রবিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৩

ক্রোধ-উপশমমূলক উপায়



ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ৫)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ক্রোধ-উপশমমূলক উপায়

ক্রোধের মূল কারণসমূহ উৎপাটনের জন্য উল্লিখিত ব্যবস্থা জোলাপ সদৃশ। উহা অবলম্বনেও ক্রোধের মূলোৎপাটন করিতে না পারিলে ক্রোধ উত্তেজিত হইয়া উঠিলেই তৎক্ষণাত শান্ত করা আবশ্যক। এইজন্য এক প্রকার মবরাম্ল শরবত তাহাকে পান করিতে হইবে। ইহা নম্রতার মাধুর্য ও সহিষ্ণুতার অম্লত্বের মিশ্রণে প্রস্তুত হইয়া থাকে। আর ইলম ও আমলের সহযোগে একই মাজন প্রস্তুত করিলে, ইহা সকল কুস্বভাবের মহৌষধ হইয়া থাকে।


ক্রোধ-প্রতিষেধকরূপে ইলম

ক্রোধের অনিষ্টকারিতা ও ইহা নিবারণের সওয়াব সম্পর্কে কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের উক্তিসমূহ বুঝিয়া হৃদয়ঙ্গম করিয়া লইবে। ইহাই ক্রোধ প্রতিষেধক জ্ঞানমূলক উপায়। এইরূপ কতিপয় উক্তি উপরে বর্ণিত হইয়াছে। তৎপর ভাবিবে, অন্যের উপর তোমার যতটুকু ক্ষমতা রহিয়াছে, এই তুলনায় তোমার উপর আল্লাহর ক্ষমতা অনন্ত ও অসীম। তুমি ক্রোধে উত্তেজিত হইয়া অপরের কতটুকু ক্ষতি করিতে পারিবে? আল্লাহ্ তোমার ক্ষতি অনায়াসে অতি সহজে করিতে পারেন। অদ্য তুমি কাহারও উপর ক্রুদ্ধ হইলে কিয়ামতের দিন আল্লাহর ক্রোধ হইতে তুমি কিরূপে রক্ষা পাইবে?


একদা রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এক ভৃত্যকে কোন কাজ উপলক্ষে পাঠাইলেন। ভৃত্য অত্যন্ত বিলম্বে ফিরিয়া আসিলে তিনি তাহাকে বলিলেন 

>“শেষ বিচার দিবস না থাকিলে আমি তোমাকে প্রহার করিতাম।” 

ইহা বলিবার পরই তিনি নিজকে সম্বোধন করিয়া মনে মনে বলিতে লাগিলেন- “তোমার কাজটি যেরূপে সম্পন্ন করা আল্লাহর ইচ্ছা ছিল, ঠিক সেইরূপে সম্পন্ন হইয়াছে; তোমার অভিপ্রায় অনুযায়ী হয় নাই, ইহাই কি তোমার ক্রোধের কারণ? তাহা হইলে ত আল্লাহর প্রভুত্বের বিরুদ্ধে ঝগড়া করা হইল!”


প্রিয় পাঠক, উল্লিখিত পারলৌকিক কারণেও ক্রোধ দমন না হইলে স্বয়ং সাংসারিক যুক্তি অবলম্বনে মনে মনে চিন্তা করিবে; তুমি উত্তেজিত হইলে প্রতিপক্ষও উত্তেজিত হইয়া তোমা হইতে প্রতিশোধ গ্রহণ করিতে পারে। শত্রুকে অবহেলা করা সমীচীন নহে। আরও মনে কর, কোন দাস বা দাসী ঠিকভাবে কর্তব্য পালন করে না, আবার কখন কখনও পলায়ন করে। ক্রোধের বশবর্তী হইয়া তাহাকে তিরস্কার করিলে সে ছলনা ও প্রতারণা করিতে পারে। আর ক্রোধের সময় মানুষ কিরূপ জঘণ্য মূর্তি ধারণ করে, ইহাও একবার স্মরণ কর। তখন তাহার বাহ্য আকার পরিবর্তিত হইয়া কুশ্রী ও কদর্য হইয়া পড়ে। সেই মূর্তি দর্শনে মনে হয় যেন, উত্তেজিত ব্যাঘ্র কোন জন্তুকে আক্রমণের উপক্রম করিয়াছে। ক্রোধের সময় মানুষের বাহ্য আকারে যেরূপ পরিবর্তন দেখা যায়, তাহার আন্তরিক অবস্থারও তদ্রূপ পরিবর্তন ঘটিয়া থাকে। তখন মনে হয় যেন তাহার ভিতরে আগুন জ্বলিতেছে। ক্রোধের সময় সে ক্ষুধিত কুকুরের ন্যায় হইয়া থাকে।

কেহ ক্রোধ দমন করিতে চাহিলে অধিকাংশ সময় শয়তান তাহাকে প্ররোচণা দিয়া বলে- “ক্রোধ দমন করিলে তোমার দুর্বলতা প্রকাশ পাইবে, অপমান হইবে, প্রভাব-প্রতিপত্তি হ্রাস পাইবে এবং লোকচক্ষে তুমি হেয় বলিয়া প্রতিপন্ন হইবে।” তখন শয়তানকে এইরূপ উত্তর দিয়া নিরস্ত করিবে- “নবীগণের (আঃ) সৎস্বভাব অর্জন এবং আল্লাহর সন্তোষ লাভে সমর্থ হইলে যে সম্মানের অধিকারী হওয়া যায়, সংসারে তদপেক্ষা অধিক সম্মানের আর কিছুই হইতে পারে না। কাহারও উপর ক্রুদ্ধ হওয়ার ফলে কল্য কিয়ামতের দিন হেয় ও তুচ্ছ হওয়া অপেক্ষা অদ্য ক্ষণস্থায়ী সংসারে হেয় ও তুচ্ছ হওয়া আমার পক্ষে উত্তম।”


ক্রোধ প্রতিষেধক জ্ঞানমূলক উপায় বর্ণনা করিতে যাইয়া উপরে কতিপয় উপমার অবতারণা করা হইল। তদ্রূপ আরও দৃষ্টান্ত তোমরা নিজে নিজেই বুঝিয়া লইবে। 


ক্রোধ প্রতিষেধক আমল 


ক্রোধের সময় বলিবে

>(আউযুবিল্লাহ্ মিনাশ-শায়তানির রাযিম)

“বিতাড়িত শয়তান হইতে আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করিতেছি।” তুমি দণ্ডায়মান থাকিলে বসিয়া পড়িবে, আর বসিয়া থাকিলে শয়ন করিবে। ইহা সুন্নত। ইহাতেও ক্রোধ দমন না হইলে ঠাণ্ডা পানি দ্বারা ওযু করিবে। কেননা, রাসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন- 

>“ক্রোধ আগুন হইতে জন্মে, পানিতে ইহা দমন হয়।” 

হাদীস শরীফে উক্ত আছে- 

>“(ক্রোধের সময়) কপাল মাটিতে রাখিয়া সিজদা করিবে এবং মনে করিবে যে, তুমি মাটি হইতে সৃষ্ট, আল্লাহর নগণ্য দাস। (মাটি হইতে সৃষ্ট দাসকে মাটির ন্যায় সহিষ্ণু হওয়া আবশ্যক)। এইরূপ দাসের পক্ষে ক্রোধ শোভা পায় না।”


একদা হযরত ওমর রদিয়াল্লাহু আন্হু ক্রুদ্ধ হইলে নাকে দিবার জন্য পানি চাহিয়া বলিলেন- 

>“ক্রোধ শয়তান হইতে আসে, নাকে পানি দিলে চলিয়া যায়।” 


হযরত আবূ যর রদিয়াল্লাহু আন্হু একদা এক ব্যক্তিকে বলিলেন- 

“ইয়া ইব্‌নাল হামরা”। অর্থাৎ হে লোহিত জননীর পুত্র। এইরূপ আহ্বানে ইহাই প্রকাশ পাইল যে, ঐ ব্যক্তি দাসীর পুত্র। তৎপর রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলিলেন- “হে আবূ যর, আমি শুনিলাম, তুমি অদ্য এক ব্যক্তিকে তাহার মাতার সম্বন্ধে উল্লেখ করিয়া দোষারোপ করিয়াছ। হে আবূ যর, জানিয়া রাখ, 

>"পরহেযগারীতে অধিক না হইলে তুমি কোন কৃষ্ণ বা লোহিত মানুষ অপেক্ষা উৎকৃষ্ট নও।” 

হযরত আবূ যর রদিয়াল্লাহু আন্হু ইহা শুনিয়া ক্ষমা প্রার্থনার উদ্দেশ্যে ঐ ব্যক্তির নিকট গমন করিলেন। সেই ব্যক্তি সহাস্য বদনে তাঁহার সম্মুখে আসিয়া সালাম দিলেন।


হযরত আয়েশা রদিয়াল্লাহু আন্হা ক্রুব্ধ হইলে রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) তাঁহার নাসিকা মুবারক ধারণপূর্বক বলিতেন- হে আয়েশা, বল-


اللَّهُم رَبِ النَّبِيِّ مُحَمَّدٍ - اغْفِرْ لِي ذَنْبِي وَأَذْهِبْ غَيْظَ قَلْبِي وَأَجِرْنِي مِنْ مُضَلاتِ الْفِتْنِ

>“হে আল্লাহ, আমার নবী মুহাম্মদের  (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) প্রভু, আমার গোনাহ্ মা'ফ করুন, অন্তরের ক্রোধ দূর করিয়া দিন এবং আমাকে পথ-ভ্রান্তির বিপদাপদ হইতে রক্ষা করুন।” ক্রোধের সময় এই দোয়া পাঠ করাও সুন্নত। 

[এখানে শিক্ষনীয় যে আল্লাহ্ তা'আলাকে মুহম্মদের রব সম্বোধন করা নবী (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)  উনার শিক্ষা ।দোয়ার পূর্বে  যেমন বলা "ইয়া রব্বি মুস্তফা" বিশেষ মর্যাদার উপমা]



অপ্রিয় বাক্য শ্রবণকারীর কর্তব্য

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...