তাওয়াক্কুল ধর্মের মনযিল সমূহের মধ্যে একটি মনযিল এবং বিশ্বাসের মকাম সমুহের মধ্যে একটি অন্যতম মকাম। এটি জানার দিক দিয়ে যেমন অত্যন্ত সূক্ষ, আমলের দিক দিয়েও অত্যন্ত কঠিন। জানার দিক দিয়ে সূক্ষ হওয়ার কারণ, উপায়-উপকরণ ও কারণাদির উপর ভরসা করা পকৃতপক্ষে তাওহীদের পরিপন্থী এবং শিরকের নামান্তর। আবার এগুলো থেকে সম্পূর্ণ দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেও শরীয়তের উপর আপত্তি উঠে। সুতরাং কারণাদির প্রতি দৃ্ষ্টি না দেয়া এবং এগুলোর উপর ভরসাও করা - এ বিষয়টি দুর্বোধ্য। তাই তাওয়াক্কুলের অর্থ এমন ভাবে হৃদয়ঙ্গম করা, যা তওহীদের অনুকূল। এবং বিবেক ও শরীয়তের সাথেও সামঞ্জ্যশীল হয়, নেহায়েত কঠিন ও সূক্ষ ব্যাপার। আল্লাহ্ তা'আলার অনুগ্রহে যে সকল আলেমের দৃষ্টিতে বস্তুনিচয়ের স্বরূপ প্রস্ফুটিত হয়েছে, তাদের ছারা এ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়ার সাধ্য কারো নেই। দিব্যজ্ঞানসম্পন্ন আলেমগণ দেখে জেনে নিয়েছেন এবং আল্লাহ্ তা'আলা তাদের দ্বারা য়েভাবে বর্ণনা করিয়েছেন, তারা সেভাবেই বর্ণনা করেছেন।
আমরা এই বিষয়বস্তু সম্পর্কে এখানে একটি ভূমিকা ও দুটি পরিচ্ছেদ লিপিবদ্ধ করব। ভূমিকায় তাওয়াক্কুলের ফযীলত এবং প্রথম পরিচ্ছেদে তাওহীদ এবং দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে তাওয়াক্কুল সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।
তাওয়াক্কুলের ফযীলত-
আল্লাহ্ তা'আলা এরশাদ করেন,
> "যদি তোমরা ঈমানদার হও তবে আল্লাহর উপর ভরসা কর"।
> "ভরসাকারীদের আল্লাহর উপরই ভরসা করা উচিত"।
> "যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, আল্লাহ্ তার জন্য যতেষ্ট"।
> "আল্লাহ্ ভরসাকারীদের ভাল বাসেন"।
সুতরাং সেই মকামের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনাসাপেক্ষ নয়, সেখানে পৌছলে আল্লাহর ভালবাসা লাভ করা যায়। যার জন্যে আল্লাহ্ তা'আলা যতেষ্ট হন এবং যাকে তিনি ভালবাসেন, সে অত্যন্ত সফলকাম। কেননা যাকে ভালবাসা হয় তার আযাব হবেনা এবং সে দুরে ও অন্তরালে থাকবেনা। এক আয়াতে এরশাদ হয়েছে -
>“আল্লাহ্ কি তার বান্দার জন্য যতেষ্ট নন”?
এ থেকে জানা গেল, যে ব্যাক্তি আল্লাহ্ ছাড়া অন্যকে যতেষ্ট মনে করবে, সে তাওয়াক্কুল বর্জনকারী হবে। আরও এরশাদ হয়েছে -
>"যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, আল্লাহ্ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়"। অর্থাত তিনি এমন শক্তিধর যে, কেউ তার আশ্রয়ে এলে তিনি তাকে লাঞ্ছিত করেন না। আর তিনি এমন কৌশলী যে, কেউ তার কৌশলের উপর ভরসা করলে তিনি তাকে নিরাশ করেন না।
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন -
>“তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য যাদের এবাদত কর তারা তোমাদের মতই বান্দা”।
এতে বলা হয়েছে আল্লাহ ছাড়া সবাই তোমাদের মত অভাবগ্রস্ত। অতএব তাদের উপর কেমন করে ভরসা করা যায়? আরো এরশাদ হয়েছে -
>“তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া যাকে পূজা কর, তারা তোমাদের রুযীর মালিক নয়। অতএব তোমরা আল্লাহর কাছে রুযী অন্বেষন কর এবং তার এবাদত কর”।
অন্যত্র বলা হয়েছে -
>“নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের ধণভান্ডার আল্লাহরই; কিন্তু কপট বিশ্বাসীরা তা বুঝেনা”।
এসব আয়াত ছাড়াও কোরআন মজীদে তাওহীদ সম্পর্কে উল্লেখিত আয়াত সমুহে এ কথাই বলা হয়েছে যে, অন্যের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে প্রবল প্রতাপশালী এক আল্লাহর উপরই ভরসা কর।
তাওয়াক্কুল সম্পর্কে হাদিস—
হাদীস গ্রন্থসমূহেও তাওয়াক্কুল সম্পর্কে অনেক রেওয়ায়েত বর্ণিত রয়েছে। হযরত ইবনে মাসুদের এক রেওয়ায়েতে রসুলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন : “আমাকে হজ্জের মৌসুমে উম্মতসমুহ দেখানো হয়েছে। আমি আমার উম্মতকে দেখেছি, তাদের দ্বারা সকল পাহাড়-পর্বত, উচ্চভূমি ও নিম্নভূমি ভর্তি হয়ে গেছে। তাদের সংখ্যাধিক্য দেখে আমার বিস্ময়ের অবধি থাকেনি। অতপর আমাকে প্রশ্ন করা হল : আপনি সন্তুষ্ট হয়েছেন? আমি বললাম হ্যা অবশ্যই। অতঃপর বলা হল : এদের সাথে আরো সত্তর হাজার বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
সাহাবায়ে কেরাম আরয করলেন : ইয়া রাসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) তারা কারা? তিনি বললেন, যারা অঙ্গে দাগ দেয়না, ভাবী শুভাশুভ বিশ্বাস করেনা এবং নিজের পালনকর্তার উপর ভরসা করে। একথা শুনে ওকাশা ইবনে মুহসিন দাড়িয়ে আরয করলেন। ইয়া রসুলআল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যাতে তিনি আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে দেন।
রসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) দোয়া করলেন হে আল্লাহ্ তাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। এর পর অপর এক ব্যক্তি দাড়িয়ে বলল : আমার জন্যও দোয়া করুন। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বললেন এ দোয়ায় ওকাশা অগ্রগামী হযে গেছে।
এক হাদিসে বর্ণিত আছে - “যদি তোমরা আল্লাহ তা'আলার উপর যথার্থ ভরসা কর তবে আল্লাহ পাখীদের মত তোমাদেরকেও রিযিক দেবেন। পাখীরা ভোরে ক্ষুধার্থ অবস্থায় নীড় ত্যাগ করে এবং সন্ধ্যায় উদরপূর্তি করে ফিরে আসে”।
এক হাদীসে বলা হয়েছে- “যে ব্যক্তি নিরবচ্ছিন্নভাবে আল্লাহ্ তা'আলার হয়ে যায়, আল্লাহ্ তাকে যাবতীয় পরিশ্রম থেকে রক্ষা করেন এবং ধারণাতীত যায়গা থেকে রিযিক দান করেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি দুনিয়ার হয়ে যায় আল্লাহ্ তাকে দুনিযার হাতেই ছেড়ে দেন”।
রসুলে আকরাম (সল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি সবার চাইতে অধিক বিত্তবান হওয়া পছন্দ করে, তার উচিত নিজের সামনের বস্তুর তুলনায় আল্লাহ্ তা'আলার নিকটবর্তী বস্তুর উপর অধিক ভরষা করা। বর্ণিত আছে রসুল (সল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর পরিবারের লোকজন যখন উপবাসের সন্মুখীন হতেন, তখন তিনি বলতেন : তোমরা নামাজের জন্য দাড়িযে যাও। তিনি আরও বলতেন : আমার পালনকর্তা আমাকে এ নির্দেশই করেছেন। সেই মতে কুরআন পাকে এরশাদ হয়েছে : আপনি আপনার পরিবারবর্গকে নামাজের নির্দেশ দিন এবং আপনি তাতে অটল থাকুন।
এক হাদিসে বলা হয়েছে- যে তাবীজগন্ডা করায় সে তাওয়ক্কুল করেনা। অর্থাত কুরআন মজিদ ও শরীয়তের সাধারণ নীতি অনুযায়ী তাবীজগন্ডা করানো যদিও জায়েয; কিন্তু এদিকে মোটেই ভ্রূক্ষেপ না করা তাওয়ক্কুলের দাবি।
কথিত আছে হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্সালাম-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হচ্ছিল, তখন জিবরাঈল (আঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেন : আপনার কোন প্রয়োজন আছে কি ? তিনি বললেন আছে, কিন্তু তোমার কাছে নয়। একথা বলার কারণ এই যে, তাকে যখন আগুনে নিক্ষেপ করার জন্য ধরা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন : আল্লাহই আমার জন্য যতেষ্ট। তিনি চমৎকার কার্যনির্বাহী। এই উক্তি বাস্তবায়িত করার জন্যই তিনি জিবরাঈল (আঃ)-কে একথা বলেছিলেন। তার এই কথা রক্ষা করার প্রতি ইঙ্গিত করেই কোরআন পাকে এরশাদ হয়েছে : "সেই ইব্রাহীম, যে তার কথা রক্ষা করেছিল"।
আল্লাহ্ তা'আলা হযরত দাউদ আলাইহিস্সালাম-এর প্রতি ওহী প্রেরণ করেন যে, হে দাউদ ! যে ব্যক্তি কেবল আমার মযবুত রশি ধারণ করবে, মানুষের সাথে কোন সম্পর্ক রাখবে না, তার সাথে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের সবাই প্রবঞ্চনা করলেও আমি তার নিষ্কৃতির পথ বের করে দিব।
তাওয়াক্কুল সম্পর্কে মনীষীগণের উক্তি
তাওয়াক্কুল সম্পর্কে মনীষীগণের উক্তি এই যে, একবার হযরত ইবরাহীম খাওয়াস এই আয়াত পাঠ করেন : আল্লা্র উপর ভরষা কর, যিনি চিরজীবী- কখনো মৃত্যুবরণ করেন না। অতঃপর তিনি বললেন : এ আয়াতের পর আল্লাহ ছারা আর কারো কাছে ভিক্ষা চাওয়া বান্দার উচিত নয়।
জনৈক আলেম বলেন : মানবের পক্ষে নিন্দনীয় রিযিকের অন্বেষনে নিজের ফরয কর্ম থেকে গাফেল হয়ে পড়া এবং পরকালের অধঃপতন ডেকে আনা উচিত নয়। সে দুনিয়াতে রিযিক ততটুকুই পাবে যতটুকু লিখা হয়েছে।
ইয়াহিয়া ইবনে মুয়ায বলেন : যখন মানুসের কাছে অন্বেষন ছাড়াই রিযিক আসে, তখন বুঝা যায়, রিযিকের প্রতিও মানুষ খুঝে নেয়ার নির্দেশ রয়েছে।
ইবরাহীম ইবনে আদহাম বলেন : আমি জনৈক দুনিয়াত্যাগী দরবেশকে প্রশ্ন করলাম : তোমার রিযিকের উৎস কি? সে উত্তরে বলল : এটা আমার জানার বিষয় নয়। পরওয়ারদেগারের কাছে জিজ্ঞাসা কর, তিনি কোথা থেকে আমার রিযিক দেন (খাওয়ান)?
হরম ইবনে হাব্বান হযরত ওয়ায়েস করণীকে জিজ্ঞেস করেন : আপনি কোথায় থাকেন ? তিনি সিরিয়ার দিকে ইশারা করলেন। হরম আবার প্রশ্ন করলেন : জীবিকা কিভাবে চলে? তিনি উত্তরে বললেন : সে সব অন্তরের জন্য পরিতাপ, যাতে সন্দেহ মিস্রিত রয়েছে। উপদেশ তাদের কি উপকার হবে ?
পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন