মঙ্গলবার, ২ জুলাই, ২০২৪

মখলুখ পর্ব – ২




মখলূক— (পর্ব – ২)

📚মিনহাজুল আবেদীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


যে যুগে সংসার ত্যাগ করা উচিত—

ভাইসব, মনে রাখবেন, হযরত রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কোন্ যুগে সংসার ত্যাগ করতে হবে, তা বাতলিয়ে দিয়েছেন। তিনি সে যুগের ও সে যুগের মানুষেরও বিস্তারিত বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে গেছেন। সে সঙ্গে তিনি সে যুগে সংসার ত্যাগ করে একা জীবন যাপনের নির্দেশও দিয়ে গেছেন। 

হযরত রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিশ্চিতভাবেই পুণ্যের বিষয় সম্পর্কে সর্বাপেক্ষা বেশী ওয়াকিফহাল ছিলেন এবং আমাদের জন্য আমাদের চাইতে অধিক উপদেশ ও উত্তম পন্থা বাতলিয়ে দেয়ার যোগ্য ছিলেন। সুতরাং তিনি যেভাবে বর্ণনা করেছেন, তার সাথে যদি তোমার যুগ মিলে যায়, তবে তাঁর নির্দেশ পালনের জন্য অগ্রসর হও এবং তাঁর এ মহান উপদেশ শিরোধার্য করে লও। 

সাবধান, এ ব্যাপারে তোমার মনে যেন সামান্যতমও সন্দেহের অবকাশ না থাকে। কেননা, তোমার যুগে তোমার পক্ষে কি কর্তব্য সঠিক, সে সম্পর্কে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) পূর্ণ ওয়াকিফহাল ছিলেন। বরং তাঁর নির্দেশের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে ধোঁকায় নিপতিত হয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের জন্য ধ্বংস ডেকে এনো না।


যে যুগে সংসার ত্যাগ ও একা জীবন যাপন করতে হবে, তার পরিচয় নিম্নোক্ত প্রসিদ্ধ হাদীসসমূহে পাওয়া যায়। 

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন :

“আমরা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট বসেছিলাম। তিনি ফিতনার সময়ের কথা উল্লেখ করে বললেনঃ যখন দেখবে যে, মানুষের মধ্যে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ শুরু হয়ে গেছে, আমানত বিনষ্ট করছে (এ সময়) রসূলূল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) তাঁর এক হাতের অংগুলিসমূহ অপর হাতের অংগুলির মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেখিয়ে বললেন যে, এ রকম হয়ে যাবে। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ) এ সময় আরয করলেনঃ আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক। হুযূর, সে সময় আমাদের কি করতে হবে? জবাবে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ “(সে সময়) গৃহেই সব সময় অবস্থান করবে এবং যে জিনিস মন্দ বিবেচিত হবে, তা পরিত্যাগ করবে। এ সময় কেবলমাত্র নিজেকেই সামলাতে থাক, সাধারণের সকল ব্যাপার থেকে দূরে অবস্থান করো”।


অন্যত্র রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ

“এরূপ হবে ফিতনার যুগে”--তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ ফিতনার যুগের পরিচয় কি? 

জবাবে তিনি বললেনঃ “যখন কোন ব্যক্তি তার সাথী সম্পর্কে নিরাপত্তা বোধ করতে পারবে না”।

আবদুল্লাহ্ বিন মসউদ (রাঃ) হারিস বিন উমায়রা (রাঃ) থেকে রেওয়ায়েত করেছেন। তিনি বর্ণনা করেনঃ রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন- “তুমি যদি জীবিত থাক, তাহলে তোমার সামনেই এমন যুগ আগমন করবে, যখন খোতবাদাতা ও বক্তা বেশী হবে, কিন্তু আলিমের সংখ্যা হবে নগণ্য; সওয়ালকারী হবে বেশী, দাতার সংখ্যা হবে অল্প”। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনাকে জিজ্ঞেস করা হলো : সে যুগটা কখন আগমন করবে? তিনি জবাব দিলেনঃ “যখন নামাযের কোন গুরুত্ব উপলব্ধি করা হবে না, সূদের কারবার সরগরম হয়ে ওঠবে এবং ধর্মকে দুনিয়ার সামান্য মালমাত্তার বদলে বিকিয়ে দেয়া হবে। এ অবস্থা থেকে নাজাত কামনা করা উচিত।


উপরিউক্ত হাদীসসমূহ থেকে যে দৃশ্য ফুটে উঠে, তার চাক্ষুষ প্রমাণ এ যুগ ও এ-যুগের মানুষের মধ্যে সঠিকভাবেই পরিলক্ষিত হয়। সুতরাং নিজেকে রক্ষার ব্যবস্থা সম্পর্কে অবশ্যই ভাবনা-চিন্তা করা উচিত নয় কি? সলফে সালেহীনগণ ও তাঁদের নিজ নিজ যুগে এসব বিষয়কে ভয় করার জন্য এক বাক্যে তাকীদ করে গেছেন এবং এমন অবস্থা দেখা দিলে নিঃসঙ্গ জীবন যাপনকেই সেক্ষেত্রে উত্তম বলে বিবেচনা করেছেন এবং তা পালনের নির্দেশও দিয়েছেন।

এ ব্যাপারেও কোন সন্দেহ নেই, সলফে সালেহীনগণই ছিলেন উত্তম উপদেশদাতা ও সবচাইতে অধিক দূরদর্শী। তাছাড়া, তাঁদের যুগের পরের যুগগুলো তাঁদের চাইতে উত্তম তো নয়ই, বরং অপেক্ষাকৃত মন্দ।


ইউসুফ বিন আসবাতের একটি বর্ণনা থেকে উক্ত বিষয়টির সঠিক প্ৰমাণ পাওয়া যায়। তিনি বলেন, “আমি সুফিয়ান সওরী (রহঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলতেনঃ আমি সে পাক যাতের কসম করে বলছি, যিনি ব্যতীত কোন মা'বুদ নেই, এ যুগে সংসার বর্জন ও নিঃসঙ্গ জীবন অবলম্বন সম্পূর্ণ হালাল”।


আমি বলছি, যদি হযরত সুফিয়ান সওরী (রঃ)-এর যুগে সংসার বর্জন ও নিঃসঙ্গ জীবন যাপন হালাল হয়, তবে আমাদের যুগে তা ওয়াজিব এবং ফরয।


সুফিয়ান সওরী (রঃ) থেকে আরও বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর বিশেষ খাদিমের নিকট এক পত্রে বলেছেনঃ

“তুমি এমন একটি যুগে অবস্থান করছ, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর সাহাবীগণ যে যুগ থেকে সর্বদা নাজাত কামনা করতেন – যাতে তাঁরা জীবিত থাকতেই সে - যুগের আগমন না হয় অথচ তাঁদের যে জ্ঞান ছিল, তা নিশ্চয়ই আমাদের নেই। সুতরাং আমরা যখন ইলমের স্বল্পতা, সবরের দৈন্য, নেককারের নগণ্য সংখ্যা এবং আনুগত্যহীনতায় মানুষের মধ্যে গোলযোগের বিভীষিকাময় একটি যুগে উপনীত, তখন আমাদের কি করা উচিত?


হযরত উমর ফারূক (রঃ) এজন্যই বলেনঃ মন্দ লোকের সাহচর্য গ্রহণের চাইতে সংসার-বর্জন ও নিঃসঙ্গ জীবন যাপনে অনেক বেশী আনন্দ ও আরাম। তিনি আরও বলেছেনঃ 'হযরত কা'ব ও হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মসউদের ভাষায় আমরা যে যুগে বাস করছি, তাতে সত্য সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত আর সর্বত্র বিস্তৃত কেবল জুলুম ও আনুগত্যহীনতা।

যুগের অবস্থা সম্পর্কে বধির ও অন্ধরা আজ পেরেশান। তবে হ্যাঁ, ইবলিসের উন্নতি ও প্রভাব সর্বত্রই দেদীপ্যমান। যদি এ অবস্থাই চলতে থাকে এবং এর কোন পরিবর্তন না হয়, তাহলে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াবে যে, কোন মৃত ব্যক্তির জন্যই আর শোক প্রকাশ করা হবে না এবং কোন নবজাতকের জন্যও আর আনন্দ করা হবে না।সুফিয়ান ইবনে উয়াইনীয়া সুফিয়ান সওরী (রাঃ)-কে বলেছিলেনঃ আমাকে কিছু ওসীয়ত করে যান। তখন তিনি বললেনঃ মানুষের সাথে সম্পর্ক কম রাখুন। তখন সুফিয়ান ইবনে উয়াইনীয়া আরয করলেনঃ আল্লাহ্ আপনার উপর রহম করুন। হাদীসে কি একথা নেই যে, মানুষের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করো? কেননা প্রত্যেক মুমিনই শাফা'আত করার অধিকার লাভ করবেন। সুফিয়ান সওরী (রাঃ) বললেনঃ তোমার সম্পর্কে আমার ধারণা অনুরূপই। আমি মনে করি, তুমি যে সব বিষয় সহ্য করতে পারো না, মানুষের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করলে তোমার বন্ধু-বান্ধবের তরফ থেকেই তা উদ্ভূত হবে এবং তোমাকে সে অসহনীয় বিষয়েরই মুকাবিলা করতে হবে।

সুফিয়ান ইবনে উয়াইনীয়া বলেনঃ আমি তখন বললাম, ঠিকই বলেছেন। অতঃপর হযরত সুফিয়ান সওরী (রাঃ) ইন্তেকাল করার পর আমি তাঁকে স্বপ্নে দেখলাম। তিনি যেন কিছু আহকাম-আরকান বর্ণনা করছিলেন। আমি আরয করলাম, আয় আবূ আবদুল্লাহ্! আমাকে কিছু ওসীয়ত করুন। তিনি সেই পূর্ব ওসীয়তেরই পুনরাবৃত্তি করলেন। তিনি আরো বললেনঃ যতদূর সম্ভব মানুষের সাথে কম সম্পর্ক রক্ষা করে চলো। কেননা মানুষের সাথে সম্পর্ক জড়িয়ে গেলে, তা থেকে মুক্তিলাভ করা বড় কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এ প্রসঙ্গে তিনি নিম্নোক্ত কতিপয় কবিতা উল্লেখ করলেন :

'আমি বরাবর মখলুকের প্রতীক্ষায় ব্যস্ত ছিলাম এবং মানুষের সাথে আমার সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু যখনই আমার মধ্যে বৃদ্ধ হওয়ার লক্ষণ দেখা দিল, তখন পরিচিত সকলকেই আমি মন্দ মনে করতে লাগলাম।

আমি যাদের জানি না, আল্লাহ তাদের উত্তমভাবে পুরস্কৃত করুন। আমার এমন কোন গুনাহ্ নেই, যার জন্য আমার ক্লেশ বা দুর্ভোগের সম্মুখীন হতে হবে। কারণ যাদের সাথে কোন পরিচয় নেই, নিশ্চয়ই তাদের কোন হক নষ্ট করা প্রায়ই সম্ভব হয় না। সুতরাং তাদের সাথে পরিচয় না হয়েই পাপ থেকে বেঁচে গেছেন বলে কবি মনে করেছেন ।


অপরপক্ষে আমি (সুফিয়ান ইবনে উয়াইনীয়া) এমন সব ব্যক্তিকে ভালবাসতে শুরু করেছি, যাদের মধ্যে ইনসাফের উৎসই বিলুপ্ত। কথিত আছে, অতঃপর তিনি তাঁর গৃহের দরজায় লিখে দিলেনঃ আমাকে যারা চিনে না, আল্লাহ্ তা'আলা তাদের কল্যাণ করুন। আর আমার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের জন্য কল্যাণের কোন কিছুই দান করো না। কেননা আমার যত ক্লেশ, দুর্ভোগ ও কষ্ট তার মূল কারণ এরাই।


অন্যত্র একটি কবিতায় বলা হয়েছেঃ

“আল্লাহ্ তা'আলা সে সব ব্যক্তির কল্যাণ ও মঙ্গল করুন, যাদের সাথে আমার কোন বন্ধুত্ব বা পরিচয় হয়নি। কেননা মানুষের সাথে সম্পর্ক রক্ষা ও বন্ধুত্বের দরুনই আমাকে কষ্ট, বিপদাপদ ও ক্লেশের সম্মুখীন হতে হয়।

হযরত ফুযায়েল (রাঃ) বলেছেনঃ এটা এমন একটি সময় যে, এখন নিজের জিহবাকে সংযত রাখো, নিজেকে বড় মনে করো না, নিজের অন্তঃকরণের চিকিৎসা করো এবং সেই সঙ্গে হুকুম-আহকাম দৃঢ়ভাবে পালন করতে থাক ও নিষিদ্ধ বিষয়কে পরিত্যাগ করে চলো।


সুফিয়ান সওরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ দুনিয়ার প্রতি উদাসীন হও, আখিরাতের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখ এবং মানুষ থেকে এমনভাবে পলায়ন কর, যেরূপ ব্যাঘ্র দেখে পলায়ন করা হয়।

হযরত আবূ উবায়দা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ এমন কোন বিজ্ঞ ব্যক্তিই দেখলাম না, যিনি আলোচনার শেষে এ কথাটি বলেন না যে, তুমি যদি প্রসিদ্ধ ও খ্যাতিমান হওয়াটাকে পছন্দ না কর, তবে বুঝবে, এটা আল্লাহর তরফ থেকে একটি আনন্দের সওগাত।

যা হোক, এ ব্যাপারে যথেষ্ট তথ্য পরিলক্ষিত হয়। তার সব কিছু এ গ্রন্থে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। কেবলমাত্র এ বিষয় সম্পর্কেই আমি একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করছি। গ্রন্থটির নাম হলো – কিতাব আখলাকুল আবরার ওয়ান্নাজাতু মিনাল আশরায়ে। যদি এ সম্পর্কে আরো অধিক বিষয় জানতে চান, তবে উক্ত গ্রন্থটি পাঠ করুন। তাতে অনেক আশ্চর্যজনক ও অমূল্য বিষয় জানতে পারবেন। এখানে কেবল আভাস দিলাম – কারণ জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য ইঙ্গিতই যথেষ্ট। -


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...