বুধবার, ১৪ জুন, ২০২৩

অন্তর বা হৃদয়- ১ অন্তরের পরিচয় - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ১) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

অন্তরের পরিচয় 
সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর নিমিত্ত, যার মাহিমা অনুধাবনে হৃদয় ও মন হতবুদ্ধি এবং নূরের কিঞ্চিৎ দ্যুতির কারণে চক্ষু ও দৃষ্টি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তিনি গোপন রহস্যাবলী এবং অন্তরে লুক্কায়িত ভেদ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। তাঁর রাজত্ব পরিচালনায় উপদেষ্টা ও মন্ত্রীর প্রয়োজন নেই। দোষ গোপন করা এবং হৃদয় পরিবর্তন করা তাঁর কাজ এবং 'গাফফারু যুনুব’ (গোনাহ মার্জনাকারী) ও 'সাত্তারুল উয়ুব’ (দোষ গোপনকারী) তাঁর নাম। 

দুরূদ ও সালাম হযরত শাফীউল মুজনিবীন সাইয়েদুল মুরসালীন মুহাম্মদ মুস্তফা (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম)-উনার প্রতি, যিনি ধর্মের শৃঙ্খলা বিধান করেছেন এবং ধর্মদ্রোহীদেরকে সমূলে উৎপাটিত করেছেন। তাঁর পবিত্র বংশধর ও পুণ্যাত্মা সাহাবায়ে কেরামের প্রতি অসংখ্য সালাম। 


প্রকাশ থাকে যে, যে মর্যাদা ও উৎকর্ষের কারণে মানুষ “আশরাফুল মাখলুকাত” তথা সৃষ্টির সেরা বলে পরিচিত, তা হচ্ছে আল্লাহ পাকের মারেফতের যোগ্যতা। এ মারেফতই ইহকালে মানুষের সৌন্দর্য ও পরাকাষ্ঠা এবং পরকালে তার সম্পদ ও সরঞ্জাম।

মারেফতের যে যোগ্যতা অন্তরকে দান করা হয়েছে, তা অন্য কোন অঙ্গকে দান করা হয়নি। কেননা, আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করা, তাঁকে চেনা, তার জন্যে কাজ করা এবং তাঁর দিকে ধাবিত হওয়া- এগুলো অন্তরেরই কাজ। হাযিরযোগ্য বস্তুসমূহের কাশফও অন্তরের সাথেই সম্পৃক্ত। অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তাঁর হাতিয়ার, অনুগামী ও খেদমতগার মাত্র। অন্তর এগুলোকে এমনভাবে কাজে লাগায়, যেমন মালিক গোলামকে এবং শাসক শাসিতকে কাজে লাগায়। মোট কথা, আল্লাহ ব্যতীত অন্য সব কিছু থেকে মুক্ত থাকলে অন্তরই আল্লাহ তাআলার কাছে গ্রহণীয়। পক্ষান্তরে অন্যের প্রতি অধিক নিবিষ্ট হলে এ অন্তর আল্লাহ তাআলা থেকে আড়াল হয়ে যায়। অন্তরের সাথেই হিসাব-নিকাশের সম্পর্ক এবং অন্তরকে সম্বোধন করেই আদেশ ও নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং স্বচ্ছতা ও আত্মশুদ্ধি নসীব হয়ে গেলে অন্তর সাফল্য লাভ করে এবং অপবিত্রতা ময়লার মধ্যে পড়ে থাকলে অন্তর দুর্ভাগ্য ও নৈরাশ্যের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। সারকথা,  প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য অন্তরই করে এবং বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে কেবল এবাদতের কারণে নূর ছড়িয়ে পড়ে।পক্ষান্তরে গোনাহ এবং অবাধ্যতাও অন্তরেরই কাজ। তখন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পাপ কর্মের চিহ্ন ফুটে উঠে। অন্তরের আলো ও তমসা থেকেই বাহ্যিক সৌন্দর্য এবং অপকৃষ্টত প্রকাশ পায়। কেননা, পাত্র থেকে তাই টপকে পড়ে, যা তার মধ্যে থাকে। মানুষ যখন তার অন্তরকে জেনে নেয়, তখন সে নিজের সম্পর্কে জ্ঞানী হয়ে যায়। নিজের সম্পর্কে জ্ঞান লাভের উপরই আল্লাহ তা'আলার মারেফত ভিত্তিশীল। অন্তর সম্পর্কে অজ্ঞান হলে মানুষ নিজের সম্পর্কে অজ্ঞান থেকে যায়। ফলে, সে আল্লাহ তা'আলাকেও চিনতে পারে না। অধিকাংশ মানুষ তাদের অন্তর সম্পর্কে অজ্ঞ এবং আল্লাহ তাদের ও তাদের অন্তরের মাঝে আড়াল হয়ে যায় । 


আল্লাহ বলেন "আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মধ্যে আড়াল হয়ে যান"। আল্লাহ তা'আলার আড়াল হওয়ার অর্থ, তিনি অন্তরকে 'মুশাহাদা' (প্রত্যক্ষকরণ) 'মুরাকাবা' (ধ্যানমগ্নতা) ও অন্তর্গত গুণাবলী অনুধাবন করতে দেন না। তিনি এটা জানতে দেন না যে, অন্তর আল্লাহ তাআলার দু’অঙ্গুলির মধ্যে কিভাবে ঘুরাফেরা করে, কিভাবে সে মাঝে মাঝে সর্বনিম্ন স্তরের দিকে ঝুঁকে পড়ে শয়তান হয়ে যায় এবং মাঝে মাঝে সর্বোচ্চ স্তরের দিকে ধাবমান হয়ে নৈকট্যশীল ফেরেশতাগণের স্তরে উন্নীত হয়ে যায়। যে ব্যক্তি ফেরেশতাসুলভ গুণাবলী অর্জনের আশায় আপন অন্তরের অবস্থা জানার চেষ্টা করে না, সে তাদেরই একজন, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন -

>"তারা আল্লাহকে বিস্মৃত হয়েছে। ফলে আল্লাহ তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করে দিয়েছেন। এরাই পাপাচারী"।

অতত্রব বুঝা গেল, অন্তরকে চেনা এবং তার গুণাবলীর স্বরূপ উদঘাটন করা আসল ধর্ম এবং আধ্যাত্ম পথের বুনিয়াদ। আমরা এ গ্রন্থের প্রথমার্ধে বাহ্যিক অঙ্গ সম্পর্কিত এবাদত ও লেনদেনের অবস্থা লিপিবদ্ধ করেছি, যাকে “এলমে যাহের” বলা হয়। দ্বিতীয়ার্ধে অন্তর ধ্বংসকারী ও উদ্ধারকারী অবস্থাসমূহ বর্ণনা করার ওয়াদা করেছিলাম। অন্তরের এ সকল অবস্থা জানার নাম "এলমে বাতেন"। উপরোক্ত বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এক্ষণে এলমে বাতেন শুরু করার পূর্বে দুটি পরিচ্ছেদ লেখা জরুরী হয়ে পড়েছে। প্রথম পরিচ্ছেদে অন্তরের আশ্চর্যজনক গুণাবলী ও চরিত্র বর্ণিত হবে এবং দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে অন্তরের আধ্যাত্মিক সাধনা ও তার চরিত্র শুদ্ধির উপায় বিবৃত হবে। এখন আমরা অন্তরের রহস্যাবলী চলতি বর্ণনাভঙ্গিতে উল্লেখ করছি, যাতে দ্রুত হৃদয়ঙ্গম হয়। নতুবা অন্তরের উধ্বজগত সম্পর্কিত আশ্চর্য অবস্থাসমূহ প্রায়শ হৃদয়ঙ্গম হয় না।

পরবর্তী পর্ব — অন্তরের রহস্যাবলী


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...