খুসুমত' তথা বিবাদ—
‘খুসুমত' তথা বিবাদ – এর মধ্যে এবং পূর্ববর্তী (বিবাদ)- এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, অপরকে হেয় ও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করার মতলবে কারও কথার মধ্যে দোষত্রুটি বের করাকে বলা হয়। এবং অর্থসম্পদ পাওয়ার উদ্দেশে যে বিবাদ করা হয়, তাকে বলে 'খুসুমত'। এটা কখনও আপত্তি ছাড়াই এবং কখনও আপত্তি সহকারে হয়, কিন্তু বিবাদ আপত্তি ছাড়া হয় না। এই খুসুমতও নিন্দনীয়।
হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর রেওয়ায়াতে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন -
“অধিক বিবাদকারী ব্যক্তি আল্লাহ্ তাআলার কাছে অধিক অপছন্দনীয়”।
ইবনে কোতায়বা বলেন : একদিন আমি বসা আছি, এমন সময় বশীর ইবনে আবদুল্লাহ আমার কাছ দিয়ে গমন করলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন : এখানে বসে আছ কেন? আমি বললাম : আমার মধ্যে ও আমার চাচাত ভাইয়ের মধ্যে একটি বিষয় নিয়ে বিবাদ আছে। তিনি বললেন : আমার উপর তোমার পিতার অনুগ্রহ আছে। আমি এর প্রতিদান তোমাকে দিতে চাই। “শুন, বিবাদ করার চেয়ে মন্দ কোন কিছু নেই। এতে ধর্মকর্ম বরবাদ হয়, ভদ্রতা বিনষ্ট হয় এবং জীবনের আনন্দ উধাও হয়ে যায়। অন্তর এতেই জড়িত থাকে”। একথা শুনে আমি গৃহে চলে যাওয়ার জন্যে উঠলাম। আমার প্রতিপক্ষ বলল : কোথায় যাও? আমি বললাম : না- আর বিবাদ নয়। সে বলল : বোধ হয় জেনে নিয়েছ যে, আমিই সত্যপথে আছি। বললাম : না, তা নয়, কিন্তু আমি বিবাদ দূরে ঠেলে দিয়ে নিজে মহৎ হতে চাই। সে বলল : যদি তাই হয় তবে আমিও আর কোন দাবী রাখছি না। সে বস্তুটি এখন তুমিই নিয়ে নাও।
এখানে প্রশ্ন হয়, যখন কারও হক কোন জালেম ব্যক্তি আত্মসাৎ করে, তখন তা উদ্ধার করার জন্যে মামলা মোকদ্দমা করা জরুরী হয়। সুতরাং এটা নিন্দনীয় হবে কেন? জওয়াব হচ্ছে, মামলা-মোকদ্দমা সব সময় এক রকমই হয় না। কখনও মিথ্যা হয় এবং কখনও না জেনে না শুনেও হয়; যেমন উকিল সত্য কোন্ পক্ষে তা না জেনেও যুক্তি প্রমাণ পেশ করে। আবার কখনও হকের পরিমাণের চেয়ে বেশী হকের জন্যেও মামলা-মোকদ্দমা করা হয়। মাঝে মাঝে কেবল প্রতিপক্ষকে হেয় ও নির্যাতিত করার উদ্দেশে মোকদ্দমা করা হয়। এছাড়া শত্রুতার ভিত্তিতে সামান্য বিষয়ের জন্যেও এটা করা হয়। এ ধরনের মামলা-মোকদ্দমা অত্যন্ত নিন্দনীয়। যদি মযলুম ব্যক্তি আপন হক পাওয়ার জন্যে শরীয়ত অনুযায়ী মামলা করে, নীচতা, অপব্যয় ও প্রয়োজনের অধিক হাঙ্গামা না করে এবং শত্রুতা ও নির্যাতনের ইচ্ছা মাঝখানে না থাকে, তবে এরূপ মামলা মোকদ্দমা হারাম নয়, কিন্তু যে পর্যন্ত মোকদ্দমা ছাড়াই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়ে যায় সেই পর্যন্ত নালিশ না করাই উত্তম। কেননা, মামলা মোকদ্দমা ও ঝগড়ার মধ্যে জিহ্বাকে সীমার মধ্যে রাখা খুবই কঠিন। ঝগড়ার কারণে বুকের মধ্যে ক্রোধের শিখা উত্থিত হয়। এর কারণে হক-নাহকের বিবেচনা শিকায় উঠে। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে কেবল হিংসা বিদ্বেষই বাকী থেকে যায়। এমনকি, এক পক্ষের দুঃখে অপর পক্ষ আনন্দিত হয়। যে ব্যক্তি প্রথমে ঝগড়া ও মামলা মোকদ্দমা করে, সে উপরোক্ত অনিষ্টসমূহে লিপ্ত হয়ে পড়ে, কমপক্ষে তার মনে উদ্বেগ প্ৰবল থাকে। এমনকি, কিভাবে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করা যায়, নামাযের মধ্যেও এই চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে।
কথার প্রাঞ্জলতার জন্যে লৌকিকতা

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন