বুধবার, ৫ জুলাই, ২০২৩

অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ১০) বিভিধ জ্ঞানে অন্তরের অবস্থা


অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ১০) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যৌক্তিক, ধর্মিয়, জাগতিক ও পারলৌকিক জ্ঞানে অন্তরের অবস্থা —
পূর্বে বর্ণিত হয়েছে, অন্তর স্বভাবগতভাবে জ্ঞাতব্য বিষয়াদি গ্রহণে তৎপর। এখন বলা হচ্ছে, যেসব জ্ঞান অন্তরে আসে, সেগুলো দু'প্রকার যুক্তিগত ও শরীয়তগত। 

যুক্তিগত জ্ঞানও দু'প্রকার- এক, যা শিক্ষালব্ধ নয় এবং দুই, যা শিক্ষালব্ধ। 

যে জ্ঞান শিক্ষালব্ধ তাও দু'প্রকার- জাগতিক ও পারলৌকিক। যুক্তিগত জ্ঞান বলে আমাদের উদ্দেশ্য এমন জ্ঞান, যার কারণ নিছক যুক্তি- অনুকরণ ও শ্রবণ নয়। এর মধ্যে সেই জ্ঞান শিক্ষালব্ধ নয়, যাতে জানা যায় না যে, এই জ্ঞান কোথা থেকে এবং কিভাবে অর্জিত হয়েছে? উদাহরণতঃ এটা জানা যে, এক ব্যক্তি একই সময় দুটি গৃহে থাকতে পারে না এবং একই বস্তু নশ্বর, অবিনশ্বর কিংবা উপস্থিত ও অনুপস্থিত একই সাথে হতে পারে না। এ জ্ঞান মানুষ শৈশবকাল থেকে অর্জন করে, কিন্তু সে জানে না, দু'গৃহে থাকা এটা কখন এবং কিভাবে অর্জিত হয়েছে? অর্থাৎ, এর কোন বাহ্যিক ও নিকটবর্তী কারণ জানে না। নতুবা আল্লাহর পক্ষ থেকে যে এসেছে, এটা জানে। 

আর শিক্ষালব্ধ জ্ঞান হচ্ছে, যাতে শিক্ষা ও প্রমাণ করার প্রয়োজন আছে। এই উভয় প্রকারকে ‘আকল' বলা হয়। হযরত আলী (রাঃ) বলেন : আকল দু'প্রকার স্বভাবগত ও শ্রবণগত। স্বভাবগত আকল ব্যতীত শ্রবণগত আকলের কোন উপকার নেই; যেমন সূর্যকিরণ দ্বারা অন্ধের কোন উপকার হয় না।


রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এক হাদীসে বলেন :

“আল্লাহ তাআলা আকল অপেক্ষা অধিক মহৎ কোন কিছু সৃষ্টি করেননি।” এখানে প্রথম প্রকার আকল বুঝানো হয়েছে।

অন্য এক হাদীসে তিনি বলেন :

“যখন মানুষ নানা প্রকার পুণ্য কাজ দ্বারা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করে, তখন তুমি আপন আকল দ্বারা নৈকট্য লাভ কর।”

এখানে দ্বিতীয় প্রকার আকল বুঝানো হয়েছে। কেননা, আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্যে শিক্ষালব্ধ জ্ঞান দরকার। মোট কথা, অন্তরকে মনে করতে হবে চক্ষু এবং স্বভাবগত আকলকে বুঝতে হবে দৃষ্টিশক্তিরূপে। দৃষ্টিশক্তি অন্ধের মধ্যে থাকে না, চক্ষুষ্মান ব্যক্তির মধ্যে থাকে, যদিও সে তার চক্ষু বন্ধ করে নেয় অথবা অন্ধকার রাত্রে থাকে। যে কলম দ্বারা আল্লাহ তাআলার জানা বিষয় অন্তরে মুদ্রিত করে, তাকে সূর্যের গোল পরিমণ্ডল মনে করা উচিত। শৈশবে জ্ঞান অর্জিত না হওয়ার কারণ এটাই যে, তখন পর্যন্ত মানসপটে জ্ঞান চিত্রিত করার যোগ্যতা থাকে না। “কলম” বলে আমাদের উদ্দেশ্য আল্লাহর সৃজিত এমন একটি বস্তু, যদ্দ্বারা অন্তরে জ্ঞানের চিত্র আকাঁ হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন “তিনি কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে এমন বিষয় শিখিয়েছেন, যা সে জানত না।”

আল্লাহ তাআলার কলম আমাদের কলমের মত নয়। যেমন- তাঁর গুণাবলী সৃষ্টির গুণাবলী থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

মোট কথা, অন্তশ্চক্ষু ও চর্মচক্ষুর মধ্যে উপরোক্ত বিষয়সমূহে মিল আছে, কিন্তু সম্মান ও মর্যাদায় কোন মিল নেই। এ মিলের কারণেই আল্লাহ তাআলা অন্তরের উপলব্ধিকে দেখা বলে ব্যক্ত করে বলেছেন : “অন্তর যা দেখেছে, তা মিথ্যা দেখেনি।”

আরও বলা হয়েছে : “এমনিভাবে আমি ইবরাহীমকে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর রাজত্ব দেখাতে থাকি।”

এ আয়াতে আত্মোপলব্ধিকে দেখা বলে প্রকাশ করা হয়েছে। এমনিভাবে নিম্নের আয়াতসমূহে উপলদ্ধির বিপরীত বিষয়কে অন্ধত্ব বলা হয়েছেঃ নিশ্চয় চক্ষু অন্ধ হয় না। তবে বক্ষস্থিত অন্তর অন্ধ হয়। যে এ জগতে অন্ধ থাকে, সে পরকালেও অন্ধ থাকবে। এ পর্যন্ত যৌক্তিক জ্ঞানের কথা বর্ণিত হল। 


এক্ষণে ধর্মীয় জ্ঞানের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। ধর্মীয় জ্ঞান পয়গম্বরগণের অনুসরণ তখা আল্লাহর কিতাব ও রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর হাদীস শিক্ষা করার মাধ্যমে অর্জিত হয়। এর মাধ্যমেই অন্তরগত গুণাবলী পূর্ণরূপে বিকাশ লাভ করে এবং অন্তরগত রোগ-ব্যাধি ও ব্যথার উপশম ঘটে। যৌক্তিক জ্ঞানের প্রয়োজন থাকলেও সেটা অন্তরের নিরাপত্তার জন্যে যথেষ্ট নয়। কেননা, কোরআন ও হাদীসের বিষয়সমূহ আপনা আপনি আকল তথা যুক্তি-প্রমাণ দ্বারা জানা যায় না, কিন্তু শ্রবণের পর যথাযথ বুঝার জন্যে আকলের প্রয়োজন হয়। এ থেকে প্রমাণিত হল, শ্রবণ ছাড়া আকলের উপায় নেই এবং আকল থেকে শ্রবণের পলায়নের পথ নেই। যেব্যক্তি কেবল তাকলীদ তথা অনুসরণই করে যায় এবং আকলকে শিকায় তুলে রাখে, সে মূর্খ। 

অনুরূপভাবে যে কেবল আকলকেই যথেষ্ট মনে করে এবং কোরআন ও হাদীসের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করে না, সে উদ্ধৃত। অতএব উভয়বিধ জ্ঞান অর্জন করা উচিত। 

কেননা, যৌক্তিক জ্ঞান খাদ্যের মত এবং শরীয়তের জ্ঞান ওষুধের অনুরূপ। রুগ্ন ব্যক্তি যদি ওষুধ না খায়, তবে কেবল খাদ্য খেয়ে তার রোগ দূর হবে না। এমনিভাবে অন্তরের রোগসমূহের চিকিৎসা সেসব ভেষজ দ্বারা হতে পারে, যা শরীয়তের হাসপাতালে পাওয়া যায় । অর্থাৎ, ওযীফা, এবাদত ও সৎকর্ম। সুতরাং যেব্যক্তি তার রোগাক্রান্ত অন্তরের চিকিৎসা এবাদত দ্বারা করবে না সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যেমন সেই রুগীর ক্ষতি হয়, যে ওষুধ না খেয়ে কেবল খাদ্য খেতে থাকে।


যারা বলে, যৌক্তিক জ্ঞান শরীয়তের জ্ঞানের বিপরীত, কাজেই উভয়বিধ জ্ঞান অর্জন করা সম্ভবপর নয়, তারা অজ্ঞতার কারণে এ কথা বলে। তারা অন্তশ্চক্ষুর নূর থেকে বঞ্চিত। বরং তাদের দৃষ্টিতে শরীয়তের কতক জ্ঞানও পরস্পর বিরোধী প্রতিভাত হয়ে থাকে। তারা এগুলোর সমন্বয় সাধনে ব্যর্থ হয়ে ধারণা করতে থাকে যে, শরীয়তই ত্রুটিপূর্ণ। অথচ এরূপ মনে হওয়ার কারণ হচ্ছে তাদের নিজেদের অক্ষমতা। উদাহরণতঃ জনৈক অন্ধ ব্যক্তি কারও গৃহে প্রবেশ করার পর ঘটনাক্রমে বাসনকোসনের উপর তার পা পড়ে গেল। এতে সে বলতে লাগলঃ এ গৃহের লোকেরা কেমন যে, পথের মধ্যে বাসনকোসন রেখে দেয়। এগুলো যথাস্থানে রাখল না কেন? জওয়াবে গৃহের লোকেরা বলল : মিয়া সাহেব, বাসনকোসন তো যথাস্থানেই রাখা আছে, কিন্তু অন্ধত্বের কারণে আপনিই পথের দিশা পাননি। আশ্চর্যের বিষয়, আপনি নিজের ত্রুটি দেখলেন না, অপরের দোষ ধরতে শুরু করেছেন!


হাঁ, যৌক্তিক জ্ঞান ও শরীয়তের জ্ঞান এদিক দিয়ে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী, কেউ এগুলোর কোন একটিতে সর্বপ্রযত্নে মনোনিবেশ করলে অপরটি থেকে সে প্রায়শ গাফেল থেকে যায়। এ কারণেই হযরত আলী (রাঃ) দুনিয়া ও আখেরাতের তিনটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। এক উক্তিতে তিনি বলেন, দুনিয়া ও আখেরাত নিক্তির দু'পাল্লার মত। দ্বিতীয় উক্তি হচ্ছে, উভয়টি পূর্ব ও পশ্চিমের মত। তৃতীয় উক্তিতে বলেছেন- এরা দু'সতীনের মত। একটি রাজি হলে অপরটি নারাজ হয়ে যায়। এ কারণেই দেখা যায়, যারা দুনিয়ার বিষয়াদিতে খুব চালাক-চতুর হয়, তারা আখেরাতের ব্যাপারাদিতে মূর্খ থেকে যায়। পক্ষান্তরে যারা আখেরাতের সূক্ষ্ম বিষয়াদি সম্পর্কে পারদর্শী হয়, তারা প্রায়ই দুনিয়ার জ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞ হয়। কেননা, অধিকাংশ লোকের আকল-শক্তি উভয় বিষয় অর্জনে সক্ষম হয় না। একটি শিখলে অপরটিতে পূর্ণতা অর্জন করতে পারে না। এ কারণেই হাদীসে বলা হয়েছে- “অধিকাংশ জান্নাতী আত্মভোলা। অর্থাৎ দুনিয়ার বিষয় সম্পর্কে অচেতন।” হযরত হাসান বসরী (রহঃ) এক ওয়াযে বলেন : আমি এমন লোকদের সাক্ষাৎ লাভ করেছি, যাদেরকে তোমরা দেখলে পাগল বলতে এবং তারা তোমাদেরকে দেখলে শয়তান বলত। অতএব, কোন অভিনব ধর্মীয় বিষয়কে যদি যাহেরী আলেমগণ অস্বীকার করে, তবে তাদের ব্যাপারে সন্দেহ করা উচিত নয়; বরং বুঝা দরকার যে, কেউ পূর্ব দিকে গমন করে যেমন পশ্চিমের বস্তু পেতে পারে না, তাদের অস্বীকারও তেমনি। দুনিয়া ও আখেরাতের বিষয়ও এই পর্যায়ে পড়ে। আল্লাহ তা'আলা বলেন : 

“নিশ্চয় যারা আমার সাক্ষাৎ আশা করে না, পার্থিব জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে এবং তা দ্বারাই প্রশান্তি লাভ করে এবং যারা আমার নিদর্শনাবলী থেকে গাফেল।”


আরও বলা হয়েছে - “তারা পার্থিব জীবনের বাহ্যিক দিকটা জানে এবং তারা আখেরাতের খবর রাখে না।”

অন্য এক আয়াতে আছে - “অতএব সেই ব্যক্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন, যে আমার যিকিরের প্রতি বিমুখ হয়ে পার্থিব জীবনই কামনা করে। তাদের বিদ্যার দৌড় এ পর্যন্তই”।


মোট কথা, আল্লাহ তাআলা আপন কৃপায় যাদেরকে উভয় জাহানের জ্ঞান দান করেন, তারাই কেবল দুনিয়া ও আখেরাত সম্পর্কে পূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি লাভ করতে পারেন এবং তারা হলেন আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম। তাদের অন্তরে সকল বিষয়ের সংকুলান হয়ে থাকে।


পরের পর্ব

এলহামের ক্ষেত্র সুফী ও আলেমের পার্থক্য

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...