রবিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৩

অপ্রিয় বাক্য শ্রবণকারীর কর্তব্য

 

ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ৬)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
অপ্রিয় বাক্য শ্রবণকারীর কর্তব্য

কাহারও অত্যাচার বা অপ্রিয় বাক্যের উত্তর না দিয়া নীরব থাকাই উত্তম। কিন্তু এইরূপ স্থলে নীরব থাকা ওয়াজিব নহে। কিন্তু প্রত্যেক কথার জওয়াব দিবারও অনুমতি নাই। গালির পরিবর্তে গালি দেওয়া এবং গীবতের পরিবর্তে গীবত করা জায়েয নহে। কেননা, এই সমস্ত কারণে শরীয়তের শাস্তি বিধান অপরাধীর উপর ওয়াজিব হইয়া পড়ে। কিন্তু কটু বাক্যের উত্তরে এমন কটুবাক্য বলার অনুমতি আছে যাহাতে মিথ্যার লেশমাত্রও নাই। ইহা কেছাছ সদৃশ্য। (অপরাধ প্রবণতা নিবারণের উদ্দেশ্যে তুল্য পরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণ ও যথাবিহিত শাস্তির বিধানকে কেছাছ বলে)।


রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন- 

>“যে দোষ তোমার মধ্যে আছে ইহার উল্লেখ করিয়া তোমাকে কেহ গালি দিলে তাহার দোষ উল্লেখ করত উত্তর দিও না।” 

কিন্তু এই হাদীসের নির্দেশ অনুসারে গালি বা ব্যভিচার সম্বন্ধে কোন বিষয়ের উল্লেখ না হইলে ঐ ব্যক্তির উত্তর না দিয়া বিরত থাকা ওয়াজিব নহে। ইহার প্রমাণ এই যে, রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন-

>“পরস্পর ঝগড়ার সময় যাহা বলা হইয়া থাকে ইহার পাপ অত্যাচারিত ব্যক্তি সীমা অতিক্রম না করা পর্যন্ত আরম্ভকারীর উপর থাকে।”


হযরত আয়েশা রদিয়াল্লাহু আন্হা বলেন- “রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আমাকে অধিক ভালবাসেন এবং আমার প্রতি তাঁহার আসক্তি অত্যধিক বলিয়া আমার সপত্নীগণ হযরত ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আন্হাকে হযরত (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট নিবেদন করিয়া বলিয়া পাঠান যেন তিনি সকলকে তুল্যরূপে ভালবাসেন। হযরত ফাতিমা রদিয়াল্লাহু আন্হা আসিয়া হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-কে নিদ্রিত দেখিতে পাইলেন। তিনি জাগ্রত হইলে হযরত ফাতিমা রদিয়াল্লাহু আন্হা তাঁহাকে নিবেদন জানাইলেন। হযরত (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আবার বলিলেন- 'আমি আয়েশাকে অত্যন্ত ভালবাসি, তোমরাও তাহাকে তদ্রূপ ভালবাস।' হযরত ফাতিমা রদিয়াল্লাহু আন্হা প্রত্যাবর্তন করিয়া আমার সপত্নীদিগকে সমস্ত কথা জানাইলেন, কিন্তু তাঁহারা ইহাতে সন্তুষ্ট হইলেন না। আমার অপর সপত্নী হযরত যয়নব রদিয়াল্লাহু আন্হাকে সকলে মিলিয়া হযরত (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট পাঠাইলেন। তাঁহাকে হযরত আমার সমান ভালবাসিতেন বলিয়া তিনি দাবি করিতেন। তিনি (হযরত যয়নব) আসিয়াই অপ্রিয় বাক্যে বলিতে আরম্ভ করিলেন- 'আবূ বকরের কন্যা এইরূপ, আবূ বকরের কন্যা ঐরূপ।' আমি চুপ ছিলাম। তৎপর রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) জওয়াব দিবার জন্য আমাকে অনুমতি দিলেন। অনুমতি লাভ করিয়া আমিও ঐ প্রকার অপ্রিয় বাক্যে জওয়াব দিতে লাগিলাম। জওয়াব দিতে আমার মুখ শুষ্ক হইয়া গেল। অনন্তর তিনি (হযরত যয়নব) পরাজিত হইলেন। রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) তখন বলিলেন- “হে যয়নব, তিনিই আবূ বকরের কন্যা।” অর্থাৎ তর্ক-বিতর্কে তুমি তাঁহাকে পরাস্ত করিতে পারিবে না। উল্লিখিত ঘটনা হইতে প্রমাণিত হয় যে, মিথ্যা না হইয়া সত্য হইলে অপ্রিয় কথায় উত্তর দিবার অনুমতি আছে; যেমন- হে নির্বোধ, হে জাহিল, লজ্জা কর, নীরব থাক, প্রভৃতি। এইরূপ বাক্য কটু হইলেও অসত্য নহে। কারণ, কেহই একেবারে নির্বুদ্ধিতা ও অজ্ঞতাশূন্য হইতে পারে না। কিন্তু অশ্লীল কথা যেন রসনা হইতে বাহির না হয় তজ্জন্য ক্রোধের সময় বিশেষ প্রয়োজন হইলে এমন কথা বলিবার অভ্যাস করিবে যাহা নিতান্ত জঘন্য নহে; যেমন হতভাগ্য, অপদার্থ, অসভ্য, গাধা ইত্যাদি।

তবে ঝগড়া-বিবাদকালে উত্তর দিলে ন্যায়ের গণ্ডির ভিতর থাকা নিতান্ত দুষ্কর। এইজন্য উত্তর না দিয়া নীরবতা অবলম্বন করাই উত্তম।


রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) উনার সম্মুখে এক ব্যক্তি হযরত আবূ বকর রদিয়াল্লাহু আনহুকে অপ্রিয় বাক্য বলিতে লাগিল। কিন্তু তিনি নীরব ছিলেন। তিনি অবশেষে উত্তর দিতে আরম্ভ করিলে রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) উঠিয়া দাঁড়াইলেন। হযরত আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) নিবেদন করিলেন- “ওগো আল্লাহর রাসূল, এতক্ষণ ত আপনি বসিয়া ছিলেন, কিন্তু আমি উত্তর দিতে আরম্ভ করিতেই আপনি গাত্রোখান করিলেন?” তিনি বলিলেন-

>“তুমি নীরব থাকা পর্যন্ত ফেরেশতাগণ তোমার পক্ষ হইতে জওয়াব দিতেছিল। (তুমি জওয়াব দিতে আরম্ভ করিলে) শয়তান আগমন করিল। শয়তানের সহিত উপবেশন করাকে আমি ঘৃণা করি।"

রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন- 

>“আল্লাহ্ বিভিন্ন ধাতে মানব সৃষ্টি করিয়াছেন। কতক লোক এরূপ যে, তাহারা বিলম্বে ক্রুদ্ধ হয় ও বিলম্বে শান্ত হয়, কতক লোক ইহার বিপরীত, তাড়াতাড়ি ক্ষুদ্ধ হয় এবং তাড়াতাড়ি শান্ত হয়। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে বিলম্বে ক্ষুদ্ধ হয় এবং তাড়াতাড়ি শান্ত হয়। আর তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি নিকৃষ্ট যে তাড়াতাড়ি ক্রুদ্ধ হয়, কিন্তু বিলম্বে শান্ত হইয়া থাকে।”



পরবর্তী পর্ব

গুপ্ত ক্রোধের আপদ এবং বিদ্বেষজাত মনোভাব

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...