শুক্রবার, ৯ জুন, ২০২৩

সবরের ফজিলত

 


সবর ও শোকর পর্ব- ১


‘সবর’ ও ‘শোকর’ ঈমানের দুটি অংশ—

হাদীস ও মনীষীদের বাণীর দ্বারা প্রমাণিত রয়েছে যে, ঈমানের দুটি অংশ - একটি 'সবর', অপরটি 'শোকর'। 

আল্লাহ তা'আলার 'আসমায়ে হুসনা' তথা সুন্দর নামসমূহের মধ্যে 'সাবূর' ও 'শাকূর' উভয়টি রয়েছে। তাই সবর ও শোকর যে খোদায়ী গুণাবলী ও আসমায়ে হুসনার অন্তর্ভুক্ত, তা প্রমাণিত। অতএব, এ দুটি বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা যেন ঈমানের দুটি অংশ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা অথবা আল্লাহ তা'আলার দুটি গুণ সম্পর্কে গাফেল থাকার নামান্তর। ঈমান ব্যতীত আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। কোন্ বিষয়ের প্রতি এবং কোন্ ব্যক্তির প্রতি ঈমান আনতে হবে, তা জানা ছাড়া ঈমানের পথে চলা অসম্ভব। যে ব্যক্তি এটা জানার ব্যাপারে শৈথিল্য করবে, সে সবর ও শোকরের সম্যক পরিচয় লাভেও ব্যর্থ হবে। এ থেকে বুঝা গেল, ঈমানের উভয় অংশের যথাযথ বর্ণনা একান্ত জরুরী। তাই আমরা এ অধ্যায়টিকে দুটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত করে সবর ও শোকর একত্রে বর্ণনা করেছি। কারণ, উভয়ের মধ্যে মিল ও যোগসূত্র অত্যন্ত গভীর


সবরের ফজিলত

আল্লাহ তা'আলা সবরকারীদেরকে অনেক বিশেষণে বিশেষিত করেছেন এবং কোরআন পাকে সত্তরেরও বেশী জায়গায় সবরের উল্লেখ করেছেন। তিনি অনেক মর্যাদা ও পুণ্যকর্মকে সবরের ফলশ্রুতি সাব্যস্ত করেছেন। নিম্নে কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করা হল—   

> "তারা যখন সবর করল, তখন আমি তাদের মধ্য থেকে পথ প্রদর্শক করলাম, যারা আমার আদেশে পথপ্রদর্শন করত"।

> "তোমার পালনকর্তার কল্যাণের ওয়াদা বনী ইসরাঈলের প্রতি পূর্ণতা লাভ করল এ কারণে যে, তারা সবর করেছিল"।

> "আমি সবরকারীদেরকে তাদের প্রাপ্য প্রদান করব তাদের সর্বোত্তম কর্মের বিনিময়ে |"

> "তারা তাদের পুরস্কার দু’বার পাবে। কারণ, তারা সবর করেছে।"

> "সবরকারীদেরকে তাদের পুরস্কার বে-হিসাব প্রদান করা হবে"।

শেষোক্ত এ আয়াত দ্বারা জানা যায় যে, সবর ব্যতীত অন্যান্য পুণ্যকর্মের সওয়াব বিশেষ পরিমাণ ও হিসাব অনুযায়ী প্রদান করা হবে এবং সবরের সওয়াব বেহিসাব দেয়া হবে। রোযা অর্ধেক সবর হওয়ার কারণে এটি সবরেরই অন্তর্ভুক্ত। তাই এক হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন "রোযা হল আমার জন্যে এবং আমি এর প্রতিদান দেব।"

সবরের সওয়াব সম্পর্কে বলা হয়েছে "তোমরা সবর কর। নিশ্চয় আল্লাহ সবরকারীদের সঙ্গে রয়েছেন"।

অন্যত্র তিনি স্বীয় সাহায্যকে সবরের সাথে শর্তযুক্ত করে বলেছেনঃ "হাঁ, যদি তোমরা সবর কর, সংযমী হও এবং শত্রু এ মুহূর্তে অতর্কিতে তোমাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে, তবে তোমাদের পালনকর্তা পাঁচ হাজার ফেরেশতা দিয়ে তোমাদের মদদ করবেন"।

আরও এক জায়গায় সবরকারীদের জন্যে এমন সব নেয়ামতের সমাবেশ ঘটিয়েছে, যেগুলো অন্যদের জন্যে নয় : এরশাদ হয়েছে 

>"এই লোকদের প্রতিই তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও অনুকম্পা ! এবং তারাই সৎপথ প্রাপ্ত"।

এ আয়াতে সৎপথ, অনুকম্পা ও ধন্যবাদ সবরকারীদের জন্য একত্রিত আছে। মোটকথা, সবরের ফযীলত সম্পর্কে আরও অনেক আয়াত বর্ণিত হয়েছে। 


হাদীসে সবরের ফজিলত:—

এ (সবর) সম্পর্কে হাদীসের সংখ্যাও অনেক। সেমতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন

> "সবর ঈমানের অর্ধেক"

এক হাদীসে বলা হয়েছে : 

> যেসব বিষয় তোমাদেরকে কম দেয়া হয়েছে, একীন ও সবর সেগুলোর অন্যতম। যে ব্যক্তি এ দুটি বিষয় থেকে যথেষ্ট পরিমাণ প্রাপ্ত হয়, সে তাহাজ্জুদ ও নফল রোযা না করলেও পরওয়া করবে না। 

> “তোমরা যদি বর্তমান অবস্থার উপর সবর কর, তবে এটা আমার কাছে এক এক ব্যক্তির সকলের সমপরিমাণ আমল নিয়ে আসার তুলনায় অধিক প্রিয়। কিন্তু আমি আশংকা করি আমার পর তোমাদের সামনে দুনিয়ার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়া হবে”। 

> তোমরা একে অপরকে খারাপ মনে করবে। তখন আকাশের অধিবাসীরা তোমাদেরকে খারাপ মনে করবে। যে ব্যক্তি এ অবস্থায় সওয়াবের নিয়তে সবর করবে, সে তার সওয়াব পুরাপুরি পাবে। এরপর রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) নিম্নোক্ত আয়াত তেলাওয়াত করলেন ?  "যা তোমাদের কাছে আছে, তা নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং যা আল্লাহর কাছে আছে, তা অবশিষ্ট থাকবে। আমি সবরকারীদেরকে তাদের প্রাপ প্রদান করব তাদের সর্বোত্তম আমলের বিনিময়ে"।

> হযরত জাবের (রাঃ) বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-কে ঈমান কি জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : "সবর করা ও দান করা"।


এক হাদীসে আছে –

>"সবর জান্নাতের অন্যতম ভাণ্ডার”। 

একবার এক প্রশ্নের জওয়াবে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন :  

> ঈমান হচ্ছে সবর করা। এর অর্থ, ঈমানের বড় রোকন হচ্ছে সবর করা। 

> বর্ণিত আছে, আল্লাহ তাআলা হযরত দাউদ (আঃ)-কে ওহী প্রেরণ করেন যে, আমার চরিত্রের মত তুমিও তোমার চরিত্র গঠন কর। আমার চরিত্র এই যে, আমি সাবূর (অধিক সবরকারী)। আতা ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন - রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) আনসারদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেন– তোমরা কি ঈমানদার ?  সকলেই চুপ করে রইল। হযরত উমর (রাঃ) আরয করলেন :  আমরা ঈমানদার। তিনি বললেনঃ তোমাদের ঈমানের পরিচয় কি ? আনসারগণ আরয করলেন :  আমরা সুখে শোকর করি, কষ্টে সবর করি এবং আল্লাহর আদেশের উপর সন্তুষ্ট থাকি। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন : কা’বার পালনকর্তার কসম, তোমরা ঈমানদার। 

এক হাদীসে আছে–

> "অপ্রিয় বিষয়ে সবর করার মধ্যে অনেক কল্যাণ নিহিত রয়েছে।"

হযরত ঈসা (আঃ) এরশাদ করেন—

> অপ্রিয় বস্তুর ব্যাপারে সবর করলেই তুমি তোমার প্রিয় বস্তু লাভ করতে পারবে ।


সবরের ফজিলতে মনীষীগণের উক্তি—

বহু মনীষীগণের উক্তি দ্বারাও সবরের ফযীলত প্রমাণিত হয়। খলীফা হযরত উমর (রাঃ) আবু মূসা আশআরীকে যে পত্র লিখেন, তাতে একথাও লিখিত ছিল- সবরকে নিজের জন্যে অপরিহার্য করে নাও। মনে রেখ, সবর দু'প্রকার এবং একটি অপরটির চেয়ে উত্তম। 

বিপদে সবর করা ভাল কিন্তু তার চেয়ে উত্তম আল্লাহ তা'আলার বণ্টনে সবর করা। মনে রেখ, সবর ঈমানের মূল। কেননা, সর্বোত্তম নেকী হচ্ছে তাকওয়া, যা সবর দ্বারা অর্জিত হয়। হযরত আলী (রাঃ) বলেন :  চারটি স্তম্ভের উপর ঈমানের স্থায়িত্ব নির্ভরশীল —  একীন, সবর, জেহাদ ও ইনসাফ। 


তিনি আরও বলেন ? ঈমানের সাথে সবরের সম্পর্ক দেহের সাথে মস্তিষ্কের সম্পর্কের অনুরূপ। সুতরাং মস্তিষ্ক ছাড়া যেমন দেহ কল্পনা করা যায় না, তেমনি যার সবর নেই, তার ঈমান আছে বলা যায় না।

(পরবর্তী পর্ব– সবরের স্বরূপ)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...