এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
এলহামের ক্ষেত্রে সুফী ও আলেমের পার্থক্য--
জানা উচিত, যে জ্ঞান শিক্ষালব্ধ নয়; বরং কখনও কখনও অন্তরে জাগরিত হয়ে যায়, তাকে এলহাম বলা হয়। এই জ্ঞান কয়েক প্রকারে অন্তরে জাগরিত হয়। কখনও মনে হয়, কেউ অজ্ঞাতে অন্তরে ঢেলে দিয়েছে এবং কখনও শিক্ষার পদ্ধতিতে অর্জিত হয়। প্রথম প্রকারকে ‘নফখ ফিল কলব' এবং দ্বিতীয় প্রকারকে ‘এতেবার' ও ‘এস্তেবসার' আখ্যা দেয়া হয়। এলহাম কখনও এমনভাবে হয় যে, বান্দা বুঝতেও পারে না, এই জ্ঞান কোথা থেকে কিভাবে অর্জিত হল। এটা আলেম ও সুফীগণের জন্যে হয়। আবার কখনও জ্ঞান লাভের পন্থা পদ্ধতি বান্দার জানা হয়ে যায়। অর্থাৎ যে ফেরেশতা অন্তরে জ্ঞান ঢেলে দেয়, সে বান্দার দৃষ্টিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। এই প্রকার এলহামকে ওহী বলা হয়। এটা পয়গম্বরগণের বৈশিষ্ট্য। যে জ্ঞান উপার্জন ও প্রমাণের মাধ্যমে হাসিল হয়, তা আলেমগণের জ্ঞান।
সত্য হচ্ছে, সকল বিষয়ের মধ্যে সত্যকে জেনে নেয়ার যোগ্যতা অন্তরের রয়েছে, কিন্তু পূর্বোল্লিখিত পাঁচটি কারণই এতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই পাঁচটি কারণ যেন অন্তররূপী আয়না ও লওহে মাহফুযের মধ্যে আড়াল হয়ে যায়। লওহে মাহফুয এমন একটি সংরক্ষিত ফলক, যাতে কেয়ামত পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য সকল বিষয় চিত্রিত আছে। এই ফলক থেকে অন্তরের উপর জ্ঞান প্রতিফলিত হওয়া এমন, যেমন এক আয়নার প্রতিচ্ছবি অন্য আয়নায় দৃষ্টিগোচর হয়। উভয় আয়নার মধ্যবর্তী আড়াল যেমন কখনও হাতে সরিয়ে দেয়া হয় এবং কখনও আপনা-আপনি বাতাসের চাপে সরে যায়, তেমনি মাঝে মাঝে খোদায়ী কৃপার সমীরণ প্রবাহিত হয় এবং অন্তশ্চক্ষুর সামনে থেকে পর্দা সরে যায়। ফলে লওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ কতক বিষয় দৃষ্টিগোচর হয়। এটা কখনও স্বপ্নে হয়। এতে ভবিষ্যতের অবস্থা জানা হয়ে যায়। সম্পূর্ণ পর্দা সরে যাওয়া মৃত্যুর পরই সম্ভবপর। মাঝে মাঝে জাগ্রত অবস্থায়ও পর্দা সরে যায় এবং সাথে সাথে অদৃশ্য যবনিকার অন্তরাল থেকে বিস্ময়কর জ্ঞানের বিষয়াদি অন্তরে উন্মোচিত হয়ে যায়। এই উন্মোচন ক্ষণস্থায়ী হয়ে থাকে এবং এর স্থায়িত্ব খুবই বিরল। সারকথা, অন্তরে জ্ঞান এলহাম হওয়া ও জ্ঞানার্জন করা এতদুভয়ের মধ্যে কেবল পর্দা সরে যাওয়ার পার্থক্য আছে। এছাড়া পাত্র ও কারণের মধ্যে কোন তফাৎ নেই। পর্দা সরে যাওয়াটা বান্দার এখতিয়ারে নেই। এমনিভাবে ওহী ও এলহামের মধ্যে এছাড়া কোন তফাৎ নেই যে, ওহীর মধ্যে জ্ঞানের মাধ্যম অর্থাৎ, ফেরেশতা দৃষ্টিগোচর হয় এবং এলহামে দৃষ্টিগোচর হয় না, কিন্তু অর্জিত হয় ফেরেশতার মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলা বলেন, “কোন মানুষের সাধ্য নেই যে, আল্লাহ তা'লার সাথে কথা বলবেন, কিন্তু ওহীর মাধ্যমে অথবা পর্দার আড়াল থেকে অথবা কোন বার্তাবাহক প্রেরণের মাধ্যমে, যে তাঁর নির্দেশে তিনি যা চান পৌঁছে দেবে।
এখন জানা উচিত, সুফী সম্প্রদায় এলহামী জ্ঞানের প্রতি উৎসাহী হয়ে থাকেন- শিক্ষালব্ধ জ্ঞানের প্রতি নয়। এ কারণেই তারা গ্রন্থকারদের লেখা গ্রন্থসমূহ পাঠ করেন না এবং উক্তি ও প্রমাণাদি নিয়ে আলোচনা করেন না। তারা বলেন: প্রথমে খুব সাধনা করা উচিত এবং কুস্বভাব ও যাবতীয় সাংসারিক সম্পর্ক ছিন্ন করে কায়মনোবাক্যে সর্বপ্রযত্নে আল্লাহ তাআলার দিকে মনোনিবেশ করা দরকার। এটা অর্জিত হয়ে গেলে আল্লাহ তাআলা স্বয়ং বান্দার অন্তরের কার্যনির্বাহী ও যিম্মাদার হয়ে যাবেন। তিনি যিম্মাদার হয়ে গেলে বান্দার প্রতি রহমত ছায়াপাত করবে এবং অন্তরে নূর চমকাতে থাকবে। ফলে ঊর্ধ্ব জগতের রহস্য তার সামনে উন্মোচিত হয়ে যাবে। অন্তরের সামনে থেকে আড়াল দূর হয়ে যাবে এবং খোদায়ী বিষয়াদির সত্যাসত্য উজ্জ্বল হয়ে দেখা দেবে। এ বক্তব্য অনুযায়ী বান্দার কাজ এতটুকু যে, সে কেবল আত্মশুদ্ধি করবে এবং খাঁটি ইচ্ছা সহকারে খোদায়ী রহমতে জ্ঞানোন্মেষের জন্যে অপেক্ষমাণ ও পিপাসার্ত থাকবে। এভাবে পয়গম্বর ও ওলীগণের সামনে সত্য উদ্ঘাটিত হয়ে অন্তর নূরানী হয়ে যায়। এটা লেখাপড়া ও গ্রন্থ পাঠ দ্বারা হয় না। কারণ, যে আল্লাহর হয়ে যায়, আল্লাহ তার হয়ে যান।
যাহেরী আলেমগণ জ্ঞানলাভের উপরোক্ত পদ্ধতি অস্বীকার করেন না। তারা স্বীকার করেন যে, বিরল হলেও এভাবে মনযিলে মকসুদ পর্যন্ত পৌছা যায় । কেননা, অধিকাংশ নবী ও ওলীর অবস্থা তাই হয়, কিন্তু তাঁরা বলেন, এ পদ্ধতি অত্যন্ত কঠিন এবং এর ফলাফল বিলম্বে পাওয়া যায়। এর জন্যে যে সকল শর্ত রয়েছে, সেগুলো অর্জন করাও খুবই দূরূহ ব্যাপার । কেননা, যারতীয় সম্পর্ক এমনভাবে ছিন্ন করা এক রকম অসম্ভব । যদি ছিন্ন হয়েও যায়, তবে তা অব্যাহত থাকা আরও বেশী কঠিন। কেননা, সামান্য কুমন্ত্রণা ও শংকার কারণে অন্তর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন,-
“মুমিনের অন্তর ফুটন্ত পানির চেয়েও অধিক স্ফুটিত হতে থাকে। এছাড়া এই সাধনায় কখনও মেযাজ বিগড়ে যায়, মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে এবং স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যায়। পূর্ব থেকে জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে মনকে সুসংযত করে না নিলে অন্তরে নানাবিধ ক্ষতিকর চিন্তা এসে ভিড় জমায় । এগুলো দূর না করা পর্যন্ত মন এগুলোতেই লিপ্ত থাকে, অথচ সারা জীবনেও এগুলোর সমাধান হয় না। এ পথে চলেছেন, এমন অনেক সুফী একই চিন্তায় বিশ বছর পর্যন্ত জড়িয়ে রয়েছেন। পূর্ব থেকে জ্ঞানার্জন করে নিলে এ ধরনের চিন্তার সমাধান তাঁরা তৎক্ষণাৎ পেয়ে যেতেন। এ থেকে জানা যায়, জ্ঞানার্জনে ব্রতী হওয়ার পদ্ধতিই নির্ভরযোগ্য এবং উদ্দেশ্যের অধিক অনুকূল। আলেমগণ বলেন, সুফী সম্প্রদায় এমন, যেমন কোন ব্যক্তি ফেকাহ শেখে না এবং বলে যে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম) ফেকাহ শেখেননি। তিনি ওহী ও এলহামের মাধ্যমে ফকীহ হয়েছিলেন। সুতরাং আমিও সদা সর্বদা সাধনা করে করে ফকীহ হয়ে যাব। যে কেউ এরূপ চিন্তা করে, সে নিজের উপর যুলুম করে এবং মূল্যবান জীবন বিনষ্ট করে। অতএব প্রথমে জ্ঞানার্জন ও আলেমগণের বাণীর অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা উচিত। এর পর প্রতীক্ষায় থাকবে যে, যা অন্য আলেমগণের জানা নেই, তা যেন সে জেনে নেয়। সম্ভবত সাধনার পরে এটি অর্জিত হয়ে যাবে।
পরবর্তী পর্ব-

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন