বুধবার, ১৪ জুন, ২০২৩

জুমআ (পর্ব– ৩) জুম'আর আদব



জুমআ (পর্ব– ৩)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
জুম'আর আদব 
জুমআর ফযীলত লাভের উদ্দেশ্যে বৃহস্পতিবার থেকে তৎপর হওয়া উচিত। সেমতে আসরের পর দোয়া, এস্তেগফার ও তসবীহ পাঠে মশগুল হবে। কেননা, এ সময়টি জুমআর মধ্যে অজ্ঞাত মুহূর্তের সমান ফযীলত রাখে।

জনৈক বুযুর্গ বলেন : আল্লাহ তাআলার কাছে মানুষের জীবিকা ছাড়া আরও একটি অনুগ্রহ আছে, যা থেকে তিনি তাকে দেন, যে তাঁর কাছে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এবং জুমআর দিন তা তলব করে।
বৃহস্পতিবার দিন কাপড়-চোপড় ধুয়ে পরিষ্কার করবে। সুগন্ধিও যোগাড় করবে। এ রাত্রে জুমআর দিনে রোযা রাখার নিয়ত করবে। এর অনেক সওয়াব। কিন্তু এর সাথে বৃহস্পতিবার অথবা শনিবারের রোযা মিলিয়ে নেবে। কেননা, শুধু জুমআর দিন রোযা রাখা মাকরূহ। এ রাত্রিটি নামায ও খতমে কোরআনে অতিবাহিত করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। কেউ কেউ এ রাতে স্ত্রীসহবাস মোস্তাহাব বলেছেন। তাঁরা এ হাদীসের উদ্দেশ্য তাই বলেছেন:–
“আল্লাহ রহম করুন সেই ব্যক্তির প্রতি, যে প্রথম ওয়াক্তে জুমআ আসে, শুরু থেকে খোতবা শুনে এবং গোসল করায় ও গোসল করে”। এখানে গোসল করায় অর্থ স্ত্রীকে গোসল করায়।
এসব কাজ করলে পূর্ণরূপে জুমআকে স্বাগত জানানো হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি গাফেলদের শ্রেণী থেকে বের হয়ে যাবে, যারা সকাল বেলায় জিজ্ঞেস করে, আজ কোন্ দিন?


জনৈক বুযুর্গ বলেন : জুমআর পূর্ণ অংশ সেই ব্যক্তি পায়, যে একদিন পূর্ব থেকে এর অপেক্ষা করে। আর ক্ষুদ্র অংশ সেই ব্যক্তি পায়, যে সকালে জিজ্ঞেস করে, আজ কোন্ দিন? কোন কোন বুযুর্গ জুমআর পূর্ব রাতে জামে মসজিদেই থাকতেন।

জুমআর দিন ফজর হতেই গোসল করা উচিত, যদিও তখন জামে মসজিদে না যায়। কিন্তু এর কাছাকাছি সময়েই মসজিদে যাওয়া উচিত, যাতে গোসল ও মসজিদে যাওয়া কাছাকাছি সময়ে হয়। জুমআর দিন গোসল করা তাকিদসহ মোস্তাহাব। কোন কোন আলেম একে ওয়াজিব বলেছেন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন-
“জুমআর গোসল প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের উপর ওয়াজিব”।
এক মশহুর হাদীসেআছে,
“যে জুমআয় উপস্থিত হয়, তার গোসল করা উচিত। মদীনার মুসলমানরা কাউকে মন্দ বলার ক্ষেত্রে এরূপ বলত : “তুমি তার চেয়েও খারাপ, যে জুমআর দিন গোসল করে না”।

একবার হযরত ওমর (রঃ) জুমআর খোতবা দিচ্ছিলেন। এমন সময় হযরত ওসমান (রঃ) মসজিদে আগমন করলেন। এ সময়ে আগমন খারাপ মনে করে হযরত ওমর (রঃ) বললেন : এটা কোন্ সময়? অর্থাৎ, আগে এলেন না কেন? হযরত ওসমান (রঃ) জওয়াব দিলেন : আমি আযান শুনার পর দেরী করিনি। ওযু করেই চলে এসেছি। হযরত ওমর (রঃ) বললেন : একটি নয়, দুটি হল। আপনি তো জানেন, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাকিদ সহকারে জুমআর দিন গোসল করার জন্যে বলতেন। আপনি কেবল ওযু করলেন।
এক রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যেব্যক্তি জুমআর দিন ওযু করে, সে ভাল করে। আর যে গোসল করে সে সর্বোত্তম কাজ করে। এ থেকে জানা গেল, গোসল তরক করাও জায়েয।
জুমআর দিন সাজসজ্জা করা মোস্তাহাব। তিনটি বিষয় সাজসজ্জার অন্তর্ভুক্ত- পোশাক, পরিচ্ছন্নতা ও সুগন্ধি ব্যবহার করা। পরিচ্ছন্নতার মধ্যে রয়েছে মেসওয়াক করা, চুল কাটা, নখ কাটা ও গোঁফ কাটা। এছাড়া পবিত্রতা অধ্যায়ে যেসব বিষয় বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোও করা উচিত।
হযরত ইবনে মসউদ (রঃ) বলেন : যেব্যক্তি জুমআর দিন নখ কাটে, আল্লাহ তাআলা তার নখ থেকে রোগ দূর করে দেন। নিজের কাছে যে উৎকৃষ্ট সুগন্ধি থাকে, তা জুমআর দিন ব্যবহার করবে, যাতে দুর্গন্ধ দূর হয় এবং উপস্থিত মুসল্লীরা আরাম বোধ করে। পুরুষদের জন্যে উত্তম সুগন্ধি হচ্ছে যার গন্ধ প্রকট এবং রং অস্পষ্ট। পক্ষান্তরে নারীদের জন্যে সেই সুগন্ধি উত্তম, যার রং উজ্জ্বল এবং গন্ধ গোপন। ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন : যেব্যক্তি তার কাপড় চোপড় পরিষ্কার রাখে, তার মনোকষ্ট কম হয় এবং যার সুগন্ধি উৎকৃষ্ট, তার বুদ্ধি বাড়ে। সাদা পোশাক সর্বোত্তম। আল্লাহ তা'আলার কাছে সাদা পোশাক অধিক পছন্দনীয়। কাল পোশাকে কোন সওয়াব নেই। কেউ কেউ কাল পোশাকের দিকে তাকানো মাকরূহ বলেছেন। জুমআর দিনে পাগড়ী পরিধান করা মোস্তাহাব। ওয়াসেলা ইবনে আসকা (রঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : আল্লাহ তাআলা ও তাঁর ফেরেশতাগণ জুমআর দিন পাগড়ী পরিধানকারীদের প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। সুতরাং গরমে কষ্ট হলে নামাযের পূর্বে ও পরে পাগড়ী খুলে ফেলায় দোষ নেই।

জামে মসজিদে সকালেই রওয়ানা হওয়া উচিত। এর সওয়াব অনেক। যাওয়ার সময় খুশু সহকারে থাকবে। নামায শেষ হওয়া পর্যন্ত মসজিদে এতেকাফের নিয়ত করবে। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : "যেব্যক্তি মসজিদে আউয়াল ওয়াক্তে যায় সে যেন একটি উট কোরবানী করে; যে দ্বিতীয় প্রহরে যায়, সে যেন একটি গরু কোরবানী করে; যে তৃতীয় প্রহরে যায়, সে যেন শিংবিশিষ্ট ভেড়া কোরবানী করে; যে চতুর্থ প্রহরে যায়, সে যেন খোদার পথে মুরগী যবেহ করে এবং যে পঞ্চম প্রহরে যায়, সে যেন একটি ডিম আল্লাহর জন্যে উৎসর্গ করে। ইমাম যখন খোতবার জন্যে বের হয়ে আসেন, তখন আমলনামা বন্ধ করে দেয়া হয়, কলম তুলে নেয়া হয় এবং ফেরেশতারা মিম্বরের কাছে সমবেত হয়ে যিকির (খুতবা) শ্রবণ করে। এ সময় যারা আসে তারা কোন সওয়াব পায় না"।
সূর্যোদয় পর্যন্ত প্রথম ওয়াক্ত, এক বর্শা পরিমাণ সূর্য উপরে উঠা পর্যন্ত দ্বিতীয় প্রহর, রৌদ্র প্রখর থাকা পর্যন্ত তৃতীয় প্রহর এবং এ সময় থেকে সূর্য ঢলে পড়া পর্যন্ত চতুর্থ ও পঞ্চম প্রহর। এ দু'প্রহরে সওয়াব কম। সূর্য ঢলে পড়ার পর নামাযের সময়। এতে কোন সওয়াব নেই।
রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : "তিনটি কাজের সওয়াব যদি মানুষ জানত, তবে সেগুলোর জন্যে মানুষ সওয়ারীতে বসে রওয়ানা হয়ে যেত- (১) আযান, (২) জামাআতের প্রথম সারি এবং (৩) ভোরে জুমআর নামাযের জন্যে মসজিদে যাওয়া"।

এক হাদীসে আছে, "জুমআর দিন ফেরেশতারা হাতে রূপার কাগজ ও স্বর্ণের কলম নিয়ে জামে মসজিদের দরজাসমূহে বসে যায় এবং প্রথম ও দ্বিতীয় প্রহরে আগমনকারীদের নাম লিপিবদ্ধ করে"।
এক হাদীসে আছে, "যখন কোন বান্দা জুমআর দিনে দেরী করে, তখন ফেরেশতারা তাকে তালাশ করে এবং তার অবস্থা একে অপরের কাছে জিজ্ঞেস করে। তারা বলে : ইলাহী, যদি দারিদ্র্যের কারণে তার দেরী হয়ে থাকে, তবে তাকে ধনাঢ্য কর। রোগের কারণে দেরী হয়ে থাকলে তাকে সুস্থতা দান কর। কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে দেরী হলে তাকে অবসর দান কার। কোন খেলার কারণে দেরী হয়ে থাকলে তার অন্তর এবাদতের দিকে ফিরিয়ে দাও"।
প্রথম শতাব্দীতে সেহরীর সময় এবং সোবহে সাদেকের পরে রাস্তা জনাকীর্ণ থাকত। লোকজন প্রদীপ হাতে জামে মসজিদে ঈদের দিনের মত দলে দলে গমন করত। আস্তে আস্তে এটা বিলুপ্ত হয়ে যায়। ইসলামে এটাই প্রথম বেদআত ছিল, লোকজন জুমআর দিন ভোরে মসজিদে যাওয়া ত্যাগ করল। ইহুদী খৃস্টানদের দেখেও মুসলমানের লজ্জা হয় না। তারা তাদের এবাদত গৃহে শনিবার ও রবিবার প্রত্যূষে যায়। দুনিয়াপ্রার্থীরাও ক্রয়-বিক্রয় মুনাফা উপার্জনের জন্যে খুব ভোরে বাজারে যায়। আখেরাতের প্রার্থীদের কি হল, তারা এ ব্যাপারে অগ্রগামী হয় না?
কথিত আছে, মানুষ যখন আল্লাহ্ তাআলার দীদার লাভ করবে, তখন তারা ততটুকু নৈকট্য পাবে, যতটুকু প্রত্যূষে জুমআয় গমন করবে। হযরত ইবনে মসউদ (রঃ) জামে মসজিদে খুব ভোরে গিয়ে দেখেন, তিন ব্যক্তি তাঁরও আগে মসজিদে বিদ্যমান রয়েছে। এতে তিনি দুঃখিত হলেন এবং নিজেকে ধিক্কার দিয়ে বললেন : চার জনের মধ্যে আমি চতুর্থ হলাম।

জামে মসজিদে প্রবেশ করার পর মানুষের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে এবং সামনে দিয়ে যাবে না। অনেক আগে গেলে এরূপ করার প্রয়োজনই হবে না। মানুষের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কঠোর শাস্তিবাণী বর্ণিত হয়েছে। হাদীসে আছে, কেয়ামতের দিন এরূপ ব্যক্তিকে পুল করে মানুষকে তার উপর দিয়ে যেতে বলা হবে।
ইবনে জুরায়েজ থেকে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জুমআর খোতবা দেয়ার সময় দেখলেন, এক ব্যক্তি মানুষের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে সামনে এসে বসে গেছে। নামাযের পর তিনি সেই লোকটির সাথে সাক্ষাৎ করে বললেন : ব্যাপার কি, তুমি আজ আমাদের সাথে জুমআয় শরীক হলে না? লোকটি বলল : হুযুর, আমি তো জুমআ উপস্থিত হয়েছি। তিনি বললেন : আমি তোমাকে মানূষের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে যেতে দেখেছিলাম। এতে ইঙ্গিত আছে, লোকটির আমল বেকার হয়েছে এক রেওয়ায়েতে আছে, লোকটি আরজ করল : হুযুর আমাকে দেখেননি? তিনি বললেন : আমি দেখেছি, তুমি দেরীতে এসেছ এবং মানুষকে কষ্ট দিয়েছ।
হাঁ, প্রথম কাতার খালি পড়ে থাকলে মানুষের উপর দিয়ে যাওয়া দূষণীয় নয়। কারণ, তখন মানুষ নিজেরাই নিজেদের হক নষ্ট করে এবং ফযীলতের স্থান ছেড়ে দেয়।
হযরত হাসান (রঃ) বলেন : যারা জুমআর দিনে জামে মসজিদের দরজায়ই বসে যায়, তাদের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে যাও। তাদের কোন ইযযত নেই।
নামায পড়ার সময় নামাযীর সামনে দিয়ে যাবে না। নামাযী নিজে স্তম্ভ অথবা প্রাচীরের কাছে বসবে, যাতে কেউ সামনে দিয়ে না যায়। নামাযীর সামনে দিয়ে গেলে নামায ফাসেদ হয় না ঠিক; কিন্তু এটা নিষিদ্ধ। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : মুসলমানের জন্যে চল্লিশ বছর দাঁড়িয়ে থাকা নামাযীর সামনে দিয়ে যাওয়া অপেক্ষা উত্তম। তিনি আরও বলেন : মানুষের জন্যে ছাই ও ধুলা হয়ে বাতাসে উড়ে যাওয়া নামাযীর সামনে দিয়ে যাওয়া অপেক্ষা ভাল।
অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে, যদি কেউ জানত নামাযের সামনে দিয়ে যাওয়া কত বড় গোনাহ্, তবে চল্লিশ বছর দাঁড়িয়ে থাকা তার জন্যে উত্তম হত। যদি স্তম্ভ, প্রাচীর অথবা বিছানো জায়নামাযের ভিতরের ভাগ দিয়ে কেউ গমন করে, তবে নামাযীর উচিত তাকে হটিয়ে দেয়া। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : নামাযীর উচিত তাকে হটিয়ে দেয়া। যদি না মানে তবে আবার হটিয়ে দেবে। যদি এর পরও না মানে, তবে তার সাথে লড়াই করবে। কেননা, সে শয়তান।
হযরত আবু সায়ীদ খুদরী (রাঃ) -এর সামনে দিয়ে কেউ গেলে তিনি সজোরে ধাক্কা দিতেন। ফলে সে মাটিতে পড়ে যেত। প্রায়ই তিনি তাঁকে জড়িয়ে ধরতেন। মারওয়ানের কাছে এ অভিযোগ গেলে মারওয়ান বলতেন : রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে এরূপ করার আদেশ দিয়েছেন। নামাযীর উচিত সামনে এক হাত দীর্ঘ কোন খুঁটি পুঁতে নেয়া, যাতে সীমা চিহ্নিত হয়ে যায়।

জুমআর নামাযে প্রথম কাতারে বসার চেষ্টা করবে। এর সওয়াব অনেক। রেওয়ায়েত আছে- যেব্যক্তি পরিবারের লোকজনকে গোসল করায়, নিজে গোসল করে, সকালে মসজিদে যায়, প্রথম খোতবা পায় এবং ইমামের কাছে থেকে খোতবা ও কেরাআত শ্রবণ করে, এটা তার জন্যে দু'জুমআর মধ্যবর্তী দিন এবং আরও তিন দিনের গোনাহের কাফফারা হয়ে যায়। অন্য এক রেওয়ায়েতে প্রথম কাতার অন্বেষণ করার কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু যদি ইমামের কাছে এমন কোন বিষয় থাকে, যা পরিবর্তন করতে তুমি অক্ষম; যেমন ইমাম রেশমী বস্ত্র পরিহিত হলে অথবা ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নামাযে এলে প্রথম কাতার থেকে পেছনে থাকা তোমার জন্যে উত্তম। কেননা, এমতাবস্থায় প্রথম কাতারে থাকলে তোমার ধ্যান বিক্ষিপ্ত হবে। কোন কোন আলেম এহেন অবস্থায় নিরাপত্তার খাতিরে প্রথম কাতার বর্জন করেছেন।
বিশর ইবনে হারেসকে কেউ জিজ্ঞেস করল : আমরা আপনাকে ভোর বেলায় মসজিদে আসতে দেখি। কিন্তু আপনি শেষ কাতারসমুহে নামায পড়েন। এটা কেন?
তিনি বললেন : অন্তরের নৈকট্য উদ্দেশ্য- দেহের নয়। এতে তিনি ইঙ্গিত করেছেন, পেছনের কাতারে থাকা অন্তরের জন্যে ভাল।
সুফিয়ান সত্ত্বরী শোয়ায়েব ইবনে হরবকে মিম্বরের কাছে আবু জাফর মনসুরের খোতবা শুনতে দেখলেন। নামাযান্তে সুফিয়ান শোয়ায়েবকে বললেন : মনসুরের কাছে আপনাকে বসা দেখে আমি বিচলিত হয়েছি। যদি আপনি তার মুখে এমন কোন কথা শুনেন, যার প্রতিবাদ করা জরুরী হয়, তবে আপনি প্রতিবাদ করতে পারবেন কি? এরা কাল পোশাকের বেদআত আবিষ্কার করেছে। শোয়ায়েব বললেন : হাদীসে কি ইমামের কাছে থাকতে এবং খোতবা শুনতে বলা হয়নি? সুফিয়ান বললেন : এটা খোলাফায়ে রাশেদীনের বেলায় প্রযোজ্য। এদের কাছ থেকে তো যত দূরে থাকা যায়, ততই আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জিত হবে।
হযরত সাঈদ ইবনে আমের বলেন : আমি হযরত আবু দারদার সাথে নামায পড়ি। তিনি নামাযে পেছনের কাতারে যেতে লাগলেন। অবশেষে আমরা সর্বশেষ কাতারে চলে গেলাম। নামাযান্তে আমি তাঁকে বললাম : প্রথম কাতার কি সব কাতার অপেক্ষা উত্তম নয়? তিনি বললেন : হাঁ, কিন্তু এটা রহমতপ্রাপ্ত উম্মত। এ উম্মতের প্রতি রহমতের দৃষ্টি রয়েছে। আল্লাহ তাআলা যখন কোন বান্দাকে নামাযে রহমতের দৃষ্টিতে দেখেন, তখন তার পেছনে যত মানুষ থাকে, সকলকে ক্ষমা করে দেন। অতএব আমি এই আশা নিয়ে সকলের পেছনে দাঁড়িয়েছি, সম্মুখের কাতারের যার প্রতি আল্লাহ তাআলা রহমতের দৃষ্টি দেবেন, তাঁর ওসিলায় আমার মাগফেরাত হয়ে যাবে।
কোন কোন রেওয়ায়েতে আছে, হযরত আবু দারদা এ বিষয়বস্তু রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনার কাছ থেকে শুনেছেন । সুতরাং যেব্যক্তি এরূপ নিয়ত সহকারে পেছনের কাতারে থাকে, অন্যকে অগ্রগণ্য মনে করে এবং সচ্চরিত্রতা প্রদর্শন করে, তার জন্যে এতে কোন দোষ নেই। প্রকাশ থাকে যে, মিম্বরের সাথে সংলগ্ন পূর্ণ কাতারকে প্রথম কাতার ধরা হবে। সুতরাং মিম্বর যদি কোন কাতারকে কেটে দেয়, তবে মিম্বরের দু'পাশে যে কাতার, তা পূর্ণ কাতার নর। তাই একে প্রথম কাতার ধরা হয় না।
হযরত সুফিয়ান সওরী বলতেন : মিম্বরের সম্মুখস্থ কাতার প্রথম কাতার। কেননা, এটাই মিম্বর সংলগ্ন কাতার। এতে উপবিষ্ট ব্যক্তি ইমামের সম্মুখে থাকে এবং তাঁর খোতবা শুনে। কিন্তু মিম্বরের প্রতি লক্ষ্য না করে যে কাতার কেবলার অধিক নিকটবর্তী, তাকে প্রথম কাতার বলা সম্ভবপর।

ইমাম যখন মিম্বর যান, তখন নামায বন্ধ করতে হবে এবং কথাবার্তাও মওকুফ করতে হবে। এ সময় খোতবা শ্রবণ করতে হবে। কোন কোন সাধারণ লোকের অভ্যাস এই, মুয়াযযিন আযান দিতে উঠলে তারা সেজদা করে। হাদীসে ও গুণীজন বাক্যে এর কোন ভিত্তি নেই। হযরত আলী ও হযরত ওসমান (রঃ) থেকে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি চুপচাপ খোতবা শুনে তার জন্যে দুটি সওয়াব, যে খোতবা শুনে না এবং চুপ থাকে, তার জন্যে এক সওয়াব এবং যে শুনে বাজে কথা বলে, তার জন্যে দু'গোনাহ্ লেখা হয়। আর যেব্যক্তি শুনে না এবং বাজে কথা বলে, তার জন্যে এক গোনাহ্ লেখা হয়।
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : “যেব্যক্তি ইমাম খোতবা পাঠ করার সময় সঙ্গীকে বলে : চুপ থাক, সে বাজে কথা বলে। আর যে বাজে কথা বলে তার জুমআ হয় না”।
এ রেওয়ায়েত থেকে জানা গেল, ইশারা করে অথবা কংকর নিক্ষেপ করে চুপ করাতে হবে- কথা বলে নয়।
হযরত আবু যর (রঃ) বলেন : রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যখন খোতবা পাঠ করছিলেন, তখন আমি উবাই ইবনে কাবকে প্রশ্ন করলাম, এ সূরা কবে নাযিল হয়েছিল। হযরত উবাই আমাকে চুপ থাকতে ইশারা করলেন। এর পর রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) মিম্বর থেকে নামার পর উবাই আমাকে বললেন : যাও, তোমার জুমআ নেই। আমি রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)- এর কাছে অভিযোগ পেশ করলাম। তিনি বললেনঃ উবাই ঠিক বলেছে।
যেব্যক্তি দূরে বসার কারণে খোতবা শুনতে অক্ষম, তার চুপ থাকা উচিত। হযরত আলী (রাঃ) বলেন : চার সময়ে নফল নামায মাকরূহ - ফজরের পরে, আসরের পরে, ঠিক দ্বিপ্রহরে এবং ইমাম যখন খোতবা দেন।

জুমআর নামায শেষ হলে কথা বলার পূর্বে
>সাত বার আলহামদু লিল্লাহ,
>সাত বার কুল হুয়াল্লাহু এবং
সাত বার কুল আউযু সূরাদ্বয় (ফালাক ও নাস) পাঠ করবে। বর্ণিত আছে, যে এরূপ করবে সে এক জুমআ থেকে অন্য জুমআ পর্যন্ত নিরাপদ থাকবে এবং শয়তান থেকে আশ্রয় পাবে। জুমআর পরে নিম্নোক্ত দোয়া পাঠ করা মোস্তাহাব :

‎اللَّهُمَّ يَا غَنِيُّ يَا حَمِيدُ يَا مُبْدِي يَا مُعِبُدُ يَا رَحِيمُ يَا وَدُودُ أَغْنِنِى بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ وَبِفَضْلِكَ عَنْ مَنْ سِوَاكَ .


“আল্লাহুম্মা ইয়া গানিয়্যু-ইয়া হামিদ, ইয়া মুবদি-ইয়া মুয়িদ, ইয়া রাহিমু-ইয়া ওয়াদুদ, আগনি বি-হালালিকা আন্ হারামিকা ওয়া বি ফাদলিকা আম্মান সিওয়াক”

অর্থাৎ, হে আল্লাহ, হে অমুখাপেক্ষী, হে প্রশংসিত, হে প্ৰথমে সৃষ্টিকারী, হে পুনর্বার সৃষ্টিকারী, হে দয়ালু, হে প্রিয়, আমাকে আপনার হালাল রিযিক দ্বারা হারাম থেকে রক্ষা করুন এবং আপনার অনুগ্রহ দ্বারা আপনি ব্যতীত সব কিছুর প্রতি অমুখাপেক্ষী করুন।

বর্ণিত আছে, কেউ যথারীতি এ দোয়া পাঠ করলে আল্লাহ তাআলা তাকে সৃষ্ট জীব থেকে বেপরওয়া করে দেন এবং তাকে ধারণাতীত স্থান থেকে রিযিক পৌছান। এর পর জুমআর পরবর্তী ছয় রাকআত নামায পড়বে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) থেকে দু'রাকআত, চার রাকআত এবং ছয় রাকআত পড়ার বিভিন্ন রূপ রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে। এগুলো বিভিন্ন অবস্থায় দুরস্ত। অতএব ছয় রাকআত পড়লে সবগুলো রেওয়ায়েত পালিত হয়ে যাবে।
জুমআ শেষে আসরের নামায পর্যন্ত মসজিদে থাকা উচিত। মাগরিব পর্যন্ত থাকলে আরও ভাল। বর্ণিত আছে, যেব্যক্তি জামে সমজিদে আসরের নামায পড়ে, সে হজ্জের সওয়াব পায় এবং যে মাগরিবের নামাযও পড়ে, সে হজ্জ ও ওমরার সওয়াব পায়। যদি রিয়ার আশংকা থাকে অথবা মসজিদে অনর্থক কথাবার্তায় মশগুল হওয়ার ভয় হয়, তবে আল্লাহর যিকির করতে করতে এবং তাঁর নেয়ামতের কথা ভাবতে ভাবতে গৃহে ফিরে আসাই উত্তম। এর পর সূর্যাস্ত পর্যন্ত অন্তর ও মুখের হেফাযত করবে, যাতে জুমআর দিনের উৎকৃষ্ট মুহূর্তটি বিনষ্ট না হয়।
জামে মসজিদে ও অন্যান্য মসজিদে দুনিয়ার কথাবার্তা বলা উচিত নয়। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : এমন সময় আসবে, যখন মানুষ মসজিদসমূহে দুনিয়ার কথাবার্তা বলবে। তাদের সাথে আল্লাহ তাআলার কোন সম্পর্কই নেই। তুমি তাদের কাছে বসো না।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...