রবিবার, ২৫ জুন, ২০২৩

জিহ্বার বিপদাপদ - (পর্ব - ১৫) ইঙ্গিতেও মিথ্যা বলা ঠিক নয়



জিহ্বার বিপদাপদ - পর্ব - ১৫
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ইঙ্গিতেও মিথ্যা বলা ঠিক নয়
পূর্ববর্তীদের উক্তি হচ্ছে, ইঙ্গিতে মিথ্যা বললে তা মিথ্যা হয় না। হযরত ওমর (রাঃ) বলেন : যদি কেউ ইঙ্গিতে কিছু মিথ্যা বলে তবে সে মিথ্যা থেকে বেঁচে যায়, কিন্তু তাঁদের উদ্দেশ্য, যখন কেউ মিথ্যা কথা বলার জন্যে বাধ্য হয়, তখন যেন ইঙ্গিতে বলে দেয়। নতুবা বিনা বাধ্যবাধকতায় মিথ্যা বলা প্রকাশ্যেও জায়েয নয়- ইঙ্গিতেও নয়। ইঙ্গিতে মিথ্যা বলা হচ্ছে এমন দ্ব্যর্থবোধক শব্দ বলা, যার এক অর্থ বক্তার উদ্দেশ্য হয় এবং অন্য অর্থ শ্রোতা বুঝে। উদাহরণতঃ হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল (রাঃ) হযরত ওমর (রাঃ)-এর খেলাফতকালে এক জায়গার গভর্নর ছিলেন। সেখান থেকে ফিরে এলে তাঁর পত্নী তাঁকে বলল : অন্য গভর্নররা যেমন গৃহে এলে কিছু নিয়ে আসে, তুমিও কিছু এনেছ কি না? তিনি জওয়াব দিলেন : না। কারণ আমার সাথে একজন গুপ্তচর নিযুক্ত ছিল। এ কথা দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহ্ তাআলা, কিন্তু তাঁর পত্নী বুঝলেন, সম্ভবতঃ হযরত ওমর তাঁর পেছনে কোন গুপ্তচর প্রেরণ করেছিলেন। তাই বললেন : সোবহানাল্লাহ্! তুমি রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে বিশ্বস্ত ছিলে। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর কাছে বিশ্বস্ত ছিলে। আর হযরত ওমর (রাঃ) কি না তোমার পেছনে গুপ্তচর নিযুক্ত করলেন। মহিলাদের মধ্যে এ বিষয়টির খুব চর্চা হল। অবশেষে হযরত ওমরের কাছেও অভিযোগ পৌঁছল। তিনি হযরত মুয়াযকে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করলেন : আমি কবে তোমার পেছনে গুপ্তচর প্রেরণ করেছিলাম? তিনি বললেন : আমি একথা তো বলিনি যে, আপনি গুপ্তচর পাঠিয়েছিলেন। আমি কেবল বলেছিলাম, আমার সাথে গুপ্তচর ছিল। পত্নীর আবদারের সামনে এছাড়া আমার কোন ওযর ছিল না। হযরত ওমর (রাঃ) হাসলেন এবং তাকে কিছু অর্থকড়ি দিয়ে বললেন নাও, এ দিয়ে পত্নীকে খুশী কর।
মোটকথা, প্রয়োজনের সময় ইঙ্গিতে মিথ্যা বলা যায়। বিনা প্রয়োজনে এটা করা উচিত নয়। কেননা, এটা একটা কৌশল। এতে প্রতিপক্ষ বাস্তবের বিপরীত বুঝে। সুতরাং মাকরূহ। আবদুল্লাহ্ ইবনে ওতবা বলেন ঃ আমি আমার পিতার সাথে হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজের খেদমতে গেলাম। তখন আমার পরনে ছিল উৎকৃষ্ট দামী পোশাক। যখন সেখান থেকে বের হলাম তখন আমার উৎকৃষ্ট পোশাক দেখে লোকেরা বলল : আমীরুল মুমিনীন তোমাকে এই পোশাক দিয়েছেন? আমি বললাম : আল্লাহ্ তাআলা তাঁকে উত্তম প্রতিদান দিন। এতে আমার পিতা আমাকে শাঁসিয়ে বললেন : খবরদার, মিথ্যা কথা বলো না। আবদুল্লাহর এ বাক্যটি মিথ্যা ছিল না, কিন্তু সাধারণত শাসনকর্তার জন্যে ওয়াদা কোন পুরস্কারের বিনিময়ে হয়ে থাকে বিধায় লোকেরা এ থেকে এটাই বুঝে থাকবে যে, খলীফা দান করেছেন। এতে যেন একটি মিথ্যা ভিত্তিহীন কথার উপর তাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। তাই তিনি এ দোয়া করতে নিষেধ করলেন।
আর একটি মিথ্যা আছে, যদ্দ্বারা কেউ ফাসেক হয় না। তা হচ্ছে, অভ্যাসগতভাবে অতিরঞ্জিত বলা; যেমন কেউ বলে, তোমাকে এটা করতে একশ' বার নিষেধ করেছি। এতে সংখ্যা বুঝানো উদ্দেশ্য হয় না; বরং অতিরঞ্জন সহকারে আধিক্য বুঝানো উদ্দেশ্য, কিন্তু যে জিহ্বা অতিরিক্ত কথা বলতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, সে মিথ্যার আশংকা থেকে মুক্ত হয় না।
আর একটি মিথ্যার অভ্যাস মানুষের মধ্যে প্রচলিত আছে। তা হচ্ছে, যখন কাউকে বলা হয়- এস, খানা খাও। তখন সে জওয়াব দেয়, আমার ক্ষুধা নেই। কোন বিশুদ্ধ উদ্দেশ্য এর সাথে জড়িত না থাকলে এটাও মিথ্যা ও হারাম। আসমা বিনতে ওমায়েস বর্ণনা করেন : হযরত আয়েশার (রাঃ) বাসর রাত্রিতে আমি তাঁর কাছে উপস্থিত ছিলাম এবং আমিই তাকে সাজিয়ে ছিলাম। আমার সাথে আরও কয়েকজন মহিলা ছিল। আমরা যখন হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে হুযুরের কাছে নিয়ে গেলাম তখন তার গৃহে এক পেয়ালা দুধ ছাড়া কিছুই ছিল না। তা থেকে কিছু তিনি নিজে পান করলেন এবং বাকীটুকু হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে দিলেন। লজ্জায় তিনি হাত বাড়ালেননা। আমি বললাম : রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর হাত সরিয়ে দিয়ো না, নিয়ে নাও। তিনি লজ্জাভরেই তা নিলেন এবং পান করলেন। অতঃপর রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন : তোমার সঙ্গিনীদেরকে দিয়ে দাও। মহিলারা আরজ করল : আমাদের ক্ষুধা নেই। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন : পেটে ক্ষুধা ও মিথ্যা একত্র করো না। আমি আরজ করলাম : ইয়া রসূলাল্লাহ! যদি কোন বস্তু আমাদের মনে চায় এবং আমরা বলে দেই, ক্ষুধা নেই, তবে এটাও কি মিথ্যার মধ্যে দাখিল? তিনি বললেন : মিথ্যা মিথ্যাই লেখা হয়। অল্প হলে অল্পই লেখা হয়।


চলবে

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...