বৃহস্পতিবার, ১৫ জুন, ২০২৩

অন্তর বা হৃদয়- ৩ অন্তরের লশকর ও খাদেম – ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ৩) 

📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

কলৰ তথা অন্তরের লশকর 

প্রকাশ থাকে যে, অন্তর, রূহ ও অন্যান্য জগতে আল্লাহ্ তাআলার লশকর এত বেশী যে, এগুলোর স্বরূপ ও গণনা তিনি ব্যতীত কেউ জানে । আল্লাহ তাআলা বলেন  "আপনার পালনকর্তার লশকর তিনি ব্যতীত কেউ জানে না ।" এখন আমরা অন্তরস্ত আল্লাহ্ তাআলার কয়েকটি লশকর সম্পর্কে বর্ণনা করছি । কেননা, আমাদের আলোচনা অন্তর সম্পর্কেই । অন্তরের দুটি লশকর। এক, যা চর্মচক্ষে দেখা যায় এবং দুই, যা অন্তশ্চক্ষে অনুধাবন করা যায়। এই উভয় প্রকার লশকর অন্তরের জন্যে খাদেম ও সাহায্যকারী। যে লশকর চোখে দেখা যায়, সেগুলো হচ্ছে হাত, পা, জিহ্বা, চক্ষু কর্ণ, নাসিকা এবং অন্যান্য সকল বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। অন্তর এগুলোকে যেভাবে চায় কাজে লাগায় । অন্তরের আনুগত্য করার জন্যেই এগুলো সৃজিত হয়েছে। অন্তরের বিরুদ্ধাচরণ করার ক্ষমতা এদের নেই এবং এরা অন্তরের বৈরীও হতে পারে না। উদাহরণত, অন্তর যখন চক্ষুকে খোলার আদেশ দেয়, তখন সে খুলে যায়। পা’কে চলার আদেশ করলে সে চলতে থাকে। জিহ্বাকে বলার আদেশ করলে সে বলতে থাকে। অন্য সকল অঙ্গের অবস্থাও তথৈবচ। অন্তরের জন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও ইন্দ্রিয়ের আনুগত্য এমন, যেমন আল্লাহ তাআলার জন্যে ফেরেশতাদের আনুগত্য। কারণ, ফেরেশতাগণও আনুগত্যের জন্যেই সৃজিত। তারা আনুগত্যের খেলাফ করার ক্ষমতা রাখে না। কোরআনের ভাষায় তাদের অবস্থা এই- "তারা আল্লাহর আদেশের নাফরমানী করে না এবং তাই করে, যা করার আদেশ হয়।" তবে পার্থক্য হচ্ছে, ফেরেশতারা আপন আনুগত্য ও খোদায়ী আদেশ পালনের বিষয় অবগত থাকে, কিন্তু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আনুগত্য দূরের কথা, আপন অস্তিত্ব সম্পর্কেও অবগত নয়। বলাবাহুল্য, অন্তরকে সৃষ্টি করা হয়েছে একটি সফরের জন্যে। সেই সফর হচ্ছে খোদায়ী মারেফত এবং খোদায়ী দীদারের মনযিল অতিক্রম করার সফর। আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ -"আমি জ্বিন ও মানবকে কেবল আমার এবাদতের জন্যে সৃষ্টি করেছি"।

অন্তরের এই সফরের জন্যে সাহায্যকারীর প্রয়োজন ছিল তাই অন্তরকে সওয়ারী, পাথেয় ইত্যাদি দান করা হয়েছে । দেহ হচ্ছে অন্তরের সওয়ারী এবং পাথেয় জ্ঞান ও শিক্ষা। দুনিয়াতে বসবাস করা ছাড়া আল্লাহর পথে চলা বান্দার জন্যে সম্ভবপর নয়। কেননা, বড় মনযিলে পৌছার জন্যে ছোট মনযিল অতিক্রম করা জরুরী। তাই দুনিয়াকে পরকালের শস্যক্ষেত্র বলা হয়েছে। অন্তরকে ইহজগতে অবশ্যই পাথেয় সংগ্রহ করতে হবে। দেহরূপী সওয়ারীর সাহায্যে সে ইহজগতে পৌছে যায়। সুতরাং দেহের হেফাযত ও রক্ষণাবেক্ষণ অত্যাবশ্যক। 

হেফাযত হচ্ছে দেহকে অনুকূল খাদ্য সরবরাহ করা এবং ধ্বংসের কারণাদি দূর করা। এদিক দিয়ে খাদ্য হাসিল করার জন্যে দুটি খাদেমের প্রয়োজন দেখা দিল। একটি বাতেনী, যার নাম ক্ষুধা ও মনের স্পৃহা এবং অপরটি যাহেরী অর্থাৎ, হাত ইত্যাদি, যদ্দরা খাদ্য অর্জিত হয়। এছাড়া ধ্বংসের কারণ থেকে বাঁচার জন্যে দুটি লশকরের প্রয়োজন দেখা দিল। একটি বাতেনী, যাকে ক্রোধ বলা হয়। যার কারণে শত্রুর কাছ থেকে প্রতিশোধ নেয়া হয় এবং অপরটি যাহেরী অর্থাৎ ,হাত, পা ইত্যাদি। দেহে এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেন হাতিয়ারের মত কাজ করে। এখন যে ব্যক্তি খাদ্যের মুখাপেক্ষী, সে যদি খাদ্যের অবস্থা না জানে, তবে কেবল খাদ্যে স্পৃহা ও ক্ষুধায় কাজ হবে না। তাই খাদ্যের অবস্থা জানার জন্যে অন্তরকে দু'টি খেদমতগার দেয়া হয়েছে। একটি বাতেনী অর্থাৎ, পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের উপলব্ধি এবং অপরটি যাহেরী অর্থাৎ, পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের বাহ্যিক স্থান তথা কর্ণ, চক্ষু, নাসিকা ইত্যাদি ।


অন্তরের খাদেম তিন প্রকার—

সারকথা, অন্তরের খাদেম তিন প্রকার । 

(১) প্রথম প্রকার হচ্ছে অন্তরকে কোন বস্তুর প্রতি উৎসাহিত করে- উপকার লাভের প্রতি, যেমন ক্ষুধা অথবা ক্ষতি দূর করার প্রতি, যেমন ক্রোধ। এই প্রকার খাদেমকে এরাদা তথা ইচ্ছাও বলা হয়। 

(২) দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে যা উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গতিশীল করে। একে বলা হয় ক্ষমতা ও শক্তি। এটা সমস্ত অঙ্গে বিশেষত শিরা-উপশিরার মধ্যে ছড়িয়ে আছে।

(৩) তৃতীয় প্রকার হচ্ছে দেখা, ঘ্রাণ লওয়া, শ্রবণ করা, আস্বাদন করা ও স্পর্শ করার শক্তি, যা নির্দিষ্ট অঙ্গসমূহের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। এই প্রকারের নাম উপলব্ধি জ্ঞান। 


এসব বাতেনী লশকরের মধ্য থেকে প্রত্যেকটির জন্যে যাহেরী লশকরও রয়েছে। অর্থাৎ,রক্ত,মাংস, চর্বি, অস্থি ইত্যাদি দ্বারা গঠিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। উদাহরণতঃ স্পর্শ শক্তির সম্পর্ক অঙ্গুলির সাথে এবং দর্শন শক্তির সম্পর্ক চোখের সাথে । আমরা বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্পর্কে আলোচনা করব না । কেননা, এগুলো বাহ্যজগত । আমরা বরং অন্তরের সেসব লশকর সম্পর্কে আলোচনা করব, যেগুলো চোখে দেখা যায় না। অর্থাৎ, তৃতীয় প্রকার উপলব্ধি শক্তি সম্পর্কে। 

এই শক্তি দু'প্রকার। 

প্রথম প্রকার সেসব শক্তি, যাদের ঠিকানা বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ; অর্থাৎ, চক্ষু, কর্ণ ইত্যাদি বাহ্যিক পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মধ্যে নিহিত। 

দ্বিতীয় প্রকার সেসব শক্তি, যাদের বাসস্থান বাতেনী মনযিলসমূহের মধ্যে নিহিত; অর্থাৎ, মস্তিষ্কের কোটরসমূহের মধ্যে। 

এই দ্বিতীয় প্রকারও পাঁচ ভাগে বিভক্ত। কেননা, মানুষ কোন বস্তুকে দেখে যখন চক্ষু বন্ধ করে নেয় তখন সে সেই বস্তুর চিত্র মনের মধ্যে পায়। একে বলা হয় “খেয়াল” তথা কল্পনা। এর পর এই চিত্র কতক বিষয় মনে রাখার মাধ্যমে মানুষের সাথে থাকে। একে বলা হয় স্মরণশক্তি। এর পর সে এই স্মরণ করা বিষয় সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে এবং কতককে কতকের সাথে মিলায়। ফলে যা ভুলে গিয়ে থাকে তা স্মরণ হয়ে যায়। কতক চিত্র হুবহু মনের মধ্যে থেকে যায়। এর পর সে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সকল বিষয় অভিন্ন চেতনার মাধ্যমে আপন কল্পনায় একত্রিত করে নেয়। এ থেকে জানা গেল, মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে যে সকল শক্তি রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে অভিন্ন চেতনা, কল্পনা, চিন্তা, জল্পনা ও স্মরণ রাখা। আল্লাহ তাআলা এসব শক্তি সৃষ্টি না করলে মস্তিষ্ক এগুলো থেকে খালি থাকত। যেমন- হাত, পা এগুলো থেকে খালি রয়েছে।

অন্তরের আভ্যন্তরীণ খাদেম জানা উচিত, ক্রোধ ও কামনা অন্তরের এ দুটি খাদেম কখনও পুরা মাত্রায় অন্তরের আনুগত্য করে। তখন অন্তর অধ্যাত্ম পথে চলার ব্যাপারে এগুলো থেকে সাহায্য পায়। বরং আল্লাহর দিকে সফরে এ দুটিকে উত্তম সঙ্গী মনে করে, কিন্তু মাঝে মাঝে এ দুটি খাদেম অন্তরের অবাধ্য 


অন্তরের আভ্যন্তরীণ খাদেম —

জানা উচিত, ক্রোধ ও কামনা –অন্তরের এ দুটি খাদেম কখনও পুরা মাত্রায় অন্তরের আনুগত্য করে। তখন অন্তর অধ্যাত্ম পথে চলার ব্যাপারে এগুলো থেকে সাহায্য পায়। বরং আল্লাহর দিকে সফরে এ দুটিকে উত্তম সঙ্গী মনে করে, কিন্তু মাঝে মাঝে এ দুটি খাদেম অন্তরের অবাধ্য ও বিদ্রোহী হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত অন্তরকে নিজেদের গোলাম বানিয়ে নেয়। তখন তারা অন্তরের বরবাদ হওয়ার কারণ হয়ে যায়। ফলে অন্তর চিরন্তন সৌভাগ্য লাভের সফর থেকে বিরত থাকে, কিন্তু অন্তরের আরও সাহায্যকারী রয়েছে; যেগুলোকে শিক্ষা, প্রজ্ঞা ও চিন্তা-ভাবনা বলা হয়। এহেন সংকট মুহূর্তে ক্রোধ ও বাসনার মোকাবিলা করার জন্যে এগুলোর সাহায্য নেয়া উচিত। কেননা, ক্রোধ ও কামনা কখনও শয়তানের দলে ভিড়ে অন্তরের উপর অনন্তর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। যদি অন্তর উপরোক্ত খাদেমদের সাহায্য না নেয় এবং ক্রোধ ও কামনার অনুগত হয়ে যায়, তাহলেও ধ্বংস ও প্রকাশ্য ক্ষতির আশংকা থেকে যায়। অধিকাংশ লোককে দেখা যায়, তাদের বিবেক-বুদ্ধি কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার জন্যে অনেক কৌশল খুঁজে ফিরে। অথচ বুদ্ধির প্রয়োজন মিটানোর ব্যাপারে কামনার অনুগত থাকা সমীচীন। এখন আমরা তিনটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে এ বিষয়টির ব্যাখ্যা পাঠকবর্গের সামনে তুলে ধরছি ।



পরবর্তী পর্ব– কামনার অনুগত থাকা সমীচীন

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...