বলা বাহুল্য, তাওহীদের চারটি স্তর রয়েছে—
( এক)সারাংশ, (দুই) সারাংশের সারাংশ, (তিন) বাকল এবং (চার) বাকলের উপরকার বাকল।
অজ্ঞ লোকদেরকে বুঝাবার জন্যে আমরা একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছি।
তাওহীদকে একটি আখরোটের উপরকার বাকল মনে করা উচিত। আখরোটের উপরিভাগে উপর-নিচে দু'টি বাকল থাকে, একটি সারাংশ থাকে এবং সারাংশে থাকে তৈল। সুতরাং তাওহীদের
প্রথম স্তর হচ্ছে আখরোটের উপরকার বাকল। তা হচ্ছে শুধু মুখে “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” উচ্চারণ করা, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত অর্থ সম্পর্কে গাফেল থাকা কিংবা মনে মনে তা অস্বীকার করা- এটা হচ্ছে মুনাফিক তথা কপট বিশ্বাসীদের তাওহীদ।
দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে মুখে কলেমা উচ্চারণ করার সাথে সাথে তার অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা। এটা হচ্ছে সাধারণ জনগণের তাওহীদ।
তৃতীয় স্তর হচ্ছে সত্যের নূরের মাধ্যমে কলেমার অর্থ স্বর্গীয় প্রেরণায় প্রকটিত হওয়া এবং তা প্রত্যক্ষ করা। এটা নৈকট্যশীলদের তাওহীদ।
চতুর্থ স্তর এই যে, অস্তিত্ব জগতে এক ও অভিন্ন আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছু না দেখা। এটা সিদ্দীকগণের তাওহীদ। সূফী-বুযুর্গগণের পরিভাষায় এর নাম “ফানা ফিত্তাওহীদ” (তাওহীদে বিলুপ্তি)। কারণ, এই স্তরে ব্যক্তি যেখানে আল্লাহ তা'আলার সত্তা ছাড়া কিছুই দেখে না, সেখানে নিজের অস্তিত্বকেও দেখে না। সুতরাং তার সত্তা নিজের চোখেও বিলুপ্ত থাকে।
উপরোক্ত স্তর চতুষ্টয়ের মধ্যে
প্রথম ব্যক্তি কেবল মৌখিক তাওহীদপন্থী। তার তাওহীদের উপকারিতা কেবল দুনিয়াতেই পাবে। অর্থাৎ সে মুজাহিদদের তরবারি থেকে রক্ষা পাবে।
দ্বিতীয় ব্যক্তি এই অর্থে তাওহীদপন্থী যে, সে কলেমার অর্থ বুঝে এবং অন্তর দ্বারা তা মিথ্যা বলে বিশ্বাস করে না। এ ধরনের তাওহীদ অন্তরের উপর এক গ্রন্থিবিশেষ, যাতে উন্মোচন ও উদ্দীপনা হয় না। এতদসত্ত্বেও এই তাওহীদ দ্বারা আখেরাতের আযাব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, যদি এর উপরই জীবনাবসান হয় এবং . গোনাহের কারণে তা দুর্বল না হয়। এই গ্রন্থিকে ঢিলে করার ও খুলে দেয়ারও কতকগুলো কৌশল রয়েছে। সেগুলোকে “বেদআত” বলা হয়। আরও কিছু পন্থা রয়েছে, যেগুলোর দ্বারা এই গ্রন্থিকে মযবুত করা ও ঢিলেকারীদের কৌশল প্রতিহত করা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। এসব পন্থাকে বলা হয় “কালাম শাস্ত্র”। যে কালাম শাস্ত্র জানে, তাকে মুতাকাল্লিম এবং তার বিপরীতকে মুবতাদে' বলা হয়। জনসাধারণের অন্তর থেকে তাওহীদের গ্রন্থি খুলে ফেলার জন্য মুরতাদে' যে অপচেষ্টা চালায়, তা ব্যর্থ করে দেয়াই মুতাকাল্লিমের লক্ষ্য থাকে।
তৃতীয় ব্যক্তি এই অর্থে তাওহীদপন্থী যে, সে বিশ্ব-জাহানের হর্তাকর্তা একজনকেই বিশ্বাস করে। সে যদিও জানে, বস্তু সামগ্রী অনেক; কিন্তু এই প্রারাচুর্য সত্ত্বেও সেগুলোকে সে এক পরাক্রমশালী আল্লাহ থেকেই প্রকাশিত বলে জানে।
চতুর্থ ব্যক্তি এই অর্থে তাওহীদপন্থী যে , এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ্ ছাড়া কোন কিছুই তার দৃষ্টিগোচর হয়নি। সে বস্তুসামগ্রীকে বহুত্বে দৃষ্টতে দেখে। এটি তাওহীদের সর্বোচ্ছ স্তর।
অতএব
প্রথম প্রকার তৌহীদ হচ্ছে আখরোটের উপরের ছাল,দ্বিতীয় স্তর দ্বিতীয় ছাল, তৃতীয় স্তর সারাংশ এচতুর্থ স্তর তৈলের ন্যায়। যা সারাংশ থেকে নির্গত হয়। উপরের ছাল কোন উপকারে আসেনা। খেলে তিক্ত লাগে। আগুনে নিক্ষেপ করলে আগুন নিভিয়ে দেয় এবং ধোয়া বৃদ্ধি করে। ঘরে রাখলে অহেতুক যায়গা আবদ্ধ রাখে। মোটকথা , কয়েকদিন আখরোটের হেফাজত করা ছাড়া এটা কোন কাজে লাগেনা। সারংশ বের করলে এটা ফেলে দেয়া হয়। মৌখিক তাওহীদের অবস্থাও ঠিক তেমনি। এরূপ তাওহীদের উপকার কম এবং ক্ষতি বেশী। স্বল্পকালীন উপকার এই যে, মন ও দেহকে রক্ষা করার জন্য মৃত্যু পর্যন্ত কাজে লাগে এবং মুনাফিকের দেহকে মুজাহিদদের তরবারির গ্রাস হতে দেয়না। কারণ তাদের প্রতি অন্তর চিড়ে দেখার নির্দেশ নেই। তারা কেবল বাহ্যিক ইসলামকে দেখে। কিন্তু মৃত্যুর সময় তাদের এই তাওহীদ তাদের দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং এরপর কোন কাজে আসবেনা।
দ্বিতীয় প্রকার তৌহিদ - আখরোটের দ্বিতীয় ছাল প্রথম ছালের তুলনায় বাহ্যত উপকারী। এর দ্বারা সারাংশের হেফাজত হয়। এবং রেখে দিলে সারাংশকে বিগড়ে যেতে দেয়না। পৃথক করে নিলে জ্বালানি কাজেও আসে। কিন্তু এই উপকার সর্বাবস্থায় সারাংশের তুলনায় কম। এমনিভাবে অন্তরে কেবল কলেমার অর্থের বিশ্বাস রাখা মৌখিক কলেমার তুলনায় অনেক উপকারী। কিন্তু কাশফ্ ও প্রত্যক্ষকরণের তুলনায় এর মান কম। কাশফ্ ও প্রত্যক্ষকরণের ফল স্বরুপ যে উন্মোচন ও প্রশস্থতা অর্জিত হয়, তাই নিম্নোক্ত আয়াতে বুঝানো হয়েছে - "আল্লাহ্ যাকে পথ প্রদর্শন করার ইচ্ছা করেন, তার বক্ষ ইসলামের জন্য উন্মোচিত করে দেন। নিন্মের আয়াতেও তাই উদ্দেশ্যে - "আল্লাহ যার বক্ষ ইসলামের জন্য উন্মোচিত করে দিয়েছেন, সে তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে কি নূরের উপর প্রতিষ্টিত আছে?"
সারাংশ সয়ং ছালের তুলনায় উৎকৃষ্ট এবং এটাই প্রকৃতপক্ষে উদ্দেশ্য। তবুও তৈল বের করার পর তাতে কিছু গাদের মিশ্রণ থাকে। এমনিভাবে জগতের হত্তাকর্তাকে বিশ্বাস করাও সাধকের একটি সুউচ্চ লক্ষ্য কিন্তু এতে কিছু না কিছু ভ্রূক্ষেপ গায়রুল্লার প্রতিও থেকে যায়। যে ব্যাক্তি আল্লাহ্ ছারা কিছুই দেখেনা, তার তুলনায় এরূপ ব্যক্তির দৃষ্টি বহুত্বের দিকে থাকে।
এখানে প্রশ্ন হয়, মানুষ পৃথিবীতে এক সত্তা ছাড়া কিছুই প্রত্যক্ষ করবে না, তা কেমন করে সম্ভব ? কেননা, সে নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল, চন্দ্র, সূর্য, বৃক্ষ, তরুলতা ও অন্যান্য শরীরী বস্তুসমূহ প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করে। এসব বস্তু এক নয় অনেক। অতএব, অনেক বস্তু এক কেমন করে হবে? এর জওয়াব এই, কোন কোন বস্তু কোন বিশেষ দৃষ্টিতে দেখলে অনেক হয়; কিন্তু অন্য দৃষ্টিতে দেখলে একই হয় । উদাহরণতঃ মানুষকে যদি আমরা আত্মা, দেহ, হাত-পা, শিরা-উপশিরা, অস্থি ও অন্ত্রের দিক দিয়ে দেখি, তবে তাতে বহুত্ব থাকে; কিন্তু যদি অন্যদিক দিয়ে অর্থাৎ মানবতার দিক দিয়ে দেখি, তবে সে এক। অনেকেই মানুষকে দেখে এবং তাদের অন্তরে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বহুত্ব ও পৃথক হওয়া ধারণাও থাকে না। আসলে মানুষ যখন একত্বের ধ্যানে নিমজ্জিত থাকে, তখন সে একের মধ্যে বিভেদ ও পার্থক্য দেখে না। আর যখন বহুত্বের দিকে লক্ষ্য করে, তখন এসব বস্তু যে আলাদা আলাদা, সেদিকে কল্পনা ধাবিত হয়। এমনিভাবে স্রষ্টা হোক কিংবা সৃষ্টি সকলকে দেখার আলাদা আলাদা ও বহু দৃষ্টিকোণ রয়েছে। কোন দৃষ্টিকোণে তারা এক এবং কোন দৃষ্টিকোণে অনেক। এখানে দৃষ্টান্তটি যদিও উদ্দেশ্যের সাথে পুরাপুরি খাপ খায় না, তবু এর মাধ্যমে মোটামুটিভাবে প্রত্যক্ষকরণে অনেক যে এক হতে পারে, তা বুঝা যায়।
সর্বশক্তিমান এক আল্লাহর সত্তা ছাড়া অন্য কিছুই দৃষ্টিগোচর না হওয়ার অবস্থাটি কখনও সার্বক্ষণিক হয়ে থাকে, আবার কখনও বিদ্যুতের ন্যায় ক্ষণস্থায়ী হয়ে থাকে। সত্য বলতে কি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষণস্থায়ীই হয়ে থাকে। এটা সর্বক্ষণ অব্যাহত থাকা খুবই বিরল। বর্ণিত আছে , হুসাইন ইবনে মনসূর হাল্লাজ ইবরাহীম খাওয়াসকে সফর করতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন : তুমি বর্তমানে কি কাজে মশগুল আছ ? তিনি জওয়াব দিলেন : তাওয়াক্কুল পাকাপোক্ত করার উদ্দেশ্যে আজকাল আমি সফর করছি। হুমায়ুন ইবনে মনসূর বললেন : তুমি অন্তর আবাদ করার কাজে সারা জীবন বিনষ্ট করেছ। ফানা ফিত্তাওহীদ ( তাওহীদে বিলুপ্তি ) কোথায় গেল ? সেটা অবলম্বন কর না কেন ? উদ্দেশ্য এই, হযরত খাওয়াস তৃতীয় স্তরের তাওহীদ পাকাপোক্ত করার কাজে মশগুল ছিলেন, আর হুমায়ুন তাকে চতুর্থ স্তর অবলম্বন করতে বলেছিলেন।
এ পর্যন্ত তাওহীদপন্থীদের মকামসমূহ সংক্ষেপে বর্ণিত হল। এখন সেই তাওহীদের ব্যাখ্যা শোনা দরকার, যার উপর তাওয়াক্কুল নির্ভরশীল। সে মতে চতুর্থ স্তরের তাওহীদ সম্পর্কে চিন্তাভাবনাই করা উচিত নয়। তাওয়াক্কুলও এর উপর ভিত্তিশীল নয়; বরং তৃতীয় প্রকার তাওহীদ থেকেই তাওয়াক্কুলের হাল অর্জিত হয়। প্রথম প্রকার তাওহীদ হল নিফাক, যার অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয় প্রকার তাওহীদ সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। এর পাকাপোক্ত করার নিয়মপদ্ধতি কালাম শাস্ত্রে উল্লিখিত হয়েছে। বেদআতীদের আপত্তিসমূহের জওয়াবও তাতে বর্ণিত হয়েছে। বাকী রইল তৃতীয় প্রকার তাওহীদ। বলা বাহুল্য , এর উপরই তাওয়াক্কুল নির্ভরশীল। কেননা , কেবল বিশ্বাসগত তাওহীদই তাওয়াক্কুল সৃষ্টি করে না- এতে কিছু কাশফ ও প্রত্যক্ষণেরও দরকার। সুতরাং তৃতীয় প্রকার তাওহীদের ক্ষেত্রে যতটুকুর উপর তাওয়াক্কুল নির্ভরশীল, নিম্নে আমরা ততটুকুই বর্ণনা করার প্রয়াস পাব।
তৃতীয় প্রকার তৌহিদ - সংক্ষেপে কথা হল, মানুষের কাছে এটা দিবালোকের ন্যায় প্রতিপন্ন হতে হবে যে, আল্লাহ তা'আলা ছাড়া জগতের সর্বময় কর্তা আর কেউ নেই। সৃষ্টি, রিযিক, বখশিশ, জীবন, মরণ, প্রাচুর্য, দরিদ্রতা ইত্যাদি যত বিষয়াদি রয়েছে, সবগুলোর স্রষ্টা, আবিষ্কারক ও উদ্ভাবক একমাত্র আল্লাহ তা’আলাই। এতে কেউ তার অংশীদার নেই। এ বিষয়টি যখন মানুষের কাছে প্রকটিত হয়ে যাবে, তখন সে অন্য কারও দিকে লক্ষ্য করবে না, অন্য কাউকে ভয় করবে না। তারই কাছে আশা করবে এবং তারই উপর ভরসা করবে। কেননা, সর্বাধিপতি তো কেবল তিনিই। তিনি ব্যতীত যা কিছু আছে, সবই তার অধীন ও পদানত। মানুষের সামনে যখন কাশফের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়, তখন এটা সে চর্মচক্ষেও প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হয়।
শয়তান মানুষকে এই তাওহীদ থেকে দু'উপায়ে বিরত রাখে এবং তার সাথে শিরক মিশ্রিত করে দেয়। প্রথমত, প্রাণিকুলের ক্ষমতার প্রতি দৃষ্টিপাতের মাধ্যমে এবং দ্বিতীয়ত, জড় পদার্থের ক্ষমতার প্রতি মনোযোগর মাধ্যমে। জড়জগতের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হল এই, মানুষ শস্য উৎপাদনের জন্যে বৃষ্টির উপর ভরসা করে এবং বৃষ্টিপাতের ব্যাপারে মেঘমালার উপর ভরসা করে। নৌকা পানির উপর সঠিকভাবে ভেসে থাকা এবং চলার ব্যাপারে অনুকূল বায়ুর উপর ভরসা। এ সমস্ত বিষয় তাওহীদের ক্ষেত্রে শিরক এবং আসল সত্য সম্পর্কে অজ্ঞতা বৈ কিছু নয়। এ কারণেই আল্লাহ পাক এরশাদ করেন : "তারা যখন নৌকায় আরোহণ করে, তখন একান্তভাবে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর আল্লাহ যখন তাদেরকে উদ্ধার করে ডাঙ্গায় পৌছে দেন, তখনই তারা শিরক করতে শুরু করে।" কতক তাফসীরকারের মতে এখানে শিরক করার অর্থ এই, তারা বলতে শুরু করে যদি বায়ু অনুকূল না হতো, তবে আমরা তীরে পৌছুতে পারতাম না। কিন্তু যে ব্যক্তি বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবগত সে জানে, অনুকূল বাতাসও স্বেচ্ছায় চলে না যে পর্যন্ত না আল্লাহ পাক তাকে চালান।
অতএব, নাজাতের ক্ষেত্রে বায়ুর প্রতি মানুষের মনোযোগ এমন, যেমন কোন প্রাণদণ্ডযোগ্য ব্যক্তি গ্রেফতার হয়, অতঃপর বাদশাহ তার মুক্তি ও ক্ষমার আদেশ লিখে দেন। এখন এই ব্যক্তি বাদশাহের দোয়াত, কলম ও কাগজকে স্মরণ করে বলে- যদি দোয়াত, কলম ও কাগজ না হত, তবে আমি রক্ষা পেতাম না। অর্থাৎ, সে কলম ইত্যাদিকেই নাজাতের কারণ মনে করে। যিনি কলম চালিয়েছেন, তাকে স্মরণ করে না। বলা বাহুল্য, এটা চূড়ান্ত মূর্খতা। যে ব্যক্তি জানে, কলম কোন আদেশ দিতে পারে না, বরং সে লেখকের অনুগত, সে কলমের দিকে মনোযোগ দিবে না এবং লেখক ছাড়া অন্য কোন কিছুর কাছে কৃতজ্ঞ হবে না। এমনকি, মুক্তির আনন্দ এবং বাদশাহের কৃতজ্ঞতায় কলম ও কালির কল্পনাও তার অন্তরে জাগ্রত হবে না। সুতরাং চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, তারা, বৃষ্টি, মেঘমালা, পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী, উদ্ভিদ প্রভৃতি সমস্তই আল্লাহ তা'আলার কুদরতের এমনিভাবে অনুগত, যেমন লেখকের হাতে কলম-কাগজ ইত্যাদি। এ দৃষ্টান্তটিও কেবল বুঝানোর জন্যে, নতুবা দস্তখত বাদশাহ করলেও বাস্তবে লেখক আল্লাহ তা’আলাই। এক আয়াতে এরশাদ হয়েছে "আপনি যখন ধূলি নিক্ষেপ করলেন, তখন প্রকৃতপক্ষে তা আপনি নিক্ষেপ করেননি; বরং আল্লাহ নিক্ষেপ করেছেন।"
মানুষের কাছে যখন প্রতীয়মান হয়ে যায় যে, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সবকিছুই আল্লাহ তা'আলার আদেশের অনুগত, তখন শয়তান তার কাছ থেকে নিরাশ হয়ে ফিরে যায় এবং তার তাওহীদে জড়পদার্থের অংশীদারিত্ব মিশ্রিত করতে পারে না। শয়তান তখন অন্য উপায় অবলম্বন করে। অর্থাৎ, প্রাণিকুলের ক্ষমতার প্রতি মানুষের মনোযোগ আকৃষ্ট করে এবং বলে— সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়— এ কথা তুমি কেমন করে বিশ্বাস করতে পারলে? দেখ, অমুক ব্যক্তি তার ক্ষমতা বলে তোমাকে রূযী-রোযগার দেয়। সে ইচ্ছা করলে তা বন্ধও করে দিতে পারে। বাদশাহ ইচ্ছা করলে তোমার গর্দান উড়িয়ে দিতে পারে এবং ইচ্ছা করলে ক্ষমাও করতে পারে। অতএব, বাদশাহকে ভয় করা উচিত এবং তাঁর কাছেই আশা করা উচিত। কেননা, তুমি তাঁর অধীন। শয়তানের এই প্ররোচনায় অনেক মানুষের পা পিছলে যায়। তবে আল্লাহ তা'আলার খাঁটি বান্দার উপর শয়তানের কোন প্রভাব নেই। তারা অন্তর্দৃষ্টিতে দেখে, লেখক অনুগত ও বাধ্য। কিন্তু যে ব্যক্তির অন্তর ইসলামের জন্য আল্লাহর নূর দ্বারা উন্মোচিত হয়নি, তার অন্তর্দৃষ্টি আকাশ ও পৃথিবীর মহাপ্রভুকে দেখতে অক্ষম। সে দেখে না যে, এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ সবকিছুর উপর প্রবল। পক্ষান্তরে যারা “মোশাহাদা” তথা প্রত্যক্ষকরণের স্তরে উন্নীত, আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য নিজের কুদরত দ্বারা আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিটি অণু-পরমাণুকে বাকশক্তি সম্পন্ন করে দেন। এ সাধকগণ এসব অণু-পরমাণু আল্লাহর উদ্দেশে যে তাসবীহ ও পবিত্রতা বর্ণনা করে, তা নিজের কানে শুনে। অবশ্য তাদের কান এরূপ কান নয়, যা ধ্বনি ব্যতীত অন্য কিছু শুনতে পারে না। এরূপ কান তো গাধারও থাকে। অতএব, যে বস্তুতে চতুষ্পদ জন্তুও শরীক, তার তেমন মূল্য নেই।
পরবর্তী পর্ব
তাওয়াক্কুলের ক্রিয়াকর্ম

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন