শয়তান থেকে আত্মরক্ষার উপায় স্বরূপ হাদীসে আল্লাহর যিকিরই উল্লিখিত হয়েছে।
বর্ণিত আছে, হযরত আমর ইবনুল আস রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর খেদমতে আরজ করলেন : ইয়া রসূলাল্লাহ্ ! শয়তান আমার মধ্যে ও আমার নামাযের মধ্যে আড়াল হয়ে যায়। অর্থাৎ নামায ও কেরাআতের মধ্যে কুমন্ত্রণা দেয়। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বললেন : “এই শয়তানকে খানযাব বলা হয়। তুমি যখন একে অনুভব কর, তখন 'আউযু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম' পাঠ কর এবং বাম দিকে তিনবার থুথু নিক্ষেপ কর।”
আমর ইবনে আস বলেন : আমি এই এরশাদ অনুযায়ী আমল করে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা পেলাম।
অনুরূপভাবে এক হাদীসে বলা হয়েছে, ওযুর মধ্যে কুমন্ত্রণা দেয়ার জন্যে ওলহান নামক এক শয়তান আছে, এর থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর।
আল্লাহর যিকির দ্বারা শয়তান বিদূরিত হওয়ার একটি চমৎকার কারণ আছে, তা হচ্ছে, শয়তানী কুমন্ত্রণা অন্তর থেকে তখনই দূর হবে, যখন এই কুমন্ত্রণা ছাড়া অন্য কোন বিষয় অন্তরে উপস্থিত থাকে। কেননা, যিকির যখন অন্তরে স্থান লাভ করবে, তখন এর পূর্বে অন্তরে যা ছিল, তা তাতে থাকবে না। সুতরাং মনকে অন্য কোন বিষয়ে ব্যাপৃত করলে শয়তানী কুমন্ত্রণা দূর হতে পারে। তবে অন্য বিষয়েও কুমন্ত্রণা দেয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়, কিন্তু আল্লাহর যিকির ও তৎসম্পর্কিত বিষয়াদির উপস্থিতিতে শয়তানের সাধ্য নেই যে, অন্তরের ধারে-কাছে আসে, কিন্তু শয়তানকে দূর করার ক্ষমতা তাদেরই আছে, যারা মুত্তাকী এবং প্রায়ই যিকিরে মশগুল থাকে। এরূপ লোকদের কাছে অসতর্ক মুহূর্তে শয়তান এলেও গোপনে চলে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন :
“নিশ্চয় যারা আল্লাহকে ভয় করে, তারা শয়তানের স্পর্শ পেয়েই সতর্ক হয়ে যায় এবং তখনই দিব্যদৃষ্টি লাভ করে।”
এ আয়াতের তফসীরে হযরত মুজাহিদ (রহঃ) বলেন : শয়তান অন্তরে ছড়িয়ে থাকে। যখন অন্তর আল্লাহর যিকির করে, তখন সে কষ্টে সংকুচিত হয়ে পড়ে। এর পর অন্তর গাফেল হয়ে গেলে শয়তান আবার ছড়িয়ে পড়ে। যিকির ও কুমন্ত্রণা আলো ও অন্ধকারের মত একটি অপরটির বিপরীত। এই বৈপরীত্যের কারণেই আল্লাহ বলেন :
“শয়তান তাদের কাবু করে নিয়েছে, অতঃপর আল্লাহর যিকির ভুলিয়ে দিয়েছে।”
হযরত আনাস (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন : “শয়তান তার শুঁড় মানুষের অন্তরের উপর স্থাপন করে। যদি মানুষ আল্লাহর যিকির করে, তবে সে সরে যায়। আর যদি আল্লাহকে ভুলে যায়, তবে শয়তান তার অন্তর গ্রাস করে নেয়।”
ইবনে আওযা রেওয়ায়েত করেন, মানুষ যখন চল্লিশ বছর বয়সে পৌঁছেও তওবা করে না, তখন শয়তান খুশী হয়ে তার মুখে হাত বুলিয়ে বলে : এ চেহারাটি সাফল্য লাভ করবে না।
মোট কথা, কামপ্রবৃত্তির মানুষের রক্ত-মাংসে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে গেছে। ফলে শয়তানের রাজত্বও তার রক্ত-মাংসের মধ্যে বিদ্যমান আছে এবং অন্তরকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে রেখেছে। তাই হাদীসে বলা হয়েছে :
“নিশ্চয় শয়তান মানুষের রক্ত চলার পথে চলাচল করে। অতএব তোমরা ক্ষুধার সাহায্যে তার চলাচলের পথ সংকীর্ণ করে দাও।”
এরূপ বলার কারণ হচ্ছে, ক্ষুধার কারণে কামপ্রবৃত্তি নিস্তেজ হয়ে পড়ে। ফলে শয়তানের চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। অন্তর যে চতুর্দিক থেকে কামপ্রবৃত্তি দ্বারা পরিবেষ্টিত, তা এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত
“আমি মানুষকে ফাঁদে ফেলার জন্যে তোমার সরল পথে বসে থাকব, এর পর তাদের কাছে আসব সামনে থেকে, পশ্চাৎ থেকে এবং ডান ও বাম দিক থেকে।”
নিম্নোক্ত হাদীসেও এ বিষয়টি উল্লিখিত হয়েছে--
“শয়তান মানুষের কয়েকটি পথে বসে। সে ইসলামের পথে বসে এবং বলে : তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করে পৈতৃক ধর্ম বিসর্জন দেবে? মানুষ তার কথা না মেনে মুসলমান হয়ে যায়। এর পর শয়তান হিজরতের পথে বসে এবং বলে : তুমি কি হিজরত করে মাতৃভূমি ত্যাগ করবে? মানুষ একথা মানে না এবং হিজরত করে। এর পর শয়তান জেহাদের পথে বসে এবং বলে : যুদ্ধ করার মানে তো জান ও মাল বিনষ্ট করা। তুমি যুদ্ধ করলে নিহত হবে। মানুষ তাও মানে না এবং জেহাদ করে।”
এর পর রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন : যে ব্যক্তি এভাবে শয়তানের কথা অমান্য করবে, আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন। এর পর রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) কুমন্ত্রণার কথা উল্লেখ করে বললেন : কুমন্ত্রণা মনের এমন কিছু কল্পনা, যেমন জেহাদকারী ভাবতে থাকে, আমি মারা গেলে আমার স্ত্রী অপরের বিবাহিত হয়ে যাবে। এ ধরনের কল্পনার আসল কারণ শয়তান। এই শয়তান থেকে মানুষের পৃথক হওয়া উদ্দেশ্য নয়; বরং তার আদেশ অমান্য করাই উদ্দেশ্য। এ ব্যাপারে মানুষের অবস্থা বিভিন্ন রূপ।
এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারে, শয়তান কি বস্তু, সূক্ষ্ম শরীরী কিনা? শরীরী হয়ে মানবদেহে কিরূপে প্রবেশ করে? এ ধরনের প্রশ্ন ঠিক এমন, যেমন কারও কাপড়-চোপড়ে সাপ ঢুকে গেলে সে সাপের অনিষ্ট থেকে মুক্তি লাভের উপায় চিন্তা করে না; বরং প্রশ্ন করতে থাকে, সাপের রং ও আকৃতি কিরূপ এবং দৈর্ঘ্য প্রস্থ কি? এরূপ প্রশ্ন নিছক মূৰ্খতা ছাড়া কিছু নয়। উপরোক্ত বর্ণনা থেকে দুশমন তথা শয়তানের অস্তিত্ব তো নিশ্চিতরূপেই জানা গেল। এখন চেষ্টা করা উচিত যাতে এই দুশমন ক্ষতি সাধন করতে না পারে। এ উদ্দেশেই আল্লাহ্ তাআলা কেরআন পাকে অধিকাংশ স্থানে এরশাদ করেছেন, মানুষ শয়তানকে বিশ্বাস করে তার অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষা করুক। এক জায়গায় বলা হয়েছে : “নিশ্চয় শয়তান তোমাদের দুশমন। অতএব তাকে দুশমনরূপেই গ্রহণ কর। সে তার দলবলকে আহ্বান করে যাতে তারা জাহান্নামী হয়ে যায়।”
অন্যত্র বলা হয়েছে :
“হে আদম সন্তানরা ! আমি কি তোমাদেরকে বলে রাখিনি যে, তোমরা শয়তানের আরাধনা করো না, সে তো তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।”
অতএব, এ দুশমন থেকে বেঁচে থাকাই মানুষের কর্তব্য। এটা জিজ্ঞেস করা নয় যে, তার বংশ কি এবং বাসস্থান কোথায়? হাঁ, জিজ্ঞেস করার উপযুক্ত বিষয় হচ্ছে, এই দুশমনের হাতিয়ার কি কি? উপরে বর্ণিত হয়েছে, শয়তানের হাতিয়ার হচ্ছে কামপ্রবৃত্তি। আলেমদের জন্য এতটুকু জানাই যথেষ্ট, কিন্তু তার সত্তাকে চেনা এবং ফেরেশতাদের স্বরূপ জানা এটা আরেফ তথা বিভুজ্ঞানীদের বিষয়, যারা কাশফে ডুবে থাকে।
পরবর্তী পর্ব-

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন