📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
কুমন্ত্রণার মাধ্যমে অন্তরের উপর শয়তানের প্রভাব বিস্তার
মানুষের অন্তরে একের পর এক যে সকল প্রভাব আসে, তার ফলে অন্তর পরিবর্তিত হতে থাকে, সেগুলোকে 'খাওয়াতির' বলা হয়। খাওয়াতির থেকে প্রবণতা এবং প্রবণতা থেকে সংকল্প, ইচ্ছা ও নিয়ত গতিশীল হয়। খাওয়াতির দু'প্রকার- শুভ ও অশুভ। অশুভ খাওয়াতিরের পরিণতি ক্ষতিকর হয় এবং শুভ খাওয়াতির দ্বারা আখেরাতে উপকার পাওয়া যায়। শুভ খাওয়াতিরকে এলহাম এবং অশুভ খাওয়াতিরকে ওয়াসত্তয়াসা তথা সন্দেহ, শংকা ও কুমন্ত্রণা বলা হয়। শুভ খাওয়াতিরের মূল কারণ ফেরেশতা এবং অশুভ খাওয়াতিরের মূল উদগাতা শয়তান। ফেরেশতা এমন এক মখলুককে বলা হয়, যাকে আল্লাহ তাআলা কল্যাণ ও জ্ঞান পৌছানো, সত্য কাশফ, মঙ্গলের ওয়াদা এবং সৎকাজের আদেশ করার জন্যে সৃষ্টি করেছেন। পক্ষান্তরে শয়তান এমন এক মখলুক, যার কাজ এর বিপরীত; অর্থাৎ অনিষ্টের ওয়াদা, অশ্লীল কাজের আদেশ এবং দান খয়রাতের সময় দারিদ্র্যের ভয় দেখানো ইত্যাদি। এ থেকে জানা গেল, কুমন্ত্রণার বিপরীত হচ্ছে এলহাম এবং শয়তানের বিপরীত ফেরেশতা। মানুষের অন্তর সদা-সর্বদা এই শয়তান ও ফেরেশতার টানাহেঁচড়ার মধ্যে অবস্থান করে। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে :
অন্তরে দু'ধরনের উঠানামা হয়। একটি ফেরেশতার তরফ থেকে। তার কাজ হল মঙ্গলের ওয়াদা প্রদান এবং সত্য বিষয়কে সত্য জানা। যে এটা অনুভব করে, তার জানা উচিত, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং তার কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। অপর উঠানামা শত্রু অর্থাৎ শয়তানের পক্ষ থেকে। তার কাজ হল অনিষ্টের ওয়াদা দেয়া এবং সত্যকে মিথ্যা মনে করা। যে এটা অনুভব করে, সে যেন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে।
এর পর রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এ আয়াতটি পাঠ করলেন : “শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ওয়াদা দেয় এবং অশ্লীল কাজের আদেশ করে।”
হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন : ইচ্ছা অন্তরের চারপাশে ঘুরাফেরা করে। এক প্রকার ইচ্ছা আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং এক প্রকার শত্রুর পক্ষ থেকে। অতএব আল্লাহ সেই বান্দার প্রতি রহম করুন, যে ইচ্ছা করার সময় বিরাম দেয়। যদি ইচ্ছাটি আল্লাহর পক্ষ থেকে জানে, তবে তা কার্যকর করে। আর যদি শত্রুর পক্ষ থেকে জানে, তবে তার সাথে যুদ্ধ করে। অন্তরের এই টানাহেঁচড়ার প্রতি নিম্নোক্ত হাদীসে ইশারা করা হয়েছে- “মুমিনের অন্তর আল্লাহ্ তাআলার দু'অঙ্গুলির ফাঁকে অবস্থান করে।”
কেননা, আল্লাহ্ তাআলা এ বিষয় থেকে মুক্ত ও পবিত্র যে, তাঁর অস্থি ও রক্তমাংসে গঠিত অঙ্গুলি হবে। বরং এর অর্থ হচ্ছে, মানুষ যেমন অঙ্গুলি দ্বারা দ্রুত কাজ করে এবং অপরের দ্রুততাকে অঙ্গুলি হেলিয়ে ব্যক্ত করে, তেমনি আল্লাহ তাআলা ফেরেশতা ও শয়তানকে কাজে লাগান। এরা উভয়ই অন্তর পরিবর্তনে মানুষের অঙ্গুলির মতই।
জন্মগতভাবেই অন্তরের মধ্যে ফেরেশতার প্রভাব ও শয়তানের প্রভাব কবুল করার যোগ্যতা সমান সমান। একটির অগ্রাধিকার অপরটির উপর নেই। হাঁ, কামপ্রবৃত্তির অনুসরণ ও বিরোধিতার মাধ্যমে একটি অপরটির উপর প্রবল হয়ে যায়। অর্থাৎ, মানুষ যদি কাম ও ক্রোধের দাবী অনুযায়ী কাজ করে, তবে শয়তান তার উপর প্রবল হয়ে যায়। তখন তার অন্তর শয়তানের আশ্রয়স্থল ও ঠিকানা হয়ে যায় কেননা, কামপ্রবৃত্তিই শয়তানের বিচরণ ক্ষেত্র।
পক্ষান্তরে যদি কেউ কামপ্রবৃত্তিকে পরাভূত করে ফেরেশতাসুলভ চরিত্র অবলম্বন করে, তবে তার অন্তর ফেরেশতাদের মনযিল ও বাসস্থান হয়ে যায়। যেহেতু মানুষের অন্তরে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ ইত্যাদি সকল প্রবৃত্তি বিদ্যমান আছে, তাই প্রত্যেক অন্তরে শয়তানেরও কুমন্ত্রণা দেয়ার অবকাশ আছে। এ কারণেই হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, “তোমাদের প্রত্যেকেরই একটি শয়তান আছে।” সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, আপনারও হে আল্লাহর রসূল? উত্তর হল : “আমারও, কিন্তু আমার শয়তান মুসলমান হয়ে গেছে। ফলে ভাল ছাড়া মন্দ আদেশ দেয় না।”
বলাবাহুল্য, কামপ্রবৃত্তির মাধ্যমেই শয়তান অন্তরে প্রভাব বিস্তার করে। অতএব আল্লাহ তাআলা যার প্রতি কৃপা করেন কামপ্রবৃত্তিকে তার এমন অনুগত করে দেন যে, উপযুক্ত সীমা ছাড়া তা প্রকাশ পায় না, তার কামপ্রবৃত্তি তাকে অনিষ্টের দিকে আহ্বান করে না, বরং শয়তান তাকে মঙ্গলের কথা ছাড়া কিছু বলে না। অন্তর যখন আল্লাহর যিকিরে মশগুল হয়, তখন শয়তান সুযোগ পায় না এবং চলে যায়। এ সময় ফেরেশতা তার কাজ করে। অন্তরে ফেরেশতা ও শয়তানের লশকরদের দ্বন্দ্ব সব সময় লেগেই থাকে, যে পর্যন্ত অন্তর এক লশকরের অনুগত না হয়ে যায়। যে লশকর বিজয়ী হয়, অন্তর তারই আবাসস্থল হয়ে যায়। অপর লশকরের আগমন হলেও তা সংঘর্ষের আকারে হয়ে থাকে।
কিন্তু অধিকাংশ অন্তরের অবস্থা হচ্ছে, শয়তানের লশকর তাদেরকে বিজিত ও বশীভূত করে নিয়েছে এবং তাদের মালিক হয়ে বসেছে। এরূপ অন্তর কুমন্ত্রণায় পরিপূর্ণ। তারা দুনিয়াকে আখেরাতের উপর অগ্রাধিকার দিয়ে রেখেছে। শয়তানের জোর কম না হওয়া পর্যন্ত এসব অন্তর ফেরেশতার বশীভূত হবে না।
শয়তানের জোর কম করার উপায় হচ্ছে, কামপ্রবৃত্তি ও খেয়ালখুশী থেকে অন্তরকে খালি করা এবং আল্লাহ্ যিকির দ্বারা তা পূর্ণ করা। এভাবেই ফেরেশতার প্রভাব অন্তরে নেমে আসে।
জাবের ইবনে ওবায়দা আদভী বলেন : আমি আলা ইবনে যিয়াদকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার অন্তরে কুমন্ত্রণা হয় কেন? তিনি বললেন : এটা ঠিক এমন, যেমন এক গৃহে চোর প্রবেশ করল। যদি গৃহে কিছু থাকে, তবে চোর মরিয়া হয়ে তা নিয়ে যাবে। আর যদি কিছু না থাকে, তবে খালি হাতেই চলে যাবে। উদ্দেশ্য হচ্ছে, যে অন্তর কামপ্রবৃত্তি ও খেয়ালখুশী থেকে খালি থাকে, তাতে শয়তান প্রবেশ করে না, করলেও খালি হাতে ফিরে যায়। এ কারণেই আল্লাহ বলেন, “(হে শয়তান!) যারা আমার বান্দা, তাদের উপর তোমার কোন ক্ষমতা চলবে না।”
সুতরাং যে ব্যক্তি খেয়ালখুশীর অনুসরণ করে, সে যেন আল্লাহর বান্দা নয়। তাকে খেয়ালখুশীর বান্দা বলা দরকার। সেমতে অন্য আয়াতে বলা হয়েছে- “যে ব্যক্তি তার খেয়ালখুশীকে উপাস্য করে নিয়েছে”।
এতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, খেয়ালখুশীর অনুসরণকারী খেয়ালখুশীর বান্দা। এরূপ ব্যক্তির উপরই আল্লাহ তাআলা শয়তানকে বিজয়ী করে দেন।
পরবর্তী পর্ব-

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন