সলফে সালেহীনগণ ও তাঁদের নিজ নিজ যুগে এসব বিষয়কে ভয় করার জন্য এক বাক্যে তাকীদ করে গেছেন এবং এমন অবস্থা দেখা দিলে নিঃসঙ্গ জীবন যাপনকেই সেক্ষেত্রে উত্তম বলে বিবেচনা করেছেন এবং তা পালনের নির্দেশও দিয়েছেন।

এ ব্যাপারেও কোন সন্দেহ নেই, সলফে সালেহীনগণই ছিলেন উত্তম উপদেশদাতা ও সবচাইতে অধিক দূরদর্শী। তাছাড়া, তাঁদের যুগের পরের যুগগুলো তাঁদের চাইতে উত্তম তো নয়ই, বরং অপেক্ষাকৃত মন্দ।


ইউসুফ বিন আসবাতের একটি বর্ণনা থেকে উক্ত বিষয়টির সঠিক প্ৰমাণ পাওয়া যায়। তিনি বলেন, “আমি সুফিয়ান সওরী (রহঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলতেনঃ আমি সে পাক যাতের কসম করে বলছি, যিনি ব্যতীত কোন মা'বুদ নেই, এ যুগে সংসার বর্জন ও নিঃসঙ্গ জীবন অবলম্বন সম্পূর্ণ হালাল”।


আমি বলছি, যদি হযরত সুফিয়ান সওরী (রঃ)-এর যুগে সংসার বর্জন ও নিঃসঙ্গ জীবন যাপন হালাল হয়, তবে আমাদের যুগে তা ওয়াজিব এবং ফরয।


সুফিয়ান সওরী (রঃ) থেকে আরও বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর বিশেষ খাদিমের নিকট এক পত্রে বলেছেনঃ

“তুমি এমন একটি যুগে অবস্থান করছ, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর সাহাবীগণ যে যুগ থেকে সর্বদা নাজাত কামনা করতেন – যাতে তাঁরা জীবিত থাকতেই সে - যুগের আগমন না হয় অথচ তাঁদের যে জ্ঞান ছিল, তা নিশ্চয়ই আমাদের নেই। সুতরাং আমরা যখন ইলমের স্বল্পতা, সবরের দৈন্য, নেককারের নগণ্য সংখ্যা এবং আনুগত্যহীনতায় মানুষের মধ্যে গোলযোগের বিভীষিকাময় একটি যুগে উপনীত, তখন আমাদের কি করা উচিত?


হযরত উমর ফারূক (রঃ) এজন্যই বলেনঃ মন্দ লোকের সাহচর্য গ্রহণের চাইতে সংসার-বর্জন ও নিঃসঙ্গ জীবন যাপনে অনেক বেশী আনন্দ ও আরাম। তিনি আরও বলেছেনঃ 'হযরত কা'ব ও হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মসউদের ভাষায় আমরা যে যুগে বাস করছি, তাতে সত্য সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত আর সর্বত্র বিস্তৃত কেবল জুলুম ও আনুগত্যহীনতা।

যুগের অবস্থা সম্পর্কে বধির ও অন্ধরা আজ পেরেশান। তবে হ্যাঁ, ইবলিসের উন্নতি ও প্রভাব সর্বত্রই দেদীপ্যমান। যদি এ অবস্থাই চলতে থাকে এবং এর কোন পরিবর্তন না হয়, তাহলে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াবে যে, কোন মৃত ব্যক্তির জন্যই আর শোক প্রকাশ করা হবে না এবং কোন নবজাতকের জন্যও আর আনন্দ করা হবে না।সুফিয়ান ইবনে উয়াইনীয়া সুফিয়ান সওরী (রাঃ)-কে বলেছিলেনঃ আমাকে কিছু ওসীয়ত করে যান। তখন তিনি বললেনঃ মানুষের সাথে সম্পর্ক কম রাখুন। তখন সুফিয়ান ইবনে উয়াইনীয়া আরয করলেনঃ আল্লাহ্ আপনার উপর রহম করুন। হাদীসে কি একথা নেই যে, মানুষের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করো? কেননা প্রত্যেক মুমিনই শাফা'আত করার অধিকার লাভ করবেন। সুফিয়ান সওরী (রাঃ) বললেনঃ তোমার সম্পর্কে আমার ধারণা অনুরূপই। আমি মনে করি, তুমি যে সব বিষয় সহ্য করতে পারো না, মানুষের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করলে তোমার বন্ধু-বান্ধবের তরফ থেকেই তা উদ্ভূত হবে এবং তোমাকে সে অসহনীয় বিষয়েরই মুকাবিলা করতে হবে।

সুফিয়ান ইবনে উয়াইনীয়া বলেনঃ আমি তখন বললাম, ঠিকই বলেছেন। অতঃপর হযরত সুফিয়ান সওরী (রাঃ) ইন্তেকাল করার পর আমি তাঁকে স্বপ্নে দেখলাম। তিনি যেন কিছু আহকাম-আরকান বর্ণনা করছিলেন। আমি আরয করলাম, আয় আবূ আবদুল্লাহ্! আমাকে কিছু ওসীয়ত করুন। তিনি সেই পূর্ব ওসীয়তেরই পুনরাবৃত্তি করলেন। তিনি আরো বললেনঃ যতদূর সম্ভব মানুষের সাথে কম সম্পর্ক রক্ষা করে চলো। কেননা মানুষের সাথে সম্পর্ক জড়িয়ে গেলে, তা থেকে মুক্তিলাভ করা বড় কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এ প্রসঙ্গে তিনি নিম্নোক্ত কতিপয় কবিতা উল্লেখ করলেন :

'আমি বরাবর মখলুকের প্রতীক্ষায় ব্যস্ত ছিলাম এবং মানুষের সাথে আমার সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু যখনই আমার মধ্যে বৃদ্ধ হওয়ার লক্ষণ দেখা দিল, তখন পরিচিত সকলকেই আমি মন্দ মনে করতে লাগলাম।

আমি যাদের জানি না, আল্লাহ তাদের উত্তমভাবে পুরস্কৃত করুন। আমার এমন কোন গুনাহ্ নেই, যার জন্য আমার ক্লেশ বা দুর্ভোগের সম্মুখীন হতে হবে। কারণ যাদের সাথে কোন পরিচয় নেই, নিশ্চয়ই তাদের কোন হক নষ্ট করা প্রায়ই সম্ভব হয় না। সুতরাং তাদের সাথে পরিচয় না হয়েই পাপ থেকে বেঁচে গেছেন বলে কবি মনে করেছেন ।


অপরপক্ষে আমি (সুফিয়ান ইবনে উয়াইনীয়া) এমন সব ব্যক্তিকে ভালবাসতে শুরু করেছি, যাদের মধ্যে ইনসাফের উৎসই বিলুপ্ত। কথিত আছে, অতঃপর তিনি তাঁর গৃহের দরজায় লিখে দিলেনঃ আমাকে যারা চিনে না, আল্লাহ্ তা'আলা তাদের কল্যাণ করুন। আর আমার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের জন্য কল্যাণের কোন কিছুই দান করো না। কেননা আমার যত ক্লেশ, দুর্ভোগ ও কষ্ট তার মূল কারণ এরাই।


অন্যত্র একটি কবিতায় বলা হয়েছেঃ

“আল্লাহ্ তা'আলা সে সব ব্যক্তির কল্যাণ ও মঙ্গল করুন, যাদের সাথে আমার কোন বন্ধুত্ব বা পরিচয় হয়নি। কেননা মানুষের সাথে সম্পর্ক রক্ষা ও বন্ধুত্বের দরুনই আমাকে কষ্ট, বিপদাপদ ও ক্লেশের সম্মুখীন হতে হয়।

হযরত ফুযায়েল (রাঃ) বলেছেনঃ এটা এমন একটি সময় যে, এখন নিজের জিহবাকে সংযত রাখো, নিজেকে বড় মনে করো না, নিজের অন্তঃকরণের চিকিৎসা করো এবং সেই সঙ্গে হুকুম-আহকাম দৃঢ়ভাবে পালন করতে থাক ও নিষিদ্ধ বিষয়কে পরিত্যাগ করে চলো।


সুফিয়ান সওরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ দুনিয়ার প্রতি উদাসীন হও, আখিরাতের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখ এবং মানুষ থেকে এমনভাবে পলায়ন কর, যেরূপ ব্যাঘ্র দেখে পলায়ন করা হয়।

হযরত আবূ উবায়দা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ এমন কোন বিজ্ঞ ব্যক্তিই দেখলাম না, যিনি আলোচনার শেষে এ কথাটি বলেন না যে, তুমি যদি প্রসিদ্ধ ও খ্যাতিমান হওয়াটাকে পছন্দ না কর, তবে বুঝবে, এটা আল্লাহর তরফ থেকে একটি আনন্দের সওগাত।

যা হোক, এ ব্যাপারে যথেষ্ট তথ্য পরিলক্ষিত হয়। তার সব কিছু এ গ্রন্থে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। কেবলমাত্র এ বিষয় সম্পর্কেই আমি একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করছি। গ্রন্থটির নাম হলো – কিতাব আখলাকুল আবরার ওয়ান্নাজাতু মিনাল আশরায়ে। যদি এ সম্পর্কে আরো অধিক বিষয় জানতে চান, তবে উক্ত গ্রন্থটি পাঠ করুন। তাতে অনেক আশ্চর্যজনক ও অমূল্য বিষয় জানতে পারবেন। এখানে কেবল আভাস দিলাম – কারণ জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য ইঙ্গিতই যথেষ্ট। -


মখলূখ (১)



মখলূক— (পর্ব – ১)

📚মিনহাজুল আবেদীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


যে কারণে সৃষ্টি পরিত্যাগ করা উচিত— 

এরপর সৃষ্টিজগৎ থেকেও স্বাতন্ত্র্য ও সংশ্রবহীনতা অবলম্বন করা উচিত। সৃষ্টিজগৎ থেকে স্বাতন্ত্র্য ও সংশ্রবহীনতা লাভেরও দু'টি কারণ আছে। 

প্রথম কারণ—- সৃষ্টিজগৎ আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদতের পথে অন্তরায় সৃষ্টি ও তৎপ্রতি ঔদাসীন্য আনয়ন করে।

কোন এক বুযর্গ ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন যে, আমি একদা এক দল মানুষকে তীর নিক্ষেপ শিক্ষা করতে দেখলাম। দেখি, বহু লোক উক্ত কার্যে ব্যাপৃত রয়েছে। কিন্তু তার কিছু দূরে আবার এক ব্যক্তি চুপচাপ বসে আছে। আমি তার কাছে গেলাম। মনে মনে ভাবলাম, তার সাথে কিছু আলাপ করব। কিন্তু তিনি বললেনঃ আল্লাহ্ তা'আলার যিকিরে লিপ্ত থাকা তোমার সাথে কথাবার্তা বলার চাইতে আমার কাছে অধিক প্রিয় ও উত্তম। আমি বললাম, তবে কি আপনি একাই আল্লাহ্ তা'আলার যিকির করতে চান? তিনি জবাব দিলেনঃ আমার সাথে আমার পরওয়ারদেগার ও দু'জন ফেরেশতা আছেন। আমি বললাম, এ ধরনের মানুষের মধ্যে আল্লাহর যিকিরের প্রতি কে আগে অগ্রসর হতে পারে? তিনি বললেনঃ আল্লাহ্ তা'আলা যার গুনাহ্ মাফ করে দেন।

অতঃপর আমি জিজ্ঞাসা করলামঃ মাগফিরাতের দরজায় পৌঁছার পন্থা কি? তিনি আকাশের দিকে হাত তুলে ইশারা করে আমাকে বলে দিলেন এবং আমাকে পরিত্যাগ করে উঠে দাঁড়ালেন।

এ কথাবার্তার ফল এই দাঁড়ায় যে, মখলুক মানুষকে আল্লাহর ইবাদত থেকে উদাসীন করে দেয়— এমনকি, তাতে বাধার সৃষ্টি করে এবং মানুষকে বিপর্যয় ও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। 


হাতেম আসেম বলেছেন: আমি মখলুকের নিকট পাঁচটি জিনিস দাবি করেছিলাম। কিন্তু তার একটিও এখনও পরিপূর্ণভাবে লাভ করা সম্ভব হয়নি। 

আমি মখলুকের নিকট আল্লাহর পথে আনুগত্য প্রদর্শন ও যুহদ দাবি করলাম। কিন্তু সে তা দিতে অসম্মতি জ্ঞাপন করল। 

অতঃপর আমি আমাকে সাহায্য ও সহযোগিতা করতে বললাম, কিন্তু তাতেও সে রাযী হলো না। 

তখন আমি বললাম, আচ্ছা, তাহলে আমি আল্লাহর রাস্তায় আনুগত্য প্রদর্শন ও যুহদ অবলম্বন করি, তাতে তুমি সম্মতি দাও। কিন্তু সে তাও স্বীকার করল না। 

অতঃপর আমি বললাম--আচ্ছা, অন্তত আমি উপরিউক্ত কার্যে লিপ্ত হই, তুমি তাতে বাধা দিও না, কিন্তু সে বাধা দেয়া হতেও বিরত হলো না। 

শেষে আমি বললাম--আচ্ছা, তাহলে অন্তত আল্লাহ্ তা'আলা যেসব বিষয়ে নিষেধ করেছেন, তার প্রতি আমাকে আহবান জানিও না এবং তোমার অনুসরণ না করায় তুমি আমার পশ্চাদ্ধাবন করো না। কিন্তু 'মখলূক' এ প্রস্তাবেও রাযী হলো না। 

ফলে, নিরুপায় হয়ে আমি সব কিছুকে পরিত্যাগ করে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত হয়ে গেলাম।


বৃহস্পতিবার, ২৩ মে, ২০২৪

খাসায়েসুল কুবরা (১) রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সৃষ্টি ও নবুওয়ত সকল পয়গাম্বরের অগ্রে



খাসায়েসুল কুবরা (পর্ব– ১)

📚খাসায়েসুল কুবরা ✍🏻জালালুদ্দীন সিয়ুতী (রহঃ)

রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সৃষ্টি  নবুওয়ত সকল পয়গাম্বরের অগ্রে—

আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেছেন– "স্মরণ করুন যখন আমি নবীগণের কাছ থেকে তাদেরঅঙ্গীকার গ্রহণ করলাম"।

ইবনে আবী হাতেম স্বীয় তফসীর গ্রন্থে এবং আবূ নায়ীম তাঁর "আদ্দালায়েল” গ্রন্থে উপরোক্তআয়াতের তফসীর প্রসঙ্গে কাতাদাহহাসান  আবু হুরায়রা (রাঃথেকে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর এই উক্তি উদ্ধৃত করেছেন- “আল্লাহ তায়ালাআমাকে সকল পয়গাম্বরের অগ্রে সৃষ্টি করেছেন এবং সকলের শেষে প্রেরণ করেছেন। কারণেই তিনি আমার কাছ থেকে অঙ্গীকারও সকলের অগ্রে নিয়েছেন।

আবূ সহল কাত্তান স্বীয় 'ইমামীগ্রন্থে সহল ইবনে সালেহ হামদানী থেকে রেওয়ায়েত করেছেনযেতিনি আবু জাফর মোহাম্মদ ইবনে আলীকে জিজ্ঞাসা করলেননবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামসকলের শেষে প্রেরিত হয়েও সকল পয়গাম্বরের অগ্রেকিরূপে হলেনজবাবে আবু জাফর মোহাম্মদ ইবনে আলী বললেন : আল্লাহ তায়ালা যখনআদম (আঃ)-এর ঔরস থেকে তাঁর সমস্ত বংশধরকে সৃষ্টি করেনতখন তাদের কাছ থেকেসাক্ষ্য নেন যেআমি কি তোমাদের প্রতিপালক নইজবাবে সকলের অগ্রে হযরত মোহাম্মদ(সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামবললেন: (بلیহ্যাঁ।  কারণেই তিনি সকলপয়গাম্বরের অগ্রেযদিও তিনি প্রেরিত হয়েছেন সকলের শেষে।

আহমদবোখারী (স্ব-স্ব ইতিহাস গ্রন্থে), তিবরানীহাকেম  আবূ নায়ীম সাহাবী মায়সারাতুলফজর (রাঃথেকে রেওয়ায়েত করেনতিনি জিজ্ঞাসা করলেন : ইয়া রসূলাল্লাহআপনিকখন নবী মনোনীত হয়েছেনতিনি বললেনযখন আদম (আঃআত্মা  দেহের মধ্যবর্তীঅবস্থায় ছিলেন।

আহমদহাকেম  বায়হাকী ইরবায ইবনে সারিয়া (রাঃথেকে বর্ণনা করেছেন যেতিনিরসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে  কথা বলতে শুনেছেনআমি আল্লাহ তায়ালার কাছে “উম্মুল কিতাবে" (লওহে মাহফুযেতখন নবী ছিলামযখনআদম (আঃমৃত্তিকায় লুটোপুটি খাচ্ছিলেন। হাকেমবায়হাকী  আবূ নায়ীম হযরত আবুহুরায়রা (রাঃথেকে বর্ণনা করেননবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে জিজ্ঞাসা করা হলআপনাকে কখন নবী নিযুক্ত করা হলতিনি বললেনঃ তখনযখন আদম (আঃসৃষ্টি  আত্মা ফুঁকার মধ্যবর্তী পর্যায়ে ছিলেন।

আবূ নায়ীম সালেজী থেকে রেওয়ায়েত করেনহযরত ওমর (রাঃরসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে প্রশ্ন করেনআপনি কখন নবী নিযুক্ত হয়েছেনউত্তর হলতখনযখন আদম (আঃমৃত্তিকায় লুটোপুটি খাচ্ছিলেন।

ইবনে সা' ইবনে আবুল জাদআ (রাঃথেকে বর্ণনা করেনতিনি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করলেনআপনি কবে নবী মনোনীতহয়েছেনতিনি বললেন : তখনযখন আদম (আঃরুহ  দেহের মাঝখানে ছিলেন।'

ইবনে সা' মুতরিফ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে শাখীর (রাঃথেকে বর্ণনা করেন যেএক ব্যক্তিরসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে প্রশ্ন করলঃ আপনি কবেনবী হিসাবে মনোনীত হয়েছেনতিনি বললেনআদম (আঃযখন রুহ  দেহের মাঝখানেছিলেনতখন আমার কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়া হয়।

তিবরানী  আবূ নায়ীম আবু মরিয়ম গামমানী থেকে রেওয়ায়েত করেনতিনি বলেছেনজনৈক বেদুঈন নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে জিজ্ঞাসাকরল : আপনার নবুওয়তের পূর্বে কি কি ঘটনা সংঘটিত হয়েছিলতিনি বললেন : সকলপয়গাম্বরের ন্যায় আল্লাহ তায়ালা আমার কাছ থেকেও অঙ্গীকার নেন। ইবরাহীম (আঃআমার আগমনের জন্যে দোয়া করেন। ঈসা (আঃআমার আগমনের সুসংবাদ দেন।এছাড়া আমার জননী স্বপ্নে দেখেনতাঁর পদযুগল থেকে একটি প্রদীপ প্রজ্বলিত হয়েছেযারআলোকে সিরিয়ার রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত আলোকিত হয়ে গেছে।

জ্ঞাতব্য বিষয়

শায়খ তকীউদ্দীন সুবকী (রহঃস্বীয় গ্রন্থে আয়াতের ( لَتُؤْمِنُنَّ بِه وَلَتَنْصُرْنَهُ - তোমরাঅবশ্যই তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁর সাহায্য করবে।অংশের তফসীর প্রসঙ্গে বলেনএই অংশে নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিরাট মাহাত্ম্যবর্ণনা করা হয়েছে এবং ইঙ্গিত করা হয়েছে যেতিনি অতীত পয়গাম্বরগণের আমলে প্রেরিতহলে তাঁদেরও নবী হতেন। কেননাতাঁর নবুওয়ত রেসালত সকল কাল  সকল সৃষ্টিতেপরিবেষ্টিত এবং শামিল।  কারণেই তিনি এরশাদ করেছেনআমি সমগ্র সৃষ্টির জন্যেনবীরূপে প্রেরিত হয়েছি। এই "সমগ্র সৃষ্টি” বলতে কেবল ভবিষ্যৎ সৃষ্টিই নয়বরং অতীতসৃষ্টিও শামিল আছে।  জন্যেই তো তিনি বলেছেনআমি তখনও নবী ছিলামযখন আদম(আঃ)-এর মৃত্তিকানির্মিত প্রতিকৃতি রুহ থেকে খালি ছিল।

কোন কোন আলেম এই শেষোক্ত হাদীসের অর্থ এই বর্ণনা করেছেন যেরসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামআল্লাহ তায়ালার জ্ঞানে তখনও নবী ছিলেন। আমরাবলিএটা ঠিক নয়। কেননাআল্লাহ তায়ালার জ্ঞান তো সকল বস্তু  সকল ঘটনাতেইপরিবেষ্টিত। আদম সৃষ্টির প্রাক্কালে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নবুওয়তের বিশেষভাবে উল্লেখ করা কেবল খোদায়ী জ্ঞান বর্ণনা করার জন্যে নয়বরং কথা বলা উদ্দেশ্য যেতাঁর নবুওয়ত সে সময়েই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল।  কারণেই আদম(আঃচক্ষু খুলেই আরশে "মোহাম্মাদুর রসূলুল্লাহলিখিত দেখতে পান। যদি এই অর্থ নেয়াহয় যেরসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামআল্লাহ তায়ালার জ্ঞানেভবিষ্যৎ নবী ছিলেনতবে এটা কেবল তাঁর বৈশিষ্ট্য নয়বরং সকল পয়গাম্বরই আল্লাহরজ্ঞান অনুযায়ী ভবিষ্যৎ নবী ছিলেন।  থেকে জানা গেলকেবল রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এরই বৈশিষ্ট্য ছিল যেসকল পয়গাম্বরের পূর্বে তাঁকেনবুওয়তের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা হয়। এরপর গুরুত্ব সহকারে এই বৈশিষ্ট্য ঘোষণা করাহয়েছেযাতে তাঁর উম্মত তাঁর উচ্চ মর্যাদার সাথে পরিচিত হয়ে যায় এবং এটা উম্মতের জন্যেকল্যাণ  বরকতের কারণ হয়।

এখানে কেউ প্রশ্ন করতে পারে যেনবুওয়ত একটি গুণ। তাই এই গুণে যিনি গুণান্বিত হবেনতাঁর বিদ্যমান থাকা জরুরী। এছাড়া নবুওয়তের জন্যে চল্লিশ বছর বয়ঃক্রম নির্ধারিত।এমতাবস্থায় রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামপ্রেরিত হওয়ার পূর্বেইকিরূপে নবী মনোনীত হয়ে গেলেনতখন তো তিনি জন্মগ্রহণও করেননি এবং প্রেরিতও হননি।

আমি বলিআল্লাহ তায়ালা দেহ সৃষ্টি করার পূর্বে রুহ সৃষ্টি করেছেন। তাই উল্লিখিত হাদীসে ইশারা নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর পবিত্র রুহ অথবা তাঁর হকীকত তথা স্বরূপের দিকে হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা সকল স্বরূপ “আসলতথা আদিকালে সৃষ্টি করে রেখেছেন। তিনি যখন ইচ্ছা করেন  সকল স্বরূপের মধ্য থেকে কোনএকটিকে অস্তিত্ব জগতে আনয়ন করেন।  সব স্বরূপের সামগ্রিক উপলব্ধি করতে আমরা অক্ষম। কেবল আল্লাহ তা'আলা সমস্ত স্বরূপ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল অথবা যাদেরকে তিনিআপন নূরের আলোকে স্বরূপ পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ্য দান করেছেন। নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর পবিত্র স্বরূপ আদম সৃষ্টির পূর্বেই আল্লাহ তায়ালাসৃষ্টি করেছেন এবং তাঁকে নবুওয়তের গুণে ভূষিত করেছেন। তাই তিনি তখনই নবী হয়ে যান।আরশে তাঁর পবিত্র নাম লিখিত হয় এবং ফেরেশতাগণসহ সমগ্র সৃষ্টিকে আল্লাহর দরবারেতাঁর সুউচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞাত করে দেয়া হয়যদিও তিনি শারীরিক দিক দিয়ে আল্লাহ প্রদত্তসমস্ত গুণ  বৈশিষ্ট্যসহ  দুনিয়ায় পরে আগমন করেন। আবির্ভাবধর্ম প্রচার এবং বাহ্যিকজগতে নবুওয়তের যোগ্য হওয়ার দিক দিয়ে তিনি নিঃসন্দেহে সকল পয়গাম্বরের পশ্চাতেকিন্তু তাঁর পবিত্র স্বরূপ এবং কিতাব  আদেশ দানের দিক দিয়ে তিনি আদম (আঃ)-এরওঅগ্রে।

এতে কোন সন্দেহ নেই যেবিশ্ব চরাচরে যা কিছু ঘটেআল্লাহ তায়ালা সে সম্পর্কে আদিকালথেকে জ্ঞাত। আমরা যৌক্তিক  শরীয়তের প্রমাণাদি দ্বারা সে সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করি। আর সাধারণ মানুষ তখন জানতে পারেযখন সেই ঘটনা বাহ্য জগতে সংঘটিত হয়ে যায়।উদাহরণতঃ নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনার নবুওয়ত সম্পর্কে সাধারণ মানুষ তখন জ্ঞাত হয়েছেযখন তাঁর প্রতি কোরআন অবতরণ শুরু হয়েছেএবং জিবরাঈল (আঃতাঁর কাছে আসতে শুরু করেছেন।


আল্লাহ তায়ালার যে সকল কর্ম কোন বিশেষ পাত্রে আল্লাহর কুদরতইচ্ছা ও ক্ষমতার চিহ্নস্বরূপ হয়ে থাকেকোরআন অবতরণ সেগুলোর মধ্যে একটি। এর দুটি স্তর রয়েছে। প্রথম স্তর সাধারণ মানুষের জন্যে প্রকাশ পায় এবং দ্বিতীয় স্তরে সেই পাত্রের জন্যে আল্লাহর এই কর্মথেকে পূর্ণতা অর্জিত হয়ে যায়। যদিও মানুষ এই পূর্ণতা সম্পর্কে জানতে পারে নাবরংআমরা "খবরে-ছাদেক” তথা বিশুদ্ধ হাদীসের মাধ্যমে এই পূর্ণতা সম্পর্কে অবগত হই। নবীকরীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামসমগ্র সৃষ্টির সেরা সৃষ্টি। তাই তিনি সমগ্রসৃষ্টির মধ্যে সর্বাধিক পূর্ণতাপ্রাপ্ত এবং সর্বাধিক মনোনয়নযোগ্য। সহীহ হাদীসের মাধ্যমেআমরা জানতে পারি যেনবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামকেনবুওয়তের পূর্ণতা  মানবতার পূর্ণতার মর্যাদা হযরত আদম (আঃকে সৃষ্টি করার পূর্বেই দানকরা হয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা মানব সৃষ্টির পূর্বেই সকল নবীর পবিত্র আত্মাসমূহের কাছথেকে তাঁর সম্পর্কে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যেতাঁরা সকলেই তার প্রতি ঈমান আনবে এবংতাঁকে সাহায্য করবে। উদ্দেশ্যসকল নবী জেনে নিক যেতিনি সকলের অগ্রে এবং সর্বশ্রেষ্ঠ।তিনি নবীগণের জন্যেও তেমনি নবী  রসূলযেমন সকল মানুষের জন্যে। তাই

(لَتُؤْمِنُنَّ بِهِوَلَتَنْصُرْنَهُ)

বাক্যাংশে কসমের 'লামঅক্ষরটি দাখিল করা হয়েছে।


পরবর্তী পর্ব

নবীগণের কাছ থেকে ঈমান  সাহায্যের অঙ্গীকার নেয়া খেলাফতের জন্যে বয়াত নেয়ারঅনুরূপ



বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...