মঙ্গলবার, ২ জুলাই, ২০২৪

মখলূক – ৩




মখলূক— (পর্ব – ৩)

📚মিনহাজুল আবেদীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


দ্বিতীয় কারণ--মখলূক থেকে স্বাতন্ত্র্য ও নিঃসঙ্গ জীবন অবলম্বনের দ্বিতীয় কারণ এই যে, মখলুকের সাথে যদি আল্লাহর পবিত্রতা শামিল না হয়, তবে এমতাবস্থায় রিয়া, আত্মপ্রদর্শনী প্রভৃতি কারণ উদ্ভূত বিষয় এসে আল্লাহর ইবাদতের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে— এ সবই বান্দার মধ্য থেকে সামনে এসে হাযির হয়। ইয়াহ্ইয়া ইবনে মায আরাযী সত্যই বলেছেনঃ মানুষের সাথে মেলামেশাই রিয়ার একটি প্রধান উপজীব্য। যারা সত্যিকারের যাহেদ (দুনিয়া ত্যাগী), তারা এসব বিষয় সম্পর্কে সাবধান থাকতেন – এমনকি এজন্য তারা মানুষের সাথে মেলামেশাই পরিত্যাগ করেছেন। হরমে হায়ান হযরত উয়ায়েস করনী (রঃ)-র নিকট আরয করেছিলেন, 'আপনি সাক্ষাৎ দান করে আমাকে গৌরবান্বিত করুন। জবাবে তিনি বলেছিলেনঃ আমি তোমার সাথে এমন একটি সম্পর্ক স্থাপন করেছি যা সাক্ষাতকারের চাইতে অনেক বেশী উপকারী। এ সম্পর্কটি হল, তোমার অসাক্ষাতেই তোমার জন্য দোয়া করা। কেননা সাক্ষাৎ ও প্রদর্শনের মধ্যে রিয়া ও প্রদর্শনী প্রকাশের আশংকা বিদ্যমান থাকে।

ইব্রাহীম আদহাম (রঃ) যখন একবার আগমন করেছিলেন তখন সুলায়মান খাওয়াসকে প্রশ্ন করা হলো, আপনি তাঁর সাথে দেখা করতে এলেন না কেন? তিনি জবাব দিলেনঃ আমি একটি বিদ্রোহী শয়তানের সাথে সাক্ষাৎ করাকে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার চাইতে বেশী পছন্দ করি। সুতরাং আমি কি করে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসবো? সুলায়মান খাওয়াসের এ মন্তব্য উপস্থিত সকলের নিকটই অসহ্য বোধ হতে লাগল। তখন তিনি ব্যাখ্যা করে বললেনঃ আমার আশংকা এই যে, আমি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার ফলে আমি তার জন্য একটি গৌরব ও প্রদর্শনীমূলক বস্তু হয়ে না পড়ি। অপরপক্ষে যদি শয়তানের সাথে সাক্ষাৎ হয়, তবে তাকে তাঁর নিকট আগমন করার পথে আমি বাধা দিব। আমার ওস্তাদ এক মারেফাত পন্থীর সাথে একদা সাক্ষাৎ করেছিলেন। প্রথমে কিছুক্ষণ তাঁরা উভয়ে কথাবার্তা বলে কাটিয়ে দিলেন। অতঃপর উভয়েই দোয়া শুরু করলেন। দোয়ার মধ্যে আমার ওস্তাদ সাহেব বলতে লাগলেনঃ আমরা যে মজলিসে এখন বসে আছি, এর চাইতে ফযীলতপূর্ণ মজলিসের কথা আমার স্মরণেই আসে না। তখন সেই মারেফত পন্থী বলতে লাগলেনঃ আমি এমন কোন বৈঠকেই থাকি নাই, যে বৈঠকে মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভয় জন্মেছে – কেবল এ বৈঠকে ব্যতীত। কেননা আপনি কি উত্তম শিক্ষাপ্রদ এবং মূল্যবান কথা আমার সামনে বর্ণনা করেন নাই? আমিও তো তাই করেছি। তাহলে নিশ্চয়ই এতে করে রিয়া হয়ে গেছে। এ কথা শুনে আমার ওস্তাদ সাহেব অনেকক্ষণ পর্যন্ত কাঁদতে থাকলেন এবং কাঁদতে কাঁদতে তাঁর হিচকি দেখা দিল। অতঃপর তিনি নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলেন 

“আহা, যদি এমন তৌফিক হাসিল হতো যার দ্বারা অত্যন্ত ভীত অবস্থায় সর্বনিয়স্তার দরবারে ইনসাফের দরখাস্ত পেশ করতে পারা যায়। আল্লাহ তা'আলার সামনে নিজের গুনাহ্ খাতা নিয়ে অনুতপ্ত হয়ে হাযির হয়েছি। তিনি ছাড়া তো আমার উপর দয়া প্রদর্শনের আর কেউ নেই। আয় বিশ্ব-প্রতিপালক! আমি তোমার নিকট সে সব গুনাহগারের প্রত্যেকের জন্যই মাগফিরাত কামনা করছি, যারা গুনাহর বাড়াবাড়ি করেছে সত্য, কিন্তু অনুতপ্ত ও লজ্জিত হয়ে রাতের আঁধারে এই বলে দোয়া করছেঃ কি অনুতাপ এমন গুনাহ্ যে সমগ্র বিশ্বকেই ঘিরে ফেলেছে। যাহেদ ও আবেদ ব্যক্তিদের সাক্ষাতকারেরই এ অবস্থা। তাহলে বুঝতেই পারা যায় নাফরমান ও দুনিয়া লোভী ব্যক্তিদের সাক্ষাতকার কোন পর্যায়ে পড়ে? তাছাড়া মূর্খ ও বদকারদের তো কথাই নেই।

অত্যন্ত গোলযোগ ও জটিলতা নিয়েই আত্মপ্রকাশ করেছে এ কালটি? বর্তমানে মানুষ কেবল লোকসান আর লোকসানেই লিপ্ত রয়েছে। এ সব গোলযোগ ও জটিলতা তোমাকেও ইবাদতে ইলাহী সম্পর্কে উদাসীন করে ফেলবে, অথচ মানুষের সাহচর্যে লাভজনক কিছুই হবে না। অধিকন্তু আল্লাহর ইবাদতের জন্য যতটুকু অগ্রসর হয়েছিলে, তাও ধ্বংস করে দেবে। কেননা আল্লাহর ইবাদতের জন্য যে সব গুণ অর্জন করেছ, যুগের হাওয়ায় নিপতিত হলে তাও সংরক্ষণ করতে তোমার মুশকিল হবে, এমনকি অসম্ভব হয়ে পড়বে।

সুতরাং মানুষ থেকে নিঃসঙ্গ ও একা জীবন যাপন এবং এ গোলযোগপূর্ণ যুগের আবহাওয়া থেকে দূরে অবস্থান অবশ্য কর্তব্য। এমতাবস্থায় পরম করুণাময় আল্লাহ্ তা'আলাই তাঁর করুণাধারায় তোমার হেফাজতের ব্যবস্থা করবেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...