সোমবার, ২৪ জুলাই, ২০২৩

ঈর্ষা দমনের উপায়


 
    ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ১৩)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
ঈর্ষা দমনের উপায়
ঈর্ষা অন্তরের কঠিন ব্যাধি। ইহার জ্ঞানমূলক ও অনুষ্ঠানমূলক ঔষধ রহিয়াছে।
জ্ঞানমূলক ঔষধ
ঈর্ষার অপকারিতা উপলব্ধি করা। ঈর্ষার ফলে ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির ইহ-পরকালের ক্ষতি হইয়া থাকে; কিন্তু বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির কোনই ক্ষতি হয় না, বরং ইহ-পরকালের তাহার লাভ হইয়া থাকে।

ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির ক্ষতি
আল্লাহ্ বিধানে মানবের উপর অহরহ নিআমত বৰ্ষিত হইতেছে। কিন্তু ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি অপরের সম্পদ দেখিয়া সর্বদা মনঃকষ্টে ও দুঃখে জ্বলিয়া-পুড়িয়া মরিতে থাকে। সে স্বীয় শত্রুকে যেরূপ দুঃখ ও মনঃকষ্টে জর্জরিত দেখিতে চাহিয়াছিল সে নিজেই তদ্রুপ দুঃখ যন্ত্রণায় কালাতিপাত করে।
ঈর্ষার যন্ত্রণার ন্যায় আর কোন যন্ত্রণাই নাই। অতএব অপরের অমঙ্গল কামনায় নিজকে দুঃখে ও মনস্তাপে জর্জরিত করা অপেক্ষা নির্বোধের কাজ আর কি হইতে পারে? অপরের ঈর্ষাতে বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির কোনই ক্ষতি হয় না। কারণ, আল্লাহ্ যাহার অদৃষ্টে যে-সম্পদ বিধিবদ্ধ করিয়াছেন, ইহা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকিবে, পরিমাণে ইহার হ্রাস-বৃদ্ধি ও সময়ের দিকে আর অগ্র-পশ্চাৎ কিছুই সংঘটিত হইবে না। কেননা, সৃষ্টির প্রারম্ভে যে অদৃষ্টলিপি বিধিবদ্ধ হইয়াছে তদনুসারেই মানুষ সম্পদপ্রাপ্ত হইয়া থাকে। কেহ কেহ ইহা বুঝিতে অক্ষম হইয়া সম্পদ লাভের কারণস্বরূপ শুভলক্ষণ ও নক্ষত্ররাজির উল্লেখ করিয়া থাকে, কিন্তু সকলেই একবাক্যে স্বীকার করিয়াছে যে, অদৃষ্ট অপরিবর্তনশীল।

একজন নবী (আঃ) এক সম্রাজ্ঞীর শাসন-উৎপীড়নে অসহ্য হইয়া তাহার বিরুদ্ধে আল্লাহর নিকট অভিযোগ জানাইলেন। ইহার উত্তরে ওহী অবতীর্ণ হইল  “অদৃষ্টলিপি পরিবর্তিত হইবে না। এই সম্রাজ্ঞীর রাজত্বকাল আরও বাকী আছে; তুমি ইচ্ছা করিলে অন্যত্র চলিয়া যাইতে পার।” 

অপর একজন নবী (আঃ) বিপদাপদে জর্জরিত হইয়া উহা মোচনের জন্য আল্লাহর নিকট বহু প্রার্থনা ও রোদন করিলেন। তৎপর এই মর্মে ওহী অবতীর্ণ হইল 
>“যে দিবস আমি যমীনের সহিত আসমানের সামঞ্জস্য বিধান করিয়াছি, সেই দিবস উহাও তোমার অদৃষ্টে বিধিবদ্ধ হইয়াছে। তোমার জন্য পূর্ব বিধান রহিত করিয়া আবার নতুন বিধান লিপিবদ্ধ করিতে বল কি?”

ফলকথা এই, ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির ইচ্ছার প্রভাবেই বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির সম্পদ বিদূরিত হয় না। তাহা হইলে ইহার ক্ষতি প্রকারান্তরে ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির উপরই আবার ঘুরিয়া আসিবে এবং তাহার স্বীয় সম্পদও বিলুপ্ত হইবে। যেমন মনে কর, তুমি কাহারও সম্পদ দেখিয়া ঈর্ষা করিলে এবং ইহাতে তাহার সম্পদ নষ্ট হইল, এখন তোমার সম্পদ দর্শনেও ত অপর কেহ ঈর্ষা করিতে পারে? এমতাবস্থায়, তোমার সম্পদও বিলুপ্ত হওয়া উচিত। আবার দেখ, ঈর্ষাতে বিদ্বিষ্ট ব্যক্তির অনিষ্ট হইলে কাফিরদের ঈর্ষার ফলে মুসলমানগণ ঈমানরূপ পারলৌকিক অমূল্য সম্পদ হইতে বঞ্চিত হইত। কিন্তু ইহা হয় নাই। কাফিরদের কামনা সম্বন্ধে আল্লাহ্ বলেন-
>“আহলে কিতাবের কেহ কেহ তোমাদিগকে বিপথগামী করিয়া দিতে অন্তরের সহিত কামনা করে।” (সূরা আল ইমরান, রুকূ ৭. পারা ৩)।

ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির ইহজগতে ভীষণ মনঃকষ্ট এবং পরজগতে ভয়ানক ক্ষতি হইয়া থাকে। আল্লাহ্ তাঁহার মঙ্গলময় বিধানে যাহা উত্তম বিবেচনা করিতেছেন তাহাই পূর্ণ কৌশলের সহিত সম্পন্ন করিতেছেন। বিশ্ব-কারখানায় তাঁহার যে কৌশল জীবন্তভাবে প্রচলিত থাকিয়া অহরহ কাজ করিয়া যাইতেছে, তিনি ভিন্ন উহার গুপ্ত রহস্য বুঝিবার ক্ষমতা আর কাহারও নাই। কিন্তু ঈর্ষী ব্যক্তি এই মঙ্গলজনক বিধানের প্রতি অসন্তুষ্ট এবং তাঁহার বন্টন-নীতিও সে মানিয়া লইতে পারে না। সুতরাং এই অসন্তুষ্টি ও অসম্মতির দরুণ আগুন তাহার হৃদয়ে সর্বদা জ্বলিতে থাকে। তাওহীদের আমানতে মুমিনকে সম্মানিত করা হইয়াছে। এমতাবস্থায়, আল্লাহ্ বিধানের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা অপেক্ষা অধিক খিয়ানত এই আমানতে আর কি হইতে পারে? 
শয়তান মুসলমানের চিরশত্রু, মুসলমানের অমঙ্গল কামনাই তাহার একমাত্র কাজ। ঈর্ষার বশবর্তী হইয়া এক মুসলমান অপর মুসলমানের অমঙ্গল করিলে সে শয়তানের কাজে শরীক হইল। মুসলমানের পক্ষে ইহা অপেক্ষা দুর্ভাগ্যের বিষয় আর কি হইতে পারে?
ঈর্ষী ব্যক্তি দুঃখকষ্টে নিপতিত থাকুক, বিদ্বেষভাজন ব্যক্তি ইহা কামনা করিতে পারে। ঈর্ষার ন্যায় কষ্টদায়ক আর কিছুই নাই। সুতরাং ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি সর্বদা মানসিক যন্ত্রণা ও কষ্ট ভোগ করে বলিয়া তাহার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইল। ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি একাধারে যালিম ও মযলুম, বরং তাহার ন্যায় মযলুম আর কেহই নাই। বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির দিক হইতে বিবেচনা করিলে সে যালিম; আর সেই ঈর্ষার ফলে সে নিজেই দুঃখকষ্টে জর্জরিত হয় বলিয়া সে মযলুম। ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির মৃত্যুর সংবাদে বা সে ঈর্ষা হইতে মুক্তি পাইয়াছে জানিলে বিদ্বেষভাজন ব্যক্তি দুঃখিত হইয়া থাকে। কারণ, সম্পদে অপরে তাহাকে ঈর্ষা করুক এবং ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি দুঃখকষ্টে নিপীড়িত হউক, ইহাই সে কামনা করিয়া থাকে।
বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির পারলৌকিক লাভের দিকে লক্ষ্য কর। সে ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি দ্বারা অত্যাচারিত। ঈর্ষার বশীভূত হইয়া কেহ কাহারও নিন্দা করিলে, অপ্রিয় কথা বলিলে এবং কাজ-কারবারের কোন ক্ষতি করিলে ঈর্ষী ব্যক্তির আমলনামা হইতে সওয়াব লইয়া বিদ্বেষভাজন ব্যক্তিকে প্রদান করা হইবে। আর তাহার সওয়াব না থাকিলে বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির পাপ ঈর্ষী ব্যক্তির স্কন্ধে চাপানো হইবে। ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির পার্থিব সম্পদের বিলোপ কামনা করে। কিন্তু ইহাতে তাহার সম্পদ বিলোপ হয় না, বরং তাহার পারলৌকিক সম্পদ বৃদ্ধি পাইয়া থাকে। অপরপক্ষে, ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি ঈর্ষার দরুণ ইহকালে ভীষণ যন্ত্রণা ও কষ্টভোগ করে, আর পারলৌকিক আযাবের উপকরণস্বরূপ তাহার পাপরাশি পুঞ্জীভূত হইতে থাকে। ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি নিজকে স্বীয় বন্ধু ও বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির শত্রু বলিয়া মনে করে, কিন্তু বাস্তবপক্ষে সে স্বীয় শত্রু এবং বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির বন্ধু। কেননা, ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি ইহলোকে নিজেকে দুঃখকষ্টে জর্জরিত করিয়া রাখে এবং পরলোকে তাহাকে কঠিন শাস্তির উপযোগী করিয়া তোলে। আলিম ও পরহেযগার ধনবানগণ সৎকর্মে ধন ব্যয় করিতেছে দেখিয়া কেহ তাহাদিগকে আন্তরিক ভালবাসিলে সে স্বয়ং গুণী ও সৎকর্মী না হইলেও সওয়াব পাইবে। কিন্তু মানবের পরম শত্রু শয়তান ইহা সহ্য  করিবে কিরূপে? অতএব, সে লোককে ঈর্ষার বশীভূত করিয়া তাহার সওয়াব নষ্ট করত পরম আনন্দ লাভ করিয়া থাকে। 
আলিম ও দীনদার সৎকর্মী লোকদিগকে ভালবাসা সওয়াব লাভের সহজ উপায়। যে ব্যক্তি তাহাদিগকে ভালবাসিবে কিয়ামতের দিন সে তাহাদের সঙ্গেই অবস্থান করিবে। বুযুর্গগণ বলিয়াছেন- যে ব্যক্তি নিজে আলিম বা ইলম শিক্ষার্থী অথবা আলিম ও ইলম শিক্ষার্থীদিগকে ভালবাসে, সেই সওয়াবের অধিকারী; কিন্তু ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি সওয়াব লাভের এই ত্রিবিধ উপায় হইতেই বঞ্চিত।

ঈর্ষাপরায়ণ লোকের অবস্থা নিতান্ত নির্বোধ ব্যক্তিসদৃশ। 
মনে কর, এক নির্বোধ অপরের প্রতি প্রস্তর নিক্ষেপ করিতে লাগিল। কিন্তু প্রস্তর বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির দেহে না লাগিয়া ঘুরিয়া আসিয়া নিক্ষেপকারীর ডান চক্ষুর উপর পতিত হইল এবং তাহার একটি চক্ষু নষ্ট হইয়া গেল। ইহাতে সেই ব্যক্তি ক্রুদ্ধ হইয়া আবার খুব জোরে প্রস্তর নিক্ষেপ করিল। এবারও প্রস্তরটি ফিরিয়া আসিয়া তাহার অপর চক্ষু নষ্ট করিয়া দিল। সে আবার ততোধিক জোরে প্রস্তর নিক্ষেপ করিল, ইহা ফিরিয়া আসিয়া তাহার মস্তক ভাঙ্গিয়া ফেলিল। এইরূপে বারবার প্রস্তর নিক্ষেপ করিতে করিতে সেই ব্যক্তি স্বীয় দেহ ক্ষত-বিক্ষত করিল। বিদ্বেষভাজন ব্যক্তি অক্ষত দেহে নিরাপদে থাকিয়া প্রস্তর নিক্ষেপকারীর দুরাবস্থা দর্শনে হাসিতে লাগিল। ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তিরও ঠিক এইরূপ দুরাবস্থা ঘটিকা থাকে। শয়তান তাহার এই দুর্গতি দেখিয়া উপহাস করিতে থাকে।
ঈর্ষা হইতে উল্লিখিত আপদসমূহ দেখা দেয়। তদুপরি ঈর্ষার বশবর্তী হইয়া কেহ অপরের নিন্দা করিলে, মিথ্যা বলিলে বা সত্য কথা অস্বীকার করিলে, তাহার উপর বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির দাবী অধিকতর বৃদ্ধি পাইবে এবং মহাবিচারের দিনে তাহার আমলনামা হইতে সেই পরিমাণে সওয়াব বিদ্বেষভাজন ব্যক্তিকে দেওয়া হইবে। অতএব ঈর্ষার যে সকল ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হইল উহা ভালরূপে হৃদয়ঙ্গম করিয়া লইতে পারিলে বুদ্ধিমান মানুষ হলাহল বিবেচনায় ইহা পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হইবে। এই সকল বোধকেই ঈর্ষা ব্যাধির জ্ঞানমূলক ঔষধ বলে।

ঈর্ষাপরায়ণ লোকের অনুষ্ঠানমূলক ঔষধ
কঠোর পরিশ্রম ও চেষ্টায় মন হইতে ঈর্ষার কারণগুলি বাহির করিতে হইবে। ক্রোধের বর্ণনাকালে বলা হইয়াছে, অহঙ্কার, ওজ্ব অর্থাৎ নিজেকে নিজে ভাল মনে করা, শত্রুতা, প্রভুত্ব ও সম্মান কামনা, ধনলিপ্সা ইত্যাদি ঈর্ষার মূল কারণ। অতএব, এই কুপ্রবৃত্তিসমূহ হৃদয় হইতে উৎপাটন করিয়া ফেলিবে। এই প্রকার কার্যকে জোলাপ বা বহিষ্কারক ঔষধ বলে। ইহা ব্যবহারের মাধ্যমে ঈর্ষার মূলসমূহ উৎপাটন করিয়া ফেলিলে মনে ঈর্ষা স্থান পাইবে না। অন্তরে ঈর্ষার ভাব উদ্ভব হইলে বিরুদ্ধাচরণে ইহার প্রতিরোধ করিবে। ইহা কাহাকেও তিরস্কার করিতে বলিলে তাহার প্রশংসা করিবে, অহঙ্কার করিতে আদেশ করিলে নম্রতা দেখাইবে, কাহারও সম্পদ বিনাশের চেষ্টায় তৎপর হইতে বলিলে বা কাহারও সঙ্গে শত্রুতা করিবার উস্কানি দিলে বন্ধুভাবে তাহার সাহায্য করিবে।
অগোচরে বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির প্রশংসা কীর্তন ও তাহার কার্যে সহায়তা তুল্য উপকারী ঈর্ষার প্রতিষেধক আর কিছুই নাই। এইরূপে অসাক্ষাতে কাহারও প্রশংসা ও সাহায্য করিলে সেই ব্যক্তির অন্তর আনন্দে পুলকিত হইয়া উঠিবে। সেই আনন্দের ছায়া তোমার অন্তরে যাইয়া পড়িবে এবং ইহাতে তোমার হৃদয়ও আনন্দে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিবে। তাহা হইলে ঈর্ষা আর কখনও অন্তরে জাগিবে না এবং শত্রুতাও তিরোহিত হইবে; যেমন আল্লাহ্ বলেন :
>“তুমি পাপকে সেই স্বভাব দ্বারা দূর কর যাহা অতি উত্তম। (এইরূপ করিলে) পরে তোমার ও যাহার (যে ব্যক্তির) মধ্যে শত্রুতা আছে, অকস্মাৎ যেন সে (তোমার) অন্তরঙ্গ বন্ধু হইয়া যাইবে।” (সূরা হামীম সিজদা, রুকু ৫, পারা ২৪)।


পরবর্তী পর্ব

ঈর্ষা পোষণে শয়তানের প্ররোচণা

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...