সবর ও শোকর (পর্ব- ২)
সবরের স্বরূপ
উপরে কোরআন-হাদিসের আলোকে সবরের ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। এখন যুক্তির নিরিখে সবরের শ্রেষ্ঠত্ব জানতে হলে তার স্বরূপ ও মর্ম জানা একান্ত আবশ্যক। তাই এক্ষণে সবরের স্বরূপ বর্ণনা করা হচ্ছে।
প্রকাশ থাকে যে, ধর্মের একটি মকাম (অবস্থান) এবং আধ্যাত্ম পথের একটি মনযিলের নাম সবর। ধর্মের সমস্ত মকাম তিনটি বিষয়ের সমন্বয়ে গঠিত হয়-
(১) মারেফত তথা তত্ত্বজ্ঞান, (২) হাল এবং (৩) আমল।
মারেফত সবকিছুর মূল এবং এ থেকেই হালের উদ্ভব হয়। হাল থেকে আমলের বিকাশ ঘটে। সুতরাং মারেফত যেন বৃক্ষসদৃশ, হাল শাখা-প্রশাখা এবং আমল যেন ফলের অনুরূপ। এ বিষয়টি সাধকদের সকল মনযিলেই বিদ্যমান। ঈমান শব্দটি কখনও মারেফতের অর্থে এবং কখনও এই বিষয়ত্রয়ের সমষ্টির অর্থে প্রয়োগ করা হয়। পূর্ণাঙ্গ সবর তখনই হয়, যখন প্রথমে মারেফত অর্জিত হয়, এরপর একটি হাল কায়েম হয়। বাস্তবে এ দুটির নামই সবর। আমল হল ফলসদৃশ, যা এ দুটি বিষয় থেকে প্রকাশ পায়।
ফেরেশতা, মানুষ ও পশুর পারস্পরিক ক্রম জানা ছাড়া এটা জানা যায় না। কেননা, সবর মানুষের বৈশিষ্ট্য, যা ফেরেশতা ও পশুর হতে পারে না- ফেরেশতাদের মধ্যে তাদের পূর্ণতার কারণে এবং পশুর মধ্যে অপূর্ণতার কারণে। পশুদের উপর কামনা-বাসনা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে, তারা কামনা-বাসনারই অধীন। তাদের চলা-ফেরা ও গতিবিধির কারণ কামনা-বাসনা ছাড়া কিছুই নয়। তাদের মধ্যে এমন কোন শক্তি নেই, যা কামনা-বাসনার প্রতিবন্ধক হয় এবং তাদেরকে এ থেকে বিরত রাখে। কামনা-বাসনার মোকাবিলায় এরূপ শক্তিকে বলা হবে সবর। পক্ষান্তরে ফেরেশতা সৃজিত হয়েছে আল্লাহ তা'আলার এবাদতে নিয়োজিত থাকার জন্য এবং তাঁর নৈকট্যলাভে সন্তুষ্ট থাকার জন্য। তাদের মধ্যে কামনা-বাসনা রাখা হয়নি, যা তাদেরকে এবাদতের আগ্রহ ও নৈকট্য অর্জনে বাধা দেবে। অপরদিকে মানুষের অবস্থা এই যে, সে শৈশবের শুরুতে পশুর ন্যায় অপূর্ণ সৃজিত হয়েছে। তখন খাদ্যস্পৃহা ছাড়া অন্য কোন কামনা-বাসনা তার মধ্যে থাকে না। কিছুদিন পর তার মধ্যে খেলাধুলা ও সাজসজ্জার কামনা-বাসনা জেগে উঠে। এরপর বিবাহের কামনা-বাসনা প্রকাশ পায়। এসব কামনা তার মধ্যে পর্যায়ক্রমে প্রকাশ পায় এবং শুরুতে সবর থাকে না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা স্বীয় কৃপায় মানুষকে সৃষ্টির সেরারূপে সৃষ্টি করেছেন এবং তার মর্যাদা পশুর ঊর্ধ্বে রেখেছেন। তাই যখন তার অস্তিত্ব পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে এবং সে বালেগ হওয়ার কাছাকাছি পৌছে যায়, তখন তার মধ্যে দু'জন ফেরেশতা নিযুক্ত করা হয়। তাদের একজন তাকে সৎপথ প্রদর্শন করে এবং অপরজন এ কাজে তাকে সাহায্য করতে থাকে। এ ফেরেশতাদ্বয়ের সাহায্যে মানুষ পণ্ড থেকে স্বতন্ত্র হয়। এ ছাড়া এই ফেরেশতাদ্বয়ের কারণেই মানুষের মধ্যে দুটি বিশেষ গুণের বিকাশ ঘটে– (১) আল্লাহ ও রসূলের মারেফত এবং (২) শুভ-অশুভ পরিণামের জ্ঞান। পশুরা না আল্লাহ্ ও রসূলকে চিনে, না শুভ পরিণামের চিন্তা করতে পারে। বরং তারা শুধু তাই দেখে, যা কার্যত তাদের কামনা-বাসনার অনুকূলে। এ কারণে সুস্বাদু খাদ্য ছাড়া অন্য কোন বস্তু তারা অন্বেষণ করে না। পক্ষান্তরে মানুষ হেদায়াতের নূরের মাধ্যমে জানে যে, কামনা-বাসনার অনুসরণ করার পরিণতি তার জন্যে অশুভ। কিন্তু কেবল এ হেদায়াতই যথেষ্ট নয়, বরং ক্ষতিকর বস্তু পরিত্যাগ করার ক্ষমতাও তার থাকতে হবে। কারণ, অনেক ক্ষতিকর বস্তু মানুষের জানা আছে, কিন্তু সে সেগুলোকে প্রতিহত করতে পারে না। এমতাবস্থায় কামনা-বাসনাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেয়ার জন্যে আল্লাহ তা'আলা আরও একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেছেন। সে মানুষকে কল্যাণের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখে এবং অদৃশ্য বাহিনীর মাধ্যমে তাকে শক্তি ও সমর্থন যোগায়৷ এ বাহিনীকে কামনা-বাসনার বাহিনীর সাথে সদা লড়াই করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ যুদ্ধে কখনও সে দুর্বল এবং কখনও প্রবল হয়। এ দুর্বলতা ও প্রবলতা ততটুকুই হয়ে থাকে, যতুটুকু সে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে অদৃশ্য সমর্থনপ্রাপ্ত হয়।
এখন যে বাহিনীর দ্বারা মানুষ কামনা-বাসনাকে পরাভূত করে পশুর স্তর থেকে স্বাতন্ত্র্য অর্জন করে, আমরা তার নাম রাখব ধর্মীয় প্রেরণা। আর কামনার বাহিনীকে বলব শয়তানী প্রেরণা। কল্পনা করা উচিত যে, উভয় প্রেরণার মধ্যে তুমুল যুদ্ধ চলছে। কখনও ধর্মীয় প্রেরণা প্রবল হয় এবং কখনও শয়তানী প্রেরণা শক্তিশালী হয়। এ যুদ্ধের ক্ষেত্র হচ্ছে মানুষের অন্তর। ধর্মীয় প্রেরণা ফেরেশতাদের কাছ থেকে এবং শয়তানী প্রেরণা শয়তানদের কাছ থেকে সাহায্য পায়। এ যুদ্ধে শয়তানী প্রেরণার মোকাবিলায় ধর্মীয় প্রেরণায় অটল ও অনড় থাকাই হচ্ছে সবরের স্বরূপ অটল থাকার পর যদি সে প্রতিপক্ষকে পরাভূত করে এবং কামনার বিরোধিতায় সদা প্রস্তুত থাকে, তবে সে সবরকারীদের তালিকায় স্থান পাবে। পক্ষান্তরে যদি দুর্বল হয় এবং কামনার কাছে পরাভূত হয়ে যায়, তবে সে শয়তানের অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। এ বর্ণনা থেকে জানা গেল যে, কামনাজনিত ক্রিয়াকর্ম ত্যাগ করা এমন একটি আমল, যা সবর থেকে উৎপন্ন হয়।
পরবর্তী পর্ব— কামনা-বাসনা দুনিয়া ও আখেরাতে সৌভাগ্যের দুশমন

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন