(১) প্রথম দৃষ্টান্ত—
মনে করুন মানুষের নফস অর্থাৎ, পূর্ববর্ণিত লতীফা বাদশাহ্, দেহ তার রাজধানী, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার কর্মী ও আমলা, বিবেকশক্তি তার হিতাকাক্ষী উযীর, ক্রোধ তার রাজধানীর প্রধান পুলিশ কর্মচারী এবং কামনা বাসনা তার দুশ্চরিত্র গোলাম, যে এই রাজধানী শহরে খাদ্যশস্য ইত্যাদি আনয়ন করে। সে এত ধূর্ত, মিথুক ও নোংরা যে, শুভাকাঙ্ক্ষারূপে আগমন করে, কিন্তু তার শুভাকাঙ্ক্ষার মধ্যে আদি-অন্ত ষড়যন্ত্র ও মারাত্মক বিষ নিহিত থাকে। বিচক্ষণ উযীরের সাথে কথায় কথায় বিবাদ করা তার অভ্যাস। এমনকি, কোন মুহূর্ত তার কথা কাটাকাটি থেকে খালি থাকে না। সুতরাং এমতাবস্থায় যদি বাদশাহ্ তার রাজত্ব পরিচালনায় উযীরের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করে এবং এই দুশ্চরিত্র গোলামের কথাবার্তা প্রত্যাখ্যান করে, তবে নিঃসন্দেহে রাজকার্য সঠিকভাবে ও ইনসাফ সহকারে পরিচালিত হবে। এক্ষেত্রে বাদশাহকে বুঝে নিতে হবে, গোলামের বিরুদ্ধাচণের মধ্যেই কল্যাণ নিহিত। উযীরের মন রক্ষার্থে প্রধান পুলিশ কর্মকর্তাকেও উপদেশ দিতে হবে এবং উযীরের পক্ষে থেকে তাকে এই দুশ্চরিত্র গোলাম ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের উপর মোতায়েন করতে হবে, যাতে গোলাম সীমালঙ্ঘন করতে না পারে এবং পরাভূত ও শাসিত থেকে যায়। অনুরূপভাবে যদি নফস বুদ্ধির সাহায্য নেয়, ক্রোধকে কামনার উপর চাপিয়ে রাখে এবং কখনও ক্রোধকে দমন করার জন্যে কামনার সাহায্য নেয়, তবে নফসের সকল শক্তি সমতার উপর কায়েম থাকবে এবং চরিত্র উন্নত হবে। যে ব্যক্তি এ পন্থা বর্জন করবে, সে সেই লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন : “আপনি কি দেখেছেন তাকে যে নিজের প্রবৃত্তিকে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে? আর আল্লাহ্ তাকে জেনেশুনেই বিভ্রান্ত করেছেন এবং তার কর্ণ ও হৃদয় মোহরাঙ্কিত করে দিয়েছেন। আর তার চোখের উপর রেখেছেন আবরণ”।
অথবা এরশাদ হয়েছে : "এবং সে তার খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করেছে । অতএব তার দৃষ্টান্ত কুকুরের মত । তার উপর বোঝা চাপালে সে হাঁপায় এবং বোঝ না চাপিয়ে ছেড়ে দিলেও হাঁপায়"।
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার নফসকে কামনা থেকে ফিরিয়ে রাখে, তার সম্পর্কে এরশাদ হয়েছে- "আর যে তার পালনকর্তার সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে এবং আপন নফসকে খেয়াল-খুশী থেকে বিরত রাখে, জান্নাতই তার ঠিকানা
(২) দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত—
মনে করুন, দেহ একটি শহর এবং এর বিচক্ষণ প্রশাসক হচ্ছে বুদ্ধি। বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ ইন্দ্রিয়সমূহ এই শহরের লশকর। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এর প্রজা এবং কামনা ও ক্রোধ এই শহরের দুশমন। তারা এই শহরে তাদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে এবং প্রজাদেরকে ধ্বংস করতে ইচ্ছুক। এখন দেহকে একটি পরিখা মনে করা উচিত , যার মধ্যে বাদশাহ স্বয়ং রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে বিদ্যমান রয়েছে। সে যদি যুদ্ধ করে দুশমনকে বিতাড়িত অথবা পরাভূত করে দেয়, তবে তার এ কাজ আল্লাহর দরবারে পছন্দনীয় হবে। যেমন আল্লাহ বলেন,-"যারা ধন ও প্রাণের বিনিময়ে জেহাদ করে, আল্লাহ তাদেরকে গৃহে উপবিষ্টদের উপর অধিক মর্যাদা দান করেন"।
পক্ষান্তরে বাদশাহ যদি পরিখা বিনষ্ট ও প্রজাদেরকে বিপন্ন করে দেয়, তবে সে সর্বোচ্চ দরবারে নিন্দার পাত্র হবে এবং তাকে এর শাস্তি দেয়া হবে। এক হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে –এরূপ ব্যক্তিকে কেয়ামতের দিন বলা হবে, হে দুষ্টমতি রক্ষক, তুমি গোশত খেয়েছ এবং দুধ পান করেছ, কিন্তু হারানো উদ্ধার করনি এবং ভগ্নাবস্থাকে ঠিক করনি । আজ আমি তোমার কাছ থেকে বিনিময় গ্রহণ করব। এই জেহাদের প্রতিই ইঙ্গিত রয়েছে নিম্নোক্ত হাদীসে "আমরা ছোট জেহাদ থেকে বড় জেহাদের দিকে ফিরে এসেছি"।
(৩) তৃতীয় দৃষ্টান্ত:-
বুদ্ধিকে একজন আরোহী মনে করা উচিত, যার ইচ্ছা শিকার করার। কামনাকে তার ঘোড়া এবং ক্রোধকে তার কুকুর খেয়াল করা দরকার। এখন যদি আরোহী পারদর্শী হয় এবং ঘোড়া ও কুকুর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়, তবে অবশ্যই অভীষ্ট অর্জিত হবে। পক্ষান্তরে যদি আরোহী স্বয়ং আরোহণ বিদ্যায় মূখ হয় এবং ঘোড়া অবাধ্য ও কুকুর উন্মাদ হয়, তবে না ঘোড়া তার কথামত কাজ করবে এবং না কুকুর তার ইশারায় শিকারের দিকে ধাবিত হবে। এরূপ ব্যক্তির জন্যে শিকার করা দূরের কথা, প্রাণ রক্ষা করাই কঠিন হয়ে যাবে। এই দৃষ্টান্তে আরোহীর অনভিজ্ঞতা মানে মানুষের মূর্খতা ও জ্ঞানশক্তির অভাব, ঘোড়ার অবাধ্যতা মানে কামনার প্রাবল্য, বিশেষত উদরের কামনা ও যৌন কামনার প্রাবল্য এবং কুকুরের উন্মত্ততার মানে ক্রোধের প্রাবল্য। আল্লাহ তাআলা আপন কৃপায় মানুষকে এগুলো থেকে রক্ষা করুন।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন